১০০
একটা অদ্ভুত হাওয়া দিচ্ছে এই প্রবল গরমেও। জানলা খুলেই রেখেছিলাম। জানলা থেকে এসে হাওয়াটা আমার মুখে ঝাপটা মারছে।
আমি বুঝতে চেষ্টা করছি হাওয়াটা কোত্থেকে আসছে। বৃষ্টি হবে কি? নাহ। মেঘ তো নেই। দুপুরে পাড়াটা শান্ত হয়ে যায়। দু-চারটে গাড়ি যায় রাস্তা দিয়ে, তার শব্দ, আর কোনও কুকুর খেপে গিয়ে চিৎকার করলে তার শব্দ পাওয়া যায়। এছাড়া তেমন কোনও শব্দ নেই। আমি হাঁটু মুড়ে বসে আছি।
একটু আগে আদি চলে গেল, ব্যাগ দুটো না নিয়েই। আদি চলে যেতে মা আমার ঘরে এসে বলল, ‘কীরে, ব্যাগ নিয়ে যাবে বলল, নিলো না তো!’
আমি বললাম, ‘পরে নেবে বলল’।
মা ঘরে চলে গেল। আমি জানি, আদি আর নিতে আসবে না। আদিকে দিদার ব্যাপারটা বলার পরে একটুও অপেক্ষা না করে আদি বলল, ‘আমি যাই বুঝলে, বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে’।
আমি কিছু বলিনি। আদি তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল। আর আসবে না।
অদ্ভুত শান্ত লাগছে আমার। আদিকে হারানোর ভয়টাও আর নেই। সব চলে গেছে। মনে হচ্ছে আর ভয়ে কাঁপতে হবে না।
নিশ্চিন্তে থাকতে পারব আমি। বিকেলে বেরোনোর কথা ছিল ওর। তার আগেই বেরিয়ে গেছে। আমি অনেকক্ষণ একইভাবে বসে রইলাম। দিদা বলল, ‘দেখলি? সত্যিডা শুনলে কেউ আর তোরে বিয়া করবে না। তুই এরকমই মরবি একদিন একা একা। ফাঁকি দিয়া বিয়া করার ইচ্ছা হইসিল ছেমরির। হুউউ, কত শখ’।
পাড়ার বাচ্চাগুলো রাস্তার উপরে ক্রিকেট খেলছে। আমি উঠে ওদের কাছে গেলাম। বাপ্পা বলে একটা বাচ্চা ব্যাট করছে। আমি বললাম, ‘আমাকে বল কর তো’।
ওরা সোৎসাহে রাজি হয়ে গেল। দুটো বল করার পরে বাপ্পা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল, ‘আমি আর বল করুম না, ব্যাট করুম। আমার ব্যাট, আমি ব্যাট করুম’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। ব্যাট কর’।
বাপ্পা ব্যাট করছে, এক হাতে বাপ্পা ব্যাট ধরেছে, অন্যদিক থেকে বাপ্পার প্যান্ট খুলে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলো সবাই খিলখিল করে হাসছে। আমিও হাসলাম। হাসতে হাসতে দেখি চোখের কোণ ভিজে যাচ্ছে। এবার কষ্ট হতে শুরু করল। মন ভেঙে দেওয়া কষ্ট। কোনও কারণ ছাড়া কষ্ট।
ঘরে ঢুকে দেখি মা একটা ডায়েরিতে কত কিছু লিখে যাচ্ছে। হিসেব করে যাচ্ছে। মাকে কিছু বললাম না। ঘরে গিয়ে বসলাম আবার।
আদিকে না বলে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু ক্রমাগত দিদা খুঁচিয়ে যাচ্ছে। না বললে আমিই পাগল হয়ে যেতাম।
মাকে এখন কিছু না বললেও মাকেও একদিন বলতে হবে। মা আদির সঙ্গে আমার বিয়ে হবে ধরে নিয়ে সব হিসেব করে যাচ্ছে। যখন জানবে, বিয়েটা হবে না, তখন এত কিছু হিসেব অর্থহীন হয়ে যাবে। মার সময়ের দাম আছে। কিন্তু এখনই বলব না। বললে আবার কৈফিয়ত দিতে হবে। যে কথা আদিকে অনায়াসে বলেছি, সে কথা মাকে আমি কোনওদিন বলতে পারব না।
যারা খুন করে, তারা কী করে বেঁচে থাকে? অনায়াসে ঘুরে বেড়ায় কী করে? আমি তো পারি না। প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে অপরাধবোধ কুড়েকুড়ে খায়। আয়নায় নিজেকে দেখলে রাগ হয়। এরকম একটা অভিশপ্ত জীবন থাকার কোনও দরকার ছিল না। মার কিছু হলে আমার আর বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। কিছু একটা পদ্ধতি ভাবতে হবে। জোর করে নিজেকে টেনে নিয়ে যাবার কোনও মানে নেই।
সন্ধেয় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি। মা এসে বলল, ‘এভাবে শুয়ে থাকিস না। বসার ঘরে চল’।
আমি বললাম, ‘মাথা ধরেছে। শুয়ে থাকি একটু’।
মা চলে গেল।
এটা কি হিমুর অভিশাপে হল? হিমু এত চেষ্টা করল, আমি ওকে ভালোবাসলাম না, তার জন্যই কি যাকে বিয়ে করতে চাইলাম সেও চলে গেল?
তাই হবে হয়তো।
১০১
আমি ভেবেছিলাম আদিদের বাড়ি থেকে ফোন আসবে। কোনও ফোন এল না।
রাত আটটা নাগাদ আমার ফোনে হিমুর ফোন আসা শুরু হল। দুবার পুরো রিং হয়ে থেমে গেছে। ধরিনি। তৃতীয়বারও যখন রিং হল, তখন বিরক্ত হয়ে ধরলাম, ‘বলো’।
‘তোমাদের মুক্তি দিলাম। ভালো থাকো’। হিমুর দুর্বল গলা শোনা গেল।
আমি এখনও হিমুর প্রতি বিন্দুমাত্র কোনো কিচ্ছু অনুভব করতে পারলাম না। কেঠো গলায় বললাম, ‘বিরক্ত কোরো না। ফোন রাখছি’।
হিমু বলল, ‘শোনো, শোনো, আমি ঠিক করিনি। শুনেছি সবাই তোমাদের খুব বাজে বাজে কথা বলেছে’।
হিমুর কথা শুনে চুপ করে রইলাম। কিছু বললাম না।
হিমু বলল, ‘আমি তোমাদের মুক্তি দিলাম’।
আমি বললাম, ‘একই কথা বার বার না বলে ফোন না করেও মুক্তি দেবার প্রমাণ দেওয়া যায়’।
হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি চাইছ যখন…তখন থাক। আচ্ছা নীপা, ছেলেটা তোমাকে আদর করেছে?’
কী প্রশ্ন এসব? বিরক্তিতে মন ভরে উঠল। আমি বললাম, ‘ফোন রাখো হিমু। আর ভালো লাগছে না’।
হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। রাখছি। আর জ্বালাব না’।
ফোন কেটে গেল। মাথা ধরেছে। মাথার পেছন থেকে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে।
মা আরেকটু রাতে আমার ঘরে এসে আলো জ্বেলে খাটে এসে বসল। ঠান্ডা গলায় বলল, ‘কিছু একটা হয়েছে, না? ছেলেটা চলে গেল, ওদের বাড়ির কেউ আমার ফোন ধরছে না’।
উত্তর দিলাম না।
মা বলল, ‘আমি জানতে চাইব না কী হয়েছে। যা হবার, তা বিয়ের আগে হয়ে যাওয়াই ভালো’।
আমি এবারও কিছু বললাম না।
মা বলল, ‘চল খেয়ে নে। শরীর ঠিক কর’।
আমি বললাম, ‘খিদে পাচ্ছে না’।
মা বলল, ‘তোকে আমি আগেও বলেছি, শরীরের সঙ্গে কোনও কম্প্রোমাইজ করবি না। যাই হয়ে যাক, লড়াই ছাড়লে চলবে না। বলেছি?’
আমি উঠে বসলাম, ‘বলেছ’।
মা বলল, ‘একা থাকতে পারলে একা থাকবি। কোনও অসুবিধা নেই। কাউকে লাগে না। হ্যাঁ, বয়স হলে তখন সমস্যা হতে পারে। হলে হবে। কারো জন্য, কোন মানুষের জন্য না খেয়ে শুয়ে থাকবি না। তোর বাবা যেদিন চলে গেছিল, তুই পরীক্ষা দিয়ে এলি, তোর মনে আছে, তোর সঙ্গে ভাত খেয়েছিলাম?’
আমার মনে পড়ল। ঠিকই। মা আমার সঙ্গে বসে খেয়েছিল।
আমি উঠে মার সঙ্গে খেতে বসলাম। কম খাচ্ছিলাম। মা বেশি করে ভাত বেড়ে দিল। হেসে ফেললাম, ‘এবার তো ফেটে যাব’।
মা বলল, ‘গেলে যাবি। খা’।
মা বলল, ‘আমি আর কাউকে ফোন করব না। ওরা করলে করবে’।
আমি বললাম, ‘আর কলকাতা যাওয়ার ব্যাপারটা?’
মা বলল, ‘বিয়েটা না হলে আর যেতে হবে না। এখানেই থাকব। যা হবে ভবিষ্যতে দেখা যাবে’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।
মা বলল, ‘তোকে একটা কথা বলা দরকার। না বললে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। ইদানীং এই অস্বস্তিটা একটু বেশিই হচ্ছে’।
আমি বললাম, ‘কী?’
মা বলল, ‘দিদা এসেছিল মনে আছে?’
আমি বললাম, ‘হুঁ’।
মা বলল, ‘মা ওই সময়টা খুব জ্বালাতন করত। আমি রেগেমেগে বাথরুমে সাবান জল রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মা পড়ে গেলে তোর মামাদের কাছে পাঠিয়ে দেব। মার সেদিন কিছু হল না। পরে একদিন…’
মা চুপ করে গেল।
আমি চমকে মার দিকে তাকালাম।
নিশিদের বাড়ি থেকে চিৎকার আসছে। নিশির বাবার সঙ্গে নিশির তুমুল ঝগড়া শুরু হয়েছে। আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, ‘ওটা আমি ছিলাম। সাবান জল ফেলেছিলাম। একইভাবে। সেবারেই যা হবার হয়েছিল। তারপর থেকে আমি দিদাকে দেখি। সারাক্ষণ আসছে। গালাগাল করছে। তুমি বলো, আমার কী করা উচিত। আমি এটাই আদিকে বলেছি। আদি চলে গেল’।
মা একটুও না ভেবে বলল, ‘বলা উচিত হয়নি। ও অন্য কাউকে বলে দিতে পারে’।
আমি বললাম, ‘বলবে না’।
মা বলল, ‘তুই নিশ্চিত হলি কী করে?’
আমি বললাম, ‘বললে অস্বীকার করব। বলব বানিয়ে বলছে’।
মা মাথা নাড়ল, ‘তাই করিস। এতদিন পরে কিছু প্রমাণ করতে পারবে না’।
আমি বললাম, ‘আমি কি ক্রিমিনাল?’
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘জানি না কে ক্রিমিনাল, আর কে সৎ’।
১০২
বাড়ির ঠিক সামনেটায় একটা আম গাছ আছে। ছোটবেলা থেকে কোনওদিন গাছটায় আম দেখিনি। এবারে কোন এক অজানা কারণে গাছটায় ছোট ছোট অনেকগুলো আম হয়েছে।
বাবাকে জিগ্যেস করতাম, বাবা, এই গাছে কোনও আম হয় না কেন? বাবা বলত, ওই গাছের আম নাকি চিনির মতো মিষ্টি, তাই খুব পোকা হত। পরে আর আম হত না। বাবা আর নেই। আম গাছটায় আম হয়েছে।
সকালে উঠে আমি গাছ দেখছিলাম। পোকা হবে? শুনেছি পোকা মারার ব্যবস্থা আছে। সেরকম হলে আমগুলো বেঁচে যাবে। এই গাছটা আমাদের আর নিশিদের বাড়ির মাঝে আছে। আম হলে হয়তো দু’ভাগে ভাগ হবে। পাড়ার ছেলেরা পেড়ে খেয়েও ফেলতে পারে। কয়েকটা ছেলে আছে, এ বাড়ি সে বাড়ির গাছ থেকে ফল পেড়ে খায়। সবাই খুব চিৎকার করে। আমার মজা লাগে। ছেলে হলে আমিও ওদের দলে যোগ দিতাম।
রোদ উঠছে, ঝকঝক করছে চারদিক। এই সময়টা সব চিন্তা ভুলে যেতে ইচ্ছে করে। আমার অবশ্য চিন্তারই বা কী আছে? কিছুই নেই। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ঘরে ঢুকতে যাব, এমন সময় নিশিদের বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে এল। ভাবলাম আগের রাতেই বাবার সঙ্গে ঝামেলা করেছিল নিশি, সে ঝগড়াই আবার শুরু হল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা পাড়া ছুটে আসতে লাগল নিশিদের বাড়িতে। হইহই শব্দে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠল।
আমি নিশিদের দিকের দরজা খুলে দেখলাম নিশিকে চার পাঁচজন মিলে বের করে বারান্দায় শুইয়ে দিয়েছে। বুক-পিঠ ঠান্ডা হয়ে গেল আমার। মনে হল আমার পা দুটো কেউ শক্ত করে মাটির সঙ্গে পুঁতে দিয়েছে। নিশির বাবা চিৎকার করে কাঁদছে, ‘ওগো, আমার মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়েছে গো’।
সবাই দিশেহারা হয়ে চিৎকার করছে, ছুটোছুটি করছে, আর আমি মেঝেতে বসে আছি। কখন জ্ঞান হারিয়েছি, নিজেই জানি না। শুধু বুঝতে পারছি কখন যেন কারা আমাকে তুলে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিয়েছে, আমি বমি করছি, আমার গোটা শরীর বমিতে ভেসে যাচ্ছে।
জ্ঞান ফিরল দুপুর নাগাদ। মা বসে আছে আমার সামনে। আমি উঠতে গেলে মা বলল, ‘উঠিস না, ডাক্তারবাবু শুয়ে থাকতে বলেছেন। রেস্ট কর’।
আমি কেঁদে উঠলাম, ‘মা, নিশি…’
মা বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘ভেবেছিলাম এখানেই থেকে যাব। আর থাকা হবে না। এ বাড়ি, এ পরিবেশে আমি বা তুই কেউই আর থাকতে পারব না’।
আমি কাঁদছি। মা বলল, ‘কাঁদিস না, বলেছি না কেঁদে কিছু হয় না?’
আমি বললাম, ‘আমি আর পারছি না’।
মা কঠিন গলায় বলল, ‘পারতেই হবে। পারছি না আবার কী? শক্ত হতে হবে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাও শক্ত হতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। এ পৃথিবীটা নরম এবং দুর্বল লোকের জন্য না। লোকে মজা দেখবে, হাসবে, কেউ পাশে থাকতে আসবে না। এমনভাবে তোকে গোটা পৃথিবীর মুখোমুখি হতে হবে যাতে তোকে কোনওদিন কোনও অবস্থাতেই দুর্বল বলে মনে না হয়। পারতেই হবে নীপা’।
আমার চোখের সামনে নিশির নিথর শরীরটা ভেসে উঠল। আমাদের ছোটবেলা…প্রাণচঞ্চল মেয়েটা…আমাকে বাড়ি থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে পিকনিকে ঝাল ঝাল ডিমের ঝোল করা, সব কিছু জুড়ে তো নিশিই ছিল। সেও আর রইল না?
অদ্ভুতভাবে কাল রাত থেকে দিদা আসেনি। এখনও দিদার কোনও অস্তিত্ব নেই। আমি চোখ বুঁজে আবার খুললাম, যদি দিদাকে দেখতে পাওয়া যায়। না! দিদা আর নেই।
আমি বললাম, ‘আমি চাকরি পাব মা?’
মা বলল, ‘পাবি। নিশ্চয়ই পাবি’।
হঠাৎ নিশির বাচ্চাটা তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। আমি পাংশুমুখে মার দিকে তাকালাম।
মা উঠে জানলা বন্ধ করে দিয়ে বসল, ‘কাল সকালে আমরা বাড়ি ছাড়ব। আর না। অনেক হল’।
১০৩
একটা বাড়ির বাস তুলে দেওয়া বড় সহজ কাজ নয়। কোনটা নেওয়া হবে, আর কোন জিনিসটা নেওয়া হবে না, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কি অত সহজ? বাবার ছবিটার সামনে মা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘তুই কি ছবিটা নিতে চাস?’
আমি বললাম, ‘নেবে না?’
মা বলল, ‘তুই নিলে নে’।
আমি বললাম, ‘ছেড়ে দাও তবে’।
বাতিলের তালিকায় বাবার ছবিটাও চলে গেল।
আমার অনেক জামা কাপড়, ছোট হত, আমি যত্ন করে রেখে দিতাম। সেগুলো সেদিনই আলাদা করে রাখা ছিল। সেগুলিও গেল। বাবার হিসেবের খাতা, ডায়েরি, পেন, বাবার আলমারিতে রাখা বাবার অনেকগুলো জামাকাপড়, সব বাতিল জিনিসের স্তুপে ফেলে দেওয়া হল।
দুজনে মিলে সব গোছগাছ করে ক্লান্ত হয়ে বসে রইলাম।
মা ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করবে রিটায়ারমেন্ট অবধি। আমি কয়েকটা অফিসে অ্যাপ্লাই করব। মা যোগাযোগ করে রেখেছ। সেখানে মাইনে বেশি না। কিন্তু মার কথা হল, ঘরে বসে না থেকে কাজটা চালিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম, ‘নিশি না ফিরলেই ভালো হত। তাহলে অন্তত বেঁচে থাকত’।
মা বলল, ‘নিশি ভুল করেছে। মরে যাওয়াটা কোনও সলিউশন না। কোনও পরিস্থিতিতেই মরে যাওয়া সলিউশন হতে পারে না’।
আমি বললাম, ‘ওর মাথা কাজ করছিল না শেষের দিকে। আমরা সবাই ভেবেছিলাম ও সুস্থ হয়ে গেছে। আসলে হয়নি’।
মা বলল, ‘হুঁ। আমরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে যাই যে পাশের লোকটা কত যন্ত্রণায় ছিল, তা আর মনে রাখি না। মেয়েটা বড় কষ্ট পেয়ে মরল’।
দুজনেই চুপ করে বসে রইলাম। আমার মা আর আমি। দুজনের দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। কোনও বন্ধুও নেই, যার সঙ্গে বসে মনের কথা বলতে পারব।
একটা কোম্পানিকে বলা হয়েছে। তারা গাড়ি নিয়ে এসে জিনিসপত্র তুলছে। পাড়ার লোকেরা এখনও দূর থেকেই দেখছে। কেউ আর এসে জিগ্যেস করছে না।
একটা গাড়ি করে হিমু এল। ক্লান্ত চোখ মুখ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে শরীর ঠিক নেই। ম্লান মুখে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়িয়ে রইল। আদি যে আর ফিরবে না, হিমু জানে না। বলল, ‘ভালো থেকো নীপা। আমি আর জ্বালাব না’।
মা বলল, ‘তুমিও ভালো থেকো। সংসার কোরো ঠিক করে। একটা লক্ষীমন্ত মেয়ে দেখে বিয়ে কোরো। সব ঠিক হয়ে যাবে’।
হিমু বলল, ‘কিচ্ছু ঠিক হবে না। আমি কারো সঙ্গে সংসার করতে পারব না। আপনাদের ঠিকানাটা দেবেন?’
মা বলল, ‘না। তোমার ভালোর জন্যই দেব না। তুমি নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করো’।
হিমু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে শুরু করল। আশ্চর্যজনকভাবে আমি এখনও হিমুর প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি অনুভব করতে পারলাম না।
নিজের উপরেই রাগ হল। আমার কোনওদিন ভালো হবে না, আমি খুব ভালো করে জানি। যে ছেলেটা সারাজীবন আমার কাছে ছুটে ছুটে এল, তাকে আমি দূরে সরিয়ে দিলাম। ভালোবাসতে পারলাম না কোনওদিনই।
বললাম, ‘ভালো থেকো। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবে’।
হিমু বলল, ‘এই বাড়িটার খদ্দের আছে? আমি কিনে নিতে পারি’।
মা বলল, ‘তুমি কেন কিনবে?’
হিমু বলল, ‘কত স্মৃতি। কতবার করে আসতাম। অন্য লোকজন আসবে, থাকবে, তার থেকে আমিই কিনে নিলাম’।
মা মাথা নাড়ল, ‘ওই ভুলটা কোরো না। ভুলেও এসব মাথায় এনো না। তোমার প্রাথমিক কাজ হবে, এ সব কিছুর থেকে নিজেকে বের করা। নইলে যে ভুল তুমি করেছ, সেটা আবার করবে। কোরো না। বেঁচে থাকো। বেঁচে থাকার বিকল্প নেই জানো তো বাবা? নইলে আমি তো কবেই মরে যেতে পারতাম, তাই না?’
হিমু মাথা নীচু করে বলল, ‘বেঁচে থাকব। ভালো থেকো নীপা। ভালো করে সংসার করো’।
আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে গাড়িটা ছেড়ে দিল।
একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আমায় আর মাকে নেবে বলে। মা বলল, ‘আসি হিমু। ভালো থেকো। চল নীপা’।
মা গাড়িতে গিয়ে বসল।
আমি বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
বাবা পালিয়ে গেল, মরে গেল, আদি ছেড়ে দিল, এত কষ্ট কোনওদিন হয়নি। ধীর পায়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। হিমু একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
গাড়ি ছেড়ে দিল।
ছোটবেলা, বড়বেলা, বিয়েবেলা, আমাদের বাড়ি, সব ছেড়ে গাড়ি চলল।
দিশাহীনের উদ্দেশে…।
***
