উনিশ
আমি ঘাসের উপর শুয়ে উপরে গাছের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম। অন্ধকারে গাছের পাতাগুলো সকালের মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে। আমি অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ করে আমি কয়েকটা পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। তার পর ফিসফিস করে গলার স্বর।
‘শুভ সকাল ওমর।’
একটা ভূত আমার পাশে এসে দাঁড়াল। এটা আরেকটা স্বপ্ন। কিন্তু এখন আমি আর কোনো কিছুই উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। কোনো কিছুই দেখছিলাম না।
সে বলল, ‘তোমাকে দেখার আশা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। তুমি এখানে কেন শুয়ে আছ। তুমি কি ভিজা স্যাঁতসেঁতে এই ঠাণ্ডাকে ভয় পাও না?’
সে ঘাসের উপর বসে আমার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিল। আমি তার হাতটা ফিরিয়ে দিলাম।
‘তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না?’ তুমি কি আমার গলার স্বর ভুলে গেছ?’ আমি যন্ত্রণাকাতর স্বরে বললাম, ‘শয়তান কখনোই আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।’
‘তুমি কি বলছ ওমর? খোদার দোহাই তুমি আমার সাথে কথা বলো। আমি তোমাকে নিয়ে খুব ভয় পাচ্ছি।’
‘তুমি কে?’
‘কি আশ্চর্য! আমি ওসমান খলিল।’
‘তুমি কি চাও?’
‘আমি ওসমান। তুমি কি বুঝতে পারছ না। যা ঘটেছে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া আমার কিছুতেই উচিত হবে না।
আমি তাকে হাত দিয়ে ধরে বুঝতে চেষ্টা করলাম।
‘কিন্তু এটাতো সমীরের শরীর নয়। তুমি কেন এই সময়ে এসেছ।’
‘সমীর?… তুমি সত্যি সত্যিই আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ।’
‘কিন্তু আমিতো ভয় পাইনি। আর পাগলের মতো কাঁদছিও না।’ সে আমাকে স্পর্শ করল।
‘খোদার দোহাই বন্ধুর মতো তুমি আমার সাথে কথা বলো। তোমার বিষয়ে আমাকে আর হতাশ করো না।’
‘এর মানে কি?’
‘ওমর শোনো। আমি খুব বিপদে আছি। তারা আমাকে প্রত্যেকটা জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। যদি আমাকে খুঁজে পায় তাহলে আমি মরে যাব।’
‘তাহলে তুমি এখন ফেরারী।’
‘নিরাপদ সময়ে পর্যন্ত পালিয়ে যাবার আগে আমি তোমার এখানে লুকিয়ে থাকতে চাই।’
আমি তাকে কষ্টের সাথে বললাম, ‘কিভাবে শয়তান জানে আমি এখানে ছিলাম।’
‘আমরা প্রথম থেকেই তোমার এই জায়গাটার ব্যাপারে জানতাম। মোস্তফার মতো সাংবাদিকের পক্ষে এর খবর রাখা খুব কঠিন কিছু না। সে প্রায়ই এদিকে যাওয়াআসা করে। যারা তোমার জন্য খাবার আনানেওয়া করত সে তাদের দিয়ে তোমার উপর নজর রাখত। আমরা তোমাকে কিছুতেই বিরক্ত করতে চাই না।
আমি বেশ উল্লসিত হয়ে বললাম, ‘তারাই আমার আর তার চেহারার মাঝে প্রতিবন্ধক তৈরী করেছে।’
‘গত দেড় বছর ধরে আমরা একবারও তোমাকে বিরক্ত করিনি।’
‘যদি সমীরের মাথা তোমার মাথা দিয়েও পরিবর্তন করা হয় তাহলেও এতে আমার কিছুই যায় আসে না।’
সে খুব দুঃখের সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ওমর তোমার কি হয়েছে? না আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাই না যে তুমি আমাকে চিনতে পারোনি।’
‘তুমি ইচ্ছা করলে বিশ্বাস করতে পার কিংবা না পারো।
‘ওমর আমার দিকে তাকাও। আমি তোমাকে কিছু সত্যি খবর দিব। আমি বাছিনাকে বিয়ে করেছি।’
‘শয়তানকে সামনে যেতে দাও আর তার কৌশল নিয়ে খেলতে দাও।’
সে আমার সামনেই তার মুখে আঘাত করতে লাগল।
‘আমাদের বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও আমরা বিয়ে করেছি। কারণ আমরা একে অপরকে ভালবাসি। আর এখন তার পেটে নতুন একটা জীবন। আমার সন্তান তোমার নাতিন।’
‘তোমরা দুজনেই আমার সন্তান এবং আমার শত্রু।’
‘এই ভয়ংকর সংবাদটা এখনো তোমাকে সজাগ করছে না?’
‘সাপ যেভাবে তার বিষাক্ত দাঁত বের করে আর নাঁচতে থাকে।’
‘কি সর্বনাশ!’
‘এটাতো আমি সব সময় বলি। কিন্তু কেউ তো কোনো প্রতিউত্তর করে না।’
সে আমার কাঁধে মোলায়েমভাবে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ওমর তুমি ফিরে আসো। আমি এখনই পালিয়ে যাচ্ছি। তারা আমার জন্য হয়তো এখানে চলে আসবে। তারা তোমার অফিস সার্চ করেছে। হয়তো তোমাকে এর সাথে জড়িয়ে ফেলবে। ফিরে যাও ওমর আর তোমার স্বচ্ছতাকে প্রমাণ করো। তোমার পরিবারের প্রতি যত্ন নাও। তোমাকে তাদের খুব দরকার। বাছিনা মা হতে যাচ্ছে, আর সে আমাকে আর কখনো দেখতে পাবে না।
‘আমিও তাকে কখনো দেখি নাই।’
‘তুমি কি মোটেই বুঝতে চেষ্টা করছ না।’
‘আমি তো প্রতিদিন দশবারেরও বেশি সময় মারা যাই শুধু বোঝার জন্য। কই আমিতো বুঝতে পারি না।’
‘তুমি কি বুঝতে পারছ না আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে করেছি। আর এখন আমাকে অবশ্যই পালাতে হবে নয়তো মরতে হবে।’
‘ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দৌড়াও। তারপর তুমি গুবরে পোকার মধুর গান শুনতে পাবে।’
‘কি ভয়াবহ সর্বনাশ।’
সে আমাকে বেশ শক্তভাবে ঝাঁকি দিয়ে বেশ ক্রোধের সাথে বলল, ‘এই জেগে উঠো। এটা হেলুসিনেশনের সময় না। আমি যাওয়ার আগে অবশ্যই তোমাকে সব কিছু বুঝিয়ে ছাড়ব।’
‘চলে যাও। আমার স্বপ্নের শুদ্ধতাকে নষ্ট করো না।’
‘কি দুর্ভাগ্য! ওমর তুমি কি করেছ নিজেকে?
‘শয়তান আমাকে হতাশ করেছে।’
‘ওমর তোমাকে অবশ্যই জাগতে হবে। তোমার পরিবার বিপদে আছে। তোমাকে যদি কোনো ভাবে সন্দেহ করে তাহলে তারা অন্যায়ভাবে সব সুবিধা গ্রহণ করার চেষ্টা করবে। আমি নিজেকে নিয়ে মোটেই ভয় পাচ্ছি না। এটা ধ্বংস হয়ে যাক। কিন্তু তোমাকে অবশ্যই তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে।’
‘তুমি জাহান্নামে যাও।’
সে আবারো আমাকে একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘আমি অবশ্যই পালিয়ে যাব। কিন্তু তোমাকেও ফিরে যেতেই হবে।’
‘তোমার নিজের চোখে আমার বিজয় দেখার জন্য এখানে থেকে যাও।’
ওসমান হতাশ হয়ে ওমরের মাথাটা ঝাঁকাল।
‘কি অপদার্থ তুমি। তুমি তোমার সমস্ত ক্ষমতা এমন একটা বিষয় সন্ধান করতে গিয়ে নষ্ট করে ফেললে যার কোনো অস্তিত্বই নেই।’
‘কখন তুমি বুঝতে পারলে যে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই?’
লোকটা দাঁড়িয়ে গেল।
তারপর বলল, ‘আমি বিশ্বাস করলাম যে তুমি আমাকে হতাশ করলে। যদিও হতাশা শব্দটা আমার অভিধানে নাই।’
‘শয়তান এখানে হতাশ করেছে..।’
ভূতটা অন্ধকারে হারিয়ে গেল চিন্তিত হয়ে এই কথা বলতে বলতে যে, ‘পুরানো সংগ্রামী বন্ধু বিদায়।’
রাতটা আরেকবার আসল। চাঁদটাও ফিরে আসল। সে বলতে লাগল, ‘তারা আসছে। আমি জানি না কত দ্রুত তারা আমাকে খুঁজে পাবে।’
সে আবার বাগানের ভেতর দিয়ে পশ্চিমের দেয়ালের দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু মাঝপথেই হাট করে পড়ে গেল। আবার ফিরে আসল। পাগলের মতো বলতে লাগল, ‘আমি অবরুদ্ধ।’
সে আবার ছোট্ট ঘরের দিকে দৌড়ে গেল আমি তখন আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার এই শান্ত পরিবেশ কিছু চিৎকার দিয়ে বিঘ্নিত হচ্ছিল।
‘আত্মসমর্পণ করো ওসমান খলিল। তোমাকে সব দিক দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।’
আমি কোনো উত্তর শুনতে পেলাম না। গলার স্বর লক্ষ্য করে আমি সেদিকে তাকালাম। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলাম না।
‘শয়তান অহেতুক খেলা করছে। কিন্তু আমি তো বন্দি নই। বরং আমি তো মুক্ত স্বাধীন।’
বেষ্টনীর চারপাশ দিয়ে কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আস্তে ধীরে সেগুলো আরো কাছে আসছে। তাদের মধ্য থেকে একজন চিৎকার করে বলল, ‘প্রতিরোধের কোনো অর্থ নেই। এটা কোনো কাজে আসবে না।’
লুকিয়ে থাকা লোকটা কোনো উত্তর দিল না।
আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘সব কিছুর মধ্যেই অর্থ আছে।’
হঠাৎ করেই তীব্র আলোতে ঘরটা ভেসে গেল। চারদিক থেকে গলার স্বর শোনা গেল।
‘ওসমান আত্মসমর্পণ করো। তোমার হাত উঁচা করে বের হয়ে আস।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম, ‘কখন এই আজেবাজে গলার স্বর গুলো আমাকে একা থাকতে দেবে।
ভয়ংকর সেই স্বরটা বলল, ‘তুমি কি কোনো ব্যর্থ বিদ্রোহীকে দেখেছ?’
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই ব্যর্থ না।’
দৌড়ে যাওয়া পায়ের শব্দগুলো বাড়ির পিছনে গেল। তারপর তারা বের হয়ে আসল।
‘কাজ শেষ হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হ্যাঁ কাজ শেষ।’
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘কোনো কিছুরই শেষ নেই।’
আরো অনেকগুলো ভৌতিক প্রতিমূর্তি বাগান থেকে ঘরের দিকে দৌড়ে গেল। তাদের মধ্য থেকে একজন আমার পায়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়তে পড়তে বলল, ‘সাবধান! এখানে আরো কয়েকজন আছে।’
আমি এই সময় বন্দুকের গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি সাথে সাথে যন্ত্রণায় কাতরে উঠলাম। এটা সত্যিকার অর্থেই একটা ব্যথার অনুভূতি, শয়তান যে অনুভূতিগুলি তৈরী করছিল তার চেয়ে।
আমি যন্ত্রণায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার চোখ দুটি মেলে তাকালাম। এই স্বপ্নের একটা অর্থই হতে পারে যে আমি দায়মুক্ত হতে পারিনি। যখন আমি জেগে থাকব তখন কেন আমি তোমাকে নিয়ে ভাবব যদিও এই কল্পনা আমার ঘুমকে তাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু দাঁড়াও! আমি এখন কোথায়? নক্ষত্রেরা কোথায়? বাগানের ঘাসগুলো কই, কোথায় চিরহরিৎ সাইপ্রাস গাছ।
একটা গাড়ি ছুটে চলছে। তার মধ্যে লম্বা একটা বিছানায় আমি শুয়ে আছি। এর পাশে একজন লোক বসা। গাড়ির অপর পাশে আমার মুখোমুখি ওসমান দুইজন লোকের মাঝখানে বসে আছে। কোনো সন্দেহ নেই আমি স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আমার কাধের মাঝে তীব্র ব্যথার জন্য মাঝে মাঝে আমি ককিয়ে উঠছি।
‘বুলেট তার কণ্ঠার হাড়ে লেগেছে। তবে আঘাত তত গুরুতর নয়। সে বিপদমুক্ত।’
এই ধরনের স্বপ্নের অর্থ কি, আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?’
আমার কাঁধের ব্যথাটা কখন কমবে। কখন শয়তান আর তার সঙ্গীরা চলে যাবে। আমার স্বপ্ন থেকে কখন এই পৃথিবীটা অদৃশ্য হয়ে যাবে। আমি আবারো ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম 1
একটা গলার স্বর বলল, ‘ধৈর্য ধরুন।’
আমি প্রতিবাদের স্বরে বললাম, ‘সরে যাও, আমি নক্ষত্র দেখব।’
‘আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন।
আমি একগুয়েমি করে বললাম, ‘আমি যখন তোমাদের পরাজিত করব তখনই সুস্থ হবো।’
‘আপনি শান্ত হোন। ডাক্তার এখনই আপনাকে দেখবে।’
‘আমার কারো প্রয়োজন নেই।’
‘কথা বলে নিজেকে দুর্বল করবেন না।’
আমি জোর দিয়ে বলতে থাকলাম, ‘উইলো বৃক্ষ কথা বলে, সাপেরা নেচে বেড়ায়, আর গুবরে পোকাগুলো গান গায়।’
সে খুব নিচু স্বরে নিজের সাথেই কথা বলতে থাকল। সে তার চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু ব্যথাটা ঠিকই রয়ে গেল।
কখন সে নিজেকে দেখতে পাবে।
এই জন্যই কি সে পৃথিবীটা ছাড়তে পারেনি।
.
তার একটা অনুভূতি ছিল যে তার অন্তরটা বাস্তবেই আন্দোলিত হচ্ছে, স্বপ্ন বা কল্পনায় নয়। আর সেটাই তাকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনল।
সে নিজেকে খুঁজে পেল যে কিনা কবিতার একটা লাইন মনে করার চেষ্টা করছে। কখন সে এটা পড়েছে? আর এটা কোন কবির?
আশ্চর্য স্বচ্ছতায় কবিতার লাইনগুলি তার চেতনায় আসতে লাগল।
‘তুমি যদি সত্যিই আমাকে চেয়ে থাকো
তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাও দূরে।’
***
