চন্দ্রহাস – সৌরভ চক্রবর্তী
পারিবারিক নরবলির ঐতিহাসিক কাহিনি
[Proofed by @bongboi Volunteer AJ]
Chandrahas by Sourav Chakraborti
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ: অনিকেত মিত্র
উৎসর্গ
আমাদের জীবনের নতুন আলো পুত্র বাহীন চক্রবর্তী’কে।
To Our Sunshine,
Our Beloved Son Vaheen Chakraborty.
.
বর্তমান পৃথিবীতে কিছু পরিবার আছে যেসব পরিবারে পুর্বের আভিজাত্য আর নেই। রাজপাট, জমিদারি সব চুকে গেছে -কিন্তু ইতিহাসের কলঙ্ক এখনো বয়ে বেড়াতে হয় তাদেরকে। পিছু ছাড়েনি পূর্বপুরুষদের রচিত অভিশাপের মায়াজাল। পারিবারিক নরবলির মত বীভৎস রীতি মেনে বছরের পর বছর রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয় তারা। গুপ্ত কুঠুরিতে চলে সাধন-ভজন । কখনও ইচ্ছের বিরুদ্ধে, কখনও বা ইচ্ছেকৃতভাবেই অংশ নিতে হয় নরবলির এই ক্রিয়ায়। একবিংশ শতাব্দীতে পা দিয়েও শত বছরের পুরনো বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে চলেছে। আর এসব রীতি না মানলেই পরিবারে নেমে আসে ঘনঘোর অন্ধকার, মৃত্যুর কালো ছায়ায় ঢেকে যায় চারদিক।
এ সবই ঘটে চলেছে লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ জানে না সে-সব ইতিহাস। এমন কি সংশ্লিষ্ট পরিবার নিজেদের পারিবারিক ইতিহাসের তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থতেও উল্লেখ রাখে না সে-সব অন্ধকারের কথা। খুবই গোপন সেই সব ক্রিয়া।
এই প্রথমবার সে-সব ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে চন্দ্রহাস-এ। অন্ধকার থেকে এই প্রথম আলোয় আসবে পারিবারিক নরবলির একাধিক তথ্য। দীর্ঘ অধ্যয়ন এবং ফিল্ড স্টাডির ফসল হিসেবে লেখক তুলে ধরেছেন সে-সব ইতিহাস, যা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
বাস্তবের উপর কল্পনার পর্দা চড়িয়ে লেখক লিখেছেন এক অবিশ্বাস্য গল্প-যা পড়লে স্বাভাবিক মানুষের অন্তরাত্মায় কাঁপন ধরে যাবে।
পাঠ শুভ হোক।
.
এই গ্রন্থ কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য। কোনও পরিবার অথবা সম্প্রদায় কিম্বা কোনও ব্যক্তি (জীবিত কিংবা মৃত)-কে আঘাত করার ইচ্ছে নিয়ে এই গ্রন্থ লেখা হয়নি। এই গ্রন্থের সমস্ত ঘটনা সত্য হবার দাবি গ্রন্থের লেখক করছেন না। কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের উপস্থিতি এবং স্থানের উল্লেখ ব্যতীত সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক। সম্পূর্ণ কাহিনি সত্য ঘটনা এবং কল্পনার মিশেলে তৈরি। তবে এই সম্পূর্ণ কাহিনির সঙ্গে কোনও বাস্তব ঘটনা বা ব্যক্তির সরাসরি মিল শুধুমাত্র কাকতালীয় একটি ঘটনা হবে। নরবলির মত বীভৎস একটি প্রথাকে উৎসাহ দেবার কোনোরূপ চেষ্টা এই গ্রন্থে করা হয়নি।
.
বাংলাদেশ সংস্করণের ভূমিকা
চন্দ্রহাসের বীজ…
পারিবারিক নরবলির ভূমিকা পর্বটা ঠিক কী রকম? এই আলোচনাটা কাহিনির মধ্যে করা আছে। বরং আমি এ রকম কিছু কথা লিখছি যা ছাড়া এই উপন্যাস অসম্পূর্ণ।
জীবনে হয়তো খুব কম এরকম সুযোগ আসে যেখানে চন্দ্রহাসের মত একটি কাহিনির ভূমিকা লেখার সুযোগ হয়। কাহিনিটি আমার লেখা বলে নয়, যদি অন্য যে কেউ আমাকে এই কাহিনির ভূমিকা লেখার সুযোগ দিত আমি তার কাছে চিরঋণী থাকতাম। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে-কেন? কেন নিজের লেখা একটি গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই কাহিনির বড়াই করছি। তার কারণ আছে। এই কাহিনির সত্যতাই এই কাহিনির বুনিয়াদ। আমি আমার মত করে লিপিবদ্ধ করেছি মাত্র। তাহলে কাহিনি পড়ে আরেকটি প্রশ্নও উঠবে-তবে কি যা যা লেখা আছে সব সত্যি? এ-ও কী সম্ভব? এই শেষ দুটো প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যেই এই সুদীর্ঘ ভূমিকা। সকল পাঠককে এই ভূমিকাটি পড়ে তারপর কাহিনিতে প্রবেশ করতে অনুরোধ করবো আমি। যদি শুধুমাত্র কাহিনিটুকু পড়েন, তবে এই গল্প শেষ হবে না। চন্দ্রহাসের একটি বীজ আছে, সেই বীজ জাগ্রত করার লক্ষ্যেই এই ভূমিকা কিম্বা প্রাক কথনের অবতারণা।
গল্প বলার অভ্যেস তো, ধরে নিন ভূমিকাতেও একটা গল্প লিখছি।
আজ থেকে বছর পনেরো আগে শরীরে রক্ত অনেকটা বেশি গরম ছিল। হাতের সময়টাকেও এখনকার মত হিসেব করে খরচ করতে হত না। সে-রকমই এক দিন হঠাৎ খবর এলো শ্মশানের পাশে যে একটা ছোট কাঁচা মাটির রাস্তা আছে, সেখানে গাছতলায় এক সাধু এসেছেন। যখনকার কথা বলছি তখন ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা আজকের মত এতটা শহুরে হয়ে যায়নি। আর যে শ্মশানের কথা বলছি সে শ্মশানও আগরতলার বর্তমান কেতাদুরস্ত নতুন শ্মশান নয়। এ শ্মশান এয়ারপোর্ট যাবার রাস্তায় পড়ে, একেবারেই ছোট। আজকেও যদি কেউ বিমানপথে আগরতলায় যান, এ শ্মশানের কাছ দিয়েই মূল শহরে ঢুকতে হবে। আধুনিকতা এখনো থাবা বসায়নি এখানে। সেকালে তো কথাই নেই।
সেই সাধুবাবাকে নিয়ে আমার কোনও আলাদা আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু যখন শুনলাম তিনি প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় বটগাছের নীচে বসে গল্প বলেন তখন আমার উৎসাহ দেখে কে! নতুন কাহিনির জন্য আমি সবসময় উন্মুখ ছিলাম। ঠিক হল, আমরা জনাকয়েক বন্ধু সেই সাধুবাবা দর্শনে যাবো।
মূল শহর থেকে রাস্তাটা অনেকটা দূর। আর আমাদের সবার বাড়ি ছিল আগরতলার প্রাণকেন্দ্রে। যেভাবেই হোক এক শনিবার একটা অটো রিক্সা রিজার্ভ করে পৌঁছে গেলাম সেই শ্মশানে। কাঁচা মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছলাম সাধুবাবার ডেরায়। যে পরিমান গল্প শুনেছিলাম আসার আগে আর এসে যা দেখতে পেলাম তাতে হতাশ হলাম। শুনেছিলাম লোকের ঢল নামে গল্প শোনার জন্য। এসে দেখছি সাধুবাবা ধ্যানে বসে আছেন আর দুয়েকজন আশেপাশে ঘুর ঘুর করছে। হয়তো সেদিনের মেঘলা আবহাওয়া এর একটা অন্যতম কারণ।
দেখলাম একজন এগিয়ে এলো আমাদের দিকে, “কী দরকার?”
দরকারটা অল্প কথায় বলতেই সে খুশি হয়ে সাধুবাবার সামনে চাটাই পেতে বসতে বলল। আমরা বসে পড়লাম। একে বৃষ্টি-বাদলার দিন, তার উপর গাছের নীচে বসে আছি, মশা কামড়াচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার বেপাড়ায় এসে পড়েছি। অলৌকিকের ভয় যে আমাদের নেই সেটা বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু লৌকিকের ভয় ভীষণভাবেই কাজ করছিল। অনেকটা সময় বসেও যখন সাধুবাবার ধ্যান ভাঙলো না তখন আমরা উঠে পড়বো ঠিক করলাম। উঠতে যাচ্ছি এমন সময় সাধুবাবা চোখ খুললেন।
“এই বৃষ্টির দিনে কেউ গল্প শুনতে আসে!”
স্পষ্ট বুঝলাম ইনি ত্রিপুরার লোক নন। ত্রিপুরার বাচনভঙ্গি আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের লোক বলেই মনে হল। তাঁর গায়ে ছাই মাখা, কপালে ত্রিপুন্ডরক, মাথায় জটা, পরে আছেন গেরুয়া কাপড়। তিনি একটা কল্কে জ্বাললেন। আমাদের নাম ইত্যাদি জেনে গল্পে প্রবেশ করলেন। জীবনের গল্প, নানারকম ঘটনা যা তিনি দেখেছেন আমাদের বললেন। সেগুলো থেকে আমরা অনেক কিছু জানলাম ঠিকই কিন্তু আমরা যে টানে এসেছিলাম সে উদ্দেশ্য পূর্ণ হল না। সাধুবাবার বলা সব গল্পই জীবনের অভিজ্ঞতা, সবই লৌকিক। অন্যদের মত উনি কোনও অলৌকিকের সন্ধান দিলেন না আমাদের । কিছুটা নিরাশ হয়ে পড়লাম আমরা। একসময় বলেই বসলাম, “কখনো ভয়ের কোনও ঘটনা দেখেছেন বা জেনেছেন? ভূত, পিশাচ, জীন বা অন্য কিছু?”
উনি অদ্ভুতভাবে চেয়ে থাকলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, “তোমার কেন মনে হয় সব সাধু ভূত আর পিশাচের অবিশ্বাস্য গল্প শোনাতেই গাছতলায় এসে বসে! হ্যাঁ, ভয় পাবার মত অনেক কিছু এক জীবনে দেখেছি। তবে বেশিরভাগ ভয়ই দেখিয়েছে মানুষ। মানুষের সেসব কাজ আমার অবিশ্বাস্য লেগেছে। তোমাদের লাগবে কি না জানি না।”
আমি জিগ্যেস করেছিলাম, “যেমন?”
তিনি বলেছিলেন, “তুমি কি জানো পশ্চিমবঙ্গে এখনো পারিবারিক নরবলি হয়?”
ব্যস, এই কথাটায় আমার কাঁটা আটকে গিয়েছিল। সেদিন তিনি আর একটা শব্দও বলেননি, আমরাও আর থাকিনি, ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু সেদিন প্রথমবার আমি নরবলির প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করি। ‘চন্দ্রহাস’-এর বীজ সেদিন বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যায় আমার মনে প্রোথিত হয়।
তারপর অনেকদিন কেটে যায়। এই বিষয়ে অনেক বই জোগাড় করার চেষ্টা করি। ইন্টারনেটপূর্ব যুগে তো বটেই, এমনকি ইন্টারনেট আসার পরেও পারিবারিক নরবলি বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানতে পারি না। এমনকি যখন ‘চন্দ্রহাস’ লিখছি তখনও আমি জানতাম না যে, বাংলা সাহিত্যে পারিবারিক নরবলি নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়নি। সে বিষয়ে পরে আসছি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কখন লেখালিখি শুরু করি সত্যি বলতে সেভাবে মনে নেই। বিদ্যালয় জীবনেই গল্প লেখা শুরু। ২০১৮ সালে সেই সমস্ত গল্পের একাংশ নিয়ে ‘গল্পের ছদ্মবেশ’ প্রকাশ হয়ে যায় এবং পাঠকের স্নেহ ধন্যও হয়। কিন্তু এর পর কী? প্রকাশকও অল্প অল্প করে তাড়া দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু আমার তো তাড়া নেই। দশ বছর ধরে অপেক্ষা করে তারপর গল্প সংকলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু এবার? আবার গল্প সংকলন! আবার বানানো গল্প বোনা! নাহ্, ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার থেকে যা কাজ করবো সব সরেজমিনে তদন্ত করে বাস্তবে ঘটে যাওয়া সমস্ত অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় ঘটনা নিয়ে কাজ করবো। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে লিখবো এক একটা উপাখ্যান।
এসব ভেবে তো ফেললাম। কিন্তু বিষয় কই? কী নিয়ে লিখবো? মাথা কুটে ফেলছি, গোগ্রাসে গিলছি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখা প্রবন্ধ। নন ফিকশান যে ফিকশানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তা বিগত এক দশকে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। তবু মন মত বিষয় পেলাম না। এমনি একদিন হঠাৎ কথা হল আমার জ্যাঠতুতো দাদার সঙ্গে। সংসারে থেকেও সে সন্ন্যাসী । জপে, তপে, তন্ত্রে দিন যাপন করে। পরবর্তীকালে এই উপন্যাসের তান্ত্রিক বামাচার নিয়ে সেই আমায় দীক্ষিত করে। তবে সে দীক্ষা শুধু আমাকে শিক্ষিত করতে। সন্ন্যাসী বা তান্ত্রিক হবার ইচ্ছে আমার নেই। প্রথমদিন এই দাদা-ই আমায় আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিল, “জানিস, এ রকম অনেক বাড়ি আছে যেখানে এখনো নররক্তে পূজা হয় । কূলদেবীকে টাটকা রক্ত দিতে হয়।”
আমি আবার আজ থেকে পনেরো বছর আগে শোনা সাধুবাবার কথার অনুরণন শুনতে পেলাম যেন। মুহূর্তে ঠিক করলাম এই সেই বিষয় যা নিয়ে কাজ করবো।
আর ঠিক সেদিনই সাহিত্যের একনিষ্ঠ সেবক, সুসমালোচক ও লেখক শ্রী ঋজু গাঙ্গুলীর সঙ্গে ব্যক্তিগত আড্ডায় এই প্রসঙ্গ উঠলো। এমনিতেই শুরু থেকে আমার লেখা নিয়ে উনার একটা আলাদা আগ্রহ আছে তা বুঝতে পারি। যখন তুলনামূলকভাবে কম পাঠক ছিল আমার, তখনও তাঁকে দেখেছি খুঁজে খুঁজে আমার লেখা জোগাড় করছেন। সবসময় বড় কথা এতোকিছুর পরেও চাঁচাছোলা ভাষাতেই পাঠ প্রতিক্রিয়াও দিচ্ছেন আমাকে, সেখানে নিস্তার নেই। তবু আমার কাছে বন্ধু ঋজু গাঙ্গুলি এগিয়ে থাকবেন সমালোচকের থেকে। তিনি সেদিন আমাকে আরও জোর দিলেন এই বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য। যেহেতু দুর্গাপুজোর সঙ্গে নরবলির একটা সরাসরি যোগাযোগের কথা শোনা যায় তাই এই বিষয়ে বেশ কিছু বইয়ের সন্ধানও দিলেন।
আমিও সেদিনের পর থেকে হন্যে হয়ে খোঁজা শুরু করলাম সেসব বই। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, বাংলায় এই নরবলি নিয়ে মাঝে মাঝে এক আধ লাইন লেখা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রায় কিছুই নেই। আর যা লেখা আছে তার বিশ্বস্ততা নিয়েও আছে অনেক প্রশ্ন। এরই মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে জনপ্রিয় সাহিত্যিক এবং আমার পরম প্রিয় শ্রী অভীক সরকার জানতে পারলেন আমি এই বিষয় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। আমিও তাঁকে জানালাম, বাংলা ভাষায় এই বিষয়ের উপর বইয়ের দৈন্যদশার সম্মুখীন হচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে নিজের সংগ্রহ থেকে আমাকে দুটি মহামূল্যবান বই দিয়ে দিলেন। অন্যান্য ভাষার বই আমাকে অনেক সাহায্য করলেও এই কাহিনি গড়ে তুলতে এই বই দুটির অসামান্য অবদান আছে তা আমি স্বীকার করি। অভীকদাকে আমার ধন্যবাদ ও ভালোবাসা জানাই। এই কৃতজ্ঞতা পাশ ছাড়ানোর মন্ত্র তন্ত্রও জানে না।
বইপত্র এভাবে জোগাড় হতে থাকলো। সেগুলো গোগ্রাসে পড়তেও শুরু করলাম। প্রচুর রেফারেন্স পেলাম, কিন্তু এই কাহিনির জন্য যা প্রয়োজন তা ওই বইগুলোতে ছিল না। টিকা ছিল, বর্ণনা ছিল, মন্ত্র ছিল কিন্তু এরকম না-জানা কোনও কাহিনি ছিল না যা আজকের পাঠক কোনোকালে শোনেইনি। আর আমি ঠিক সেরকম কাহিনির খোঁজেই ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম বাড়ি থেকে বেরোতে হবে সে কাহিনির খোঁজে। পড়াশোনার উপর ভিত্তি করে একটি তালিকা তৈরি করলাম। কিছু নাম না-জানা পরিবারের তালিকা কিংবা সে নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয় সেরকম এক তালিকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ধীরে ধীরে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। প্রায় অন্ধকার ইতিহাস খুঁড়ে খুঁজে বের করলাম তাঁদের। আমি ঠিক কী চাইছি নিবেদন করলাম বাড়ির কর্তাদের কাছে। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় হাত জোড় করে জানালেন এ কাজ তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। পারিবারিক ঐতিহাসিক গ্রন্থ তুলে দিয়েও জানালেন এরকম কোনও নরবলির ইতিহাস নেই তাঁদের পরিবারের। আমি তবু নাছোড়বান্দা ছিলাম। বার বার চলে গেছি সেই শুলুক সন্ধানে। অফিস আর বাড়ি করা আলস্য প্রকৃতির লোক বলেই বদনাম আমার। অন্তত চেনাশোনা লোক তাই বলে। কর্পোরেটে কাজ করে অন্য সবকিছুর জন্য সময় প্রায় থাকেনা। সেই আমিই যখন এভাবে উঠে পড়ে লাগলাম সবাই আশ্চর্য হল। কিন্তু আমায় এই নরবলির কাহিনির নেশায় পেয়েছিল। বারংবার অনুরোধ করার পর এক আধজন সেসব কাহিনি বলতে রাজি হলেন। জানালেন, এরকম পূতিগন্ধময় অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাস পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সেটা প্রকাশ হোক তারা চান না। এই বিষয়টা এতটাই সংবেদনশীল। তাই এর উল্লেখ পারিবারিক গ্রন্থে অব্দি নেই। এমনকি আমাকে বললেও সেসব যেন কোনোভাবেই প্রকাশিত না হয়। কল্পনায় মোড়া গল্প হতে হবে। এই বয়ানে আমার থেকে লিখিত অব্দি রাখা হল যেন এর অন্যথায় আমার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আমাকে এই ইতিহাস জানার মোহ এতটাই পেয়ে বসেছিল যে আমি রাজি হলাম। আমার পাঠকদের এই কাহিনি বলার ছিল আমার-হোক না চড়া ফিকশনে মোড়া।
ধীরে ধীরে জানতে পারলাম এরকম কিছু অধ্যায়ের কথা যা আজ অব্দি লেখা হয়নি বা শোনা যায়নি। শুনতে শুনতে বিশ্বাস করতে পারিনি অনেক সময়, তবু শুনলাম আর আবিষ্ট হলাম। যারা শোনালেন তারা নাম গোত্রহীন। কিন্তু যা শোনালেন, সেই কাহিনি আমার মনে গেঁথে থাকবে আজীবন। হয়তো ‘চন্দ্রহাস’ পড়ার পর পাঠকের মনেও সেই কাহিনি বঁড়শিতে গেঁথে যাওয়া মাছ হয়ে মনের এক কোণে পড়ে থাকবে। যদি তাই হয় তবেই এই কাহিনি সফল। আজকাল অনেক কাহিনি লেখা হয়, আমিও লিখি-কিন্তু সব কি আর মনে রাখার মত! জানি না কেন, প্রথমদিন থেকেই মনে হচ্ছে ‘চন্দ্রহাস’-এর কপালে সেই সিঁকে ছিড়তে পারে। কারণ ‘চন্দ্রহাস’-এর নায়ক আর কেউ নয়, এর কাহিনি।
কাহিনি শুনলাম, বুঝলাম। কাউকে সরাসরি না বলার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধও হলাম। শুরু করলাম ‘চন্দ্রহাস’ লেখা। প্রথমেই ঠিক করে নিয়েছিলাম আইনি সমস্যা এড়াতে কাল্পনিক কাহিনি লিখবো। কী রকম হবে সেই কল্পনা? বাস্তবে সম্ভব এরকম ঘটনার পাশাপাশি চড়া দাগের ফিকশন যোগ করা হবে কাহিনিতে। এর ফলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবে, ঠিক কোন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে আর কোনটা ঘটা একেবারেই অসম্ভব। এই উপন্যাসের আদ্যন্ত এই সূত্র মেনে লেখা হয়েছে। অত্যন্ত অবাস্তবের মধ্যেও যে ঘটনা লৌকিকভাবে ঘটা সম্ভব সেটা পাঠকের বুঝতে এবং সেই ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে অসুবিধে হবে না।
ঐতিহাসিক চরিত্র ভৈঁরো দেও, ঐতিহাসিক স্থান যেমন দন্তেশ্বরী মন্দির ইত্যাদি কয়েকটি ব্যবহার ব্যতীত সমস্ত চরিত্র ও স্থান এই গ্রন্থে কাল্পনিক। তবে যে সময়ের কাহিনি বিবৃত হয়েছে সেই সময় কোনও কল্পনা নয়। তিনটি আলাদা আলাদা সময় বৃত্ত জুড়ে ভারতবর্ষে এই কাহিনির ব্যাপ্তি।
আরও একটি জিনিস সম্মানিত পাঠককে জানাই। এই কাহিনি লেখার সময় কিছু পরীক্ষা আমি করেছি। যেমন একই কাহিনিতে ‘পূজা’ এবং ‘পূজো’ দুইরকম বানান ব্যবহার করেছি। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি একেকজন মানুষ একেকভাবে এই শব্দটা উচ্চারণ করে। আমার কাহিনিতে এত চরিত্রের ভিড়, তারা সবাই একই উচ্চারণ করবে তা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই দু-রকম বানানই ব্যবহার করেছি চরিত্র বিশেষে।
আবার আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, কিছু লোক যদি কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনায় থাকেন এবং সেই মুহূর্তে কোনও বিপর্যয় ঘটে তবে সেই আলোচনা আর সম্পূর্ণ হয় না। এই কাহিনিতেও মহারাজ অনুজ নারায়ণ বৃহদ্ধর্মপুরাণ নিয়ে কথা শুরু করলেও কোনও এক অঘটনের কারণে আর সে গল্প সম্পূর্ণ করে বলেননি। আমিও পরবর্তী সময় সে কাহিনির উল্লেখ গ্রন্থে করিনি। আমার মনে হয়েছে বাস্তবিক জীবনে এরকমই হয়। বলতে শুরু করেও অনেক কথা আর বলে শেষ হয় না। মূল গল্পে শুরু করা সেই বৃহদ্ধর্মপুরাণের কাহিনিটি, অনুজ নারায়ণের জবানবন্দিতেই ভূমিকায় লিখে রাখছি শুধুমাত্র জিজ্ঞাসু পাঠকের কথা ভেবে।
“লঙ্কাধিপতি রাবণের দ্বারা সীতাহরণের পর অবিচল চলেছিল রাম-রাবণের যুদ্ধ। তখন কুম্ভকর্ণ জেগে আছেন। দেবতারা হতাশ হয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন রঘুবীরের অমঙ্গল আশঙ্কায়। দেবগণ তখন ধ্যানমগ্ন পদ্মযোনি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। দেবতাদের কণ্ঠে শুধু কাকুতি মিনতি ছিল, যে করেই হোক রাবণবধ করতে হবে। প্রজাপতি ব্রহ্মা দেবতাদের থেকে সব শুনে বললেন, একমাত্র ত্রিভুবন-জননী আদ্যাশক্তি মহামায়ার মঙ্গল আশিসেই রাবণ বিনাশ সম্ভব। চরাচর বিহারিণী শক্তিরূপিণী মহামাতৃকাকে প্রসন্ন করতে হলে ভক্তিভরে স্তব, প্রার্থনা এবং পূজো ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই। কিন্তু এখন দক্ষিণায়ন। দুর্গতিহরা দুর্গা নিদ্রিতা। তিনি প্রবোধিতা না হলে কার্যসিদ্ধি অসম্ভব। তখন ব্রহ্মা দেবতাদের নিয়ে দেবীর স্তব করতে লাগলেন। সেই স্তবে সন্তুষ্টা দেবী এক দিব্যদীপ্তিমালিনী সত্ত্বগুণময়ী কৌমারী মূর্তিতে আবির্ভূত হয়ে ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ববৃক্ষমূলে মহাদেবীর বোধন করে পূজো করতে নির্দেশ দিলেন। সেই নির্দেশানুযায়ী ব্রহ্মাসহ অন্য দেবগণ সকলে নেমে এলেন পৃথিবীতে। আশ্রয় করলেন এক দুর্গম ও নির্জন স্থানে। আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, বিল্ববৃক্ষের সবুজ ঘন পত্ররাশির মধ্যে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা এক পরমাসুন্দরি বালিকা নিদ্রিতা। সেই দিব্যকুমারীদেবীকে চিন্ময়ী জগন্মাতা বুঝে ব্ৰহ্মাদি দেবতারা পরম ভক্তিভরে কৃতাঞ্জলিপুটে স্তব করতে লাগলেন যাতে তিনি জাগ্রতা হন। তাঁদের আকুল প্রার্থনায় প্রসন্না হয়ে মহেশ্বরী এবার জাগরিতা হলেন। তখন তিনি এই বালিকারূপ ত্যাগ করে দনুজহননী দেবী চণ্ডিকার রূপ পরিগ্রহ করলেন। ব্রহ্মা বললেন :
‘মা, রাবণবধে শ্রীরামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য আমরা অকালে তোমাকে জাগ্রত করেছি।’
‘রাবণস্য বধার্থায় রামস্যান্যগ্রহায় চ।’
‘যতদিন রাবণ বধ হবে না ততদিন তোমার অর্চনা করে যাব। আজ যেভাবে মহাপূজোর জন্য তোমার বোধন করেছি, যতদিন এই সৃষ্টি থাকবে, মানবজাতি ততকাল আরাধনায় ব্রতী থাকবে।’
‘অৰ্চিৰ্য্যন্তি বিশেষণ যাবৎ সৃষ্টি প্রবর্ততে।’
ব্রহ্মার এই বন্দনায় তুষ্ট হয়ে মহামায়া মহাদেবী ‘তথাস্তু’ বলে তাঁকে বরদান করে বললেন, সপ্তমী তিথিতে আমি শ্রীরামচন্দ্রের ধনুর্বানে প্রবেশ করবো। অষ্টমীতে রাম-রাবণের যুদ্ধে সৌরমণ্ডল প্রকম্পিত হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড ভূপাতিত হবে। আর দশমীতে শ্রীরামচন্দ্র বিজয়োৎসব করবেন। এই বলে দেবী দুর্গোৎসবে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ক্রম ও বিধি ব্যাখ্যা করে সবাইকে জানিয়ে দিলেন।
শ্রীরামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য ব্রহ্মা বিল্ববৃক্ষে বোধনপর্ব সময়াদন করে যে মাতৃ আরাধনা করেছিলেন, আমাদের শারদীয় মহাপূজা তারই অনুবর্তন।”
এই হচ্ছে সেই কাহিনি যা মূল গল্পে আমি ইচ্ছে করেই লিখিনি শুধুমাত্র তাতে গল্পের গতি বিঘ্নিত হতে পারে এবং গল্পের সঙ্গে বাস্তবের চরিত্রগত মিল রাখার কথা ভেবে।
এই কাহিনি আমার জীবনে কিছু মানুষের উপস্থিতি ব্যতীত লেখা সম্ভব ছিল না। তালিকায় প্রথম নামটাই আমার সহধর্মিণী শ্রীমতি শ্যামা ঘোষ চক্রবর্তী’র। যখন আমি এই কাহিনি লিখছি তখন সদ্য আমাদের সন্তান হয়েছে। একজন মায়ের প্রসব পরবর্তী দিনগুলোর কষ্ট আশা করি সকল পাঠক অনুধাবন করতে পারবেন। সেই সমস্ত দিনেও রাতের পর রাত মহারাজকে (আমাদের পুত্রের ডাক নাম) সামলানোর পাশাপাশি ‘চন্দ্রহাস’-এর পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদ পড়ে গেছেন তিনি। কোথায় ভুল ত্রুটি আছে, কোথায় আরও ভালো করা যায়, কোন কোন অংশ নিয়ে আরও ভাবা উচিত, সেসব অকাতরে আমাকে না বললে এই কাহিনির সঠিক রূপ রস গন্ধ আমি পাঠকের কাছে তুলে ধরতে পারতাম না। আমার সকল লেখার প্রথম পাঠক হিসেবে এই কাজটা তিনি প্রতিবার করে আসছেন। সহধর্মিণীকে ধন্যবাদ দেবার জায়গা নেই, আছে ভালোবাসার অধিকার।
তন্ত্র নিয়ে বড় কাজ করার ইচ্ছে অনেকদিন আগে থেকেই ছিল। কিন্তু এই বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুঝতে পারি-এ কাহিনিতে তন্ত্রকে জোর করে টেনে আনতে হবে না। তন্ত্রাচার ছাড়া মহাপূজো এবং নরবলি অসম্পূর্ণ। তাই তন্ত্রাচার এই কাহিনিতে এসেছে তার স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই। প্রথমেই ঠিক করি যে, শুধুমাত্র বই পড়ে এবং বইয়ের থেকে মন্ত্র টুকে দায় সারবোনা। কোনও সাধকের কাছে এই বিষয় চর্চা করে নিজেকে শিক্ষিত করবো তারপর এই গ্রন্থের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করবো। এ কাজে আমি সর্বতোভাবে কাছে পাই পূর্বে উল্লিখিত আমার জ্যেষ্ঠ শ্রী বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য্য’কে। তিনি নিজে বামাচারী সাধক হওয়ায় আমাকে সঠিকভাবে তান্ত্রিক ক্রিয়া, উপক্রিয়াসহ বিভিন্ন মন্ত্রের বীজ উল্লেখ দ্বারা শিক্ষিত করেন। আমার শিক্ষার্জিত বিদ্যায় কোথায় কোথায় সেই অর্থে ট্যাকনিক্যাল ক্রটি আছে তা চিহ্নিত করেন। আমি শুরুতেই জানিয়েছিলাম আমি পাঠক ঠকাতে চাই না, বরং ইতিহাস জানাতে চাই বিশুদ্ধভাবে। সেই বিশুদ্ধতা তখনই বজায় থাকবে যখন আমার মন্ত্র থেকে শুরু করে তান্ত্রিক পূজোর আচার বিধান আমি যথাযথ মেনে লিখতে পারবো। বিশ্বরূপদা না থাকলে এই গ্রন্থ কোনোভাবেই তান্ত্রিক ব্যাকরণের দিক দিয়ে ত্রুটিমুক্ত হত । সাধককে প্রণাম জানানো রীতি, আমি মানুষটাকে বুকে রাখি।
বিগত দেড় বছর ধরে আমি যে এই একটি বিষয় নিয়ে পড়ে আছি, অধ্যয়ন করছি, বিভিন্ন জায়গায় অবিরত ফিল্ড স্টাডির জন্য যেতে হচ্ছে সেই বিষয়গুলো সময়ে সময়ে খোঁজ নিয়ে গেছেন ‘দ্য কাফে টেবল’ প্রকাশনের অন্যতম কাণ্ডারী শ্রী অভিষেক আইচ। এ গ্রন্থ ছাপার ব্যাপারে ‘দ্য কাফে টেবল’ দেড় বছর আগেই আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবুও কাহিনি সম্পূর্ণ লেখার পর আমার একমাত্র শর্ত ছিল এই কাহিনি অভিষেকদার নিজে পড়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ছাপার ব্যাপারে। কারণ, শুধুমাত্র লেখকের গবেষণার পেছনে চোখ বন্ধ করে কোনও প্রকাশক লগ্নি করুক এটা আমি চাই না। প্রকাশকের ব্যবসায়িক দিক নিয়ে ভাবার দায়িত্ব প্রত্যেক লেখকের অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করি। ‘চন্দ্রহাস’ সম্পূর্ণ পড়ে শুধুমাত্র ছাপার সিদ্ধান্ত নিল না ‘দ্য কাফে টেবল’, লেখা নিয়ে রীতিমত নোট তৈরি করে অভিষেকদা চমকে দেয় আমাকে। নিজের সুচারু মতামত জানান যাতে আমি উপকৃত হই। এই মানুষটা নিরন্তর আমাকে সময় নিয়ে ভালো কাজ করার সৎ উপদেশ দেয়। আগামী দিনেও এরকম বড় প্রজেক্ট হাতে নেবার ব্যাপারে যে উৎসাহ আমি অভিষেকদার থেকে পাই-তা আমাকে সাহসী হতে সাহায্য করে। ‘চন্দ্রহাস’-এর সকল খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমার মতামত ঠান্ডা মাথায় শুনে, ভালো প্রোডাকশান পাঠকের হাতে তুলে দিতে যে পরিশ্রম তিনি করেছেন তাতে আমি আজীবন কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকবো৷ ‘দ্য কাফে টেবল’-এর আরেক কর্ণধার শ্রী অরিজিত ভদ্র-ও যখন মুম্বাই থেকে কলকাতা এসেই ‘চন্দ্রহাস’ নিয়ে নিজের মুগ্ধতা জানায় এবং কীভাবে আরও ভালোভাবে পাঠকের হাতে গ্রন্থটি তুলে দেওয়া যায় নিয়ে অবিরাম চর্চা করে বুঝতে পারি, ‘দ্য কাফে টেবল’-এর হাতে ‘চন্দ্রহাস’ সুরক্ষিত।
গ্রন্থটিকে ত্রুটিমুক্ত করতে শ্রীমতি ইন্দ্রাণী নাগ, শ্ৰী তন্ময় দে এবং কুমারী ঋষা ভট্টাচার্য্য যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা অকল্পনীয়।
এছাড়াও লেখক তথা বন্ধু শ্ৰী মনীষ মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখ করতে চাই। একবার অফিসিয়াল একটি কাজে বাইরে গেছি। রাতের বেলায় লেখা নিয়ে বসেছি। বুঝতে পারলাম প্রয়োজনীয় বই বাড়িতে ফেলে এসেছি। এই কথা শোনামাত্র সেই বইটি আমার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন লেখক। এরকম বন্ধু ভাগ্য কম লোকের জোটে। তাঁকে আমার আন্তরিক ভালোবাসা জানাই।
তবে এই গ্রন্থ লিখতে গিয়ে যে মূল্যবান বন্ধুদের আমি পাশে পেয়েছি তাতে এক উল্লেখযোগ্য নাম গ্রন্থের প্রচ্ছদশিল্পী শ্রী অনিকেত মিত্র। ২০১৮ সালের মাঝপথ থেকে খুব সজাগ দৃষ্টি নিয়ে খুঁজতে থাকি কার হাতে ‘চন্দ্রহাস’-এর প্রচ্ছদের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি। এ রকম কেউ হতে হবে যার আঁকায় সহজাতভাবেই বীভৎস রস থাকবে। কারণ এই উপন্যাস দাঁড়িয়েই আছে নরবলির মত বীভৎস এক অধ্যায় নিয়ে। ধীরে ধীরে একজনের আঁকা ছবি, পোস্টার ডিজাইন অত্যন্ত ভালো লাগতে শুরু করে, বলা ভালো মুগ্ধ হতে থাকি। তিনিই অনিকেত মিত্র। বলিউডের বাঘা বাঘা লোকেদের সঙ্গে কাজ করতে থাকা এই শিল্পী যখন ‘চন্দ্রহাস’ নিয়ে শুনলেন এবং মনোযোগ দিয়ে পড়লেন তখন এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। আমার সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করলেন। আমি আবিষ্কার করলাম এক কর্মপ্রিয়, সৎ, নির্ভীক শিল্পীকে যিনি নিজের কাজের মধ্যে ঈশ্বর খোঁজার চেষ্টা করেন। শুধু অসাধারণ প্রচ্ছদ, নামঙ্কন আর অলঙ্করণের জন্য নয় এরকম একজন শিল্পীর সাহচর্যের জন্য আমি খুশি এবং গর্বিত। এছাড়াও বাংলা সাহিত্যে সামনে এবং পেছনে দুটো প্রচ্ছদকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজও খুব বেশি নেই। বিদেশী সাহিত্যের গ্রন্থে বিষয়ভিত্তিক কাজ করা হলে এ রকম করা হয়। আমি যখন আমার এই দুই প্রচ্ছদের চিন্তা সামনে রাখি প্রকাশক এবং শিল্পী দু’ক্ষেত্রেই আমাকে স্বাগত জানানো হয়। এমনকি প্রথা ভেঙে বাংলা সাহিত্যের অলঙ্করণে এক অন্য ধারা নিয়ে অলঙ্করণের যে ইচ্ছে আমার ছিল, আমার মনে হয় তাতেও শিল্পী অনিকেত মিত্র চূড়ান্তভাবে সফল। এই আঁকাগুলো উপন্যাসটির গহনা।
এবার আসি অন্য এক অধ্যায়ে। ভারতবর্ষে যখন ‘চন্দ্রহাস’ প্রকাশের খবর বেরোয়, তখন ভারতবর্ষের সর্বত্র বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এবং ত্রিপুরায় বইটি নিয়ে পাঠকদের মধ্যে বিপুল সাড়া দেখা দেয়। হয়তো গ্রন্থটির বিষয় পারিবারিক নরবলি এবং অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ আমার লেখার সঙ্গে এ দেশে পরিচিত বলেই হয়তো এই সাড়া। আমার জন্মস্থান এবং ছোটবেলা কেটেছে ত্রিপুরায়। তাই সেখানকার উৎসাহও আমার বোধগম্য ছিল। কিন্তু আমাকে অবাক করে দেয় আমার প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশের পাঠকেরা। সেখান থেকে ‘চন্দ্রহাস’কে নিয়ে যে পরিমান আগ্রহী প্রশ্নের সম্মুখীন আমি এবং ‘দ্য কাফে টেবল’ প্রতিদিন হতে থাকি তা এক কথার অবিশ্বাস্য ছিল। একইসঙ্গে আমার কাছে আসতে থাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইয়ের কপিরাইট দেবার অনুরোধ। কিন্তু যেভাবে আমি ভারতে ‘দ্য কাফে টেবল’কে এই বই প্রকাশের দায়িত্ব দেবো ভেবে রেখেছিলাম বাংলাদেশেও সেই দায়িত্ব শুধু ‘বাতিঘর প্রকাশনী’কেই দেবো মনস্থ করেছিলাম। এ রকমই এক সময়ে ‘বাতিঘর প্রকাশনী’র কর্ণধার এবং দুই বাংলার জনপ্রিয়তম থৃলার লেখক মোহম্মদ নাজিম উদ্দিন মহাশয় ‘চন্দ্রহাস’কে বাংলাদেশে প্রকাশ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। দ্বিতীয়বার ভাবার কোনও প্রশ্নই ছিল না। কারণ একমাত্র এই প্রকাশনা সংস্থাকেই দেবো তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম আমি। শুধু মনে প্রশ্ন ছিল একটাই-ভারতবর্ষে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হচ্ছে, বাংলাদেশেও একই সময়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি? আমার আশঙ্কা এক লহমায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন মোহম্মদ নাজিম উদ্দিন। ‘দ্য কাফে টেবল’-এর সঙ্গে যোগাযোগসহ সমস্ত আইনি ব্যাপার স্যাপার সামলে নিলেন দক্ষতার সঙ্গে। আমি লেখক নাজিম উদ্দিনের বাইরে আবিষ্কার করলাম এক বড় হৃদয়ের মানুষকে। এই সম্পর্ক আরও এগোবে।
ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশ, দু’দেশে প্রায় একই সঙ্গে একই সময়ে দুই ভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘চন্দ্রহাস’। আমাকে এই কৃতিত্বের অধিকারী করার জন্য ধন্যবাদ জানাই আমার দুই দেশের দুই প্রকাশককে এবং দুই দেশের পাঠককে। তাঁদের ভালোবাসা ছাড়া এটা কখনোই সম্ভব হত না। এরই মধ্যে আমার প্রিয় পাঠক বন্ধু তথা ছোট ভাই আশরাফ হোসেন পারভেজের কথাও উল্লেখ করবো। ওর অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল যেন বাংলাদেশ থেকেও আমার বই প্রকাশিত হয়। মূলত ওর ইচ্ছেতেই আমি বাংলাদেশে ‘চন্দ্রহাস’ প্রকাশের কথা ভাবি। এবার শুধু ওর নয়, আমার নিজের স্বপ্নও বাস্তবায়িত হলো।
ভালোবাসা জানাই আমার পরিবারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে যারা আমার এই লেখার কারণে কোনও না কোনভাবে কষ্ট স্বীকার করেছেন, তবু আমার অধ্যয়নের কিম্বা লেখার ক্ষতিসাধন হতে দেননি।
আমার যা যা দেবার ছিল আমি দিয়ে দিলাম। এবার বাকি কথা দুই দেশের পাঠক বলবেন।
শুধু এইটুকু বলার, নরবলি নিয়ে বড় ক্যানভাসে একটা কাজ করলাম ঠিকই, হয়তো আগামীদিনে আরও একটি কাজ করতে পারি যদি এই গ্রন্থ আপনাদের ভালোবাসা পায়, কিন্তু নরবলির মত বীভৎস ক্রিয়াকে কোনোভাবেই উৎসাহিত করতে রাজি নই। এই গ্রন্থে সে চেষ্টাও করা হয়নি। শুধুমাত্র যা যা ঘটে গেছে ইতিহাসে তা তুলে ধরা হয়েছে কাহিনির মোড়কে। ভূমিকার পূর্ববর্তী ‘লেখকের কথা’ অংশটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকের জন্যে এই বইয়ের ‘লেখকের কথা’ বস্তুত এক প্রকার সাবধানবাণী। পাঠকের মানসিক প্রস্তুতির কথা ভেবেই এর অবতারণা। এবার বলি দেওয়া উচিত কী অনুচিত তা ঠিক করবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং শ্রদ্ধেয় পাঠক নিজে।
আশা করি ‘চন্দ্রহাস’-এর বীজকে ভূমিকায় জাগ্রত করতে পেরেছি। এবার মহাপূজো শুরু হোক। ‘চন্দ্রহাস’ আপনাদের হয়ে গেল।
পাঠ শুভ হোক।
ধন্যবাদান্তে
সৌরভ চক্রবর্তী
কলকাতা, ভারত
.
তথ্য ঋণ
১. কালিকা পুরাণম
২. মনু সংহিতা
৩. ঋক বেদ
৪. যযুর্বেদ
৫. নরবলির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, শ্রী দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়
৬. মানবসভ্যতায় কুমারীবলি, শ্রী দীনেন্দ্রকুমার সরকার
৭. ভক্তিশাস্ত্র
৮. উত্তরকামিকাগম
৯. ক্রিয়াকর্মদ্যোতি
১০. মন্ত্রমহার্ণব
১১. পুরোহিত দর্পণ
১২. বৃহৎ তন্ত্রসার
১৩. রামায়ণ
১৪. মহাভারত
১৫. শিব পুরাণ
১৬. স্বদেশচর্চা লোক: দুর্গোৎসব সেকাল-একাল ১, সম্পাদক শ্রী প্রণব সরকার।
১৭. নবকুমার বসুর বিভিন্ন গ্রন্থ।
১৮. তন্ত্রাভিলাষীর সাধুসঙ্গ, শ্রী প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়
১৯, ভারতবর্ষের মন্দিরে মন্দিরে, শ্রী শিবশঙ্কর ভারতী
২০. ত্রিপুরার রাজমালা
২১. Indian and oriental armour, Lord Egerton of Tatton
২২. Precious Indian Weapons, Salam Kaoukji
২৩. The encyclopedia of animals.
২৪. Extinct animals, Speedy publishing LLC
২৫. Extinct animals of the British isles, Gerlach Justin.
২৬. The best book of endangered & extinct animals, Christiane Gunzi
২৭. Human Sacrifice, a shocking expose of ritual killings worldwide, jimmy Lee Shreeve
২৮. The highest alter, Patrick Tierney
২৯. Ritualistic Human sacrifice, CV Hunt
৩০. Human sacrifice, Laerke Recht
৩১. Heat & Sacrifice in the Vedas, Uma Marina Vesci
৩২. New perspectives on human sacrifice and ritual body treatments in ancient maya society, edited by Verateasler & Andrea Cucina
৩৩. The jew & human sacrifice, Starck Hermann Leberecht
৩৪. দেবী মাহাত্ম্য
৩৫. ইন্টারনেট
.
সৌরভ চক্রবর্তী
ত্রিপুরায় জন্ম, বেড়ে উঠেছেন আগরতলায়। ঐতিহ্যবাহী উমাকান্ত অ্যাকাডেমি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন-পরবর্তীতে কারিগরি বিদ্যায় স্নাতক। স্কুল-জীবন থেকেই লেখার। হাতেখড়ি। কলেজ জীবনে ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এক সময় গ্রুপ থিয়েটারও করেছেন এই লেখক। তখন থেকেই বড়দের জন্য গল্প লেখার শুরু।
প্রথম উপন্যাস চতুর্থস্তম্ভ প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে। সেই থেকে রহস্য-থৃলার, জীবনমুখী, সব লেখাতেই সমান স্বচ্ছন্দ। ছোটদের জন্যে লিখেছেন ‘কিশোর-ভারতী’, ‘সন্দেশ’-এর মত পত্রিকায়। ত্রিপুরার ‘শিশুমহল’-এর জন্য। এক বছর টানা লিখেছেন জনপ্রিয় কমিকস কলাম সিরিজ। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে একাধিক গল্প । শেষ গল্প-এর মত অন্যধারার গল্প লিখে। লেখক-পাঠকের কাছ থেকে পেয়েছেন অকুণ্ঠ ভালোবাসা।
চাকরিসূত্রে কলকাতানিবাসী এই লেখক। সময় পেলেই পত্রিকা ও ওয়েবজিনের জন্য লেখেন। গল্পের খোঁজে দেশ চষে বেড়ানোটা সাম্প্রতিককালে নেশায় পরিণত হয়েছে। তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘গল্পের ছদ্মবেশ।’





Leave a Reply