ভিখারি – ৩

তিন

এখন থেকে তুমি নিজেই ডাক্তার। তুমি স্বাধীন। আর মুক্ত থেকে যে কাজ করা হয় সেটা সৃষ্টিশীল কাজ বলে মনে করা হয়। এমনকি সেটা যদি শরীরের মেদ কমানোর কাজও হয়ে থাকে। আমরা যদি বলি মানুষকে শুধুমাত্র গোগ্রাসে খাওয়া আর উদরমুক্তির জন্য তৈরী করা হয়নি বরং আত্মার মুক্তির জন্য তৈরী করা হয়েছে তাহলে তুমি দেখতে আগস্টের মেঘগুলি কেমন চকচকে হয়ে পড়ত আর ঝড়ো বাতাসগুলি কেমন সুর করে গেয়ে উঠত।

কিন্তু এখন এই মানুষের ভিড় আর ঘামের গন্ধের মাঝে ব্যায়াম করাটা তোমার জন্য খুব কষ্টকর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমার পাগুলো এমনভাবে চলছিল যে মনে হচ্ছিল তুমি এই প্রথমবারের মতো কিভাবে হাঁটতে হয় সেটা শিখছ। চোখদুটি দানবের চোখের মতো যেন বড় হয়ে বের হয়ে আসছিল। ক্লান্ত হয়ে সে পাশেই একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। পচিশ বছরের অন্ধত্ব নিয়ে যেন তুমি মানুষগুলিকে দেখছিলে।

এভাবেই হয়তো নদীর তীর আদম আর হাওয়ার সৃষ্টি দৃশ্য দেখেছিল। অথচ তাদের কেউই জানত না কে স্বর্গ থেকে বের হয়ে পৃথিবীতে আসছে। কায়রোর ছোট্ট এক কর্মচারীর ছেলে কোনো অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ একটা যৌবন হেঁটে পার করে ফেলেছে অথচ তার পরবর্তী প্রজন্ম একটু হাঁটতে গিয়ে মাটির সাথে যুদ্ধ করছে আর মানসিক অবসাদে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। অতীত খুব শীঘ্রই খাঁচার ভেতর থেকে বের হয়ে আসবে আর অনেক বেশি যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

‘ওসমান তুমি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’ ওমর বলল।

‘তুমি কি ফুটবল খেলতে চাও না?’ ওসমান বলল।

‘আমি খেলাধুলা পছন্দ করি না।’

‘কবিতা ছাড়া কি আর কিছুই না?’

‘তোমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। আর তোমার সাথে তর্ক করেই কি লাভ। তুমি তো জানো কবিতা আমার জীবন। কবিতার দুটো লাইন আমার কাছে প্রজাপতির দুটো পাখার মতো স্বৰ্গীয় নাচ নাচতে নাচতে আকাশে মিলিয়ে যায়। ব্যাপারটাতো এমনই ঠিক না মোস্তফা?’

টেকো মাথার মোস্তফা বলল, ‘আমাদের চারপাশে যে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব এক নিখুঁত শিল্পকর্ম ছাড়া আর কিছু না।’

একদিন ওমরের বন্ধু সমাজতন্ত্র আন্দোলনের ছাত্রনেতা ওসমান একটা আন্দোলনের আড্ডায় বেশ সোরগোল করেই বলেছিল, ‘আমাদের সব ধরনের সমস্যার একটা যাদুকরি সমাধান আমি পেয়েছি। আমরা সর্বোচ্চ একটা আদর্শিক রাষ্ট্রে পৌঁছতে পারি। কবিতার ছন্দগুলো আজ প্রকম্পিত বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব নয় আমরা আরেক মাধ্যাকর্ষণের কথা বলছি যাকে কেন্দ্র করে এক কাল্পনিক ভারসাম্যে সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা আরেকটার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না আবার একটার উপর আরেকটা পড়ছে না। কিন্তু যখনই আমরা কোনো কষ্ট আর বাধার মুখোমুখি হই তখনি আমরা পরিণতি খারাপ হওয়ার পরেও আরামদায়ক বিছানার দিকে ছুটে যাই। শরীরের মেদ আর থলথলে চর্বিকে মেনে নিয়ে হাঁটার পরিবর্তে দামী কেডিলাক গাড়িতে করে ছুটে বেড়াই।’

সমুদ্র সৈকতে নানা রং-এর ছাতাগুলো একটার সাথে আরেকটা মিশে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে বিচিত্র রকমের কোনো দুর্গ। ছাতাগুলোর নিচে প্রায় অর্ধ- উলঙ্গ শরীরগুলো শুয়ে আছে। সমুদ্রের তীরে ঘামের কটু দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আছে আর সূর্যটা প্রখর তাপ দিয়ে যাচ্ছে।

বাছিনা হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়েছিল। মেদহীন চমৎকার গড়ন। তার তামাটে হাত আর পা দেখা যাচ্ছে। মাথার চুলগুলো নীল রঙের সুতির একটা টুপি দিয়ে ঢাকা।

ওমর নিজেও প্রায় অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় শুয়ে আছে। তার বুকের কালো লোমগুলো সূর্যের দিকে মুখ করে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট মেয়ে জামিলা পায়ের কাছে বসে বালি দিয়ে পিরামিড বানাচ্ছিল। স্ত্রী জয়নাব পাশে চামড়ার একটা খাটিয়ার উপর হেলান দিয়ে শুয়েছিল। তার ভারী শরীর আর বুকের দিকে নির্লজ্জ মানুষগুলো প্রায় নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল।

প্রিয় মোস্তফা,

শিল্পসাহিত্য নিয়ে আমি তোমার সাপ্তাহিক নিবন্ধটি পড়েছি। খুবই অসাধারণ আর ধারালো একটা নিবন্ধ। তুমি বলেছ যে তুমি হলে খই আর দুধ বিক্রেতা। এই সব কথা ছাড় আসল কথা হলো সূক্ষ্ম বিশ্লেষণীমূলক কলম চালনায় তোমার রয়েছে ভালো অভিজ্ঞতা। এমনকি ঠাট্টা করেও তুমি যেটা লেখ সেখানেও একটা শৈলী থাকে।

তোমাকে ধন্যবাদ যে তুমি আমাদের বিষয়ে জানতে চেয়েছ, যদিও এটা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তোমার প্রবন্ধগুলোর জন্য এই চিঠিগুলোকে তুমি দ্বিতীয় স্তরে রাখতে পার। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার সাথে আমার দীর্ঘ একটা বৈঠক দেয়ার প্রয়োজন। জয়নাব ভালো আছে। সে তার অভিবাদন তোমাকে জানিয়েছে। এবং তোমার প্রয়োজনীয় ঔষুধগুলোর কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিতে বলেছে। আমি মনে করি তার এই অহেতুক উদ্বেগজনিত সমস্যা খুব স্বাভাবিক। তুমি তো জানো কিছু হলেই ওষুধের প্রতি তার একটা স্বাভাবিক দূর্বলতা আছে। সে ওষুধ পছন্দ করে। বাছিনা বেশ আনন্দে আছে। আমি যেভাবে চাইছিলাম সেভাবে বাছিনার মনটা আমি এখন পড়তে পারছি। তবে জামিলাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব সুখে আছি। কারণ সে এখনো কিছুই বোঝে না। তুমি আমার উন্নতির কথা শুনলে অবাক হবে। আমি পনের পাউন্ড ওজন এর মধ্যে কমিয়ে ফেলেছি, এক হাজার কিলোমিটার হেঁটেছি, কয়েক টন মাংস খাওয়া থেকে বিরত থেকেছি। ডিম, মাখন, দুধ তৈল মাছ সব কিছু পরিহার করেছি। আমি বুঝতে পেরেছি খাবারের প্রতি আগ্রহ শুধু মৃত্যুকেই ডাকে। তুমি ছাড়া যখন আমি অন্য কাউকে আর কথা বলার মতো খুঁজে পেলাম না তখন আমি নিজেই নিজের সাথে কথা বলছি। জয়নাব কথাবার্তায় যদিও খুব সংযমী কিন্তু তারপরেও আমি বুঝতে পারছি না কেন এই শান্ত সংযমী কথাবার্তা আমাকে খুব বিরক্ত করছে। সমুদ্র থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটা উন্মাদ লোকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। সে তার পাশ দিয়ে যেই যাচ্ছিল তাকেই লক্ষ্য করে নেতাদের মতো হাত তুলে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছিল। একমাত্র তার কথাবার্তাই আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। বেশ মজা পেয়েছিলাম তার কথা শুনে। সে আমাকে দেখে বলল, ‘আমি কি তোমাকে বলিনি?’

আমি বেশ গুরুত্ব দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ  বলেছ।’

‘তাহলে লাভটা কি হলো? আগামীকালই পুরো নগরীটা ভরে যাবে বোয়াল মাছে তখন তো তুমি পা রাখার জন্য এক ইঞ্চি জায়াগাও পাবে না।’

‘পৌরসভার উচিত…’

সে আমার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, ‘পৌরসভা কিছুই করবে না। বরং তারা পর্যটনের জন্য আরো উৎসাহের সাথে এটাকে স্বাগতম জানাবে। ফলে এখানকার অবস্থা এমন হবে যে এলাকার বাসিন্দারা পালাবে আর কৃষিকাজের রাস্তাগুলো অভিবাসীদের লাইন দিয়ে ভরে যাবে। আর এই সমস্ত কারণে মাছের দাম বাড়তেই থাকবে।’

আমি তার মনটাকে পড়তে চাইছিলাম। যাই হোক আমি এখন একটা সুখী পরিবারের বাবা। আমি খুব সন্তর্পণে দেখছি যখন বাছিনাকে আমি গোপনে কানে কানে কিছু বলছি তখন জামিলা আমাদের উপর সমুদ্রের বালি নিয়ে চড়াও হচ্ছে। যালিমে আমাদের বাড়িটা খুবই আরামপ্রদ আর বিলাসবহুল। গতকাল আমরা যখন বিচের কেবিনে ছিলাম তখন আমাদের এক প্রতিবেশী বলল যে অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িগুলো সরকার জাতীয়করণ করে ফেলবে। জয়নাবের মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। সে আমার দিকে সাহায্যের জন্য তাকাল। আমি বললাম, ‘আমাদের অনেক টাকা আছে।’

সে জিজ্ঞেস করল, ‘টাকা কি আমাদের রক্ষা করতে পারবে?’

‘আমরা আমাদের ভাগ্যের বিরুদ্ধে অনেকগুলো ইন্সুরেন্স করে রেখেছি।’

সে আবারো উদ্বেগ মেশানো গলায় বলল, ‘কিন্তু তুমি নিশ্চিত হলে কিভাবে..?’

আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘তার আগে তুমি আমাকে বলো তুমি এত মোটা কিভাবে হয়ে গেলে?’

সে বলল, ‘তোমার যৌবনে তুমি তাদের মতো ছিলে। সমাজতন্ত্র ছাড়া তুমি আর কোনো কথা বলতেই পছন্দ করতে না। আমি মনে করি এটা এখনো তোমার রক্তের ভেতরে আছে।’

তার পর সে আমাকে আবারো মনে করিয়ে দিল আমি যেন তোমাকে ঠিক মতো ঔষুধের কথা বলি। মোস্তফা আমি কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দেই না। সত্যি কথা বলতে কি কোনো কিছুই আমাকে উদ্বেগী করে না। আমি জানি না আমার কি ঘটতে যাচ্ছে। আমার কাছে সব ধরনের কথাবার্তা অর্থহীন মনে হয়। দৈবাৎ একদিন আমি অন্ধকারে দুইজন প্রেমিকপ্রেমিকার কথা বার্তা শুনেছিলাম।

প্রেমিকটি বলছিল, ‘প্রিয়তমা এটা খুব বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে।’

মেয়েটি বলল, ‘তার মানে এটার অর্থ হলো তুমি আমাকে ভালবাস না।’

‘কিন্তু তুমি তো খুব ভালো করেই জানো আমি তোমাকে ভালবাসি।’

‘তুমি খুব যুক্তিপূর্ণভাবেই কথা বলছ যার অর্থ তুমি আমাকে ভালবাস না।’

‘তুমি কি দেখনি আমি একজন বয়ঃপ্রাপ্ত বিবাহিত দায়িত্ববান পুরুষ।’

‘তুমি আমাকে শুধু বলো যে তুমি কি আর আমাকে ভালবাস না?’

‘আমরা একসাথেই ধ্বংস হয়ে যাব আর আমাদের বাড়িঘরগুলো ধ্বংস করে দেব।’

‘তুমি কি এই সব আজেবাজে কথা বন্ধ করবে।’

‘তোমার নিজের স্বামী আছে মেয়ে আছে, আমার স্ত্রী আছে সন্তান আছে।’

‘আমি তো বলেছি আমাকে আর ভালবাসার দরকার নেই।’

‘কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি।’

‘তাহলে ভালবাসা ছাড়া আমার আর কোনো স্মৃতি রইল না।’

আমি বেশিক্ষণ এই চমকপ্রদ গোপন কাহিনীর পাশে না থেকে চলে আসলাম আর মনে মনে হাসলাম মহিলাটার সাহস দেখে আর লোকটার আতঙ্ক দেখে। কিন্তু তারা অনেক দিন পর আমার বুকের ভেতর পুরাতন এক বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দিল। সেটা হলো ভালবাসা। প্রেম। আল্লাহ জানে কত দীর্ঘকাল হয়েছে ভালবাসা ছাড়া আমি কাটিয়েছি। কিভাবে আমি একজন প্রেমিকার হৃদয়ে আবার ঢুকতে পারি। তুমি তো জানো জয়নাব আমার একমাত্র ভালবাসা। কিন্তু সেটাতো ছিল বিশ বছর আগে।

এখানে আমি আমার ওজন কমানোর চেষ্টা করছি আর জয়নাবকে দেখছি একটা পরিবারের ভিত্তি রক্ষায় পরিচালকের ভূমিকায়। বিশ্বাস করো আমি সত্যি বলছি কোনো কিছুতেই এখন আমি আর আগ্রহ পাই না। আমি জানিনা আমার কি হতে যাচ্ছে বা কি পরিবর্তন হচ্ছে। আনন্দ করো বন্ধু। আমি আমার স্বাস্থ্য রক্ষা করছি কিন্তু আসলে আমি পাগল হতে যাচ্ছি।

আমার মনে হয় তুমিই খুব ভাগ্যবান।

.

‘ঔষুধের বিষয়ে তাকে লিখতে ভুলো না।’

‘আমি তাকে সেটা লিখেছি।’

বাছিনা তুমি দেখতে কি সুন্দর। তোমার শারীরিক গঠন পৃথিবীর আনন্দের কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আর আমি হলাম পুরনো একজন মানুষ। তোমার নির্দেশনার জন্য তোমার মাকে ঠিক করলাম। যাতে তুমি পৃথিবীকে বুঝতে পারো। এটা খুবই চিন্তার বিষয় যে তুমি জীবন সম্পর্কে কিছুই জানো না। আমি তোমাকে কাছে কাছে রাখছি। তোমার আর আমার মাঝে খোলামেলা কথা বলার পরও কি তুমি কিছু বিষয় আমার কাছে গোপন করো নি? সমুদ্র তীরের এই অর্ধ নগ্ন মানুষগুলো, বাতাসে সমুদ্রের ঢেউয়ে আকুল করা ঘ্রাণ কি তার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলেনি। হা প্রভু সমাজটা যেন তার চিন্তাভাবনা আর ক্রিয়াকলাপের সাথে তাল মিলিয়ে চলে নয়তো সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ওমর বাছিনাকে বলেছিল সে তখন ওমরের চেয়ারের পাশেই বালির উপর বসা।

‘ইতিপূর্বে একসাথে আমাদের এত ভালো সময় যায়নি।’

‘এটা তোমার দায়িত্ব ছিল।’

‘আমিতো সারাটা জীবন শুধু তোমাদের জন্যই অফিসে কাটালাম।’

বাছিনা তার হাতের উপর ভর করে পেট আর বুক সূর্যের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। খোলা চকচকে আকাশ থেকে সূর্যের কিরণ তখন তার বুকে আর পেটের উপর পড়ছিল। আকাশে এক খণ্ড সাদা মেঘ ভেলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বাছিনার মা হাতের কাজ করছিল। সেখান থেকে মাথা না তুলেই বাছিনাকে বলল, ‘তাকে বলো যে তার স্বাস্থ্য এখন সব চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

‘অট্টালিকাগুলো জাতীয়করণের চেয়েও কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’

সে দৃঢ়ভাবেই বলল, ‘বাড়িঘরগুলো জাতীয়করণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

ওমর বলল, ‘সামাজিক উপযোগিতা আসলেই ভালো একটা বিষয়।’

জয়নাব কিছুই বলল না।

সে আবার বলল, ‘আমি যখন আবার স্বাভাবিক জীবনে চলে যাব তখন এমন একটা দর্শন চালু করব যেটা সত্যিকার অর্থে সুখই নিয়ে আসবে।’

‘আল্লাহ আমাদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করুক।’

‘আল্লাহ চায় আমরা যেন তার কাছে সকল মানুষের মঙ্গল প্রার্থনা করি।’

তারপর সে জয়নাবের দিকে তাকিয়ে বেশ কৌশুলি চোখে বলল, ‘কিন্তু এই অবস্থায় আল্লাহ কিভাবে আমাদের প্রার্থনার উত্তর দিবেন?’

জয়নাব তার কথার অর্থ বুঝতে পারল কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। ওমরও প্রসঙ্গ ভুলে গিয়ে আরেকটা চিন্তায় ডুব দিল। সে এখন বেশ হাল্কা, প্রফুল্ল আর শক্তিবোধ করছে। একদিন বাছিনা তোমার কাছ থেকে আরেকজনের তত্ত্বাবধানে চলে যাবে। ঐযে দূরে বসে জামিলা বালির পিরামিড বানাচ্ছে সেও। তুমি আসলে কি চাও।

তোমার মক্কেল তোমাকে বলেছিল, ‘আমি আমার কেসটা মহোদয়ের কাছে বিশ্বস্ততার সাথে অর্পণ করতে চাই।’

কি হাস্যকর মাননীয় কাউন্সেলর। এই সব কিছুই জাতীয় সার্কাসের কাজের জন্য দিয়ে দেয়া হচ্ছে।

নানা রকম অদ্ভুত চিন্তায় ওমর আবারো উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল।

‘প্রিয়তম তোমার কি হয়েছে? তোমাকে খুব বিক্ষিপ্ত মনে হচ্ছে।’

‘না তেমন কিছু না।’

‘তুমি ঠিক আছ তো?’

‘আমি তাই মনে করি।’

‘কিন্তু আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে তোমার এখন একটু যত্ন নেয়া দরকার।’

‘অভিজ্ঞতাকে অবশ্য আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত।’

‘আমি কি তোমাকে রান্নার বিষয়ে মতামত দিতে পারি।’

‘রান্নার জন্য কোনো মতামতের দরকার আছে কি?’

জয়নাব বলল, ‘একজন সফল পরিতৃপ্ত ব্যক্তি শয়তানের দুষ্ট চোখের শিকার হতে পারে।’

‘তুমি সেটা বিশ্বাস করো?’

‘না বিশ্বাস করি না। কিন্তু মাঝে মাঝে সন্দেহ এক ধরনের ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করে।’

‘তাহলে তোমাদের এখন সবার ভূতের ওঝার কাছে যেতে হবে।’

‘তুমি কি মনে করো ভূতের এই আছর তোমার চরিত্রে নেই?’

ওমর হাসতে হাসতে বলল, ‘ছোটখাটো এই সব আছর তেমন কোনো ক্ষতিকর না।’

‘বাদ দাও এইসব কথাবার্তা।’

তারা যখন বাড়ির পথে ফিরে যাচ্ছিল তখন জয়নাব তার দুই মেয়ের জন্য রাস্তায় ওমরের সাথে একটু দাঁড়াল।

‘তোমার জন্য আমার কাছে একটা সু-সংবাদ আছে।’

কথা শুনে ওমর বেশ রহস্যময় ভাবে জয়নাবের দিকে তাকাল।

‘আমি বাছিনার মাঝে কিছু একটা লক্ষ্য করছি যেটা আগে কখনো দেখিনি।’

‘আগে কখনোই তুমি তার মাঝে এমন লক্ষ্য করো নি?’

‘হ্যাঁ। ওমর সে একজন কবি।’

ওমর বিস্ময়ে তার ভ্রূ দুটি উপরের দিকে তুলে তাকাল।

‘আমি তাকে নিবিষ্ট মনে লিখতে দেখেছি। সে আমাকে নিশ্চিত করেছে যে এটা কবিতা ছিল। আমি হাসতে হাসতে তাকে বলেছিলাম.. ‘

জয়নাব একটু ইতস্তত করছিল। তখন ওমর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তাকে কি বলেছিলে?’

‘আমি তাকে বলেছিলাম তুমিও কবি হতে যাচ্ছ।’

সে ভ্রূ কুচকে বলল, ‘তুমি তাকে বলোনি এই কাজ করতে গিয়ে কিভাবে আমি এর শেষ করেছিলাম।’

‘কিন্তু এই বয়সে তার মতো একটা মেয়ের কবিতা লেখাতো দারুণ ব্যাপার।’

‘ঠিক আছে।’

‘এখন তুমি অবশ্যই তার কবিতাগুলো পড়বে আর তাকে উপদেশ পরামর্শ দিবে।’

‘আমার উপদেশের যদি কোনো গুরুত্ব থাকে তাহলে সেটা আমার জন্যই মঙ্গলজনক হবে।’

‘তুমি কি সংবাদটা শুনে খুশি হওনি?’

‘অনেক খুশি হয়েছি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *