৮০
আদির সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়ে একটা কথা মনে হল।
আদির মতো ছেলের সঙ্গে আমার আগে কেন দেখা হল না? আদি বিরাট কোনও হিরো না। কিন্তু আদি একজন স্বাভাবিক ছেলে।
পিউর মেসেজ দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম। আদি আমার মুখ দেখে সেটা ঠাহর করতে পারল, ‘কী হল?’
আমি কিছু না ভেবেই ফোনটা আদিকে দিলাম। আদি মেসেজটা দেখে হাসল, ‘চিন্তা করবেন না। ভয় দেখানো পাবলিক অত সহজে মরে না। যারা মরার, তারা কিছু না বলে টুপ করে মরে যায়’।
আমি বললাম, ‘কিন্তু ও মরবে কেন?’
আদি বলল, ‘সেটা ও বলতে পারবে। আপনি সরবত খান’।
আমি সরবত শেষ করলাম। আদি বলল, ‘আর কোনও সরবত খাবেন?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘না না। একটাই ঠিক আছে। আমি বেশি খেতে পারি না’।
আদি বলল, ‘খাবেন। খাওয়াটা দরকার। মানুষ বেঁচে থাকে কেন? কিছুটা খাওয়ার জন্যও তো বাঁচে। আপনার বয়ফ্রেন্ড আছে?’
কোন কথার পর কোন কথা! আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, ‘মানে?’
আদি বলল, ‘এমনিই জানতে চাইছি। বয়ফ্রেন্ড আছে?’
আমি বললাম, ‘আমার বয়ফ্রেন্ড নেই, তবে হাফ রাতের বিয়ে হয়েছিল। আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাকে যত্ন করে ফুলসজ্জার রাতে বাপের বাড়িতে দিয়ে গেছিল’।
আদি হাঁ হয়ে গেল, ‘সিরিয়াসলি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আমি ইউনিক পিস’।
আদি বলল, ‘না, এখানে ইউনিক পিসের কিছু নেই। কিন্তু কী হয়েছিল?’
আমি যতটা ছোট করে বলা যায়, বললাম। আদি শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘ওরে বাবা, এ তো ইতিহাস’।
আমি বললাম, ‘ইতিহাসই বটে। অংক পরীক্ষার দিন বাবা পালিয়ে গিয়ে আমার জীবনটাই ইতিহাস করে দিয়ে চলে গেছে’।
আদি বলল, ‘আপনি সেসব ভুলে যান’।
আমি বললাম, ‘বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চাই না। পালিয়ে গিয়ে কি কিছু হয়?’
আদি বলল, ‘বাস্তব যদি মাথায় চেপে বসে, তাহলে মাথা থেকে সেসব সরিয়ে রাখলে ভালো থাকা যায়। চেষ্টা করে দেখুন। অসুবিধা হবে না’।
আমি বললাম, ‘চেষ্টা করব। এবার আমাকে ফিরতে হবে। অফিস টাইমের ভিড়টাকে আমি বড্ড ভয় পাই’।
আদি বলল, ‘আগের দিনই বলেছেন। চলুন রিকশা ধরি’।
আমি বললাম, ‘রোজ রোজ রিকশা ধরা ঠিক হবে না। আমি চলে যাব’।
আদি বলল, ‘চলে যাবেন? আর দেখা হবে না?’
আমি বললাম, ‘কেন হবে না? বইটা ফেরত দিতে হবে তো’।
আদি বলল, ‘তাও ঠিক। আমাকে ফোন করে নেবেন না হয়। নাম্বারটা সেভ করে নিন’।
আদি নাম্বার দিল। আমি সেভ করে নিলাম। আদি বলল, ‘ভালো থাকবেন’।
আমি বললাম, ‘আপনিও’।
আদি হাঁটতে হাঁটতে ভিড়ে মিশে গেল। আমি বাস স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
ফোন বেজে উঠল, দেখলাম পিউ ফোন করছে। ধরলাম, ‘বল’।
পিউ বলল, ‘তোর প্রেম হল?’
আমি হেসে ফেললাম, ‘প্রেম না। এমনি দেখা করতে এসেছিল। একটা বই দেওয়ার জন্য। তুই এরকম করছিস কেন?’
পিউ বলল, ‘আমার মনে হল তুই আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছিস না। আমার ভীষণ রাগ হল। তোর কি ছেলেটাকে ভালো লেগে গেছে?’
আমি বললাম, ‘ছেলেটা তো ভালোই। খারাপ লাগার কিছু নেই’।
পিউ বলল, ‘ওরকম মনে হয়। সময় দে। দেখবি খারাপ লাগার অনেক কারণ বেরিয়ে আসে। বাইরে থেকে ওপর ওপর দেখে কিছু বুঝবি না। যাকে বেশি ভালো মনে হয়, সে বেশি জালি বেরোয়’।
আমি বললাম, ‘তোর তো খুব এক্সপেরিয়েন্স!’
পিউ বলল, ‘এক্সপেরিয়েন্সের কিছু না। যে ক’টা মেয়ে আমার বন্ধু ছিল, সবার বয়ফ্রেন্ডের কিছু না কিছু কেলো বেরিয়েছে’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। রাখ। আমি বাড়ি যাই’।
পিউ বলল, ‘এখনও যাসনি?’
আমি বললাম, ‘না, এই তো বাসস্ট্যান্ডে’।
পিউ বিকট একটা শব্দ করে বলল, ‘দেখ তাহলে, আমি হলে তোকে স্টেশনে দিয়ে আসতাম। ছেলেটা চলে গেল। দেখলি ডিফারেন্সটা’।
আমি বললাম, ‘কী করব বল, আমি মেয়েদের পছন্দ করি না। অবশ্য ছেলেদেরও যে করি এমন নয়’।
পিউ বলল, ‘কেন? মেয়েদের পছন্দ করিস না কেন? এতে পাপের কিছু নেই। তোকে বলছি শোন…’
আমার বাস এসে গেছিল। আমি তাড়াতাড়ি পিউকে ‘ছাড়ি’ বলে ফোন কেটে দিলাম। বাসের মধ্যে পিউ ফোন করতে শুরু করল। আমি কেটে দিতে থাকলাম। অনেকবার কাটার পর মেসেজ করল, ‘ঠিক আছে, আমি দূরে চলে যাচ্ছি, তুই আমাকে পছন্দ করছিস না যখন, তখন থাক’।
আমি উত্তর দিলাম না।
৮১
কোনও কোনও মানুষ ভীষণরকমের একা। এতটাই একা যে কল্পনা করা যায় না। একাকিত্ব মানুষকে রাগী বানিয়ে দেয়, মিথ্যুক বানিয়ে দেয়, কখনও কখনও অপরাধীও বানিয়ে দেয়।
পিউর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে, পিউ মেয়ে পছন্দ করে, তাতেও আমার সমস্যা না থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে আমাকেও যে পিউকেই পছন্দ করতে হবে, মেয়ে হয়ে মেয়েকেই ভালোবাসতে হবে, তার তো কোনও মানে হয় নেই।
বাড়ি ফিরতে ফিরতেই পিউ আমাকে এমন সব মেসেজ পাঠানো শুরু করল, যেগুলো দেখলে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
‘তোর কথা শুনে মনে হয়েছিল তুই আমাকে ভালোবাসিস, তুই একটু আমাকে বোঝ’।
‘তুই তো নিজেই বলেছিলি তোর ছেলে পছন্দ না, তাহলে ওই ছেলেটাকে পছন্দ করলি কেন?’
‘আমি খুব একা নীপা, প্লিজ আমাকে একটু বোঝ’।
দিদা খিক খিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘এই হয়, বিয়া করস নাই, এখন তোর পিছনে মাইয়া মানুষ পড়সে। দুদিন পর পাড়ার কুত্তায় আইসা পড়বে’।
আমি পাত্তা দিলাম না। ফেসবুক খুললাম। ফেসবুকে আজকাল হিমুকে ফ্রেন্ড সাজেশনে দেখায়। খুব কায়দা করে দাঁড়িয়ে আছে। অনির্বাণদাকে দেখায়, রিমলেস চশমা পরে এমন একটা ছবি দিয়েছে, যে কেউ দেখলে পাগল হয়ে যাবে।
অনীশ বড় বড় কোটেশন শেয়ার করে, ‘যৌথখামার’, লেনিন মার্ক্সের ছবি দেয়। নারীবাদী লেখা শেয়ার করে। ফেসবুক দেখার পর থেকে আমার বিস্মিত হবার মাত্রা কমে গেছে। মানুষ বাস্তব জীবনে যা, ফেসবুকে কি ঠিক তার উল্টো হবার চেষ্টা করে? অনীশের মতো ছেলে, যে কিনা আমার বাবার মৃত্যুদিনে আমার অনুমতি ছাড়া আমাকে চুমু খেতে গেছিল, সে নারীবাদী কোটেশন শেয়ার করছে? ভাবলেই কেমন পেট গুড়গুড় করে হাসি পায় আমার।
আদিকে খুঁজলাম। পেলাম না। আদি কি ফেসবুকে নেই? নাকি আমিই পাচ্ছি না? কে জানে।
পিউ হোয়াটস অ্যাপে দুঃখ ভরা স্ট্যাটাস দেওয়া শুরু করেছে, ‘যাকে বন্ধু ভাবি, সেই বুঝিয়ে দেয় আমি কেউ না’, ‘কাছের মানুষ যাকে ভেবেছিলাম, সেই সবার আগে ধোঁকা দিয়ে চলে যায়’।
এসব দেখে রেগেমেগে ফোন রেখে দিলাম। কিন্তু ফোন একটা অদ্ভুত নেশা। রাখার পরে কখন যে আবার হাতে চলে আসে, কিছুই বোঝা যায় না। কয়েকটা অজানা ছেলে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। অ্যাক্সেপ্ট করতে মেসেজ করতে শুরু করে, ‘হাই, কথা বলা যাবে?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘বলুন’।
‘তোমাকে দেখাও’।
আমি একটা ছবি তো দিয়েছি। তারপরেও দেখতে চায় কেন? দিদা বলল, ‘ভইরা দিতে চায়, বুঝস না?’
আমি আর উত্তর দিই না। রাতের দিকে কোনও কোনও ছেলের কথার টোন পাল্টে যায়। ‘কী করছ?’ যদি উত্তর দিই শুয়ে আছি, লিখবে ‘একা শুয়ে আছ? ফিলিং রোমান্টিক!’ কিংবা ‘কী পরেছ?’
আজব! আমি কী পরে থাকব? কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত কবি কবি ভাব নিয়ে কথা বলে, ‘এই বৈশাখী সন্ধ্যায় আপনার মন কি উদাসীন হয়ে আছে?’
ফেসবুকে এসে বুঝলাম মেয়ে হলে জীবনে একা থাকার কোনও ব্যাপার নেই। ঝড়ের মতো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর মেসেজ আসতে থাকে।
পড়াশুনা মাথায় ওঠে ভিডিওর জন্য, গোটা রাত কাটিয়ে দিতে পারি আমি ভিডিও দেখতে দেখতে। জীবনের একটা জানলা খুলতে চেয়েছিলাম হয়তো ফেসবুকে এসে। খুব কম সময়ে গোটা বাড়ির দরজা জানলা খুলে ফেলেছি বুঝতে পারলাম। কত লোক কত বড়লোক। কত দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। দেখলে লোভ হয়, হিংসে হয়। কবে আমি এরকম একা একা ঘুরতে যেতে পারব?
আদিকে ফোন করে ফেলি একসময়। আদি ফোন ধরে বলে, ‘বলছি’।
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, ‘নীপা বলছি’।
‘ওহ, বলুন, কেমন আছেন?’
আমি বললাম, ‘ভালো আছি। আপনাকে কি ভুল সময়ে ফোন করে ফেললাম?’
‘না না। বলুন না। কিছু বলবেন?’
আমি কথা খুঁজে পাই না। কথা হাতড়াই। শেষে কিছু না বলতে পেরে ফোন কেটে দিই। কী বা বলব? আমার কি কিছু বলার আছে?
৮২
‘তোকে ফোন কিনে দেওয়াটা ঠিক হয়নি’।
খেতে বসেছিলাম। খেতে খেতেই মা বলল।
আমি বললাম, ‘কেন?’
মা বলল, ‘সর্বক্ষণ হাতে ফোন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। নিজে বুঝতে পারছিস না, সমস্যাটা কোথায়?’
আমি খেতে খেতেই ফোন দেখছিলাম। মার কথায় লজ্জা পেয়ে ফোন রেখে বললাম, ‘একজন বন্ধু মেসেজ করেছিল। ওকে উত্তর দিচ্ছিলাম’।
মা বলল, ‘বন্ধুটা ফোন কেনার আগে ছিল?’
আমি বললাম, ‘না’।
মা বলল, ‘কোথাকার বন্ধু?’
বললাম, ‘কোচিঙের’।
আমি বললাম, ‘মেয়ে’।
মা বলল, ‘কী ধরনের কথা বলিস? মানে এত কথার কী আছে?’
আমি বললাম, ‘ও মেয়েদের পছন্দ করে। সেই যে আছে না, মেয়েরা মেয়েদের পছন্দ করে, সেরকম’।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে খেল। মিনিট দুয়েক পরে বলল, ‘যাই করিস, ফোনটা যেন আরেকটা বডি পার্ট না হয়ে যায়, সে চেষ্টা করিস। ফোন নিয়ে আমি শুনছি সর্বত্র, সবখানে এক সমস্যা। তোকে নিয়ে কোনওদিন ভাবতে হয়নি’।
আমি বললাম, ‘ভাবতে হবে না’।
মা বলল, ‘দেখিস সেটা। পৃথিবী ছোট হয়ে আসা একদিকে যেমন ভালো, তেমন তার অসংখ্য খারাপ দিক আছে। তোকে নতুন করে আর কিছু বোঝানোর দরকার আছে বলে মনে হয় না’।
আমি বললাম, ‘না না। ভেবো না’।
মার খাওয়া হয়ে গেছিল, উঠে গেল।
আমি নির্লজ্জের মতো দেখলাম আমার হাতটা নিজে থেকেই ফোনের কাছে চলে গেছে। জিভ কেটে ফোন রাখলাম। দিদা বলল, ‘দ্যাখসোস? তোর চুলকানি? ওই ছ্যামরাটারে ফোন করতে ইচ্ছা করে না?’
আমি বললাম, ‘না, করে না’।
দিদা বলল, ‘তাইলে কি তোর ওই মাইয়াডারে পছন্দ নাকি?’
আমি বললাম, ‘আমার কাউকেই পছন্দ না’।
দিদা খিকখিক করে হাসতে শুরু করল, ‘তুই একা একা মইরা যাবি ছেমরি। বাড়িতে কেউ থাকব না, দরজা বন্ধ হবে বাইরে থিকা, তুই ঘরের ভিতরে একা একা মইরা যাবি। কেউ জানতেও পারব না তুই মইরা লাশ হইয়া পইড়্যা থাকবি ঘরের ভিতরে’।
আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমি আর খেতে পারলাম না।
মুখ হাত ধুয়ে সব বেসিনে রেখে ঘরে গিয়ে বসলাম। নিজে থেকেই আবার ফোন ঘাঁটতে শুরু করে দিলাম। অনির্বাণদা একটা মেয়ের সঙ্গে ছবি দিয়েছে। হয়তো এই মেয়েটাকেই বিয়ে করবে। খানিকটা শান্তি পেলাম।
ফোন বাজতে শুরু করল। পিউ। ধরলাম না। পিউ ছেড়ে দেবার মেয়ে না। ক্রমাগত ফোন করতেই থাকল। বিরক্ত হয়ে ধরলাম, ‘বল’।
পিউ বলল, ‘কোথায় ছিলি? কোনও ছেলের সঙ্গে ছিলিস নাকি?’
আমি বললাম, ‘না। খেলাম’।
পিউ ভারী গলায় বলল, ‘আমি ভাবলাম কারো সঙ্গে বিজি। হতেই পারে, তোর ডিমান্ড আছে, ফিগার ভালো। অনেকেই তোকে আড়চোখে ঝাড়ি মারে, একা ঘরে পেলে কী করবে ইমাজিন করে’।
আমি বললাম, ‘কী বলবি বল’।
পিউ বলল, ‘ওই ছেলেটা আর ফোন করেছিল?’
আমি বললাম, ‘কোন ছেলেটা?’
পিউ বলল, ‘আমাকে ঢপ মেরে যেটার সঙ্গে দেখা করতে গেলি, সে ছেলেটা’।
আমি বললাম, ‘আমার ভালো লাগছে না রে। পরে কথা বলছি’।
পিউ বলল, ‘ছেলেটার ডিটেলস বের করে দেব? সব পেয়ে যাব। আমাকে ফোন নাম্বারটা দে, একটা লয়্যাল্টি টেস্ট করি’।
আমি বললাম, ‘লয়্যাল্টি টেস্ট মানে?’
পিউ বলল, ‘অন্য একটা মেয়ে হিসেবে ফোন করি, দেখা যাক কীভাবে ট্রিট করে। লাইন মারলে বুঝে যাবি ছেলে ভালো না। তোর সুবিধার্থে আমি কল রেকর্ড করব’।
আমি বললাম, ‘দরকার নেই’।
পিউ বলল, ‘দরকার নেই কেন, দে না নাম্বারটা’।
আমি বললাম, ‘না’।
পিউ ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করল। আমি ফোন কেটে দিলাম। পিউ একটার পর একটা ফোন করে যেতে থাকল। ফোন ছাড়া হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার, কিছুই ছাড়ল না। আমি রেগেমেগে ফোন সুইচ অফ করে দিলাম। এই জিনিসটাকে আর আমাকে যন্ত্রণা দিতে দেব না। মা ঠিকই বলেছে।
যখন কোচিঙে যাব, তখন শুধু রাস্তার জন্য ফোন অন করা থাকবে।
আধঘণ্টা পাড়লাম। তারপর ফোন অন করে ফেললাম।
আদি মেসেজ করেছে, ‘কাল টিউশন আছে আপনার? দেখা করব’।
৮৩
কথা বলতে ইচ্ছে করে, দেখা করতে ইচ্ছে করে, একেই কি প্রেম বলে? প্রেম মানে কী? সারাক্ষণ কারো কথা মনে হওয়াকেই তো প্রেম বলে? আমার এই কঠিন কঠোর হৃদয়ও দেখি আদির সঙ্গে দেখা করতে চায়। এরকম হবে ভাবতে পারিনি। আদিকে আমি উত্তর দিলাম, দেখা করব।
আদি মেসেজ সিন করেনি। অনেক আগে মেসেজ করেছিল, রিপ্লাই করিনি দেখে রেগে গেছে হয়তো।
আমার খারাপ লাগতে শুরু করল। পিউর উপরে রাগও হল। পিউর জ্বালাতনেই তো আমি ফোন অফ করে রেখেছিলাম।
আদি কলকাতার ছেলে। আমাদের মফস্সলের লোকেদের কাছে কলকাতা খুব বড় শব্দ। অন্য গ্রহের প্রাণী মনে হয়। তাদের চলাফেরা, কথা বার্তা, জামাকাপড় আমাদের থেকে আলাদা। আদিকে নিয়ে আমি অবশ্য অত কিছু ভাবিনি। আদির সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। সবার সঙ্গে তো কথা বলতে ভালো লাগে না। যেন কেমন একটা হয়ে যায়। হিমুর উপর আমার ফুলশয্যা থেকেই বিরাগ জন্মে গেছিল। চেষ্টা করলে হয়তো হিমুকে ভালোবেসে ফেলা যেত, কিন্তু আমি পারিনি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আদির মধ্যে ভালোবাসার মতো কিছু আছে কি? জানি না। তবে ওই, কথা বলতে ভালো লাগে।
রাতে মাঝে-মাঝেই ঘুম ভেঙে ফোন চেক করলাম, আদি রিপ্লাই করেছে নাকি দেখলাম। করেনি।
মেসেজ পৌঁছায়নি। আমার কি ফোন করা উচিত হবে? নাহ, সেটা ঠিক হবে না বলে চুপ করে গেলাম। দিদা ফিকফিক করে হাসে, আর একই কথা বলতে থাকে, ‘ছেমরির কুড়কুড়ি উঠসে, বিয়া করবি ছেমরি? কীরে’।
আমি বললাম, ‘চুপ করো’।
দিদা বলল, ‘চুপ করুম ক্যান রে? কুড়কুড়ি বুঝস না?’
আমি চোখ বুজলাম। বুড়িকে বলতে দিলে বকে যাবে।
কলকাতা যেতে একবার ইচ্ছে করে, আবার বিরক্তও লাগে পিউর জন্য। আমি ঠিক করলাম পিউর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখব। কথা বলব না।
সেন্টারে পৌঁছে দেখা গেল, আমি না, পিউই দূরত্ব রাখতে শুরু করেছে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বাঁচা গেল। পিউ কথা না বললেই আমি ভালো থাকব। সব সময় দখল করার মানসিকতা নিয়ে কেউ থাকলে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয় না। পিউর মধ্যে সব সময় একটা চাপে রাখার প্রবণতা থাকে। জানি না, কতক্ষণ পিউ কথা না বলে থাকবে কিন্তু যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ আমি ভালো থাকব।
আদি আর অনলাইন আসেনি। আমিও আর ফোন করিনি। ক্লাস শেষে পিউর চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে কিছুক্ষণ কলেজ স্কোয়ার চত্বরে হাঁটলাম। আদিকে দেখতে পেলাম না। দিদা কানের কাছে বকে গেল, ‘খুইজা লাভ নাই, ওই ছ্যামরা তোরে পাত্তা দিবো না’।
আমারও তাই মনে হচ্ছিল। অগত্যা একা একাই কিছুক্ষণ হাঁটলাম। ব্যাগে কিছু টাকা ছিল। দুটো বই কিনলাম। ফোন রেখে বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। মা ভুল কিছু বলেনি। ফোন রাখার দরকার আছে। সত্যিই আমি পাল্টে গেছি। শুধু আমি কেন, বাসে ট্রেনে কত লোককেই দেখছি সারাক্ষণ ফোনে মুখ গুঁজে বসে আছে। কেউ কেউ হেডফোন কানে গুঁজে রেখেছে। ফোন এত সর্বগ্রাসী, কেউ কি আদৌ বুঝতে পারছে? লজ্জা লাগছিল, ঠিক করলাম, মাকে বাড়ি ফিরেই বলব আমি আর ফোন ঘাঁটব না।
এমনিতেই জীবনে অনেক টেনশন, ফোনের জন্য আর টেনশন বাড়িয়ে লাভ নেই।
কলেজ স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ারের মধ্যে একটা নেশা আছে। বই দেখার নেশা, চুপচাপ ঘুরে বেড়াবার নেশা। আমি নেশাগ্রস্তের মতোই যেন কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম।
বইয়ের প্যাকেট নিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতেই আদির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, ‘দেরি হয়ে গেল’।
আমি বললাম, ‘আপনি তো মেসেজ দেখেননি। খোঁজ পেলেন কী করে?’
আদি বলল, ‘আমার মনে হয়েছিল আপনি আজকে আসবেন। চলে এলাম। আপনি কি এখনই চলে যাচ্ছিলেন?’
বললাম, ‘হ্যাঁ, তবে আরেকটু থাকা যায়’।
অফিস টাইমের ট্রেনগুলোতে ভীষণ ভিড় হয়। তবু আমি এ কথা বললাম। আদির চোখ পড়ল আমার হাতের বইয়ের প্যাকেটের উপরে। বলল, ‘বই কিনলেন? দেখি’।
আমি দেখালাম। আদি বইগুলো দেখে খুশি হল, ‘বাঃ। নীললোহিত। ভালো লাগবে। বোহেমিয়ান ব্যাপার স্যাপার এই বয়সে ভালো লাগবে’।
আমি হাসলাম, ‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি আমার থেকে অনেক বড়!’
আদি অপ্রস্তুত হল, ‘ব্যাপারটা সেরকম না। মানে বয়সটা তো একটা ব্যাপার বটেই। শান্ত মাথায় একরকম লেখা ভালো লাগে, টেনশনের মধ্যে অন্যরকম। বড় হলে কি ছোটদের লেখা সবার ভালো লাগবে? তা তো নয়’।
আমি বললাম, ‘তা বটে। সব বয়সে সব লেখা ভালো লাগে না। আমার অবশ্য পড়ার অভ্যাস তেমন নেই’।
আদি বলল, ‘হবে হবে। পড়তে পড়তেই অভ্যাস হয়। একদিনে কি কিছু হয়? চলুন, আজ একটু শহর ঘুরি’।
আমি বললাম, ‘দেরি হয়ে যাবে তো’।
আদি বলল, ‘ট্রেনে তুলে দিয়ে আসব। কত আর দেরি হবে?’
মা কত করে বলে দিয়েছিল অপরিচিত কারো সঙ্গে একা একা কোথাও যাবি না। আমি সেটা মনে করে বললাম, ‘থাক। আমরা এখানেই বসি’।
আদি বলল, ‘ভয় পেলেন নাকি?’
আমি বললাম, ‘না, দেরি হয়ে যাবে। তাই বললাম’।
পিউকে দেখতে পেলাম। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে। বুঝলাম, এতক্ষণ ও আমাকে ফলো করছিল। আমি ওর দিকে আর তাকালাম না। বললাম, ‘চলুন, বসি কোথাও’।
দুজনে কফি হাউসে গেলাম। আদি অনেকক্ষণ সুনীলের কবিতা নিয়ে কথা বলে গেল। আমি চুপ করে শুনলাম। বিকেল পাঁচটা নাগাদ হুঁশ ফিরল। আদি জিভ কেটে বলল, ‘এবাবা! চলুন আপনাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসি’।
আমি না করলাম। ও আমাকে বিল দিতে দিল না কিছুতেই।
বাসের ভিড়ে পিষে যেতে যেতেও বুঝতে পারলাম, আদিকে আমার ভালো লাগছে। আমি কিছুতেই ওকে দূরে ঠেলতে পারলাম না। ট্রেন থেকে কোনও মতে নেমে আমি ওকে ফোন করলাম, ফোন ধরতেই বললাম, ‘আপনি জানেন তো আমার বাবা পালিয়ে গেছিল? আমার হাফ রাতের বিয়ে হয়েছিল?’
আদি বলল, ‘জানি তো’।
এর পর কী বলতে হবে, আমি বুঝতে পারলাম না। চুপ করে ফোন ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
৮৪
মফস্সলের একটা পরিবেশে থেকে কলকাতায় যাওয়া…কুয়ো থেকে সমুদ্রে পড়ার থেকেও বেশি।
আমাকে সেদিন হিমুদের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে না দিলে আমার জীবনটা কেমন হত? হিমুর মার সঙ্গে ঝগড়া করতাম, হয়তো এতদিন বিদেশে গিয়ে হিমুর জন্যে রান্না করছি এখন।
আমার কলকাতা দেখা হত না। জীবনে কতরকম সম্ভাবনা থাকে, একটা পথে গেলে সবরকম সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো অন্য পথে গেলেই ভালো হত। হয়তো হত না। কেউ জানে না, কোনটা ঠিক।
মার কথা শুনে চলার চেষ্টা করি বাড়ি থাকলে। ফোন দূরে রাখি। মার কাছে গিয়ে বসি। মা স্কুলের পরীক্ষার খাতা দেখে। লাল কালি দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কেটে দেয় কত খাতা। আমি বললাম, ‘এরকম করে কাটছ কেন?’
মা বলল, ‘না কেটে না দেখে নম্বর দিয়ে গেলে কিছু শেখে না। স্কুলে শিখতে এসেছে। না শিখিয়ে অকারণ একগাদা নম্বর দিলে সে ছাত্রের কোনও লাভ হবে না’।
আমার সে উত্তর ভালো লাগে না। কী দরকার এরকম কাটার? নম্বরই তো। দিয়ে দিক না।
একটু রাতের দিকে মাকে বললাম, ‘মা, আমার মনে হয় একটা ছেলেকে পছন্দ হয়েছে’।
মা খাতা দেখতে দেখতে আমার দিকে না ফিরেই বলল, ‘কোচিঙের?’
আমি আদির ব্যাপারে সবটা বললাম। মা একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘তোর ব্যাপারে সব জানে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।
মা বলল, ‘তুই ওর ব্যাপারে সব জানিস?’
আমি এবার থমকে গেলাম। না তো, আমি আদির ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না। এটা তো আমি ভেবে দেখিনি। বললাম, ‘জানি না’।
মা বলল, ‘আগে জান। একটা সম্পর্ক তৈরি করার আগে অনেক কিছু জানা দরকার। ভালো লাগাটাই সব না’।
আমি বললাম, ‘আজকাল সবাই শুরুতেই বিয়ের কথা ভাবে না জানো?’
মা বলল, ‘ওটা চালাকির কথা। বিয়ের কথা যারা ভাবে না তারা আসলে শুতে চায়। শুয়ে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা কি কোনও কাজের কথা?’
আমি বললাম, ‘এটা পুরনো দিনের কনসেপ্ট হয়তো’।
মা শান্ত গলায় বলল, ‘মেয়েদের কাছে নতুন পুরনো বলে কিছু হয় না। যত বন্ধুত্ব করুক, বিয়ে না করে যত শুয়ে পড়ুক, পেটটা তো মেয়েদেরই হবে। ডাক্তারের কাছে মেয়েদের ছুটতে হবে। সবাইকে উত্তর দিতে হবে বাপটা কে। ছেলেটা তখন দায়িত্ব না নিলে হবে?’
আমি ঘাবড়ে গেলাম, ‘তুমি অত দূর ভেবে ফেললে কেন?’
মা বলল, ‘সম্পর্ক শুরু হয়ে গেলে ব্যাপারগুলো ওদিকেই চলে যায়। শরীর তো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো, ঘুমিয়ে আছে একরকম, জেগে উঠলে তখন তাকে আটকানো যায় না। তার উপরে তুই একা একা যাচ্ছিস, ছেলেটার সঙ্গে মিশছিস, কখন কী হবে কে বলতে পারে?’
আমি বললাম, ‘না না অত কিছু হয়নি। ভালোবাসা, বা সম্পর্ক নিয়ে কোনও কথা হয়নি। ছেলেটার দিক দিয়ে হয়তো কিছু নেইও’।
মা বলল, ‘এমনি এমনি তোর সঙ্গে দেখা করতে আসছে না। হয় ভালোবাসে, নয়তো কুমতলব আছে। দু’ক্ষেত্রেই তোকে সতর্ক হতে হবে’।
আমি বললাম, ‘ওরে বাবা, এত ভেবে তো মেশা যায় না। হতে পারে শুধু বন্ধুত্ব চায়?’
মা বলল, ‘কেন? ছেলেটার এমনি বন্ধু নেই? হঠাৎ তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আসবে কেন? লোকের খেয়েদেয়ে কাজ নেই?’
আমি ব্যাজার মুখে বসে রইলাম। দিদা বলল, ‘কুড়কুড়ানি উঠসে ছেমরির। শোয়ার তাল করো, না?’
আমি দিদাকে পাত্তা দিলাম না।
মা বলল, ‘যাই হোক, কথা বলার সময় ছেলেটার বাড়ির সব তথ্য নিবি, তারপর দেখা যাবে। ঠিক আছে? প্রেম ভালোবাসায় গিয়ে হাওয়ায় ভেসে যাবার সময় এটা না। সময় ভালো না। কোনওকালেই ছিল না অবশ্য, এখন আরও খারাপ’।
আমি শ্বাস ছাড়লাম। মা ছাড়া এ কথা আর কে ভালো বুঝবে? সংসার করা একটা লোক ছেড়ে দিয়ে চলে গেল, এরপর মা আর কাকে বিশ্বাস করবে?
মা যে সবসময় ঠিক, তা আমার থেকে ভালো আর কে জানে!
