ভিখারি – ১৩

তেরো

ভালবাসার উন্মাদনা কখনো স্থায়ী হয় না আর যৌনতাড়না সেটাও সংকুচিত হয়ে আসে। যদিও এদের প্রভাব থেকে যায়। আমাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্য যদি কোনো খাবার না পাই তখন আমরা কিই বা করতে পারি?’ তুমি হয়তো একটি ভংয়কর ঝড়ে ভেসে যাবে আর ধ্বংস হয়ে যাবে। এই স্থিরতা মরে গেছে আর একে ফিরিয়ে আনার কোনো পথ নেই।

বাদামি তাম্রবর্ণের এক নর্তকী নিউ প্যারিস ক্লাবে তাকে মুগ্ধ করেছিল নিজের হাল্কা পাতলা শরীর আর প্রফুল্লতা দিয়ে। সে মার্গারেটকে দেখেছিল মঞ্চে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার পর সে এই তাম্রবর্ণকে তার টেবিলে আমন্ত্রণ জানালো। মার্গারেটের কাছে এটা খুব একটা অপটু ভালবাসার খেলা মনে হয়েছিল। কিন্তু সে এই ঝড়ে সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে। পিঙ্গল বর্ণের মেয়েটি তার সাথে ঘুরতে বের হয়ে গেল শুধুমাত্র টাকার জন্য। এটা খুব একটা ভালো বিষয় ছিল না। কিন্তু তার কাছে মনে হল মেয়েটা যখন হাসছে তখন তার অন্তর কেঁপে উঠছে। তার হৃদয়টা যদি আন্দোলিত না হয়ে উঠে তাহলে এটা মরে যাবে। কবিতা, মদ, ভালবাসা কোনোটাই বিস্মৃতিপ্রবণ এই পরমানন্দকে নিয়ে আসতে পারে না।

প্রতি রাতেই সে কোনো না কোনো ক্লাব থেকে একটা করে মেয়েকে সাথে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। কখনো কখনো রাস্তা থেকেও।

কাবরি ক্লাবে একদিন সে মুনা নামের একজন নর্তকীর সাথে বসল। ক্লাবের ম্যানেজার ইয়াযবেক তাকে দেখে অভিবাদন জানানোর জন্য দৌড়ে তার কাছে চলে আসল। ইয়াযবেকের এই আচরণ দেখে তার কাছে মনে হলো এটা আরেকটা মৃত্যুর ঘোষণা।

‘কি সৌভাগ্য আমার!.. মাননীয়..।’

ওমর তার দিকে তীব্র চোখে তাকিয়েই মুনাকে নিয়ে বের হয়ে গেল। সে যখন মুনাকে তার কাছে চেপে ধরল তখন তার ভেতরে মুনাকে হত্যা করার জন্য ভয়ংকর এক ইচ্ছা জেগে উঠল। সে ভাবছিল একটা ছুরি দিয়ে এখন মুনার বুকটা চিরে ফেললে খুব ভালো হতো। হঠাৎ করে বুঝতে পারল সে কি অন্বেষণ করছে। মৃত্যু হলো সৃষ্টি প্রক্রিয়ার আরেকটা কারণ, নিরবতার সমাপ্তি। আহ কি রহস্যময় চক্র।

‘কোনো সমস্যা। কি হয়েছে?’ মুনা বলল। সে হঠাৎ করেই যেন জেগে উঠল।

‘নাহ তেমন কিছু না। এই অন্ধকার।’

‘কিন্তু এখানে আমাদের পাশেতো কেউ নেই।’

সে পাগলের মতো দ্রুততায় তার গাড়িটা চালাতে লাগল। মুনা ভয়ে তার হাতদুটো চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল।

পরে বাড়িতে ফিরে সে যখন কাপড় পাল্টাচ্ছিল তখন ভাবছিল কিছুই নেই, সমাপ্তি চলে আসছে, পাগলামি অথবা মৃত্যু।

ওয়ারদা বিছানায় বসে ছিল।

‘আমি চলে যাচ্ছি।’ ওয়ারদা বলল।

সে খুব মোলায়েমভাবে উত্তর দিল, আমি তোমার সব কিছুর জন্য দায়ী 1 তোমার জন্য দায়িত্ব অনুভব করছি।’

‘আমি কিছুই চাই না।’ ওয়ারদা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ‘কি বাজে একটা ব্যাপার যে আমি সত্যি সত্যিই তোমাকে ভালবেসেছিলাম।’

সে বেশ উদ্বেগের সাথে বলল, ‘কিন্তু তুমি তো আমার সাথে ধৈর্য্যধারণ করতে পারলে না।’

‘আমার ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে।’

সে তার আত্মার ভেতর ওয়ারদাকে নিয়ে একটা অনুভূতি টের পেল। কিন্তু সে কিছুই বলল না।

পরের রাতে ঘরে ফিরে এসে সে যখন ওয়ারদার কোনো চিহ্নই খুঁজে পেল না তখন মনে মনে সে প্রশান্তির হাসি হাসল। বিছানায় শুয়ে সে পুরো ফ্ল্যাট জুড়ে নিরবতা আর শূন্যতাটাকে উপভোগ করতে থাকল। প্রতি রাতে সে একজন করে নতুন মেয়ে মানুষ নিয়ে ফ্লাটে উপস্থিত হয়।

মোস্তফা তাকে একদিন হাসতে হাসতে বলল, ‘বিশাল এই আফ্রিকা মহাদেশে বিখ্যাত নারী কামুককে স্বাগতম।’

ওমর মোস্তফার কথা শুনে খুব বিষণ্নভাবে হাসল। মোস্তফা তার কথা চালিয়ে যেতে থাকল।

‘বিষয়টা এখন আর গোপন নেই। আমার বেশ কয়েকজন সহকর্মী তোমাকে নিয়ে আলোচনা করেছে। ক্লাবগুলোতে তোমাকে নিয়ে খবরগুলি ছড়িয়ে পড়েছে। তোমার যৌনজীবন নিয়ে যে কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপারটা সবাইকে অবাক করেছে।’

ওমর খুব ঘৃণার সাথেই উত্তর দিল। ‘সত্যি করে বলছি আমি মেয়ে মানুষদের ঘৃণা করি।

মোস্তফা বলল, ‘তোমার ভেতরে যত অস্থিরতা আছে সেটাকে খালি করে দাও যাতে শেষ পর্যন্ত তুমি একটু স্থির হয়ে থাকতে পারো।’

বসন্ত কাল আসার পর সে নাইটক্লাবের বাইরের বাগানে ভেতরের হল রুমে বসার চেয়ে বেশ আরাম করেই বসতে পারল। তার ভেতরে অস্থিরতা যদিও ছিল আর স্বপ্ন দেখতে দেখতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তবে এর মাঝেই ভারতীয় আর ফার্সি কবিতা নিয়ে পড়াশুনা করে সে বেশ প্রশান্তি পাচ্ছিল।

রাতের এই অভিসারগুলোতে সে প্রায়ই কাবরি ক্লাবে যাওয়াআসা করত। এর মধ্যে একদিন সে কাবরি ক্লাবের তৈরী একটা মাচার নিচে বসেছিল। মদ খাচ্ছিল আর বসন্তে র বাতাস উপভোগ করছিল। তখনই সে দেখতে পেল ওয়ারদা মঞ্চে যাচ্ছে।

সে ভেতরে কোনো আবেগ, বিস্ময়, উত্তেজনা, কিংবা আনন্দের গমক টের পেল না। ওয়ারদা তাকে দেখল। সে নাচ শুরু করল। ক্লাবের ম্যানেজার ইয়াযবেক খুব উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়েছিল। শো শেষ হওয়ার পর সে ওয়ারদাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে তার টেবিলে ডাকল। ওয়ারদা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে প্রতি উত্তর জানালো। যেন তাদের মাঝে কিছুই হয়নি। সে খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্লাবগুলোতে আসলে যে সমস্ত পানীয়ের অর্ডার দেয় সেগুলো আনতে বলল। তারপর ওয়ারদার দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীরভাবে বলল, ‘ওয়ারদা আমি সত্যিকার অর্থেই খুব দুঃখিত।’

ওয়ারদা খুব হেয়ালিপূণভাবে হেসে বলল, ‘যা ঘটে গেছে তা নিয়ে তোমার দুঃখ প্রকাশ করা উচিত হবে না। তবে ভালবাসার অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থেই খুব চমৎকার যদিও এটা প্রচুর দুঃখ বয়ে নিয়ে এসেছে।’

ওমর ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে বলল, ‘আমি ভালো নেই।’

ওয়ারদা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে খোদার কাছে প্রার্থনা করো তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।’

তার চোখের সামনে ঐ সমস্ত মেয়েলোকগুলোর চেহারা ভাসতে লাগল যারা রাতের পর রাত তার সাথে বাড়িতে গিয়েছিল। ওয়ারদা তখনো হাসছিল। সে ওয়ারদার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘ওদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ছিল না।’

ওয়ারদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার ভ্রূ দুটি একটু উঁচু করল।

ওমর আবার বলল, ‘আমি তাদের সবাইকেই চিনতাম কিন্তু তাদের প্রতি আমার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না।’

‘তাহলে কেন?’

‘হতে পারে স্বর্গীয় কোনো মুহূর্ত এর উত্তর দিতে পারে।’

ওয়ারদা বেশ ক্রুদ্ধ হয়েই বলল, ‘তুমি কি নিষ্ঠুর। তোমরা পুরুষরা কখনোই ভালবাসতে পারো না।’

‘হতে পারে। কিন্তু আমার সমস্যাটা অন্য।’

কমলার মিষ্টি একটা ঘ্রাণ খোলা অন্ধকার মাঠ থেকে ভেসে আসছিল। সেই ঘ্রাণ হৃদয়ের অনুভূতিগুলোকে খুলে দিচ্ছিল। সে হঠাৎ করেই ওয়ারদাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওয়ারদা আমাকে বলো তুমি কেন বেঁচে থেকে জীবনযাপন করছ?’

ওয়ারদা তার কাঁধটাকে একটু ঝাঁকিয়ে পানীয়টা শেষ করল। কিন্তু উত্তরের আশায় সে আবার যখন প্রশ্ন করল তখন ওয়ারদা বলল, ‘এই প্রশ্নের কি কোনো মানে আছে?’

‘আমি প্রায়ই এই প্রশ্নটা করি এতে তো কোনো ক্ষতি নেই।’

‘আমি বেঁচে আছি। জীবনযাপন করছি। ব্যস হয়ে গেল।’

‘আমি তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কোনো উত্তর আশা করছিলাম।’ ওয়ারদা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আমি নাচতে ভালবাসি, প্রশংসা শুনতে ভালবাসি, আর আমি সত্যিকারের ভালবাসাকে খুঁজে বের করতে চাই।’

‘তাহলে তোমার কাছে জীবনের অর্থ হলো ভালবাসা।’

‘কেন নয়?’

‘একবার ভালবাসার পর আবার সেই ভালবাসায় কি তোমার ঘৃণা জন্মাবে না?’

ওয়ারদা বেশ বিরক্তির সাথেই বলল, ‘সেটা অন্য কারো জন্য সত্য হতে পারে।’

‘তাহলে তোমার জন্য কি?’

‘না আমার জন্য সত্য না।’

‘তুমি কতবার ভালবেসেছ?’

‘আমি তোমাকে এটা একবার বলেছি।’

ওমর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি একবার কি বলেছিলে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয়টা এখন খোলামেলা আলোচনা করতে চাই।’

‘তোমার আক্রমণাত্মক আচরণই মনে হচ্ছে সত্য এখন।’

‘তুমি কি তাহলে কথা বলতে চাচ্ছ না।’

‘আমার যা বলার বলে দিয়েছি। আমি তাকে…’

ওমর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হায় খোদা তাহলে এখানে তোমার অবস্থান কোথায়? তুমি তাকে নিয়ে কি ভাবছ?’

ওয়ারদা তার দিকে খুব সন্দেহপূর্ণ চোখে তাকালে ওমর আবার বলল, ‘ওয়ারদা দয়া করে উত্তর দাও।’

‘আমি তাকে বিশ্বাস করতাম।’

‘আসলেই কি?’

‘অবশ্যই।’

‘তোমার এই বিশ্বাস কোত্থেকে আসল?’

‘এটা আছে এবং এটাই যথেষ্ট।’

‘তুমি কি প্রায়ই তার সম্পর্কে ভাব।’

ওয়ারদা বেশ শব্দ করে হাসল। তারপর বলল, ‘যখনই আমার প্রয়োজন হয় তখনই।’

‘এ ছাড়া অন্য সময়।’

ওয়ারদা এবার বেশ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, ‘তুমি শুধু আরেকজনকে কষ্ট দিতেই ভালবাস। বাস না?’

ওমর রাত তিনটা পর্যন্ত ক্লাবে থাকল। তারপর নিজের গাড়িটাকে পিরামিডের রাস্তায় ছুটিয়ে নিয়ে গেল। রাতে একা একা বের হয়ে সে আশ্চর্য একটা উন্নতি নিজের মাঝে টের পেল। সে গাড়িটাকে মরুভূমির রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে অন্ধকারে বের হয়ে গেল। অন্ধকারটা ছিল খুব বেশি নিবিড়, ঘন। তার মনে পড়া অন্য কোনো রাতের মতো না। পৃথিবী আর মহাশূন্য তার কাছে মনে হয়েছিল অনুপস্থিত। আর সে যেন হারিয়ে গেছে অন্ধকারের মাঝে। সে মাথাটা উঠিয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে তাকাল। দেখতে পেল পশ্চিমে হাজার হাজার নক্ষত্র একা একা বিচ্ছিন্নভাবে আবার দলবদ্ধভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাল্কা মিহি নরম মিষ্টি একটা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছে। মরুভূমির বালুচর অন্ধকার কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। প্রজন্মের পর প্রজন্মের অসংখ্য আশা আকাঙ্ক্ষা তাদের সর্বশেষ জিজ্ঞাসা আর ফিসফিসানিগুলো লুকিয়ে আছে এখানে।

এই যে আমি এখানে এই নিরবতায় কিছু একটা বলার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আমি তো জানি চিৎকার করলে এখান থেকে কোনো প্রতি উত্তর ফিরে আসবে না। তাহলে কোনো জিনিস আমাকে চিৎকার করতে বাধা দিচ্ছে?

সে আবার তার গাড়ির কাছে চলে গেল। আকাশের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। আস্তে আস্তে অন্ধকারটা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। হাল্কা একটা রেখা ফুটে উঠছে। এটা ধীরে ধীরে আলোর তরঙ্গে রূপান্তরিত হচ্ছে। তার অন্তরটা হঠাৎ করেই এক ধরনের অজানিত আনন্দে নেচে উঠল। অন্তর থেকে ভয় আর শঙ্কা কেটে গেল। খুব উষ্ণ এক ধরনের সুখ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আনন্দের নৃত্য সমগ্র সৃষ্টিকে যেন জড়িয়ে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জেগে উঠল, তার অনুভূতিগুলি প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। সন্দেহ, সংশয়, ভয় সব কিছু যেন মাটি চাপা পড়ে গেল। তাকে হঠাৎ করে মনে হলো শক্তি, আত্মবিশ্বাসীর প্রতীক। তার মনে হচ্ছিল এখন সে যা ইচ্ছা করবে তাই অর্জন করতে পারবে। সে শক্ত হয়ে আবার দাঁড়াল। পৃথিবীটা ধুলোবালির মতো তার পায়ের নিচে পড়ে গেল। সে কিছুই করতে চাইল না।

আমি স্বাস্থ্য, শান্তি, নিরাপত্তা কোনো কিছুই চাই না। সমাপ্তিকে কাছে আসতে দাও। এটাই সব চেয়ে সেরা মুহূর্ত।

এই বিকারগ্রস্ততা তাকে আরো ছেকে ধরল।

সে গাড়িতে এসে বসল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো কাউকে যেন উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘এই হলো আনন্দ।’

সে একবার থামল। তারপর আবার বলা শুরু করল, ‘কোনো যুক্তি তর্ক ছাড়াই।’ তারপর আবার থেমে বেশ বড় একটা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘গোপনীয়তার ফিসফিসানি, অজানার প্রশ্বাস।’ তার গাড়ি চালু করে সে জিজ্ঞেস করল, এই জন্য পৃথিবীর সব কিছু কি ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *