এগারো
সে ওয়ারদাকে বেশ কৃতজ্ঞচিত্তে চুমু খেল।
‘আমি জানি চাকরিটা ছাড়তে তোমাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।’
ওয়ারদার চোখ দুটো পানিতে চিকচিক করছিল।
‘এটাতো শুধু তোমার জন্যই।’
পুব দিকে মুখ করা ঘরটায় তখন ভালবাসার সুবাতাস ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে কখনো কল্পনাও করেনি যে ওয়ারদাকে এত তীব্রভাবে কখনো ভালবাসতে পারবে। ওয়ারদা বেশ গাঢ় নীল রংএর একটা বাক্স তার গাউনের পকেট থেকে বের করে ওমরের দিকে দিয়ে বলল, ‘এটা একটা সোনার রিং তোমার কোর্টের সাথে পরার জন্য।
ওমর উপহারটা পেয়ে এমন উচ্ছ্বাস দেখালো যে সে কখনো স্বর্ণ দেখেনি কিংবা ব্যবহার করেনি।
‘আমার প্রিয়তমা!’
‘তুমি এই যে রিংটা দেখছ এটার দুটো অংশ আছে। দুটো হৃদয় স্বর্ণের।’
‘কেন হবে না। আমিতো আগেই বলেছি তোমার হৃদয়টাও স্বর্ণের তৈরী।’
ওয়ারদা তার আঙুলগুলো ওমরের ঘন কালো চুলের ভেতর বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আজ তোমার সমস্ত জামাকাপড় কেন সাথে করে নিয়ে আসলে?’
ওমরের চেহারায় কালো মেঘের ছায়া।
‘আমি চিরতরে আমার ঘর ছেড়ে চলে এসেছি।’
ওয়ারদা খুব বিস্মিত হয়ে বলল, ‘না এটা ঠিক হয়নি।’
‘এটাই একমাত্র সমাধান।’
‘কিন্তু আমিতো তোমাকে বলেছি আমি তোমার জন্য কোনো সমস্যা তৈরী করতে চাই না।’
‘ঠিক আছে এই বিষয়ে আর কোনো কথা না বলি।’
সকালের শান্ত আবহাওয়ায় ঘরের ভেতরে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে যখন নিজ বাড়িতে ফিরে এল তখন স্ত্রী জয়নাব তার দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকাল। তার মুখের মেকাপ চোখের পানিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
‘সত্যকে মেনে নেয়ার জন্য তোমার কিছু শিক্ষা নিতে হবে।’ ওমর বলল।
‘তার চেয়ে বলো তুমি একজন রক্ষিতার সাথে রাত কাটিয়ে এসেছ।’
‘আস্তে কথা বলো। তোমার উঁচু স্বর সবাইকে জাগিয়ে তুলবে।’
‘তাই। তোমার জামার কিনারে লিপিস্টিকের দাগটার দিকে তাকাও। কি বিশ্রী লাগছে দেখতে।’
ওমর বেশ রেগেমেগে চিৎকার করে বলল, ‘তাহলে এর পর কি হতে যাচ্ছে।’
‘তোমার এক মেয়ে বিবাহযোগ্য।’
‘আমি নিজে মৃত্যুর জন্য ছুটে বেড়াচ্ছি।’
‘তোমার কি লজ্জা হয় না ওমর? তোমার জন্য আমার নিজেরই লজ্জা হচ্ছে।’
তার ক্রোধ আরো বেড়ে গেল। সে উত্তরে বলল, ‘মৃত্যুকে গ্রহণ করা আরো বেশি লজ্জাজনক কাজ।’
জয়নাব মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বিশটা বছর তোমার নোংরামি না দেখেই কাটিয়ে দিলাম।’
ওমর পাগলের মতো বলল, ‘তাহলে এটার শেষ হতে দাও।’
‘আমি দুচোখ যেদিকে চায় সেদিকে চলে যাব।’
‘না তোমার যাওয়ার দরকার নেই। এটা তোমার ঘর। সুতরাং তুমিই থাকো। আমিই চলে যাব।’
কথা শেষ করেই তুমি থপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ো। তীব্র ব্যথায় তোমার চোখ মুদে আসে। তুমি কিছু একটার শব্দ শুনে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখ বাছিনা তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। সে ঘুম ঘুম চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ঘরের আবহাওয়াটায় কেমন একটা অপরাধী অপরাধী ভাব। তোমার মিথ্যা কথাগুলো মনে পড়ে যায়। হঠাৎ তোমার এত লজ্জা অনুভব হয় যে তুমি সারা জীবনেও যার মুখোমুখি হওনি।
‘বাছিনা আমি খুবই দুঃখিত যে তোমাকে উৎকণ্ঠায় ফেলে দিয়েছি।’
বাছিনা যে গর্ব করত সেটা মিথ্যে হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘কথা বলে কোনো লাভ নেই।। তারপর বাছিনা চুপ হয়ে গেল।
‘তোমার মা ঘরে থাকবে। তোমাদের আনন্দ আর সুখের সব কিছু সেই ব্যবস্থা করে দিবে।’
সে মনে মনে খোদার কাছে প্রার্থনা করছিল মেয়েটা যেন কান্না শুরু না করে। বাছিনা খুব দুঃখী চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা তুমি বলেছিলে তেমন কিছুই ঘটেনি। তুমি কিছুই করোনি।
তার চেহারাটা তখন লজ্জায় পুড়ে যাচ্ছিল।
‘সত্যটা এখানে উপযুক্ত না।’
‘কিন্তু কেন বাবা?’
তুমি চলে আসলে। বাছিনা তোমাকে ক্ষমা না করার আগ পর্যন্ত তার সাথে দেখা করার সাহস তোমার ছিল না।
তোমার কথা শুনে ওয়ারদা বলল, ‘তোমার এই ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।’
‘না এই ধরনের ভণ্ডামির মুখোমুখি আমি আর হতে পারব না।’
ওয়ারদা খুব চিন্তিতভাবে বলল, ‘আমি খুব ভয় পাচ্ছি যে শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে সুখী করতে পারব কিনা?
‘কিন্তু বিশ্বাস করো আমি সত্যিকার অর্থেই এখন সুখী।’
সে নিজেকে সুখী রাখার চেষ্টা করতে থাকল। তার মাথা থেকে সমস্ত বিরক্তিকর চিন্তাভাবনাগুলো সে ঝেড়ে ফেলে দিল। তার কাজের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হল। আইনি লড়াইগুলো খুব ঠাণ্ডা মাথায় সে চালিয়ে যেতে থাকল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে ওয়ারদার সাথে ফোনে কথা বলে। কাজ শেষ করে সে যখন তার ছোট্ট নতুন পাখির বাসার মতো ফ্লাটটায় এসে উপস্থিত হয় তখন ওয়ারদা তাকে বেশ উজ্জ্বল আর হাসিখুশি চোখে স্বাগতম জানায়। কখনো কখনো তারা দুজন পূবালি হাওয়ার ছোট্ট কক্ষটায় অবস্থান করে, আবার কখনো কায়রো থেকে বেশ দূরে কোথাও বেড়াতে চলে যায়। কখনো মরুভূমির পাশে বড় রাস্তার কোনো রেষ্ট হাউসে রাত কাটায়।
ওয়ারদা যখন বুঝতে পারল ওমরের পুরাতন কাব্যিক নেশাটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠছে সে তখন ওমরকে নিজের মুখস্থ করা কবিতা আবৃত্তি করে আরো বেশি করে উৎসাহ দিতে থাকল। নাট্যকলার ছাত্রী হিসেবে শাওকির কাব্যনাটকের অনেক কবিতাই তার মুখস্থ ছিল। সাথে সাথে অনেক প্রেমের কবিতাও তার জানা ছিল।
ওমর ওয়ারদাকে বেশ প্রশংসা করেই একদিন বলল, ‘তোমার প্রেমের কবিতাগুলো সত্যিই চমৎকার।’
ওয়ারদা তাকে বারবার পীড়াপীড়ি করত কবিতা লেখার জন্য। কিন্তু ওমর ছিল খুব শান্ত।
‘কবিতা যখন জীবন্ত তখন তা লেখার কি দরকার।
ওয়ারদা একদিন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আমার অতীতের বিষয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন করোনি।’
সে ওয়ারদাকে একটা চুমু খেয়ে বলল, ‘আমরা যখন ভালবাসায় আছি তখন বিশ্বাস দিয়েই আমরা সব কিছু গ্রহণ করব। এখানে প্রশ্ন করার কোনো দরকার নেই।
কিন্তু ওয়ারদা তার অতীতের বিষয়ে বলতে চাচ্ছিল।
‘আমার বাবা ছিলেন ইংরেজির শিক্ষক। খুব চমৎকার একজন শিক্ষক। তিনি এমন একজন শিক্ষক ছিলেন যে ছাত্রছাত্রীরা তাকে কখনো ভুলতে পারবে না। আমি যখন নাট্যকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি অবশ্যই আমাকে আশীর্বাদ করতেন আর উৎসাহ দিয়ে যেতেন। কিন্তু আমার মা ছিলেন খুবই ধার্মিক আর সংকীর্ণমনা। আমি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নাট্যকলায় ভর্তি হলাম। আর আমি যখন নাচের সিদ্ধান্ত নিলাম তখন তিনি রাগে প্রায় ফেটে পড়লেন। আমার চাচারাও একই আচরণ করল। আর এটার সমাপ্তি ঘটল তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে। আমি আমার পরিবারকে ফেলে আসলাম।’
‘কিন্তু তুমি নিজের ব্যবস্থাটা কিভাবে করলে।’
‘আমার এক অভিনেত্রী বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম কিছু দিন।’
সে ওয়ারদার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি সবসময় নৃত্যকে ভালবেসেছ?’
‘হ্যাঁ আমি নাচতে ভালবাসতাম। কিন্তু অভিনয়ের প্রতি আমার বাড়তি একটা আগ্রহ ছিল। আমি চেষ্টা করেছি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। সবশেষে আমি নৃত্যকেই বেছে নিলাম।’
ওমর বেশ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ইয়াযবেক কি তোমার সাথে কখনো দুর্বব্যবহার করেছে?’
‘আসলে মূল কথা হলো সে অন্যদের চেয়ে ভালো। আমিতো জানি নাইট ক্লাবগুলোতে কি ধরনের কার্যকলাপ হয়ে থাকে।’
‘তুমি আমার প্রথম আর শেষ ভালবাসা।’ সে ওয়ারদাকে একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে কৃতজ্ঞতার সাথে বলল। ‘তুমি যখন অভিনয়ে ব্যর্থ হলে তখন আবার তোমার মার কাছে ফিরে গেলে না কেন?’
‘ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছে। এ ছাড়া আমি কারো কাছে ছোট হতে চাই না। আমার ব্যর্থতাটা অভিমানটাকে আরো তীব্রতর করেছে।’
ব্যর্থতা! উফ এটা একটা অভিশাপ। এই অভিশাপ কখনোই শেষ হয় না। এটা এমনই বিরক্তিকর যে তখন কেউ তোমার কথা শুনতে চাইবে না।
তার অফিসে তার একমাত্র বোন আর খালু আসল। তারা এই নর্তকী মেয়েটাকে বিয়ে না করতে বারবার নিষেধ করল। তার খালু হুসেইন কারাম বলল, ‘সম্পর্কটা এভাবে চলতে থাকলে তোমার বিচারিক কার্যক্রমের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’
সে খুব কর্কশ ভাবেই উত্তর দিল, এই গুলি নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি এগুলো আর চাই না।’
তাকে যে হতাশাগুলো কণ্ঠ চেপে ধরেছিল সে ঐগুলোকে পাত্তা না দিয়ে বেশ দৃঢ়তার সাথেই তার সুখটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। সে এতই শিশুদের মতো আচরণ করছিল যে মোস্তফা তাকে একদিন হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এখন আমাদেরকে জীবনের অর্থ কি সেটা বলো।’
ওমর প্রশ্ন শুনে বেশ উচ্চঃস্বরে হেসে উঠল। তারপর বলল, ‘আমাদের অন্তর যখন শূন্য হয়ে পড়ে তখনই এই প্রশ্নটা আমাদের খুব বিরক্ত করে। আনন্দই সেই শূন্যস্থানটা পূরণ করতে পারে। আর আমি আশা করি ভালবাসাই সেই সর্বকালীন আনন্দটা দিতে পারে।
তার কথা শুনে মোস্তফা হাসতে হাসতে বলল, ‘কখনো কখনো তোমার জন্য আমার খুব সমবেদনা হয় আবার কখনো কখনো আমি তোমাকে খুব ঈর্ষা করি। জীবনের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করলে মাঝে মাঝে আমার অন্তরের গভীর থেকে অনেক ধরনের ব্যর্থতার কাহিনী এসে হাজির হয়। কিন্তু আমি তারপরেও জীবনের অর্থ খোঁজায় বিশ্বাস করি।’
শীতের ঠাণ্ডা একটা বাতাস ওমরের অফিসের জানালা গলে ভেতরে ঢুকছিল। শেষ অপরাহুটা রাত্রিতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছিল। মোস্তফার মাথার চকচকে টাকটা ঠাণ্ডা এসে লাগছে। তার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
সে আবার বলল, ‘আমরা কেন জীবনের অর্থ খুঁজি। ধর্মীয় বিশ্বাসতো আমাদেরকে সেই অর্থের সন্ধান দিতে পারে। দেখ গতকালটা খুব অসন্তুষ্টি আর বাজে অবস্থায় গেছে। কিন্তু আমি জোর দিয়ে বলতে পারি আমার শিল্পী কর্মীরা তারা অর্থবহ ছিল। আমার অতীতের আর বর্তমানের রেডিও অনুষ্ঠানগুলো অর্থবহ, টেলিভিশনে আমার যে নাটকগুলো চলছে সেগুলো অর্থবহ, সুতরাং জীবনের অর্থ কি কিংবা এটা কতটুকু অর্থবহ এই প্রশ্ন করার অধিকার আমার নেই।
তারা খুব চুপচাপ অফিসের ভেতর সিগারেট টানছে। হঠাৎ করেই ওমর মোস্তফাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাড়ির সবাই কেমন আছে?’
মোস্তফা একটু মুচকি হাসল।
‘জয়নাব ভালো আছে। সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। যদিও সে এখন গর্ভবতী। কিন্তু এখানে তোমার আরো কিছু খোঁজ খবর নেওয়া উচিত।’
ওমরের চোখে মুখে একটু আগ্রহ দেখা গেল।
‘জয়নাব সন্তান জন্ম দেয়ার পর কাজ করার চিন্তা করছে।’ মোস্তফা একটু থামল। তারপর আবার বলল, ‘এই মনে করো অনুবাদকের কাজ কিংবা অন্য কিছু। তবে আমি ভয় পাচ্ছি সে হয়তো একদিন ঘর ছেড়ে দিবে।’
‘কিন্তু সে কেন ঘর ছাড়বে। এটাতো তার বাড়ি।’ওমর বলল।
মোস্তফা তার দিকে একটু অবজ্ঞার চোখেই তাকিয়ে বলল, ‘বাছিনা তার পড়ালেখায় বেশ আনন্দে আছে। জামিলা তোমাকে প্রায় ভুলেই গেছে।’
ওমর তার চোখ দুটি নামিয়ে নিল।
‘কিন্তু আমি তোমাকে বার বার সতর্ক করে আর সমালোচনা করে আমার দায়িত্ব ঠিকই পালন করেছি।’
ওমর তার কথা শুনে এবার হেসে উঠল।
‘তুমি হলে পুরাতন ভণ্ড।’ ওমর বলল।
‘আমার স্ত্রী পরিবারের পক্ষ থেকে কখনোই তোমাকে আক্রমণ করা হবে না।’
‘সেটাতো অবশ্যই।’
‘আমরা যখনই একা হয়ে পড়ি তখনই আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করি। তোমার মানসিক অসুস্থতায় দাঁড়াতে চাই। আমি তোমার স্ত্রীকে বারবার বোঝাতে চাই যে এটা সংক্রমিত কোনো রোগ নয়।’
