অধ্যায় ১২
রাজবাড়ির যে অংশে শরৎকালে দুর্গাপূজা হয়, সেই মন্দির দালানে ইদানীং প্রফেসর রাঘব চক্রবর্তী সকালের দিকটায় আস্তানা গেড়েছেন। আদিত্য নারায়ণকে অনুরোধ করায় তিনিই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কারণ আর কিছু না, চণ্ডী পাঠ।।
রাঘব প্রতিদিন এখন সকালে উঠে স্নান সেরে মন্দিরে এসে চণ্ডী পাঠ শুরু করেন। রিশানকে তার সঙ্গ দিতে হয়। শুরুতে দুজন থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল আদিত্য নারায়ণও আসতে শুরু করেছেন। তারপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠা আদিত্যের মা রেবা এবং ভাঙা কাঁধ সারাইয়ের পথে থাকা অনুজ নারায়ণও সকাল সকাল চণ্ডী পাঠে এসে বসা শুরু করলেন। বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। শরৎকাল আগেই শুরু হয়ে গেছিল, এখন মহালয়ার আর সপ্তাহখানেক বাকি। কাজেই, যতো দিন এগোচ্ছে, সবার মনে ভয় বাড়ছে। এটা নরবলির বছর। অথচ পরিবারের প্রত্যেকটা লোক জানে এখন এই রীতি মানা অসম্ভব। সুতরাং স্বাভাবিক নিয়মে ধর্ম কর্মের দিকেই সবাই ঝুঁকছে। মার্ক্স ধর্মকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করে একদম সঠিক কথাই বলেছিলেন। শুধু মানুষের ব্যাখ্যায় ত্রুটি ছিল। এই আফিম নেশা নয়, বেদনানাশক। ধর্ম শুরুতে ক্ষতিকারক ছিল না, আমরাই ধর্মে বিষ মিশিয়েছি।
আজ চণ্ডী পড়তে গিয়ে রাঘব যেন তার সামনে স্বয়ং দুর্গাকে নাচতে দেখছেন। ইতিমধ্যে সবাই লক্ষ করেছে, চণ্ডী পাঠকালে আবেগে দু’বার কেঁদে ফেলেছেন তিনি। শেষ চণ্ডী শ্লোক আওড়াচ্ছিলেন রাঘব, হাত জোড় করে বসে আছেন আদিত্য নারায়ণ, অনুজ নারায়ণ, রেবা এবং রিশান।
‘সহস্রাবৰ্ত্তনাল্লক্ষ্মীরাবৃণোতি স্বয়ং স্থিরা।
ভূক্ত্বা মনোরথান কামান নরো মোক্ষমবাপ্লুয়াৎ।।
যথাশ্বমেধঃ ক্রুতুরাট দেবানাঞ্চ যথা হরিঃ।
স্তবানামপি সৰ্ব্বেষাং তথা সপ্তশতীস্তবঃ।
অথবা বহুনোক্তেন কিমেতেন বরাননে।
চণ্ড্যাঃ শতাবৃত্তিপাঠাং সর্ব্বাঃ সিধ্যস্তি সিদ্ধরঃ।
ইতি চণ্ডীপাঠফলং সমাপ্তম।’
সবাই নমস্কার করে একে একে উঠে পড়লেন। ঘটে প্রণাম করে এক সময় রাঘব উঠে দেখলেন রিশান বসে আছে।
“কী রে, বসে আছিস? ওরা তো চা খেতে চলে গেল।”
“তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল।”
“এই সাতসকালে জিজ্ঞাসা! এইযে একটা লম্বা কাহিনি চলছে আমাদের, পুরো কাহিনি জুড়ে আমার সঙ্গে তোরা শুধু প্রশ্নোত্তর খেলে চলেছিস। অবশ্য আমিও তাই করছি।” মন্দিরে আসন গোছাতে গোছাতে হালকা চালে উত্তর দিলেন রাঘব ।
রিশান হেসে জিজ্ঞেস করলো, “এত সমস্যার মধ্যে হঠাৎ চণ্ডীপাঠ কেন? তাও প্রত্যেক দিন?”
রাঘব এই প্রশ্নে বেশ জোরে হেসে বললেন, “ওরে, উত্তর তো তুই নিজেই দিয়ে দিলি।”
“মানে?” রিশান স্পষ্টতই বুঝতে পারেনি এর সারমর্ম।
“আচ্ছা, তোকে তন্ত্রোক্ত রুদ্রচণ্ডীর একটা শ্লোক বলছি-
‘মধুকৈটভ নৈপাত্যং মহিষাসুরসংহরং
পঠন্তি পাঠয়ন্ত্যেব বধং শুম্ভ নিশুম্ভয়োঃ।
শ্রোষ্যন্তি নিত্যং যে ভক্ত্যা মাহাত্ম্যং তব চণ্ডিকে।
নবম্যাং কৃষ্ণপক্ষে বা চতুর্দ্দশ্যাং তথৈব চ।
শুক্লাষ্টম্যাং পৰ্ব্বতো বা ভক্তাশ্চৈবৈকচেতসঃ
ন চৈষাং দুষ্কৃতং কিঞ্চিন্নদারিদ্র্যং ন চাপদঃ।।’
এর মানেটা বোঝ ভালো করে। বলছে, হে চণ্ডিকে, যে ব্যক্তি ভক্তিপূর্বক একাগ্রমনে মধুকৈটভ, মহিষাসুর এবং শুম্ভ-নিশুম্ভবধরূপ তোমার মাহাত্ম্য প্রত্যহ অথবা কৃষ্ণা নবমী বা চতুর্দশী কিংবা শুক্লাষ্টমী বা পর্বদিনে পাঠ করে, কি পাঠ করায় অথবা শ্রবণ করে, তার কোনোরূপ পাপ, দারিদ্র বা বিপদ উপস্থিত হয় না।
অর্থাৎ, এই দেবীমাহাত্ম নিত্যস্মরণের ফলে সাধকের চিত্তে ভগবতী চণ্ডিকার শক্তি ক্রমশ জাগ্রত হয়ে উঠে। দেবীর অচিন্ত্য শক্তি ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলে তার প্রভাবে সাধকের অনিষ্টকারী যাবতীয় বিরোধী শক্তিসমূহের বিনাশ ঘটে।”
রাঘবের প্রত্যেকটা কথাই মন দিয়ে শুনলো রিশান। শুনে বলল, “তার মানে যিনি পড়ছেন শুধু তার নয়, যিনি শুনছেন তার মধ্যেও একই শক্তি জাগ্রত হয়?”
“আলবাত হয়। তাই বর্ণিত আছে।”
“এত কিছু জানতাম না। শুধু জানতাম দুর্গাপূজায় চণ্ডী পাঠ হয়।”
“ঠিকই জানতিস। দুর্গাপূজা একটি মহাপূজা। শ্রীশ্রী দেবীমাহাত্ম্য চণ্ডীতে দেবী নিজেই বলেছেন।
‘বলিপ্রদানে পূজায়ামগ্নিকার্য্যে মহোৎসবে। সৰ্ব্বং মমৈতচ্চরিতমুচ্চাৰ্য্যং শ্রাব্যমেব চ।’
বলিদান, পুজো, হোম ও মহোৎসব উপলক্ষে আমার এই সমগ্র মাহাত্ম্য অবশ্যই পাঠ ও শ্রবণ করা কর্তব্য।”
“আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু মহাপূজো কী? সব পূজো কি মহাপূজো নয়?”
“শরকালীন দুর্গাপূজা একটি মহাপূজা। কারণ এতে মহাস্নান, পূজা, হোম এবং বলিদান-এই চারটে পর্ব রয়েছে। সব পূজায় এই চার পর্ব থাকে না বলেই সব পূজা মহাপূজা নয়।”
“বুঝলাম। দেখি তোমার চণ্ডী শ্রবণে আমার বিপদ কতটা কাটে।” শেষটা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলে রিশান। রাঘব হাসতে থাকেন।
এই কদিন উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটেনি। রাঘব এবং রিশান তক্কে তক্কে ছিল। কোনো কাজের লোক বা রাঁধুনি কোন ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসে সেটা জানার প্রায় সমস্ত চেষ্টাই তারা করেছে, এমনকী একজন কাজের লোককে কিছু টাকার লোভ অবধি দেখিয়েছে কিন্তু কোনোকিছুতেই কিছু জানা যায়নি। বয়স্ক কাজের লোকটা হাত জোড় করে বলেছে, “আর কয়টা দিনই বা বাঁচুম দাদাবাবু। এই পাপ করতে কইয়েন না। আমার বংশ সমূলে নষ্ট হইয়া যাইবো।”
আর কিছু বলার থাকে না। চৌধুরী বংশ যে এই রহস্য বেশ ভালোভাবেই গোপন রেখেছে, তা বুঝতে পারেন রাঘব। আসলে এত বিভীষণ আতঙ্ক দেখেছে এই বংশ, এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। সৌদামিনীর যোনি চিরে রক্ত বের করার দৃশ্য যত বার মনে হয়েছে, ঘর থেকে দৌড়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেছেন রাঘব। উফ! ভাবতেই বিবমিষা উদ্রেক হয়।
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আদিত্য নারায়ণের আতিথ্যে এবং তার মা রেবার স্নেহশীল ব্যবহারে দিনগুলো ভালোই কাটছে। রাঘব এবং রিশানের। দুপুরে কলেজে চলে যায় দুজনেই। বিকেলের মধ্যেই ফিরেও আসে চন্দ্রহাস মহলে।
এই করে করে দিন উপস্থিত হলো। আদিত্য নারায়ণ কুলদেবীকে পূজার জন্য চন্দ্রহাস মহলে আনতে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা দিলেন। সেদিন রাতেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো রাঘবের।
খাওয়া-দাওয়া সেরে শোবার ঘরে চলে এসেছিলেন রাঘব এবং রিশান। দুজনের একই ঘরে শোবার ব্যবস্থা। রাঘব কিছু সময় বই নাড়াচাড়া করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লেন। রিশানও আলো নিভিয়ে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঘুমিয়ে গেল।
রাত তখন ক’টা কে জানে। রাঘবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন, কেউ তাকে ডাকছে। নারী কন্ঠে কেউ বলছে, “রাঘব, রাঘব। বাইরে এসো। বাইরে এসো রাঘব। এসো রাঘব, এসো।”
কী মায়াবী সেই কণ্ঠ! তার টান এমনই অমোঘ যে রাঘবের মতো পোড়খাওয়া লোক অবধি সে ডাকে সাড়া দিয়ে ফেললেন। রিশানকে না জাগিয়ে সম্মোহিতের মতো রাঘব দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। আওয়াজটা দোতলার দিকে থেকেই আসছে যেন।
“রাঘব এদিকটায় এসো। আমি এদিকে। এদিকে এসো রাঘব। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর এদিকেই।”
রাঘব বুঝতে পারছিলেন যে যাওয়া হয়তো উচিত হচ্ছে না, কিন্তু তার শরীর তার কথা শুনছে না। চিন্তাশক্তিরহিত হয়ে অন্ধভাবে সেই দিক বরাবর হাঁটতে থাকলেন তিনি। এ দৃশ্য বাস্তবে যতোটা ভয়াবহ, কল্পনাতেও ততটাই। অভিশপ্ত এক রাজবাড়িতে নিশুতি রাতে একা এক পুরুষ কোন নারী কণ্ঠের ডাকে হেঁটে চলেছে। বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
“রাঘব আমি এদিকে, আরও উপরে উঠে এসো রাঘব। সব জানতে পারবে তুমি আজ।”
দোতলা থেকে তিনতলায় পৌঁছে গেছে সে শব্দ। রাঘব নিঃশর্ত সমর্পণ করেছে নিজেকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন তিনি।
তেতলায় অনেকগুলো ঘর। বেশিরভাগই বন্ধ! সেরকম একটা বন্ধ ঘরের ভেতর থেকেই শব্দ আসছে এবার।
“রাঘব, দরজার গোলকটাতে চাপ দাও। দরজা খুলে ভেতরে এসো রাঘব।”
রাঘব সেই গোলকে চাপ দিতেই কোনো শব্দ না করে দরজা খুলে গেল। তালা যেরকম ঝুলছিল সেরকমই রইলো। তালাটি ফলস ঝোলানো আছে, বোঝা গেল। শুধু লোকে যেন সন্দেহ না করে সেজন্য এই তালার ব্যবস্থা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে দরজা বাইরে থেকে তালা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।
ভেতর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে কড় কড় শব্দে একটা বাজ পড়লো। আর তাতে রাঘবের সম্মোহন নষ্ট হয়ে গেল। তিনি হঠাৎই নিজেকে আবিষ্কার করলেন অপরিচিত অন্ধকার এক কক্ষে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না সেই কক্ষে। এত অন্ধকার বোধহয় নরকেও নেই!
পাজামার পকেট হাতড়ে একটা লাইটার পেলেন তিনি। তাই জ্বালালেন। মুহূর্তে একটা আলোক বলয় তৈরি হলো অন্ধকারের উপর। কিছু বস্তু দেখা গেল। বেশ পরিষ্কার ঘর। নিয়মিত ঝাড়পোঁছ হয়। বোঝা গেল কাজের লোকেরা এসব গোপনে করে। চারদিকে আলো ঘোরাতেই সামনে আরেকটা দরজা চোখে পড়লো। দরজার নীচ দিয়ে একদম হালকা নীল রঙের আলো বেরোচ্ছে। রাঘব সেই দিকে এগিয়ে গেলেন।
বাইরে থেকে দরজা খিল তুলে আটকানো আছে। খিল টানতেই সশব্দে দরজা খুলে গেল আর খুলতেই বয়সের ভারে অস্পষ্ট হয়ে আসা এক ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠ শোনা গেল, “কে-এ-এ-এ? কে রে-এ-এ-এ-এ?”
পুরুষ কণ্ঠ। বিদ্যুৎবেগে ব্রজ নারায়ণের কথা মনে পড়লো রাঘবের। তিনি দরজা ভেজিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ঘর জুড়ে রয়েছে এক হালকা নীল আলোর ব্যবস্থা। লাইটার জ্বালাতে হয় না। দেখা যায় ভালোই।
আবার আওয়াজ এলো, “কে-এ-এ-এ তুই?”
“আমি রাঘব চক্রবর্তী। আমি…”
“আহ!”
রাঘবকে থামিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলেন সেই পুরুষ কণ্ঠের অধিকারী, যেন কোনো সুঘ্রাণ তার নাকে এসেছে। তৃপ্তি পেয়েছেন তিনি।
“তুই এসেছিস! কতকাল যে অপেক্ষা করতে হলো। যাক এবার মুক্তি পাবো হয়তো”।
রাঘব বুঝতে পারছিলেন না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।।
“ওখানে বসার জায়গা আছে, বোস ওখানে। আমি যতটা জানি বলে ফেলি। কবে ভুলে যাবো ঠিক তো নেই কিছু।”
লোকটার আঙুল দেখা গেল এবার। সেটা দিক নির্দেশ করছে। রাঘব সেদিকে যেতে যেতে বললেন, “কী বলবেন?”
তাকে কীভাবে চেনেন তিনি সেই নিয়ে প্রশ্ন করার প্রয়োজনই মনে করলেন না রাঘব। এতদিনে এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তিনি।
“গল্প বলব রে, গল্প। যে গল্পের জন্য হন্যে হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছিস, সেই গল্প। আমার কাছে সব খবর এসে বলে যেত তারা। তারা আমাদের পক্ষে রে, পক্ষে।”
“কারা? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
রাঘব লোকটাকে এখন কিছুটা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বিছানার উপর বসে আছেন । নীল আলোতেও এইটুকু স্পষ্ট যে লোকটা অস্থিমজ্জাসার এক বৃদ্ধ।
“ওই যে ট্যাক্সি ড্রাইভার, ঘটিগরমওয়ালা… সবাই আমাদের দিকে রে। ভয় নেই। জয় আমাদেরই হবে। তবু ভৈরবকে বিশ্বাস নেই, কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসে।”
শেষটুকু আনমনে বলে বিশ্রী হাসেন বৃদ্ধ। তারপর গল্প শুরু করেন। “মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ দন্তেশ্বরী মন্দির থেকে চন্দ্রহাস হাতে নিয়ে পালিয়ে আসেন এই রাজবাড়িতে। সেই রাতের ভয়াবহতা তিনি অচিরেই ভুলে গেলেন এখানকার মানুষের ভালোবাসা পেয়ে। শুরুতে ভেবেছিলেন আবার ভৈঁরো দেওয়ের কাছে যাবেন। কিন্তু ততদিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্তি সে অঞ্চলে আরও বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে আর নতুন করে কিছু করা সম্ভব নয় বুঝে বাকি জীবন এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু রক্তের নেশা এক মারাত্মক নেশা। কারো মুখে একবার সে স্বাদ লেগে গেলে আর নিস্তার নেই। পাপ বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আবার নরবলি দেবেন। বাড়ির লোকজন অনেক বোঝালো, কিন্তু মহারাজ সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন।
এই রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার চল ছিল। কাত্যায়নী দুর্গার পূজা করা হতো শরৎকালে। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ আগামী দুর্গাপূজাতেই নরবলি দেবেন বলে ঠিক করলেন। তবে একটা পরিবর্তন এসেছিল। কাত্যায়নী রূপের বদলে দুর্গার আরেক রূপ রক্তদন্তিকা হিসেবে মায়ের পূজার সিদ্ধান্ত নিলেন রাজা। আদেশানুসারে রাজবাড়িতে কারিগর এলেন এবং রক্তদন্তিকার মূর্তি বানাতে উদ্যত হলেন।
রাজা মন্ত্রীদের জানালেন, বলির জন্য লোক চাই। সেই মতো খুঁজে খুঁজে প্রথম বছরই লোক পাওয়া গেল, মানে ধরে-বেঁধে আনা হলো।
তখনও পূজার প্রায় মাস ছয়েক বাকি। একটা নতুন নিয়ম বানালেন প্রতাপ নারায়ণ। বলি প্রদত্ত ব্যক্তিকে এবার একটা ক্ষমতা দিলেন তিনি। তিনি বললেন, এই ছয় মাস আমার এলাকায় তোমাকে রোখার কেউ নেই। যা ইচ্ছে করো। চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি-তোমার কোনো শাস্তি হবে না। তোমার জীবনের এই শেষ ছয় মাস তুমি রাজার মতো কাটিয়ে যাও।
ব্যাস! সেদিনের পর থেকে রাজ্যে অশান্তি বেড়ে গেল। প্রতাপ নারায়ণ বলেছিলেন চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানির জন্য সব দোষ ক্ষমা করবেন তিনি। কিন্তু দেখা গেল সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি লিপ্ত হয়েছে ধর্ষণে। প্রজারা অনেকেই অভিযোগ করলো। কিন্তু মহারাজের মাথায় মায়ের জন্য নররক্তের পিপাসা বেশি ছিল। বলি প্রদত্তকে দেওয়া কথা তিনি রাখলেন। কোনোরূপ শাস্তি বিধান হল না সে ব্যক্তির। অবশেষে নবমী রাতে দুর্গার রক্তদন্তিকা রূপের সামনে নিজ হস্তে বলি দিলেন সেই ব্যক্তিকে। সেদিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই মহলে শুরু হল এই নতুন প্রথা, নরবলি । মহলের নতুন নামকরণ হল চন্দ্রহাস মহল।
এভাবে আরও বছর দুই কাটলো। মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ এই প্রথাতেই পূজা সম্পন্ন করতে লাগলেন। তারপর চতুর্থ বছর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। প্রতি বছর বলির জন্য বিভিন্ন প্রদেশ থেকে লোক খুঁজে আনতে হতো। এবার আমাদের এখান থেকেই এক ব্যক্তি সরাসরি এসে উপস্থিত হলো রাজদরবারে। মহারাজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী নাম?”
প্রায় ছ’ফুটের লোকটা বিশুদ্ধ বাংলায় বলল, “ভৈরব সিংহ।”
“কী চাস?”
“মায়ের জন্য আমার কাটা মুণ্ডু দিতে চাই।”
সভায় সবাই নড়েচড়ে বসলেন। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।
“তুই জানিস তুই কী বলছিস?”
ভৈরব নিজের উত্তরে অটল রইলো, “মা রক্তদন্তিকাকে নিজের রক্ত দিতে চাইছি। আমার গর্দান কেটে যে রক্তস্রোত বইবে তা দিয়ে মাকে স্নান করাতে চাই।”
মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের মতো পাষণ্ডও এই জবাবে কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেছিলেন বলে শোনা যায়। তারপর বলেছিলেন, “কে আছিস? একে নিয়ে যা। এ বছর আর বলির জন্য অন্য লোক খুঁজতে হবে না। একেই চড়াব যূপকাষ্ঠে। এই, তুই আজ থেকে কী কী ক্ষমতা পেলি সেটা জানিস তো?”
“জানি, মহারাজ। কিন্তু আমার কোনো ক্ষমতা চাই না। শুধু একটা কক্ষ চাই, যেখানে আমি সাধনা করতে পারব। দয়া করে শুধু সেটার ব্যবস্থা করে দিন, আর কিছু চাই না।”
মহারাজ আবার ধাক্কা খেলেন। এক ঝটকায় প্রজা থেকে রাজা হবার সুযোগ কেউ এভাবে হেলায় ফেলতে পারে সে ধারণা কামাতুর, নেশাতুর এবং ক্ষমতাবিলাসী রাজার ছিল না। তিনি মেনে নিলেন এই শর্ত। ভৈরবের জন্য একটি কক্ষ নির্দিষ্ট হলো এবং সেখানেই সে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা অতিবাহিত করতে লাগলো। সেখানে সে কী করে, কার পূজা করে সে বিষয়ে কেউই কোনো খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করলো না।
এদিকে মহারাজার ব্যক্তিগত জীবনে তখন এক অশান্তি চলছে। মহারাজার যথেচ্ছাচারের বিষয়ে রানি বিম্ববতী সমস্ত জানলেও কোনোদিন কোনোরূপ কথা মহারাজকে বলেননি। মহারাজও তাই অপরিমিত নারীসঙ্গ, সুরাপান, একসঙ্গে একাধিক কুমারীর সঙ্গে রাত কাটানো ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একদিন তিনি মহারাজকে বলতে বাধ্য হলেন, “আপনি আপনার জীবন বেশ আনন্দেই কাটাচ্ছেন। তা ভালো, তাতে আমার অনুযোগ নেই। কিন্তু আমার জীবনের আনন্দের কথা ভাবা কি আপনার কাজ নয়?”
“কেন বিম্ব? কী হয়েছে?”
“আমাদের বিবাহের পর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। এবার অন্তত আমার কোল জুড়ে কাউকে দিন, যাকে নিয়ে বাকি জীবনটা সুখে-শান্তিতে, হেসে-খেলে কাটাতে পারি।”
এই একটা বিষয়ে মহারাজ কিছু বলতে পারতেন না। আসলে বহুবিধ নেশার ফলে হোক, লাগামহীনভাবে শয্যাসঙ্গিনী পাল্টানোর জন্যই হোক বা অন্য কোনো কারণে মহারাজের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল। তাই এত বছর পরেও পিতা হবার সৌভাগ্য তার হয়নি।
রানি জিভে আগুন নিয়ে আরও বলেছিলেন, “রাজ্যকে একটা ওয়ারিশ অন্তত দিয়ে না গেলে ইতিহাস কিন্তু আপনাকে নরবলির জন্য বেশিদিন মনে রাখবে না মহারাজ।”
কথার বিষ সহ্য করতে না পেরে সেদিন শয়নকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রতাপ নারায়ণ।
এরকমই এক দিনে রাজসভায় একা বসে বসে যখন ভাবছেন কী করা যায়, তখন ভৈরব সেখানে উপস্থিত হয়েছে। এই ছয় মাস বলিপ্রদত্তের যে কোনো স্থানে উপস্থিত হতে কোনো পরোয়ানার দরকার পড়ে না।
“মহারাজ আপনাকে আজ বিষন্ন লাগছে।”
“তাতে তোর কী?”
“আপনি রাজা। প্রজা হিসেবে আমার দুঃখ যেমন আপনি দেখেন, আপনাকে দুঃখে দেখলে প্রজারও কষ্ট হয়। বলে দেখুন, হয়তো লাঘব করতে পারবো।”
“না ভৈরব, এ দুঃখ লাঘব হবার নয়।”
“মহারাজ, অনুরোধ করছি। একবার বলুন আমায়।”
“তবে রে হতচ্ছাড়া, শোন তবে। দেখি কী করে লাঘব করিস!”
“বলুন মহারাজ।”
“পুত্র-সুখ চাই। পারবি দিতে? আছে কোনও জাদু মন্ত্র? অনেক তো পুজা-আচ্চা করিস তুই।” মহারাজ অবজ্ঞার সুরে কথাগুলো বললেন। ভৈরব হাসলো। তারপর বলল, “আপনি আমাকে এক সপ্তাহ সময় দিন।” বলেই বিদায় নিলো।
ঠিক এক সপ্তাহ পর সে আবার মহারাজের সম্মুখে উপস্থিত হলো। তার হাতে কিছু একটা ছিল এই বার। এবারেও মহারাজ একাকী বসে ছিলেন। ভৈরবকে দেখতে পেয়েই বললেন, “তোর এক সপ্তাহ কিন্তু আজ শেষ।”
ভৈরব শান্ত সমাহিতভাবে হেসে বলল, “এই নিন মহারাজ। এর পূজা করুন নিয়মিত, রোজ করবেন কিন্তু।” বলেই মহারাজের হাতে কী একটা দিল।
প্রতাপ নারায়ণ তিনি হাতে নিলেন সেই বস্তু। জিজ্ঞেস করলেন, “কী এটা? লাল কাপড়ে ঢাকা ছিল বস্তুটি। এক টানে কাপড় খসালেন প্রতাপ নারায়ণ। সেখান থেকে বেরোল একটি মূর্তি। পেতলের তৈরি এক গণেশ মূর্তি। কিন্তু এরকম গণেশ মূর্তি এর আগে মহারাজ কখনো দেখেননি। এক অদ্ভুত গণেশ মূর্তি ভৈরব তাকে দিয়েছিল।”
মূর্তিটার ছয় হাত। এক হাতে পদ্ম, এক হাতে দাড়িম্ব ফল, অন্য তিন হাতে যথাক্রমে বীণা, অক্ষমালা এবং ধানশীষ। ষষ্ঠ হাতে দিয়ে তিনি একজন দেবীর, যিনি কিনা তার কোলে অবস্থান করছেন তার নিতম্ব স্পর্শ করে আছেন। গণেশ মূর্তিটির মাথায় রত্নমুকুট এবং ললাটে তৃতীয় নয়ন। উপস্থিত। দেবী মূর্তিটা সমগ্র গণেশ মূর্তির তুলনায় ছোট। গণেশ তার শুঁড় দিয়ে দেবী মূর্তির যোনি স্পর্শ করে আছেন। এত উদ্ভট গণেশ মূর্তি রাজা জীবনেও দেখেননি। ভীষণ আশ্চর্য হলেন তিনি। এরকম কোনো গণেশ মূর্তি যে হতে পারে সেই ধারণাই তার ছিল না। প্রতাপ নারায়ণ ভৈরবকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইনি কে? কার মূর্তি দিচ্ছিস তুই আমাকে?”
