চন্দ্রহাস – ১.৯

অধ্যায় ৯

কলকাতা ফেরার পর কয়েকদিন সাধারণভাবেই কাটলো রাঘবের। ইতিমধ্যে রিশানও কলেজে ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। ছাত্র এবং শিক্ষকের উত্তেজনা ও রোমাঞ্চকর জার্নি যে শুরু হয়ে গেছে তা ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারলো না।

প্রত্যেক দিন রাঘবের ক্লাস থাকে না। তেমনি রিশানদের বলি ছাড়াও অন্যান্য ক্লাস থাকে। তাই দুজনেই ঠিক করে নিলো নিজের নিজের ফাঁকা সময়ে এরা কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নেবে। কখনো কখনো সময় পেলে একত্রেও এরা খোঁজখবরে বেরোত। কিন্তু প্রায় মাসখানেক কেটে গেলেও সোনালি এবং কালো সিংহবিশিষ্ট সিংহদুয়ারের হদিশ তারা পেলো না। পত্রিকা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা নিউজ করলে হয়তো চটজলদি কাজ হয়ে যেতো, কিন্তু সেক্ষেত্রে লোকের কৌতূহল এত বেড়ে যেতো যে কাজের অসুবিধে হতে পারতো। লোক জানাজানি হবার ভয়ে সে পথে হাঁটেনি রাঘব-রিশান জুটি। তবে নিজেদের মতো কিছু সোর্স লাগিয়ে দিলো শহর জুড়ে।

শহরটা তো নেহাত ছোট নয় এবং জমিদারিও এককালে কম ছিল না। কোথাকার জমিদার ছিলেন প্রতাপ নারায়ণ, তা যখন জানা নেই তখন উত্তর-দক্ষিণ, নতুন-পুরাতন সমস্ত কলকাতাই এদের চারণভূমিতে পরিণত হল।

এরই মধ্যে একদিন চেহারায় কাঁচা-পাকা দাড়ি নিয়ে পড়াতে এলেন রাঘব।

“গুড মর্নিং, স্যার।”

রাঘব চেয়ারে বসে একবার ক্লাসটাকে মেপে নিলেন। রিশান এক কোণে বসে আছে। তনুশের জায়গায় রিশান চলে আসায় এখন আবার ক্লাস পূর্ণতা পেয়েছে।

“এতদিন আমরা সাধারণভাবে ভারত এবং আশেপাশের অঞ্চলের নরবলি প্রথা এবং তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছি। তৎসম্পর্কিত নোটসও ইতিমধ্যে তোমরা পেয়ে গেছে। আজ আমরা বিভিন্ন দেশের নরবলির ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করবো। আমরা শুধু ভেবে এসেছি যে, প্রধানত উপমহাদেশের দেশগুলিই কুসংস্কারাচ্ছন্ন। কিন্তু আজ হয়তো এটা বুঝতে পারবো যে কিছু দিক দিয়ে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য তথা সম্পূর্ণ মানবসভ্যতা এক সূত্রে গাঁথা। শুধু দেশ পাল্টায়, লোকাচারের নাম পাল্টায়-মানুষের পাষণ্ড হওয়া একই থাকে।

পল্লবী শুরুতেই একটা প্রশ্ন করে, “পাশ্চাত্যে কুসংস্কার?”

রাঘব উত্তর দিলেন না আজ। সরাসরি পড়ানো শুরু করে দিলেন। আজ স্যারকে দেখে সবারই একটু অন্যমনস্ক ঠেকছে। তাই বাকি ক্লাসে আর কেউ প্রশ্ন করলো না, শুধু স্যারের সুনিপুণ দক্ষতায় গল্পচ্ছলে বলে যাওয়া ইতিহাসটুকু শুনলো এবং বিস্মিত হলো।

“পৃথিবীর ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস, যার জন্য ওই খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০-৪৮০-এর দিকে, তিনি ‘থ্রেস’ এবং ‘সিথিয়ান’ জাতির কথা উল্লেখ করেছেন। এই ‘থ্রেস’ এবং ‘সিথিয়ান’-দের মধ্যে ব্যাপকভাবে নরবলির প্রচলন ছিল। অথচ এদের নরবলির কারণ এবং ধরন কিন্তু আমাদের এতদিন ধরে জেনে আসা কারণগুলোর থেকে আলাদা। এরা দেব-দেবীর নামে যেরকম বলি দিতো, ঠিক সেরকম বলি দিতো তাদের জাতের পুরুষ কিংবা রাজা মারা গেলে।”

“কীরকম?”

“এই ‘থ্রেস’-দের মধ্যে পুরুষে বহুবিবাহের চল ছিল এবং পাশাপাশি এরা মৃত্যুর পরের জীবনেও সমানভাবে বিশ্বাসী ছিল। অনেকটা আমাদের মিশরীয় মমি ব্যবস্থার মতো ঘটনা এরাও এখানে ঘটাতো। তবে ধরন আলাদা। এখানে পুরুষ মারা গেলে তার পত্নীদের মধ্যে তীব্র বচসা বাঁধতো। কে সেই পুরুষের সবচেয়ে কাছের ছিল, তাই হতো সেই ঝগড়ার মূল প্রতিপাদ্য। তারপর যখন মীমাংসা হতো, তখন সেই স্ত্রীকে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হত বধ্যভূমিতে। মৃত স্বামীর মঙ্গলার্থে তার বলি দেওয়া হতো এবং তাকে একই কবরে সমাহিত করা হতো।

এবার আসি ‘সিথিয়ান’দের কথায়। এরা আরও নিষ্ঠুর জাতি ছিল। দেশের রাজা মারা গেলে মৃত্যুর এক বছর পর তার কবরের কাছে পঞ্চাশজন পুরুষকে গলা টিপে হত্যা করে বলি দেওয়া হতো। সেই মৃতদেহগুলো নিয়ে রাজার কবর প্রদক্ষিণ করা হতো এবং তারপর কবরের আশেপাশে সারিবদ্ধভাবে পুঁতে দেওয়া হতো সেই দেহগুলো। মনে করা হয় মৃত রাজা এবং রাজন্যবর্গের মঙ্গল কামনাতেই এই নরবলির ব্যবস্থা।

প্রাচীন মিশরে যেভাবে রাজার মমির সঙ্গে তার স্ত্রী, রক্ষিতা এমনকী, ভৃত্যদেরও হত্যা করে মমিফিকেশান করা হতো, যাতে মৃত্যুর পরে রাজার কোনো কিছুর অভাব বোধ না হয়- ঠিক তেমনি বিশ্বাস জন্মেছিল প্রাক ইসলামিক যুগে। রুবিনা ভালো করে বুঝে নাও জায়গাটা।”

রাঘব অমনোযোগী রুবিনাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে সে ইতিহাসের গল্পে আবার ডুব দিলেন।

“নীল নদের বিস্তীর্ণ উপত্যকা এবং জাগোস পর্বতমালার কাছে পারস্য উপসাগরের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের নদী উপত্যকা সংলগ্ন ইলাম অঞ্চল, মানে পার্বত্যভূমি, প্রাচীন চীন, প্রাচীন ফিজি এবং ওশিয়ানিয়া, মালয়, সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জে এইরকম মৃত্যুর পরের জীবনের বিশ্বাস লিপিবদ্ধ আছে। সে কারণেই এসব দেশে মমি না পাওয়া গেলেও, কবরে একই সঙ্গে একাধিক নরকরোটির হদিশ মেলে।

এছাড়াও হিরোডোটাসের ইতিহাস থেকে জানা গেছে, এরিস দেবিতার মূর্তির কথা। এই দেবতার সামনে যুদ্ধবন্দিদের স্রেফ কচুকাটা-করা হতো। সে হত্যাকাণ্ড নৃশংস, আমরা একেও বলির নাম দিয়েছি। বলির আগে মাথায় মদ ঢেলে এরা বলিপ্রদত্তকে পবিত্র করে নিতো। এই সব এরা করতো ধর্মের নামে। পুণ্য লাভের আশায়। এই পুণ্য লাভের আশায় সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনার বর্ণনা আছে বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে। সেখামে পিতা আব্রাহাম কর্তৃক পুত্র ইসাকের বলির ঘটনা এক জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। শুধুমাত্র স্বর্গে যাবার আশায় পিতা ছুরি দিয়ে কেটে কেটে পুত্রকে বলি দিয়েছিল। এই অবধি কারো মনে কোনো কৌতূহল এলে প্রশ্ন করতে পারো।”

ক্লাসের সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসেই রইলো। অন্য দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বের ক্লাসের চেয়ে আজকের ক্লাস যেন অনেক পরিনত। রাঘব বুঝতে পারলেন, আজ তিনি একটু বেশিই কাঠকোট্টা হয়ে পড়াচ্ছেন। কিন্তু মাঝে মাঝে এরকম দিন আসে যে কিছু করার থাকে না। এত দিন হয়ে গেল এখনও রাজবাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না, ভেতরে যেন কী একটা কুরে খাচ্ছে তাকে। তিনিও বুঝতে পারছেন না। কী একটা কর্তব্য যেন তার বাকি! হয়তো রাজবাড়িতেই সেই প্রশ্নের উত্তর। কোনোক্রমে চিন্তাস্রোতে লাগাম পরালেন রাঘব। আবার ক্লাস শুরু করলেন।

“এবার ধীরে ধীরে আমি ঢুকছি মহাকবি হোমারের ‘দ্য ইলিয়াড’ এবং ‘দ্য ওডিসি’ মহাকাব্যে। ট্রয় ধ্বংসের পর গ্রিক সম্রাট এগামেমনন ও মেনেলাসের মধ্যে বিরোধ ঘটেছিল, এ প্রায় সকলের জানা তথ্য। কিন্তু যেটা জানলে সত্যি গায়ে কাঁটা দেয় তা হলো এই দুই ভাইয়ের বিরোধের প্রধান কারণ ছিল নরবলি। সম্রাট এগামেমনন বলেছিলেন, যেহেতু জ্ঞান দেবী এথিনির সহায়তায় তারা ট্রোজানদের যুদ্ধে হারিয়েছে, সুতরাং দেবীকে খুশি করতে হলে নরবলি সহকারে দেবী পূজার আয়োজন বাধ্যতামূলক। সম্রাটের এই মতামতের বিরুদ্ধাচারণ করেন ভাই মেনেলাস। এই নিয়েই বিরোধ এবং দুই ভাইয়ের ছাড়াছাড়ি।

“‘দ্য ইলিয়াড’ কাব্যের আরেকটি ঘটনা, যেখানে সমুদ্রকন্যা দেবী থেটিসের পুত্র, বিখ্যাত গ্রীক বীর একিলিসের প্রসঙ্গ আছে। ব্রাইসিস ছিলেন একিলিসের বাগদত্তা। ট্রয়ের যুদ্ধের আগে একিলিস ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে, যদি যুদ্ধে তিনি নিহত হন তবে ব্রাইসিসকে যেন বলি দেওয়া হয়। সত্যি সত্যি যুদ্ধে একিলিস নিহত হন এবং ব্রাইসিসকে তার সমাধির উপরেই বলি দেওয়া হয়। হায় ভালোবাসা!”

রাঘব মুচকি হেসে চুপ করলেন। ক্লাস শুরু থেকেই চুপ। যেন এই নিস্তব্ধতা ভাঙার জন্যই রিশান প্রশ্ন করে, “শুধু কি নরবলিই হতো সে সময়?”

রাঘব সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলেন কথাটা, “না না। ট্রয়ের যুদ্ধের সময় দেবরাজ জিউস, অ্যাপোলো প্রভৃতি দেবতার সামনে বারংবার পশু বলির উল্লেখ আছে। তবে প্রসঙ্গক্রমে বলি, গ্রিক পুরাণে যে দেবতার নামে সবচেয়ে বেশি নরবলি হয়েছে তিনি অর্ধনর-অর্ধবৃষরূপী ‘মিনোতার’ দেবতা। এই দেবতা পূজার শর্তই ছিল প্রতি বছর উৎসবের সঙ্গে সাতটি বলিষ্ঠ যুবক এবং সাতটি সুন্দরী যুবতীর বলি। …বিরতি নেবে একটু? এসব মনে রাখাটা চাপ হয়ে যায়, বুঝতে পারছি।”

অনিন্দ্য, বেশ ভারিক্কি স্বভাবের ছেলেটা উত্তর দেয়, “না স্যার, আপনি ইতিহাস বললেও আমাদের চোখের সামনে সেই যুগের দৃশ্য একের পর এক সিনেমার মতো চলতে থাকে। বিরতি আবার কীসের?”

বাকি ক্লাসও অনিন্দ্যের কথায় সায় দেয়। রাঘব এবার একটু হাসলেন। ছাত্র পড়া বুঝলে শিক্ষকের যে কী তৃপ্তি হয়, তা বোঝানো দায়।

“আচ্ছা, তবে এবার আমরা প্রাচীন রোম আর প্রাচীন চীনে প্রবেশ করি। প্রাচীন রোমে ‘স্যাটার্ন’ বলে এক ফসলের দেবতার উল্লেখ পাই। নববর্ষ উৎসবে স্যাটার্নের উদ্দেশে বলি দেওয়া হত। শস্যের দেবতার নাম ছিল ‘চেরেশ’ । রোমানরা শস্য চোরদের বলি দিত এই দেবতার সামনে।”

“শেষেরটা কিন্তু ভালো ছিল স্যার।” রুবিনা এবার উত্তেজিত এবং হাসিমুখ ।

রাঘব বুঝিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, সাজা হিসেবে ফাঁসি আজকের দিনেও ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে শস্য চুরির অপরাধে মৃত্যু, না বাপু আমি ঠিক মানতে পারি না।”

রুবিনা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে, “সরি স্যার।”

রাঘব বলতে থাকেন, “এবার চীনের একটা গল্প বলি। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের ঘটনা, মানে খ্রিঃ পূঃ ১৭৬৬-৫৩। সমাটের নাম টাং । সাত বছর ধরে সেখানে বৃষ্টি নেই। ফসল হয় না, চারদিকে দুর্ভিক্ষ। পশুপাখি, জন্তু-জানোয়ার কেটে লোকে খেয়ে নিচ্ছে। এমন সময় দেশের পুরোহিত সম্রাটকে বললেন, চৈনিকদের স্বর্গের দেবতা ‘সাংটি’-র পূজা করতে। আর যে সে পূজায় সাংটি খুশি হবেন না। নররক্ত চাই। রাজা মেনে নিলেন এবং আয়োজন করতে বললেন। বলির দিন রাজা বললেন প্রজাকে নয়, ‘নিজেকে বলি দেব’। আদেশানুসারে রাজাকে যূপকাষ্ঠে মাথা গলিয়ে দিতে সাহায্য করলেন সেপাইরা। রাজা নিজেই নিজের বলির আদেশ যেই দিয়েছেন খাঁড়া নামার সময় তুমুলভাবে বৃষ্টি নামলো। রীতিমতো ঝড় উঠলো। বলা হয় রাজার আত্মত্যাগে দেবতা সাইটি প্রসন্ন হয়েছিলেন। রাজা প্রাণে বাঁচলেন।”

পল্লবী মুখে বিস্ময় নিয়ে বলল, “যাক একজন ভালো রাজা পেলাম এতদিনের ইতিহাসে।”

রাঘব সহ পুরো ক্লাস জোরে হেসে উঠলো।

“এরকম কত উদাহরণ আছে রে মেয়ে, সব কি আর ইতিহাস লিখতে পেরেছে? না আমরা বলতে পারবো কোনোদিন!”

এবারেও সবাই মাথা নাড়ে বিজ্ঞের মতো।

“তবে কি জানো সবাই, প্রাচীন চীন দেশের নরবলি ইতিহাসটা অদ্ভুত। রীতি-নীতিও অন্যান্য প্রায় সকল দেশের থেকে অদ্ভুত। কারণ, ধরন না হয় বাদই দিলাম। এই যেমন প্রাচীন চিনের মৃৎশিল্প তখন পৃথিবী বিখ্যাত। আর সেই শিল্পীরাই কিনা ফ্যাক্টরির নতুন চুল্লিতে আগুন দেবার আগে অগ্নিদেবতার জন্য একটা শিশুকে বলি দিতো! মানে যাদের জন্য খেলনা বানাবে সেই বাচ্চাগুলোকেই বলি দিয়ে দিতো সেই পাষাণ শিল্পীগুলো। উফ ভাবা যায়!”

ক্লান্ত রাঘব চেয়ারে ধপ করে বসে ঢকঢক করে জল পান করলেন। রিশান এগিয়ে গিয়ে বলল, “শরীর ঠিক লাগছে তোমার?”

