ভিখারি – ৬

ছয়

আগষ্টের শেষ দিকে পুরো পরিবারটা কায়রোতে ফিরে আসল।

ওমর যখন তার কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছিল তখন পথে আল আযহার চত্বরটা দেখে তার মাঝে হঠাৎ করে আবার বিরক্ত ভাব ফুটে উঠল। সে এখান থেকে প্রস্থান করার পরও জায়গাটা সেই আগের মতোই অপরিবর্তিত আর বিরক্তিকরই রয়ে গেছে।

অফিসে তাকে বেশ উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়া হলো। বিশেষ করে তার সহকারি মাহমুদ ফাহমি।

ঝুলে থাকা কেসের ফাইলগুলো তার কাছে আনা হলো। সেপ্টেম্বরের দিনগুলো এমনিতেই একটু চটচটে ছিল কিন্তু তারপরেও একটা মিষ্টি বাতাস বেশ ভালোভাবে বয়ে যাচ্ছিল। সকালের আকাশটা সাদা মেঘ দিয়ে সাজানো ছিল। মোস্তফা তাকে দীর্ঘ আলিঙ্গন করল। তারা মুখোমুখি দাঁড়ালো। ওমর তার বন্ধুর উপর দিয়ে তাকাল। বন্ধুর টেকো মাথা কালো টাই সিলভার রং-এর বাতির কারণে চমকাচ্ছিল।

মোস্তফা অফিসের ডেস্কের সামনে চামড়ার দীর্ঘ চেয়ারটায় বসতে বসতে ওমরকে বলল, ‘বন্ধু তোমাকে তো হরিণীর মতো বেশ ফিটফাট আর কৃশকায় দেখাচ্ছে। সাবাস!’

সে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স থেকে সিগারেট নিল। বাক্সটা খুললে সেখান থেকে বেশ সুন্দর একটা মিউজিক বেজে উঠে। সিগারেটটা নিয়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মোস্তফা বলে যেতে থাকল, ‘আমি প্রায় সময় ভাবি তোমার সাথে ঘুরে আসব আলেক্সান্দ্রিয়ায় কিন্তু আমার পরিবার বলে রাসেল বারের কথা। যাই হোক আমি রেডিওর জন্য নতুন একটা সিরিয়াল লেখা শুরু করছি।

ওমর তার কেসের ফাইলগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে বন্ধুর চোখের দিকে তাকাল। একটু হেয়ালির মতো করে হেসে তারপর বলল, ‘আজকে সকালে আমি কোনো বিরতি ছাড়াই কাজ করব।’

মোস্তফা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু সাথে সাথেই ওমর বিড়বিড় করে বলল, ‘কিন্তু….’

মোস্তফা চিন্তিত হয়ে বলল, ‘কিন্তু কী?’

‘সত্যি করে বলছি আমার কাজ করার কোনো মানসিকতা নেই।’

একটা অস্বস্তিকর নিরবতা ঘরের ভেতর নেমে এল। মোস্তফা একটু চিন্তিত হয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘মনে হয় তোমার আরো কিছু দিন বিশ্রাম নেয়া উচিত।’

‘ছেলেমানুষি বুঝ বন্ধ করো। সমস্যাটা এর চেয়েও জটিল।’

কথা শেষ করে ওমর একটা সিগারেট ধরালো। তারপর গলার স্বরটা একটু পাল্টিয়ে বলল, ‘সমস্যাটা আরো জটিল। এটা শুধু আগে যতটুকু ছিল সে পর্যন্তই থেমে নেই অর্থাৎ শুধু আমার কর্মক্ষেত্রকেই না বরং আমার মানসিক অসুস্থতাটা আরো অন্যান্য অনেক বিষয়গুলোকে গিলে খাচ্ছে। যেমন আমার স্ত্রী আমার পরিবার।’

‘জয়নাব?’ মোস্তফা বেশ আতঙ্কিত হয়ে বলল।

ওমর একটু লজ্জার স্বরে বলল, ‘আমি জানি না কিভাবে এটা বলব। কিন্তু এটা সত্যিকার অর্থেই দুঃখজনক। আমি জয়নাবকে এখন আর সহ্য করতে পারছি না। আমার ঘরটা এখন সুখী ভালবাসার ঘর নেই।’

‘তুমি কি বলছ? বাছিনা আর জামিলাতো এর সাথে সম্পৃক্ত।’

‘সৌভাগ্যবশত আমাকে তাদের প্রয়োজন নেই।’

মোস্তফার চেহারাটা বিষণ্ন হয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল সেখানে দুঃখের ছায়া। সে বলল, ‘কিন্তু ওমর তুমিইতো পারো সমস্যাটার গোপন বিষয়টা উপলব্ধি করতে।’

একটু শক্ত ভাবে হেসে ওমর বলল, সম্ভবত আদিঅন্তহীন এই বিশ্ব আর এই বিশ্বের একঘেয়ে ক্লান্তিকর পরিভ্রমণ হয়তো এই সমস্যার প্রাথমিক কারণ হতে পারে।

‘আমি নিশ্চিত তুমি পাগলের প্রলাপের মতো বাড়িয়ে কিছু বলছ। যাই হোক জয়নাব এটা নিয়ে খুব উদ্বেগের মধ্যে আছে।’

‘সেও একটা অন্ধকার সত্য।’

তারপর ওমর খুব নরমভাবে মোস্তফাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভালবাসার এই জগতে আর কি ঘটার আছে?’

মোস্তফা বলল, ‘আমি সব সময় প্রশ্নের মুখোমুখি থাকি কিন্তু আমার কোনো জবাব থাকে না।’

‘এখনতো তুমি একটু বুঝতে পারো। কারণ মানসিক এই বৈকল্যের অবস্থাটার ভেতর দিয়েই তুমি এখন যাচ্ছ।’

মোস্তফা বলল, ‘তুমি যা ইচ্ছা বলতে পারো। কিন্তু আমি এখন কি করতে পারি। আমার কি করা উচিত?’

‘প্রশ্ন দিয়ে তোমার ত্যক্ত হওয়ারই কথা। তোমার গোপন ইচ্ছাগুলো প্রমাণ করো, তোমার স্বপ্নের ভেতর দিয়ে তাকাও। অনেক কিছুই আছে দৌড়ে পালানোর জন্য কিন্তু কোথায় যাবে?’

‘ঠিক আছে। কিন্তু কোথায় যাব?’

‘তুমি অবশ্যই উত্তরটা খুঁজে পাবে।’

‘তার আগে আমাকে বলো কোন বিষয়টা তোমার কাজ আর বিয়ের ব্যাপারে তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’

প্রশ্নটা যেভাবেই হোক তার কাছে খুব হাস্যকর লাগল। ওমর তাই একটু মুচকি হাসল। কিন্তু শান্ত পরিবেশে সে তার উত্তেজনাটি দমন করল।

‘স্ত্রীর সাথে আমার সম্পর্কটা হয়েছে এক ধরনের অভ্যাস আর বাস্তবতার উপর নির্ভর করে। আমার কাজের ক্ষেত্রটা হলো আমার জীবনধারণের উপায়। আমি আমার অডিয়েন্সকে নিয়ে সুখী। প্রতি সপ্তাহে তাদের কাছ থেকে যে শত শত চিঠি পাই তা নিয়ে আমি সুখী। সাধারণ জনগণের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া খুব সুখের কারণ। এমনকি সেটা পপকর্ণ ভাজা কিংবা পানিফল বিক্রির মাধ্যমে হলেও।’ তার কথা শুনে মোস্তফা বলল, ‘শোনো আমি সাধারণ পাবলিকও না, কিংবা কোনো ধরনের রিয়্যালিটিও না।’

মোস্তফা একটু থামল। তারপর আবার বলল, ‘যদিও কর্মক্ষেত্রে তুমি অসম্ভব সফলতা পেয়েছ, তোমার স্ত্রী তোমাকে অসম্ভব ভালবাসে আর অর্চনা করে। সুতরাং তোমার সামনে পৌঁছার মতো আর কোনো লক্ষ্য নেই।’

ওমর একটু ঠাট্টা করে হেসে বলল, ‘তাহলে আমি কি এখন আল্লাহর কাছে আমার ব্যর্থতা আর পরিবারের ধ্বংস আর পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা করব?’

