অধ্যায় ১
“মহারাজ, মহারাজ! মা দন্তেশ্বরী আজ ছাগরক্তে সন্তুষ্ট নন, মা নররক্ত চাইছেন।”
সুভদ্র মহারাজের কক্ষের বাইরে দাড়িয়ে কথাটা জানালেন। এই কথায় বিন্দুমাত্র উদ্বেগ ছিল না, ছিল পাশবিক মনোবাঞ্ছা-যেন সুভদ্র তথা সমগ্র বস্তারবাসী আজ নররক্তের জন্য জিভ বের করে অপেক্ষা করছে। কিন্তু কক্ষের ওপার থেকে মহারাজের উত্তর এলো না।
সুভদ্র আবার ডাকেন, “মহারাজ? মহারাজ!”
এবার উত্তর আসে, যুদ্ধবন্দিদের তৈরি করো। কণ্ঠ ঈষৎ স্খলিত, বোঝা যাচ্ছে মহারাজ এখন মাদকে আচ্ছন্ন।
সুভদ্র উত্তর দেয়, “যথা আজ্ঞা মহারাজ।” সুভদ্রের মনের ইচ্ছা যেন পূর্ণ হলো। সে সহাস্যে বিদায় নিতে যাবে, ঠিক তখনই মহারাজ আবার বললেন, “তিন জন চাই, বলির আগে তিনজন চাই।”
সুভদ্র আর প্রশ্ন করলেন না, মুখে ‘যথা আজ্ঞা’ বলে অভিবাদন জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কারাবাসে যুদ্ধবন্দিদের তৈরি করার আদেশ দিয়ে নিজে ঘোড়ায় চাপলেন। বলির আগে তিনটে কুমারী যোনির ব্যবস্থা করতে হবে তাকে। মহারাজ আগে তাদের রক্তাক্ত করবেন।
ঘোড়া ছোটার শব্দ সেভাবে শোনা গেল না। রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে মা দন্তেশ্বরীর মন্দির। একান্ন পিঠের এক পিঠ এই মন্দির। সতীর দাত পড়েছিল এই অঞ্চলে, সেই থেকে মা দন্তেশ্বরী। বর্তমানে সেখানে প্রচুর লোক সমাগম। অন্তত জনা একশো তো হবেই, আর সবাই রাজার বিশেষ অনুগত। নইলে আজ এখানে আসার সাহস কেউ দেখাতো না। বর্তমানে এক এক করে ছাগ বলি হয়ে চলেছে মন্দির প্রাঙ্গণে। ঢাক বাজছে, চামর দুলছে দেবী প্রতিমার সামনে। দেবীর সে কী ভুবনমোহিনী রূপ! আজ নতুন বস্ত্র, নতুন অলঙ্কারে ভূষিতা রাজনন্দিনী মা দন্তেশ্বরী। মহারাজের একান্ত প্রিয় এই দেবী, দেবীকে তুষ্ট করতে হেন কাজ নেই মহারাজ করতে পারেন না। দেবীও তার ভক্তের সমস্ত মনোবাসনা পূরণ করে চলেছেন এক এক করে। কিছুদিন হলো পার্শ্ববর্তী দুই রাজ্য জয় করে ফিরেছেন মহারাজ। আর তাই আজ কুলভূষণা দেবীর আকণ্ঠ রক্তপানের এ ব্যবস্থা। দেবীকেও তো খুশি করতে হবে!
আর খুশি করতে গিয়েই মন্দিরের নাটমন্দিরের এক পাশে শোভা পাচ্ছে জবামালা শোভিত কয়েকশো ছাগ মুণ্ডু। প্রতিটার জিভ বেরিয়ে আছে, ঠিক যেমন জিভ বেরিয়ে থাকে মা কালীর।।
ঘোড়া এসে থামলো রাজপ্রাসাদের সামনে। তা থেকে নামলেন সুভদ্র। তার পেছন পেছন আরও তিনটে ঘোড়া, প্রতিটায় একজন ঘোড়সওয়ার এবং একজন করে মেয়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনজনই কুমারী এবং প্রত্যেকের সতীচ্ছদ অটুট নিশ্চিত হয়েই তাদের মহারাজের সামনে আনা হয়েছে। কীভাবে নিশ্চিত হয়েছেন সুভদ্র? সে প্রশ্ন বাহুল্য মাত্র।
তিনি এগিয়ে চললেন মহারাজের কক্ষের দিকে, পেছনে তিন কুমারীকে নিয়ে তিন পেয়াদা। মন্দির থেকে ভেসে আসা বাদ্যের শব্দ এত বেশি যে, তা ছাপিয়ে মেয়েগুলোর চিৎকার শোনার কোনো উপায় নেই। বরং বাদ্যের শব্দে এটা বোঝা যাচ্ছে, মন্দিরে বোধহয় এবার একত্রে তিনটে করে ছাগ বলি শুরু হয়ে গেছে। রক্তের গন্ধ আর কিছু সময় পর এখানে চলে আসবে। আহ! সে কী সুবাস!
