চন্দ্রহাস – ১.১৫

অধ্যায় ১৫

ঠিক রাত বারোটায় আদিত্য নারায়ণ সুড়ঙ্গের মুখে রাঘব এবং রিশানকে নিয়ে হাজির হলেন। প্রত্যেকের হাতেই একটি করে বড় মাপের মশাল । তিন মশালের আলোতে যেন অকালে দীপাবলি হয়ে গেল চারদিকে। রাঘব এবং রিশান কোমরে তলোয়ার নিলেন, আদিত্য নিলেন অনুজ নারায়ণের লাইসেন্সড পিস্তল। এছাড়াও প্রত্যেকেই জুতোর সঙ্গে ছোট ভোজালি বেঁধে নিয়েছেন। ঠিক কীরকম বিপদ আসতে পারে, কোনো কিছুই জানা নেই। তাই সবরকমভাবেই প্রস্তুত হয়ে এসেছেন তারা।

লোহার গোল চাকতি সরাতেই সুড়ঙ্গ পথ দেখা গেল। প্রথমে রাঘব নামলেন, তারপর আদিত্য, শেষে রিশান। বাইরে যে মশাল দীপাবলির আলো ছড়িয়েছিল, ভেতরে ঢুকতেই সেগুলো টিমটিমে লণ্ঠনের মতো হয়ে গেল, সুড়ঙ্গের ভেতরটা ঠিক এতটাই অন্ধকার। তিন জনেই খুব সাবধানে এগোতে লাগলেন।

সুড়ঙ্গে নেমেই প্রথম যে জিনিস তারা দেখলেন, তা হলো একগাদা নরকরোটির ভিড়। বহু মানুষ এই সুড়ঙ্গে নেমেও আর বেরোতে পারেননি, সেই স্মৃতিই বহন করছে সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বার। তারা সন্তর্পণে এগোতে থাকলেন। সুড়ঙ্গের মাঝপথে একটা জলস্রোত এসে রাস্তা পিচ্ছিল করে রেখেছে, স্রোতের রঙ কালচে লাল। এ জিনিস রক্ত হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।

দু’দিকে সব মরচে ধরা রুদ্ধ কারাবাস। এককালে অপরাধীদের এবং যুদ্ধবন্দিদের এই সুড়ঙ্গে রাখা হতো। প্রত্যেক কারাবাসেই কম-বেশি নরকরোটি পড়ে আছে। এরা হয়তো যাবজ্জীবনের আদেশ পেয়েছিলেন, আর জগতের আলো দেখা হয়নি তাদের। যদিও এত বছরে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই আর, তবুও একটু-আধটু যে নিদর্শনই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, সুড়ঙ্গ জুড়ে সবই হাড়গোড়। ধুলোয় ঢেকে আছে কারাবাসের মেঝে থেকে লোহার গরাদ। দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলেন সবাই।

হঠাৎ রিশান হোঁচট খেলো, আদিত্যের তৎপরতায় সে মাটিতে পড়লো না। কিন্তু এই শব্দেই কীসের যেন ঘুম ভাঙলো। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস শুরু হলো সুড়ঙ্গ জুড়ে।

রাঘব ইশারায় থামতে বললেন। একটা জান্তব পায়ের শব্দ, কোনো বিশালাকার প্রাণী যেন উঠে দাঁড়াচ্ছে। চারদিকে জল থাকায় জলের মধ্যে সেই প্রাণীর চলার শব্দ সুড়ঙ্গের দেয়ালে স্পষ্ট অনুরণিত হয়ে রাঘবদের কানে পৌঁছাচ্ছে।

ইতিমধ্যে রাঘব যে কারাবাসের সামনে আছেন সেটার দিকে চোখ রেখে থমকে দাঁড়ালেন। ভেতরে একটা লোহার বাক্স দেখা যাচ্ছে। ধুলো এবং জং পড়ে জীর্ণ অবস্থা। কারাবাসের গরাদে তালা ঝুলছে। সঙ্গে ছোট কিন্তু ধারালো আয়রন কাটার আছে, রাঘব সেটা পকেট থেকে বার করলেন। তালার গায়ে সেটা চালানোর আগেই তিনজনে স্পষ্ট শুনলেন, সেই দীর্ঘকায় প্রাণীটা এই পথের উদ্দেশে চলতে শুরু করেছে যেন, অভিমুখ তাদের দিকেই। রাঘব কাটারের গতি বাড়ালেন, শব্দ বাড়লো। সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে সে শব্দের অনুরনন যেন ঝড় তুললো। তাতে সেই জান্তব পায়ের শব্দ চাপা পড়ে গেল। কিন্তু তাতে সমস্যা হলো, এবার তারা বুঝতে পারছিলেন না যে সেই প্রাণী ঠিক কত দূরে আছে। আদিত্য ইঙ্গিতে কাটার বন্ধ করতে বললেন রাঘবকে। রাঘব তৎক্ষণাৎ নিবৃত্ত হলেন।

পায়ের শব্দটা আবার শোনা যাচ্ছে, আগের চেয়ে অনেক বেশি কাছে সেই শব্দ।

“আর দেরি করা উচিত হবে না।”

আদিত্য বলতেই বাকিরাও সুড়ঙ্গদ্বারের অভিমুখে রওনা দিলো। রাঘবের ফেরার ইচ্ছে ছিল না। ওই বাক্সে কী আছে? আর কোনো কারাগারে তো কোনো কিছু নেই।

তবু পায়ের শব্দ এবং চাপা গর্জন এগিয়ে আসার কারণে তাকেও ফেরার পথ ধরতে হলো। যতটা দ্রুত সম্ভব, তিনজনেই রাস্তা ভাঙতে লাগলেন। এক সময় প্রায় ছুটতে লাগলেন তারা। কারণ পেছনে তাদের যম ছুটে আসছে এবার, ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ হচ্ছে শুধু।

সুড়ঙ্গমুখে এসে পৌঁছালেন সবাই। আদিত্য বললেন, “আপনারা উঠুন।”

রাঘব রাজি হলেন না, “আপনি উঠুন আগে।”

“আমি এই রাজবাড়ির বর্তমান রাজা, আমি আপনাকে আদেশ করছি। উপরে যাবার জন্য।”

গলার স্বরে আদিত্য নারায়ণের এরকম কিছু ছিল যে রাঘব সে আদেশ অমান্য করতে পারলেন না। রিশানকে তুলে দিলেন। নিজেও উঠে এলেন।

ততক্ষণে সেই প্রাণীটি প্রায় সুড়ঙ্গের মুখে পৌঁছে গেছে। শুধু একটা লাফের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন আদিত্য নারায়ণ । উপরে উঠতে গেলে মশাল ফেলে উঠতে হবে। মশালটি ফেলে দিলেন আদিত্য। জল লেগে নিভে গেল সেটা। গাঢ় অন্ধকারে পুনরায় ঢেকে গেল সুড়ঙ্গ। প্রাণীটা গর্জন করে উঠলো, আদিত্য নারায়ণ সেদিকে লক্ষ্য করে পকেট থেকে পিস্তল বের করে দু’বার গুলি ছুড়লেন। কিন্তু তাতে গর্জন বেড়ে গেল।

“আপনি আমার হাতে ধরুন, প্লিজ ধরুন।”

রাঘব মাটিতে শুয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আদিত্যের দিকে। আদিত্যও এবার উপায়ান্তর না দেখে কোনোক্রমে সেই হাত ধরলেন। রাঘব প্রাণপণে টানলেন তাকে।

প্রাণীটা শেষবারের মতো গর্জন করে লাফিয়ে পড়লো আদিত্য নারায়ণের উপর। চিৎকার করে উঠলেন আদিত্য। রাঘব তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে উপরে টানলেন। রিশান রাঘবের হাতে ধরে রাখল যেন শক্তির অভাব না হয়।

আদিত্য নারায়ণ উপরে উঠে এলেন। প্রাণীটির থাবায় আটকে গেল আদিত্যের কাঠের বাম পা। ততক্ষণে সবাই প্রাণীটির মাথা দেখে ফেলেছেন। ভয়াবহ চেহারার এক কালো সিংহ, যার মাথার আকার সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক সিংহের মাথার থেকে অন্তত তিনগুণ বড়। চোখগুলোতে ভাটার আগুন জ্বলছে সে প্রাণীর। যে থাবাটি চোখে দেখা গেল তার আকার বিশাল, মানুষের প্রাণহানির জন্য একটি থাবাই যথেষ্ট। কাঠের পা-টা কয়েক টুকরো হয়ে গেছে এক লহমায়। রিশান লোহার চাকতি আটকে তড়িৎ গতিতে সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ করলো।

সুড়ঙ্গ মুখের মেঝেতে শুয়ে সবাই বুক ভরে শ্বাস নিতে লাগলো।

আদিত্য নারায়ণকে ধরে ধরে তার ঘরে আনা হলো। বসিয়ে দেওয়া হলো তার বিছানায়। সোফাতে এলিয়ে পড়লেন রাঘব ও রিশান। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর আদিত্য বললেন, “আমাকে ওই আলমারির ভেতর থেকে আরেকটা পা দাও।”

রিশানকে বলতেই সে আলমারি খুলে একটা কাঠের পা বের করে দিলো। সেই পা লাগাতে লাগাতে আদিত্য বললেন, আগেরবার আসল পা-টা ছিড়ে নিয়ে নিয়েছিল। এবার নকলটাও নিলো।

রাঘব-রিশান দুজনেই বিস্মিত! রাঘব বললেন, “আপনি ওই প্রাণীর অস্তিত্ব আগে থেকেই জানতেন? অথচ আগে আমাদের কিছুই বলেননি।”

“এই পরিবারের নিয়মই হলো ছেলে-মেয়ে মোটামুটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে পরিবারের ইতিহাস জানিয়ে দেওয়া। আমাকেও জানানো হয়েছিল। আমি সত্যি ভুলে গেছি বেশিরভাগ ইতিহাস। ভৈরবের অভিশাপেই হোক কি অন্য কোনো কারণ, আমার মাথা সেগুলি ধরে রাখতে পারেনি। তাই আপনাদের বলার মতো কিছু ছিল না। আর ওই সিংহের কথা শুনে আমি ছোটবেলায় বিশ্বাস করিনি। তাই অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়েছিলাম দু’পা নিয়ে, ফিরেছিলাম এক পায়ে। আমি খুব ভালো নাচতাম রাঘবদা, সবাই বলত আমি নাকি নেচে বিশ্বজোড়া নাম করবো। ওই কালো কদর্য সিংহটার জন্য এই জীবনে আর সে স্বপ্ন পূরণ হবে না। যদি সুযোগ হয়, আপনি প্লিজ সিংহটাকে মারার সুযোগটুকু আমাকে দেবেন।”

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন আদিত্য। রাঘব বুঝতে পারলেন, ঠিক কোন আবেগে আজ তিনি আদিত্যের সম্বোধনে রাঘববাবু থেকে রাঘবদা হয়ে গেছেন। আদিত্যের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখলেন তিনি। তারপর বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

সোজা তেতলায় উঠে গেলেন রাঘব। চাকতি ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকলেন তিনি। আজ লাইটারের আলোর প্রয়োজন পড়লো না। নীল আলোর ক্ষীণ রশ্মি লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন এবং শেকল খুলে সজোরে ঢুকলেন ঘরে। বৃদ্ধ ব্ৰজ নারায়ণ আজকেও বসে আছেন এক কোণায়।

এরকম শব্দে হকচকিয়ে গেলেন তিনি।

“কে, কে-রে?” আজ গলায় ভয়।

“আমি রাঘব। কাল আপনি মনে করতে পারেননি, কিন্তু আজ আপনাকে মনে করতেই হবে। একটা কথা জানা খুব জরুরি। আপনার বংশকে বাঁচাতে হলে আপনার মনে করতেই হবে।” রাঘব সরাসরি কথা বললেন আজ।

“আমি আর কিছু জানি না। সত্যি জানি না। কী জানতে চাস তুই?” কাঁপা গলায় বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি ছবিতে দেখেছি মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ মুণ্ডিত মস্তক সন্ন্যাসীর বেশে ছিলেন। ভৈরবের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে উনি ঠিক কীরকম জীবন কাটিয়েছিলেন? মনে করুন, মনে করে বলুন।”

বৃদ্ধ মাথায় হাত দিলেন। প্রশ্নের চাপে যেন তার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। রাঘব বলতেই থাকে, “আমি আজ সুড়ঙ্গের কারাগারে একটা বাক্স দেখেছি। সেই বাক্সে কী আছে? কারাগারে তালাবন্দি করে রাখা হয়েছে কেন সেই বাক্স? আপনাকে মনে করতেই হবে। একমাত্র আপনিই সঠিক পথ দেখাতে পারেন আমাদের।”

বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ কর, চুপ কর হারামজাদা। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে, শিরা দপদপ করছে। তুই চুপ কর।”

রাঘব বৃদ্ধের পা ধরে ফেললেন, তার মনে হল বৃদ্ধের গায়ের চামড়া যেন স্বাভাবিক নয়। অনেকটা কাঁঠালের খোলের মতো উঁচু-নীচু। হর নারায়ণের কন্যার রক্তের কথা আবার মনে পড়ে তার। আজ গা গোলানো অনুভূতিটাই উবে গেছে, তিনি আজ মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের শেষ ইতিহাস জানতে মরিয়া।

বৃদ্ধও চেষ্টা করছেন মনে করার। মাথায় দু’হাত চেপে প্রায় চিৎকার করছেন, তবু শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন বংশরক্ষার তাগিদে। মাথায় হাত রেখেই তিনি বললেন, “মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ শেষ জীবনে সমস্ত ভোগ-বিলাস ত্যাগ করেন। কঠোর তপস্যা করেন। পালন করেন অনেক কঠিন ব্রত। ভৈরবের অভিশাপে কেউ কিছু মনে রাখতে পারবে না ভেবে তিনি নিজে সমস্ত ইতিহাস লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। যেদিন পুস্তক রচনা শেষ হয় সেদিন তিনি নিজে সেই পুস্তক সুড়ঙ্গে কারাগারে রাখতে গেছিলেন, কাউকে সঙ্গে যেতে দেননি। কিন্তু আর তিনি সুড়ঙ্গ থেকে ফেরেননি। শোনা যায় সুড়ঙ্গ মুখে অপেক্ষারতরা মহারাজের আর্তনাদ শুনেছিলেন। কিন্তু তা সমপর্ণের নয়, তিনি সুড়ঙ্গের সেই যমকে পাল্টা আঘাত করার চেষ্টা করেই মৃত্যুবরণ করেন। আর যদি তুই দেখে থাকিস যে সুড়ঙ্গের কারাগারে বাক্স আছে, তবে আমি নিশ্চিত সে বাক্সে মহারাজ লিখিত সেই পুস্তক আছে।”

“আর চন্দ্রহাস?”

“যা এখান থেকে, যা ভাগ! নিজের সর্বস্ব দিয়ে এইটুকু জানতে পেরেছি। বাকি তোকে নিজে বের করতে হবে। যা ভাগ!”

বলেই বৃদ্ধ বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। বৃদ্ধকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি অনেক মানসিক পরিশ্রম করেছেন। দরদর করে ঘামছেন। রাঘব অভাগা বৃদ্ধের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে ভালোভাবে শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

এক তলায় নিজের ঘর থেকে কী একটা নিয়ে পকেটে পুরলেন। তারপর সোজা চলে গেলেন সুড়ঙ্গের সামনে। মশালে নতুন করে আগুন জ্বালালেন। পাশেই পড়েছিল কিছুক্ষণ আগের মরণপণ যুদ্ধের চিহ্নগুলো। মেঝে থেকে তরবারি তুলে নিলেন। অনুজ নারায়ণের পিস্তলটাও ছিল, কোমরে গুঁজে নিলেন সেটা। কয়েক গোছা মোটা নারকেলের রশি জোগাড় করলেন। রশির এক প্রান্ত বাঁধলেন নিজের কোমরে, অন্য প্রান্ত শক্ত করে বাঁধলেন সুড়ঙ্গের কাছের এক লোহার পাইপে। লোহার গোল চাকতি খুলে মশাল হাতে ভেতরে ঢুকলেন রাঘব।

সুড়ঙ্গে নামতেই শব্দ হলো এবং সুড়ঙ্গের অনেক অনেক গভীরে কেউ যেন আবার সজাগ হলো।সিংহটি বুঝে গেছে তার উপস্থিতি। রাঘব বুঝলেন, এবার যা করার দ্রুত করতে হবে-সময় কম। রাস্তা এবার অনেকটাই চেনা ঠেকলো। দ্রুত পায়ে নির্দিষ্ট কারাগারের দিকে এগিয়ে গেলেন রাঘব। প্রায় ছুটে পৌঁছালেন সেই কারাগারের সামনে। মশাল এগিয়ে দেখে নিলেন। ঐতো দেখা যাচ্ছে বাক্স। পকেট থেকে আয়রন কাটার বের করে ফেলেছেন তিনি, সেটা চালিয়ে দিলেন তালার উপর।

ওদিকে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত থেকে আবার পায়ের শব্দ শুরু হয়ে গেছে। রাঘব সেদিকে খেয়াল না করে তালা কাটতে লাগলেন। পুরো সুড়ঙ্গ যান্ত্রিক শব্দে ভরে উঠলো। তালা এবং কাটারের ঘর্ষণে আলোর ফুলকি বেরোল আর তাতেই প্রথম বারের মতো রাঘব তার থেকে অনতিদূরে প্রাণীটাকে দেখতে পেলেন। বিশালাকার সেই প্রাণী, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এগিয়ে আসছে এদিকে। তালাটা আগের বার কিছুটা কাটা হয়েছিল, তাই এবার খুব একটা সময় লাগলো না। ভেঙে গেল। প্রাণীটা প্রায় রাঘবের কাছে পৌঁছে গেল । রাঘবকে লক্ষ্য করে লাফ দিলো। রাঘব মুহূর্তের মধ্যে কারাগারের ভেতরে ঢুকে পকেটে রাখা একট ছোট তালা ঝুলিয়ে দিলেন কারাগারের দরজায়। সমস্তটাই ঘটলো চোখের পলকে। কারাগারের এক দিকে রাঘব, অন্য দিকে ভৈরবের তন্ত্রসাধনায় জীবিত হয়ে ওঠা বিশালাকৃতি প্রাণী।

মশাল জ্বেলে ভালো করে চাইলেন রাঘব প্রাণীটার দিকে। মিশমিশে মখমলি কালো শরীর, দৈর্ঘ্যে সাধারণ যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সিংহের তুলনায় দ্বিগুণ। চোখগুলো যেন সাক্ষাৎ নরপিশাচের মতো জ্বলছে সর্বক্ষণ, এক একটা থাবায় সাধারণ বাঘ বা সিংহকে অনায়াসে কাবু করতে পারে এই প্রাণী। কিন্তু রাঘব সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হলেন প্রাণীটির দাঁত দেখে। কালো কেশরে ঢাকা সিংহটির মুখের পাশ বরাবর নেমে গেছে দুটো দাঁত। যখন গর্জন করছে তখন বাইরে থাকছে সে দাঁত। এমনকী মুখ বন্ধ করলেও দাঁত দুটো বাইরেই থাকছে।

একসময় জীবাশ্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন বলে রাঘব এ দৃশ্য দেখে আরও কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। একটা সত্যি অনুধাবন করতে পেরেছেন তিনি। এই দাঁত দীর্ঘতম ক্যানাইন দাঁতের গোত্রে পড়ে। অর্থাৎ এই সিংহটির দাঁত দুটো খড়্‌গ দন্ত। আজ থেকে বিয়াল্লিশ মিলিয়ন বছর আগে এরকম দেখতে প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছিল পৃথিবীতে, কিন্তু এর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আজ থেকে প্রায় এগারো মিলিয়ন বছর আগেই পৃথিবী থেকে এরা হারিয়ে গেছে। তবে কি…

ভাবতে পারেন না রাঘব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভৈরবের তান্ত্রিক অভিচারের ফসলস্বরূপ এই প্রাণী প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে। এই প্রাণী বেঁচে থাকলে শুধু চৌধুরী পরিবার নয়, আরও অনেক বিপদের সম্ভাবনা। রাঘবের মনে পড়ে সে সুড়ঙ্গের চাকতি খোলা অবস্থায় রেখে এসেছে। যা করার দ্রুত করতে হবে ।

তিনি পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করলেন। এই প্যাকেটটাই তিনি ঘর থেকে নিয়ে এসেছিলেন। প্যাকেটটা বাইরে রাখলেন। প্রাণীটা যেন এবার কিছু একটা পেয়ে পাগল হয়ে উঠেছে। কারাগারের লোহা ধরে দাঁড়িয়ে পড়ছে। গর্জন করছে, রাঘবও মশাল হাতে কারাগারে ওপার থেকে গর্জন করছেন। রাঘব নিজের ভয়কে জয় করার চেষ্টায় সফল আজ। গারদের লোহার এক দিকে মশাল হাতে রাঘব, অন্য দিকে প্রাগৈতিহাসিক কালো সিংহ। একে অপরকে হিংস্রভাবে হুংকার দিচ্ছে।

তারপরেই তড়িৎগতিতে রাঘব জংধরা বাক্সটা ভেঙে ফেললেন। ভেতরেও একটি কাঠের বাক্স পেলেন তিনি। বাক্সটি পিঠের ব্যাগে পুরে ফেললেন। তারপর মেঝে থেকে প্যাকেটটি তুললেন এবং বের করলেন একটি বড় মাংসপিণ্ড। প্যাকেটটাকে আবার পকেটে পুরলেন। সিংহটাকে কোনোমতে পিস্তলের গুলিতে বিভ্রান্ত করে কারাগারের ভেতর থেকে সুড়ঙ্গের ভেতরের দিকে যতটা দূরে সম্ভব ছুড়ে দিলেন সেই মাংসপিণ্ড। প্রাণীটা সিংহগর্জনে সেদিকে ছুটে গেল।

মুহূর্তে রাঘব তালা খুলে বের হলেন এবং ছুটলেন সুড়ঙ্গের মুখের দিকে। প্রাণীটা ততক্ষণে মাংসখণ্ড পেয়ে তা উদরস্থ করে ফেলেছে। মুখে লেগে আছে তার রক্ত। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে আবার ছুটলো রাঘবের পেছনে। এবার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে প্রাণীটা। রাঘবের পক্ষে এর গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। আর এরই মধ্যে রাঘব হোঁচট খেলেন। উপুড় হয়ে পড়লেন স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে। চারদিকে হাড়গোড়ের মধ্যে পড়ে শরীর চিড়বিড় করে উঠলো তার। ফিরে দেখলেন প্রাণীটা এবার তার থেকে বিশ হাত দূরে। কোনোক্রমে পকেটের প্যাকেট থেকে একটা মাঝারি বোতল বের করলেন। এই তার শেষ চেষ্টা।

বোতলটা সুড়ঙ্গের দেয়াল লক্ষ্য করে ছুড়ে মারলেন এবং পাশে নিবু নিবু হয়ে আসা মশালটা ছুড়ে দিলেন সেদিকেই। বোতল ভেঙে মদ বেরোতেই মশাল গিয়ে পড়লে তাতে। প্রাণীটি তার খড়্‌গ দন্ত বের করে রাঘবের উপর ঝাঁপ দেবে এমনি সময় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল সুড়ঙ্গ। আগুনের এক পারে প্রাগৈতিহাসিক কালো সিংহ, অন্যপ্রান্তে কোননাক্রমে উঠে দাঁড়ানো প্রফেসর রাঘব। সিংহটা আগুন পেরোতে পারছে না বলে ব্যর্থ গর্জনে ভরিয়ে তুললো সুড়ঙ্গের প্রতিটি কোণা। এই শব্দে জুলফির পাশ দিয়ে ঘাম আর কান দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো রাঘবের।

সুড়ঙ্গের মুখের কাছে পৌঁছে কোমরে বাঁধা দড়িটাকে টেনে টেনে উপরে উঠে এলেন তিনি। বন্ধ করে দিলেন সুড়ঙ্গের দরজা। শুয়ে পড়লেন মেঝেতে, এবার মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাবেন। ভোর হয়েছে কিনা জানা নেই, সময় কত কে জানে!

রাঘব জ্ঞান হারাবার আগে যেন শুনলেন কেউ একজন মহালয়ার সকালে রেডিও বা রেকর্ডার কিছু একটা চালিয়েছে। তাতে বাজছে-

“বাজলো তোমার আলোর বেণু…”

অদূরে অনুজ নারায়ণকে দেখা যাচ্ছে, ভাঙা কাঁধ নিয়েও পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ করে যাচ্ছেন। আজ মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ সহ চৌধুরী পরিবারের সকল পুরুষ জল পাবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *