বারো
ভালবাসার ক্ষেত্রে ওয়ারদার মতো তুলনীয় আর কেউ নেই। সে তার মানুষটার জন্য আর তাদের ছোট্ট বাসাটার জন্য পাগল। সে ভালবাসার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলিয়ে দিচ্ছে। ওমর ঘরের দেয়ালসহ চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। ফুলদানিতে রাখা ফুল থেকে গোলাপের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। পুব দিকের ছোট্ট ঘর থেকে মিহি সুরে সংগীত বেজে চলছে। ওমরের মনে হল সে এখন বেহেস্তে আছে। যদিও ওয়ারদা তার কাছে কোনো কিছুই চায়নি তারপরেও ওমর ওয়ারদাকে কাপড়চোপর থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল।
ওয়ারদা প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে আর নিয়ন্ত্রিত খাবার খেয়ে নিজের ওজন আর স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখছিল। সে ওমরকেও খাবার আর পানীয়ের ব্যাপারে সতর্ক রাখছিল। ওমর বুঝতে পারছিল যে ওয়ারদা তার ব্যক্তিত্বের একটা অংশ হয়ে যাচ্ছে আর তার সর্বশেষ আশা আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
শীতের সেই দীর্ঘ রাতে তারা একে অপরে পুবের ঘরটায় রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকল। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ, সত্য মিথ্যা, কল্পনা বাস্তবতা, স্বপ্ন ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে তারা কথা বলল যার কোনো মাথামুণ্ড নেই। তারা একে অপরে চুমু খেল। আলিঙ্গন করল। শীতের তীব্র বাতাস আর বৃষ্টির ধারা তাদেরকে কোনোভাবেই বিরক্ত করছিল না। তাদের কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর ঘরের ভেতর পারস্পরিক সমঝোতা আর প্রশান্তির একধরনের নিরবতা নেমে আসল। ঠিক সেই সময় তার ভেতরে অলীক সব কল্পনা ঘুরপাক খেতে লাগল। তার কতগুলো বেশ হাস্যকর আবার কতগুলো বিরক্তিকর। কল্পনায় সে তখন ভাবছিল বাঁক খাওয়া রাস্তার মুখে দুটো গাড়ি মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো, একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ছিটকে বাতাসের উপর ভেসে উঠল।
‘কি ব্যাপার কি হলো। কোথায় তুমি?’ একটা নরম কন্ঠস্বর ভেসে এল।
সে বেশ লজ্জা পেয়ে উত্তর দিল, না তেমন কিছু হয়নি।’
ওয়ারদা হাত দিয়ে ওমরের গলা পেচিয়ে ধরল। ‘মনে হচ্ছে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এখানে আছে।’
সে নেতিবাচকভাবে তার মাথাটাকে একটু নাড়াল। কিছুক্ষণ নিরবতার পর ওয়ারদা আবার বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না কেন বাছিনা আর জামিলা তোমার অফিসে তোমাকে দেখতে আসছে না?’
সে তখন ভাবছিল মাকড়শা পোকামাকড় শিকার করার জন্য কি অদ্ভুত উপায়ে তার ঘরটা তৈরী করে। সে বলল, ‘বাছিনা কখনো চায় নাই।’
‘সে কি তোমার ইচ্ছার কথা জানে?’
‘মোস্তফা তাকে বিষয়টা জানিয়েছে।
‘তুমিতো আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলোনি।’
‘এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।’
‘কিন্তু যে বিষয়টা তোমাকে উদ্বেলিত করে সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
তারা বসে খুব বেশি করে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলো দেখতে থাকল। কারণ টিভির অনুষ্ঠানগুলো অহেতুক ফালতু কল্পনা থেকে আগেভাগেই নিজেদের দূরে রাখতে পারত। এর মধ্যে মোস্তফা একদিন তাদের এই ফ্লাটে ফোন করে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। ওয়ারদা মোস্তফাকে তাদের ফ্লাটে আসার আমন্ত্ৰণ জানানোর পর মোস্তফা আবার সেখানে আসা শুরু করল। সে ওমরকে তার কবিতার উন্নতির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘সে কবিতা লিখতেছে।’ ওয়ারদা উত্তরে বলল।
কিন্তু ওমর তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘এটা তেমন কিছু নয়। অসময়ের গর্ভপাত।’
মোস্তফা প্রবোধ দেয়ার মতো করে বলল, ‘কবিতার চেয়ে সুখী হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
সে আবার শেষ প্রশ্ন করার মতো বলল, ‘সুখ বিষয়টা কি?’
কিন্তু তখন মোস্তফার বাদামি চোখে একধরনের উদ্বেগ দেখে সে আবার চুপ করে গেল। মোস্তফা, রেডিও, টেলিভিশন এরা লোকদেরকে পুনরাবৃত্তিমূলক কথা- বার্তা থেকে বিরত রাখে। আর ঠিক তখনই ওমরের মাথার ভেতর আবার সেই অলীক কল্পনাগুলো ভেসে উঠল।
‘হায় খোদা!’ সে নিজেকে দেখতে পেল একজন যাদুকরের ভূমিকায় যে তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। সে বিরাট অপেরা হাউসটাকে চোখের পলকে বাতাসে মিশিয়ে দিল। লোকজন বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবার সবাইকে হতবুদ্ধি করে সে অপেরা হাউসটাকে চোখের পলকে আগের জায়গায় নিয়ে আসল। আহ! যাদুর ক্ষমতা পাওয়াটা মানুষের জন্য কতই না দরকার। সে আবার মনে মনে বলল, ‘হায় খোদা!’
সে ওয়ারদার দিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকালে ওয়ারদা তখন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কেন তোমার বন্ধুদের এখানে এসে গল্পগুজব করে সময় কাটানোর জন্য আমন্ত্রণ জানাও না?’
সে খুব শান্তভাবে উত্তর দিল, ‘মোস্তফা ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই।’
সে বুঝতে পারল ওয়ারদা তার কথাটা ধরতে পারেনি। তাই সে আবার ব্যাখ্যা করার জন্য বলল, ‘আমার সাথে যারা কাজ করে বা উঠাবসা করে তাদেরকে আমি বন্ধুর কাতারে ফেলি না।
ওয়ারদা নিজ উদ্যোগেই তাকে নিয়ে বেশি বেশি বাইরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তারা সিনেমা হলে, থিয়েটারে এমনকি নাইটক্লাবগুলোতে যাওয়াআসা করতে থাকল।
ওয়ারদা বলল, ‘আমরা নিজেরা এভাবে ঘরে একা একা বসে থাকার চেয়ে বাইরে ঘুরে বেড়ানোটাই বেশি মঙ্গলজনক তাই না।’
সে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল।
ওয়ারদা একটু ঠাট্টা করে বলল, ‘এই প্রথম আমার মনে হল তুমি কোনো তোষামোদ না করেই সত্য কথাটা বলেছ।’
বেশ কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, ‘তোমার এই বাইরে যাওয়ার আয়োজনটা নিয়ে একটু প্রশংসা করতে চেয়েছিলাম।’
‘তোমার সংস্পর্শে আমি কখনোই ক্লান্ত হবো না।’
‘বিশ্বাস করো আমি একমাত্র তোমারই।’
কিন্তু তারপরেও ওমর তার হঠাৎ হঠাৎ অমনোযোগিতার জন্য নিজের উপর নিজেই বেশ বিরক্ত ছিল। হায় খোদা কি এমন ঘটেছে। কেন এমন হয়।
মোস্তফা যদিও তার এই নতুন সুখ শান্তি নিয়ে বেশ খুশি ছিল। একদিন তার অফিসে বসে গল্প করতে করতে মোস্তফা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে প্রেম ভালবাসার বিষয়ে কিছু বলো। কারণ শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে জীবনের নতুন এক দর্শন গ্রহণ করার জন্য প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছ।’
ওমর তার প্রশ্নটাকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি বাছিনার কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছি।’
‘তুমিতো জানো বাছিনা খুবই আদর্শবাদী। সে অন্তরের ভেতর থেকে তোমাকে ভক্তি করে।’
‘সে আমার মতো বিশ্বাসঘাতককে কি মনে রেখেছে?’
‘সে হয়তো একদিন তোমাকে দেখতে আসবে। কিন্তু খোদার দোহাই তার আগে তুমি আমাকে তোমার নতুন এই প্রণয়ের বিষয়ে কিছু বলো।’
সে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার মতো করে বলল, ‘এটা আগের অনেক কিছুর চাইতে শক্তিশালী।’
‘এটা কি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।’
‘তোমার মতো কপট ভণ্ডের হৃদয়ের গোপন জিনিস জানার কোনো অধিকার নেই।’
তার কথা শুনে মোস্তফা লম্বা সময় নিয়ে গা দুলিয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘আসলে আমি তোমার ব্যাপারটা যেমন দেখেছি সেটা বলি। মজাদার সেই কথা বার্তাগুলো শেষ হয়েছে, প্রেম প্রেম এই খেলা ফিকে হয়ে গেছে, আর তুমি অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করছ।’
‘এই সব বন্ধ করো।’
আহ! কি ভয়ংকর অবস্থা।
ওয়ারদা সত্যিকার অর্থেই একজন প্রেমিকা। সাথে সাথে সে খুবই সুন্দরী। হায় খোদা কিভাবে আবার বেঁচে থাকার স্বতঃস্ফুর্ততা জেগে উঠবে।
একরাতে ওয়ারদা আর ওমর নিউ প্যারিসে গেল। সেখানে হঠাৎ করেই মার্গারেট মঞ্চে এসে হাজির হল। তার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। মার্গারেটকে নিয়ে তার সে রাতের কথা মনে পড়ে গেল। অনেক কষ্টে সে তার স্নায়ুর উত্তেজনাটাকে নিয়ন্ত্রণ করল।
মার্গারেট তখন গাইছিল,
“তোমাকে যতই দেখি ততই পাবার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে
এর সাথে জ্বলে উঠে কামনার আগুন”
ওয়ারদা ফিসফিস করে বলল, ‘কি সত্য কথাই না বলছে সে!’
মার্গারেটের সাথে তার একবার চোখাচোখি হলো। ওমর সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে ওয়ারদাকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসল। শীতের রাতে উদ্দেশ্যহীনভাবে খালি রাস্তায় গাড়ি চালাল। তার এত উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ ছিল না বা দরকার ছিল না। কিন্তু কেমন একধরনের হতাশা আর উত্তেজনা তাকে পেয়ে বসল।
সে একদিন অফিস থেকে ওয়ারদাকে ফোন করে বলল যে বিচারবিভাগে নতুন যোগ দেয়া তার এক সহকর্মীর সম্মানে বাড়িতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
তার পর সে আবার একদিন নিউ প্যারিস ক্লাবে গেল। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মার্গারেটের গান শুনল। মনে মনে ভাবছিল কোনো জিনিস আমাকে এখানে নিয়ে আসল, আর এত তাড়াইবা ছিল কিসের। আমি আসলে কি খুঁজছি। ওয়ারদার সাথে তাহলে কি সব কিছু শেষ হয়ে গেল?’
মার্গারেট একটা শ্যামপেন সাথে করে নিয়ে টেবিলে আসল। তার চেহারায় কেমন একটা উদ্ভাস। সে বলল, ‘আমি দুঃখিত যে আমাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চলে যেতে হয়েছিল।’
‘অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে?’
ওমর খুব মনোযোগ দিয়ে মার্গারেটকে দেখছিল। তার আকর্ষণের ক্ষমতাটা অনুভব করছিল। ওমর মার্গারেটকে তার সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল।
কিন্তু মার্গারেট বলল, ‘না আজ রাতে নয়।’
সে তার অস্থিরতাটাকে দমন করার চেষ্টা করছিল।
‘তাহলে কবে?’
‘আগামীকাল হতে পারে।’
সে যখন তার ছোট্ট বাসাটায় ফিরে আসল তখন প্রায় রাত একটা বেজে গেছে। ওয়ারদা তখন পুবের ঘরটায় বসে ছিল। সে ওয়ারদাকে চুমু খেল। তারপর এক সময় সে যেভাবে জয়নাবকে জিজ্ঞেস করত সেভাবে ওয়ারদাকে বলল, ‘তুমি এখনো জেগে আছ?’
ওয়ারদা বেশ ভর্ৎসনার সুরে জবাব দিল, ‘অবশ্যই।’
ওয়ারদা তার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বলল, আমি আশা করি তুমি অতিরিক্ত মদ পান করে আসোনি।’
কিছুক্ষণ পরে সে যখন তার পায়জামাটা পরে বিছানায় শুলো তখন ওয়ারদা তাকে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট চেপে ধরল ওমরের ঠোঁটের উপর। কিন্তু সে তখন কোনো তাড়না অনুভব করছিল না।
‘রাতটাকে নিষ্পাপ থাকতে দাও।’ সে মনে মনে নিজেকে বলল।
পরদিন ওমর অফিসে গেল না। ওয়ারদা তার অফিসে ফোন করে তাকে না পেয়ে বুঝতে পারছিল না ওমর কোথায় যেতে পারে। কারণ ওমর তার অনুপস্থিতির বিষয়ে আগ থেকে কিছুই বলেনি।
ওমর নিউ প্যারিস ক্লাবে চলে গেল সময় কাটানোর জন্য। মঞ্চের বাতিগুলোর নানা রকম লাল আলোয় মার্গারেটকে বেশ অদ্ভুত লাগছিল। তার চকচকে গলা উঁচু গানের কণ্ঠস্বর বারবার ওমরকে কাঁপিয়ে তুলছিল।
ক্লাবের দেয়াল আর ছাদের মেঝেতে স্প্যানিশ বাতির নিচে নগ্ন মহিলাদের ছবি শোভা বৃদ্ধি করছিল। চারদিকে সিগারেটের ধোঁয়া আর মদের গন্ধ। বড় একটা খাম্বার পাশে দাঁড়িয়ে এক জোড়া কপোত-কপোতী মৃত্যুযন্ত্রণার মতো অস্থির হয়ে জড়াজড়ি করছিল আর চুমু খাচ্ছিল।
ওয়ারদা কি তাহলে অন্তর থেকে এত সহজেই উৎপাটিত হয়ে গেল। যেভাবে কৃত্রিম ফুলগুলোকে ছুঁড়ে ফেলা হয়। কেন আমরা বারবার মৃত্যুকে স্মরণ করি। কেন আমরা যা ইচ্ছা তা করতে পারি না। কে নিশ্চয়তা দিবে যে এই মদ্যপায়ী আত্মাগুলো বেঁচে আছে।
সে আর মার্গারেট তার গাড়িতে করে পিরামিডের দিকে রওনা দিল। ‘রাতটা বেশ ঠাণ্ডা।’ মার্গারেট বলল।
সে গাড়ির হিটারটা চালিয়ে দিল। মার্গারেট তার কথা বলা থামাল না।
‘আমরা কেন তোমার বাড়িতে যাচ্ছি না?’
‘আমার কোনো ঘর নেই।’
অন্ধকারে গাড়িটা থামিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকল। খুব ঘন মেঘে আকাশটা ছেয়ে আছে।
‘আকাশে একটা তারাও দেখা যাচ্ছে না।’ সে বেশ খুশি হয়ে বলল।
মার্গারেটকে ক্ষিপ্রতার সাথে নিজের বুকের উপর টেনে আনল। মার্গারেট দম বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল, ‘অন্ধকার খুব ভীতিপ্রদ।’
সে মার্গারেটকে আরেকটা চুমু খেয়ে থামিয়ে দিল। তারপর বলল, ‘এখন ভয় পাওয়ার সময় না।’
আহ মার্গারেটের স্পর্শ কি সুখকর। যদিও এর কোনো অর্থ নেই। জীবনের রহস্যময়তাকেই স্পর্শ করা একটা জরুরী ব্যাপার। দীর্ঘশ্বাস প্রশ্বাসের মাঝে তাদের কথাবার্তা হারিয়ে গিয়েছিল। রাতের নিরবতা, সুরেলা এক ছন্দময় গানের সুর তাদের জন্য চমৎকার আরেকটা জীবনের আগমনবার্তা নিয়ে আসছিল। অন্ধকারটা লজ্জায় আধবোজা চোখ থেকে মুক্ত ছিল। অন্তর এখন বেশ শান্ত আনন্দ উপভোগ করার জন্য। সে গভীর উচ্ছ্বাস আনন্দ আর দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে চারদিক দেখতে থাকল। কিন্তু হায় খোদা হঠাৎ করেই সে যেন সব কিছুর মধ্যে কেমন ভয় আর নিদারুণ যন্ত্রণা টের পেল। সে কালো অন্ধকার রাতের দিকে তাকিয়ে দেখল কোথায় আনন্দ, কোথায় প্রমোদ, কোথায় মার্গারেট কোথায় কি? কিছুই নেই কোথাও।
সে প্রচুর বিরক্তি আর অসন্তোষ নিয়ে তার ছোট্ট বাসাটিতে ফিরে আসল। ওয়ারদা বেশ কঠোরভাবেই তার সামনে দাঁড়াল। সে ওয়ারদার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিল। তারা দুজনেই কয়েক পলক বেশ অস্বস্তি নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকল। সে হঠাৎ করেই তার বিছানার উপর হেলান দিয়ে বলল, ‘আমি খুব দুঃখিত।’
‘ক্ষমা চাওয়ার কোনো কিছু দেখছি না।’ ওয়ারদা একটু পেছনে হেঁটে গিয়ে ঘরের এক পাশে একটা চেয়ারে তার মুখোমুখি বসল। তারপর আবার বলল, ‘এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে তোমার একটা পরিবর্তন দরকার।
‘বিষয়গুলো আমার কাছে অত সহজ মনে হচ্ছে না।’
ওয়ারদা তার নিজের উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে বলল, ‘আমি কোনো অকৃতকার্য পরীক্ষা পরিচালনা করতে যাচ্ছি না। তোমাকে শুধু খুব সহজ একটা প্রশ্ন করতে চাই। আমাদের সম্পর্কটা কি তাহলে ব্যর্থ হয়েছে? আমরা কি তাহলে..?’
সে বেশ বিশ্বস্ততার সাথে কিন্তু কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে বলল, ‘কেউ তোমার সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে না। আমি নিশ্চিত।’
ওয়ারদা মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুমি কি কোনো মেয়ে মানুষের সাথে ছিলে?’
সে বেশ অস্বস্তির সাথেই উত্তরটা দিল।
‘তোমাকে সত্যি কথাটাই বলতে হয়। আমি আসলে এখনো আমার অসুস্থতা থেকে মুক্ত হইনি।’
এই প্রথমবারের মতো ওয়ারদা খুব তীব্র স্বরে তাকে বলল, ‘এমন একটা অসুস্থতা যেটাকে কেবল একজন মেয়েমানুষই সুস্থ করতে পারে!’
তারপর সে আবার ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘আমার কাছে তোমার জন্য ভালবাসা ছাড়া আর কিছু নেই। তুমি যদি সেটা উপেক্ষা করো তাহলে সব কিছুই শেষ হয়ে গেল।’
কথা শেষ করে ওয়ারদা খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছিল। তারপর আবার বলল, ‘কোনো অল্প বয়সের তরুণ যুবকের হৃদয়ের পাগলামি সারানো সম্ভব কিন্তু তোমার মতো বিজ্ঞ বুঝদার মানুষের যদি সেরকম কিছু হয় তাহলে তার চিকিৎসা সম্ভব না।।
ওয়ারদার কথা শুনে সে খুব হতাশ হয়ে ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘তাহলে কি আমি পাগল হয়ে গেছি?’
‘আশ্চর্য! তোমার ব্যক্তিত্বে সুস্থিরতার কিছুই দেখা যাচ্ছে না।’
আমার আচরণের জন্যই বলা হচ্ছে আমি পাগল।’
তার কথা শুনে এবার ওয়ারদা চিৎকার করে উঠল।
‘তুমি যদি আমার সাথেই বাস করতে চাও তাহলে তোমার স্ত্রীর কাছে চলে যাও।’
‘আমার কোনো স্ত্রী নেই।’
‘ঠিক আছে তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। আমার সমস্যা তোমার স্ত্রীর চেয়ে প্রকট নয়। কেননা ইচ্ছে করলেই আমি একটা চাকরি আর থাকার জায়গা জোগাড় করে নিতে পারব।’
ওয়ারদার কথাবার্তায় সেও বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘যাও।’
কথা শেষ করে সে চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
‘তাহলে তুমি একজন মেয়েমানুষের সাথেই ছিলে?’
সে বেশ হাল্কা সুরেই উত্তর দিল।
‘তুমি তাকে চেন।’
‘কে সে?’
‘একজন মেয়ে মানুষ।’
‘কিন্তু কে সে?’
‘এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।’
‘তুমি কি তাকে আমার সাথে পরিচিত হওয়ার আগে থেকেই চিনতে?’
‘আমরা এমনিই দু-একবার সাক্ষাৎ করেছিলাম।’
‘তুমি কি তাকে ভালবাস?’
‘না।
‘তাহলে কেন তুমি তার সাথে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলে।’
‘এটা হঠাৎ একধরনের কৌতূহল হতে পারে।’
‘এর মানে কি? তুমি কি সব সময় তোমার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দাও?’
‘না সব সময় না।’
‘তাহলে কখন।’
‘যখন আমি অসুস্থ অনুভব করি।’
‘তুমি কি আসলেই মেয়েদের প্রতি খুব বেশি পরিমাণে আসক্ত।’
‘না।’
‘তুমি কি আমাকে ভালবাস না?’
‘হ্যাঁ অবশ্যই।’
‘কিন্তু মনে হয় খুব বেশি সময়ের জন্য না।’
‘আমি তোমাকে ভালবাসি। কিন্তু আমার অসুস্থতাটা মনে হয় আবার শুরু হচ্ছে।’
ওয়ারদা বেশ অসহিষ্ণু হয়ে বলল, ‘আমি গত কয়েক দিন ধরেই তোমার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন দেখছি।’
‘তখন থেকেই অসুস্থতা আবার শুরু হয়েছে।
‘অসুস্থতা! অসুস্থতা।’
হঠাৎ করেই ওয়ারদা তার গলার স্বর পাল্টে প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘তুমি কি আবার ঐ মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাচ্ছ?’
‘আমি ঠিক জানি না।’
‘তুমি কি আমাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাচ্ছ?’
সে একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘দয়া করে একটু থামো। একটু বিশ্রাম দাও আমাকে।’
সে আবার মার্গারেটকে নিয়ে শীতের ঠাণ্ডা রাতে ডেজার্ট রোডের পাশে রেষ্ট হাউজে সময় কাটাল। রাতটা তখন ছিল নক্ষত্র দিয়ে চকচকে আর ঝকমকে। ফেরার সময় মার্গারেট বলল, আমাদের নিজেদের একটা জায়াগা থাকলে ভালো হতো না?’
‘না .. ..।’ সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল। সে এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছিল না। কিন্তু মার্গারেট তার উত্তর দেয়ার পরেই আবার বলল, ‘সত্যিকার অর্থে আমি গাড়ি নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রেম করতে আনন্দ পাচ্ছি না।’
সে মার্গারেটকে কোনো কথা না বলেই হোটেলে ফিরিয়ে দিয়ে আসল।