সম্বোধনে বোঝা গেল ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছে।

“হ্যাঁ রে। ক্লাসে এসেই তো বকবক শুরু করি। সকাল থেকে একটু দুর্বল লাগছে আজ। তাই একটু বসে পড়লাম। ক্লান্ত লাগছে।”

“আজ না হয় থাক। অনেকটাই তো পড়লাম আমরা।”

“তা কী করে হয়? সিলেবাস টানতে হবে না? পাকামি না করে বেঞ্চে গিয়ে বোস।”

রিশান অগত্যা ফিরে আসে। আশেপাশের বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে সব ঠিক আছে কিনা। উত্তরে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে রিশান। মিনিট কয়েক পরেই আবার ইঞ্জিন শুরু করেন রাঘব, “যেখানে আমরা দেখেছি যে দেবতার উদ্দেশে পশু-পাখির বলি নানা দেশে হয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে- সেখানে। চীনে পশু-পাখির উদ্দেশে নরবলি হয়েছে শুনলে খুব অবাক লাগে।”

“কী?” পুরো ক্লাস বিস্ময়ে ফেটে পড়ে!

“হুম! পশু-পাখিদের দেবতা জ্ঞানে পূজা করা চৈনিকদের আদিম রীতি। এই যেমন কুকুর, কুকুরের মূর্তির সামনে চিনারা নরবলি দিয়ে কুকুরের কৃপা ভিক্ষা করতো। অদ্ভুত!”

শেষেরটা স্বগতোক্তি করেন রাঘব।

“আরও একটি অস্বাভাবিক প্রথার প্রমাণ ইতিহাসে আছে। প্রাচীন চৈনিকদের ধারণা ছিল মৃত্যুর পর মৃতের আত্মা আবার তার দেহে প্রবেশের চেষ্টা করে। তাই তার মৃত্যুর পর কিছুদিন সেই মৃতদেহ বাড়িতে রেখে দিত। কবর দিতো না কিংবা পুড়িয়েও ফেলতো না। তারপর বাড়ির ছাদ বা সেরকম উঁচু কোনো জায়গায় গিয়ে বুক চাপড়ে আর্তনাদ করে কান্নাকাটি করতো। এর মাঝের কিছুদিন তারা উপবাসে কাটাতো, ঘাসের বা খড়ের বিছানায় শুতো। কিন্তু যখন মৃত ব্যক্তি জেগে উঠতো না তখন শুরু হতো দ্বিতীয় পর্ব। বিশাল এক কবর খোঁড়া হতো। তাতে পোশাক-পরিচ্ছদ, খাবার সমস্ত কিছু রেখে দেওয়ার পর মৃতদেহকে শুইয়ে দেওয়া হতো সেই কবরে। মৃতের পাশে চিরাচরিত নিয়মে স্ত্রী, রক্ষিতা, ভৃত্য প্রভৃতিদের রাখা হতো। জীবন্ত কবর দেওয়া হতো তাদের। এও তো একপ্রকার বলি প্রথাই।”

| “স্যার, মাথা বোঁ বোঁ করছে এসব শুনে। এ কীরকম ইতিহাস স্যার!” শাক্য কথাটা বলে। অনেকেই সমর্থন জানায়।

রাঘব বলেন, “এর তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস সরলীকৃত। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের তীরে গড়ে উঠা মেসোপটেমিয়া বা ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় ‘বল’ দেবতা মানে পাতি হিন্দুমতে আমাদের শিব ঠাকুরের পূজায় নররক্ত ছিল প্রধান উপাচার। এছাড়া তাদের যুদ্ধ দেবতা আলাউজ্জা যার অর্থ শুকতারা, তার উদ্দেশে যুদ্ধবন্দিদের বলি দেওয়া হতো। এমনকী ইয়োরোপের ইতিহাস পড়লেও সেই গ্রিকদের মিনোতার দেবতার কথাই পাওয়া যায়। তবে সেখানে দুটো অদ্ভুত নরবলির বিবরণ ইতিহাসে মিলেছে।”

অনিন্দ্য জিজ্ঞেস করে, “কীরকম স্যার?”

“বলছি। সুইডেনের আকশালা শহরে নাগরিকরা ভাগ্যদেবতার উদ্দেশ্যে একযোগে নয়টা নরবলি দিতো। বলির পর সেই কাটা নরমুণ্ডুগুলোকে রাজপথের গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিতো। এতে নাকি শহরের সবার উপর আশীর্বাদ বর্ষিত হবে বলে ধারণা ছিল তাদের। আর দ্বিতীয়টার উল্লেখ পাই, যত দূর মনে পড়ে জুলিয়াস সিজারের ইয়োরোপ অভিযানের বিবরণে। ফরাসি, জার্মানরা ভৌতিক দেব-দেবীর উদ্দেশে নরবলি দিতো। এরকম আজব ঘটনা গোটা পৃথিবীতে দুটি নেই।

এবার আসি আমেরিকায়। এটা দিয়েই নরবলির বিশ্ব ভ্রমণের ক্লাস আজ শেষ করবো। মাঝে মাঝেই আমরা হৃদয়বিদারক শব্দটা শুনতে পাই, আজ তোমাদের এই শেষ গল্পে হৃদয় উত্তোলনের ঘটনা শোনাবো। বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় প্রথা অনুসারে নরবলির যে বিধান, তাতে প্রাচীন আমেরিকা অন্যতম। এই প্রাচীন আমেরিকাতেই মায়া, ইনকা, আজটেক ইত্যাদি সুসভ্য জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই আজটেক জাতি ‘কর্নাটিকি’ নামক এক দেবতার আরাধনা করতো। কর্নাটিকি খ্রিস্ট ধর্মের বহু পূর্বেই আমেরিকানদের উপাস্য ছিল, কারণ কর্নাটিকি অর্থ সূর্য। বছরে প্রায় বিশ হাজারের বেশি নরবলির উল্লেখ পাওয়া গেছে মেক্সিকো অঞ্চলের আজটেক জাতির ইতিহাসে। আর কীভাবে সেই নরবলি? দেবতার পূজার অর্ঘ্যে দেওয়া হতো জীবন্ত মানুষের তাজা, রক্তে ভেজা দপদপ করতে থাকা হৃৎপিণ্ড। মুরগির দোকানে সদ্য কাটা মুরগি ছাল ছাড়ানোর পরে যেভাবে পেশি সঙ্কোচন-প্রসারণ ঘটায়, সেই হৃৎপিণ্ডেরও সেভাবেই সঙ্কোচন-প্রসারণ ঘটতো। তা দিয়েই পূজা হতো ‘কর্নাটিকি’-র। পাথরের ছুরি দিয়ে স্বয়ং পুরোহিত জীবন্ত মানুষকে কুপিয়ে কুপিয়ে তাজা হৃৎপিণ্ডটা বের করতো। সে এক মারাত্মক দৃশ্য! কোনো ঢাক-ঢোল কিছু বাজতো না, শুধু মানুষটার আর্তনাদ শোনা যেতো। হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলার পর মৃতদেহ বুকে এক গর্ত রক্ত নিয়ে পড়ে থাকত ‘কর্নাটিকি’র সামনে।”

“বিশ হাজার! এত লোক?”

পল্লবীর প্রশ্নে রাঘব শুধু একটি কথাই বলেন, “এটা বছরের হিসাব। তবে সংখ্যায় আশ্চর্য যদি হতে চাও তবে সে ঘটনা প্রাচীন আমেরিকার ‘হুইজী লোপকটলী’ নামক এক যুদ্ধের দেবতার মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বলতে পারি। মন্দিরটা এখনও আছে আমেরিকার চিচেন ইৎজা নামক জায়গায়। পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মন্দির। শোনা যায় এই আজটেকরাই এই মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন একদিনে সত্তর হাজার যুদ্ধবন্দিকে বলি দিয়েছিল। আবার বলছি, সত্তর হাজার!”

রাঘব ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে গেলেন। ছাত্ররা বিহ্বল হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। কেন স্যার আজ এসে চুপচাপ ছিলেন, এতক্ষণে সবাই হয়তো একটু অনুভব করতে পারছে। এরকম এক ইতিহাস পড়াতে গেলে যে মানসিক দৃঢ়তা দরকার তা মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য নিজস্ব এক অপার্থিব আবেশে নিয়ে নেয়। এত এত বলির কাহিনি একদিনে আর নেওয়া যাচ্ছে না। কেউ কারোও সঙ্গে কথা বলল না আস্তে আস্তে সবাই বেরিয়ে গেল। লাইট নিভিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

কলেজ ছুটির পর রিশান বাইরে অপেক্ষা করছে রাঘবের জন্য। পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে রাঘব রিশানের সামনে এসে থামালেন। সকালের থেকে এখন অনেক বেশি প্রাণবন্ত লাগছে তাকে। যেন ক্লাস শেষ করে ক্লান্তি ঝরেছে অনেকটা। রিশানের ভালো লাগলো। গাড়িতে উঠে বসলো সে।

“ঘটিগরম খেতে ইচ্ছে করছে। কোথায় যাওয়া যায় বল।”

রাঘবের এ হেন প্রশ্নে আমোদ পেলো রিশান। সে বলল, চলো কোনো পার্কে যাই। সেখানে ঘটিগরম থাকবেই।”

“বেশ, চল। একটু লং ড্রাইভ করে কোনো পার্কে যাই।”

“তাহলে ইকো পার্ক সেরা। রাস্তাও বেশ অনেকটা।”

“চল তাহলে।”

স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলেন রাঘব। সাউথ কলকাতা থেকে বিকেলের দিকে মা ফ্লাইওভার দিয়ে আসাটা একটা দারুণ ব্যাপার। আর আকাশে মেঘ করে থাকলে তো কথাই নেই। পেছনে পড়ে থাকে বাইপাসের সব নামী রেস্তোরা, জিম এবং বারগুলো। স্কাই রাইজ দেখতে দেখতে ফ্লাইওভারের মখমল রাস্তায় চার চাকা যেন মাখনের মতো এগিয়ে যায়। বেশি রাতের কলকাতাতে এই দৃশ্য আরও জমাট বাঁধে।

“দুটো ঘটিগরম দিন।”

মাদার ওয়েক্স মিউজিয়ামের উল্টোদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে রিশান ও রাঘব। না, কথা বেশি বলছে না, দৃশ্যই দেখছে বেশি। গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে ইকো পার্কের গেটের মুখে এসেই ঘটিগরমওয়ালাকে পেয়ে গেছিলেন রাঘব। তাই আর ভেতরে ঢোকেনি তারা। বাইরে দাঁড়িয়েই খাচ্ছে। ঘটিগরম খেতে খেতেই রিশান জিজ্ঞেস করে, “রাজবাড়ি নিয়ে কিছু ভাবলে?”

“ভেবে কী করবো? খুঁজে বের করাটাই কাজ। এ শহর বিরাট, কোথায় কোন রাজবাড়ি আছে সব কি জানা সম্ভব? তুই-ই বল।”

“আমাদের ত্রিপুরা হলে দু’দিনে পেয়ে যেতাম। আগরতলা হলে তো একদিনেই…।”

আবার চুপচাপ। হাতের ঠোঙাটি মাটিতে ফেলে আরেকটা ঠোঙা অর্ডার করলো রিশান।

“বাবু, যেখানে সেখানে কাগজ ফেলবেন না। সরকারের নিষেধ। তুলে নিন মাটি থেকে, আপনারই কাজে লাগবে।”

কীরকম ঝিম ধরা গলায় কথাগুলো বলে ঘটি গরমওয়ালা নতুন মিক্সচার বানাতে থাকে। কথার ঝিম ধরা ভাবটা রাঘবের খুব চেনা লাগে। আগে যেন কোথায় শুনেছেন। তারপর হঠাই তার মনে পড়ে, দান্তেওয়াড়াতে বৃদ্ধর বলা শেষ কিছু কথা।

এক মুহূর্তেই তিনি মনে করতে পারেন যে এভাবে কারা কথা বলেছিল। সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার এবং মন্দিরের গর্ভগৃহের লোকটা। আর মনে করতে পারার সঙ্গেই সঙ্গেই মাটিতে বসে রিশানের ফেলা কাগজটা খুঁজতে থাকেন রাঘব। বেশি খুঁজতে হয় না। কাছেই পড়ে ছিল। আর কাগজটা হাতে তুলে উল্টো পিঠ খুলতেই চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায় রাঘবের। মুখ হা করা। অবস্থাতেই থেকে যায়। রিশান ততক্ষণে নতুন ঠোঙা হাতে এসে দাঁড়িয়েছে।

রাঘব ওদিকে চেয়ে দেখলো, ঘটিগরমওয়ালা আর নেই সেখানে। রিশানের দিকে এগিয়ে দিলেন কাগজটা।

একটা বিজ্ঞাপন, উত্তর কলকাতার সন্নিকটে এক পুরোনো রাজবাড়ি কিনে নিতে চলেছে বর্তমান সরকার। রাজবাড়ির ছবি দেওয়া আছে পত্রিকায়।

ছবিতে সিংহদুয়ারের স্পষ্ট দুটো সিংহ-একটার রঙ সোনালি, অন্যটা মিশমিশে কালো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *