চন্দ্রহাস – ১.১১

অধ্যায় ১১

কোনো রাজবাড়ির অন্দরমহলে কোনোদিন থাকার সুযোগ হয়নি রিশানের। রাঘব এক-আধ বার জয়পুর এবং আসামে রাজবাড়ির গেস্ট হাউসে থেকেছেন বটে কিন্তু এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। দিন কয়েক হলো রাঘবরা এখন মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ নির্মিত প্রাসাদে থাকতে শুরু করেছেন। আগে একটা কথা বলা হয়নি। এই প্রাসাদের নামকরণ কিন্তু চন্দ্রহাসের নামেই করা হয়েছে। তবে সেটা লেখা আছে ভেতর বাড়ির গায়ে। সিংহদুয়ারে লেখা নেই, যে কারণে ভেতরে ঢোকার সময় তাদের চোখে পড়েনি। আর ভেতরে ঢুকে আদিত্যদের চিৎকারের শব্দে এসব পর্যবেক্ষণ মাথায় উঠেছিল। তবে বাইরের ফলকে যতই মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ এস্টেট লেখা থাকুক না কেন, এখানকার লোকে প্রাসাদকে ‘চন্দ্রহাস মহল’ নামেই ডাকে।

প্রশ্নটা রিশান তুলেছিল একবার। প্রতাপ নারায়ণ তো অনেক আগে থেকেই জমিদার ছিলেন। তার এই প্রাসাদের নামকরণ তো তার হাতে চন্দ্রহাস আসার অনেক আগে হবার কথা।

রাঘব বলেছিলেন, “তা বটে। মনে হচ্ছে ভৈঁরো দেও চন্দ্রহাস দান করার পরই রাজবাড়ির নতুন নামাঙ্কন করেছিলেন প্রতাপ নারায়ণ। এজন্যই হয়তো তা ভেতর বাড়িতে খোদাই করা আছে, তার আগে হয়তো অন্য কিছু ছিল।

বেশিরভাগ ঘরই এখন তালাবন্ধ। একেকটা ঘরের উচ্চতা প্রায় ফুট পঁচিশেক, আগেকার দিনে যেরকম হতো আর কি! যেগুলো খোলা আছে, সেগুলো আদিত্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখাচ্ছেন রাঘবদের। সব ঘরেই চৌধুরী পরিবারের শিকারের চিহ্ন বর্তমান। ইয়া বড় বড় তৈলচিত্র জানান দিচ্ছে পরিবারের ইতিহাস। চৌধুরী পরিবার অবশ্য এক্ষেত্রে অন্যান্য রাজা জমিদারদের থেকে আলাদা। সব রাজারাই সাধারণত নিজের শ্রেষ্ঠ কীর্তির ইতিহাস রেখে যেতে পছন্দ করেন। তবে চৌধুরী পরিবার ভালোর পাশাপাশি পরিবারের কলঙ্ক দেখাতেও কসুর রাখেনি। এরকম বেশ কিছু তৈলচিত্র রাঘবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।

একটা চিত্রে চিত্রিত আছে মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের নারী আসক্তির দৃশ্য। তিনি একটি আসনে শুয়ে আছেন। উর্ধাঙ্গ নিরাবরণ, কটিদেশে এক হাত এলোমেলো কাপড়, তার পাদদেশে এবং মাথার কাছে বসে আছেন দুই নারী। পাদদেশের সম্পূর্ণ নিরাবরণ সেই নারী মূর্তি তার সুডৌল বাহুদ্বয় দ্বারা রাজার জঙ্ঘাদেশে হাত রেখেছে। মাথার কাছে যিনি আছেন তিনিও অনুরূপ বসনা, তার হাত রাজার বুকে। স্তন বৃন্ত ইচ্ছে করেই শক্ত আঁটোসাঁটো, যেন রাজার দেহসৌষ্ঠবে এরা কামুক, সেটা বোঝাতেই এই দৃশ্যের অবতারণা। নিতম্ব ও যোনির সংযোগস্থলের কাছে হালকা লাল স্রোত। নারীর কৌমার্য হরণের প্রমাণ এই রক্তস্রোত। আসনের পেছনেও এক উন্মুক্ত নারী সুরাপাত্র এবং আঙুর জাতীয় কোনো ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা প্রতাপ নারায়ণ শায়িত হয়ে মুখে স্মিত হাস্য নিয়ে হাতের কাছে একটি চিতা বাঘকে আদর করছেন। চিতার চোখের কালো দৃষ্টিতে যেন মুত্যু লুকিয়ে আছে।

হঠাৎ এই দৃশ্য দেখলে বুকের রক্ত একটু ছলকে ওঠে। রাঘব এই দৃশ্যের পটভূমি জানতেন বহু বছর ধরে, তবু তার গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠলো। এত শান্ত, গভীর চোখের অধিকারী একজন মানুষ এতটা পৈশাচিক কী করে হতে পারে, রাঘব ভাবতে লাগলেন।

এরকম আরেকটা ছবিতে প্রতাপ নারায়ণ রাজবেশে এক সিংহাসনের উপর বসে আছেন। হাতে চকচক করছে রাজ-তলোয়ার। পাশে বসে একটা সিংহ, জীবন্ত সিংহ। প্রতাপ নারায়ণ এবং সিংহের চোখের দৃষ্টিতে কোনো ফারাক নেই, দুটোই রক্তপিপাসু। সিংহটিকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন রাঘব। কেশর, হলুদাভ লাল চোখ, চোয়াল শক্ত করে রাখা কাঠিন্য সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে কেন সে জঙ্গলের রাজা। কেন উচ্চতায় লম্বা জিরাফ বা সবচেয়ে ওজনদার হাতি বা ক্ষিপ্র চিতা নয়, তিনিই জঙ্গলের সর্বময় কর্তা; কারণ তার চোখে আভিজাত্য আছে, অহং আছে, গর্ব আছে।

আদিত্য হাসতে হাসতে বললেন, “দুই নৃশংস রাজা এক ছবিতে।”

তার কথায় রাঘবের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়। তিনি বলেন, “এই সিংহটা কি প্রতাপ নারায়ণের পোষা ছিল?”

আদিত্য অনেক ভেবে বলেন, “প্রতাপ নারায়ণের অনেক পশু-পাখি পোষার শখ ছিল। চিতা যে ছিল, সে তো আপনি নিজেই বলেছিলেন। সিংহ থাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তবে আদৌ ছিল কি না জানি না আমরা কেউই। আর জানলেও ভৈরবের অভিশাপে…” কথা শেষ না করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আদিত্য।

রাঘব আবার জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা সেদিন আপনি বলেছিলেন না শুধুমাত্র কয়েক জনের মনে আছে আপনাদের পরিবারের ইতিহাস?”

আদিত্যকে এবার একটু সংকুচিত দেখালো।

দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললেন, “হুম, বলে তো ছিলাম। তবে সব গল্পই বংশ পরম্পরায় একজন থেকে অন্য জন জেনেছে কিংবা বলতে পারেন একজন ভুলে যাবার ভয়ে অন্যকে জানিয়ে গেছে। কিন্তু ঐযে বললাম, ভৈরবের অভিশাপে সেই গল্প কেউ মনে রাখতে পারে না।”

“সে ঠিক আছে। এরকম কেউ বেঁচে আছেন কি?”

আমতা আমতা করে মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন আদিত্য, “আছেন। একজন নয়, দুজন।”

রাঘব যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “বলছেন কী? দুজন বেঁচে আর সে কথা আপনি বলতে চাইছিলেন না!”

আদিত্যের যেন একটু লজ্জা বোধ হলো। বললেন, “ইচ্ছে করে কি বলতে চাইনি? ঘটনা হলো যে দুজন জানেন বা জানার সম্ভাবনা আছে তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে বহু বছর। স্বেচ্ছা নির্বাসনে গেছেন দুজন। একদিনে যাননি অবশ্য, কিছু সময়ের ব্যবধান ছিল যাবার মধ্যে।”

রাঘবের এত দিনের পরিশ্রম যেন এবার সফল হবে। একটা রাস্তা যেন খুলছে ধীরে ধীরে।

“নির্বাসন? কীরকম নির্বাসন? আচ্ছা, কোথায় আছেন তারা, এখন এটা অন্তত বলুন।”

“নির্বাসন কেন, তা আমরা কেউ জানি না। আর কোথায়?” এবার অল্প হেসে বললেন আদিত্য, “এই রাজবাড়িতেই আছেন তারা, যক্ষের মতো পাহারা দিয়ে চলেছেন পরিবারের ভিটে এবং ইতিহাস।”

রাঘব এবার বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “দেখুন আদিত্যবাবু, এভাবে হেঁয়ালি করলে কথা বলা মুশকিল। আমাদের না বললে আমরা কীভাবে কী করবো বলুন তো।”

রিশানও যোগ করলো, “আদিত্যদা, আপনি কাদের কথা বলছেন? তারা কারা?”

আর উপায়ান্তর না দেখে আদিত্য প্রায় বাধ্য হয়েই আরও কিছুটা খুলে বললেন, “আপনি মহাষ্টমীর রাতের যে গল্পটি আমাদের শুনিয়েছিলেন তাতে ব্রজ নারায়ণ বেঁচে গেছিলেন। পরের বছর নিয়মানুযায়ী নরবলির কথা ছিল। ব্রজ নারায়ণের মধ্যে আমাদের পূর্বজদের মতো তেজ ছিল না। আর পাঁচ জনের মতো শান্তশিষ্ট, গোবেচারা লোক ছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবার রক্ষা করতে নরবলির প্রয়োজন। গত বছর দাদা হর নারায়ণের মৃত্যু নিজের চোখে দেখেছিলেন তিনি। রাজমাতার মৃত্যুও সেদিনই হয়েছিল বলে শুনেছি আমরা। পরিবারের সবাই যখন বারংবার বলির জন্য চাপ দিতে লাগলো, তখন তিনি কিছুদিনের জন্য নিরুদেশ হয়ে গেছিলেন। কিন্তু ঠিক পূজোর সময় বাড়িতে উপস্থিত হলেন তিনি।”

“কোথায় ছিলেন এত দিন?”

“জানা নেই। বাড়ির লোক ভেবেছিল বলির কোনো ব্যবস্থা করতে গেছেন। কিন্তু ফিরলেন একদম রিক্ত হাতে, সঙ্গে কেউ নেই। সন্ধি পূজার সময় বাড়িতে নাকি প্রলয় এসেছিল, এই যে ফাটলগুলো দেখছেন সেগুলো নাকি সেদিনেরই।”

রাঘবরা সত্যি দেখলো ঘরের কোণে বড় বড় ফাটল। ভূমিকম্প তীব্র মাত্রায় না এলে এরকম ফাটল সম্ভব না।

“তারপর?”

“ব্রজ নারায়ণ কিছু সময়ের জন্য দিক্‌বিদিকশূন্য হয়ে পড়েছিলেন। শেষে হর নারায়ণের কন্যাকে সামনে পেয়ে চুলির মুঠি ধরে যূপকাষ্ঠে এনে ফেললেন। অনেকে আটকাতে এসেছিল, কিন্তু ব্রজ নারায়ণকে আটকানো যায়নি। কোনো এক পৈশাচিক শক্তি ভর করেছিল তখন ব্রজ নারায়ণের ওপর। সামনে থেকে একটা কলসি তুলে নিজেই শুদ্ধ উচ্চারণে স্নান মন্ত্র পড়লেন। অথচ তিনি পূজার্চনা বিধি জানতেন না।”

“তারপর?”

উত্তেজনায় কাঁপছেন অভিজ্ঞ ইতিহাসবিদ রাঘব। রোজ না জানি কত বলির ইতিহাস পড়তে হয়, পড়াতে হয়। কিন্তু এরকম বর্ণনা তিনি কোনোদিন শোনেননি।

“তারপর আর কী? সেই প্রথম কুমারী বলি হয় আমাদের পরিবারে। শোনা যায়, শুধু দেবী মা নয়, প্রত্যেকের গায়ে সেদিন হর নারায়ণের মেয়ের রক্তের ছিটে পড়েছিল। সবার শরীরের যে জায়গায় পড়েছিল, সেসব জায়গায় ঘা হয়ে গেছিল। এমনকী দেবী মায়ের গায়ে যেখানে পড়েছিল সেখানেও নাকি ঈষৎ পুড়ে যায়। অ্যাসিড পড়লে যেরকম হয় সেরকম। ব্রজ নারায়ণের পুরো দেহে পড়েছিল।”

“ইশ!”

ঘটনার ভয়াবহতায় মুখে যন্ত্রণা ফুটে ওঠে রিশানের। রাঘব এখনও বজ্রাহত।

“সেদিনের পর আমরা দেবী মূর্তি বাড়ির বাইরে সরিয়ে রাখি। ত্রিপুরায় আমাদেরই জ্ঞাতির বাড়িতে মা থাকেন। পূজার সময় মহালয়ার একদিন আগে মা এ বাড়িতে আসেন এবং দশমীর পর দিন আবার ত্রিপুরায় পথে যাত্রা করেন।”

রিশানের চোখ চকচক করে ওঠে। সে জিজ্ঞেস করে, “ত্রিপুরায় কোথায়? কোন বাড়ি?”

আদিত্য হাত জোড় করে বলেন, “এবার আমাকে ক্ষমা করো। এটা বলা বারণ।”

রাঘব এবার একটা অন্য প্রশ্ন করলেন, “প্রলয় থেমেছিল বলির পর?”

“সঙ্গে সঙ্গে। এই ঘটনার কিছুদিন পর হর নারায়ণের পত্নীর কন্যাশোকে মৃত্যু হয়।”

“আপনার বাবা কি তাহলে…”

“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। ব্রজ নারায়ণের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ছোট ভাই কিশোর নারায়ণ গত বছর পূজার সময় মারা যান।”

“গত বছর?”

“হ্যাঁ, হিসেব মতে গত বছর টাটকা অস্থি-মাংস নিবেদনের কথা ছিল। দেওয়া হয়নি।”

“তার মানে…”

রিশানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। রাঘব ঘুরে তাকালেন আদিত্যের দিকে। চোখের চশমা খুলে আস্তিনে মুছতে মুছতে আদিত্য বললেন, “হিসেব মতো এ বছর নরবলি হবার কথা।”

শিরদাঁড়া বেয়ে যেন সর্পসম কিছু নেমে গেল দুজনেরই। মুখে ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই। আদিত্যের দিকেই চেয়ে রইলেন তারা। এ যেন সত্যি বিনা মেঘে বজ্রপাত। এ বছর নবমীতেই নরবলির কালতিথি। চোখ বন্ধ করলেন রাঘব। যেন এই অসম যুদ্ধে আরও কোণঠাসা হলেন।

“এ জন্যই এ বছর আমরা বাড়িটা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলাম। সেই মতো সব কথাবার্তাও এগিয়েছে। সেই বিষয় নিয়েই তো সেদিন আমরা কথা বলছিলাম। আচমকাই ঘরটা দুলে উঠলো। আমরা স্পষ্ট অনুভব করেছিলাম যে, বাড়ির অন্দরমহলে কিছু একটা প্রবেশ করেছে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। একটা জান্তব গন্ধ ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছিলো। আর কিছু বোঝার আগেই কেউ ঝালরটাকে ছুড়ে দিয়েছিল আমাদের দিকে। বেঁচে যে আছি সেটাই অবিশ্বাস্য লাগছে। কোনো অশুভ শক্তি চাইছে না এই বাড়ি বিক্রি হোক।”

আদিত্য আর ভাবতে পারছেন না। কপালের শিরা ফুলে উঠেছে।

“ব্রজ নারায়ণ তারপর কী করলেন?” রাঘব এখনও অনুসন্ধিৎসু।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আদিত্য, “কী আর করবেন। সেদিন যে অস্বাভাবিক হলেন, আর ফিরলেন না স্বাভাবিক জীবনে বন্ধ ঘরে একা একাই থাকতেন। তারপর যখন দেখলেন যে সৌদামিনীও একইরকম ভাবে…”

রিশান থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এক মিনিট। সৌদামিনী কে?”

“সৌদামিনী হলেন আমার বাবার পিসিমা।”

“মানে হর নারায়ণ এবং ব্রজ নারায়ণের বোন?”

“ঠিক। তিনিও নাকি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাকে রক্ত দিতে হবে। শোনা যায় কিছু বছর পরে তিনি সন্ধি পূজার রাতে প্রায় পাগলের বেশে পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন তিনি ষোড়শী, অসাধারণ সুন্দরী। ধীরে ধীরে বিবস্ত্র হয়েছিলেন তিনি মায়ের সামনে। তখনও তিনি কুমারী, ইয়ে মানে…”

আদিত্য আমতা আমতা করছিলেন এই জায়গাটায় এসে। রাঘব বললেন, “বুঝেছি, তখনও উনি ভার্জিন। রিশান প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে অনেকদিন, দেখতেই যা একটু ছোট লাগে। তারপর বলুন…”

“হ্যাঁ, সেটাই-ভার্জিন। সেই রাতে নিজের যোনিতে হাত ঢুকিয়ে সতীচ্ছদ বিদীর্ণ করে রক্ত নিবেদন করেছিলেন বলি হিসেবে। ভাবতে পারেন!”

রাঘবের আর শুনতে ভালো লাগছে না। একটা পরিবারের উপর এমন কী অভিশাপ থাকতে পারে যে সবাই বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে এভাবে নিজেদের জীবন। নষ্ট করতে পারে? তাও এত বীভৎসভাবে! মাথা ঝিমঝিম করছে রাঘবের।

পাপ, আসলে পাপ কাউকে নিস্তার দেয় না। বস্তারের মা দন্তেশ্বরী মন্দিরে সে রাতে ঐভাবে একেকটা নরহত্যায় যে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছিল, তার গরম হলকায় এই বংশটা এখনও পুড়ছে। রাঘব যেন সেই উত্তাপ অনুভব করতে পারছেন, অভিশাপের উত্তাপ।।

রিশান জিজ্ঞেস করে, “সৌদামিনীর কী হলো?”

আদিত্য ব্যাজার মুখে বললেন, “পরদিন তিনি স্বাভাবিক হয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা কানে যেতেই যেন রাগে, অভিমানে প্রায় দিশেহারা হয়ে পাগল হয়ে গেলেন। এই রূপ, এই যৌবন আর কোনো কাজে লাগাতে পারবেন না ধরে নিয়ে নিজেকে এই রাজবাড়ির এক অন্দরমহলের কোনায় বন্ধ করলেন। দেখাদেখি ব্রজ নারায়ণেরও হয়তো এরকম কিছুই অনুভূতি হয়েছিল। তিনিও নিজেকে একটা ঘরে বন্দি করলেন। দুজনের জন্যই খাবার যেত, এখনও যায়। শুধু যাবার আগে দুজনেই নির্দেশ দিয়েছিলেন কখনো যেন তাদের ঘরে কারও পা না পড়ে। কেউ যেন তাদের খোঁজ করতে না আসে।”

“তারপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি?”

