চন্দ্রহাস – ১.৫

অধ্যায় ৫

“আমাদের ভারতবর্ষে কাদের হাত ধরে নরবলি শুরু হলো, যদি বলা হয় তবে আমরা নিষাদ এবং কিরাত জাতির কথা বলবো। যদিও দমিল নামক এক জাতির কথাও আমরা জানতে পারি।”

অ্যাক্সিডেন্টের পর অনেকদিন কেটে গেছে। আজই আবার ক্লাস শুরু করেছেন প্রফেসর রাঘব। মাঝের দিনগুলো খুব কষ্টে কেটেছে তার। যদিও তনুশের মৃত্যু নেহাত দুর্ঘটনায় হওয়ায় পুলিশ কিংবা তনুশের বাড়ির লোকেরা কোনোভাবেই বিরক্ত করেনি রাঘবকে। তবু রাঘব তনুশের মৃত্যুর জন্যে নিজেকেই দায়ী করছেন। এক-আধ বার তনুশের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের কথাও ভেবেছেন, কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি।

রাঘব জানতে পেরেছিলেন যে, হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তনুশের মৃত্যু হয়। রাস্তায় সে গাড়ির দিকে নির্দেশ করার পর কোমায় চলে গিয়েছিল, সেখানে তার মৃত্যু হয়নি। আর এটা শোনার পরেই তার মনে হয়েছিল বইটার কথা। ততদিনে ছুটি হয়ে গিয়েছে রাঘবের। হাসপাতাল থেকে পাঠানো প্যাকেটগুলোর মধ্যে বইটা পেয়েছিলেন তিনি। আর পাঁচটা বইয়ের মতোই, বিশেষ কিছু মনে হয়নি দেখে। পাতা উল্টেও একই অনুভূতি ছিল। বিভিন্ন টুকরো গল্প, অলৌকিক বর্ণনায় ভর্তি বানানো ইতিহাস। আর এগুলো পড়তে পড়তেই তিনি মহারাজ হর নারায়ণ এবং রাজমাতার গল্পটি পড়লেন। সেই গল্পকেও একই রকম বানানো গল্পের অন্তর্ভুক্ত করতেন তিনি যদি না বেশ কয়েকবার তাতে চন্দ্রহাসের উল্লেখ পেতেন। আর তখনই তনুশের বলা কথাগুলো মনে পড়ে তার। তনুশ হয়তো এই চন্দ্রহাসের উল্লেখের জন্যই বারবার বলেছিল যে হয়তো তার গল্পের সঙ্গে এই গল্পটিকে জুড়লে কোনো দিকনির্দেশ পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন কী করণীয়, তা তিনি নিজেও ঠিক করে উঠতে পারেননি।

“নিষাদ ও কিরাতরা অনার্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিল। তাদের এই সংস্কৃতির ঐতিহ্যও সুদূর বিস্তৃত। মনে করা হয়, ছোটনাগপুর ও সাঁওতাল পরগণা থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের উচ্চভূমি সীমা পর্যন্ত প্রধানত আদি অস্ট্রাল বা নিষাদ জাতির বিভিন্ন শাখার সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। শিকার, পশুপালন, কৃষি প্রভৃতি নানারকম স্তরভুক্ত ছিল এই সংস্কৃতি।”

“এই নিষাদ ও কিরাত জাতি ভারতবর্ষে কখন থেকে আছে?”

“ভেরি গুড কোশ্চেন রুচি। মনে করা হয়, মানবজাতির ক্রমবিকাশের প্রথম যুগ থেকেই নাকি তারা ভারত ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজত্ব করছেন। অর্থাৎ, হিসেবমতো খ্রিস্টপূর্ব ২৩ শতাব্দীরও আগে থেকে তারা ছিল এবং সে প্রমাণও আছে ইতিহাসে। আর যদি তারাই নরবলির কাণ্ডারী হয় তবে সেই সময় থেকেই ধর্মের নামে নরবলি শুরু হয়ে গিয়েছিল আমাদের এই মহান দেশে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন উপজাতির উন্মেষ ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু নিষাদ ও কিরাতদের সংস্পর্শে এসে তারাও ধর্মীয় আচার-আচরণে নরবলি প্রথাকে স্থান দিয়ে দিল। ব্যস, এবার নরবলিতে পুণ্যলাভের প্রক্রিয়া সংক্রামিত হল ভাইরাসের মতো।”

“অদ্ভুত!”

“অদ্ভুতের এখনও কী দেখলেন অনুরাগ মশাই, সবে তো শুরু হলো। শোনা যায়, আদিম মানুষের এই ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কিত আচার-অনুষ্ঠান দু’রকম ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথম হচ্ছে সদৃশ বিধানী ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া এবং দ্বিতীয়টি সংস্পর্শ বিধানী ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া। শুরুর দিকে আদিম মানুষ প্রথম প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতো। টোটেম মনে আছে তো তোমাদের! সেই টোটেম ব্যবহার হত এই প্রক্রিয়ায়। যাদের হত্যা বা বলি হবে, সেই ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তিদের মাটির মূর্তি বানানো হতো। তারপর সেই মূর্তির বুকে একটি বিশেষ বুনো গাছের কাঁটা ফুটিয়ে দেওয়া হতো। ব্যস এইটুকুই। কিন্তু যখন দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি গ্রহণ করা হলো, তখন থেকেই শুরু হলো মূর্তির বদলে প্রকৃত মানুষ হত্যা বা বলি প্রথা। এই অবধি কারও কোনো প্রশ্ন থাকলে করো। নয়তো একটা ইন্টারেস্টিং টপিকে ঢুকে যাব।”

সবাই মাথা নেড়ে জানালো, এইটুকু অবধি তাদের কোন প্রশ্ন নেই।

গ্রিন সিগন্যাল পেয়েও রাঘব নতুন টপিকে ঢুকতে পারলেন না। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে উঠলো আর তিনি সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়ানো থেকে বসে পড়লেন। রুচি, অনিরুদ্ধ, পল্লবীসহ ক্লাসের অনেকেই এগিয়ে এলে তাদের প্রিয় স্যারকে ধরতে। রাঘব হাত নেড়ে বোঝালেন যে তিনি ঠিক আছেন। রুচি জল এগিয়ে দিলো।

“ঠিকই আছি রে মা। শুধু ছেলেটাকে ভুলতে পারছি না।”

পল্লবী বলল, স্যার আমাদের সঙ্গেও ওই একদিনেরই আলাপ। তারপর তো সে পরদিন আর এলোই না ক্লাসে। তবু মনটা খারাপ হয়ে আছে।”

“নিজেকেই অপরাধী মনে হয়।”

“স্যার আপনার কী দোষ? ইট ওয়াজ অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট।”

“তাই বললে কী হয়! এত দিন ধরে নরবলি পড়াতে পড়াতে আজ আমি নিজে…”

ক্লাসে কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। এই নিস্তব্ধতা হিউম্যান স্যাক্রিফাইসের রাঘবস্যারের ক্লাসে ট্রেডমার্ক।

রাঘবের আজ অসহ্য লাগে এই নিস্তব্ধতা। তিনি নতুন টপিক শুরু করে দেন, “মৃতের স্তূপ, ‘মহেন-জো-দড়ো’ -নামটা সবাই জানি তো?”

সবাই আবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

“কেউ আমাকে বলল, এই ‘মহেন-জো-দড়ো’ সভ্যতা কেন ধ্বংস হতে গিয়েছিল? এনি ওয়ান? এনি রিজন?

অনিরুদ্ধ হাত তোলে।

“ইয়েস অনিরুদ্ধ । প্লিজ।”

“স্যার, অনেক কারণের উল্লেখ থাকলেও ইতিহাসের প্রত্নতত্ত্ব খননের উপর ভিত্তি করে ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস, আর্যদের হাতেই নাকি ধ্বংস হয়েছিল মহেন-জো-দড়ো। যদিও এছাড়াও অনেক কারণ আছে।”

“আছে, অনেক কারণ আছে। কিন্তু আজকে ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি তুমি বলে দিয়েছে। এই মহেন-জো-দড়ো আবিষ্কারের কাহিনিটাও খুব ইন্টারেস্টিং। ১৯২২ সাল, পশ্চিম ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তদানীন্তন সুপারিন্টেন্ডেন্ট মশায় শিকারে বেরিয়েছেন, নাম শ্রী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। গাদা বন্দুক নিয়ে হরিণ শিকারে করতে গিয়ে সিন্ধুপ্রদেশের লারকানা জেলার একটি জঙ্গলে পথভ্রষ্ট হলেন। ঘুরতে ঘুরতে রাখালদাস মশাই এসে এক মস্ত ঢিপির উপর বসলেন। পড়বি তো পড়, সেই ঢিপি পড়েছে রাখালদাস মশায়ের মতো অভিজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদের চোখে। অল্প সময় নিরীক্ষণ করেই বুঝতে পারলেন, এই ঢিপির নীচে হাজার বছরের ইতিহাস জমা আছে। ওই ষষ্ঠোন্দ্রিয়ের উপর ভরসা করে কাজ শুরু করলেন এবং আবিষ্কার করলেন প্রাগবৈদিক যুগের এক সভ্যতা- যার জন্ম হয়েছিল যিশুর জন্মের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে।

“হাউ লাকি হি ইজ?”

“অনিরুদ্ধ, এই ভাগ্যটা খুব জরুরি, জানো? পৃথিবীতে সব বড় বড় ঘটনা ঘটার আগেই সিসটেম্যাটিক ওয়েতে কিছু প্যারালাল ঘটনা ঘটতে থাকে। সেগুলো যখন ঘটে, তখন বোঝা যায় না তাদের গুরুত্ব। কিন্তু যখন সবগুলো ছোট ছোট ঘটনা মিলে বড় ঘটনাটি ঘটে যায় তখন আমরা একে ভাগ্যের নাম দিয়ে ফেলি। বিনা কারণে কোনো কিছু ঘটে না, কোনো কিছু না।”

কথাটা বলে রাঘব থামলেন। তার মাথায় আবার ঘুরে এলো তনুশের ছবি। তনুশের মৃত্যু কি তবে তাকে আরও বড় কোন ঘটনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? হঠাৎ করে সব হিসেব পালটে যাচ্ছে যেন, রাঘব সময় এবং চিন্তার উপর আর আগের মতো পরিপাটিভাবে রাশ টানতে পারছেন না।

“স্যার, স্যার?”

ঘোলাটে হয়ে যাওয়া পৃথিবীটা আবার পরিষ্কার হলো ছাত্রদের ডাকে। রাঘব আবার শুরু করলেন।

“মহেন-জো-দড়ো নিয়ে পড়তে গেলে একটা প্রশ্ন প্রায় সব ইতিহাসবিদদের মাথায় এসেছে। এরকম বহু ঢিপি পৃথিবীর বহু স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন ধরো গৌড়ের বল্লাল ঢিপি। এমনকী কোনার্কের মন্দিরও এক বালির ঢিপির নীচ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সব ঢিপির নীচে কী ছিল তা আমরা জেনেছি খননের পরে । আগে জানার কোনো উপায় ছিল না। তাই ঢিপির নীচের ইতিহাসের ভিত্তিতে নামকরণও হয়েছে খনন পরবর্তী সময়ে। অথচ মহেন-জো-দড়ো সভ্যতা আবিষ্কারের আগে থেকেই সেই ঢিপির নাম মহেন-জো-দড়ো অর্থাৎ মৃতের স্তূপ ছিল। সেটা কেন? এর মানে, বছরের পর বছর এই প্রবাদই রটেছে যে এর নীচে মৃত মানুষ রয়েছে, আস্ত একটা মৃত শহর রয়েছে। আর এটা মানুষ কখন বলতে পারে?”

রাঘব প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন ক্লাসের মধ্যে আর রুচি যেন লুফে নিলো সেই প্রশ্নের ক্যাচ।

“তখনই পারে স্যার, যখন সে নিজে ধ্বংস করেছে সেই শহরকে।”

“কারেক্ট । মানে মানুষ নিজেই মহেন-জো-দড়ো সভ্যতাকে রাতারাতি ধ্বংস করে দিয়েছিল। চলো, এই বৈরিতার একটা প্রধান কারণ নিয়ে আজ পড়াশোনা করি আমরা-নরবলি।”

প্রায় সমস্বরে কয়েকজন বলে উঠলো, “হোয়াট?”

“এই হোয়াটের উত্তর দেওয়াটাই তোমাদের রাঘবস্যারের কাজ। মহেন-জো-দড়ো থেকে প্রাপ্ত শিলমোহরগুলোর ভাষা আমরা বহুকাল পাঠোদ্ধার করতে পারিনি। তারপর রেভারেন্ড হেরাস নামে এক নৃতত্ত্ববিদ সেই ভাষার পাঠোদ্ধার করেন। লিপির নামকরণ তিনি করতে পারেননি, কিন্তু মহেন-জো-দড়োর তৎকালীন নাম কী ছিল, তা তিনি বিশ্ববাসীকে জানালেন। শহরের নাম ছিল ‘নন্ডুর’ এবং তাদের আরাধ্য দেবতা ছিলেন আন (অহহ)। তিনি আরও জানতে পারেন যে এক সময় সে দেশের রাজার নাম ছিল চুন্নি মীনা। মূলত এই রাজা চুন্নি মীনাই সে দেশে লিঙ্গ পূজা শুরু করেন। আন নামক পুরুষ দেবতার সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন আম্মা (অস্‌সধ) নামের এক স্ত্রী দেবতা। ইনি ছিলেন উর্বরা শক্তির প্রতীক। জমিতে যাতে অধিক শস্য ফলন হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্বিকার থেকে রক্ষা পেতেই এই মাতৃশক্তির আরাধনা শুরু হয় নন্ডুরে। আশা করি, তোমরা দ্বিতীয় দিনের ক্লাসে বোঝানো বিষয়গুলোর সঙ্গে এবার মিল খুঁজে পাচ্ছো।”

“পাচ্ছি স্যার।”

“বাহ্, এই প্রথম ক্লাসে তোমার উত্তর পেলাম, ভালো লাগলো রুবিনা। এই আমাদের দেশ-যেখানে মাতৃশক্তি নিয়ে ক্লাসে উত্তর দিচ্ছে আল্লাতালার সন্তান। চলো আবার সিলেবাসে ডুব দিই, তো এই আম্মা দেবীর কোনো নির্দিষ্ট মূর্তি ছিল না। একটি নির্দিষ্ট গাছকে তারা দেবীর প্রতীক হিসেবে বেছে নিতে এবং বছরব্যাপী গাছটির পূজা হতো। এবার শিলালিপি থেকে জানা যায়, মহেন-জো-দড়োর প্রতি নগর ও গ্রামে একটি করে এরকম পবিত্র গাছ থাকতো। তোমরা কিছু আন্দাজ করতে পারছো?

রুবিনাই উত্তর দেয়, “অপবিত্র কুরুচিকর ইতিহাসের সংকেত খুঁজে পাচ্ছি স্যার।”

“গন্ধটা নির্ভুল। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে, সম্ভবত বর্ষার শুরুতে যখন কৃষিক্ষেত্র তৈরির সময়, তখন দেশ জুড়ে আম্মার পূজা হত। অনেকটা দুর্গোৎসবের মতো। নন্ডুরের জাতীয় উৎসব ছিল এই পূজা। নাচ-গান ইত্যাদি তো ছিলই, কিন্তু সবচেয়ে রোমহর্ষক ছিল নরবলি। সবাই অপেক্ষা করে থাকত সে সময়ের। আর একটি বা দুটি নয়-এক যোগে সাতটি অথবা সাতের গুণিতকে একুশটি বলি হতো। সে দৃশ্য বড় নির্মম ছিল, কিন্তু রাজা ভাবতেন এতেই দেশের মঙ্গল হবে।”

“স্যার, আপনি তো বললেন প্রতি নগরে একটি পবিত্র গাছ থাকতো।”

“তাহলেই তুমি বোঝো পল্লবী, প্রতি নগরে যদি সাত কিংবা একুশ জন মানুষ বলি হয় তাহলে দেশ জুড়ে সংখ্যাটা এক বর্ষায় কোথায় গিয়ে ঠেকছে! আরও ভয়ানক ইতিহাস শুনবে? তোমরা অশ্বমেধ তো শুনেইছো, রামায়ণ-মহাভারতে এরকম অনেক অশ্বমেধের উল্লেখ আছে। কখনও নারীমেধ শুনেছ?”

ক্লাসে সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে আর অনুরণনে বারবার ‘নারীমেধ’ শব্দটা ভেসে বেড়ায় ক্লাসে।

“আশঙ্কা করা হয়, এই বলিগুলির অধিকাংশই ছিল নারীমেধ। নারীবলিই হত বেশি। কিশোরীরা অগ্রগণ্য হতো এ বিষয়ে। আর রাজা চুন্নি মীনা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীমেধের জন্য কিশোরী এবং নরবলির জন্য কিশোর সংগ্রহ করতেন। সংগ্রহ করে তিনি তুলে দিতেন পুরোহিতদের হাতে। সহজেই অনুমেয় যে মাতা-পিতারা নিশ্চয়ই হাসিমুখে সন্তানকে বলির জন্যে তুলে দিতেন না। বলপ্রয়োগেই সে কাজ করা হতো। প্রজারা এ কারণে দীর্ঘদিন অসন্তুষ্ট থাকার পর বিদ্রোহ করে। রাজাকে বন্দি করা হয়। পরবর্তীতে রাজাকে শান্তি চুক্তি করে ছাড়া হয় ঠিকই, কিন্তু বলি বন্ধ হয় না। রাজা দেশের লোকদের বলির জন্য ব্যবহার করে না, কিন্তু দেশের বাইরে থেকে মানুষ সংগ্রহ করতে থাকেন। এবার হচ্ছে গল্প। আচ্ছা, নন্ডুরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তোমরা কাদের জনবসতির কথা পেয়েছে ইতিহাসে?”

“বৈদিক আর্যদের।”

“ঠিক, পল্লবী। ততদিনে বৈদিক আর্যদের উত্থান শুরু হয়ে গেছে। আর আর্যদের থেকে মানুষ সংগ্রহ করতে গিয়েই রাজা চুন্নি মীনা ধ্বংস ডেকে আনেন। আর্যদের হাতেই মৃতের স্তূপে পরিবর্তিত হয় নন্ডুর। তাহলে নরবলি যে সবসময় ধ্বংসই ডেকে এনেছে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? অথচ আজকের দিনেও খবরের কাগজে ওঠে এরকম কত ঘটনা।”

ক্লাস শেষে রাঘব বই নিয়ে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হলেন। এতক্ষণ ক্লাস করে মাথাটা কিছুটা হালকা লাগছে। রুমে ফেরার পথে কলিগ বীরেনবাবুর সঙ্গেও কিছু সময় কথা বললেন। মনটা আরও ভালো হলো। ক্যান্টিনের ছেলেটাকে হাতের কাছে পেয়ে খাবার পাঠিয়ে দিতে বললেন। তারপর হাসি মুখেই রুমে ঢুকেই ছিটকে গেলেন।

রুমে তার চেয়ারের অপর প্রান্তে বসে আছে কিছুদিন আগে তার গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কায় মৃত ছাত্র তনুশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *