নীপাদের বাড়ি – ২০

২০

‘নীপা। এই নীপা’।

জানলায় ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। আর কেউ ডাকছে। মেয়েদের গলা।

গলাটা চেনা লাগছে। গলাটা নিশির।

নিশির ভালো নাম নিশি না। ওর খুব কঠিন একটা ভালো নাম আছে। প্রজ্ঞাপারমিতা। কিন্তু ওর ডাক নামটা আমার মার দেওয়া। নিশি। ছোটবেলায় আমি পড়তে বসলেই ও ডাকতে আসত। আর আমি দৌড়ে চলে যেতাম। মা বলতো, ‘ওই দেখ, সকাল সকাল নিশি ডাকতে শুরু করে দিয়েছে’।

এইভাবেই একসঙ্গে বড় হচ্ছিলাম। ক্লাস নাইনে নিশিকে আরেক নিশি ডাকতে শুরু করেছিল।

চিরদিনই তুমি যে আমার সিনেমা আছে। সিনেমা দেখতে ভারি ভালো লাগে। বাইক মিস্ত্রি স্কুলের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে। নিশিকে এক বাইক মিস্ত্রি নিশি ডাকতে শুরু করল।

নিশি বাড়িতে পড়াশুনা করতে করতে এক শীতের রাতে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। পাওয়া যাচ্ছে না। একটা চিঠি লিখে গেছে,

‘মা

আমি মকবুলকে ভালোবাসি। আমরা বিয়ে করব।

ক্ষমা করে দিও।

তোমাদের পোজ্ঞা’।

ব্যস। কান্নার রোল উঠল বাড়িতে। মকবুল এলাকার ছেলেই না। বিহারের ছেলে। ওর মালিক জানেই না ছেলেটা কোত্থেকে এসেছিল। সে নিশিকে নিয়ে পালিয়েছে।

আমার মাকে কে যেন বলেছিল মেয়েকে সাবধানে রেখো। মা পাত্তাই দেয়নি। বলেছিল, যত বেশি বেঁধে রাখবে, তত আগে পাখি খাঁচা ছেড়ে পালাবে।

বাবার ক্ষেত্রেও মা একই পলিসি নিয়েছিল। কোনদিন বাঁধতে যায়নি। গেছে, গেছে। ঠিক আছে। কোনও ব্যাপার না।

নিশির এতদিন কেউ খোঁজ পায়নি। কেউ বলেছে আরবে পাচার হয়ে গেছে। কেউ বলেছে সোনাগাছিতে নাকি দেখা গেছে।

তাকে যখন জিগ্যেস করা হয়েছে, তুই ওকে সোনাগাছিতে দেখলি কী করে? তার মানে তুইও গেছিলি নিশ্চয়ই। তখন সে আমতা আমতা করে বলেছে, সে ওই রাস্তার সামনে দিয়ে আসছিল। দেখেছে নিশি শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে।

তাকে আবার চেপে ধরা হল, তার মানে তুই ওই রাস্তায় যারা দাঁড়ায় তাদের দেখিস? সে বলেছে তাহলে ভুলই দেখেছে সে। নিশি রাস্তায় দাঁড়াতেই পারে না।

জীবনে একটাই ভালো বন্ধু ছিল। সেও পালিয়ে গেছিল। কপালটাই এমন। এখন সে জানলা ধাক্কাচ্ছে।

দৌড়ে উঠে জানলা খুললাম।

সত্যিই নিশি। একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বড় বড় লাগছে। আমাকে দেখেই বলল, ‘আয় আয়। বাইরে আয়’।

আমি দৌড়ে বাইরে গিয়ে বললাম, ‘তুই কোত্থেকে? কোথায় ছিলি তুই?’

নিশি বলল, ‘ছাপরা পালিয়েছিলাম। মকবুল নিয়ে গেছে। সে যে কী কেঁদেছি আর ব্যাটাকে কিল মেরেছি তুই জানিস না’।

আমি বললাম, ‘তারপর?’

নিশি বলল, ‘তারপর অভ্যাস হয়ে গেল। বাচ্চা হল’।

আমি চোখ বড় বড় করলাম, ‘তোর বাচ্চা? কোথায়?’

নিশি হাই তুলল, ‘বাড়িতে রেখে এসেছি। বাবা বাড়িতে নেই। মা বাচ্চা কোলে নিয়েছে। মা সাইজ হয়ে যাবে। বাবা হবে না। কোন বাড়ি বিয়ে করেছি ভাই! আমার পুরো খবর আছে। বাংলা পক্ষ ধরবে বিহারি বলে, আরেকপক্ষ ধরবে…হি হি’।

আমি বললাম, ‘সে তো বুঝলাম খবর আছে, কিন্তু তুই এলি কেন?’

নিশি বলল, ‘এমনিই। যেভাবে পালিয়েছিলাম। একদিন সকালে মনে হল পালিয়ে বিয়ে করি। করলাম। কাল মনে হল অনেক সংসার করেছি। এবার ফিরে যাই। চলে এসছি বাচ্চা নিয়ে। মকবুলের কী আছে? বিয়ে করে নেবে আরেকটা’।

আমি বললাম, ‘এত সোজা? তোকে এ বাড়িতে মানবে কেন?’

নিশি বলল, ‘ও ঠিক মেনে নেবে। কেঁদে টেদে সাইজ করে নেবো। কিন্তু ভাই, ওদের লোকজন খুব ডেঞ্জারাস! আমি অবশ্য দূর থেকে তিন তালাক মেরে দিয়েছি’।

আমি বুঝলাম, বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা। আমি পাগল, হিমু পাগল, নিশি পাগল, যেদিকে চোখ দেব সবাই পাগল।

অবশ্য সুস্থ হয়েই বা লাভ কী? সুস্থ মানুষজন ভোট দিয়ে যাদের জেতায়, তারা কি আদৌ সুস্থভাবে দেশ চালায়? এসব নিয়ে ফালতু ভাবনা করার কোনও মানেই নেই।

আমি বললাম, ‘চল তোর বাচ্চাকে দেখে আসি’।

নিশি খুশি হল, ‘চল চল’।

নিশিদের বাড়ি রওনা হয়েই মনে হল আমার বাবার বাচ্চা নিশির বাচ্চার থেকেও ছোট হবে।

উফ!

২১

পৃথিবী আজব জায়গা। এখানে এক একটা লোক কী থেকে কী হয়ে যায়, কেউ জানে না। আমাদের কলেজে একটা মেয়ে ছিল দেবী নামে। দেবী সব সময় বলত, ও কিছুতেই মদ সহ্য করতে পারে না। পারলে পৃথিবীর সব মদ ও বুলডোজারের তলায় ফেলে দিত।

এখন দেবী পিওর মাতাল। মদ না খেলে নাকি ঘুমাতেই পারে না। মদটাই ওর অভ্যাস হয়ে গেছে। নেশা জিনিসটাই এমন। একটা সময় অবধি সবাই ভাবে এটায় কিছুই হবে না। সবটাই আমার নিয়ন্ত্রণে আছে। কখন যেন নেশা তাকে গ্রাস করে ফেলে, সে নিজেও জানে না। একটা সময় সন্ধে হলেই মনে হতে শুরু করবে, ইস, একটু খেলে মন্দ হত না। কেউ বা রাতে ঘুমানোর জন্য একটু করে খায়। সবারই ওই ‘একটু টেস্ট করে দেখি’ দিয়েই শুরু হয়েছিল।

নিশি কী ছিল ভাবতে গেলেই মনে পড়ে ছোটখাটো চেহারার মেয়ে, সারাক্ষণ লাফিয়ে যাচ্ছে, এর ওর বাড়িতে আম, জাম, কুল যা পাচ্ছে পেড়ে নিয়ে আসছে, সে এখন একটা ছেলে কোলে নিয়ে তাকে ঘুম পাড়াচ্ছে। চেহারায় একটা বয়স্ক বয়স্ক ভাব এসেছে।

সময় পালটায়। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পালটায় আর সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে পালটায়, সেটা ভাবতেই অবাক হতে হয়। নিশির মা কাঁদো কাঁদো মুখে আমাকে বললেন, ‘আমি শুধু ভাবছি, ওর বাবা এলে কী হবে? ভাবলেই আমার জ্বর চলে আসছে। কী বলব? মেয়ে কপাল পুড়িয়ে এসেছে? সেই চিরাচরিত থ্রেট যেটা মায়েরা দারুণ দেয়। ‘দাঁড়া তুই, তোর হচ্ছে। বাবা ফিরুক আগে’।

নিশি ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘চুপ করো তো মা। তোমার সারাক্ষণ জ্বরই আসে। এসব নিয়ে ভেবো না’।

আমি বললাম, ‘চিন্তার কিছু নেই কাকিমা। আমাকেও শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কেউ একা না, সবাই স্পেশাল কেস। সবাই রাডারের মধ্যে আছি’।

কাকিমা কী বুঝলেন জানি না, চুপ করে গেলেন। নিশি বলল, ‘তোমরা ভালো করে খুঁজেছিলে আমায়?’

কাকিমা বললেন, ‘খুঁজিনি আবার? তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তোকে কোথাও পাইনি’।

নিশি বলল, ‘ধুস। খোঁজোইনি। ঠিক করে খোঁজার কোনও ইচ্ছে ছিল না তোমাদের। ঠিক করে খুঁজলে ভগবান পাওয়া যায়, আমি তো কোন ছাড়। তোমরা ভাবলে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে না, বেঁচে গেলাম’।

কাকিমা কেঁদে ফেললেন, ‘নিমক হারাম। তোর লজ্জা লাগে না এসব বলতে? তাও যদি একা থাকতিস, বুঝতাম। একটা বাচ্চা পয়দা করে ফেলেছিস আবার। তোর এই বিহারি বাচ্চাকে কে দেখবে?’

আমি বললাম, ‘বিহারি বাচ্চার আরেক সমস্যা আছে কাকিমা। ওরা এখন থেকেই পানমশলা খায় আর পিক ফেলে চারদিক রং করে দেয়। হ্যাঁ রে নিশি, তোর বাচ্চা এখন থেকেই পান মশলা খাচ্ছে নাকি?’

নিশি খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। আমার ভারি মজা লাগছিল। কাকিমা হাসলেন না। রেগে গেলেন।

নিশি ভালো সময়ে এসেছে। ও না এলে আমার খুব সমস্যা হত।

নিশির বাবা এলেন হঠাৎ করেই। নিশিকে দেখে কিছু না বলে স্নানে চলে গেলেন। নিশির মা অবাক হয়ে বললেন, ‘একী! রাগল না?’

নিশি বলল, ‘রাগলে রাগবে। আমার কিছু করার নেই’।

কাকিমা রেগে গেলেন, ‘করার নেই মানে? তোর জন্য কি বিশ্বযুদ্ধ হবে নাকি?’

নিশি বলল, ‘আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই মা। লাথিঝ্যাটা খেয়ে এখানেই পড়ে থাকতে হবে’।

নিশির বাবা ফ্রেশ হয়ে এসে নিশির বাচ্চাকে দেখলেন, নিশিকে দেখলেন। শান্ত মুখে চেয়ার টেনে বসে বললেন, ‘তারপর? বিপ্লব শেষ?’

নিশির মা নিশিকে ইশারা করলেন বাবাকে প্রণাম করতে। নিশি প্রণাম করতে যেতেই নিশির বাবা পা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘তুই আমার মেয়ে না। আমার মেয়ে মরে গেছে’।

নিশি বলল, ‘আমি ও বাড়ি ছেড়ে দিয়েছি’।

নিশির বাবা বললেন, ‘উদ্ধার করেছ। তোমার বিয়ের জন্য যে গয়না রাখা ছিল, সব গয়না আমি মন্দিরে দিয়ে দিয়েছি’।

নিশি চোখ ছলছল করে বলল, ‘আমি শুধু তোমার জন্য চলে এসেছি বাবা। তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল’।

নিশির বাবা কেঁদে ফেললেন। নিশি সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে জড়িয়ে ধরে আমাকে চোখ মারল।

এর অর্থ হল, ‘বাবা ফিট হয়ে গেছে, আর চাপ নেই’।

কী কপাল! এই হয়। নিশির বাবা আছেন, আমার থেকেও নেই!

২২

মা বলে, খারাপ সময় এলে আর পিছু ছাড়ে না। ধরে রেখে দেয়। আটকে রেখে দেয়।

আমার খারাপ সময় যাচ্ছে নাকি জানি না। হিসেবমতো যে দিন বাবা চলে গেছিল, সেদিন থেকেই আমার খারাপ সময় শুরু হয়ে গেছে। তার পর থেকে আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি, নিজেই বুঝতে পারি না।

নিশি ছিল পিকনিক মাস্টার। ও চলে যাবার পর থেকে আমাদের পাড়ায় পিকনিক করা বন্ধ হয়ে গেছিল।

নিশি এসেই ধুয়ো তুলল, পিকনিক করবে। ডিম ভাত। আর কিছু না। বাড়ির পেছনে উনুন কেটে হাড়িতে ভাত বসিয়ে দিল। শীতের রাত। বেশ উৎসব উৎসব পরিবেশ। আমার কেন জানি না চোখে জল চলে আসছে। আমি মাঝে মাঝেই চোখের জল মুছে ফেলছি।

হিমু এসে গেছে। আগুনের সামনে নিশির বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। নিশি বলল, ‘তোর বর তো ভালো বাচ্চা সামলাতে পারে!’

আমি বললাম, ‘বিয়ে ভেঙে গেছে। বর বলছিস কেন?’

নিশি বলল, ‘আমারও ভেঙেছে। কিন্তু মকবুলের জন্য হেবি দুঃখ হচ্ছে রে। মকবুল পাগলা ছিল, কিন্তু ভালোবাসত। মাঝে মাঝে রান্না করে খাওয়াত। এই যে রান্না করছি না, মকবুল হলে করতেই দিত না’।

আমি বললাম, ‘আমি করতে দেব ভাই। ওই হাড়ি তুই আমাকে বা হিমুকে নামাতে বলিস না। সকালেই কেলো করে দিয়েছি’।

নিশি বলল, ‘আচ্ছা আমায় একটা কথা বল, কাকা বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, কাকিমা কিছু বলল না?’

আমি বললাম, ‘না। তোর কাকিমা এখন ওদের সংসার চালায়’।

নিশি বলল, ‘পাগল আউরাত’।

আমি বললাম, ‘বিহারে থেকে থেকে এসব ভাষা শিখেছিস নাকি? আউরাত আবার কী?’

নিশি বলল, ‘আমাকে এটাই বলত মকবুল’।

আমি বললাম, ‘বললে বলত। তুই বলিস না। তোর মুখে কেমন লাগে। তোকে অচেনা মনে হয়’।

নিশি হাসি মুখে বলল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু আমি মনে হয় এখানে বেশিদিন থাকব না। আমার ওই বিহারে যেতেই ইচ্ছে করছে’।

আমি বললাম, ‘জানি। তোকে আমি আজ থেকে চিনি?’

নিশি মনের সুখে ডিমের ঝোলে ঝাল দিয়ে দিল।

বাইরেই খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শালপাতা পেতে খেতে বসে পড়লাম। ধোঁয়া ওঠা ভাত। ঝালস্য ঝাল ডিমের ঝোল।

হিমু খেতে গিয়ে উস আস করতে লাগল।

আমি বললাম, ‘মিষ্টি খাবে?’

হিমু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না না। এটাই খাব। কী আর হবে?’

আমি ধমক দিলাম, ‘না। দাঁড়াও আমি মিষ্টি নিয়ে আসি’।

ফ্রিজে রসগোল্লা ছিল। নিয়ে এলাম দুটো। হিমু ঝাল ডিমের ঝোল আর রসগোল্লা মিশিয়ে ভাত খেতে খেতে বলল, ‘হেবি খেতে লাগছে তো। এখন থেকে এভাবে খাব’।

আমি আর নিশি হেসে গড়িয়ে পড়লাম। নিশি বলল, ‘তা জামাইবাবু, তুমি কি আমার বন্ধুকে খুব ভালোবাসো?’

হিমু বলল, ‘খুব ভালোবাসি’।

আমি বললাম, ‘আমি বাসি না। এসব কথা বলিস না নিশি’।

নিশি বলল, ‘কেন বলব না? আমি তো বলবই। আমার অধিকার আছে’।

আমি বললাম, ‘ওর মার সামনে অধিকার ফলাস’।

নিশি বলল, ‘তুই ঘাবড়ে গিয়ে চলে এলি কেন? ফাইট দিতিস’।

আমি বললাম, ‘আমি আসিনি। কতবার বলব? আমাকেই ভাগিয়েছে’।

নিশি বলল, ‘ঢুকে যা। সংসার শুরু করে দে। ওতে কী হয়?’

আমি বললাম, ‘আমি এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না’।

নিশি বলল, ‘কেন? কী আছে তোদের বাড়িতে?’

আমি বললাম, ‘আমি আছি। ছোট থেকে এখন অবধি। পুরোটা। আর কী চাই?’

নিশি কেঁদে ফেলল, ‘ঠিক তো। আমাদের বাড়িতে তো আমরাই থাকি। তাও এ বাড়ি নাকি আমার না, কোনও বাড়িই আমার না’।

আমি বললাম, ‘না। আমার বাড়ি আমারই’।

নাট্যস্থলে হিমুর মাকে নিয়ে মামা এসে হাজির হলেন। হিমুর মা হিমুকে রসগোল্লা দিয়ে ডিম খেতে দেখে কপাল চাপড়ে বললেন, ‘এ মেয়ে কামরূপ কামাখ্যা থেকে জল পড়া নিয়ে এসে আমার ছেলেকে বশ করেছে গো!’

আমি জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এই নিন। আপনিও খেয়ে নিন। তাহলেই আমার দলে চলে আসবেন’।

হিমুর মা মুখ বাঁকিয়ে বললেন, ‘শাঁকচুন্নি কোথাকার!’

হিমু বলল, ‘মা আমায় খেতে দাও’।

হিমুর মা চোখ বড় বড় করলেন, ‘না। তুই আমার সঙ্গেই যাবি। চল’।

আমি বললাম, ‘যাবে না। এই হিমু, তুমি খাও। নিশ্চিন্তে খাও। নিশি, হিমুর মাকে ডিম টেস্ট করতে দে’।

হিমুর মা তিড়িং বিড়িং লাফ দিয়ে উঠলেন, ‘আমি এই মন্ত্রপড়া খাবার খাব না’।

আমি নিশিকে দেখিয়ে বললাম, ‘দেখেছেন? সাক্ষাৎ ডাকিনী। আর একটা হাকিনী আছে। আয়না নিয়ে আসব। দেখবেন?’

হিমুর মা আবার অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন।

২৩

হিমুর মা আমার মার মুখোমুখি।

যেন অনুপম রায়ের গান।

‘তোমার নৌকোর মুখোমুখি আমার সৈন্যদল…’।

হিমুর মা বললেন, ‘আমি পুলিশে যাব। একটা পাগল মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন আপনি!’

মা কিছু বলল না।

হিমুর মা রীতিমতো ফুঁসছিলেন, ‘আমার ডিভোর্স চাই। রেজিস্ট্রি নাকি প্রসেসিং হচ্ছে। বিয়ের ছবি দেখিয়ে নাকি আপনারা বিয়ে প্রমাণ করবেন। আমি ওসব জানি না। আমার ডিভোর্স চাই’।

মা এবার মুখ খুলল, ‘আমি যতদূর জানি, বিয়েটা আমার মেয়ের সঙ্গে হিমাংশুর হয়েছিল। এ বাড়িতে আপনাকে বিয়ে করতে কেউ দেখেনি। আর হিমাংশুকে এ বাড়িতে কেউ জোর করে আনেনি। ও স্বেচ্ছায় আসে। আপনারা বরং ওকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে পারেন’।

আমি কেরলের কোনও একটা মন্দিরের ভিডিও দেখেছি। সেখানকার পাবলিকদের নাকি ভূতে ধরে, তারা কাঁপতে কাঁপতে এসে কারেন্ট খাওয়া লোকের মতো মেঝেতে শুয়ে পড়ে।

হিমুর মা একদম সেভাবে মাথা ছাদের দিকে করে কাঁপতে শুরু করলেন। বললেন, ‘ও বাবা গো, আমার ছেলের উপর থেকে ডাইনির নজর সরাও গো, কী ভুল যে করেছি, কেন আমি এই মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলাম গো…’।

হিমুর ঠরকি মামা ভুঁড়ি চুলকাচ্ছেন। দিদির অবস্থা দেখে হাই তুললেন।

হিমুর এখনও ঝাল লাগছে। উস আস করে যাচ্ছে। হিমুর মা কিছুক্ষণ কেঁপে টেপে শান্ত হলেন। ‘শুনুন, আমি বলছি, ব্যাপারটা মেটান, এই মেয়েকে আমি ঘরে তুলব না’।

মা বলল, ‘আমার মেয়েই আপনাদের ঘরে যাবে না। আপনি অকারণ সিন ক্রিয়েট করছেন। মেটানোর কিছু নেই। আপনারা বরং আসুন’।

হিমুর মা বললেন, ‘হিমুকে কী গুণ করেছে আপনার মেয়েকে জিগ্যেস করুন। পানি পড়া খাইয়ে দিয়েছে। বা কোনও জিন দিয়ে বশ করেছে। আমার ছেলেকে বশীকরণ করে দিয়েছে’।

মা বলল, ‘আপনার কি মাথা খারাপ? এই সময়ে দাঁড়িয়ে এসব বিশ্বাস করেন? লজ্জা লাগে আপনাদের বাড়িতে আমার মেয়ে একদিন ছিল। আমি আমার মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইছি’।

হিমুর মা চুপ করে গেলেন। চোখ বড় বড় করে চারদিকে ঘুরিয়ে শান্ত হয়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা মেটান’।

মা বলল, ‘মেটাতেই চাইছি। আমাদের গয়না ফেরত দিন।’

হিমুর মা বললেন, ‘গয়না দেওয়া যাবে না। ওটা এখন আমাদের সম্পত্তি। লক্ষ্মী একবার এসেছে। তাকে আমি যেতে দেব না। গয়না দিলেই আমার বাড়ি থেকে লক্ষ্মী চলে যাবে। আপনারা খাট আর আলমারি ফেরত নিয়ে নিন’।

মা বলল, ‘হ্যাঁ সেগুলো তো নেবোই। কিন্তু আগে গয়না’।

হিমুর মা হঠাৎ কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেলেন। দু’ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হঠাৎ ‘উঁ উ উ’ করতে শুরু করে দিলেন। কয়েক মিনিট পর সামলে নিয়ে বললেন, ‘গয়না দেওয়া যাবে না। ভালো করে শুনে নিন’।

হিমুর মামা বললেন, ‘দেখলেন তো। আপনাকে আমি বলেছিলাম। মূল্য ধরে দেব। ওটা নিয়ে নিলেই পারতেন’।

মা বলল, ‘আমি জানি কীভাবে টাকা উদ্ধার করতে হয়। ভাববেন না একদম। আমার রক্তজল করা টাকায় কেনা। কোনও আজেবাজে লোকের সঙ্গে এই নিয়ে তর্ক করা বৃথা। কিছু লোক আছে, তাদের কাজই হল যে লোকের সম্পত্তি ঝাড়তে হবে। নিজেরা কিছু করবে না’।

হিমুর মা চোখ পিটপিট করে আমার মাকে বলল, ‘আপনি কি আমাকে আজে বাজে লোক বললেন?’

মা বলল, ‘হতে পারে। বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে হবে। দেখা গেল আপনার সঙ্গে কোনও আজেবাজে লোকের সব বৈশিষ্ট্য মিলে গেছে, তাহলে আপনিও আজেবাজে লোকই হবেন। কোনও কোনও লোক থাকে, তাদের বয়স বাড়ে না। নিজেকে বাচ্চা ভেবে যায়। ভাবে সারা পৃথিবীর দায় পড়েছে তারা যেটা করছে সেটাকে ঠিক বলতে হবে। আপনার মধ্যে এসব তো আছে। দেখতে পাচ্ছি’।

হিমুর মা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলেন, ‘ওগো, আমার কী হবে গো, ওরে হিমু তুই এরকম কেন? দেখ কী শুরু করেছে এরা?’

হিমু কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

ভোটের আগের নেতাদের মতো লাগছে ওকে।

মা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল, ‘একটু বাইরে আয়’।

আমি ঘরের বাইরে যেতেই মা ভেতরের ঘর বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘থাক এরা বসে। গয়না পেলে তবেই ছাড়া পাবে’।

আমি মজা পেলাম। এবার ওদের ঘরে দিদা ঢুকলেই ষোল কলা পূর্ণ!

২৪

জীবনে কিডন্যাপিং এর অভিজ্ঞতা ছিল না। সেটাও হয়ে গেল। হিমুর মা কেমন একটা ডাকিনী যোগিনীর মতো চিৎকার শুরু করে দিলেন ঘরের ভেতর থেকে।

ভালো করে শুনলে মনে হবে বলছেন, ‘আমি মঞ্জুলিকা, দুর্গাষ্টমীতে আমি তোর রক্ত খাব’।

হিমুর মামা মৃদুগলায় ডাকছেন, ‘বউদি, শুনছেন, দরজা খুলুন না, কত গয়না লাগবে? আমি সব গয়না এনে দিচ্ছি’।

মা বলল, ‘আগে আনানোর ব্যবস্থা করুন, তারপর দেখছি’।

হিমুর মা বললেন, ‘আমি মরে যাব, কিন্তু গয়না দেব না’।

এই মহিলাগুলো এরকম হয় কেন? তোর নিজের গয়না না। ছেলের বিয়েতে গয়না কিনে দিয়েছে মেয়ের বাড়ির লোক। সেই গয়নাগুলোকে কী হিসেবে তুই নিজের বাপের সম্পত্তি ভেবে বসে আছিস? আজব ব্যাপার তো! আমারও মাথা গরম হল। আমি দিদাকে ডেকে বললাম, ‘যাও না, ওদের মাঝখানে গিয়ে বসে থাকো না!’

দিদা নাক কুঁচকাল, ‘আমি কেন যাব? তোদের সমস্যা তোরা বুঝে নে’।

মানে বুড়ি শুধু আমায় জ্বালাবে। আমার বোঝা উচিত ছিল বুড়িটা এরকমই।

আরও কীসব কথা খুনখুন করে বলার চেষ্টা করল বুড়ি। আমি পাত্তা দিলাম না। পাড়ার নেতারা ঘুর ঘুর করছে। খবর পেয়েছে বোধহয় এ বাড়িতে একটা বাওয়াল হয়েছে। কিন্তু ভোট বড় বালাই। নিজের পাড়ার লোককে কে খ্যাপাবে? তারা খবরের কাগজের ভাষায় মন দিয়ে ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’ করছে।

হিমুর মামা হিমুর মাকে বোঝাচ্ছেন, ‘গয়না নিয়ে কী করবি দিদি? গয়নাগুলো দিয়ে দে। হিমু তো মেয়েটাকে ভালোবাসে। তুই জেদ ধরে থাকলে সমস্যা বাড়বে’।

হিমুর মার গলা ভেঙে গেছিল চিৎকার করে। মঞ্জুলিকার গলায় ফ্যাসফ্যাস করে বললেন, ‘আমি ওই মেয়েকেও ঘরে ঢোকাব না, আর ওই গয়নাগুলিও ফেরত দেব না। যা পারবে করে নিক। এখানে আটকে রাখলে রাখুক’।

আমার মা শান্ত মুখে বসে ওদের কথা শুনছে। আমি বললাম, ‘যদি থানা পুলিশ করে?’

মা বলল, ‘করুক। তারপর মজা দেখাব। আমি সব সময় চুপ করে সব কিছু দেখব না নীপা, মানুষের থেকেও আমার পরিশ্রমের দাম বেশি। গয়নাগুলো আমার রক্ত জল করা টাকায় কেনা। ওগুলো ফেরত না দিলে ওদের কপালে দুঃখ আছে’।

আমি বললাম, ‘তা তো ঠিকই। আমিও তোমার সঙ্গে একমত’।

মা বলল, ‘তুই কি আবার ও বাড়ি যাবার প্ল্যান করছিস?’

আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না। একেবারেই না। ও বাড়িতে গিয়ে আমি কী করব?’

মা বলল, ‘ছেলেটা সারাক্ষণ তোর পেছন পেছন ঘুরছে। তোর মন গলে যেতেই পারে। তোদের বয়সে সেটা স্বাভাবিক। তুই চাইলে ওদের আমি ছেড়ে দেব। কী বলিস?’

আমি বললাম, ‘আমি কিছু চাই না। তুমি যা ভালো বোঝো করো’।

মা বলল, ‘তাহলে চুপ করে বসে থাক। ওরা ওদের মতো চলুক’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।

নিশি জানলায় টোকা মারল। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। নিশি বলল, ‘মজা হচ্ছে কিন্তু। তোদের বাড়ি নিয়ে পাড়ার জুয়া পার্টি বাজি ধরেছে’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। আমাদের পাড়ায় কয়েকটা ছেলে মারাত্মক জুয়াড়ি। সব ব্যাপারে জুয়া খেলে। হিমুদের নিয়েও জুয়া খেলবে মাথায় আসেনি। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী নিয়ে জুয়া চলছে?’

নিশি বলল, ‘গয়না ফেরত আসবে কি আসবে না? না আসার দিকে ভোট বেশি আছে এখনও। উল্টো দিকে খেললে বেশি টাকা। আমি বাজি ধরেছি আসবে। ভাই, আমি জিতব তো?’

খবরের কাগজে পড়েছি জুয়াড়িরা প্লেয়ারদের থেকেই খেলার খবর নিয়ে জেতার খবর খোঁজে। এর মানে হল আমি এখন প্লেয়ার। গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘না ভাই। খেললে ঠিক করে খেল। চিটিং করিস না। তখন বাকিরা তোকে চুর বলবে। চুর চুর চুর, নিশি চুর! ভাল্লাগবে শুনতে?’

নিশি আমার কথা শুনে মুষড়ে পড়ল।

বাড়ির পাঁচিলে উৎসাহী মানুষের মাথা গিজগিজ করছে।

আজকাল মানুষের খবর কেউ নেয় না। সব বাজি ধরে।

কী সময় এসে গেল মাইরি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *