অধ্যায় ৩
আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন, সেটা প্রফেসর রাঘৰ জানেন। ক্লাসে আজ নরবলির ইতিহাস শুরু করবেন তিনি। কিন্তু দিন শেষে এরকম একটা জিনিস যে তার হাতে আসবে যা ওর আগামী জীবনটাই পাল্টে দেবে সেটা তিনি ব্রেকফাস্ট করে কলেজ যাবার সময় ভাবতেও পারেননি।
তিনি যখন ক্লাসে এলেন তখন সবাই চলে এসেছে। অনুপস্থিত একমাত্র তনুশ।
“আজ আমরা নরবলির উৎপত্তি এবং প্রাথমিক আদি পর্ব নিয়ে আলোচনা করবো। কোনো বই নয়, কোনো নোটস কিছু নয়, যা প্রয়োজনীয় তা আমি পরে তোমাদের নোটস দিয়ে দেবো। যতক্ষণ আমার লেকচার চলবে আমি তোমাদের গল্পের মতো ইতিহাস বলতে থাকবো। তোমাদের মনে যে প্রশ্নটা আসবে সেটা সরাসরি জিজ্ঞেস করে নেবে। এর মাঝে আর কোনো কথা নেই। ঠিক আছে?
রাঘব কথা শেষ করে বুড়ো আঙুলে থাম্বস আপ দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন। সবাই সমস্বরে জানালো, “জ্বি স্যার।”
“তাহলে শুরু করছি। প্রথমেই যেটা জানতে হবে, সেটা হলো ভারতবর্ষে তথা পৃথিবীতে বলি শুরু হল কেন? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো ভয় এবং লোভ। কীসের ভয়? কীসের লোভ? তাহলে উত্তর হবে প্রাচীনকালে মানুষ দেবতাদের ভয় পেতো। এখনও পায়। কিন্তু সেটা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্যে ভয় দেখানো হয়, সে অন্য বিষয়। তখনকার দিনে আকাশে বজ্রপাত হলে ইন্দ্রকে ভয় পেতো, অধিক বৃষ্টিপাত হলে বরুণকে ভয় পেতো, দাবানলে বসতি নষ্ট হলে অরণ্যকে ভয় পেতো এবং সবাইকেই
তুষ্ট করতে দেবতা জ্ঞানে পূজা করতো। তারপর এই ধারণা থেকে জন্ম নেয় টোটেম।”
“টোটেম কী স্যার?”
“বলছি অরুণাভ। আজ আমরা যে জড় মূর্তি পূজা করি, অর্থাৎ মাটি, পাথর ইত্যাদি জড় পদার্থ নির্মিত দেবদেবী, সেই ভাবনা প্রথম আসে আমাদের আদিম পূর্বসুরিদের মনে। তারা প্রথম ধারণা করে জড় পদার্থের প্রাণ আছে। আর এই প্রাণ বিশিষ্ট জড় বস্তু আমাদের রক্ষক বা শুভাকাঙ্ক্ষী। একেই আমরা টোটেমবাদ বলি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই টোটেমবাদেও অনেক পরিবর্তন আসে, সে অন্য ব্যাপার। আসল কথা হচ্ছে, তখনকার মানুষ এই দেবতাদের ভয় পেতে থাকে এবং তাদের তুষ্ট করার সমস্ত চেষ্টা করতে থাকে।”
“সেই তুষ্ট করার থেকেই প্রথম নরবলি?”
“না পল্লবী, সরাসরি নরবলি আসেনি। এসেছে অনেক পরে। যে সময়ের কথা, সে সময় মানুষের ভোগ করার মতো, রিক্রিয়েশান করার মতো বস্তু আজকের মতো অঢেল পরিমাণে ছিল না। সেই সময় মানুষ শুধুমাত্র নারীদেরকেই রিক্রিয়েশানের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ভাবতো এবং নারীগমন বা সেক্সই একমাত্র রিক্রিয়েশান ছিল। সে যুগে আজকের মতো। সভ্য সমাজ গড়ে ওঠেনি। তখন মায়ের সঙ্গে ছেলে, বাবার সঙ্গে মেয়ে, ভাইয়ের সঙ্গে বোনের অবাধ যৌন মিলন ঘটতো। তাই যখন দেবতার উদ্দেশে প্রথম নৈবেদ্য দেওয়ার কথা মানুষের মনে এলো, তখন মানুষ নারীকেই বেছে নিলো।”
“স্যার, মানে আপনি বলতে চাইছেন নারীবলি?”
“সেটা কখন বললাম তমসা? বললাম নারীকে বেছে নিলো। গোটা নারীকে তখনও যূপকাষ্ঠে গলা দিতে হয়নি। দিতে হয়েছিল আরও কিছু সময় পর। প্রথমে মানুষ নারীর ম্যানস্ট্রুয়েশানের বিজ্ঞান জানতো না। তাই নারীর ম্যানস্ট্রুয়েশানকে এক অতিপ্রাকৃত ঘটনা বা ম্যাজিক ভাবতো। মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিন এই রক্তপাত হওয়ায় এটা যে কোনো জাদু সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছিল। তাই প্রথম নৈবেদ্য হিসেবে যোনিবাহিত এই শোণিতকেই তারা বেছে নিয়েছিল। কিন্তু কিছু সময় পর যখন তারা দেখলো যে তাদের
অভীষ্ট এতে সিদ্ধ হচ্ছে না, বজ্রপাত কমছে না কিংবা বন্যা, মড়ক ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে তখন তারা ভাবলো, এই শোণিতে দেবতা তুষ্ট হচ্ছেন না। তাদের এ-ও মনে হলো, এই ঋতুমতী নারীর শোণিত নয়, যে জিনিসে তারা মানুষ হিসেবে তৃপ্ত হচ্ছেন, সেই সঙ্গমকালীন শোণিত তারা দেবতাকে নৈবেদ্য দেবেন।”
“মানে? বুঝতে পারিনি, স্যার।”
“রাজীব, এর মানে, তখন তারা কুমারী মেয়েদের সঙ্গে পূজা চলাকালীন সঙ্গম করতেন, সঙ্গমকালে সেই কুমারীর সতীচ্ছদ বা হাইমেন ছিঁড়ে যে রক্তপাত হতো তা সংগ্রহ করে দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো বা নিবেদন করা হতো। তারপর এক সময় আস্ত নারীকেই যূপকাষ্ঠে মাথা দিতে হলো, এর কিছু সময় পর পুরুষ বলি, মানে নরবলিও শুরু হয়ে গেল। তাহলে বুঝতে পারছো তোমরা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে বলিপ্রথার পরিবর্তন হয়েছে?”
সবাই মাথা নেড়ে উত্তর দিয়ে বোঝালো যে তারা বুঝতে পারছে। একজন প্রশ্ন করল, “শুধু কি মানুষ বলিই হত শুরুর দিকে? মানে এখন যেমন আমরা দেখতে পাই-পাঁঠা, মহিষ, কুমড়ো, মাছ ইত্যাদি নানা জিনিস বলি দেওয়া হয়, সেগুলো?”
প্রফেসর রাঘব উত্তর না দিয়ে একটা শ্লোক আওড়ালেন। ক্লাস গমগম করে উঠল রাঘবের কণ্ঠে :
“পক্ষিণঃ কচ্ছপা গ্রাহা মতস্যা নববিধা মৃগঃ।
মহিষোবোধিকা গাবশছাগোবভ্রশ্চ শূকরঃ।।
খড়গশ্চ কৃষ্ণসারশ্চ গোধিকা সরভো হরি।
শার্দুলশ্চ নরশ্চৈব স্বর্গাত্ররুধিরতথা৷
চণ্ডিকা ভৈরবাদীনাং বলয়ঃ পরিকীর্তিতঃ।
বলিভিঃ সাধ্যতে মুক্তির্বলিভিঃ সাধ্যতে দিবস।।
‘কালিকা পুরাণম’ নামক উপপুরাণ, যার রচনাকাল খ্রিস্টের জন্মের ৬০০-৩০০ বছর আগে, তাতে যাবৎ জীবহত্যার এই নির্দেশাবলী আছে। এই শ্লোকের অর্থ-পক্ষী, কচ্ছপ, কুম্ভীর, নয় প্রকার মৎস্য, মৃগ, মহিষ, গোধিকা, গো, ছাগ, নকুল, শূকর, গণ্ডার, কৃষ্ণসার, সরভ, সিংহ, ব্যাঘ্র, মনুষ্য স্বীয় শরীরের রক্ত এই সমুদয় বস্তু চণ্ডিকা-ভৈরবাদির বলি। এই বলির দ্বারা মুক্তিসাধন হয় এবং বলির দ্বারা স্বর্গসাধন হয়।”
একজন ছাত্র প্রশ্ন করলো, “কী লাভ হতো স্যার এসব নরবলি-টলি দিয়ে? আদৌ কিছু হয়েছে তাদের এসব অপসংস্কৃতি করে?”
এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন রাঘব ।
“আমি হাসার মতো কিছু বললাম স্যার?”
“না শাক্য, তুমি আমাকে আবার সিলেবাসে ফেরালে। ঐযে বলেছিলাম শুরুতেই, ভয় এবং লোভ। তুমি প্রশ্নটা করে আমাকে লোভ অংশটায় ঢুকিয়ে দিলে। কালিকা পুরাণের আরেকটি শ্লোক বলতে হচ্ছে এর উত্তর দিতে গিয়ে :
‘নরেন বলি না দেবী তৃপ্তিং সহস্র বৎসরাণি।
বিধিদত্তেন চাপ্নোতি ত্ৰিইপ্তিং লক্ষং ত্রিভির্নরেঃ।।’
অর্থাৎ যথাবিধি একটি নরবলিদানে দেবী এক হাজার বছর এবং তিনটি নরবলিদানে দেবী এক লক্ষ বছর তৃপ্ত থাকেন। সুতরাং দেবীকে তৃপ্ত করার লোভ সে যুগের মানুষ ছাড়তে পারেননি। তাছাড়া মানুষ আরও অনেক লোভেই নরবলির আশ্রয় নিয়েছে।”
“কীরকম স্যার?”
“বলছি সিদ্ধার্থ। ধরো, তুমি একটা গ্রামে থাকো। ততদিনে মানুষ চাষবাস শিখে গেছে। এবার জমিতে বীজ বপনের মরসুম। এবার তুমি দেখলে জমি যেরকম উর্বরাশক্তি সম্পন্ন, তেমনি একজন নারীও উর্বরাশক্তি সম্পন্ন। এবার তুমি এবং গ্রামের সবাই ভাবলে, যদি ধরিত্রীর উদ্দেশ্যে একটি নারী বলি হয় তবে ফসল ভালো হবে। ইনফ্যাক্ট এত দূরে গিয়ে ভাবতে হবে কেন? আজকালকার দিনেও এরকম ঘটনা ভারতের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে ঘটেই থাকে।”
“আজকের দিনে? কী বলছেন স্যার?”
“পল্লবী, তুমি খবরের কাগজ পড়া শুরু করো। খবরগুলো পেয়ে যাবে। দুটো ঘটনা বলছি। উহু, ঘটনা নয়, দুটো উৎসব। পুরোনো উৎসব, এখনও মাঝে মাঝে খবর আসে। প্রথমটি ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় কন্ধ উপজাতিদের। উৎসবের নাম ‘মেরিয়া পূজা’। তিন দিনের অনুষ্ঠান। ‘মেরিয়া’ শব্দের অর্থ দেবতার উদ্দেশ্যে বলি বা উৎসর্গ। বর্তমানে খুব গোপনে হয়, কিন্তু উনবিংশ শতকে বেশ ধূমধাম করেই পালন করা হতো এই উৎসব। আবাদ জমির ফলন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই উৎসব বা বলি প্রথা। কন্ধরা নিজের জাতের ছেলে-মেয়ে বলি দেয় না, দূরের গ্রামের অকন্ধ জাতের মানুষ কিনে বা চুরি করে আনে এরা। উৎসবের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় নাচ-গান, অবাধ যৌনতা এবং আকণ্ঠ মদ্যপান। দ্বিতীয় দিন গ্রামের মোড়ল নরবলির জন্য নির্দিষ্ট পুরুষ-মহিলাকে পূজাস্থানে নিয়ে আসে এবং নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে দেয়। তাকে একটি শক্ত খোঁটার সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয় এবং পুরোহিত তেল-হলুদ মাখিয়ে দেয় তার শরীরে। বুনো ফুলের মালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় তাকে। এই অবস্থায় তাকে দিনভর নাচন-কোদন দেখে যেতে হয়। ভাবতে পারছো?”
“ভয়াবহ!”
“হ্যাঁ, এই ভয়াবহ দিন পেরিয়ে তৃতীয় দিন তাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়, তরল খাবার। আর খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র পুরোহিত এবং দুই সহকারী মিলে তার হাত-পা দুমড়ে ভেঙে দেয়।”
“স্যার, প্লিজ! বন্ধ করুন।”
“নরবলির ক্লাস অ্যাটেন্ড করছো রুচি, নার্ভ শক্ত করো। ডাক্তার হতে গেলে চিকিৎসা শাস্ত্র শেখার জন্য মড়া কাটতে হয়। আর এই ক্লাসে মৃত্যুর ইতিহাস জানতে হয়। রিসার্চ করতে গেলে হয়তো নরকঙ্কাল আবিষ্কার করবে। নার্ভ শক্ত করে রাখো তোমরা। তোমাদের পক্ষেই মঙ্গল। তা কোথায় ছিলাম?”
“হাত-পা দুমড়ে ভেঙে ফেলে লোকটার।”
“গুড, রুচি। হ্যাঁ, ভেঙে ফেলে। কিন্তু ভাঙার সময় সতর্ক থাকে যেন রক্তপাত না হয়। যে কোনো বলির আগে শরীর থেকে রক্তপাত হওয়া নিষেধ। এটা খেয়াল রাখবে তোমরা। হুম, তো হাত-পা ভাঙার পর একটা মোটা গাছের ডালকে দু’ভাগে চিরে, চেরা জায়গায় নির্দিষ্ট ব্যক্তির গলাটা ঢুকিয়ে দেয় এবং ডালের দু’প্রান্ত এতটা শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয় যাতে তার আর নড়বার শক্তি না থাকে। হাত-পা ভাঙা এবং চেরা গাছের মধ্যে গলা ঢোকানোর সময় আর্তনাদের শব্দ ঢাক-ঢোলের শব্দে চাপা পড়ে যায়। তারপর পুরোহিত মন্ত্র পড়ে এবং মন্ত্র শেষে ধারালো দায়ের কোপ বসায় ব্যক্তির শরীরে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলে সেই রক্ত দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়। তারপর সমবেত গ্রামের জনতা ছুরি, দা, কাটারি যা পারে তা নিয়ে হামলে পড়ে সেই ব্যক্তির উপর । জীবন্ত দেহ থেকে মাংস কেটে নেয় তারা। সেই পবিত্র মাংস তারা বাড়ি এনে যার যার জমিতে পুঁতে ফেলে । ভালো ফসলের লোভে মন্দির প্রাঙ্গণে বলি হয়ে চেরা ডালের মধ্যে ঝুলতে থাকে একটি নরকঙ্কাল।”
“আর দ্বিতীয় ঘটনা?”
“আমাকে একটু জলও খেতে দেবে না সায়ন্তনী?”
“সরি, স্যার।”
রাঘব বোতল থেকে জল পান করে একটু রেস্ট নিলেন। ওই সময়ে মোবাইলে আসা একটি হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সট দেখে তার ভালো লাগলো। তনুশ টেক্সটে জানিয়েছে, সে আজ বিকেলের মধ্যে আসছে কলকাতা। আরও লিখেছে, “যে বইটির খোঁজে গিয়েছিলাম, সেটি পেয়ে গেছি স্যার। আমার মনে হয় আমাদের কৌতূহল এবার পূর্ণতা পাবে।”
সঙ্গে এয়ার টিকেটের ইনভয়েস পাঠিয়েছে সে। রাঘব মোবাইল রেখে আবার ক্লাসে মন দিলেন।
“ঘুমুসর বলে একটা গ্রাম আছে। সেখানেও এইরকম পৈশাচিক নরবলির ঘটনা আছে। সেখানেও ফসলের লোভেই বলি দেওয়া হয় তবে সেটা গঞ্জাম জেলার থেকে কিছুটা আলাদা। এখানে হত্যাটা কুপিয়ে হচ্ছে না। এখানে একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের গর্ত খোঁড়া হয় এবং গর্তের পাশে একটি শূকর বলি দেওয়া হয়। সেই শূকরের রক্তে গর্তটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। এরপর গ্রামের কয়েকজন শক্ত-সমর্থ জোয়ান মিলে নরবলির জন্য নির্দিষ্ট মানুষটিকে টেনে-হিঁচড়ে সেই রক্ত ভর্তি গর্তের সামনে নিয়ে আসে এবং তার মুখটা জোর করে শূকরের রক্তভর্তি গর্তে চেপে ধরে। লোকটা ছটফট করতে থাকে। মুহূর্তে সেই শূকরের রক্ত শ্বাসনালী দ্বারা ফুসফুসে চলে যায় এবং শ্বাস বন্ধ হয়ে লোকটা মারা যায়। তারপর সেই মৃতদেহ থেকে মাংস কাটা হয় ধারালো ছুরি দিয়ে। উপস্থিত ভক্তরা সেই মাংস সংগ্রহ করে এবং বাড়ি ফিরে যায়। তারপর আর একটাই কাজ বাকি থাকে। সেই মাংসপিণ্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয় আবাদি জমিতে কিংবা এক কোণে পুঁতে রাখা হয়। আমাদের খুব লোভ, বুঝলে হে ছাত্রছাত্রীবৃন্দ!”
কিছুক্ষণ ক্লাসে কেউ কথা বলে না। নিস্তব্ধতা নেমে আসে যেন। মৃত্যুশোকের মতো। নরবলির ইতিহাস ক্লাস শুনলেই যে আর পাঁচটা ইতিহাসের ক্লাসের মতো সাল-সংখ্যা আর ঘটনার কচকচানি মনে হয়েছিল এই দু’দিনেই সে ভুল ভেঙে গেছে সবার। প্রফেসর রাঘব যেন বর্ণনা এবং কন্ঠের অপূর্ব মিশ্রণে সবাইকে নিয়ে পাড়ি দিচ্ছিলেন সেই সমস্ত জায়গায় যেখান থেকে সবাই মিলে চাক্ষুষ করতে পারছিল ইতিহাসে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক নরবলির ঘটনাগুলো।
“ক্রব্যাদশুকরোশট্রনাং কুকুটানাঞ্চ ভক্ষণে।
নরকাক খরানাঞ্চ তপ্ত কৃচ্ছং বিশোধনং।।”
প্রফেসরের কণ্ঠে আবার গমগম করে উঠলো ক্লাসরুম, যেন জীবনীশক্তির সঞ্চার হল মৃতবৎ ক্লাসরুমে।
“মনুসংহিতা, অধ্যায় ১১, শ্লোক ১৫৭। সেখানে এরকম একটা কথা বলা হয়েছে যে আমাদের নিজের নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমাদের পূর্বপুরুষরা কী কী পাপ করেছেন আর সেই পাপের অংশ আমাদের মধ্যে কতোটা বর্তমান।”
কয়েকজন সমস্বরে প্রশ্ন করলো, “কী বলা হয়েছে স্যার এই শ্লোকে?”
“এই শ্লোকে বলা হচ্ছে, মাংস ভক্ষণশালী পশু-পক্ষী, গ্রাম্য শূকর, উষ্ট্র, গ্রাম্য কুক্কুট, মনুষ্য, কাক ও গর্দভের মাংসজ ভক্ষণে তৃপ্তকৃচ্ছ ব্রত করবে। অর্থাৎ, মনুষ্য মাংস ভক্ষণের কথা সরাসরি মনুসংহিতায় আছে। জীবন্ত মনুষ্য মাংস নিশ্চয়ই খাওয়া যায় না। সুতরাং ধরে নিতে হবে, বলিপ্রদত্ত মনুষ্যকে বলির পর রান্না করে খাওয়া হতো। স্বয়ং মনু এ কথা লিখে গেছেন, মানে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিশ্চয়ই হয়েছে। এ পাপ কি ধম্মে সইবে হে! তবে এ শ্লোক একটা জিনিস স্পষ্ট করে যে বৈদিক যুগে মানুষ নরমাংসে অভ্যস্ত ছিল এবং তাতে দোষের কিছু ছিল না।”
“কেন?”
“কারণ হিমাদ্রি, এই মনুই ৫ নং অধ্যায়ের ৫৬ নং শ্লোকে বলছেন-
‘ন মাংস ভক্ষণে দোষো, ন মদ্যে, ন চ মৈথুনে।’
মদ-মাংস ভক্ষণে এবং মৈথুনাদিতে কোনোরূপ দোষ নেই।”
“স্যার আজ আর নেওয়া যাচ্ছে না।”
“ঠিক, আজকের জন্য অনেক হলো হিমাদ্রি। আমিও আজ আর দিতে পারছি না। তবে শেষ করার আগে এক-দুটো তথ্য তোমাদের জানানো প্রয়োজন। ভারতবর্ষে ধর্মের নামে যেসব নরবলি হতো তার প্রথম উল্লেখ আমরা পাই বাজস্নেয়ি সংহিতায়। অর্থাৎ, ঋক পরবর্তী যজুর্বেদ গ্রন্থে। যজুর্বেদের ১-১-২ অংশে স্পষ্ট নরবলির উল্লেখ আছে। এছাড়া প্রচ্ছন্ন উল্লেখ আছে ২৩/১৮-২০ অংশে। এগুলোর নোট আমি তোমাদের দিয়ে দেব। শুধু খেয়াল রেখো, এই বইয়ের রচনাকাল খ্রিঃ পূঃ ৪০০০ থেকে ১০০০-এর মধ্যে। অর্থাৎ পাপকার্যটি আমাদের পূর্বসুরিরা অনেককাল ধরেই করে আসছে, ঠিক আমার মতো।”
“মানে?” সবাই স্যারের আকস্মিক এই শেষ কথাটায় আঁতকে উঠলো।
“ভয় পেয়ো না। গত পনেরো বছরে ধরেই আমি ক্লাস নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হবার পরেও ছাত্রদের আটকে রাখি। চেয়ে দেখো, ক্লাস শেষ হয়েছে প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে।”
“সময় কোথায় দিয়ে কেটেছে আমরা কিন্তু ধরতেই পারিনি স্যার।”
“সে তো আনন্দের কথা, রুচি! আচ্ছা, কেউ একজন আমার রুম থেকে গিয়ে নোটস কালেক্ট করে সবাইকে দিয়ে দিও। আর অ্যাটেন্ডেন্সটাও পাঠিয়ে দিও। হ্যাভ আ গুড ডে, মাই স্টুডেন্টস।” বলে রাঘব বেরিয়ে গেলেন।।
কলেজ থেকে ফেরার সময় জোর বৃষ্টি নামলো। সঙ্গে কড়কড় বজ্রপাত। এ বৃষ্টি থামার নয়, বুঝেই আর দেরি করলেন না রাঘব। ছাতা মাথায় ব্রিফকেসে হাতে কোনোক্রমে গাড়িতে এসে উঠলেন। তাড়া কিছু ছিল না, তবু কলেজে বসে থাকতে মন চাইছে না আর রাস্তায় একবার জল দাঁড়িয়ে গেলে কী হয় কলকাতাবাসী মাত্রই জানে। তাই বৃষ্টির মধ্যেই গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরালেন তিনি।
পথে দুর্যোগ বাড়লো। যেন প্রলয় নাচন শুরু হয়েছে চারদিকে। ঘন ঘন বজ্রের দাপট, রাস্তার ধারের সারিবদ্ধ ঝাউ গাছের বাধ্য মাথাগুলো আজ চরম অবাধ্য। যেন কেউ চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে ওদের। ঠিক এমনি সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড ঝাউ গাছ মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়লো প্রফেসর রাঘবের গাড়ির উপর। তিনিও টাল রাখতে না পেরে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলেন। উল্টো দিক থেকে প্রায় সমগতিতে আসা একটি গাড়িও একই অবস্থায় পড়লো এবং দুটো গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। তীব্র শব্দে গাড়ির কাচ ভেঙে পড়লো। দুটো গাড়ির ড্রাইভার স্টিয়ারিংয়ে। মাথা ঠুকে আঘাত পেলেন ঠিকই কিন্তু তা ততটা মর্মান্তিক হল না সিটবেল্টের কারণে। অন্য গাড়ির পেছনের সিটে একজন বসে ছিলেন। তিনি সোজা কাচ ভেঙে ছিটকে বাইরে পড়লেন। অন্যদিন এই ঘটনায় লোক জমে যেতো মুহূর্তে। আজ এতটাই ঝড়ের গতি যে, এগিয়ে আসার মতো কেউ ছিল না। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটলো। তারপর প্রফেসর রাঘব কোনোক্রমে মাথা তুললেন। রক্ত বেরুচ্ছে, কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন আঘাত ভয়াবহ হয়নি। মাঝখানে একটা গাছ পড়ে আছে। সামনেই আরেকটা ভাঙা গাড়ি। সিটবেল্ট খুলে কোনোক্রমে বেরুলেন গাড়ি থেকে। রাস্তায় কেউ নেই। সামনের গাড়ির কাছে গিয়ে দেখলেন, ড্রাইভার যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে, কেটে গেছে বেশ কিছু জায়গায়। তাকে ধরতে যাবেন রাঘব, এমন সময় একটা আওয়াজ কানে এলো, “স্যা-র, স্যা-র?”
এ ডাক তার চেনা ঠেকলো। ঝড়ের মধ্যেই তিনি এগিয়ে গেলেন। ঝড়ের দাপট সত্ত্বেও রাস্তা রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে লুটিয়ে আছে তনুশ। দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে যেন ছটফট করছে। কোনোক্রমে তনুশ গাড়ির পেছনের সিটে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করলো এবং তারপরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। রাঘবের অন্তত তাই মনে হলো । তার মাথা কাজ করছে না। তবু তিনি বুঝতে পারছেন, তার চোখে জল আসছে। বোধহয় এবার জ্ঞান হারাবেন। কোনোক্রমে নিজের শরীরটাকে টেনে তুললেন রাঘব । তনুশের গাড়ির পেছনের সিটের দরজা খুললেন এক টানে। সেখানে একটা ব্যাগ ছিল। সে ব্যাগে সন্তর্পণে খুলে ফেললেন। অনেক কিছু হাতড়ে অন্য জিনিসের সঙ্গে প্লাস্টিকে মোড়া একটা বই পেলেন। এটার ইঙ্গিতই যে তনুশ করেছিল, তা বুঝতে ইতিহাসের শিক্ষকের দেরি হলো না। বুকে আগলে সে বই নিজের গাড়িতে এনে ব্রিফকেসে রাখলেন এবং সেখানেই সংজ্ঞা হারালেন।
কিছু সময়ের মধ্যেই বৃষ্টি ধরে এলো এবং দুটো গাড়িকে কেন্দ্র করে লোক জমা হতে শুরু করলো।
