ভিখারি – ১৪

চৌদ্দ

খালি বাসায় ফোনের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। ফোনের রিসিভারটা কানে লাগাতেই শুনতে পেল মোস্তফার ফোন।

‘সারা রাত তুমি কোথায় ছিলে?’

সে কোনো উত্তর দিল না।

মোস্তফা আবার বলল, ‘জয়নাব হাসপাতালে।’

কয়েক মুহূর্ত লাগল তাকে ব্যাপারটা বুঝতে। এর পরই তার মনে হলো সে একজন স্বামী, একজন বাবা এবং খুব বেশি হলে একদিন দাদা হবে।

হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে সে বাছিনা মোস্তফা এবং মোস্তফার স্ত্রী আলিয়াকে দেখতে পেল। আলিয়া গোলাকার মুখ আর আকৃতির চল্লিশ বছর বয়সের খুব দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মহিলা। তাকে দেখেই বাছিনা ছুটে আসল। তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মাথাটা নিচু করে রাখল।

মোস্তফা বলল, ‘সে ডেলিভারি কক্ষে আছে। সব কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে।’

যখন সে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইল তখন আলিয়া তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমিই তার সাথে ভেতরে ছিলাম। এখন আমি আবার যাচ্ছি।’

আমার কি এখন যাওয়া উচিত হবে না?

মোস্তফা বলল, ‘হঠাৎ উত্তেজনাকে এখন পরিহার করে চলাটাই ভালো হবে।’ কিছুক্ষণ পরই আলিয়া বেশ হাস্যোজ্জ্বল মুখে ঘর থেকে বের হয়ে এসে বলল, ‘অভিনন্দন! আপনার ছেলে হয়েছে। জয়নাব তার ঘরে সুস্থ আছে।’

সে বাছিনার দিকে ভালবাসায় তাকাল। কোনো কিছু না বলে সে তার হাতটাকে বাছিনার হাতের উপর রাখল। বাছিনা একটু লজ্জা পেয়ে কিছুক্ষণ হাতটা বাবার হাতে রাখল। তারপর হাতটা খুব নরমভাবে আবার সরিয়ে নিল।

মোস্তফা বাপ মেয়ের চুপি চুপি এই কাণ্ডটা দেখছিল। সে বলল, ‘যাই হোক সৌভাগ্যবশত হাসপাতাল এমন একটা জায়গা যেখানে ঝগড়া বিবাদের অবসান হয়।

মেয়ে হাতটা সরিয়ে নেয়াতে ওমর একটু হতাশ হলেও সে এটাকে গোপন করে জিজ্ঞেস করল, ‘জয়নাবকে কখন এখানে নিয়ে আসা হয়েছে?’

‘প্রায় মধ্যরাতে।’

তখন সে আর ওয়ারদা শ্যামপান খাচ্ছিল আর কথাবার্তা বলছিল।

‘তুমি কি স্কুলে যাওনি?’

‘প্রশ্নই ওঠে না। সেতো তার মার সাথে এসেছে।’ মোস্তফা বলল।

‘আলিয়া তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’

‘আপনাকে স্বাগতম।’ আলিয়া জয়নাবের ঘরে যেতে যেতে বলল।

‘সকালের দিকে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।’ মোস্তফা বলল।

আহ! মরুভূমির সকাল। একটা পূর্ণাঙ্গ কাল্পনিক আনন্দ। কিন্তু কোথায় সেটা?..

মোস্তফা অনুমতি নিয়ে একটু ঘুমাতে চলে গেল। সে আর বাছিনা বসে অপেক্ষা করছিল। বেতাল এই পরিস্থিতিতে সে একটু নরম স্বরে বাছিনাকে বলল, ‘তুমি কি ঘুমাওনি বাছিনা?’

বাছিনা হাসপাতালের বিশাল করিডোরের কার্পেটের দিকে মাথা নিচু করে তাকিয়ে শুধুমাত্র মাথাটা একটু নাড়ল।

‘তুমি কি আমার সাথে কথা বলতে চাও না?

বাছিনা কিছুটা লজ্জা আর দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আমি কি বলতে পারি?’

‘যে কোনো কিছু। তোমার মনের মধ্যে যা আছে সব। আমি তোমার বাবা আবার তোমার বন্ধুও বটে। আমাদের এই সম্পর্কটাতে ফাটল ধরা সম্ভব না।’

বাছিনা তবু চুপ থাকল। কিছু বলল না।

‘আমরা কি আমাদের সেই চুক্তিতে একমত থাকতে পারি না?’ ওমর বলল।

বাছিনা মাথাটাকে সম্মতিসূচক ভাবে একটু নাড়াল।

ওমর বলল—বোঝা যাচ্ছে তুমি খুব ক্ষেপে আছ। সে যাই হোক আজকের এই সমস্যাটা তোমাকে কোনো প্রভাব ফেলছে না। আমার থেকে তুমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছ এটা কোনো ভাবেই সহ্য করা যায় না। তোমাকে বার বার বলেছি আমাকে দেখে যাওয়ার জন্য কিন্তু তুমি আসো নি? কেন তুমি আসো নি?’

‘আমি আসতে পারি নি।’

‘কেউ কি তোমাকে বাধা দিয়েছিল?’

‘না। কিন্তু আমার খুব মন খারাপ ছিল।’

‘তোমার দুঃখবোধ কি আমাদের ভালবাসার চেয়েও বড়।’

বাবার কথা শুনে এবার বাছিনা খুব শক্তভাবে উত্তর দিল। ‘তুমিওতো বাবা একবারের জন্যও আমাদের দেখতে আসোনি।’

‘সেটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমি যখন তোমাকে বারবার আমন্ত্রণ জানিয়েছি তখন তোমার আসা উচিত ছিল। তোমার প্রত্যাখ্যান বিষয়টাকে আরো বিরক্তিকর আর অসহনীয় করে তুলেছে।’

বাছিনা চেষ্টা করছিল তার চোখের পানি লুকিয়ে রাখতে।

‘আমার খুব কষ্ট হয়েছিল তাই আমি আসিনি।’

‘কোনো কিছু নিয়ে জড়তা আমার পছন্দ না। আমি চলে যাওয়ার পর তোমাকে খুব অনুভব করেছিলাম।’ কথা শেষ করে ওমর একটু মিষ্টি করে হাসল পরিবেশটাকে হাল্কা করার জন্য। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে এখন তিরস্কার করার কোনো সময় নেই।’ সে বাছিনার কাঁধটা ধরে হাল্কা ঝাঁকি দিল। তারপর বলল, ‘তোমার কবিতার খবর কি?’

এই প্রথমবারের মতো বাছিনা সহজভাবে হাসল।

ওমর খুব আগ্রহের সাথে মেয়েকে বলল, ‘তুমি কি বুঝতে পারছ আজ আমরা দুজন যেভাবে কাছে এসেছি এভাবে আগে কখনো আসিনি।’

‘তুমি কি বলতে চাও বাবা?’

‘এর মানে হচ্ছে আমরা দুজন এক উৎস থেকেই বেড়ে উঠেছি।’

বাছিনা তার সবুজ চোখ দুটি বাবার দিকে ফিরিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করতে বলল।

ওমর বলল, ‘তুমি কি জানো আমি আবার কবিতা পড়ছি। আবার চেষ্টা করছি কবিতা লিখতে।’

‘সত্যি বাবা?’

‘এটা একধরনের ব্যর্থ চেষ্টা।’

‘কেন এমন মনে করছ?’

‘আমি জানি না। মনে হয় অন্তরের মাঝে অনেক ধুলো জমে গেছে যেটাকে একবারে ঝেড়ে ফেলা যাবে না। হতে পারে এই সমস্যাটাই কবিতাকে বাধা দিচ্ছে।’

‘সমস্যা?’

‘আমি বলতে চাচ্ছি আমার অসুস্থতা।’

বাছিনা মাটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগল।

‘তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করছ না।’

‘আমি সব সময় তোমাকে বিশ্বাস করি।’

বাছিনার কথাগুলো তাকে খুব কষ্ট দিল।

সে বলল, ‘বাছিনা আমাকে অবশ্যই তোমার বিশ্বাস করতে হবে। ঐ মিথ্যাটা সত্ত্বেও। এটা খুব প্রয়োজনীয় একটা মিথ্যা ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করো এটা আর কখনো দ্বিতীয়বার হবে না। আমি সত্যি সত্যিই অসুস্থ।’

‘তুমি কি এখনো খুঁজে বের করতে পারোনি সমস্যাটা কি?’

ওমর কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, ‘এক ধরনের কষ্ট এটা। দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য ধারণই এটার একমাত্র ঔষধ।’

বাছিনা খুব কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘তুমি কি সেটা আমাদের মাঝে খুঁজে পাওনি?’ সে খুব শান্তভাবে বলল, ‘আমি একদম একা বাস করছি।’

বাছিনা খুব অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

ওমর বলল, ‘একদম একা বিশ্বাস করো।’

‘কিন্তু…’

‘এখন একদম একা।’

বাছিনা খুব নরমভাবে বলল, ‘বাবা তুমি ফিরে আসছ না কেন?’

সে মেয়ের গালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেল।

‘মনে হয় এভাবেই থাকাটা সব চেয়ে ভালো হবে।’

‘না।’ বাছিনা বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল। আবার বলল, ‘না।’

আলিয়া ফিরে এসে ওমরকে বলল সে এখন জয়নাবকে দেখতে যেতে পারে। সে রুমে ঢুকে দেখতে পেল জয়নাব গলা পর্যন্ত একটা সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে শুয়ে আছে। চেহারাটা খুব মলিন আর চোখ দুটি আধবোজা। সে জয়নাবের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা, আর সমবেদনা অনুভব করল। এখানে জয়নাব কিছু একটা তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে যখন কিছু একটা করার জন্য তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সে একটু হতবুদ্ধির মতোই বিড়বিড় করে বলল, ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ যে সবকিছু ভালোয় ভালোয় হয়েছে।’

জয়নাব একটু মুচকি হাসল।

‘তোমাকে অভিনন্দন তুমি একটা রাজপুত্র জন্ম দিয়েছ।’

সে বসল কিন্তু তেমন স্বস্তি পাচ্ছিল না। বাছিনা আর আলিয়া ঘরের ভেতর ঢুকে তাকে এই অস্বস্তি থেকে রক্ষা করল। আলিয়া মজার মজার কথা বলে পরিবেশটাকে হাল্কা করছে। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট একটা হুইল বিছানায় করে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসা হলো। তারা বাচ্চাটার মুখের উপর থেকে কাপড়টা একটু সরিয়ে দিল। ছোট্ট লাল মাংসের একটা প্রতিকৃতি। বাচ্চাটাকে দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে একদিন সে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। বাচ্চাটাকে দেখে তার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। কিন্তু সে জানত ধীরে ধীরে তার প্রতি ভালবাসা জন্মাবে। শিশুটার প্রকৃতিগত চাহনিটাই সেই মুহূর্তের জন্য যথেষ্ট। হায় শিশু যদি তুমি নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারতে তাহলে আমি তোমাকে তোমার অনুভূতির বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম আর তুমি যেই জগৎ থেকে এসেছ সেই জগতের স্মৃতির বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম।

‘তার জন্য কোনো নাম ঠিক করেছ?’ আলিয়া জিজ্ঞেস করল।

‘ছামির।’ বাছিনা উত্তর দিল।

ছামির হলো সাথী আর বিনোদন দানকারী। আশা করি এই নাম তাকে সব দুঃখ কষ্ট থেকে রক্ষা করবে।

আলিয়া সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে বলল, ‘দোয়া করি বাচ্চাটা তার বাবা মা উভয়ের ভালবাসায় বেড়ে উঠবে।’

ওমর আগের মতোই বিরক্ত হয়ে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল জয়নাব আর তার মাঝে যে শূন্যতা তৈরী হয়েছে সেটা এই বাচ্চাটা পূরণ করতে পারবে না।

দুপুরের খাবারের সময় যখন ঘনিয়ে আসল তখন সে চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। বাইরে বের হওয়ার সাথে সাথেই বাছিনা তার পিছু পিছু আসল। তারপর বলল, ‘বাবা তুমি আর একা থাকতে পারবে না।’

সে নিজেও আর শূন্য ফ্লাটে কোনোভাবেই থাকতে চাইছিল না। যদিও সে নতুন ধরনের এক নির্জনতার স্বপ্ন দেখছিল।

‘তুমি তাহলে কি চাও?’ ওমর বেশ নরম সুরে জিজ্ঞেস করল।

আমি চাই তুমি ফিরে আস।’

মেয়ের কপালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেল সে। তারপর বলল, ‘যে কোনো শর্তেই আমি তোমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠব।’

বাছিনা তার হাতদুটো ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাইরের দরজায় চলে আসল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *