ভিখারি – ৭

সাত

“তোমাকে যতই দেখি ততই পাবার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে
এর সাথে জ্বলে উঠে কামনার আগুন”

.

‘খুবই হৃদয়বিদারক গান। গায়িকাটা কে?’

‘মার্গারেট.. .. আধুনিক প্যারিসের সংগীত তারকা।’

নতুন চাঁদের আকৃতির বাগানের মধ্যে নাচের মঞ্চটা শরতের বাতাস দিয়ে শীতল হয়েছিল। লাল রংএর দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করা একটা মঞ্চ থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছিল। মঞ্চটা নানা রং-এর বাতির আলো দিয়ে সজ্জিত করা।

‘গায়িকাটাকে দেখতে ইংলিশদের মতো মনে হয়।’

‘নাইট ক্লাবের মালিকেরা এটাকেই দাবি করে থাকে..। তার চেহারার রেখাগুলো, তার চোখের নির্দিষ্ট চাহনি, তার চলাফেরার ভঙ্গি এই সব কিছুর মধ্যেই একটা অনাবিল আনন্দের ছন্দ পাওয়া যায়।’

‘এই অপরিমেয় আনন্দের দক্ষতায় আমি সত্যিই তোমার প্রশংসা করি।’

‘একটা ম্যাগাজিনের আর্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকায় এটা করা আমার কাজেরই একটা অংশ।’

‘ব্রাভো…তুমি তার নাম বললে মার্গারেট।’

সে হেসে উত্তর দিল, ‘অথবা একরাতের জন্য বিশ পাউন্ড। মদের হিসাব এর মধ্যে ধরা হবে না।’

শরতের মৃদু বাতাস যেন কোনো অজানা জগৎ থেকে অভিবাদন নিয়ে ভেসে আসছিল। যে জগতে একজন মাত্র বাস করে আর সে জগতের চারটা কোণা চিরহরিৎ গাছের ছায়ার উপর দাঁড়িয়ে।

‘আমি এখন এমন একটা মানসিক অবস্থায় আছি যেখানে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।’

‘তুমি কিন্তু এক গ্লাসের বেশি পান করো না।’

‘প্রথম যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো মেয়েটাকে আমার টেবিলে আমন্ত্ৰণ জানাতে হবে।’

মোস্তফা ওয়েটারের খোঁজে উঠে গেল। লিলি ফুলের সুঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সে চমকপ্রদ একটা জীবনে প্রবেশ করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। আশ্চর্যরকম দেখতে সব মানুষগুলো তার চোখের সামনে দিয়ে ঘুরাঘুরি করছে। সে নিজেই নিজেকে কৈফিয়তের সুরে বলছিল যে যা দেখছে এখন সব তার অসুস্থতার প্রভাবেই দেখছে।

মার্গারেট তার সন্ধ্যাকালীন গাঢ় রং-এর গাউনটা পরে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তাদেরকে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে অভিবাদন জানালো। হাসির কারণে মুক্তোর মতো বাঁধানো দাঁতগুলো দেখা গেল।

তার ঠিক পেছনেই ওয়েটার দাঁড়িয়ে ছিল।

‘শ্যামপেন।’ ওমর নির্দেশ দিল।

তুমি এটা প্রথম তোমার বিয়ের রাতে পান করেছিল। এটা খুব সস্তা একটা ব্রান্ড। মোস্তফা আর ওসমান যৌথভাবে এটা তোমাকে উপহার দিয়েছিল। তোমার এই অদ্ভুত রোগ তুমি যদি বন্দিদের কাছে প্রকাশ করো তাহলে তাদের কিইবা করার আছে?’

মোস্তফা এমনভাবে মেয়েটাকে অভিবাদন জানালো যেন সে অনেক আগে থেকেই তাকে চেনে।

‘মিস মার্গারেট।’ সে বলল। ‘আপনার কণ্ঠস্বর আমাদের দুজনকেই মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে আমার বন্ধু আপনার ব্যক্তিত্বে ও সৌন্দর্যে বিশেষভাবে মুগ্ধ। সত্যি কথা বলতে কি সে যখনই আপনাকে দেখেছে তখনই তার ভেতরে কথা শেষ না করেই মোস্তফা হাসতে লাগল। তারপর আবার বলল, ‘আমার বন্ধু কিন্তু খুব খ্যাতিমান উকিল। তবে আমি আশা করি তার পেশাগত দক্ষতা আপনার প্রয়োজন পড়বে না।’

মার্গারেট শব্দ ছাড়া মুচকি একটা হাসি দিল। তারপর বলল, ‘আমি সব সময় এমন একজনকে চাই যে আমাকে রক্ষা করতে পারবে। একজন মেয়ে মানুষের ক্ষেত্রে এটাইতো স্বাভাবিক ঠিক না।’

ওমর একটু তোষামদের সুরে বলল যে সুরে সে দীর্ঘ দিন কথা বলে না।

‘তবে আপনার রূপ সৌন্দর্য আর কণ্ঠের সুরের বিষয়টা আলাদা।’

মোস্তফা বেশ ধূর্ততার সাথে তার নাটকীয় চোখ দুটি একটু নাচিয়ে বলল, ‘আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, সে কবি হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও তেমন মানসম্মত জায়গায় পৌঁছতে পারেনি।’

মার্গারেট ওমরকে বেশ সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করে বলল, ‘একজন কবি..! কিন্তু প্রত্যেকটা শব্দ বলার সময় তাকে তো বেশ শান্ত মনে হচ্ছে।’

কথার উত্তরে ওমর বলল, ‘এই জন্যই আমি খুব দ্রুত কবিতাকে ছেড়ে দিচ্ছি।’

‘এই জন্যই সে সৌন্দর্যকে একটা প্রতিষেধক হিসেবে গ্রহণ করেছে যা তাকে দীর্ঘ দিনের অসুখ থেকে মুক্তি দিবে যে অসুখে সে অনেক দিন ধরে কষ্ট পাচ্ছে।’

শ্যামপেনের বোতলটা খুলে গ্লাসে ঢালার পর গ্লাসগুলো থেকে শ্যামপেনের বুদবুদি উঠছিল।

‘তার মানে দাঁড়াচ্ছে আমি এক ধরনের ঔষুধ।’ মার্গারেট বলল।

মোস্তফা একটু হেসে খুব দ্রুত বলল, ‘হ্যাঁ  কেন নয়। রাতে ঘুমানোর আগে যেভাবে ঔষুধ খাওয়া হয় তেমনটা হতে সমস্যা কোথায়।’

‘এত তাড়াহুড়ো করবেন না। আপনি যত সহজে ভাবছেন রোগমুক্তি কিন্তু তত সহজে হচ্ছে না।’

ওমর তাকে নাচের আমন্ত্রণ জানালো। মার্গারেটের কোমর তার হাত দিয়ে পেচিয়ে ধরেছিল। খুব সুন্দর একটা সুঘ্রাণ তার চেতনাকে প্রায় আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে 1 গাছ আর তার ডালপালাগুলো নানা রংএর বাতির আলো দিয়ে অপরূপ সাজে সজ্জিত ছিল।

‘এটা খুবই সুন্দর আনন্দময় সুখী একটা মুহূর্ত।’

‘আপনি দেখতে যেমন লম্বা তেমনি খুব মুগ্ধকর।’

‘আপনি নিজেও কিন্তু দেখতে খাটো নন।

‘কিন্তু আপনার তীক্ষ্ণ চোখ কেমন ভয় ধরিয়ে দেয়।’

‘এগুলো এখন আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু আমি ভালো নাচতে পারি না। আমি এই সব ভুলে গেছি।’

‘কিন্তু আপনি সুন্দর নাচের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ লম্বা আছেন।’

‘আধুনিক প্যারিসে একটা ক্লাবে আমার বন্ধু যখন আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিল তখনো সে এই রকম কথা বলেছিল।’

‘তাই নাকি।’

শরতের এই মৃদু বাতাসে কত সুন্দর করেই না মিথ্যা কথাগুলো আসছিল। তারা দুজন যখন নিজ নিজ আসনে এসে বসল তখন মোস্তফা তাদের হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানালো।

ওমরের চোখে মুখে বালকসুলভ একটা হাসিখুশি ভাব দেখা যাচ্ছিল। কয়েকটা মুহূর্তের জন্য সে রাতের সৌন্দর্যে সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল।

মার্গারেট ওমরের বা হাতের আংটিটা স্পর্শ করে বিড়বিড় করে বলল, ‘বিবাহিত আপনারা বিবাহিতরা সত্যিই অবিবাহিতদের জন্য কোনো সুযোগই রাখেননি।’

মোস্তফা হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনারা দুজন খুব শিগির এক হয়ে যাবেন। আমি বাজি ধরতে পারি আজ রাতে আপনারা একসাথে বের হবেন।

‘আপনি বাজিতে হেরেছেন।’ মার্গারেট বলল।

‘কেন মাননীয় মার্গারেট। আমাদের আইনজ্ঞ বন্ধু দেরি সহ্য করতে পারে না।’

‘তাহলে তাকে অবশ্যই কিছু শিখতে হবে।’

তাদের কথার মাঝখানে ওমর খুব নরমভাবে বলল, ‘যে কোনো পরিস্থিতিতে আমার গাড়ি আপনি যেখানে চান সেখানে নামিয়ে দিতে পারবে।’

মার্গারেট যখন ওমরের গাড়িতে উঠল তখন ওমর খুব উদ্দীপ্ত হয়ে পড়ল।

‘কোথায় যাব?’

‘এথেন্স হোটেলে।’

‘আপনি কি মধ্যরাতের পর পিরামিডের সৌন্দর্য দেখেছেন?’

‘আজকের রাতটা অনেক অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই।’

সে গাড়িটা পিরামিডের পথে ঘুরিয়ে নিল।

নগর সভ্যতা আমাদের রাতের অপরূপ রূপ দেখা থেকে বঞ্চিত করেছে।’

‘কিন্তু …’ মার্গারেট বলল।

ওমর পুনরায় নিশ্চয়তার সুরে বলল, ‘আমি একজন আইনবিদ। কোনো প্লেবয় না কিংবা বড় রাস্তার ডাকাতও নই।’

সে এখন তার পরিবারের কথা মনে করতে পারে। জয়নাবের মুখ। এবং সত্যিকার অর্থে তার বিয়ের ছবিগুলোকেও যেগুলো সে গত দশবছরে একবারও খুলে দেখেনি।

ওমর আবার বলল, ‘পিরামিডের পাশে এই খোলা আকাশের নিচে কত ঐতিহাসিক আর বিখ্যাত সব ঘটনা ঘটেছে।’

মার্গারেট তার ঘারের উপর থেকে ওমরের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, দয়া করে আজকে যেন সেরকম কোনো বিখ্যাত ঘটনা না ঘটে।’

সে তার হাতটা মৃদু চাপ দিল।

মার্গারেট বলল, ‘সবচেয়ে ভালো হয় আমরা যদি গাড়ি থেকে না নামি। আর গাড়িটা যদি না থামে। আপনি কি দেখছেন না বাইরে কি শক্ত বাতাস।’

‘ভয় নেই আমরা গাড়ির ভেতর বেশ ভালো নিরাপদ।

আহ! রাতের আঁধার কিভাবে আমাদের চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছে। তোমার আত্মা ভালবাসার জন্য আর পরমআনন্দে আকুল হয়ে আছে।

‘আমরা কেন আজকের রাতটা এখানে কাটাতে পারি না?’

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখেন আর বোঝার চেষ্টা করেন। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলেন।’

‘আপনিতো কখনোই শুনেননি যে রাতের বেলা পিরামিডে কত কিছুই না হয়ে থাকে।’

‘আপনি আগামিকাল আমাকে এই ব্যাপারটা বলবেন।’

তারা একে অপরে চুমু খেল। ওমর মার্গারেটের গলায় চুমু খেয়ে আবার সাথে সাথেই সচেতন হয়ে উঠল। মরুভূমির উপর দিয়ে তার গাড়িটা আবার চালানো শুরু করল।

‘দয়া করে আমার আচরণে রাগ কররেন না।’ মার্গারেট বলল।

‘আমি আসলে অভ্যন্তরীণ কিছু অবস্থার কাছে বশ্যতা স্বীকার করছি।’

‘অভ্যন্তরীণ?’

‘আমি বলতে চাচ্ছি মেয়েলি সংক্রান্ত কিছু অবস্থা।’

‘সত্যি কথা বলতে কি আমি খুব ক্লান্ত আজ।’

‘আমিও। কিন্তু আমি আমাদের জন্য উপযুক্ত একটা জায়গা ঠিক করতে পারব।’

‘একটু ধৈর্য ধরেন। আমরা আগামীকাল আবার সাক্ষাৎ করি।

‘আমি কিন্তু সব ব্যবস্থা করতে পারব।’

‘একটু ধৈর্য ধরেন।’

‘আমরা কিন্তু একসাথে থাকতে পরব। আমি অনুভব করছি।’

‘ঠিক আছে।’ মার্গারেট রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল।

সে যখন বাড়িতে ফিরে এল তখন প্রায় সকাল হয়ে গেছে। লিফটে উঠতে উঠতে সে ভাবছিল তার বাবা তাকে বাড়িতে রাত করে ফেরার জন্য কত না তিরস্কার করত।

শোয়ার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সে দেখল জয়নাব চেয়ারে বসে তার দিকে খুব নিভু নিভু আর দুঃখী চোখে তাকিয়ে আছে।

সে খুব শান্ত ভাবে বলল, ‘তোমার ঘুমিয়ে পড়া উচিত ছিল।’

জয়নাব হতাশ হয়ে তার হাত দুটো নেড়ে বলল, ‘এটা তৃতীয় রাত তুমি এত দেরি করে ফিরেছ।’

সে কাপড় না খুলেই দূর থেকেই দাঁড়িয়ে বলল, ‘এটা খুব দরকার ছিল।’

জয়নাব খুব তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, ‘ঘর কি তোমাকে বিরক্ত করছে?’

‘না সেরকম না। কিন্তু এটা সত্য যে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি।’

‘তো শুনি তুমি কিভাবে রাতটা কাটালে।’

‘কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় না। এই সিনেমা হলে ছবি দেখলাম, কফি হাউজে কফি খেলাম, গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম।’

‘আর আমার মাথার ভেতর তোমার এই সবই ঘুরপাক খাচ্ছিল।’

‘কিন্তু তোমার উচিত ছিল ঠাণ্ডা একটা ঘুম দেয়া।’

‘শেষ পর্যন্ত মনে হয় আমিও অসুস্থ হয়ে যাব।’

‘আমার কথা অনুযায়ী চলো।’

জয়নাব খুব গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি আমার সাথে খুব ভয়াবহ ঠাণ্ডা আচরণ করছ।’

এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। তোমার পুরাতন সত্তাটার চামড়াটা খসে পড়েছে। এখন সে রহস্যময় কোনো আহ্বানের জন্য দিগ্‌বিদিক হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। সে তার পাশে গতকালের সব আনন্দ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, তার আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ফেলে দিয়ে এমনকি যে বালিকাটার তারুণ্যের রূপ যখন চার্চের ঘণ্টা বাজছিল তখন একটা বিশেষ প্রতিক্রিয়া তৈরী করেছিল তাও ভুলে গেছে। এমন কি একসময় তুমি সেই সবুজ চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে বলতে, ‘ভালবাসা হলো অকুতোভয় নিৰ্ভীক।’

জয়নাব তোমার সাথে মিশে বিড়বিড় করে বলল, ‘কিন্তু আমার পরিবার।’

‘আমিই তোমার পরিবার। আমিই তোমার একমাত্র পৃথিবী। মহা বিচারের দিন পর্যন্ত আমরা এক সাথেই থাকব।’

আজকে তোমার জীবনটা খুব সস্তা একটা গানের কারণে প্রায় ঝুলে পড়েছিল। জয়নাব তুমি তোমার জন্য আর আমার জন্য ঘুমিয়ে পড়ো।

অন্যদিকে আরেকজন মেয়ে মানুষ লাল একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইছে

“তোমাকে যতই দেখি ততই পাবার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে
এর সাথে জ্বলে উঠে কামনার আগুন”

সে মোস্তফার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘মার্গারেট কোথায়?’

মোস্তফা বলল, ‘একটা চমক আছে?’

‘কি সেটা?’

‘সে চলে গেছে।’

‘কোথায়?’

‘মহা পৃথিবীতে।’

‘বিষয়টা কি খুব অনাকাঙ্ক্ষিত হলো না?’

মোস্তফা অবজ্ঞাভরে তার হাতটা একটু ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘চলো আমরা অন্য কাউকে খুঁজে বের করি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *