ভিখারি – ৯

নয়

একটা অর্থহীন অবাস্তব অফিসে প্রতিদিন যাওয়া আসাটা কি অদ্ভুতই না মনে হয়। এটাকে বন্ধ করে দেয়ার মতো শক্তি সাহস তার কবে হবে।

অফিসের প্রধান কারণিক এর মধ্যে বলেছে, ‘আমরা প্রত্যেকদিন একটা করে আইনি লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছি। আমি নিজেও প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছি।’

সত্যি কথা বলতে কি সে নিজেও কাজের সমস্ত বোঝা অন্যদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। অফিসিয়াল বিষয়গুলো খুব কমই সে এখন নজরদারি করছে। দেয়াল থেকে নিষ্প্রাণ চোখগুলো তার দিকে বিমূর্ত তাকিয়ে আছে।

তবে তার সৃজনশীল আর শৈল্পিক ক্ষমতাগুলো এখন সোলায়মান পাশা স্কয়ারের একটা নতুন ফ্লাটে বেশ ভালোই কাজ করছে।

‘আমি আনন্দিত যে আমরা আমাদের নিজেদের নিরাপদ জায়গাতেই এখন বসে আছি।’ সে ওয়ারদাকে বলল। ‘শীতের মধ্যে বাইরে পিরামিড দেখতে যাওয়া ঠিক হবে না।’

ওয়ারদা তার কাঁধটাকে একটু ঝাঁকিয়ে কাবরির বিশেষ মাচার নিচে বসে বলল, ‘শীত পর্যন্ত আমার প্রতি তোমার মনোযোগ থাকবে কি?’

সে শ্যামপেনের গ্লাসটা তুলে ধরল।

‘তোমার প্রতি আমার মনোযোগ থাকবে আজীবন।’

ইয়াযবেক একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওমর তার সাথে একটু হাসি বিনিময় করে ওয়ারদার হাতটা ধরে বলল, ‘আমি ওর কাছে আসলেই ঋণী।’

‘সে আসলেই ভালো এটা সত্যি, কিন্তু তুমি যতটুকু আশা করছ তার চেয়ে বেশি লোভী সে।’

‘কিন্তু তুমিতো জানো আমি হলাম তার মানে শ্যামপেনের একজন খরিদ্দার।’

ওয়ারদা একটু ভ্রূকুচকে বলল, ‘কিন্তু এখানে প্রতিদিন আসাটা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ।’

তার চোখেমুখে একটু হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘তুমিইতো শুভ্র অভিবাদন, তোমার জন্যইতো আসা।’

ওয়ারদা তার দুচোখ দিয়ে ওমরকে একবার আলিঙ্গন করল।

‘ঐ পিরামিডটা কি এখনো দেখা হয়নি?’

‘হ্যাঁ  আমার ভালবাসা। আমার পক্ষ থেকে আমি যেমন বলেছিলাম এটা শুধু তেমন প্রেমই নয় বরং…’

ওয়ারদা মৃদুভাবে ওমরের হাতে চাপ দিল।

‘থাক তার নাম বলার দরকার নেই। এটা নিজেই নিজের নাম ঠিক করে নিক। সবচেয়ে ভালো হবে সেটা।’

‘তুমি দেখতে এত সুন্দর যে আমি পাগল হয়ে গেছি।’

‘আমি যেহেতু একজন অভিনেত্রী তাই কথাকে আমি বিশ্বাস করি না।

‘আর একজন অভিনেত্রীতো শব্দের অর্থটাকেই পরিপূর্ণ জোর দেয়।’

‘তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি কি জানো অধিকাংশ লোকই শিল্প সংস্কৃতির বিষয়ে ভুল ধারণা নিয়ে থাকে। এই জন্য আমার পরিবারকে আমি ত্যাগ করেছি। বিষয়টা এমন যে এখন আমার কোনো ভাই নেই কোনো বাবা নেই।’

ওমর তার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘অভিনয়টা নিঃসন্দেহে কাবরির ক্লাবে নাচানাচি করার চেয়ে অনেক ভালো।’

‘অভিনয়ের প্রতি আমি পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারিনি। তারা বলে এতে নাকি আমার তেমন দক্ষতা নেই। তবে নাচই আমার সত্যিকার ভালবাসা। সুতরাং সেটা কাবরিতেই হোক বা এরকম আর অন্য কোথাও যেখানেই হোকনা কেন সেটাই আমার জন্য দরকার।’

ওমর বেশ উষ্ণ স্বরে বলল, ‘কিন্তু তোমার হৃদয়টাতো সোনা দিয়ে বাঁধানো।’

‘আমি অবশ্য এই ধরনের কথা এর আগে কখনো শুনিনি।’

.

সে একাধিক লোককে তার নতুন ফ্লাটটা গোছানোর কাজে লাগিয়ে দিল। নতুন ফার্নিচার, মদ্যশালা, নানা ধরনের শৈল্পিক নকশা, চিত্রকর্ম সব কিছুর আয়োজন করা হলো। সবশেষে ফ্লাটটা বেশ চমৎকারভাবেই গোছানো হলো। পৃথক পৃথক শোবার ঘর, আপ্যায়ন কক্ষ, আর সহস্র আরব্যরজনীর মতো করে সাজানো হয়েছে বিশাল একটা হল রুম। সে টাকার যন্ত্রণাকে পাত্তা না দিয়ে দুই হাতে খরচ করল। মোস্তফা মানুবি যখন আসল দেখতে তখন সে বন্ধুর হতবাক হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘কোনো প্রকার ঠাট্টা বা তিরস্কার ছাড়া তুমি আমাকে বলোতো জীবনের অর্থ কি?’

‘জীবন!’ মোস্তফা একটু অবাক হওয়ার সুরে বলল।

‘আমি এই বোধির দেয়ালটার প্রতিটি অংশে আঘাত করেছি, অবশেষে এর ভেতরের গোপন ঐশ্বর্যের প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম।’

মোস্তফা বেশ শান্তভাবে তার কাঁধটাকে একটু ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘পাগলামি করার মাঝেও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে।’

‘গত কয়েকদিনে আমি জীবনের যে স্বাদ পেয়েছি তা এর আগে কখনো আমি পাইনি। কোনো কিছুই এখন কোনো ব্যাপার না।’

মোস্তফা হাসতে হাসতে বলল, ‘ইয়াযবেকের অস্বস্তিটাই তাহলে এই মেয়েটার বিশ্বস্ততাকে প্রমাণ করল।’

‘মেয়েটা সৎ হতে পারে আবার অনেক বড় অভিনেত্রীও হতে পারে।’

‘কিন্তু সেতো অভিনয়ে ব্যর্থ হয়েছে।’

মেয়েটা যখন প্রথম এই ফ্লাটে ঢুকেছিল তখন সে বেশ অবাক হয়েছিল। সে বেশ প্রশ্রয়ের সুরেই বলেছিল, ‘তুমি শ্যামপেন সত্যিকার অর্থেই খুব বেশি খাও কিন্তু সত্যিকার অর্থে তুমি খুব অপব্যয়ী। টাকা নষ্ট করতে তোমার কষ্ট লাগে না।

ওমর ওয়ারদাকে খুব আলতোভাবে চুমু খেয়ে বলেছিল, ‘এটাই আমাদের পাখির নীড়ের মতো ছোট্ট বাসা।’

আমি তোমাকে কোনোভাবেই চাপ দিতে চাই না আমি চাই তুমি আমার প্রকৃতটাকে ভালোভাবে চিনে নাও।’

‘যদি আমি আমার ওয়ারদাকে ভালোভাবে নাও চিনতে পারি তাহলেও আমি কোনো ধরনের পাগলামি করব না।’

ওয়ারদা বেশ প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলল, ‘তাহলে তোমার চেনা না চেনার জন্য আমি কিন্তু দায়ী নই।’

‘কিন্তু পিরামিড?’

‘এটা কিন্তু আগুন যখন আমাদের একটু তাতিয়ে দিয়েছিল তার চিৎকার। এর মানে কিন্তু এই নয় যে চিৎকার করাই আমাদের স্বভাব।’

ওমর সোফার মধ্যে একটু হেলান দিয়ে শুয়ে বলল, ‘মোস্তফা আমাকে বলেছে ইয়াযবেক নাকি বেশ দুঃশ্চিন্তায় আছে।’

‘আমি অন্য কারো সাথে বের হতে অস্বীকার করতেই পারি। সে ইচ্ছা করলে যেখানে খুশি চলে যাক।’

‘আর সেখানে চিরজীবন থাকুক।’

‘আমি কাবরি ক্লাবে আমার নাচার কাজটা কমিয়ে দেব।’

‘তুমি আমাকে বলো গোলাপের সুগন্ধি পানি কি তোমাকে সিক্ত করেছে? তুমি অনেক সুন্দর।’

ওয়ারদা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘আজ খুব গরম পড়েছে। আমি ফ্লাটের নতুন এই বাথরুমে একটা গোসল দেব।’

ওমর তার বাইরের কাপড় পাল্টালো। হলরুমে ঢুকে সে বুঝতে পারল তার মনের রোগটা দূর করার জন্য যথেষ্ট আনন্দ আর সুখ এখন আছে। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘গোসলখানার ঝর্নার পানি এখন কি করছে?’

গোসলখানার দরজার ওপার থেকে ওয়ারদার কণ্ঠ ভেসে এল।

‘কিছু একটা ঠিক মনে হচ্ছে না।’

দরজা খুলে গেল। ওয়ারদা একটা তোয়ালে দিয়ে নিজেকে পেচিয়ে তড়িৎ একবার তার দিকে তাকিয়ে দ্রুত শোয়ার ঘরে চলে গেল। বেশ পুলকিত হয়ে ওমর তার চোখটা একটু বন্ধ করল। তার ছোট্ট এই ফ্লাটটা হয়তো পিরামিডের আনন্দটা আবার পুনরাবৃত্তি করবে। তার হাতে এখন এমন জিনিস আছে যেটা হয়তো তার হৃদয়ের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে নিবৃত্ত করবে। ওয়ারদা হয়তো মার্গারেটের মতো হারিয়ে যাবে না।

তোমার এক ঘনিষ্ঠ উকিল বন্ধু একবার অফিসে তোমাকে বলেছিল, ‘একজন পরিশ্রমী সফল আইনজীবী হওয়ার জন্য যে প্রণোদেনার দরকার তোমার মাঝে ইদানীং সেটা দেখা যাচ্ছে।’

তুমি হেসে বলেছিলে, ‘সফল হওয়ার জন্য যতটুকু হাস্যোজ্জ্বল দরকার আমার মনে হয় তার চেয়ে কম আছে।’

সে তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য তার পছন্দের বিষয় রাজনীতিকে নিয়ে আসল।

সে বলল, ‘লোকজন বর্তমানে আসলে কি ভাবছে। তাদের চাওয়াপাওয়াটা কি?’ রাজনীতিতে তোমার অনাগ্রহতা নিয়ে তুমি উত্তর দিলে, ‘পাগলের মতো আনন্দ অন্বেষণ করা।’

সে তোমার কথার কিছুই বুঝল না। সে একটু নারীঘেঁষা। কিন্তু তুমি কিন্তু সেরকম নও।

শোয়ার ঘরের দরজা অর্ধেক খুলে গেল। তার ভেতর দিয়ে ওয়ারদা মাথা বের করে বলল, ‘অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এখন একটা চুমু না খেলে আমি মরে যাব।’

ওমর তার দিকে দৌড়ে গেল। ওয়ারদার চিবুকটা দুই হাত দিয়ে ধরে তার মুখটা সামনে এনে সে ওয়ারদাকে চুমু খেল। ওয়ারদার শরীরের মিষ্টি সাবানের ঘ্রাণ সে পেল। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি কি ভিতরে আসতে পারি।’

ওয়ারদা তাকে হাসতে হাসতে একটু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, সেকেলের মতো ঢং করো না।’

সে আবার সোফার মাঝে গা এলিয়ে দিল। তার সামনে রেডিও টেলিভিশন রাখার ট্রের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর আবার উঠে দাঁড়িয়ে সে শোয়ার ঘরের দরজায় নক করল।

ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এল, ‘হাই!’

‘আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।’

‘আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে।’

‘তুমি তোমার সমস্ত জীবনে আর কী চাও।’

‘ভালবাসা।’

ওমর বেশ নাটকীয় সুরে বলতে থাকল, ‘জীবনের অর্থ কি এই বিষয়টা নিয়ে তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ?’

‘ভালবাসা ছাড়া এর কোনো অর্থ নেই।’ ওয়ারদা বলল। ‘তুমি কি কখনো এর সৌন্দর্য থেকে দূরে থেকেছ?

‘খুব কম।’

ওমর তার কথা চালিয়ে যেতে থাকল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রিয়তমা তুমি কি এতে অস্থির হও না যে যখন আমরা আনন্দফূর্তি করে বেড়াচ্ছি তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী খুব গুরুত্বের সাথে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।

তার কথা শুনে ওয়ারদা বেশ জোরে হেসে উঠল। তারপর বলল, তুমি কি দেখছ না এই আমরা যখন বেঁচে থাকার খুব চেষ্টা করছি তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী কি রকম আনন্দফূর্তি আর খেলাধুলায় মত্ত।’

‘তুমি এত সুন্দর সাজিয়ে অলংকারপূর্ণ কথা বলা কোত্থেকে শিখেছ?

‘কিছুক্ষণ পর তুমিও এর রহস্যটা জানতে পারবে।’

রাত যখন অতিক্রান্ত হয়ে যায় আর নির্দয় সকালটা আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় তখন তুমি অপরিহার্যভাবে তোমার হতাশাগ্রস্ত ডেরায় ফিরে যাও। সেখানে কোনো সংগীত নেই, কোনো আনন্দ নেই, সেখানে দুঃখী চোখগুলো আর পাথরের দেয়ালগুলো নির্বাক তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। বিষণ্ন তারের সংগীত বালুঝড়ের মতো কর্কশ সুরে তোমার পাশে ঘুরপাক খেতে থাকে। বার বার তোমার ভেতর থেকে একটা কথাই বের হয়ে আসতে থাকে, ‘আমাকে বিরক্ত করো না।’

শব্দগুলো তোমার কানে লাগার মতো চলতেই থাকে।

‘আমি বলেছি আমাকে বিরক্ত করো না। আমি এভাবেই আজকে আগামীকাল প্রত্যেকদিন থাকতে চাই। যেটা যেভাবে আছে সেভাবেই মেনে নাও। আমার মেয়েগুলোকে ঝগড়ার মাঝে এনো না। ওদেরকে এর থেকে দূরে রাখ। সমঝোতার কোনো পথ নেই। যা আমাকে আনন্দ দেয় আমি তাই করব। তুমি কি চাও সেটা নিয়ে তুমি ভাবতে পার। আমি এই সব কিছু নিয়ে খুব ক্লান্ত।’

ঘরের দরজা খুলে ওয়ারদা তার পূর্ণ দীপ্তি নিয়ে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলল, ‘আমার সুইট হার্ট তুমি আমাকে নিয়ে কি ভাবছ।

সে তার দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে এমন কিছু বলার সুযোগ দাও যেটা ইতিপূর্বে কেউ কোনো দিন বলেনি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *