৮৫
‘আচ্ছা আপনার বাড়ি কি কলকাতাতেই?’
প্রশ্নটা করেই ফেললাম।
আদি বলল, ‘হ্যাঁ। কেন? যাবেন? চলুন না’।
বিপদে পড়ে গেলাম। আমি আদির সম্পর্কে সব কিছু জানতে চাইছি। কিন্তু সরাসরি বলতে পারছি না। মার কথা অনুযায়ী আদিও আমার সঙ্গে সম্পর্কে যেতে চায় অথবা ওর খারাপ উদ্দেশ্য আছে। ও যদি এখন বাড়ি নিয়ে যেতে চায়, তখন আমি কী করব?
আমি বললাম, ‘পরে একদিন যাব না হয়। আজ তো ফিরতে হবে’।
আদি বলল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করে আপনার বাড়ি যেতে। আমার মামাবাড়ি মফস্সলে। ছোটবেলায় খুব যেতাম। কত গাছপালা’।
আমি বললাম, ‘বেশ তো। ঘুরে আসবেন’।
পিউকে দেখতে পেলাম যেন। ঘুর ঘুর করছে। পিউ আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে হোয়াটস অ্যাপ স্ট্যাটাস দেয়। কেমন অস্বস্তি হয় সেগুলো দেখলে। যেন বোঝাতে চায় আমি ওকে ঠকিয়েছি। ঠকানোর তো কোনও ব্যাপার নেই। আমার সঙ্গে শেয়ালদা যাওয়া নিয়েও ঠারে ঠোরে কথা শুনিয়েছে। আমি তো ওকে শেয়ালদা যেতে বলিনি। ও নিজেই আমার সঙ্গে যেত।
পিউকে আদিও দেখেছে। বলল, ‘ওর কি কোনও সমস্যা আছে?’
আমি বললাম, ‘জানি না। হতে পারে সমস্যা আছে’।
আদি বলল, ‘কেমন রাগী রাগী মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে’।
আমি বললাম, ‘ছাড়ুন। দেখার দরকার নেই’।
আদি বলল, ‘হুঁ। আপনাকে একটা কথা বলব?’
আমার বুকটা ধুক করে উঠল। বললাম, ‘বলুন’।
আদি বলল, ‘আমার আজকাল আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। মনে হয় কাছে কাছে থাকি। এটা কি কোনও সমস্যা?’
আমি বললাম, ‘আপনি কি প্রেম নিবেদন করতে চাইছেন?’
আদি পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, ‘চাইলে কি আপনি না করে দেবেন?’
আমি বললাম, ‘কেউ কারো সম্পর্কে কিছুই জানি না। শুধু মনে হওয়া নিয়ে কিছু বলা ঠিক না’।
আদি বলল, ‘আপনি আমার সম্পর্কে কী জানতে চান বলুন? আমি সব কিছু বলছি।’
আমি বললাম, ‘কিছু জানাতে হবে না। জেনে কী করব?’
আদি বলল, ‘আপনার জানতে ইচ্ছে করে না?’
আমি বললাম, ‘আমার মধ্যে অনেকগুলো দেওয়াল আছে আদি। কোন দেওয়াল কখন সব কিছু আটকে দেবে আমি নিজেই জানি না। বোধ হয় আমার মনে কোনওদিন কারো জন্য কোনও ফিলিংসও তৈরি হবে না। আপনাকে জড়ালে আপনাকেই কষ্ট দেওয়া হবে। আমার হিমুর কথা মনে পড়ে যায়…’
আদি হেসে ফেলল, ‘আপনি কি অনেক দূর অব্দি ভেবে ফেলছেন?’
আমিও হাসলাম, ‘না ভাবিনি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে যে হার্ডলগুলো আছে, সেগুলোকে পেরিয়ে আমি কতদূর এগোতে পারব, তা নিয়ে খুব দ্বিধায় থাকি’।
আদি বলল, ‘মনে হয় আমার সম্পর্কে আপনাকে সব কিছু বলে দেওয়া উচিত। আপনার নাম আদিনাথ রায়। আমার বাবা পরমার্থ রায়। বাবা ব্যাঙ্কে কাজ করেন। আমি কম্পিউটার পার্টসের ব্যবসা করি। বড় রোজগার নেই। তবে খারাপ না। আমি বেহালায় থাকি’।
আমি বললাম, ‘থাক থাক। এত জেনে আমি কী করব?’
আদি বলল, ‘দ্বিধা কাটবে। আমার কিন্তু আপনার ওই আধ বেলার বিয়ে নিয়ে কোনও সমস্যা নেই’।
আমি বললাম, ‘তাও থাক। আমি এত তাড়াতাড়ি কিছু ভাবছি না। আমার মাথা কাজ করে না’।
আদি বলল, ‘ভালো তো। আমরা দেখা করব, কথা বলব, আপনার যদি মনে হয় এগোতে চান, এগনো যাবে। কোনও অসুবিধা নেই’।
আমি হাসলাম, ‘তাই হোক। আচ্ছা আপনি ফেসবুকে নেই? দেখলাম না তো’।
আদি বলল, ‘না। আমার ভালো লাগে না। সময় নষ্ট হয় অনেক’।
আমি বললাম, ‘যাক। আমার মতো কেউ একজন আছে’।
আদি বলল, ‘আমরা কি তুমি করে কথা বলতে পারি?’
আমি বললাম, ‘পারি’।
আরও কত আজেবাজে কথা বললাম। আদি আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে গেল।
ভালো লাগছিল। এই অনুভূতিটা ভালো লাগার মতোই।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে আজকাল আমার সন্ধ্যা হয়ে যায়।
মা দরজা খুলে বলল, ‘জিগ্যেস করলি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। আদি যা যা বলেছে বললাম।
মা বলল, ‘রবিবার বাড়িতে ডাক। ঘুরে যাক’।
আমি বললাম, ‘এখনই?’
মা বলল, ‘হ্যাঁ। এখনই’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে বলব’।
৮৬
হঠাৎ করে বৃষ্টি পড়ছে। বাড়ির সামনেটায় জল জমে যাচ্ছে। নিশি ওদের বারান্দায় বসেছিল। হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজতে বাইরে এসে দাঁড়াল।
আমার মাথাটা কেমন একটা ধরে আছে। হয়তো একটু ঘুমোতে পারলে ভালো হত। ঘুমোতে পারছি না। চোখ বুজলেই অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আদি যদি আমার সঙ্গে আর দেখা করতে না চায় তাহলে কী হবে?
আমার যে খুব আদির বাড়িতে গিয়ে সংসার করতে ইচ্ছে করছে, ব্যাপারটা একবারেই সেরকম না। কিন্তু আমার আদির সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে। আদি না থাকলে অস্বস্তি হচ্ছে।
জানলার বাইরে চেয়ে চুপ করে বসে আছি। সন্ধে থেকে রাত হয়ে গেল এভাবেই। আরেকটু রাত হলে আদি ফোন করল, ধরলাম। ওপ্রান্ত থেকে আদি বলল, ‘কী করছেন?’
আমি বললাম, ‘মা আপনাকে দেখতে চেয়েছে। রবিবারে আসতে পারবেন?’
আদি বলল, ‘কেন পারব না? অবশ্যই যাব’।
আমি বললাম, ‘কিছু মনে করলেন না তো?’
আদি বেশ জোর দিয়ে বলল, ‘না না। একেবারে না। কেন মনে করতে যাব?’
আমি বললাম, ‘আসলে মাকে বলেছিলাম তো। তাই মা চিন্তা করছিল। বুঝতেই পারছেন আমাদের বাড়ির পরিস্থিতিটা কেমন। মা কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না’।
আদি বলল, ‘প্লিজ আপনি এত কিছু বলবেন না। অ্যাকচুয়ালি আমিই তো যেতে চাইছিলাম। আপনাকে বলেছিলাম। আপনি কি ভুলে গেছেন?’
আমি বললাম, ‘না, আমার মনে আছে। তবু আমার মনে হচ্ছে আমি যেন জোর করছি’।
আদি বলল, ‘জোর করার কিছু নেই। আমি যাব। আপনি ঘাবড়াবেন না’।
আমি চুপ করে রইলাম। কান্না পাচ্ছিল। কান্না জিনিসটাকে আমি ঘেন্না করি। তবু এটাই আমার সব থেকে বেশি পায়। কারণে অকারণে চোখ জলে ভিজে যায়।
ফোন রাখতে দেখি দিদা খাটে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে। বলল, ‘কীরে ছেমরি, কলকাতার ছ্যামরা পাইয়া গলায় ঝুলতে ইচ্ছা করে, তাই না?’
আমি বললাম, ‘তুমি এখন যাও। আমার ভালো লাগছে না’।
দিদা খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তুই বুঝস না? তোর কপালে দুর্ভোগ লেখা আছে। তুই কোনওদিন সুখী হইতে পারবি না। বাপ পালাইছিল তোর, তুই কি কইরা আনন্দে থাকবি?’
আমি উত্তর না দিয়ে শুয়ে রইলাম।
ইদানীং আমার নিজেরও মনে হয়, আমি একটা অপয়া। আমার ভালো কিছু হবে না। হয় দেখা যাবে আদি একটা ফ্রড, নয়তো ওর বাড়ির লোক মানবে না।
সারারাত এপাশ ওপাশ করলাম, ঘুম এল না। ভোর হতে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিশি উঠোনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওর বাড়ির লোক কি মেয়েটার একটুও খেয়াল রাখে না?
আমি গিয়ে নিশিকে ঠেলে তুললাম, ‘ওঠ-ওঠ, ঘরে যা’।
নিশি ভেজা গায়ে ধড়মড় করে উঠে বসল। আমার দিকে কঠিন চোখে দেখে বলল, ‘কীরে নীপা, তুই রাতে আমার কাছে শুয়েছিলি?’
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। নিশি কি ঠিক হয়ে গেছে? বললাম, ‘না। তুই একা একা উঠোনে ঘুমিয়ে পড়েছিলি। ঘরে গিয়ে শো’।
নিশি একদম সুস্থ মানুষের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘ঠিকই বলেছিস। যাই ঘরে যাই’। গট গট করে গিয়ে সদর দরজায় কলিং বেল বাজাল। নিশির বাবা দরজা খুলতে নিশি বলল, ‘আমি বাইরে ছিলাম আর তুমি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুমোলে? তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে বাবা?’
নিশির বাবা ফ্যালফ্যাল করে একবার আমার দিকে, আরেকবার নিশির দিকে তাকাল।
নিশি বাবাকে সরিয়ে ঘরে ঢুকল।
নিশির বাবা আমাকে বললেন, ‘কীরে, ও কি ঠিক হয়ে গেছে?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘জানি না’।
নিশির বাবা উত্তেজিত ভাবে ঘরে ঢুকে গেল।
আমার হতভম্ব ভাব কাটছিল না। কিছুক্ষণ ওখানেই বসে রইলাম। ঘরের ভেতর থেকে নিশির গলা ভেসে আসছিল, ‘একী! আমার ঘরে মা শুচ্ছে কেন? এ আবার কী? আমি শোব এখন, যাও, তোমার ঘরে গিয়ে শোও’।
আমি নিজেকে একবার চিমটি কাটলাম, নাহ ব্যথা লাগছে তো! তাহলে আমি স্বপ্ন দেখছি না, সত্যিই নিশি সুস্থ হয়ে গেছে!
৮৭
নিশির হঠাৎ ঠিক হয়ে যাওয়ার খবরে আমাদের পাড়ায় শোরগোল পড়ে গেল। সবাই নিশিদের বাড়ি ভিড় করতে শুরু করেছে। নিশি গম্ভীর মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ হয়তো ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করছে, ‘ঠিক আছিস নিশি?’
নিশি রোষকষায়িত নেত্রে দেখছে। তারা পালিয়ে যাচ্ছে। নিশি একদিন হঠাৎ করে যেমন পাগল হয়ে গেছিল, তেমন একদিন ঠিক হয়েও গেল। যদিও ঠিক হবার পরেও কোনও কোনও ঘটনা দেখলে মনে হয় আদৌ হয়তো ঠিক হয়নি। পাড়ার কেউ বেশি প্রশ্ন করলে আগের সেই পিলে চমকে দেওয়া ভয়াবহ হাসিটা হেসে ফেলত। চাউনিটাও মাঝে মাঝে কেমন কেমন লাগে। বাবা বলত, পাগল বোঝা যায় চোখ দেখে। মানুষ বোঝার জন্যে চোখের বিকল্প নেই।
নিশিকে আমি ঠিক করে চিনতেই পারলাম না হয়তো কোনওদিন।
আদিকে আনতে রিকশা নিয়ে স্টেশনে গেছিলাম। এমনিতেই নিশির জন্য আমাদের বাড়ির সামনে ভিড় গিজগিজ করছিল। আদিকে নিয়ে যখন রিকশা করে ফিরছি, পাড়ার সিসিটিভিগুলো উত্তেজনায় ছটফট করছে। আমার সেই অস্বস্তিটা ফিরে আসছিল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করল।
আদি বলল, ‘ভয় পাচ্ছেন?’
আমি বললাম, ‘জানি না’।
আদি বলল, ‘ভয় পাবেন না। ভয়ের কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে’।
আমি রিকশা থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। আদি ধরে নিল।
মা রান্না করছিল। আদি গিয়ে প্রণাম করল। মা বলল, ‘বসো। চা খাবে? না সরবত?’
আদি বলল, ‘জল খাব’।
আদিকে একটা গ্লাস ভর্তি করে জল দিল মা। আদি একঢোকে জল খেয়ে নিল। মা বলল, ‘রান্না শেষ করে আসছি। তুই ওকে বাড়ি ঘুরিয়ে দেখা’।
আদি বলল, ‘খুব ভালো লাগছে জানেন আন্টি। কতটা জায়গা নিয়ে আপনাদের বাড়ি’।
মা বলল, ‘দেখো ভালো করে’।
আদিকে ঘরগুলো দেখাতে দেখাতে নিশির কথাটা বললাম। আদি বলল, ‘এরকম হয় নাকি? একবার পাগল হয়ে গেল, আবার ঠিকও হয়ে গেল?’
আমি বললাম, ‘আপনি পরিচয় করবেন? এখন গোটা পাড়ার লোক আছে ওদের বাড়িতে। কিন্তু আমার বন্ধু তো, ডাকলে চলে আসবে’।
আদি বলল, ‘না না থাক। আমি এমনি গল্প করি’।
আমরা বসার ঘরে বসলাম। আদি হাসল, ‘কী অদ্ভুত না? কীভাবে দেখা হয়ে গেল, আমি চলেও এলাম আপনাদের বাড়িতে? এভাবেই দেখা হয়ে যায় হয়তো’।
আমি বললাম, ‘আপনার কোনও অস্বস্তি হচ্ছে না তো?’
আদি বলল, ‘না। কিছু হচ্ছে না। আপনার মার যা যা খোঁজ নেওয়ার দরকার, উনি নিতে পারেন। আমি প্রস্তুত’।
আমি বললাম, ‘আমার বিয়েটার ব্যাপারে…’
আদি বলল, ‘আর কতবার বলবেন? ইট হ্যাপেন্স’।
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। তবে সেই বাবা চলে যাবার পর থেকে আমার সঙ্গে তো ভালো কিছুই হয়নি, তাই একটু কেমন কেমন লাগে’।
আদি বলল, ‘আপনার বাবার চলে যাওয়াটাও সেভাবে দেখতে গেলে বিরাট অস্বাভাবিক কিছু না। মানুষ যার সঙ্গে ভালো থাকবে, তার সঙ্গে থাকুক’।
আমি থমকে গেলাম। বললাম, ‘আপনারও কি এরকম মনে হয়? আপনি এরকম করতে পারেন ভবিষ্যতে?’
আদি বলল, ‘আমি সরাসরি বলব। দুম করে না বলে চলে যাব না। এটুকু বলতে পারি’।
আমি বললাম, ‘অনেকটা সময় পরে একটা মানুষ ছেড়ে চলে যাবে, এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে আপনার?’
আদি বলল, ‘হ্যাঁ। আপনার বাবার দোষ নেই’।
আমি চুপ করে গেলাম। রাগ হচ্ছিল। বললাম, ‘বসুন, আমি দেখি মার কোনও হেল্প লাগবে নাকি’।
আদি বলল, ‘ঠিক আছে’।
আমি রান্নাঘরে গেলাম না। নিজের ঘরে গিয়ে বসে রইলাম। কান্না পাচ্ছিল। দিদা বলল, ‘দ্যাখসস ছেমরি? সব ব্যাটা একরকম হয়’।
আমি বললাম, ‘হু। সবাই সমান’।
দিদা বলল, ‘কাজ শেষ হইলেই ছ্যামরারা সব ভুইলা যায়। নতুন মাগি চায় তহন’।
আমি আবার বললাম, ‘হুঁ’।
চোখ ফেটে জল আসছে। মা ডাকল, ‘এদিকে আয়’।
আমি চোখ মুছে রান্নাঘরে গেলাম।
মা বলল, ‘ছেলেটা ভালো’।
আমি বললাম, ‘মানে?’
মা বলল, ‘দেখলে বোঝা যায়। সে বোধ আমার আছে। লুচি করলাম। দিয়ে আয়’।
আমি আর কিছু বললাম না।
আদি বেশ মন দিয়ে খাওয়া দাওয়া করল। মার সঙ্গে ওর মার কথা বলিয়ে দিল।
বিকেল নাগাদ আদিকে রিকশায় তুলে দিলাম। ও যেতেই আমি মাকে বললাম, ‘তুমি জানো, ও বলেছে বাবা যেটা করেছে ঠিক করেছে? এ ছেলেকে বিয়ে করা ঠিক হবে না’।
মা আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমি শুনেছি, তোরা যখন কথা বলছিলি। ও চাইলে প্রিটেন্ড করতে পারত। তোর দলে গিয়ে তোর বাবাকে বাজে কথা বলতে পারত। বলেনি। ও যে কথাটা বলেছে, সেটা সত্যি কথা। ও মন জুগিয়ে কথা বলেনি। তোর বাবা যদি আমাকে সরাসরি বলত তোমায় পোষাচ্ছে না, তোমার বোনের সঙ্গে আমি চলে গেলাম, আমার সমস্যা হত না। আদি ভালো ছেলে। যদি অন্য কোথাও সম্পর্কে যায়, তোকে সরাসরি এসে বলবে। যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ না, বলতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। বুঝলি?’
আমি কিছুই বুঝলাম না। মাথা নেড়ে তবু বললাম, ‘ঠিক আছে’।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, ‘বুঝবি আরেকটু বড় হ। পেছন থেকে কেউ ছুরি মারার চাইতে সামনে বুকে গুলি করা অনেক ভালো। আদির বাড়ি যেতে বলেছে ওর মা। আমরা যাব’।
৮৮
দোকান থেকে কোনও জিনিস কেনার পর যখন মনে হয়, দামটা কম বললে হয়তো কম দামেই জিনিসটা দিয়ে দিত, তখন অদ্ভুত মন খারাপ হয়। আমার সেরকমই মন খারাপ হল।
এতদিন আদিকে চোখে হারিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো? আদির মার সঙ্গে আমার মার কথা বলার মতো জায়গায় তো আমাদের সম্পর্কটা যায়নি। তাহলে কথা বলার কী দরকার?
আমি কিছু ভাবতে পারলাম না। মাথা ঘেঁটে গেছে বিচ্ছিরিভাবে।
নিশিদের বাড়ি ফাঁকা হয়েছে এতক্ষণে। নিশির বাবা পাড়ার সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছে মেয়ে সুস্থ হয়েছে বলে।
নিশির সঙ্গে গিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু গেলাম না। নিশির আবার কিছু হলে নিশির বাবা যদি আমাকেই দোষী ঠাউরে দেন? আমি আর ঝামেলায় যেতে চাই না।
শেয়ালদা পৌঁছে আদি মেসেজ করল। পিউও মেসেজ করেছে, ‘ওই ছেলেটার জি এফ আছে। মেয়েটার সঙ্গে এদিক সেদিক ঘুরতে যায়। জিগ্যেস করবি’।
পিউ পাগল হয়ে গেছে। আমি আর পিউর মেসেজ দেখব না ঠিক করলাম। এমনিতেই আমার মনে অনেক দ্বিধা কাজ করছে, এরপর আরও দ্বিধা চলে আসবে।
কোনও মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে আদি ঠিক বলে দিত। তাছাড়া ছেলে মেয়ে বন্ধুও হয়। কোনও মেয়ের সঙ্গে ঘোরা মানেই প্রেম করছে, এরকম ভুলভাল ধারণার কোনও মানেই হয় না। অবশ্য পিউ হিংসা করে মিথ্যে রটাতেও পারে। ওর মধ্যে এই গুণ আছে। শুরু থেকেই আদির বিষয়ে আমার সংশয় তৈরির চেষ্টা করেছে মেয়েটা।
মা কখন আমার ঘরে চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। খাটে বসে বলল, ‘তোর বিয়ে হলে বাড়ি বিক্রি করব। এ বাড়ি আর রাখব না’।
বুঝলাম বাড়ি বিক্রির ভূত আবার মার মাথায় চলে এসেছে। বললাম, ‘তুমি কোথায় থাকবে?’
মা বলল, ‘কলকাতায় একটা না একটা থাকার জায়গা পেয়ে যাব। এই বাড়িতে দুঃস্বপ্ন মাথায় করে আর বাকি জীবনটা কাটাব না’।
এ কথা বললে কি আর বাড়ি বিক্রির বিরোধিতা করা যায়? বললাম, ‘আমার বিয়েটা হবেই, কী করে বুঝলে?’
মা বলল, ‘বোঝা যায়। এগুলো তো সংযোগ। একটার পর একটা ঘটনা ঘটতে থাকে। তোকে কলকাতায় কম্পিউটার শিখতে পাঠানোর কথা হঠাৎ মাথায় এল। আমি কোনওদিন ভাবতে পারিনি তুই এই ভিড় লোকালে যাতায়াত করতে পারবি। সেটাও পারলি, আবার আদির সঙ্গে তোর দেখা হল। পর পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই বিয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে’।
আমি বললাম, ‘বাড়ি বিক্রি করে একটা সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় একা একা থাকতে পারবে?’
মা বলল, ‘তোর কাছাকাছিই ফ্ল্যাট কিনব। তুই কাছে থাকবি, মাঝে মাঝে দেখে যাবি। তাহলে আর অসুবিধা হবে না’।
মা তো ভুল কিছু বলছে না। আমরা দুটো প্রাণী। একজন দূরে চলে গেলে আরেকজন কী করবে? এটাই স্বাভাবিক। তবু আমার খুব কষ্ট হল বাড়িটার জন্য।
জগদীশচন্দ্র বোস আবিষ্কার করেছিলেন গাছেদের প্রাণ আছে। আমি জানি বাড়িরও প্রাণ আছে। এই যে আমার ঘরটা। খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, আমাদের বাড়ির রঙ, সব কিছু অনেকটা মায়া বুকে নিয়ে আমাকে জড়িয়ে থেকেছে এতদিন। সেই বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে? আমরা থাকব না, অন্য মানুষ এসে থাকবে?
আমার ঘরে একটা পুতুল আছে। ছোটবেলায় বাবা কিনে দিয়েছিল। বাবার চলে যাওয়ার খবর যেদিন জানতে পেরেছিলাম, সেদিন পুতুলটাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। এই সমস্ত কিছু তুচ্ছ করে চলে যেতে হবে একদিন। অবশ্য অনেকেই বলে বাপের বাড়ি মেয়েদের আসল বাড়ি না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটা আমার বাড়ি না। তবু, এসব যুক্তি দিয়েও কি ওই পুতুলটা এখন আমার কাছে জড়বস্তু হয়ে যাবে?
রাতে আদি ফোন করে জানিয়ে দিল। পৌঁছে গেছে। আমি বেশি কথা বললাম না, ঘুম পেয়েছে বলে দিলাম। আমি জানি এখন আবার চিন্তা করতে শুরু করব। সারারাত খাটে শুয়ে ভাবব কী হবে আমার।
কোনও কিছুতেই শান্তি পাব না আমি…।
৮৯
‘তুমি বই পড়ো?’
আদির বোন আমায় জিগ্যেস করল।
আদিদের বাড়িটা ভারি সুন্দর। কলকাতায় তো বাড়ি করার জন্যে আমাদের মফস্সলের মতো বড় জায়গা থাকে না। তবু আদিদের বাড়ি বেশ বড়। আসার পরে আদির বোন আমায় ওর ঘরে নিয়ে এসেছে। মা আদির বাবা মার সঙ্গে গল্প করছে। আদিকে মিষ্টি আনতে পাঠানো হয়েছে।
আদির বোনের ঘরটা বেশ ছিমছাম। এক কোণে কম্পিউটার। দেওয়ালে অনেক বই। বোঝাই যায়, অনেক বই পড়ে।
আমি অবশ্য আগে থেকেই জানি আদির বোন খুব বই পড়ে। বললাম, ‘খুব পড়ি না। মাঝে মাঝে পড়ি’।
আদির বোন বলল, ‘হ্যাঁ দাদার সঙ্গে তোমার সেই বই কিনতে গিয়েই আলাপ হয়েছিল। দাদা বলেছে’।
আমি বললাম, ‘আমি ওখানে একটা কম্পিউটার কোচিঙে যাই। বই কিনতে যাইনি’।
আদির বোন বলল, ‘হ্যাঁ। সেটা জানি। দাদার যে কাউকে পছন্দ হবে আমরা ভাবতে পারিনি জানো? দাদাকে বিয়ের কথা বললেই দাদা রেগে যেত। কারণটা কেউ জানি না আমরা’।
আদির বোনের কথায় আমি হাসলাম, ‘পছন্দ হয়েছে নাকি জানি না। খুব বেশিদিন কথা হয়নি আমাদের’।
আদির বোন বলল, ‘কেন? তোমার দাদাকে পছন্দ হয়নি? নাকি এখনও ডাউট আছে?’
আমি বললাম, ‘হয়েছে। আমার মা বলেছে, আদি ভালো ছেলে। যা বলে মুখের উপর বলে দেয়’।
আদির বোন বলল, ‘তুমিও কোনও কথা গোপন করনি। যা হয়েছে, তা বলেছ’।
আমি বললাম, ‘লুকিয়ে কি কোনও লাভ হয়? সবাই জানতে পারে। তাছাড়া লুকোনোর প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। আমার এমনিতেই কাউকে পছন্দ হয় না। এককালে আমি ভেবেছিলাম, আমার হয়তো কাউকেই ভালো লাগবে না’।
আদির বোন বলল, ‘তোমার জায়গায় আমি হলে হয়তো এত শক্ত থাকতে পারতাম না। তুমি খুব কঠিন কাজ করেছ। তোমার মেন্টাল স্ট্রেসের ব্যাপারটা আমি বুঝি। তুমি এত ভেবো না। আমাদের বাড়িতে তোমার কোনও সমস্যা হবে না’।
আমার জীবনে কোনও কিছুই সোজা সরলভাবে হয়নি। আমার বাবা, হিমুদের বাড়ি, অনীশ, অনির্বাণদা, নিশি, দিদা—কোনও কিছুই জটিলতাহীন না। আমার আশঙ্কা ছিল আদিদের বাড়িতে এসে আমার আশাভঙ্গ হবে। আশ্চর্যজনকভাবে তা হল না। আদিদের বাড়ির জানলাগুলো বড় বড়, ঝকঝকে ঘরগুলোর মতো মানুষগুলোও ভারি আন্তরিক। আদির মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, অনেক আদর করলেন। আমার চোখে জল চলে আসছিল। দুপুরে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন। মাকে অনেকদিন পর প্রাণখুলে হাসতে দেখলাম। বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে উঠেই মা শুধু বলল, ‘অনেক দিন পর একটু শান্তি পেলাম। ওরা ভালো মানুষ’।
আমি কিছু বললাম না। আজ আদি খুব হাসছিল। আমরা দুজন আলাদা ঘরে বসে কথাও বললাম। আদি বলল, ‘আপনি কি একটু ফ্রি হতে পেরেছেন?’
আমি বললাম, ‘পেরেছি’।
আদি বলল, ‘আপনার কি এখনও মনে হচ্ছে সব কিছু বড্ড তাড়াতাড়ি হচ্ছে?’
আমি বললাম, ‘কিছুটা। আমরা বেশিদিন দেখা করিনি’।
আদি বলল, ‘তার দরকার নেই। আমার সৎ মানুষ চিনতে ভুল হয় না। যত দেরি, তত কমপ্লিকেশন। যদিও আমাদের বাড়িতে ওসব সমস্যা নেই’।
আমি বললাম, ‘আমি যদি বলি আপনাকে ভালোবাসতে পারব না, কাউকে ভালোবাসতে পারব না? তাহলেও আপনি এগোবেন?’
আদি বলল, ‘হ্যাঁ। আমি এগোব। আপনার সঙ্গে থাকতে ভারি ইচ্ছে করে আমার। দেখেন না, আপনার কম্পিউটার সেন্টারে কেমন ছুটে ছুটে যেতাম? সব সময় ভালোবাসাটাই বড় কথা না। একসঙ্গে থাকতে ভালো লাগছে নাকি, সেটাও বড় কথা। আমার আপনার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে’।
আমি হেসে ফেললাম, ‘এ কেমন কথা?’
আদি বলল, ‘এটাই কথা। ভালোবাসা ধুয়ে কি জল খাবেন?’
আমি বললাম, ‘অস্বীকার করব না, আমারও আপনার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে’।
আদি বলল, ‘তাহলে? আর কিছু দরকার নেই। আর ঝামেলা করবেন না’।
আমি বলেছি, ‘বেশ। করব না’।
বাড়িতে ঢোকার সময় আবার আমার মনে হল, এই বাড়িটায় আর থাকব না বিয়ে হয়ে গেলে?