ভৈরব নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে বলল, “ইনি উচ্ছিষ্ট গণেশ। হিন্দু দেবতা গণেশের একটা তান্ত্রিক রূপ। এই যে দেবী দেখছেন গণেশের কোলে, যিনি নানা রত্নে সজ্জিতা, ইনি মা বিঘ্নেশ্বরী।” বলেই হাত জোড় করে প্রণাম করলো ভৈরব। তারপর বলল, “আপনি উচ্ছিষ্ট গণেশের পূজা কাল থেকেই শুরু করুন। উপাচার সব আমি বলে দেব। আশা করছি। আমার মৃত্যুর আগেই আপনি সন্তানলাভ করবেন।”
মহারাজের বিশ্বাস হলো না সব কথা, কিন্তু তিনি মূর্তিটা রেখে দিলেন। ভৈরব সেদিনকার মতো বিদায় নিলো।
বৃদ্ধ থামলেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে আছেন দেখে রাঘব জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”
বৃদ্ধ কোনোক্রমে জানালেন, “আর মনে পড়ছে না। কিছুতেই মনে পড়ছে না।”
রাঘবের মনে পড়লো ভৈরবের অভিশাপের অংশবিশেষের কথা। সম্পূর্ণ ইতিহাস কেউ মনে রাখতে পারবে না, ভুলে যাবে।
“আর কিছুই মনে পড়ছে না আপনার?”
বৃদ্ধ স্মৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আবার বলতে শুরু করলেন, “হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ভৈরব যখন অভিশাপ দেয়, মহারাজকে তখন যেসব কথা বলেছিল, তার সঙ্গে পরবর্তীকালে স্বপ্নাদেশে একটা কথা যোগ করেছিল। সে অবশ্য অনেককাল পরেই। ততদিনে অভিশাপে ছেয়ে গেছে এই রাজবাড়ি। সাদা মেঘ যেন এই বাড়ির উপর এলে কালো হয়ে যায়। তখন মহারাজ বারবার তার ইষ্ট দেবতার ধ্যানে এই অভিশাপ মুক্তির খোঁজ করছিলেন। এইরকমই এক দিন ইষ্টনাম জপ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। স্বপ্নে দেখলেন ভৈরবকে। সে বলছে, “আমাদের আবার দেখা হবে, তখন অভিশাপ মোচনের শেষ সুযোগ পাবি।”
জেগে উঠেছিলেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে রেখেছিলেন এই স্বপ্নদেশের কথা। কারণ, কখন কে ভুলে যাবে সেসব কথা, কিছুই ঠিক ছিল না। আমি, আমার দাদা, বোন সবাই সব কিছু শুনেছি পূর্বপুরুষদের কাছে। কেউই সব মনে রাখতে পারিনি আমরা।
বৃদ্ধকে বিরক্ত করার আর কোনো মানে হয় না। রাঘব বিদায় নেবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। সাবধানে বেরিয়ে যাবার জন্য লাইটারের আলো জ্বালতেই বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “বন্ধ কর, বন্ধ কর।”
চোখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন বৃদ্ধ। এত দিন পর তীব্র আলো চোখে পড়ায় চোখে ধাঁধা দেখছেন তিনি।
আলো নিভিয়ে দিলেন রাঘব। এই এক মুহূর্তেই রাঘব ব্রজ নারায়ণের যে চেহারা দেখলেন, তাতে চোখ ঝলসে গেল তার। শরীর ভর্তি ক্ষত নিয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ। রাঘবের মনে পড়লো আদিত্য নারায়ণের কথা। সে বলেছিল হর নারায়ণের কন্যার রক্ত যাদের গায়ে পড়েছে তাদের সেসব জায়গায় ক্ষত হয়ে গেছে, অ্যাসিডে পোড়ার মতো ক্ষত। এত বছর ধরে এই কালান্তক ক্ষত নিয়ে বৃদ্ধ বেঁচে আছেন ভেবেই মন ভারি হয়ে গেল তার। চন্দ্রহাস উদ্ধার করলে হয়তো এই কষ্ট থেকে নিস্তার পাবেন বৃদ্ধ। রাঘব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। হাতল ঘুরিয়ে কামরাটি আটকে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বুঝতে পারলেন, বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়েই চলেছে। রাত এখন ক’টা, কে জানে!
এক তলায় শোয়ার ঘরে ফিরলেন তিনি। মনে কিছুটা অন্তত শান্তি ছিল যে এই বাড়ির ইতিহাস আরও কিছুটা জানা গেল। ভৈরবের উল্লেখ পাওয়া গেল অন্তত। কিন্তু ঘরে ঢুকে সব শান্তি মন থেকে উধাও হয়ে গেল তার।
রিশানের বিছানা ফাঁকা, ঘরে কেউ নেই।
