আঠারো
যখনই তোমার অন্তর তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তখনই তুমি সময় এবং স্থানের সীমা ভেঙে বেরিয়ে গেলে। তোমার কাছে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত আর চিরহরিৎ গাছ দিয়ে ঘেরাও করা ছোট্ট বাড়িটা অসহ্য মনে হলো। তুমি অপেক্ষা করছ সে দিনটা কখন আসবে যখন তোমার কাছ থেকে এই চিরহরিৎ গাছগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে, এবং রাতের এই ডালপালায় উদ্ভিদ আর পোকামাকড়ের ফিসফিসানি চুপ হয়ে যাবে। কবে সেই দিনটা আসবে যখন তোমার অতীত স্মৃতি কোনো ভাবেই তোমাকে পীড়াপীড়ি করবে না। কষ্ট দেবে না। ভারতীয় আর পারসী সংগীতগুলো নষ্ট হয়ে যাবে তার স্থলে আসবে গোলাপ ফুলের আনন্দ নিয়ে সরাসরি অন্য ধরনের আনন্দ সুর। সকালের সেই উচ্ছলতা তোমাকে অজানা শক্তি দিয়ে আকাশের গম্বুজের সাথে বেঁধে রাখবে। সেখানে তোমার অন্তর ঘুম কি জিনিস বুঝবে না আবার জাগরণের কোনো অনুভূতি থাকবে না।
বাছিনা তার সামনে চিরসবুজ প্রাণবন্ত গাছের মতো দাঁড়াল। তার সবুজ চোখ দুটি বাগানের দিকে ফিরিয়ে গাছগুলোর মধ্য দিয়ে যে পানির নালাটা প্রবাহিত হচ্ছে, তার সমানেই যে মাঠটা আছে সেদিকে তাকাল।
সে দাঁত চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শুধুমাত্র এই জন্য?’
বাছিনার উপস্থিতি তার চুলের ঢেউ কোমলতা তোমাকে কিছুটা নরম করল। তুমি বিড়বিড় করে বললে, ‘কোনো কিছুর জন্যই না।’
‘তুমি কি এই শূন্য জায়গায় একাকিত্বকে ভয় পাচ্ছ না?’
তুমি তার কানে কানে ফিসফিস করে বললে, ‘জনতার ভীড়ের মাঝে একাকিত্ব আমাকে পীড়ন করে।
সে এক কদম পিছনে গিয়ে বলল, ‘গতকাল ওসমান বলেছিল…’
ওমর তাকে মৃদুভাবে বাধা দিল।
‘প্রিয় কন্যা আমার তুমি কি এখনো বুঝতে পারোনি আমি কিছুই শুনতে চাই না। আমি বধির।’
বাছিনা কাঠের দরজা দিয়ে বাগানটা পেরিয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
আমি ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর অন্ধকারের দিকে আমার চোখ দুটো খুললাম। এই স্বপ্নের একমাত্র অর্থ হতে পারে যে আমি জীবনের আহ্বান থেকে এখনো বের হতে পারিনি।
মোস্তফা গভীর আবেগে তোমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর খুব দুঃখী চোখে তোমার চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করল। তুমি লক্ষ্য করলে মোস্তফার চকচকে টাকে এখন ঘন কালো চুল চমকাচ্ছে।
‘স্বাগতম। তুমি কিভাবে এটা জোগাড় করলে?’
সে অন্যরকম গুরুত্ব দিয়ে বলল, ‘আমি সকালে পবিত্র কোরানের সব বরকতময় সুরাগুলো আবৃতি করেছি।’
উত্তর শুনে তুমি খুব বিস্মিত হলে।
‘কবে থেকে তুমি স্রষ্টার পথ খুঁজে পেলে?’
‘এই জায়গায় যখন থেকে তুমি পৃথিবীকে বিচ্ছিন্ন করলে।’
‘তুমি কেন এসেছ?’
‘তোমাকে এই কথাটা বলতে যে জয়নাব দশ জন পুরুষের শক্তি নিয়ে কাজ করছে।’
‘আল্লাহ তাকে সাহায্য করুক।’
সে ঘরের ভেতরে, বাগানে এবং মাঠটা ঘুরে ফিরে দেখল।
‘কি একটা আইডিয়া! এই জায়াগটা হলো ভালবাসার ঘর কিংবা শিল্প সাহিত্যের স্থান।
তুমি বললে, ‘তাহলে তুমি এখানে ঠাট্টা মজা করার জন্য এসেছ।’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমরা যখন থেকে প্রস্তর যুগের সন্তান তখন থেকেই ঠাট্টা রসিকতা করা ছাড়া আমাদের আর কি অবশিষ্ট আছে। কিন্তু আমিতো দেখতে পাচ্ছি তুমি হতাশায় একেবারে ভেঙে পড়ছ।’
তার কথা শুনে আমি একটু পিছনে এসে বললাম, ‘তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার সমস্ত অনুভূতিগুলো মরে গেছে?’
সে তার কাঁধটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে সাইপ্রাস গাছের উপর চড়ে বসল। তারপর সে দিগন্তের উপর চাঁদের কাছাকছি উঠে গেল। সেখানে সে একটা ঘণ্টি হাতে নিয়ে বাজাতে থাকল। নানা রকমের পোকামাকড় গাছটা ঘিরে ধরে নাচানাচি করতে লাগল। চাঁদের আলোতে তার টেকো মাথাটা চকচক করতে লাগল।
আমি ব্যথাক্রান্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারে আমার চোখ দুটো মেললাম। এই ধরনের কল্পনার একমাত্র অর্থ হতে পারে যে আমি জীবনের আহ্বান থেকে এখনো বের হতে পারিনি। প্রায় সময়ই আমার জাগ্রত সময়গুলোতে আমি তোমাকে ভাবি। আর ভাবি যে এই সমস্ত অর্থহীন কল্পনা আমার ঘুমকে নিরাশ করে।
.
গতকাল সকালে আমি যখন বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম আর মাজনুনের কবিতা পাঠ করছিলাম তখন হঠাৎ করেই উত্তরের বেষ্টনী থেকে যেখানে একটা খাল বয়ে গেছে বেশ মোটা গলার একটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
‘এই যে ভদ্রলোক বাড়িতে ঢোকার দরজা কই?’
সেদিকে তাকিয়ে আমি দেখলাম ওসমান একটা মটর সাইকেলে বসে আছে। তার মটর সাইকেলটা বেশ অদ্ভুতভাবে সাজানো।
আমি বেশ অবন্ধুসুলভ ভাবে বললাম, ‘ভেতরে ঢুকো না।’
সে বেশ উল্লসিত হয়ে বলল, ‘তুমি কি অলৌকিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে চাও না? আমি পুরো খালটা মটর সাইকেলে করে পার হয়েছি।’
‘আমি কোনো অলৌকিকে বিশ্বাস করি না।’
ওসমান বেশ শব্দ করে হাসল।
‘কিন্তু আমরাতো একটা অলৌকিক যুগেই বাস করছি।’
আমি এক পা এগিয়ে তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি চাও?
‘আমি তোমার পরিবারের পক্ষ থেকে এসেছি।’
‘আমার কোনো পরিবার নেই। তুমি কি জানো না আমাদের সত্যিকারের পরিবারের মূলত কিছুই না।’
সে ধমকের সুরে বলল, ‘আমি তোমাকে একদল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে তাড়িয়ে বেড়াব।’
মটর সাইকেল স্টার্ট হওয়ার শব্দ শোনা গেল। তার পিছে পিছে এক দল কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ। আমি হতাশ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। অন্ধকারের দিকে আমার চোখ দুটি মেলে ধরলাম। এই স্বপ্নের একটাই অর্থ হতে পারে। আমি এখনো পলাতক হতে পারিনি। যাই হোক আমি প্রায় সময়ই আমার জাগ্রত সময়গুলোতে ভাবি এই সমস্ত অলীক কল্পনা আমার ঘুমকে নিরাশ…..।
.
আমি সারারাত বাগানের মাঝে কাটালাম। অন্ধকারে আমার সাথে কেউ ছিল না। আসমানের গম্বুজে তারকাগুলো মাথার উপর চিকিমিক করছিল। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম কবে আমার ইচ্ছাগুলো পরিপূর্ণ হবে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। সেই চিৎকারে গাছের ফাঁকা জায়গাগুলো কেঁপে উঠল।
আমি সবকিছুকেই গালাগালি করলাম আবার কিছুই না-কেও তিরস্কার করলাম।
একটা তারকার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি বললাম, ‘আমি দেখতে চাই।’
‘তাহলে তাকাও।’ তারকাটা ফিসফিস করে বলল।
আমি তাকিয়ে শুধুই শূন্যতা দেখলাম। কিন্তু আমিতো আকুলভাবে শুধু এই জিনিস দেখতে চাইনি।
‘তাকাও।’ সে আবার ফিসফিস করে বলল।
আমি অন্ধকারের দিকে তাকালাম। অন্ধকার থেকে একজন নগ্ন মানুষের প্রতিকৃতি বের হয়ে আসল। সে আদিম কালের হিংস্র মানুষ। তার দৃঢ় কাঁধ লম্বা চুল। তার হাতে যুদ্ধ করার জন্য পাথরের অস্ত্র। হঠাৎ করেই বিকট দর্শন একটা জন্তু বের হয়ে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। প্রাণীটাকে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল কোনো কুমিরের মতো। কিংবা না। এটা চারপায়ের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। মাথাটা মহিষের মতো। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হলো তাদের মাঝে। কিন্তু অবশেষে মানুষটা প্রাণিটাকে হত্যা করল। তার বুক মুখে রক্তের চিহ্ন। হাত দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। কিন্তু তার মুখে ছিল হাসি।
কিন্তু তুমি তো জানো এই ছবি দেখার জন্য আমি আকুলভাবে অপেক্ষা করিনি।
‘তাকাও।’ এটা আবার ফিসফিস করে বলল।
তখন অন্ধকারটা ফিকে হয়ে গেল। আর সেখানে বনের মাঝখানে পাহাড়ের নিচে একটা জায়াগা বের হয়ে আসল। পাহাড়ের অর্ধনগ্ন জনবসতির লোকেরা পাথুরে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকল। তাদেরকে বাধা দেয়ার জন্য বনের লোকেরাও প্রস্তুত। তারা একে অপরকে হত্যা করার জন্য চূড়ান্তভাবে মুখোমুখি হলো। তারা তুমুল যুদ্ধ করল। একে অপরকে হত্যা করল। রক্ত প্রবাহিত করল। তাদের আহতদের চিৎকারে বনের পশুরা কেউ গাছের উপরে কেউ গুহায় কেউ পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিল। অবশেষে পাহাড়ের লোকেরা বিজয়ী হয়ে বনের লোকগুলোকে বন্দি হিসেবে নিয়ে গেল।
নাহ। এই প্রতিচ্ছবিটাও আমি দেখতে চাইনি।
‘তাকাও।’ এটা আবার ফিসফিস করে বলল।
প্রথমে আমি কিছুই দেখতে পেলাম না। কিন্তু হঠাৎ করেই আনন্দের একটা গমক আমার অন্তরকে পরিপূর্ণ করে ফেলল। এটা আচমকা এক ধরনের বিজয়ের আনন্দ। আমি অন্তরে মরুভূমির সেই সকালের প্রোজ্জ্বল আনন্দটুকু মনে করতে লাগলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম সেই কাঙ্ক্ষিত পরম আনন্দ তার সুর নিয়ে ঘনিয়ে আসছে। অন্ধকারটা ফিকে হয়ে আরেকটা রূপ ধারণ করল। আস্তে আস্তে অন্ধকার কেটে কেমন আলোকিত হতে থাকল। আমার অন্তর এমনভাবে কাঁপছিল যে এই কম্পন আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। আমি একটা তোড়া দেখতে পেলাম। কিন্তু সেটা কোনো গোলাপের তোড়া ছিল না। সেটা ছিল কতগুলো মানুষের মুখের ভিড়। আমি হতবাক হয়ে পড়লাম যখন মুখগুলি চিনতে শুরু করলাম। এতো জয়নাব, বাছিনা, সামির, জামিলা, ওসমান, মোস্তফা, ওয়ারদার মুখমণ্ডল। হঠাৎ করে আমি হতাশায় ভেঙে পড়লাম। তুমি তো জানো আমি আকুল আগ্রহে এটা দেখার জন্য বসে ছিলাম না। তাহলে কোথায় সেটা? কোথায়?
সময়ের সাথে সাথে খুব দ্রুত দৃশ্যপটগুলি পাল্টে যাচ্ছে। তারা আচমকা একটা হাস্যকর খেলা শুরু করল। জয়নাব আর ওয়ারদা তাদের মুখমণ্ডল একে অপরের সাথে পাল্টাপাল্টি করল। ওসমান মোস্তফার চকচকে টেকো মাথাটা তার নিজের মাথায় বসিয়ে নিল আর মোস্তফা আমার দিকে ওসমানের দু-চোখ দিয়ে তাকাল। হঠাৎ করে সামির মেঝেতে পড়ে ওসমানের মাথাটা নিজের মাথায় লাগিয়ে আমার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে লাগল। আমি আতঙ্কিত হয়ে সামির আর ওসমানের শংকর আকৃতি থেকে পালানোর জন্য দৌড় দিলাম। আমি যত দ্রুত দৌড়াই সেও তত দ্রুত আমাকে ধরতে চেষ্টা করল। আমি বাগানের উপর দিয়ে বেড়া ডিঙ্গিয়ে নালার পাশ দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। কিন্তু অবাধ্য পাগলা ষাড়ের মতো সেও আমার পিছু পিছু ছুটতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার দম শেষ হয়ে যাওয়ার পর একেবারে নির্জীব হয়ে আমি মাটিতে শুয়ে পড়লাম। আমি শুনতে পেলাম ভৌতিক সেই প্রতিমূর্তিগুলির পায়ের শব্দ।
শয়তান স্বপ্নগুলি নিয়ে খেলছে।
পরমানন্দ অভিশাপে পরিণত হয়েছে। আমি দীর্ঘক্ষণ সেখানে শুয়ে রইলাম। তার পর এক সময় মাথা তুলে চারদিকে তাকালাম।
দেখলাম সরু লম্বা একটা গাছ কবিতার লাইন আবৃত্তি করছে, একটা গাভী বলছে যে সে দুধের ব্যবসা দিবে কারণ এ দিয়ে সে রসায়ন গবেষণা করবে।
একটা সাপ তার জিভ আর বিষাক্ত দাঁত বের করে নাচছে, একটা শেয়াল মুরগি পাহাড়া দিচ্ছে, একটা গুবরে পোকা সুন্দর সুরেলা সুরে গান গাইতেছে, একটা কাঁকড়া বিছে একজন নার্সের পোশাক পরে আমার মুখোমুখি বসে আছে।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে তাকালাম। এই স্বপ্নের একটাই অর্থ হতে পারে যে, …
যাই হোক আমি প্রায় সময়ই তোমাকে ভাবি আমার জাগরণে।