‘জীবনে নতুন কিছুর স্বাদ যদি আবার পেতে চাও তাহলে তুমি এটা করতে পার।’

ওমর বলল, ‘কখনো কখনো এটা আমাকে সান্ত্বনা দেয় যে আমি নিজেই আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ ঘৃণা করি।’ কথা শেষ করে ওমর খুব অস্থিরভাবে তার সিগারেটটা অ্যাস্ট্রের মধ্যে চেপে ধরল।

‘আমার কাজের ক্ষেত্র, জয়নাব, এবং আমি নিজে এই সবগুলোই সত্যিকার অর্থে এক জিনিস। আর এই সবগুলো বিষয় থেকেই আমি মুক্ত হতে চাচ্ছি।’

মোস্তফা তার দিকে একটু পরিহাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘পুরাতন কোনো স্বপ্ন কি তোমাকে প্ররোচিত করছে এই ব্যাপারে?’

ওমর একটু দ্বিধা করে বলল, ‘বাছিনা কিছু কবিতা লিখেছে।’

‘বাছিনা! বলো কি?’

‘আমি সেগুলো পড়েছি। আমরা দুজন কবিতাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। বিশ বছর আগে আমি পুরাতন যে বইগুলো পরিত্যাগ করে এসেছিলাম সেই বইগুলোর প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণ আমি এখন টের পাচ্ছি।’

‘আহ! কতবার আমি ভেবেছিলাম যে এমনটা ঘটবে।’

‘থামো। হ্যাঁ  একটা নির্দিষ্ট অনুভূতি আমার জঞ্জাল মস্তিষ্কে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। আমি পুরাতন হারিয়ে যাওয়া একটা সুর খুঁজছি। আমি এমনকি আমার নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করছি যে এটা আবার নতুন করে শুরু করা সম্ভব কি না। কিন্তু এটা শুধুমাত্র হাল্কা একটা অনুভূতি যেটা কিছু পরই আবার বাতাসে মিলিয়ে যায়।’

‘তুমি খুব শিগিরই ভালো হয়ে যাবে। আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।’

‘না। আমি আবার পড়াশোনা করার জন্য ফিরে যাচ্ছি। কিছু শব্দও লিখেছি। কিন্তু এগুলো কিছুই হয়নি। এক সন্ধ্যায় আমি যখন সিনেমা হলে ছিলাম তখন খুব সুন্দর একটা মুখ দেখে একই রকম অনুভূতি আমার হয়েছিল।’

‘এর পরে তোমার আর কি কি অনুভূতি হয়েছে?’

‘এটা একধরনের আবেগপ্রবণ অনুভূতি কিংবা উন্মাদনা বলতে পারো। সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনবেন। আমি এখন বিশ্বাস করি এই অনুভূতি কিংবা উন্মাদনা উচ্ছলতাই আমার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য। আমার কাজ, পরিবার কিংবা সহায়সম্পদ এইগুলো কিছু না। অদ্ভুত রহস্যময় এই উন্মাদনা সব কিছুকে পরাজিত করে বিজয়ী হওয়ার জন্য যেন এসেছে। এটা একাই সকল সংশয় উদাসীনতা দ্বিধা- দ্বন্দ্বকে পরাভূত করে ফেলবে।’

মোস্তফা হাতের উপর থুতনি রেখে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি তাহলে ভালবাসাকে চূড়ান্ত একটা বিদায় জানাতে চাচ্ছ?’

সে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি কি তাহলে বলতে চাচ্ছ যে এটা মধ্যবয়সের একটা উপসর্গ। যাই হোক এটা যদি তাই হয় তাহলে এখান থেকে আরোগ্য পাওয়াটা খুব সোজা যদি একজন দায়িত্ববান স্বামী নাইটক্লাবে যাওয়া বন্ধ করে কিংবা নতুন একটা বিয়ে করা থেকে বিরত থাকে। এবং আমিও হয়তো নতুন কোনো মেয়েমানুষের দিকে ঝুঁকে পড়ব। কিন্তু আমাকে যে বিষয়টা পীড়া দিচ্ছে সেটা তো এর চেয়েও কঠিন।’

মোস্তফা আর হাসি থামিয়ে রাখতে পারল না। সে বেশ উচ্চ শব্দ করে হেসে বলল, ‘এটা সত্যিকার অর্থেই খুব অদ্ভুত একটা অনুভূতি, কিংবা শারীরিক চাহিদা নিবৃত্ত করার কোনো দার্শনিক উপায় খুঁজে ফেরা।’

‘আমার দিকে তাকিয়ে ঠাট্টা করে হাসবে না। তুমি নিজেও এক সময় বিপজ্জনক পথে ছিলে।’

এই কথা শুনে মোস্তফা তার পুরাতন স্মৃতিগুলো মনে করতে করতে আরো একটু হেসে নিল।

‘হ্যাঁ।’ সে বলল। ‘হঠাৎ করেই আমি যখন আমার অবলম্বন হারিয়ে ফেললাম তখন আমি নতুন একটা নাটক লেখা শুরু করলাম। শিল্পসাহিত্য আমার হাতের মধ্যেই নোংরা হয়ে খণ্ড-খণ্ড টুকরায় ভেঙে গিয়েছিল। তাই আমি শিল্পকলাকে অন্যভাবে পরিবর্তিত করতে চাইলাম। যেই পথে আমাদের লক্ষ লক্ষ নাগরিককে এখন আনন্দ দিচ্ছে।

‘হ্যাঁ  আমি সেই পথটা হারিয়ে ফেলেছি। আমি শিল্পকলা থেকে মুখ ফিরিয়ে এমন একটা পেশার দিকে মুখ ঘুরিয়েছি যেটা এর মধ্যেই মরে যাচ্ছে। আইন এবং শিল্প দুটোই এখন অতীত। তুমি যেভাবে করেছ কিংবা তোমার মতো আমি নতুন এই শিল্পে দক্ষ হতে পারব না। আমি বিজ্ঞানচর্চা করতেও ব্যর্থ হয়েছি। আমি হারিয়ে যাওয়া সৃষ্টিশীলতার আনন্দ কিভাবে আবার ফিরে পাব। আমাদের জীবনটা খুবই ছোট আর একটা কথা শোনার পর সেই যে আমার মাথা ঘুরল সেটাকে আমি কখনোই ভুলতে পারব না। একটা লোক বলেছিল, ‘আল্লাহ আমাদের জীবনটা খুব শিগগিরই নিয়ে নিবেন এটা জানার পর কি আমরা জীবনযাপন করা বন্ধ করে দিব?’

‘মৃত্যু চিন্তা কি তোমাকে খুব বেশি অস্থির করে তুলেছে?’

‘না কিন্তু এটা আমাকে জীবনের গোপনীয়তা বোঝার ব্যাপারে উত্তেজিত করছে।’

‘যেভাবে তুমি সিনেমা হলে পেয়েছিলে?’

মোস্তফা তোমার ফুটপাতে ফুটপাতে কিংবা আলেকজান্দ্রিয়া স্কয়ারে ঘুরে বেড়ানোটা জানে না, একটা সুন্দর মুখ যেখানে পরমানন্দ পাওয়া যাবে তার জন্য তোমার আকুলতার বিষয়টাও সে জানে না।

এই উন্মাদ আবেগপ্রবণ ব্যক্তি তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি আর মনটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ক্ষয়ে যাওয়া ঝলসে যাওয়া ঘাসের তলে।

‘ঐ রাতগুলোতে আমি লোভী পশুর মতো শুধু ঘুরে বেড়াইনি। বরং আমি একরকমের হতাশা আর বেদনায় কাতর ছিলাম।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *