ভিখারি – ৫

পাঁচ

সূর্যের নিভু নিভু আলোতেও তাকে বেশ শান্ত এমনকি বেশ উজ্জ্বল লাগছিল। লম্বা হৃষ্ট পুষ্ট শরীরেও তাকে বেশ মনোরম আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। তার সবুজ চোখ দুটিতে মুগ্ধতা, যদিও সে দুটোকে এখন বেশ অপরিচিত মনে হচ্ছে। সে অন্য এক লোকের স্ত্রী যে কিনা গতকালও অবসাদ আর ক্লান্তি কি জিনিস সেটা জানত না। যে কিনা নিজেকেই ভুলে গিয়েছিল। সে কিভাবে এই লোকটার সাথে সম্পৃক্ত হলো যে লোকটা কোনো অসুস্থতা ছাড়াই অসুস্থ পঙ্গু হয়ে আছে আর আর্দ্র ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝে অশুভ সীমাহীন বিপদের গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

সামনেই দুই বোন জামিলা আর বাছিনা। জামিলা একটা পাথরের দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটছে আর বাছিনা তখন তার অন্য আরেকটা হাত ধরে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলছে। তারা দুজন জিলিম ও সিদি বিশরের মাঝে একটা পথ দিয়ে হাঁটছিল। এই পথে ভিড়-ভাট্টা একটু কম। অনেকের দৃষ্টিই বাছিনার উপর পড়ছিল। তাকে নিয়ে ফিসফিস করে বেশ কিছু মন্তব্যও শোনা যাচ্ছিল। কথাগুলো অস্পষ্ট হলেও এর উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছিল।

ওমর সে দিকে তাকিয়ে নিজেই মনে মনে হাসল।

দুই বছর কি তিন বছর পর তুমি দাদা হবে আর জীবন এভাবেই চলতে থাকবে। কিন্তু কোথায় যাবে। ওমর পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্যাস্তের শেষ অবস্থাটা দেখতে থাকল।

সে দিকে তাকিয়ে ওমর বলল, ‘পূববর্তী লোকেরা জিজ্ঞেস করত সূর্য কোথায় হারিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের খুব বেশি কোনো প্রশ্ন নেই।’

জয়নাব এক মুহূর্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যে কোনো প্রশ্ন থেকে মুক্ত হওয়াটা খুব চমৎকার।

যৌক্তিক উত্তর তোমাকে কষ্ট দেয় এবং কোনো কারণ ছাড়াই মাঝে মাঝে সঙ্গত আচরণ তোমাকে বিরক্ত করে তোলে। এটা কতই না চমৎকার হতো যদি হঠাৎ করেই সমুদ্রটা উত্তাল হয়ে তীরবর্তী সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত, আর উপকূলীয় রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো লোকগুলোর উপর যদি দুর্যোগ নেমে আসত আর জুয়াখানাটাকে যদি মেঘের অনেক উপরে উড়িয়ে নিয়ে যেত আর এই পরিচিত স্বাভাবিক দৃশ্যগুলোকে যদি চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলত তাহলে কতই না ভালো হতো।

সুতরাং মাথার ভেতর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি টের পাওয়া যাচ্ছিল আর কীট পতঙ্গ চড়ুইপাখিরা ওড়াউড়ি করছিল।

মেয়ে দুটি হাঁটতে হাঁটতে সেন স্টিফানু প্রেক্ষাগৃহের সামনে এসে একটু থামল। তারপর আবার হাঁটা শুরু করল।

হঠাৎ করেই জয়নাব তার বাহু দিয়ে ওমরকে স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ওমর- কি হয়েছে, কোনো সমস্যা?’

তার আশেপাশে যারা ছিল তাদের দিকে একবার তাকিয়ে সে একটু মুচকি হেসে উত্তর দিল, ‘অনেক বেশি প্রেম অনুভব করছি।’

‘এটাতো নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?’

সে তার প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘কত কিছু আছে বাছিনা এখনো তার কিছুই জানে না। আমি সেগুলোই নিয়ে ভাবছিলাম যখন আমি ….’

জয়নাব একটু অধৈর্য হয়ে তার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমি জানি আমি কি করছি। বাছিনা খুবই ছোট্ট একটা নিষ্পাপ মেয়ে। কিন্তু তুমিতো পালিয়ে বেড়াচ্ছ।’

‘আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি?’

‘তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কি বলতে চাচ্ছি। আমার কথা স্বীকার করে নাও।’

‘কিন্তু কোন অপরাধে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি?’

‘কেননা তুমি তোমার নিজেকেই ধরতে পারছ না।’

আহ! একটা ঝড়ো স্রোতের কি প্রয়োজনই না আমরা বোধ করছি এই অস্বস্তি কর স্যাঁতসেঁতে ভেজা বাতাসের পরিবেশটাকে পরিষ্কার করে ভাসিয়ে নেওয়ার জন্য।

‘তোমার শরীরটাই শুধু আমাদের মাঝে বসবাস করে আর তুমি যে কোথায় থাকো কে জানে। মাঝে মাঝে আমার মৃত্যুর চিন্তা হয়।’

‘কিন্তু তোমরাতো দেখতেই পাচ্ছ আমি কি চিকিৎসা করিয়ে যাচ্ছি।’

‘হ্যাঁ  এটা সত্যি কথা। কিন্তু অন্য কোনো বিশেষ কিছু আছে কি যেটা তোমাকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে।’

‘না তেমন কিছু নেই।’

‘আমি অবশ্যই তোমাকে বিশ্বাস করব।’

‘তবে আমার মনে হয় না তুমি পুরোপুরি সেটা করছ।’

‘আমি ধারণা করেছিলাম হয়তো তোমার অফিসে কিংবা কোর্টে কেউ কেউ অথবা কোনো ঘটনা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে মনে দাগ কেটেছে। হ্যাঁ  তুমি খুবই নাজুক মনের কিন্তু তুমি মনের ভেতর অনেক কিছুই লুকিয়ে রাখতে পারো।’

‘আমি ডাক্তারের কাছে শুধুমাত্র এই কারণেই গিয়েছিলাম যে আমি কারণটা ধরতে পারছিলাম না।’ ওমর বলল।

জয়নাব বলল, ‘তুমি কিন্তু আমাকে বলোনি কিভাবে এই সমস্যাটা শুরু হয়েছিল।’

‘আমি তোমাকে অনেকবার এই নিয়ে বলেছি।’

‘তুমি শুধু ফলাফলটাই বলেছিলে কিন্তু কিভাবে সমস্যাটা শুরু হয়েছিল সেটা বলোনি।’

স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য এক ধরনের বেপরোয়া উত্তেজনা তোমার ভেতর কাজ করছিল।

‘এটা বলা কঠিন যে ঠিক কবে থেকে এবং কিভাবে পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল। কিন্তু একটা মিটিংএর কথা আমার মনে পড়ছে সোলায়মান পাশার প্রদেশে একটা আইনি লড়াই নিয়ে আমি বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে একজন বলেছিল, ‘মাননীয় আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আপনি পরিস্থিতির মূল বিষয়টা ধরতে পেরেছেন। আপনার খ্যাতি সত্যিকার অর্থেই বাস্তব। বিচারে আমাদের বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ আশাবাদী।’

উত্তরে আমি বলেছিলাম আমিও তেমনটা আশা করি।

লোকটা তখন খুব আনন্দে হাসছিল আর তার হাসি দেখে আমার ভেতর হঠাৎ করেই অন্ধ ক্রোধের একটা ঢেউ টের পেলাম। আমি বললাম, ‘ধরেন আপনি আজ বিচারে জয়ী হয়ে গেলেন আর আগামীকাল সরকার যে জমিটা বাজেয়াপ্ত করেছে সেটা আপনারা দখল নেবেন?’

সে বেশ ফূর্তির সাথেই উত্তর দিল, ‘সব কিছুই নির্ভর করছে বিচারে জয়ী হওয়ার উপর। আল্লাহ আমাদের জীবন নিয়ে কি করছেন না করছেন সেটা ভেবেতো আমরা জীবন কাটাই না।’

আমি তার যুক্তির সাথে একমত হলাম। কিন্তু এর পরপরই আমার মাথা ঘুরতে লাগল। চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।

জয়নাব খুব অদ্ভুত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘এটাই কি ছিল কারণ?’

‘না। আসলে মূল কারণটা আমি ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু এর পরেই আমি সুক্ষ্ম একটা পরিবর্তন টের পেতে থাকলাম। কোনো যুক্তি ছাড়াই প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের কথায়, প্রতিউত্তরে আমি উত্তেজিত হতে থাকলাম।’

‘বিজ্ঞ মানুষেরা যেভাবে মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করে তুমিও সেটা করতেই পারো এটা স্বাভাবিক।’

‘কিন্তু আমি অবাক হই কিভাবে বিজ্ঞজনেরা মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করে।’

‘না – না আমি সেটা বলছি না। এটা সম্ভবত আগে কিংবা পরে ঘটেছে।’

‘তোমার সাথে এটা নিয়ে আমাকে আরো আলাপ করতে হবে।’

‘তুমি কি কাজের ব্যাপারে আসলে খুব উদ্বিগ্ন।’

‘আমি শুধু মাত্র তোমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমি শুধু তোমার যত্ন নিতে চাই। আমি আজ হাঁটতে ক্লান্ত।’ জয়নাব বলল।

সে বলল, ‘কিন্তু তুমি তো সাধারণত এতটুকু দূরত্ব দিনে দুইবার অতিক্রম করে থাক।’

জয়নাব তার চোখ দুটি নামিয়ে নিল। ‘এখন আমার স্বীকারোক্তির সময়। আমি খুব সম্ভবত অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়েছি।’

কথা শুনে ওমরের পেটের ভেতর গুরুগুরু করে উঠল। সে উঠে বসে বলল, ‘কিন্তু …’

জয়নাব খুব শান্তভাবে বলল, ‘প্রিয়তমা আমাদের যে কোনো ধরনের পরিকল্পনার চেয়ে খোদার ইচ্ছাটা অনেক বেশি শক্তিশালী।’

তারপর সে ওমরের হাতটা স্পর্শ করে বলল, ‘কিন্তু তুমিতো তোমার রাজপুত্রের জন্য আশীর্বাদ করলে না।’

তারা দুজন ঘরে ফিরে আসল। জয়নাবের চোখেমুখে এক ধরনের দুষ্টমির হাসি।

বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুমের পর সে খুব সকাল সকাল ঢেউয়ের শব্দে ঘুম থেকে উঠল। সকালটা ছিল খুব নিরব। জয়নাব গভীর ঘুমে কাতর ছিল। তাকে বেশ তৃপ্ত দেখাচ্ছিল। তার নরম ঠোঁট দুটো একটু বুজে আছে। চুলগুলো ঈষৎ ছড়ানো। অথচ তার পাশেই তুমি ছিলে হতাশাগ্রস্ত।

‘আমি তাকে আর ভালবাসি না। ভালবাসার দীর্ঘ অনেকগুলো বছর পার হওয়ার পর, জীবনটা ভাগাভাগি করার পর মধু স্মৃতিগুলো অতিক্রম করার পর এখন আর ভালবাসার কোনো অংশই বাকি নেই।

তুমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলে কিন্তু তার জন্য কোনো মায়া বা সমব্যথা অনুভব করছিলে না। তুমি তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবছিলে কোন বিষয়টা তোমাদেরকে একত্র করেছিল। এই জঘন্য কাজটা করার জন্য কে বাধ্য করেছিল।

‘মোস্তফা দেখো ঐ যে মেয়েটা।

‘কোনটা ঐ যে চার্চ থেকে বের হয়ে আসছে একা ঐটা?’

‘হ্যাঁ ঐ একজনই। দেখো তার চাচার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সে আজকে কালো পোশাক পরেছে। কি সুন্দরই না তাকে দেখাচ্ছে।’

‘কিন্তু তার ধর্ম।’

‘এই সমস্ত বাধা বিপত্তিকে আমি পাত্তা দেই না।’

আমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য সে যে নম্র ব্যবহার করেছিল আমি তাতে খুবই মুগ্ধ ছিলাম। আমি তাকে এই কথা বলেছিলাম।

একটা সাধারণ পাবলিক বাগানে ওমর আল হামজাবি একজন আইনবিদ নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিল যখন সে নিজে নিজে প্রায় অস্পষ্ট করে বলল ‘কেমেলিয়া ফুয়াদ’।

প্রিয়তমা আমাদের ভালবাসা সব কিছুর চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের পথের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারবে না।

সে উত্তরে বলেছিল ‘আমি কিছু জানি না।’

মোস্তফা বেশ উত্তেজিত হয়ে হেসে উঠেছিল। ওমরকে বলেছিল আমি সারা জীবনের জন্য তোমাকে চিনেছি। তুমি সবসময় বিপদকেই দেখেছ। প্রচণ্ড ঝড় তোমার ঘরের ভেতর বয়ে যাবে। আমি এই দুজনার মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

পরবর্তীকালে কি চমৎকার ব্যবহারই না মোস্তফা তাদের সাথে করেছিল। সে তার হুইস্কির গ্লাস উঠিয়ে তাদের লক্ষ্য করে বলেছিল, ‘তোমাদের দুজনকেই স্বাগতম। অতীত চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু এই মেয়েটার ত্যাগ তোমার চেয়ে অনেক বেশী। ভালো থেক জয়নাব ভালো থেকো ওমর।(কেমেলিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নবী মুহাম্মদ এর মেয়ে জয়নাবের নাম ধারণ করে। ওমরকে বিয়ে করে সে তার পরিবারের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে।)

মোস্তফা তোমার এক পাশে বসে মদ পান করে পুরোপুরি মাতাল হয়ে আবার কথা বলতে থাকে।

‘সামনের মন্দ সময়গুলোকে ভুলে যেও না। ভালবাসাকেও কখনো ভুলো না। মনে রেখো এই পৃথিবীতে এখন এই মেয়েটির আর কোনো পরিবার নেই। সে ভিন্ন একটা গাছ থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন তুমি ছাড়া তার আর কেউ নেই।’

ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়ই জয়নাব তার মুখটা সরিয়ে একটু পাশ ফিরে শুলো। তার নাইট গাউনটা নিচ থেকে সরে যাওয়ায় শরীরের বেশ কিছু সতর খুলে গেল। ওমর সে দিকে একবার তাকিয়ে বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় চলে এল। পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

অন্ধকারে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটায় সে সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকাল যেগুলো প্রতিযোগিতা করে একটার পর একটা তীরের দিকে ধেয়ে আসছে। আকাশের গম্বুজে মেঘের ঝাঁকেরা একের পর এক এসে জমা হচ্ছে। সকালের আবহাওয়ায় হাল্কা কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ছে।

নিচে কাউকেই হাঁটতে দেখা যাচ্ছে না। সকালের বাতাস তোমাকে ঝরঝরে করছিল না। মানসিক এই অসুস্থতা থেকে সুস্থতার জন্য তোমাকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

ইস মোস্তফা কোথায় তাকে যদি পারস্পরিক মানসিক দ্বন্দ্বের কথাটা জিজ্ঞেস করা যেত। মোস্তফার মাথায় অনেক ধরনের চিন্তা সব সময় ঘুরপাক খায়।

বেশ বড় একটা ঢেউ হঠাৎ করে ছুটে এসে তীরে আছড়ে পড়ল। তারপর ভেঙে পানির ফেনায় রূপ নিল।

সে ভাবছিল। হায় খোদা জয়নাব আর কাজ দুটোই আমার কাছে এখন সমান। যে রোগ আমাকে কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেই একই রোগ আমাকে জয়নাব থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। জয়নাব সম্পদশালী, সফল আর সবশেষে সে হলো অসুস্থ। যেহেতু আমি এই সব বিষয়গুলোর উপর বিরক্ত সেহেতু আমি নিজের উপরও বিরক্ত অথবা যেহেতু আমি নিজের উপর বিরক্ত সেহেতু এই সব জিনিস আমাকে অসুস্থ করে তুলছে এবং আমি এইগুলোর উপরও বিরক্ত। কিন্তু আমি ছাড়া জয়নাবের আর কেই বা আছে। গত রাতটা ছিল ভালবাসার একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার রাত।

ভালবাসার উত্থান আর পতন ছিল গত রাতে। শিরার গতি বেড়ে গিয়েছিল কমে গিয়েছিল, বেড়েছিল রক্তের চাপ, আর কেমন একটা অনুভূতিতে পাকস্থলির সংকুচোন আর প্রসারণ বেড়ে গিয়েছিল।

একটা বড় ঢেউ সমুদ্রের তীরে আছড়ে পড়ার সাথে সাথে বালির চর সেটাকে শুষে নিল। ঢেউটা আর সমুদ্রে ফিরে যেতে পারল না।

জয়নাব রাতে প্রণয়ের গান গাইল আর আমি ছিলাম নিশ্চুপ, সে ছিল ভালবাসায় উত্তাল আর আমি ছিলাম উদাসীন, সে আমাকে ভালবাসছিল অথচ আমি তাকে ঘৃণা করছিলাম, সে ছিল গর্ভবতী আর আমি ছিলাম বন্ধ্যা, সে ছিল অনুভূতিপ্রবণ আর আমি ছিলাম নির্বোধ অনুভূতিহীন মন্থর।

সে বলেছিল তুমি সব সময়ই এই রকম চুপচাপ। আমি বলেছিলাম আমার স্বর এমনই ঠিক যেন শোনা যায় না।

আমি বলেছিলাম, ‘ধরো তুমি সম্পত্তির দখলটা আজ পেয়ে গেলে তাহলে আগামীকাল কি সরকার এই জমিটাকে বাজেয়াপ্ত করবে?’

কথাটা যাকে বলা হলো সে উত্তরে বলল, ‘আমরা জীবনযাপন করে যাচ্ছি এটা জেনেও যে খোদা শিগগির আমাদের জীবনটাকে দখল করবেন।’

একটা বড় ঢেউ তীরে এসে আছড়ে পড়ে ভেঙে সাদা ফেনা হয়ে গেল। তোমার চোখে কবরের ঘুম কিন্তু মনে প্রশান্তি নেই। তোমার মাথার ভেতর উত্থালপাতাল ঝড়। এমনকি তুমি আবার ডাক্তারের সাথে দেখা করার চিন্তা করছিলে। কারণ তুমি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিলে। এর পর আমি কিই বা চাইতে পারি। কিইবা করতে পারি।

জ্ঞান অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই। মূল্য নেই আমার আইনি মক্কেলদের, আমার একাউন্টে আরো একশ পাউন্ড জমা হবে তারও কোনো গুরুত্ব নেই। একটা সুন্দর ঘরের কোনো দাম নেই কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম দেখার মধ্যেও কোনো অর্থ খুঁজে পাই না। তাহলে কেন আমি শূন্যে একটা ভ্রমণ দিচ্ছি না।

আলোর ঢেউয়ে চড়ে বেড়ানো। সেখানে গতি নির্দিষ্ট করা, আর এই বিশ্বে নির্দিষ্ট করা বিষয়গুলো সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে।

প্রথম যে মহাকাশচারী মহাশূন্যে পৌঁছে ছিল সে প্রথম অণুজীব বিক্রি করেছিল আর বিক্রি করেছিল অসংখ্য মিথ্যা সংবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *