পনেরো
সে বাড়িতে ফিরে আসল জয়নাবের প্রতি ভালবাসা বা ঘৃণা কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই। ঘৃণার অনুপস্থিতিটা আসলে জয়নাবের অনুপস্থিতিকেই প্রমাণ করে।
সে জয়নাবকে বলল, ‘আমাদের এই ক্লেশকে আরো বীরত্বের সাথে মুখোমুখি হওয়া উচিত।’
জয়নাব মূলত বেশ সাহস আর ধৈর্যের সাথেই উপস্থিত হলো। তার আচরণ দেখে ওমর একদিন বলল, ‘তুমি সত্যিকার অর্থেই ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি।’
সে তার রাতের অভিসারগুলো থেকে দূরে থেকে সন্তানদের মাঝেই আনন্দ খুঁজে পেল। কিন্তু ব্যালকনির নিচে নীল নদের প্রবাহের দিকে তাকিয়ে সে আবার মরুভূমির ঐ সকালের শান্তির জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতে থাকল।
সে তার ঘরে রাত কাটাতে লাগল বই পড়ে, ধ্যান করে, আর দিনের বেলা সে বারান্দায় চলে আসে। তারপর দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। ভাবে শান্তি কোথায়?’
আরবি কবিতা, পারসি কবিতা, আর ভারতীয় কবিতার মধ্যে শুধু রহস্য কিন্তু সুখ কোথায়।
‘আল্লাহকে ধন্যবাদ।’ মোস্তফা একদিন বলল। ‘সব কিছুই আবার স্বাভাবিক ভাবে ফিরে এসেছে।’
সে খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, ‘কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসেনি।’
মোস্তফা অবশ্য তর্কে যেতে চাচ্ছিল না কিন্তু ওমর ছাড়তে রাজি হলো না।
‘আমি আমার ঘরে ফিরে আসিনি, কাজে ফিরে যাইনি।’
‘কিন্তু প্রিয় বন্ধু আমার….
‘আর কেউ জানে না সামনের সময়গুলোতে কি পরিবর্তন অপেক্ষা করছে।’
এক বিকেলে ওমর তার অফিসে বসেছিল। এই সময় হঠাৎ করেই একজন লোক তার অফিসে ঢুকল। লোকটা মধ্য আকৃতির, গায়ের রঙ মলিন, মুখমণ্ডল লম্বাটে, মাথার চুল মুণ্ডানো, হাত আর নাক বেশ মজবুত।
ওমর এক মুহূর্ত অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে তারপর হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে গেল। উত্তেজিত গলায় বলল, ‘ওসমান খলিল!’
দুই বন্ধু পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ডেস্কের সামনে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসল। ওমর কিছুতেই নিজের উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখতে পারছিল না। বার বার সে ওসমানকে অভিবাদন জানাচ্ছিল, তার এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছিল। ওসমান শুধু মিটমিট করে হাসছে। সে বলার মতো কিছু পাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারা আবার একে অপরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। আশ্চর্য সব ভাবনা তখন স্মৃতিতে ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু তারপরেও ওমর তার একেবারে গভীরে পূর্বঘোষিত এক ভয়ের উপস্থিতি টের পাচ্ছিল। বন্ধুর সাথে এই ধরনের আড্ডাটা নিয়ে সে শঙ্কিত। কারণ তার অবস্থা এখন সে রকম নেই। সাম্প্রতিক সময়ে সে তার সময়চক্রসহ সব কিছুই হারিয়েছে। বন্দিজীবন এখনো শেষ হয় নাই। যদিও সে বুঝতে সক্ষম ছিল না যে তার এক তৃতীয়াংশ এর মধ্যেই অতিবাহিত হয়ে গেছে। কিন্তু তার বর্তমান যে মানসিক অবস্থা সেখানে সে এরকম একটা বৈঠকের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
একজন লোক জেলখানা থেকে এই পৃথিবীতে আবার প্রবেশ করেছে আর অন্যজন পরিচিত এই পৃথিবীকে ত্যাগ করতে চাচ্ছে অজানা কোনো জগতের জন্য।
‘অনেক দিন পর তাই না।’
ওসমান হাসল।
‘তুমি একটা মুহূর্তের জন্যও আমাদের মন থেকে অনুপস্থিত ছিলে না। এখন আবার তুমি স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চলে এসেছ।’
ওসমান বেশ গমগমে কণ্ঠে বলল, ‘তোমার যদিও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু তোমার স্বাস্থ্যটা যেমন হওয়ার কথা ছিল তেমন নেই।’
ওমরের খুব ভালো লাগল যে বন্ধু বিষয়টা লক্ষ্য করেছে। ‘হ্যাঁ আমি একটা অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত। কিন্তু বন্ধু দয়া করে এখন আমাকে নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমি এখন চাই যে তুমি কথা বলে যাও আর আমি শুনতে থাকি।’
ওসমান অপেক্ষা করছিল। একজন সেবক কোকাকোলা আর কফি নিয়ে আসল। তারপর ওসমান বলল, ‘বছরের পর বছর পার হয়ে গেছে, দিনগুলোকে লম্বা বছরের মতো ঘৃণ্য মনে হতো আর বছরগুলোকে দিনের মতো অকিঞ্চিৎকর মনে হতো। এখন আর বন্দি জীবনের কাহিনী শুনতে চেয়ো না।’
‘আমি বুঝতে পেরেছি। এটা সত্যিকার অর্থেই খুব দুঃখজনক। .. .. তুমি বের হয়ে এসেছ কবে?’
‘দুই সপ্তাহ আগে।’
‘তুমি এতদিন কেন আসোনি?’
মুক্তি পেয়েই আমি সোজা গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে জ্বরে আক্রান্ত হলাম। অসুখ সারার পর চলে আসলাম কায়রোতে।’
এখান থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। এই মুহূর্তে তোমার ভেতরে একরকম অপরাধবোধ তৈরী হচ্ছিল।
‘এটা আমাদেরকে খুব কষ্ট দিত যে আমরা তোমাকে দেখতে যেতে পারতাম না।’
‘পরিবারের সদস্য ছাড়া কেউ দেখা করতে গেলেই তাকে গ্রেফতার করা হতো।’
‘আমরা তোমাকে সম্ভবপর সহোযোগিতা করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি।’
‘শুরুতেই আমাদের সাথে খুব খারাপ আচরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।’
বন্ধুর কথা শুনে ওমরের ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। সে বলল, ‘সবচেয়ে ভালো হতো আমরাও যদি তোমার সাথে জেলে যেতে পারতাম।’
ওসমান একটু শ্লেষের সাথে বলল, ‘আমাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে জেলখানায় ঢোকানো হয়েছিল।’
ওমর একটু সংকোচের সাথে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমরা আমাদের স্বাধীনতার জন্য বিশেষ করে আমাদের জীবনের স্বাধীনতার জন্য তোমার কাছে ঋণী।’
‘তুমি কি একই কাজ করতে না যদি তুমি জেলখানায় বন্দি থাকতে আর আমি মুক্ত থাকতাম।’
ওসমানের কথা শুনে ওমর লজ্জা আর সংকোচে চুপ মেরে বসে থাকল।
ওসমান তিক্ত স্বরে আবার বলল, ‘এই যে আমি মধ্যবয়সে আবার এই পৃথিবীতে ফিরে এসেছি।’
ওমর তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল।
‘তুমি এখনো তরুণই আছ। তোমার সামনে দীর্ঘ একটা জীবন অপেক্ষা করছে।’
‘শুধু তাই না আমার সামনে হতাশার চেয়েও কষ্টকর আর বিষণ্ণ একটা অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে।’
ওমর একটু দুঃখিত হয়ে বলল, ‘মাঝে মাঝে আমার ভয় হয় যে আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’
ওসমান বাধা দিয়ে বলল, ‘এভাবে বলো না। আমার শেষ সান্ত্বনাটুকু কেড়ে নিও না।’
ভীতিপ্রদ একটা অনুভূতি ফিরে আসল। তার কাছে মনে হল পৃথিবীর পৃষ্ঠে পড়ে থাকা সে একটা মৃতদেহ। সে বলল, ‘দেখ আমরা আমাদের কাজ করি, তারপর বিয়ে করি, সন্তান উৎপাদন করি, অথচ আমার মনে হয় কি জানো? আমার মনে হয় শুধু চিটা শস্যগুলো ছাড়া আমার আর কোনো কিছু অর্জন করার মতো নেই। আমাকে তোমার অবশ্যই ক্ষমা করা উচিত। কারণ আমার নিজের বিষয়েই কথা বলার কোনো অধিকার আমার নেই।’
‘কিন্তু আমরা দুজনেই তো একে অপরের জন্য অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
অতীততো পার হয়ে গেছে। তার হিসেবনিকেশ বড় কঠিন। ওসমান একদিন মোস্তফা আল মিনাবির বাড়িতে বেশ সোরগোল করেই বলল, ‘আমাদের কয়েদখানা এমন লোহায় তৈরী যা কখনো ভাঙা যাবে না। আমরা কাজ করব সমগ্র মানবতার জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট একক দেশের জন্য না। আমরা মানবজাতির জন্য জ্ঞান বিজ্ঞানময় আর বিপ্লবের একটা পৃথিবী তৈরী করতে চাই।’
তার কথার সম্মতি জানিয়ে সবাই যখন হাততালি দিল তখন ওসমান আবার বলল, ‘আমি খুব খুশি যে মোস্তফা সেই ভীতুই আছে আর ওমর নতুন বিয়ে করেছে। আগামীকালই ভোগবাদীদের কাছ থেকে একটা বোম এসে পড়বে আর তারা আমাদের রক্তগুলো চেটে চেটে খাবে।’
‘তোমার চিন্তাভাবনা ঠিক আছে। যদি বন্দুকের গুলি তোমার পায়ে আঘাত না করে তাহলে তারাতো তোমাকে গ্রেফতার করতে পারবে না।’
‘ভালো কথা। কিন্তু তুমি আর মোস্তফা কি করবে?’
‘আমরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করব, ‘দুঃখবোধ করব।’
ওসমান একটু শুষ্ক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি স্বীকারোক্তি দিব তোমরা কি এতে ভয় পাচ্ছ না?’
‘মোস্তফা তার সাথে পালিয়ে যাবার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছে। আমরা তারপর ভেবেছিলাম লুকিয়ে থাকব। বেশ কিছু দুর্বিষহ দিনের ভেতর দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি ক্ষমতাধর মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করলে। আমরা ছিলাম কিন্তু আমাদের কিছুই নেই।’
ওসমান তার বাবা মাকে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই সাহায্যের জন্য ওমরকে বলল। কিন্তু ওমর তার কথা শুনতে চাইল না। ওসমান সাথে সাথেই আবার বলল, ‘আমি অতীতের জন্য বিলাপ করতে চাই না। যেহেতু আমি আমার ভাগ্যকে ঠিক করে নিয়েছি। আর বেশ ভালোভাবেই আমি জানি আমি কি করছি। কিন্তু এখন তোমাকে বলতে হবে পৃথিবীতে কি হতে যাচ্ছে।’
ওমর কথার প্যাঁচ থেকে পার পাওয়ার জন্য একটু হেয়ালি করে বলল, ‘ভবিষ্যৎ এখন আমাদের মূল উদ্বেগের বিষয়।’
‘ভবিষ্যৎ! …ঠিক আছে আমি তাহলে আমার আইন ডিগ্রিটাকে আবর্জনায় ফেলে দেব।’
‘তখন আমার অফিস থাকবে তোমার নিয়ন্ত্রণে।’
‘চমৎকার। কাজ করার জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো বাধা নেই।
‘তাহলে তুমি এখন থেকেই কেন শুরু করছ না?
‘অনেক ধন্যবাদ। … কিন্তু তার আগে তুমি আমাকে বলো পৃথিবীতে কি ঘটতে যাচ্ছে।’
সে তার মনোভাব পাল্টাতে চাচ্ছিল না। ব্যাপারটা কত অদ্ভুত যে তুমি কখনোই তার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলে না। তার সাথে এই ধরনের বৈঠকের জন্য তুমি আগ্রহীও ছিলে না। তোমাদের মাঝে মৃত ইতিহাস ভাগাভাগি করা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর সে তোমার কাছে শুধু অপরাধবোধ, ভীতি, আর আত্মঘৃণাই নিয়ে আসে।
আর এইতো এখানে সে ভাগ্যের মতোই তোমার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে যখন তুমি পরিচিত এই পৃথিবী আর মানুষদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাইছ।
ওমর বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার অন্য বন্ধুদের খবর কি?’
‘ও তারাতো নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। মোস্তফা আল মিনাবি ছাড়া কারো সাথেই আমার যোগাযোগ নেই।’
‘তোমরা তাহলে কি করেছ?’
‘সত্যি কথা বলতে কি তুমি যে বৎসর গ্রেফতার হলে তখন সময়টা খুব বাড়াবাড়ি রকম সহিংসতা আর ভীতিপ্রদ ছিল। আমাদের বাধ্য হয়েই চুপ করে যেতে হয়েছিল। এর পরতো যে যার কাজে ঢুকে গেল। আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম। বিপ্লব ভেঙে গেল। তার সাথে সাথে পুরাতন পৃথিবীটাও ভেঙে পড়ল।
ওসমান হাত দিয়ে তার প্রশস্ত চিবুকটা ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে ঠাণ্ডা একটা ভাব। মনে হচ্ছে চোখগুলো অতীত হয়ে যাওয়া নষ্ট বছরগুলোর জন্য আর্তনাদ করছে। কি বিরক্তিকর পরিস্থিতি। সে প্রায় সময়ই ভাবে এই অবস্থাগুলোই তার জন্য দুঃস্বপ্ন আকারে ঘুমের মধ্যে এসে হাজির হয়।
সে বলল, ‘আমি প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করি কেন, হ্যাঁ কেন? জীবন আমার কাছে কুৎসিত প্রতারণা নিয়ে হাজির হয়। আমার ভাগ্যকে নিয়ে আমি অবাক হই, যে মানুষগুলোর জন্য আমি কারাগারে গেলাম তাদের পা-গুলোই আমার কপালকে এখন ঠুকছে। কিন্তু কেন? আমি জিজ্ঞেস করি কেন? এই ব্যাপারটাতো পিপীলিকা সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীদের ক্ষেত্রে সত্য না। আমি আমার কথা বাড়াতে চাই না। শেষ পর্যন্ত হয়তো আমার বিশ্বাস থেকে আমি সরে আসব। কি দুর্ভাগ্য! আমি এই প্রজ্বলিত সূর্যের নিচে, পাথুরে এই ভূমির উপর আবার নিজের বিশ্বাসকে আবিষ্কার করব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়নি।’
ওমর ওসমানের বক্তব্যের সাথে একমত হয়ে সম্মান জানিয়ে তার মাথাটা একটু নিচু করল। কিন্তু ওসমান বেশ উত্তেজিত স্বরে তার কথা চালিয়ে যেতে থাকল।
নষ্ট অতীত নিয়ে পড়ে থাকাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না যখন আমাদের ভীরুতার চেয়ে আরো অনেক বেশী শক্তিশালী হয়ে ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।’
ওমর সামনের এই খরপ্রবাহ থেকে বের হওয়ার একটা পথ খুঁজছিল।
‘যেভাবেই হোক অতীতের নষ্ট পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে একটা সত্যিকারের বিপ্লবের মাধ্যমে। সুতরাং তোমাদের কোনো স্বপ্ন হয়তোবা বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
তাকিয়ে দেখ তার চেহারাটা কিভাবে ক্রোধে কুচকে যাচ্ছে আর সেখানে ঝড় এসে একত্র হচ্ছে। আর এখানে তুমি এমন একটা ক্ষেত্রে পরাজয়কে চুমুক দিয়ে পান করছ যেখানে তোমার কোনো আগ্রহই নেই। অথচ সে বুঝতেই পারছে না আমাকে কোনো কিছুই আকর্ষণ করছে না।
ওসমান বেশ দুঃখ করে বলল, ‘তুমি যদি পালানোর জন্য ছোটাছুটি না করতে তাহলে তোমার অবস্থানটা তুমি হারাতে না।’
‘আমাদের কোনো ক্ষমতা ছিল না অথবা জনগণের মধ্যে আমাদের কোনো অনুসারীও ছিল না যাকে কিছু বলা যায়। আর কোনো যাদুবলে আমরা যদি এগিয়ে যেতামও তাহলে এই উপমহাদেশ আমাদের ধ্বংস করে ফেলত।’
‘এটা দুর্ভাগ্য যে অসুস্থ ব্যক্তিই শুধু অসুস্থতার চিন্তা করে।’
‘তুমি কি মনে করো তাদেরকে উপেক্ষা করে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হতো।’
‘না এটা যুক্তিপূর্ণ হতো না, বরং পাগলামিই হতো। কিন্তু তুমি কি বুঝতে পারছ না পৃথিবীটা পাগলামির কাছে কতভাবে ঋণী।’
সে বেশ নরমভাবে বলল, ‘যদি বিপ্লবটা সংঘটিত হতো আর সঠিক সমাজতন্ত্রের পথেই এগুতো তখন …’
ওসমান খুব সরুভাবে তার দিকে তাকাল। ওমর ওসমানের এই মনোভঙ্গিটা পছন্দ করল না।
‘যাই হোক এই বিপ্লব কখনোই আমার মতো পুঁজিবাদীদের স্পর্শ করত না। বরং এখানে আরো নানা রকম ট্যাক্স বসিয়ে দিত।’
সে বিরক্তির সাথে শ্বাস ছেড়ে তার কথা শেষ করল, ‘বিশ্বাস করো আমি কোনো কিছুরই অনুগত নই। সুতরাং তাদেরকে জাহান্নামে যেতে দাও।’
ওসমান তার কথা শুনে হাসল। ‘আমার প্রিয় বন্ধু একটু খোলাখুলি কথা বলো আমার সাথে। তুমি একসময় যেমন বিশ্বাসী ছিলে এখন কি সেরকম নও?’
ওমর তার নিজের জায়গায় বসে একটু ভাবল।
‘বিপ্লবটা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি একরকম ছিলাম। কিন্তু বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর আমি এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম। রাজনীতি থেকে আমার কৌতূহল কমতে শুরু করল। আমি অন্য পথে ঘুরে গেলাম।’
‘অন্য পথ?’
সে ইতস্তত করে বলল, ‘মোস্তফা এটাকে আমার সৃজনশীল অতীতের নষ্টালজিয়া বলতে পছন্দ করে।’
ওসমান অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শিল্প আর মূলনীতির মাঝে কোনো বিরোধ আছে কি?’
ওমর বিরক্ত আর হতবুদ্ধি হয়ে উত্তর দিল, ব্যাপারটা খুব সহজ নয়।
ওসমান হতাশ হল তার কথা শুনে। ‘আমি বুঝতে পারছি যে তুমি আর আগের মতো নও।’
জয়নাব আর ওয়ারদাও তার বিষয়ে একই কথা বলেছিল।
সে বলল, ‘আমি স্বীকার করছি আমাকে নিয়ে তোমার আর উদ্বেগের কিছু নেই।’ তারপর সে ওসমানের দিকে তাকিয়ে বেশ উৎফুল্লের সাথে বলল, ‘এখন যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো অতীতকে ভুলে তুমি একটা নতুন জীবন শুরু করো।’
‘আমি ভয় পাচ্ছি, কারণ যা অতীত হয়ে গেছে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো আমি কিছু পাব না।’
‘আমার অফিসটা এখন তোমারই। এখন তোমার শুধু দরকার শুরু করা।’
‘আমি জানি না কিভাবে তোমাকে ধন্যবাদ জানাবো।’
‘তার কোনো দরকার নেই। আমি সব সময়ই তোমার কাছে ঋণে আবদ্ধ।’
তারপর সে বেশ তরল গলায় বলল, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে তুমি জয়নাব আর মোস্তফা আর পরিবারের সবাইকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছ। চলো আজ রাতে আমার বাড়িতে একটা নৈশভোজ হয়ে যাক।’