“না রিশান, নেয়নি। এই পরিবার যতবার অভিশাপ অমান্য করেছে। ঠিক ততবার ধ্বংস হয়েছে। এই আদেশ অমান্য করার সাহস কারও হয়নি।

তাই আমি এই ঘটনা আপনাদের বলতে চাইনি।” চুপ করলেন আদিত্য।

“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আদিত্যবাবু। আমরা সে ঘর দেখার জন্য অনুরোধ করবো না। মহাকাল আমাদের তার নিজের ইচ্ছেতেই সব কিছুর সন্ধান দিচ্ছেন, পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করছেন। তিনিই রাস্তা দেখাবেন।”

“তাই হোক রাঘববাবু। আপনি সফল হলে আমরাও হয়তো অভিশাপ থেকে মুক্ত হবো।”

আদিত্য নারায়ণ রাঘবের হাত ধরে ফেললেন। রাঘবও সে হাত শক্ত করে ধরলেন।

“আপনি বাড়ি কবে বিক্রি করছেন?”

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই রাজবাড়িটা আংশিক কেঁপে উঠলো যেন। চমকে উঠলেন তিনজনই। না, এ প্রসঙ্গ এ বাড়িতে থেকে উচ্চারণ করা যাবে না। আদিত্যের ইশারায় উত্তর বুঝে নিলেন রাঘব। পূজোর পরে বিক্রি হবে চন্দ্রহাস মহল।

কিছু সময়ের মধ্যেই আদিত্য নারায়ণ চৌধুরী এবং রিশান বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। এতক্ষণ কথাবার্তা হচ্ছিলো রাজবাড়ির দোতলার পুব দিকের একটা ঘরে বসে। তারা বেরিয়ে যাবার পর আরেকটা তৈলচিত্রে চোখ পড়ে রাঘবের। আগের দুটো থেকে একেবারে আলাদা এই চিত্রের মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ । প্রথম চিত্রে তিনি কামার্ত পুরুষ, দ্বিতীয় চিত্রে তিনি ক্ষমতালোভী পশু । এই একটি মাত্র চিত্রে তিনি ধ্যানস্থ সন্নাসী।

আশ্চর্য হলেন রাঘব। মুণ্ডিত মাথা, ত্রিপুণ্ডরক আঁকা কপাল, গেরুয়া বসন পরিহিত লোকটাকে পরাক্রমশালী দুর্জয় রাজা প্রতাপ নারায়ণ বলে চেনাই যেতো না, যদি না নীচে তার পরিচয় লেখা থাকতো। এই চিত্রে এক আশ্চর্য স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে তার চোখে। যেন বৌদ্ধিক মননের অধিকারী চিত্রিত এই ব্যক্তি। সত্যি কি ইনি মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ নাকি কোনো ভুল হয়েছে নাম খোদাইয়ে?

ফেরার পথে আরো একটা জিনিস চোখে পড়লো তার এবং তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। চিত্রটিতে আবার ভালো ভাবে খুঁটিয়ে দেখলেন। খুব ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, চিত্রে মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ যে আসনে বসে আছেন, তার ঠিক ডান হাতের পেছনে অন্ধকার একটি ঘর। সেই ঘরের মেঝেতে দুটো উজ্জ্বল চোখের উপস্থিতি। ভালো করে দেখলেন রাঘব। হ্যাঁ, চোখই বটে। ভাটার মতো জ্বলছে চোখ দুটো। কী করে দেখলেন চিত্রকর, এই চোখের উপস্থিতি? তবে কি এত বছর আগে থেকেই মহাকাল ইতিহাস উদ্ধারের ঘুঁটি সাজিয়ে রেখেছেন তার জন্য? ট্যাক্সি ড্রাইভার, দন্তেশ্বরী মন্দিরের লোকটা, ঘটিগরমওয়ালার পর এই চিত্রকর। নাহ, আর ভেবে কী লাভ? ইতিহাসবিদ রাঘব পকেট থেকে একটা ছোট আতস কাচ বের করলেন। বহু দিন পর এ জিনিস কাজে এলো তার।

আতস কাচে ছবিটা বড় করতেই ভাটার মতো চোখে যেন মশাল জ্বেলে আগুন লেগে গেল। ভালো ভাবে খুঁটিয়ে দেখে রুমাল দিয়ে মুখের ঘামগুলো মুছলেন তিনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

এ চোখ মানুষের নয়, কোনো বিশালাকৃতি চারপেয়ের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *