চার
হঠাৎ করেই তার মনের ভেতর এক ধরনের সুখানুভূতি তাকে আন্দোলিত করে তুলল। এই ধরনের ঝড়োনুভূতি ভয়ের কারণ। তার বুকের ভেতর আনন্দ উচ্ছ্বাসের ঝড় বয়ে গেল। সে এই রকম অনুভূতি গত বিশ বছরেও কখনো পায়নি। সমুদ্রের দিকে মুখ করে সে মেয়েকে ডাকল। বাছিনা আজ পরেছে বেশ নকশা করা একটা ফতুয়া আর খুব আঁটসাঁট জিন্স প্যান্ট। পায়ের গোড়ালি থেকে শুরু করে ঊরু পর্যন্ত প্যান্টটা খুব সংকীর্ণ হয়ে লেগে আছে। তিনি মেয়েকে মুখোমুখি তার সামনে বসালেন।
‘আমার সাথে সূর্যাস্ত দেখার জন্য তোমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
মেয়ের চোখে মুখে যদিও তখন চলে যাওয়ার জন্য একধরনের ওজর আপত্তি ফুটে উঠেছিল। তিনি সেটা লক্ষ্য করলেন। তিনি জানেন বাছিনার এখন মা আর বোনের সাথে বাগানে খেলতে যাওয়ার কথা। তারপরেও তিনি মেয়েকে বললেন, ‘তোমাকে আমি তাড়াতাড়িই ছেড়ে দেব যাতে তোমার মা আর বোনের কাছে তুমি যেতে পার। তার আগে তুমি আমাকে বলো কবিদের কি সূর্যাস্ত দেখা পছন্দ করা উচিত নয়?’
তিনি লক্ষ্য করলেন মেয়ের চিবুক দুটো কেমন লাল হয়ে উঠেছে। তিনি একটু হাসলেন।
‘কিন্তু বাবা….বাবা দেখো আমি কিন্তু কবি নই।’
‘কিন্তু তুমিতো কবিতা লেখো।’
‘আমি কিভাবে বুঝব যা আমি লিখেছি সেগুলো কবিতা।’
‘আমি ভালো করে দেখে বিশ্লেষণ করে তোমাকে বলব।’
‘না বাবা তার কোনো প্রয়োজন নেই।’ বাছিনা খুব লজ্জিত আর বেশ কাঁপা গলায় কথাগুলো বলল।
তিনি বললেন, ‘দেখ আমাদের মাঝে কোনো গোপনীয়তা থাকার প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করি।’
‘বাবা ঐ লেখাগুলো কেবল দুর্বল বাক্য ছাড়া আর কিছুই না।’
‘আমি তোমার দুর্বল বাক্যের এই কবিতাগুলোকেই পছন্দ করি।’
বাছিনা লজ্জায় তার চোখ নামিয়ে ফেলল। চোখের লম্বা পাপড়িগুলো চিবুকের ত্বক স্পর্শ করল। তিনি গভীর মনোযোগের সাথে খুব গুরুত্ব দিয়ে মেয়েকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাছিনা তুমি আমাকে বলো কেন তুমি কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়েছিলে?’
‘আমি ঠিক জানি না বাবা।’
‘তুমি তো বিজ্ঞান নিয়ে ভালো কাজ করতে পারতে। কবিতার প্রতি কোন বিষয় তোমাকে উৎসাহিত করেছে?’
বাছিনা ভ্রূ কুচকে মনে করার চেষ্টা করতে থাকল।
‘স্কুলের পাঠ্য বইয়ের কবিতাগুলো। আমি সেগুলো খুব উপভোগ করতাম বাবা।’
‘অনেক মানুষইতো এমনটা করে।’
‘কিন্তু আমি মনে করি আমি অন্যদের চেয়ে খুব বেশি প্রভাবিত ছিলাম।
‘তুমি কি এ ছাড়া আর অন্য কোনো কবিতা পড়েছিলে।’
‘আমি কিছু কবিতার সংগ্রহ পড়েছিলাম।’
‘কবিতা সংগ্রহ? কখন কোত্থেকে?’
বাছিনা হাসল।
‘আমি সেগুলো তোমার লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করেছিলাম।’
‘সত্যি বলছ?’
‘আমি জানি তুমি নিজেও একজন কবি।’
মেয়ের এই কথাটা তাকে একটু কষ্ট দিল। কিন্তু তিনি সেটাকে পাত্তা না দিয়ে বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে উৎসাহিত হওয়ার মতো বললেন, ‘না না আমিতো কবি না। এটা ছেলেবেলার একধরনের সময় কাটানো খেলা ছিল।’
‘বাবা তুমি নিশ্চিত একজন কবি ছিলে। যাই হোক আমি কবিতার মাঝেই এক ধরনের আকর্ষণ খুঁজে পাই।’
আমার বন্ধু তুমি আমাকে মঞ্চের ব্যাপারে উৎসাহী করেছিলে অথচ আমি একজন কবি। আমি নিজেকে এমন একটা জলঘূর্ণির মাঝে পেয়েছি যেখান থেকে কবিতা ছাড়া বের হওয়ার কোনো পথ নেই। কবিতাই আমার অস্তিত্বের একমাত্র লক্ষ্য। কবিতা ছাড়া আমরা ভালবাসা দিয়ে কি করব যেটা জীবনধারী বাতাসের মতো আমাদের চারপাশকে ছেয়ে আছে। কিংবা আমাদের হৃদয়ের গোপন সব অনুভূতিগুলো যা আগুনের মতো ক্রমশ আমাদের দগ্ধ করে যাচ্ছে। কিংবা এই বিশ্ব যেটা কোনো রকম দয়া কিংবা ক্ষমা ছাড়াই নিষ্ঠুরভাবে আমাদের দমন করে যাচ্ছে। আমার বন্ধু সুতরাং কবিতার ব্যাপারে খুব বেশি উদাসীন হয়োনা।
তিনি মনে মনে কথাগুলো ভাবলেন।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে আরো কিছু বলো।’
বাছিনা তার স্বভাবসুলভ উৎসাহ নিয়ে কথা বলতে থাকল।
‘বাবা এটা আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে আমি বাতাস থেকে কোনো গানের সুর ধরছিলাম।’
‘খুব ভালো অনুভূতি বাছিনা। কবিতা খুব চমৎকার একটা বিষয়। এটা কখনো মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে না।’
‘বাবা তুমি কি বলতে চাচ্ছ?’
‘আমি তোমার পড়াশোনা তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু এখন শুধু তোমার কবিতা নিয়েই কথা বলার সময়।’
বাছিনা একটা রূপালি রঙ-এর খাতা নিয়ে এসে তার সামনে রাখল। তিনি ভালবাসা, উদ্বেগ আর স্মৃতিকাতরতা নিয়ে খাতাটা খুলে পড়তে লাগলেন।
সময় ১৯৩৫ এর মাঝামাঝি। বছরটা ছিল উত্তেজনা, তীব্র যাতনা, গোপন পরিকল্পনা আশা আকাঙ্ক্ষা আর একটা আদর্শিক রাষ্ট্রের স্বপ্নের। এর মধ্যেই ওসমান একদিন ঘোষণা করল সে সকল সমস্যার একটা সফল সমাধান খুঁজে পেয়েছে। জানা গেল তার ছোট্ট মেয়েটা যে কিনা এখনো কুড়ি থেকে পরিপূর্ণ ফুল হয়ে ফুটে ওঠেনি সে প্রেমে পড়েছে। কে সেই সুন্দর যুবক যার শ্বাস প্রশ্বাসে মেঘ ঘনীভূত হয়ে উঠে, যার জন্য গাছের ডালপালা মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করে। আর কেনইবা এই খবরে আমাদেরকে বিচলিত হতে হয় যখন যে পথে আমরা একদিন হেঁটে গিয়েছিলাম সে পথে আমাদের সন্তানেরা হাঁটার ইচ্ছা করে। তার বাবারই বা কি অবস্থা হবে যখন সে শুনবে যে সে নিজেই তার নাতনিকে ভালবাসার বিষয়ে কথা বলছে।
লেখাগুলো পড়ে তিনি মেয়েকে বললেন, ‘এগুলো সত্যিকার অর্থেই কবিতা।’
তার কথা শুনে মেয়ের চোখে মুখে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে চকচক করে উঠল।
সে বলল, ‘সত্যি?’
‘খুব সুন্দর কবিতা।’ তিনি বললেন।
‘বাবা আমার মনে হচ্ছে তুমি শুধু আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য এমনটা বলছ।’
‘না। এটাই সত্যি।’
তার পর তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, কিন্তু এই ছেলেটা কে?
বাবার কথা শুনে মেয়ের চোখে যে উৎসাহের প্রজ্বলন ছিল সেটা যেন হুট করে নিভে গেল।
সে খুব হতাশ গলায় বলল, ‘কোন ছেলেটা?’
‘এই কবিতাগুলোর মাঝে যাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।’
কথা শেষ করে তিনি বেশ জোড় গলায় মেয়েকে কাছে টেনে বললেন, ‘শোন মা আমি মনে করি তোমার আর আমার মাঝে কোনো গোপনীয়তা রাখা ঠিক হবে না।’
কিন্তু বাছিনা খুব হেয়ালিভাবে হাল ছেড়ে দেয়ার মতো করে বলল, ‘বাবা সে আমাদের পরিচিত মানুষদের মধ্যে কেউ না।’
‘তাহলে বোঝা যাচ্ছে তুমি তোমার বাবাকে বিশ্বাস করছ না।’
‘বাবা আমি বলতে চাচ্ছিলাম সে কোনো মানুষ নয়। ‘তাহলে সে কি ফেরেস্তা।’
‘না সে কোনো ফেরেস্তা নয়।’
‘তাহলে সে কে…? কোন স্বপ্ন…? কোন প্রতীক….?’
বাছিনা একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বের সাথে বলল, ‘না এটা হলো সকল কিছুর মূল লক্ষ্য সর্বশেষ প্রান্ত।’
তিনি কপাল আর হাত থেকে ঘাম মুছে নিলেন। তার গলার স্বর থেকে যথা সম্ভব গম্ভীরতা আর কর্কশভাবকে মুছে বেশ গুরুত্বের সাথে তিনি মেয়েকে বললেন, ‘তাহলে এখন তুমি অস্তিত্বের গোপন রহস্যের বিষয়ে মুগ্ধ?’
বাছিনা খুব ভয়ে ভয়ে বলল, ‘বাবা এটার সম্ভাবনাটাই খুব বেশি।’
যখন আমরা ধারণা করি যে আমরা অপরজনের কাছ থেকে ভিন্ন তখন আমরা খুব বোকার মতোই এই চিন্তা করি।
‘এই সমস্ত বিষয়গুলো কিভাবে তোমার কাছে আসল।’
‘আমি জানি না বাবা। … … এটা বলা খুব কঠিন। কিন্তু তোমার কবিতাই প্ৰথম পথটা দেখিয়েছে।’
কথা শুনে ওমর খুব প্রাণ খুলে হাসল।
‘আমার মনে হচ্ছে এটা একটা পারিবারিক ষড়যন্ত্র। তোমার মা অনেক আগে থেকেই সব কিছু জানে। আর এই গুলোই তোমাকে বুঝিয়েছে। যেগুলোকে তুমি এখন কবিতা বলছ।’
কিন্তু বাবা সত্যিকার অর্থেই এগুলো খুব সুন্দর কবিতা। খুব প্রভাবিত করে এগুলো।’
মেয়ের কথা শুনে তিনি আরো জোরে হাসিতে ফেটে পড়লেন।
‘যাক শেষ পর্যন্ত আমি একজন মুগ্ধ পাঠক আর প্রশংসাকারী পেলাম। কিন্তু এই গুলো কবিতা ছিল না। এই গুলো ছিল একধরনের বিচ্ছিন্ন কল্পনা। সৌভাগ্যবশত একটা সময় আমি এগুলোকে ধরতে পেরেছিলাম।’
‘যাই হোক আমি এগুলোর মাঝে পরমানন্দ পেয়েছিলাম।’
‘তাহলে তুমি তোমার পড়ালেখার মাঝে এটাকে এভাবেই তৈরী করেছ?’
‘বাবা তুমিতো এমনাটাই বলেছিলে।’
‘তাহলে বোঝা যাচ্ছে কবিতাই তোমার প্রিয়তম।’
‘হ্যাঁ এটা যেমন তোমার প্রিয় ছিল।’
তিনি ভাবলেন হায় এখনতো আর কোনো প্রিয়তমা নেই। হৃদয়ে এখন শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নেই। আকাশের নক্ষত্রগুলোর মাঝে এখন শুধু শূন্যতা আর অন্ধকার আর শত শত আলোক বছরের দূরত্ব ছাড়া আর কিই বা আছে।
বাছিনা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা এখন তোমার মত কি?’
‘আমি তোমাকে শুধু বলব তুমি যা ইচ্ছা হয় তাই করতে পার।’
বাছিনা তখন খুব আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা তুমি আবার কবে কবিতায় ফিরে আসবে।’
‘আল্লাহর কাছে দোয়া কর আমি যেন আগে আমার অফিসে ফিরে যেতে পারি।’
‘আমি খুব আশ্চর্য হচ্ছি যে তুমি খুব সহজেই এটাকে ছেড়ে দিয়েছিলে।’
তিনি একটু লজ্জিতভাবে মুচকি হেসে বললেন, ‘এটা একরকম বিনোদনমূলক খেলা ছাড়া আর কিছু ছিল না।’
‘কিন্তু বাবা তোমার কবিতা সংকলনের কি হবে?’
‘একবার আমি ভেবেছিলাম যে আমি চালিয়ে যাব।’
‘আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি কে তোমাকে থামালো।’
সে খুব বিব্রতভাবে একটু হাসল। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন খোলাসা করে সে কিছু বলতে উৎসাহ বোধ করল।
‘আমার গান কেউ শোনে না।’
নিরবতা আর উপেক্ষা সব সময়ই কষ্ট দেয়। কিন্তু মোস্তফা একবার বলেছিল, ‘সাধনা করো আর ধৈর্য ধরো।’
ওসমান বলেছিল ‘তুমি বিপ্লবের জন্য কলম ধরো দেখবে লক্ষ লক্ষ শ্রোতা তোমার গান শোনার জন্য কান পেতে আছে।’
নিরবতা সবসময়ই তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে দমিয়ে রাখবে। কবিতা কখনো তোমাকে ধরে রাখবে না।
মোস্তফা একদিন খুব আনন্দের সাথে বলেছিল যে তালিয়া গ্রুপ তার নাটকটিকে মঞ্চস্থ করতে রাজি হয়েছে। তখন তার কাছে নিরবতার নামের উপেক্ষাটা আরো কঠিন হয়ে চেপে বসেছিল।
বাছিনা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা আমার গান কারো শোনার দরকার আছে কি?’
তিনি মাথা তুললে মেয়ের ঝুঁকে পড়া কালো চুল তার মুখে এসে পড়ে। তিনি ভাবেন কি দরকার নিরবতা থেকে আরো নিরবতার মধ্যে অস্তিত্বের রহস্য বের করা। তিনি খুব নরম স্বরে মেয়েকে বললেন, ‘তুমি কি চাও না লোকজন তোমার কবিতা শুনুক?’
‘অবশ্যই চাই। আর আমি এটা যেভাবেই হোক ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখার চেষ্টা করব।’
চমৎকার। তুমি তোমার বাবার চেয়েও অনেক সাহসী আৰু সেরা। এটাই দরকার।’
‘কিন্তু বাবা তুমি তো ইচ্ছা করলেই আবার কবিতায় ফিরে আসতে পারো।’
‘আহা সেই ইচ্ছা পুরোপুরিই শেষ হয়ে গেছে। মৃত্যু হয়েছে ভার।’
‘আমি কখনোই সেটা বিশ্বাস করি না। আমার কাছে তুমি সব সময়ই একজন কবি।’
তার এই বেঢপ পরিত্যাক্ত শরীর নিয়ে, আইনবিষয়ক নানা রকম কাজকর্মে ডুবে থেকে, আর বিভিন্ন ধরনের ইমারত তৈরীর কাজে ব্যস্ত থেকে আর খাবার খেয়ে খেয়ে অসুস্থ অবস্থায় কবিতা নিয়ে সে কিই বা করতে পারে। এমনকি মোস্তফা একদিন চেয়ারে বসা থেকে উত্তেজিত হয়ে তার দিকে ঝুঁকে বলেছিল, ‘কোন বিষয়টা তোমার চেষ্টাটাকে নষ্ট করে দিয়েছে।’
আর তুমি সেদিন মোস্তফার দিকে তাকিয়ে খুব উদ্বেগের সাথে উত্তর দিয়েছিলে, ‘তালিয়া গ্রুপ তোমার নাটকটাকে খুব সাদরে গ্রহণ করেছে। এটাকে অভিবাদন জানিয়েছে। এটা আসলেই খুব ভালো একটা কাজ ছিল।
একটু তাচ্ছিল্যের ভাব করে সে তার হাতটাকে ভাঁজ করে এনে বলল, ‘আমি তোমার মতো আমার জীবনটাকে মনে করতে চাই।
‘তোমার মধ্যে সব সময় ধৈর্য আর স্থিরতার অভাব ছিল।’
সে খুব শুষ্ক একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘তুমি কখনোই মানুষের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করতে পারবে না।
‘তুমি কি আবার একজন আইনবিদ হিসেবেই শুরু করতে চাও?’
‘আইন সেটা তো শিল্পের আগেই মরে গিয়েছে। এমনকি আমাদের উপলব্ধি ছাড়াই শিল্পকলার ধারণাটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। শিল্পসাহিত্যের যুগ শেষ। আমাদের সময়ের শিল্পতো খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাগ হয়ে গেছে। একমাত্র সম্ভাবনাময় শিল্প হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানমঞ্চে পশুপাখি জীবজন্তুর খেলা দেখানো সার্কাস ছাড়া শিল্পের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রকে দখল করে নিয়েছে।’
‘আমরা সত্যিকার অর্থেই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছি একজন আরেকজনের কাছ থেকে।’
‘না বরং তুমি বলো যে আমরা চূড়ান্ত প্রাপ্তিতে পৌঁছে গেছি। তুমি তোমার জীবনের সফলতাকে তার একটা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পার। আমার মতে হাস্যরস, আনন্দ প্রাচুর্যই হচ্ছে বিংশ শতাব্দির ক্লান্ত মানুষের সবচেয়ে মূল উদ্দেশ্য। আমিতো মনে করি সত্যিকার অর্থে শিল্পকর্ম হচ্ছে একটা আলো যেটা এমন একটা নক্ষত্রের কাছ থেকে আসছে যে নক্ষত্রটা মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে মারা গেছে। আমাদের উচিত এখন সার্কাসের ভাড়কে সে যতটুকু চায় ততটুকু সম্মান করা।’
‘আমারতো এখন মনে হচ্ছে দর্শনও শিল্পকে ধ্বংস করেছে।’
‘না বরং বিজ্ঞান, শিল্প ও দর্শনকে ধ্বংস করেছে। সুতরাং শিশুদের নিষ্পাপ উৎসব আর মানুষের বুদ্ধিমত্তা, চমৎকার সব গল্প আর অর্থহীন দুর্বোধ্য চিত্রকর্ম নিয়ে আসো কোনো বাছবিচার ছাড়াই আনন্দ করি। এই সব কিছুই আমাকে আনন্দ দেয় আবার কষ্টও দেয়। আমার পারস্পরিক বিপরীতযুধি অনুভূতি নিয়ে আমি খুব কষ্টে আছি।’
‘তুমি যেভাৱে বিজ্ঞানকে ধারণা করছ তাতে আমারতো মনে হচ্ছে আমাদের জীবনের চৌহদ্দিতে এটা অনধিকার প্রবেশ ছাড়া আর কিছু নয়।’
‘শোনো আমরা এমন কতগুলো মানুষ যারা অনেকগুলো গোপন দুঃখকে বয়ে বেড়াচ্ছি। ক্ষত এই জায়গাগুলোকে বের করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’
‘কিন্তু আমরাতো দীর্ঘ দিন ধরেই এই অবস্থায় আছি।’
‘আল্লাহর শপথ এই ক্ষতগুলোকে উন্মুক্ত করো না।’
‘বিজ্ঞানীরা তাদের বিশ্বস্ততা আর সত্যের ব্যাপারে অনেক সতর্ক। অথচ আমাদের টাকার শক্তি যেটা দিনকে দিন তার বৈধতাকে খুইয়ে বসছে।’
‘সুতরাং আমি তোমাকে বলি যে মৃত্যুই একমাত্র মানুষের জীবনের মূল সত্যটার প্রতিনিধিত্ব করছে।’
ওমর তার মেয়ের সবুজ চোখের দিকে খুব নরমভাবে তাকিয়ে বলল, ‘বাছিনা তোমাকে যদি বিজ্ঞান পড়াটা বন্ধ করতে নিষেধ করি তাহলে এটা কি অযৌক্তিক হবে?’
আমিও সেরকম মনে করি। কিন্তু আমি এটাও মনে করি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হবে কবিতা।’
‘এটাকে হতে দাও। আমি এই নিয়ে কোনো তর্কও করতে চাই না। কিন্তু ধরো তুমি একই সাথে একজন কবিও হতে পারো আবার একজন প্রকৌশলীও হতে পারো।’
‘মনে হচ্ছে তুমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ছো?’
‘হ্যাঁ অবশ্যই। আমি চাই না যে তুমি নিজেকে এমন একটা সময় প্রস্তরযুগে থাক যখন তোমার চারপাশে সবাই বিজ্ঞানের যুগে বসবাস করবে।’
‘কিন্তু কবিতার কি হবে?’
তিনি মেয়ের কথায় বাধা দিয়ে বললেন, ‘মামণি আমি তোমার সাথে বিতর্কে যেতে চাচ্ছি না। আমার বন্ধু মোস্তফা বিজ্ঞানের মধ্যে ধর্ম, কবিতা, এবং দর্শনকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু আমি তার সাথে একমত নই। আমি তোমাকে নিয়ে খুব সন্তুষ্ট আর গর্বিত।’
ঐতো লাল থালার মতো সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে। কোনো অজ্ঞাত কেউ এর শক্তি আর তীব্রতাকে শুষে নিচ্ছে। পানির দিকে যেভাবে শান্ত চোখে তাকানো যায় এখন সূর্যের দিকে সেভাবে তাকানো যাচ্ছে। এর চারপাশে মেঘেরা জমাট বাঁধছে।
মোস্তফা তুমি কি সত্যিই আমার গোপনকে জানতে চাও? ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণায় আমি শক্তিকে দেখেছি। ঐ অশুভ শক্তিকে দেখেছি যাকে আমরা সব সময় উচ্ছেদ করতে চাই।
কিন্তু প্রিয় বন্ধু মোস্তফা তুমিতো এর মধ্যেই আমার গোপনীয়তাকে জেনেছ।
