ভিখারি – নগীব মাহফুজ : অনুবাদ – রাফিক হারিরি
al-Shahhadh (The Beggar) – Naguib Mahfouz
মূল : নগীব মাহফুজ (১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী মিশরীয় ঔপন্যাসিক)
অনুবাদ : রাফিক হারিরি
al-Shahhadh by Naguib Mahfouz
প্রথম প্রকাশ : চট্টগ্রাম বইমেলা, মার্চ ২০০৯
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক: সাইফুর রহমান চৌধুরী
.
অনুবাদকের উৎসর্গ
বৃক্ষমানব বাপ্পি, মানিমেকার হৃদয়, মেডিকেল মেন সোহাগ, মটু রনি, বিচিত্র শ্রাবণ, ফটোগ্রাফার বিটু, সদা হাস্যোজ্জ্বল জোকার শুভ, বাংকার মাসুদ নিঃসঙ্গ শাহেদ সহ হৃদয়ের কাছের ও দূরের সকল বন্ধুদের।
.
প্রসঙ্গ ভিখারি ও নগীব মাহফুজ
নগীব মাহফুজ আরবী সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী। মিশরীয় এই আরব ঔপন্যাসিক বিশাল কলেবরে মহাকাব্যিক ঢঙ-এর উপন্যাস লেখার পাশাপাশি ছোটগল্প ও ছোট কলেবরে উপন্যাস লেখায়ও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
আল শাহহাজ নগীব মাহফুজের আলোচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি।
আল শাহহাজ-এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ভিখারি। উপন্যাসটিকে নগীব মাহফুজ একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তার অন্যান্য লেখার চেয়ে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। উপন্যাসটিতে বেশ কয়েকটি চরিত্র আসলেও মূল চরিত্র একজন। আর সে হলো ওমর হামযাবি। যে পেশায় একজন আইনজীবী। যৌবনের প্রথমে কবিতা, শিল্প-সাহিত্য আর একটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শিক রাষ্ট্রের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। এক সময় কবিতা লিখতেন। কিন্তু জীবনের কঠিন পেষণে শিল্প সাহিত্যের মতো সৌখিন সেই কাজটা একসময় ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় ওমর হামযাবির মনের ভেতর যৌবনের সে সৌখিন সৃজনশীল কাব্যিক মনটা আবার বের হয়ে আসার জন্য চাপাচাপি করতে থাকে। ব্যস্ত অফিস, ঘর-সংসার, দীর্ঘ দিনের প্রেমিক, স্ত্রী সব কিছুই তার কাছে অর্থহীন মনে হতে থাকে। এক রকম ব্যাপক নিরানন্দ আর হতাশা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতে থাকে। কোনো কিছুর মাঝেই সে আনন্দ খুঁজে পায় না। যাপিত এই জীবনের অর্থ কি সেটাই তার কাছে সবচেয়ে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে সে তার রুটিনমাফিক জীবন থেকে বের হয়ে আসে। মানসিক অস্থিরতা এক সময় তাকে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় পৌঁছে দেয়। তবে লেখক উপন্যাসে কাহিনীর মূল চরিত্র ওমর হামযাবির ভারসাম্যহীনতাকে প্রাধান্য দেন নি। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন কবি ওমরের আবার কবিতায় ফিরে আসার আকুলতাকে। যেখানে তার কাছে মনে হয়েছে সৃষ্টিশীলতা আর জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ানোটাই মূল কাজ। কিন্তু ওমর সে কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে ওমরের যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয় সেটাই কাহিনীর নানা বাঁকে নগীব মাহফুজ ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে প্রেম এসেছে, কাম এসেছে, এসেছে দীর্ঘদিনের প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা, এসেছে পাগলামি আর সর্বশেষ অবোধগম্য পরিণতি। তবে সবচেয়ে পাওয়ার বিষয় যেটা তা হলো নগীব মাহফুজের কাহিনী বয়ান। সর্বনামের ব্যবহারে প্রাচীন আরবী রীতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে বেশ শক্ত কাজটাকে দক্ষতার সাথে সমাপ্ত করেছেন।
তবে সর্বনামের অতি ব্যবহারে কখনো কখনো কাহিনীর গতি পাঠককে থমকে দিতে পারে। পাঠক হয়তো দাঁড়িয়ে যাবেন। ভাববেন আসলে কোথায় যাচ্ছি। আরবীয় সর্বনামের ব্যবহারের রীতি যেমন কর্তা, প্রথম পুরুষ (আমি, আমরা) থেকে হঠাৎ করেই দ্বিতীয় পুরুষ (তুমি, তোমরা) দিয়ে বর্ণনা শুরু করেন। পাঠকের হয়তো তখন মনে হবে আলোচনায় নতুন কোনো চরিত্র উপস্থিত হলো কি না। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যাবে আসলে প্রথম পুরুষ আর দ্বিতীয় পুরুষ একই ব্যক্তি। এটা আরবী কবিতা এবং উপন্যাসের নিজস্ব একটা পদ্ধতি। যেমন ভিখারি উপন্যাসের তৃতীয় পরিচ্ছেদে মূল চরিত্র ওমরকে বর্ণনা করা হয়েছে দ্বিতীয় পুরুষ (তুমি) সম্বোধন করে। আবার চতুর্থ পরিচ্ছেদে এসে সেই ওমরকেই বর্ণনা করা হচ্ছে তৃতীয় পুরুষ (সে) সম্বোধন করে। এই জাতীয় রীতি শুধু পরিচ্ছেদেই নয় মাঝে মাঝে কাহিনীর ভিতরের প্যারার মধ্যেও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচীন আরবী কবিতাগুলোতেও এই ধরনের রীতির উপস্থিতি দেখা যায়। শুধু তাই নয় পবিত্র কুরআনেও এরকম ভাষা ব্যবহারের নিদর্শন রয়েছে অনেক।
ভিখারি উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল অংশ হলো এর শেষ কয়েকটি পরিচ্ছেদ। যেখানে ওমর হামযাবির ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যাওয়ার বর্ণনাটা এসেছে একেবারেই নতুন ঢঙে। সেখানে অলীক কল্পনার সাথে বাস্তবের মিশ্রণ, আবার কল্পনার বল্গাহীন ছুটে বেড়ানো, নানা রকমের অদ্ভুত চরিত্র আর চিত্রের সমাহার ঘটিয়ে শেষ পরিচ্ছেদগুলো নগীব মাহফুজ রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো তৈরী করেছেন। নগীব মাহফুজ এই উপন্যাসের মাধ্যমে আবারো আরবী সাহিত্যে তার ব্যতিক্রমী আবির্ভাবের বিষয়টি প্রমাণ করেছেন বেশ স্বচ্ছ আর জোরালোভাবে। উপন্যাসটিতে মূলের স্বাদ রাখার জন্য মূল আরবী থেকে অনুবাদ করে এর সর্বনামের ব্যবহার চিত্র-কল্পকাহিনী চিত্রণ সবকিছুই প্রায় একরকম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
নগীব মাহফুজ হলেন আরবী সাহিত্যের একমাত্র কথাশিল্পী যিনি সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরস্কার আরবী সাহিত্যে এই প্রথম হলেও নগীব মাহফুজ বহুবার সাহিত্যক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদকে ভূষিত হয়েছেন। শিল্প ও সাহিত্যে চল্লিশ দশকে অবদান রাখার জন্য তিনি সম্মানজনক ‘আরবাইনাত’ পদক লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি উপন্যাস রাদুবিস রচনার জন্য ‘কুত আল কুলুব আর দিমারদাসিয়্যাহ’ পুরস্কার লাভ করেন। খান আল খালিলি উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৪৬ সালে আরবী ভাষা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৫৭ সালে সাহিত্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং তার কাসর আল শাওক উপন্যাসের জন্য পদকপ্রাপ্ত হন। ১৯৭০ সালে তিনি মিশরের জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার লাভের গৌরব অর্জন করেন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে নগীব মাহফুজ মিশর সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দি কলার অব দ্য রিপাবলিক অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি মিশরের আলমেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনারারী ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে নোবেল প্রাইজ লাভের পর ১৯৮৯ সালে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনারারী ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা থেকে নগীব মাহফুজ শুধু উপন্যাস ও ছোটগল্পকে তার মূল ধারা হিসেবে বেছে নেন। শুরু থেকেই নিজেকে একজন সফল গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একজন সফল সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য তিনি আরবী সাহিত্যসহ বিশ্ব সাহিত্যের এমন কোনো দিক বাদ রাখেননি যেটা তার পড়ার আওতায় ছিল না। নগীব মাহফুজ উপন্যাস বিবর্তনের ধারায় আরবী উপন্যাসের মধ্যে পাশ্চাত্য উপন্যাসের কলাকৌশল ও ঐতিহ্যের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। তবে আরবী জাতীয় সাহিত্যের ঐতিহ্য ও অনুপ্রেরণা তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তিনি এক হাজার এক আরব্য রজনী দ্বারা প্রভাবিত হন। আধুনিক আরবী উপন্যাস ও ছোটগল্পের যে সমস্ত লেখক দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন তারা হলেন মাহমুদ তৈমুর, আব্বাস মাহমুদ আল আক্বাদ, তাওফীক আল হাকিম ও ইয়াহ হিয়া হাক্কি।
১৯৬৬ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত নগীব মাহফুজ যে সব নাটক, উপন্যাস ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন তাতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন মিশরের সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি মিশরসহ সমস্ত মুসলিম বিশ্বের উপর হিটলারের নাজী বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা, কর্ণেল নাসির আমলের বিপ্লব, বাদশাহ ফারুকের স্বৈরাচারী শাসনামলের বিভীষিকা, অত্যাচার অবিচার, ইউরোপীয় অপসংস্কৃতির অনুকরণের কুফল বর্ণনাসহ বিচিত্র বিষয় স্থান পেয়েছে। নগীবের এইসব সচিত্র প্রতিবেদনের মধ্যে মিশরবাসী তথা সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত জাতি নিজ নিজ জীবন জিজ্ঞাসার সমাধান খুঁজে পাবেন।
নগীব মাহফুজ আরবী সাহিত্যের প্রাচীন ও আধুনিক যুগের প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং আরবী গদ্য সাহিত্যের নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৩৬ সালে এম এ করেন। প্রথম দিকে তিনি পেশাদার লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন। এরপর ১৯৩৯ সালে যোগ দেন আমলাতন্ত্রে। লেখক জীবনের প্রথম দিকে তিনি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিচিত্র প্রেক্ষাপটে তিনি ক্রমাগত লিখেছেন। সমাজ ও ইতিহাসের প্রতি, মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা আর দায়বদ্ধতা থেকে তিনি লিখেছেন বিরতিহীনভাবে। ২০০১ সালে তার নব্বইতম জন্মদিন পালন উপলক্ষে মিশরের ‘আল আহরাম’ পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকার নিতে আসলে তিনি বলেন যেখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ অন্যায়ভাবে বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছে সেখানে পার হয়ে যাওয়া একজন মানুষের জন্মদিন নিয়ে কি করার আছে।
নগীব মাহফুজ রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে আল তারিক (খোঁজ), আল লুসুস ওয়াল কিলাব (চোর ও সারমেয় সমাচার), হজরত আল মুতারাম (মান্যবরেষু), আল শাহ্হায (ভিখারি), আবস আল আকদার ( ভাগ্যের পরিহাস), রাদুবিস (ফিরাউনের সময়কার একটি চরিত্র), খান আল খালিলি (একটি রাস্তার নাম), বায়নাল কাসরাইন (দুই প্রাসাদের মাঝে), বিদায়া ওয়া নিহায়া (শুরু এবং শেষ), জুকাক আল মিদাক (মিদাক গলি), আল কাহিরা আল জাদীদ (নতুন কায়রো), কাসরোল শাওক (প্রেমের প্রাসাদ), আল হুব্বু তাহতাল মাতার (বৃষ্টির নিচে ভালবাসা) এবং গল্প গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— হামসুল জুনুন (পাগলের প্রলাপ), তাহতাল মাজাল্লা (যাত্রী ছাউনির নিচে), শাহর আল আসাল (মধু মিলন), ও দুনিয়া আল্লাহ (আল্লাহর দুনিয়া)।
রাফিক হারিরি



Leave a Reply