এক
নীল সামিয়ানার নিচে সাদা স্পষ্ট মেঘগুলো সাঁতরে বেড়াচ্ছে আর নিচে সবুজ প্রান্তরে তার বিশাল বিস্তৃত ছায়া পড়ছে। অনেকগুলো গাই গরু খুব মনোযোগ দিয়ে শান্তভাবে সবুজ কচি ঘাস চিবুচ্ছিল। এটা কোন জায়গা তা দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। নিচে খোলা মাঠে এক কিশোর বেশ তাগড়া একটা ঘোড়ার পিঠে বসে আনমনে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে খুব রহস্যময় দুর্বোধ্য এক টুকরো হাসি লেগে আছে।
পুরো দৃশ্যটাই একটা বেশ বড় বোর্ডে লাগানো চিত্রকর্মের অংশ।
চিত্রকর্মটির দিকে ওমর বেশ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল। কে এই অবাক করা চিত্রকর্মের শিল্পী। ওমর বসে বসে ভাবছিল। সে যে ঘরে বসে অপেক্ষা করছিল সেখানে সে ছাড়া আর কেউ নেই। গত দশ দিন আগে ডাক্তারের সাথে দেখা করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল সেই সময়টাও হয়ে এসেছে। ডাক্তারের অপেক্ষমাণ ঘরের মাঝে বেশ বড় একটা টেবিল বিছানো ছিল। টেবিলের উপর নানা ধরনের পত্রিকা, ম্যাগাজিন ছড়ানো ছিটানো। একটা পত্রিকার সামনের পাতায় একজন শিশু অপহরণকারী মহিলার ছবি দেওয়া।
ওমর আবার চোখ ফিরিয়ে নিল চিত্রকর্মটির দিকে।
সবুজ প্রান্তর, অনেকগুলো গরু, একজন কিশোর, বিস্তৃত দিগন্ত। চিত্রকর্মটি আসলে খুব সুন্দর তারপরেও কারুকাজময় সোনালী ফ্রেমে বাধানোর কারণে এর বাহ্যিক মূল্যটা আরো বেড়ে গেছে। ওমর খুটেখুটে কিশোর আর শান্ত সুখী গরুগুলিকে দেখছিল। এগুলোই তার কাছে ভালো লাগছিল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে যদিও তার চোখের পাতা ভারী হয়ে যাচ্ছে আর সে বুকের ধুকপুকানি টের পাচ্ছে। ছবিতে বাচ্চাটা দিগন্তের অনেক দূরে তাকিয়ে আছে। সে এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল যেন মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা তাকে বেষ্টন করে আছে। তুমি যেদিক থেকেই কিশোরটার দিকে তাকাও না কেন মনে হবে সে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে। কি এক বিশাল খাঁচা তাকে ঘিরে আছে।
ওমর ভাবছিল ছবিতে তেজী এই ঘোড়াটা আর শান্ত ও পরিতৃপ্ত চোখের গরুগুলির তাৎপর্য কী?
ঘরের বাইরে সে মৃদু পায়ের শব্দ শুনতে পেল। দরজার সামনে ডাক্তারের একজন সহকারি এসে দাঁড়াল।
‘আপনি আমার সাথে আসুন।’
ওমর উঠে দাঁড়াল। ভাবছিল পচিশ বছর পর তার বাল্যকালের স্কুল বন্ধু কি তাকে চিনতে পারবে?
সে প্রভাবশালী ডাক্তারের অফিসরুমে ঢুকল।
হ্যাঁ ঐতো ডাক্তার হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাল্কা পাতলা মাঝারি গড়নের। বেশ দ্যুতিময় চোখ, মাথার চুলগুলো এলোমেলো। স্কুল মাঠে সে যে রকম ছিল সত্যিকার অর্থেই তার চেয়ে এখন অনেক পাল্টে গেছে। তার মুখের কিনারে ভাঁজের চিহ্নটা সুখ আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কথাই বলে দিচ্ছে।
‘আরে কি খবর ওমর! তুমিতো অনেক পাল্টে গেছ। কিন্তু এটা ভালোই হয়েছে।’
‘আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে চিনতে পারবে না।’
তারা বেশ উষ্ণভাবে একে অপরের হাত ধরে ঝাকি দিল।
‘তুমি তো বিশাল দানবের মতো হয়ে গেছ। সব সময় তুমি বেশ লম্বা ছিলে। আর এখন ওজন বেড়ে হয়ে গেছ বিশাল আকৃতির।’ ডাক্তার ওমরের দিকে মাথাটা তুলে বলল।
ওমর বেশ খুশি হয়ে বলল, ‘আসলেই আমি ভাবিনি যে তুমি আমাকে মনে রাখবে।’
‘কিন্তু আমি তো কাউকে ভুলে যাইনি। তাহলে তোমাকে কিভাবে ভুলে যাব বন্ধু।’
ডাক্তারের পক্ষ থেকে অভিবাদনটা ছিল সত্যিকার অর্থেই মনে রাখার মতো। হাজার হোক সে এখন সামাজিকভাবে যে অবস্থানে আছে সেখান থেকে দূরের কাউকে মনে রাখার কথা না।
ডাক্তার ওমরকে ভালো করে দেখতে দেখতে বলল, ‘তুমি সত্যিকার অর্থেই মুটিয়ে গেছ। তোমাকে এখন জাদরেল ব্যবসায়ী মনে হচ্ছে। সিগারেট ছাড়া আগের সব অভ্যাসই কি ছেড়ে দিয়েছ?’
ডাক্তারের কথায় ওমর হাসল। বেশ লাজুক হাসি। তার চোখের ভ্রূ দুটি বেশ নড়ে চড়ে উঠল।
‘ডাক্তার তোমার সাথে আবার দেখা হওয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছি।’
‘আমিও তোমাকে পেয়ে খুব খুশি। যদিও আমার দেখা পাওয়াটা খুব আনন্দের বিষয় না।’
ডাক্তার তার নিজের ডেস্কের সামনে চলে গেল। সেখানটা নানা ধরনের বই পুস্তক, কাগজপত্রে ভরা। ডাক্তার ওমরকে বসতে ইশারা করল।
‘ঠিক আছে এখন আমরা পুরনো স্মৃতি না কপচিয়ে আগে তোমার স্বাস্থ্যগত অবস্থাটা নিশ্চিত হয়ে নেই।’
ডাক্তার কেস হিস্ট্রির খাতাটা খুলে নিয়ে সেখানে লেখা শুরু করল।
‘নাম : ওমর আল হামযাবি, পেশা : ওকালতী, বয়স?’
ডাক্তার ওমরের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর নিজেই উত্তর দিল।
‘ভয় নেই। আমরা দুজনেই একই অবস্থায় আছি।’
‘পয়তাল্লিশ।’
‘দেখ স্কুল জীবনে একটা মাস বড় ছোটকে আমরা কি গুরুত্বই না দিতাম। আর এখন কে এসব নিয়ে ভাবে। তোমার পরিবারে কোনো বিশেষ রোগের ইতিহাস আছে কি?’
‘নাহ। তবে ষাটের পরে তুমি ব্লাড প্রেসারের বিষয়টা ধরে নিতে পার।’
ডাক্তার তার হাতটা ভাঁজ করতে করতে বলল, ‘এবার তোমার রোগের বিষয়ে আমি কি বলি শোনো।’
ওমর মাথার ঘন কালো চুলে হাত বুলালো। খুব গভীরভাবে সেখানে তাকালে ফাঁকে-জোকে দু-একটা সাদা চুল দেখা যায়।
সে বলল, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে স্বাভাবিকভাবে আমার কোনো রোগ আছে।’ ডাক্তার খুব মনোযোগের সাথে ওমররের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি সাধারণ কোনো উপসর্গের কথা বলছি না।’
‘তাহলে’
‘আমি একটু অন্য ধরনের কিছু একটা ধারণা করছি।’
‘সত্যিই এমন কিছু হয়েছে নাকি?’
‘সেরকম ধারণাই করছি।’
‘এটা মনে হয় অধিক পরিশ্রমের কারণে হতে পারে।’
‘কিন্তু আমারতো তা মনে হচ্ছে না।’
‘ঠিক আছে তুমি ভালো করে পরীক্ষা করে বলো কি অবস্থা। এ ছাড়া অন্য ভাবেতো তুমি আর আমাকে সম্মানিত করতে পারবে না।’
‘আসলে আমি নিজেও সব সময় কাজ করতে পছন্দ করি না।’
‘তারপর। চালিয়ে যাও।’
‘এটা কোনো অবসন্নতা বা ক্লান্তি থেকে নয়। আমি মনে করি প্রচুর কাজ আমি করতে পারি। কিন্তু মূলত আমার সব সময়ই কাজ করতে হবে এমন কোনো ইচ্ছা নেই। এখন আমার অফিসে একজন ল’ ইয়ারকে সাহায্য করার জন্য আমি কাজ থেকে বিশ্রাম নিচ্ছি। আমার জমে থাকা কাজগুলো যদিও কয়েক মাসের জন্য ঝুলে যাবে।’
‘তুমি কি কোনো বিশ্রামের কথা কখনো চিন্তা করো না?’ ওমর কথা বলে যেতে লাগল যেন সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
‘বেশ কিছু দিন আগে আমি আমার জীবন নিয়ে, পরিবার নিয়ে আশেপাশের লোকজন নিয়ে বেশ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরিস্থিতি আমার কাছে এতই জটিল হয়ে পড়েছিল যে আমি এগুলো নিয়ে একদম চুপ ছিলাম।’
‘সমস্যাটি কি চলে গেছে না….?’
‘সমস্যাটি আসলেই খুব জটিল ছিল। আমি কোনো কিছু ভাবতে চাইতাম না, চিন্তা করতে পারতাম না, চলাফেরা করতে ইচ্ছা হতো না, কোনো কিছু অনুভব করতে ইচ্ছা করত না। সব কিছুই আমার কাছে কেমন ছাড়া-ছাড়া খণ্ড-খণ্ড আর অহেতুক মনে হত। আমি এখানে আসলাম যে আসলেই কোনো শারীরিক সমস্যা হয়েছে কিনা সেটা দেখতে।’
তার কথা শুনে ডাক্তার হেসে বলল, ‘এটা কতই না ভালো হতো যদি আমরা খাওয়ার পরে কিংবা ঘুমানোর আগে দানার মতো একটা টেবলেট খেয়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করতে পারতাম।’
ডাক্তার আর ওমর একসাথে পরীক্ষানিরীক্ষার কক্ষে ঢুকল।
ওমর জামাকাপড় খুলে পরীক্ষা করার ছোট্ট খাটিয়ার উপর শুয়ে পড়ল। ডাক্তার পরীক্ষা করার স্বাভাবিক কাজগুলো করছিল। ডাক্তার ওমরের প্রসারিত জিহ্বা দেখল। চোখের ভ্রূ হাত দিয়ে খুলে চোখের মণি পরীক্ষা করল, তার রক্তচাপ মাপ নিল, দক্ষ মার্জিত আঙ্গুল দিয়ে ডাক্তার ওমরের পিঠ, বুক, পেটে চাপ দিয়ে কিছু একটা পরীক্ষা করল। তারপর স্টেথিস্কোপ দিয়ে ওমরের শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করল। ওমর বেশ লম্বা করে শ্বাস নিয়ে ‘আহ!’ শব্দ করে শ্বাস ফেলল। এভাবে বেশ কয়েকবার শ্বাস নিল। সে ডাক্তারের চোখের দিকে খুব আড়চোখে তাকিয়ে ডাক্তারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না।
পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ হলে ডাক্তার তার অফিস রুমে ঢুকল। কিছুক্ষণ পর ওমর ডাক্তারের কক্ষে ঢুকল। ডাক্তার তখন বসে ওমরের প্রস্রাব পরীক্ষার রেজাল্ট কি হয়েছে সেটা দেখছিল। ওমরকে দেখে ডাক্তার তার হাত দুটো ঘষতে ঘষতে বেশ ছড়ানো একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার প্রিয় আইনজ্ঞ বন্ধু তোমার আসলে কিছুই হয়নি।
ওমর তার নাকটা ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে প্রশস্ত চেহারায় বলল, ‘কিছুই হয়নি?’
‘কিছুই না।’ ডাক্তার নিশ্চয়তা দিল। কিন্তু আবার বেশ সতর্কতার সাথে বলল, ‘তবে আমি মনে করি সমস্যাটা আসলে আরো বেশি জটিল।’ তারপর সে গলা উঁচিয়ে হাসতে লাগল। ‘এটা যদিও এমন কোনো সমস্যা না যেটার কারণে তোমাকে দ্বিগুণ ফিস দিতে হবে।’
ওমর বেশ আশাবাদী হয়ে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে হাসল।
‘তো ঠিক আছে। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু…?’
ওমর বেশ অস্থিরভাবে বলল, ‘তাহলে কি কোনো মনোচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যেতে হবে নাকি?’
‘না কোনো মনোচিকিৎসক কিংবা কারো কাছেই যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’
‘সত্যি বলছ?’
‘হ্যাঁ। তবে তোমাকে বুর্জোয়া রোগে ধরেছে। ধনী মানুষের রোগ। আমাদের সংবাদ-পত্রগুলো এই নামটাই বেশি ব্যবহার করে। তুমি আসলে অসুস্থ নও।’ ডাক্তার আস্তে আস্তে বলতে লাগল। কিন্তু আমি তোমার মাঝে রোগের চেয়েও আরো বেশি কিছু প্রকট আকারে দেখেছি। এই ধরনের অবসন্নতা তুমি কতদিন ধরে অনুভব করছ?’
‘দুই মাস বা তার চেয়ে একটু বেশী হবে। তবে গত মাসটা নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় গেছে।’
‘ঠিক আছে তোমাকে আমি যেমন দেখলাম সে অনুযায়ী বলছি। তুমি একজন সুখী, সমৃদ্ধিশীল ধনী লোক। তুমি সত্যিকার অর্থেই ভুলে গেছ কিভাবে হাঁটতে হয়। তুমি সবচেয়ে ভালো খাবার খাও, দামি পানীয় পান করো, আর প্রচণ্ড কাজের চাপে নিজেকে ডুবিয়ে রাখো। তোমার মস্তিষ্ক সব সময় মানুষের সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থাকে। কারণ তুমি একজন আইনবিদ। তোমার কাজের ভবিষ্যৎ আর অর্থনীতির দুশ্চিন্তা দুটোই তোমাকে ব্যস্ত রাখছে।’
ওমর হাল্কা মৃদু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ তুমি বাস্তব চিত্রটাই এঁকেছ। কিন্তু আমিতো এখন সব কিছু থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি।’
‘হ্যাঁ সব ঠিক আছে। এখন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু শত্রু তোমার আশেপাশে এখনো অপেক্ষা করছে।’
‘ইসরায়েলের মতো?’
‘তুমি যদি এখন থেকেই সতর্ক না হও তাহলে ভয়ংকর কোনো বিপদ ঘটে যেতে পারে।’
তাহলে আমরা এখন ঠিক সময়টাতেই আছি কি বলো।’
‘পরিমিত খাও, নানা ধরনের পানীয় পান করা কমিয়ে দাও, বেশি বেশি হাঁটা- চলা করো। তাহলে বিপদ অনেক কেটে যাবে।’
ওমর চুপ করে কথা শুনছিল, অপেক্ষা করছিল ডাক্তার আর কিছু বলে কি না। কিন্তু ডাক্তার কিছুই বলল না। তখন ওমর বলল, ‘তুমি কি আমার জন্য কোনো ঔষধপত্রর দিয়েছ?’
‘না। তুমি তো গেয়ো কোনো রোগী নও যে তোমাকে ঔষধ লিখে না দিলে তুমি আমার ডাক্তারিকে পাত্তাই দিবে না। এমন ঔষধ যেটা তোমার কোনো উপকারেও আসবে না, আবার ক্ষতিও করবে না। তুমি বরং আমার কথা শোনো। ঔষধ তোমার হাতেই আছে। তুমি নিজেই এর ঔষধ।’
‘আমি আবারো নিজেই নিজের পথ্য হতে যাচ্ছি?’
‘সেটাই ভালো।… … দেখো আমার শত কাজ সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, হাসপাতাল, ক্লিনিক এই সব কিছু করেও আমি প্রতিদিন কমপক্ষে আধঘণ্টা হাঁটাচলা করি। আর আমার খাবারের দিকে সব সময় নজর রাখছি।’
‘আমিতো কখনো সামনের বছরগুলো নিয়ে ভাবিনি।’
‘বুড়ো কালটাই একটা রোগ। তুমি শত চেষ্টা করেও একে ঠেকাতে পারবে না। তুমি কি জানো ষাটের উর্ধ্বে অনেক যুবক আছে। তুমি আসল কথা হলো জীবনকে উপলব্ধি করা। জীবনটাকে বুঝতে চেষ্টা করা।
‘শুধুই জীবনকে বুঝতে চেষ্টা করা?’
‘আমি অবশ্যই কোনো দার্শনিকের মতো কথা বলছি না যেটা বুঝতে তোমার কষ্ট হবে।
‘কিন্তু তোমার চিকিৎসাটাতো একধরনের দার্শনিক চিকিৎসার মতোই হয়ে গেল। তোমাকে যদি কেউ জীবনের অর্থের কথা জিজ্ঞেস করে তাহলে তার উত্তর দেয়াটা তোমার জন্য কি কঠিন হবে না?’
এই কথায় ডাক্তার বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল।
‘আমার কি অত সময় আছে। প্রতি ঘণ্টায় যে সমস্ত সমস্যা নিয়ে লোকজন আমার কাছে আসে আমি তার সমাধান করতে করতেই শেষ। সেখানে এই প্রশ্নের কোনো প্রয়োজনই নেই।’ ডাক্তার তারপর বেশ আন্তরিকভাবে বন্ধুসুলভ পরামর্শ দিল। ‘তুমি একটু বিশ্রাম নাও।’
‘আমার বিশ্রাম আসলেই খুব দুরূহ। কেননা গ্রীষ্মের এই সপ্তাহগুলো খুব লম্বা কাজের ভেতর থাকবে।’
‘আমি সত্যিকার অর্থের কোনো বিশ্রামের কথা বলছিলাম। তোমার জীবনাভ্যাস পাল্টে ফেল। নতুন কিছু চর্চা করো। দেখবে তখন নতুন কিছু পেয়ে গেছ।
‘আসলেই কি এমন হবে।’
‘আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। হতে পারে এটা তোমার জন্য অদৃশ্য থেকে কোনো নির্দেশনা। তোমার এই মুহূর্তে আরো চল্লিশ পাউন্ড ওজন কমানো দরকার। তবে তাড়াহুড়া করে নয়। আস্তে আস্তে।’
ওমর হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু ডাক্তার তাকে তাড়াতাড়ি বাধা দিল।
‘দাঁড়াও। তুমি ছিলে আজকের সর্বশেষ রোগী। এখন আর কোনো কাজ নেই। চলো কিছুক্ষণের জন্য আড্ডা দেই।’
ওমর হাসতে হাসতে আবার বসে পড়ল।
‘ডা: সাবরি তুমি কি চাচ্ছ আমি বুঝতে পারছি। তুমি চাচ্ছ ভাঁজ পড়ে যাওয়া পচিশ বছর আগের দিনগুলোকে আবার সাজাতে আর হৃদয় খুলে হাসতে।’
‘আহ! কি দিনগুলোই না ছিল তখন।’
‘ডাক্তার আসলে ‘এখন’ এই সময়টা ছাড়া অতীত হয়ে যাওয়া সবগুলো সময়েরই একটা বাড়তি আবেদন সব সময় থাকে। সেই সময়গুলোই আসলেই অনেক সুন্দর।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ। স্মৃতি এক জিনিস আর অভিজ্ঞতা অন্য জিনিস।’
‘সুতরাং এই সব কিছুই অতীত হয়ে গেছে। আর অর্থহীনভাবে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’
‘আমরা জীবনকে ভালবাসব। এটাই হলো আসল অর্থ।’
‘গত দিনগুলোতে জীবন আমার কাছে বড় বেশি অসহনীয় আর বিরক্তিকর মনে হয়েছে।’
‘আর এখন তুমি তোমার হারিয়ে যাওয়া ভালবাসাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ। আচ্ছা বন্ধু তোমার কি ছাত্রজীবনের রাজনীতি, মিছিল সমাবেশ আর স্বপ্নরাষ্ট্র নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার দিনগুলোর কথা কি মনে পড়ে?’
‘অবশ্যই। কিন্তু সেই দিনগুলোতো অতীত হয়ে গেছে। আর এখন সেগুলো শুধু শোনাই যাবে।’
‘হ্যাঁ সেই সময় কত বড় স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলাম। আমি বলতে চাচ্ছি একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা।’
‘হ্যা.. .. ..।’
ডাক্তার হাসল।
‘ওমর তুমি আসলে অনেকগুলো চেহারার একজন মানুষ। একজন খাঁটি সমাজতান্ত্রিক, জাদরেল উকিল, তবে তোমার যে চেহারাটা আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে তা হলো ওমর একজন কবি।’
এই কথা শুনে ওমর একটু হেসে নিজেকে যেন গোপন করতে চাইল। ‘ঐটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঘটেছিল।’
‘তুমি কি কবিতা ছেড়ে দিয়েছ?’
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু আমার যত দূর মনে পড়ছে তুমি একটা কবিতার বই বের করেছিলে।’
ওমর তার চোখ দুটো নামিয়ে ফেলল। ফলে ডাক্তার তার মানসিক চাপ আর যন্ত্রণার কথা ধরতে পারল না।
‘ঐটা ছিল এক ধরনের ছেলেখেলা।’ ওমর বলল।
‘আমার কিছু ডাক্তার বন্ধু কবিতা রোগ থেকে দূরে থাকার জন্য ঔষধ দিয়ে থাকে।’
বাজে পঁচা এক আবহাওয়ার মতো স্মৃতির এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা ওমরকে বিরক্ত করছিল। সে মনে প্রাণে চাইছিল ডাক্তার যেন প্রসঙ্গটা পাল্টায়।
‘আমাদের এক বন্ধুর কথা মনে পড়ছে। তার নাম ছিল মোস্তফা মিনাবি। কিন্তু তোমার কি মনে আছে আমরা তাকে কি নামে ডাকতাম?’
‘ছোট টাক্কু। আমরা আসলেই খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। সে এখন খুব নামকরা একজন সাংবাদিক। রেডিও টেলিভিশনের জন্য দুই হাতে লিখে যাচ্ছে।’
‘আমার স্ত্রী তার ভীষণ ভক্ত। সেও তোমার মতো সমাজতান্ত্রিক ছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতবদ্ধ কর্মী ছিল নিঃসন্দেহে ওসমান খলিল।’
ওমরের চেহারাটা যেন বেদনাদায়ক স্মৃতির মেঘে মুহূর্তেই ঢেকে গেল। সে বিড়-বিড় করে বলল, ‘ওসমান এখন কারাগারে।’
‘হ্যাঁ সে দীর্ঘ দিন কারাগারে ছিল। সে কি তোমার ল বিভাগের সহপাঠী ছিল না?’
‘আমরা এক সাথেই গ্রাজুয়েশন করেছিলাম। মোস্তফা, ওসমান আর আমি। অতীতকে আমার ভালো লাগে না।
ডাক্তার তার কথার সমাপ্তিতে বলল, ‘সুতরাং আজ থেকে ভবিষ্যৎকে ভালবাসতে থাকো। এখন থেকে তুমিই তোমার চিকিৎসক।’
বিশ্রাম ঘরে ওমর আবার ছবিটার দিকে চোখ তুলে তাকাল। কিশোরটা ঘোড়ার পিঠে বসে আছে। আর সে এক পলকে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বিস্তৃত দিগন্তই কি কিশোরটির দুর্বোধ্য রহস্যময় হাসির কারণ। দিগন্তটা অনেক দূরে পৃথিবীর সাথে মিশে গেছে। কেন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারকারশ্মিগুলো আকাশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক প্রশ্নই আছে কোনো ডাক্তারই তার উত্তর দিতে পারবে না।
বিশাল অট্টালিকার বাইরে সোলায়মান বাদশা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা তার কালো কেডিলাক গাড়িটিতে চড়ে বসল। আর গাড়িটা নীল নদের জাহাজ যেভাবে ভেসে চলে সেভাবে তাকে নিয়ে বের হয়ে গেল।