সুভদ্র ডাকলেন, “মহারাজ, মহারাজ…”।
শুরুতে এবারও উত্তর এল না। সুভদ্র আবার ডাকতে যাবেন এমন সময় উত্তর এলো, “ভেতরে পাঠিয়ে দাও, সবাইকে একসঙ্গে।”
মহারাজের কণ্ঠে আরও নেশা জমেছে।
সুভদ্র আজ্ঞাবাহী দাস হয়ে দরজার এক কপাট খুলে তিন কুমারীকে ভেতরে যেতে নির্দেশ দিলেন। প্রথমে নম্রভাবে এলো সে নির্দেশ। কিন্তু তাতে ফল না হওয়ায় কোমরের তলোয়ারে হাত দিতে হলো। ময়ান থেকে তলোয়ার অর্ধেক বের না হতেই কাজ হলো ওষুধের মতো। তিন কুমারী রাজকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো।
তলোয়ার পুনরায় খাপে ফিরিয়ে নিলেন সুভদ্র, কক্ষের দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হলেন। এই ফুাঁকে যে দৃশ্য তার চোখে পড়লো, তাতে সুভদ্রের মতো ধুরন্ধর যুদ্ধবীর পর্যন্ত কিছুক্ষণের জন্য ঘাবড়ে গেলেন। এতক্ষণ ধরে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করা কুমারীরা যে এ দৃশ্যে ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক।
মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ বসে আছেন তার বিলাসবহুল সিংহাসনে, সামনে সুরাপাত্র গড়াগড়ি খাচ্ছে। মহারাজের কটিদেশ কেবল আধহাত কাপড়ে আবৃত, দেহ উলঙ্গ। মহারাজ আজ চুল বাঁধেননি। খোলা কেশরাশি বলিষ্ঠ কাঁধ বেয়ে নেমে এসে চিবুক ছুঁয়েছে। যে কক্ষে তিনি আছেন, সে ঘরে আলো কমিয়ে রাখা হয়েছে, অদ্ভুত হালকা এক সোনালি আভা ঘর জুড়ে বিচরণ করছে। মহারাজের এই দেহ, এই রূপ যে কোন নারী মন উদ্বেল করতে পারে, তাই কুমারীরা যে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু এই রূপবান, সোনালি আলোময় ঘরের মালিক সুরাসক্ত অনাবৃত পুরুষটা যখন রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট একজন মহারাজ স্থানীয় লোক হন এবং সেই মহারাজের এক হাত তার গোঁফে, অন্যটি তার পোষা কালো চিতার গায়ে বিলি কাটে-তখন কামের নয়, ভয়ের উদ্রেক হয়।
সুভদ্র আর এই দৃশ্য দেখতে পারলেন না। কক্ষের কপাট যখন বন্ধ করলেন, তখন মহারাজের শেষ কথাটি কানে এল। কুমারীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলছেন, “কাছে এসো, আমায় অনাবৃত করো।”
আর কিছু শুনতে চাইলেন না সুভদ্র। কারাবাসের দিকে যাত্রা করলেন তিনি।
সুভদ্র যখন কারাবাসে পৌঁছালেন ততক্ষণে তার আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কারাবন্দিদের স্নান করানো হয়ে গেছে। বন্দিরা এখনও জানে না ঠিক কী কারণে রাত দশটায় তাদের তড়িঘড়ি স্নান করিয়ে নতুন জামা কাপড় পড়ানোর ফরমান এসেছে। এমনিতেই এরা সবাই যুদ্ধবন্দি, কিছু বলার বা করার ক্ষমতা সেদিনই লোপ পেয়েছে যেদিন তাদের মহারাজা যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছেন। দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ যেদিন তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্য আক্রমণ করেন, সেদিনই তারা হয়তো এই দিনটির জন্য মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন। তাই আজ দেয়াল লিখন স্পষ্ট হতে দেখেও কারো মুখে কোনো প্রশ্ন নেই।
সুভদ্র বিনা বাক্যব্যয়ে সমস্ত কাজকর্মের তদারকি করতে লাগলেন। সিপাহিদের আদেশ করলেন প্রত্যেক যুদ্ধবন্দির হাত পেছনে এনে শক্ত নারকেলের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলতে। তাদের পায়ে লোহার শেকল পরানোর আদেশ দিলেন আর মুখে তুলো ভরে তারপর কাপড় দিয়ে বাঁধতে বললেন।
আদেশ তামিল হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বুঝে সুভদ্র একবার মন্দির পরিদর্শন করতে বেরোলেন। বারোটা বাজতে খুব বেশি সময় বাকি নেই। সব কিছু সঠিকভাবে না হলে মহারাজ হয়তো এবার তার গর্দানই যূপকাষ্ঠে চড়িয়ে দেবেন। যদিও সুভদ্র ভালোই জানেন, তাকে ছাড়া মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের প্রতাপ অর্ধেক কমে যাবে। বঙ্গদেশের একজন রাজার পক্ষে বস্তার রাজ্য সামলানো কোনোদিন সম্ভব হতো না, যদি না তার কাছে সুভদ্রের মতো সুচতুর একজন মন্ত্রী থাকতো।
রাজ্যবাসীর খাজনা আদায় থেকে, জমিদারদের সঙ্গে বিভিন্নরকম ঝামেলা, মামলা-মোকদ্দমা এমনকী ইংরেজদের সঙ্গে সমস্ত বোঝাপড়াও এই সুভদ্র সামলায়। মহারাজাও অবশ্য শুধু নামকাওয়াস্তে নন। ওই যে শুধু অর্ধেক কমে যেতো সুভদ্র না থাকলে, বাকি অর্ধেক মহারাজা নিজে। যেমন জ্ঞানী, তেমনই অত্যাচারী, তেমনই ধার্মিক- ঠিক তেমনই সকল ম-কারের ভক্ত।
সুভদ্র যখন মন্দিরে পৌঁছালেন, ততক্ষণে ছাগবলি শেষ। চারদিকে ছাগমুণ্ডু এবং ছাগরক্তের নেশাধরা গন্ধ। মায়ের ভোগের জন্য ছাগশরীরগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দির সংলগ্ন ভোগ-রান্নার ঘর থেকে ছুটে আসবে ছাগমাংসের গন্ধ। মিলেমিশে একাকার হবে রক্তের সুতীব্র সুবাসের সঙ্গে। আগামীকাল দেবীর এই প্রসাদ গ্রহণ করবে সমস্ত বস্তারবাসী।
পুরোহিত আবার বলিষ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণে মা দন্তেশ্বরীর পুজো শুরু করে দিয়েছেন। চারদিক ধূপের ধোঁয়ায় পূর্ণ। একজন নেচে নেচে আরতি করে চলেছেন। হঠাৎ দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটা বঙ্গদেশ নয়, মধ্যপ্রদেশ।।
একদল ভক্ত জোড় হাতে মন্দিরের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত বছর পর আজ আবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত, যখন এই গোঁড়া রাজ্যে নরবলি হতে যাচ্ছে। বাছাই করা রাজপরিবারের অনুগতরা এই মুহূর্ত আজ উপভোগ করতে এসেছে। মন্দিরের মধ্যেই চলছে অবাধ সুরাপান। সবার চোখেই আজ রক্ত পিপাসা।
সুভদ্র দেখলেন ছাগবলি শেষে ছোট খড়্গটা মায়ের পায়ের সামনে রাখা হয়ে গেছে। সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। তন্ত্রধারীকে ডাকলেন, “অনেক দিন ধরে মা নররক্ত পান করেন না, মায়ের তৃষ্ণা এই ছাগরক্তে আর মিটছে না। আপনি মায়ের সাধের খড়্গটি বের করুন।”
কথাটি শুনে স্পষ্টতই তন্ত্রধারী কেঁপে উঠলেন। কিন্তু কোনো কথা বললেন না। তৎক্ষণাৎ পুরোহিতের কানের কাছে গিয়ে কিছু একটা বললেন। পুরোহিতের চোখ বন্ধ, হাতে রক্তজবা। মন্ত্র শেষ করে সেই জবাফুল মায়ের পায়ে নিক্ষেপ করলেন তিনি। তারপর আসন ছেড়ে উঠে সুভদ্রের সামনে এলেন। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি এই বলি বিষয়ে আগে অবগত ছিলেন না। যদিও বাইরে উপস্থিত ভক্তরা সবাই আজ এসে ভিড় করেছে বলি হবে জেনেই। তার মানে অনুগতদের বাইরে এই খবর রটানো হয়নি। পুরোহিত সুভদ্রকে বললেন, “আপনার আমাকে আগে জানানো উচিত ছিল।”
“সম্ভব ছিল না আচার্যমশায়। একান্ত অনুগতদের বাদ দিলে সবার থেকেই গোপন রাখা হয়েছিল। আর কী কারণে এই গোপনীয়তা তা আপনার থেকে ভালো কেই বা বলতে পারবে!”
আচার্যমশায় শুনলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে ঢাকের শব্দ এখনও থামেনি। এই কথোপকথন সুভদ্র এবং আচার্যমশায় ছাড়া আর কারো কর্ণগোচর হবার উপায় ছিল না।
আচার্যমশায় দৃপ্ত কণ্ঠে জানালেন, “বেশ! আমি তবে এই পূজা সম্পূর্ণ করতে পারব না।”
সুভদ্র শুনলেন এবং হালকা হাসলেন। তার গোফ এবং চোখ দুটোই চক্চক্ করে উঠলো এই কথা শুনে। যেন এই সব মুহূর্তের জন্যেই তার রাজ্যের প্রধান মন্ত্রীত্ব।
“আপনাকে আমি পূজো করতে অনুরোধ করছি না, রাজ-আদেশ শোনাচ্ছি মাত্র। যদি তার অন্যথা হয় তবে মা দন্তেশরীর ভোগে প্রথম নরমাংস আপনার হবে।
অত্যন্ত ঠাণ্ডাভাবে, ঝরঝরে বাংলায় কথাগুলো বললেন সুভদ্র। নাহ, এবার আর তলোয়ারকে ময়ানের বাইরে আনতে হল না। তার চোখের ধারেই আচার্যমশায়ের রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হল। তিনি ফিরে গেলেন আসনে, তন্ত্রধারীর হাতে তুলে দিলেন একটি চাবি। নরমাংসোৎসব উদযাপনের চাবি, যা এত বছর ধরে তার কাছে রক্ষিত ছিল।
সুভদ্রের তত্ত্বাবধানে তন্ত্রধারী চললেন নিকটবর্তী অস্ত্রশালায়, যেখানে দেবীর সজ্জার সমস্ত অস্ত্র এবং এত বছরের মন্দিরের ইতিহাসের সমস্ত অস্ত্র রক্ষিত আছে। আজ সেই ঐতিহাসিক অস্ত্রাগারের সবচেয়ে বড় ঘাতক আবার মুক্তি পাচ্ছে। চন্দ্রহাস মুক্তি পাচ্ছে!
সিপাহি সুভদ্রকে আসতে দেখেই অভিবাদন জানালো এবং তার ইঙ্গিতে অস্ত্রাগারের লোহার দরজা খুলে দিলো। ভেতরে প্রবেশ করলেন সুভদ্র, সঙ্গে এলেন তন্ত্রধারী। মা দন্তেশ্বরীর পূজার কোনো অস্ত্র বা খড়্গ ব্রাহ্মণ ছাড়া একমাত্র রাজা স্পর্শ করতে পারবেন, তাই তন্ত্রধারীর আগমন।
অস্ত্রাগারের ভেতরে নিকষ অন্ধকার। অমাবস্যা যেন বাসা বেঁধেছে এই সেখানে। সুভদ্র সিপাহির থেকে মশাল চেয়ে নিলেন।
নরবলির জন্য নির্দিষ্ট অস্ত্রের লোহার প্রকোষ্ঠ খুঁজে পেতে সময় লাগলো । সুভদ্র অধৈর্য হয়ে বললেন, মুক্ত করুন চন্দ্রহাসকে।
তন্ত্রধারী আর দেরি করলেন না, লোহার জং ধরা প্রকোষ্ঠের গর্তে চাবি দিয়ে মোচড় দিতেই উন্মোচিত হতে লাগলো প্রকোষ্ঠ। আর এক পলকেই কক্ষের অমাবস্যা পূর্ণিমায় পরিবর্তিত হল। এতদিনের অব্যবহারে আগের চেয়ে কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়তো, তবু সুভদ্রের হাতের আলোয় ঝলমল করে উঠলো চন্দ্রহাস। তা দেখে সুভদ্রের মুখের ঔজ্জ্বল্য কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
বিপুল ওজনের চন্দ্রহাসকে কোনোক্রমে তুলে নিলেন তন্ত্রধারী এবং সুভদ্রকে নিয়ে আবার মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
মন্দিরে পৌঁছে আচার্যমশায়ের হাতে তুলে দেওয়া হলো বহু নররক্তে স্নান করা চন্দ্রহাসকে। এতদিন পর আবার আজ তার তৃষ্ণা নিরসন হবে। চন্দ্রহাসের অঙ্গসজ্জা প্রয়োজন, প্রয়োজন ঝালাইয়ের, প্রয়োজন উপযুক্ত পূজার। তাই আচার্যমশায় নিয়ে গেলেন চন্দ্রহাস তলোয়ারটি।
আগামী কিছু সময় সুভদ্রের এ মন্দিরে কিছু করার নেই। ইতিমধ্যে নারী রক্তে স্নান হয়ে যাবার কথা মহারাজের। রাজমহলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন তিনি।
আজ অনেক পরিশ্রম যাচ্ছে, তবু নররক্তের কথা মাথায় এলেই যেন দেহে কী রকম উত্তেজনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার। যে যাই বলুক, মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের পরিবারের একান্ত অনুগত সুভদ্র তথা তার পূর্বপুরুষেরা। সেই হিসেবে রাজপরিবারের ইষ্টদেবতা তাদেরও ইষ্টদেবতা। সেই দেবতার তুষ্টির জন্য, মায়ের এতদিনকার পিপাসা নিবৃত্তির জন্য এইটুকু পরিশ্রম যদি সে আজ না করতে পারে, তবে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী লাভ হলো!
রাজমহলে যখন পৌঁছালেন, তখন মহল খাঁ-খাঁ করছে। একজন চাকরও আর অবশিষ্ট নেই। সবাই গিয়ে জুটেছে মন্দিরে। পরিবারের আর সকল সদস্য বর্তমানে বাংলায় আছে। মহলে দুজন পেয়াদা সিংহদুয়ার আগলে পাহারা দিচ্ছে। সুভদ্রকে আসতে দেখেই অভিবাদন করলো তারা। সুভদ্র ঘোড়া থেকে নেমে সোজা ভেতরে ঢুকে গেলেন। আর ঢুকতেই শব্দটা শুনতে পেলেন। তীক্ষ্ণ, তীব্র শীৎকারের শব্দ।
সুভদ্র ঠিক করলেন কিছু সময় বাইরে কাটাবেন। শব্দ বন্ধ হলেই মহারাজকে ডাকবেন। মহারাজের কক্ষের অনতিদূরে বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি। শীৎকার বাড়তে লাগলো এবং মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ যে তিন কুমারীর উপর প্রভাব খাটাচ্ছেন, সেটা সুভদ্র বাইরে থেকেও বুঝতে পারছিলেন। এই অবস্থায় স্থির থাকা কতটা শক্ত এই পরিস্থিতিতে যিনি পড়েছেন তিনিই জানেন। কিন্তু সুভদ্র নিশ্চল রইলেন এবং ততক্ষণ অপেক্ষা করলেন যতক্ষণ না মহারাজের চরম মুহূর্ত উপস্থিত হয়। শূন্য রাজমহল মহারাজ এবং তিন কুমারীর বীভৎস চিৎকারে এবার কেঁপে উঠলো। মন্দিরের ঢাকও সে শব্দ চেপে রাখতে পারলো না। সিংহদুয়ারের সিপাহিরা একে অপরের দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো মাত্র।
এবার সুভদ্র সময় নিলেন না। “মহারাজ, সময় প্রায় উপস্থিত।”
প্রতাপ নারায়ণ ডাকলেন, “ভেতরে এসো।”
সুভদ্র একবার চোখ বন্ধ করে স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে আনলেন এবং পরক্ষণেই কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, মহারাজ একটি মখমলের কাপড়ে নিজের যৌনাঙ্গ পরিষ্কার করে নিজেকে আবৃত করছেন। তিন কুমারী প্রায় অচৈতন্য এবং অনাবৃত অবস্থায় কক্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে এবং ঈষৎ হলুদাভ চোখ নিয়ে মহারাজের পোষ্য কালো চিতাটি তাদের শরীরের গন্ধ শুঁকছে।
“সুভদ্র, তুমি এদের শোণিত একটি পাত্রে সংগ্রহ করো। আমি তৈরি হয়ে আসছি।”
মহারাজের কণ্ঠ আর স্থলিত নয়। আদেশ দিয়ে তিনি কক্ষের বাইরে চলে গেলেন।
সুভদ্র পড়লেন মহা সংকটে। যে কাজ এখন মহারাজ করতে বলেছেন, সে কাজ আজ অবধি তিনি করেননি। পূর্বপুরুষদের এ কাজের গল্প শুনেছেন মাত্র।
অগত্যা তিনটি শুদ্ধ পাত্র জোগাড় করলেন এবং তিন কুমারীর যোনিনিঃসৃত সংগ্রহ করতে লাগলেন। স্রোত এতটাই ছিল যে কাজে অসুবিধে হলো না। এই স্রোত গত দেড় ঘণ্টায় অত্যাচারের পরিমাণ সূচক হিসেবেই জানান দিচ্ছিলো।
কিছু সময়ের মধ্যেই মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ তৈরি হয়ে কক্ষে এলেন।
“সুভদ্র, শোণিত সংগ্রহ করেছ?”
“আজ্ঞে মহারাজ।”
“বেশ, তুমি মন্দিরে যাও এবং কারাবাস থেকে যুদ্ধবন্দিদের মন্দিরে নিয়ে এসো। দ্বিপ্রহর হতে আর বেশি বাকি নেই।”
“যথা আজ্ঞা মহারাজ!”
কথা শেষ করে সুভদ্র কক্ষ থেকে বেরোতে উদ্যত হলেন। মহারাজ তাকে পেছন থেকে একবার ডাকলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো উপদ্রব নেই তো?”
সুভদ্র এক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দিলেন, “না মহারাজ। কাকপক্ষীও জানতে পারেনি, এমনকী আচার্যমশায় ঘণ্টাখানেক আগে জেনেছেন।”
মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তবু আরেকটি প্রশ্ন করে থাকতে পারলেন না, “আর চন্দ্রহাস?”
এবার সুভদ্রের মুখে হাসি ফুটলো, “আপনার হাতের স্পর্শের অপেক্ষায় আছে চন্দ্রহাস। নরঘাতকের পূজা শুরু হয়ে গেছে।”
মহারাজা এবার অট্টহাস্য করে উঠলেন। সুভদ্রও সেই অট্টহাস্যে যোগ দিলেন। তারপর আঙুল হেলিয়ে সুভদ্রকে যাবার অনুমতি দিলেন মহারাজ।
সুভদ্র যাবার সময় সিপাহিদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন, “মহারাজ কিছুক্ষণের মধ্যে মন্দিরে যাবেন। তোমরা তৈরি থেকো । আর মহারাজ মন্দির থেকে ফেরার আগে ভেতরে যে তিন জন কুমারী আছে, তাদের হাতে ন্যায্য পাওনা দিয়ে গ্রামে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবে।”
সিপাহিরা আদেশ পালনে উদ্যত হলো।
সুভদ্র কারাবাসে খবর পাঠালেন যুদ্ধবন্দিদের মন্দিরে নিয়ে আসার জন্য। এরপর মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তিনি।
যখন সুভদ্র মন্দিরে পৌঁছালেন, তখন দ্বিপ্রহর হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। আধ ঘণ্টার মতো বাকি। চন্দ্রহাসের পূজাও শেষ লগ্নে। ইতিমধ্যে ঝালাই সম্পূর্ণ হয়েছে, চন্দ্রহাস তার আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। প্রায় ছয় ফুট লম্বা এই অস্ত্র । হাতলে সাধারণ তলোয়ারের মতো ধরার বাট বর্তমান। প্রায় প্রথম তিন ফুট পর্যন্ত এই চন্দ্রহাস আর যে কোনো তলোয়ারের মতোই সোজা কিন্তু তারপর থেকেই অস্ত্রটি খাঁড়ার মতো বাঁকতে শুরু করেছে এবং শেষ পৌনে এক থেকে এক ফুট অঞ্চলে গিয়ে প্রকৃত খাঁড়ায় পরিণত হয়েছে। চন্দ্রহাসের বর্ণ কুচকুচে কালো। সুভদ্র তার বাল্যকালে প্রত্যক্ষ করেছেন, এই চন্দ্রহাসে যখন নররক্ত লাগে, এই তলোয়ার যেন কথা বলতে শুরু করে। এতই তার তেজ, এতই নির্মেদ টানটান শরীর তার। এর ফলার আঘাতে যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। চোখের পলকে নরমুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাবে, সে আর এমন কী!
আসনে বসানো চন্দ্রহাসের দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইলেন সুভদ্র। আচার্যমশায় যখন চন্দ্রহাসে সিঁদুর পরালেন, তখনই সুভদ্রের কানে কানে একজন সিপাহি এসে কী যেন বলল। সুভদ্রের সংবিৎ ফিরতেই তিনি দেখলেন, এক এক করে সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধবন্দিদের আনা হচ্ছে মন্দিরে। ঠিক যেভাবে সুভদ্র বলেছিলেন, সেভাবেই আনা হচ্ছে তাদের। প্রত্যেকেরই হাত বাঁধা, মুখে তুলো পুরে বাঁধা, পায়ে শেকল এবং মাথায় কালো কাপড় দেওয়া। ঢাকের শব্দ এবার বাড়তে লাগল। যুদ্ধবন্দিদের কোথায় দাঁড় করাতে হবে সেটা নির্দেশ করলেন সুভদ্র। বন্দিদের সার বেঁধে সেদিকেই দাঁড় করানো হল।
সময় দেখলেন তিনি। নাহ! আর সময় নেই। মিনিট দশেক। এখনও মহারাজ আসেননি। সুভদ্র ভেবে, মহারাজকে মন্দিরে আহ্বান জানানোর জন্য একজন প্রহরীকে ডাকলেন। কিন্তু তাকে যেতে হলো না। হাতির শব্দ পাওয়া গেল। মহারাজ হাতির পিঠে চড়ে আসছেন মন্দিরে।
কাছে আসতেই দেখা গেল হাতির পিঠে সাদা মখমল কাপড়ের ধুতি এবং উর্ধ্ব বস্ত্র পরে, গলায় মুক্তোর ছড়া নিয়ে, চুল খোঁপায় বেঁধে রাজ্যের সুদর্শন, সুপুরুষ মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ উপস্থিত হয়েছেন। তার প্রবেশের জন্য জনতা দু’ভাগ হয়ে তাকে ঢোকার জায়গা করে দিলো এবং জয়ধ্বনি তুলতে লাগলো।
মহারাজ হাতির উপরে বসেই হাত নেড়ে সবাইকে চুপ করতে বললেন। “আজ জয়ধ্বনি শুধু একজনের নামেই হবে। বলো, মা দন্তেশ্বরীর জয়।”
“জয়-য়-য়…!” জয়জয়কারে ফেটে পড়ল রাজার অনুগত জনতা।
মহারাজ হাতির পিঠ থেকে নেমে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। মা দন্তেশরীর সামনে গিয়ে মা’কে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। আচার্যমশায় তার মাথায় মায়ের আশীর্বাদধন্য জয় তিলক কেটে দিলেন।
“মহারাজের কল্যাণ হোক।”
মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আমরা কি এবার শুরু করতে পারি আচার্যমশায়?”
আচার্যমশায় কোন উত্তর দিলেন না, শুধু চেয়ে রইলেন মহারাজের দিকে। এ দৃষ্টির অর্থ বুঝেও বুঝলেন না প্রতাপ নারায়ণ। বজ্রকঠিন স্বরে বললেন, “আমি কি আবার একই প্রশ্ন করব আচার্যমশায়?”
না, এবার চুপ থাকার অর্থ নিজের প্রাণ সংশয়। আচার্যমশায় কোনমতে বললেন, “আপনি আদেশ করলেই আমি মন্ত্র পড়া শুরু করে দেবো।”
প্রতাপ নারায়ণ তার রক্তবর্ণ চোখ আচার্যমশায়ের চোখে রেখে হাসি মুখে বললেন, “আমাদের রাজ্যে নরবলির আদেশ পুরোহিত মশায় দেন। আপনি তো জানেনই। আপনার আদেশ ব্যতীত এ কাজ শুরু করা যায় না। আপনি দয়া করে আদেশ দিন।” বলেই জোড়হাতে আচার্যমশায়ের হাত দু’খানি ধরলেন মহারাজ। আচার্যমশায় সেই হাতের তাপে কেঁপে উঠলেন। কী ভীষণ গরম হাত দুটো। মহারাজ যে নরবলির উত্তেজনায় ভেতর থেকে উত্তেজিত, বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না অভিজ্ঞ আচার্যমশায়ের। সঙ্গে সঙ্গে হাত সবিনয়ে ছাড়িয়ে মন্দিরের বহু পুরোনো ঘণ্টায় প্রথা মেনে আঘাত করলেন এবং মুখে বললেন, “শুভায় ভবতু।”
মহারাজ এবার মুখে ক্রুর হাসি নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “মা দন্তেশ্বরীর জয়! জয় মা দন্তেশ্বরী!”
সুভদ্র সহ অন্য সকল অনুগত জয়ধ্বনিতে সামিল হলেন।
মহারাজ গায়ের মখমলের চাদর ফেলে দিলেন মাটিতে এবং দু’হাত বাড়ালেন আচার্যমশায়ের দিকে। পূজার আসন থেকে কালো, ধাতব চন্দ্রহাসকে তুলে রাজার হাতে দিলেন তিনি। প্রতাপ নারায়ণ চন্দ্রহাস হাতে নিয়ে তার বাটে দু’হাতের দশ আঙুল পুরে চোখ বন্ধ করলেন। আহ! এত দিনে যেন পূর্ণ শক্তিধর হলেন তিনি! চন্দ্রহাসের গা থেকে যেন অদ্ভুত দ্যুতি ঠিকরে বেরুচ্ছে। ঢাকের সঙ্গে সঙ্গত করে কাঁসর বাজতে লাগল এবার। মৃদঙ্গ-তাসা এসবও ধীরে ধীরে যোগ হলো।
মহারাজ চোখ খুললেন এবং যূপকাষ্ঠের দিকে এগিয়ে চললেন। সুভদ্রের ইঙ্গিতে সিপাহিরা একজন যুদ্ধবন্দিকে টানতে টানতে নিয়ে চললো সেদিকে এবং তার মাথা যূপকাষ্ঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো। সে বেচারা মুখের তুলোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও চিৎকার করতে পারলো না। তাকে ভালোভাবে বাঁধা হলো যূপকাষ্ঠে যেন কোনোভাবে চন্দ্রহাসের আঘাতে সে ছিটকে না পড়ে। দুজন সিপাহি শক্তভাবে তার পা বেঁধে দিলো যূপকাষ্ঠের অন্য প্রান্তে। জয়ধ্বনি ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। মহারাজ চন্দ্রহাস হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন তার প্রথম শিকারের জন্য।
এতো পৈশাচিক আনন্দের মধ্যেও মহারাজ তৃপ্ত হচ্ছেন না যেন। সুভদ্র সেটা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাকে ঠিক আনন্দিত মনে হচ্ছে না মহারাজ।”
“তুমি ঠিক ধরেছে। যুদ্ধবন্দির মুখের তুলো ফেলে দাও, মৃত্যুকালে ওর চিৎকার না শুনলে মা দন্তেশ্বরী তৃপ্ত হবেন না।”
সুভদ্রের চোখ চক্চক্ করে উঠলো। এই না হলে নররক্ত লোভী ঘাতকের মতো কথা। সাধে কি তিনি রাজ্যের মহারাজ। সুভদ্র তৎক্ষনাৎ আদেশ পালন করলেন। যুদ্ধবন্দির মুখ খুলে দেওয়া হলো, খোলা হলো চোখ। সে দেখতে পেলো তার বীভৎস করুণ অবস্থা, দেখতে পেলো তার চারদিকের উদ্দাম নাচ-গান, দেবী পূজার বহর, দেখতে পেল বেজে চলা ঢাক-মৃদঙ্গ-কাঁসর-ঘণ্টা-তাসাগুলোর পাগল করা কম্পন। এতদিন ধরে যে অত্যাচার কারাবাসে হয়েছিল, তা সমস্ত ইন্দ্রিয়কে অবশ করে দিয়েছিল। সেই সব ইন্দ্রিয় এবার জাগ্রত হলো এবং সে মৃত্যুভয়ে চিলচিৎকার জুড়লো। সে এক বিকট চিৎকার! এই চিৎকার তখনই আসে যখন কাউকে চারদিকে থেকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে যূপকাষ্ঠের সঙ্গে বেঁধে তার চোখের সামনে আরোও একশো বন্ধুকে মুখ বন্ধ অবস্থায় কালো কাপড়ে ঢেকে ফেলা হয়। দেবী পূজার নামে বলির উৎসব বসিয়ে মুখের সামনে চন্দ্রহাসরূপী কালদণ্ড দিয়ে সাক্ষাৎ যমরাজকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়।
মহারাজের মুখে এবার হাসি ফুটলো। তিনি এগিয়ে গেলেন তার শিকারের দিকে। দু’হাতে শক্ত করে চন্দ্রহাস ধরলেন এবং নরবলির মুদ্রায় গেলেন। ডান পা পেছনে এবং বাঁ পা উরু ভেঙে সামনের দিকে, চন্দ্রহাস মাথার উপর পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রির কোণ করে উঁচিয়ে ধরা রইলো। আচার্যমশায় জোরে জোরে মন্ত্র পড়তে লাগলেন এবং কুমারীত্রয়ের যোনিনিঃসৃত শোণিত কুলপুষ্পরূপে দেবীর পায়ের কাছে এবং যূপকাষ্ঠে নিবেদন করলেন। তন্ত্রধারী এবং সহযোগী যারা ছিল, তারাও সে মন্ত্রে যোগ দিলেন, ঢাক-কাঁসর শব্দের উচ্চতর গ্রাম অতিক্রম করল এবং সর্বোপরি যূপকাষ্ঠে বলি প্রদত্ত মানুষটি চিৎকার করতে করতে বোধহয় কণ্ঠনালি ছিঁড়ে ফেললো। আর তক্ষুনি আচার্যমশায় চিৎকার করে বলে উঠলেন,
“তৎ ক্ষমস্ব মহাভাগ, গান্ধর্ববং লোক মাপুহি।”
মন্ত্রটি শোনামাত্রই মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মা দন্তেশ্বরীর জয়ধ্বনি তুলে উপরে তুলে রাখা চন্দ্রহাস নীচে নামালেন। শক্তির দাপটে গলার মুক্তোর হার ছিটকে চারদিকে গড়াতে লাগলো।
মুহূর্তে খণ্ডিত হলো সে যুদ্ধবন্দির মুণ্ডু। দেহ ছটফট করতে লাগলো, সেই ছটফটানির সময় সবাই সমবেত সঙ্গীত ধরলেন বাদ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অচিরেই দেহের ছটফটানি বন্ধ হলো, কিন্তু সঙ্গীত চলতে
থাকলো। নরবলির পর এই সঙ্গীত গাওয়া বস্তারের রীতি।
যূপকাষ্ঠে রাখা ধড় থেকে রক্ত ফিনকি স্রোতে ছিটকে গিয়ে পড়লো মা দন্তেশ্বরীর পায়ে।
সঙ্গীতের তালের মধ্যেই পরবর্তী যুদ্ধবন্দি এসে উপস্থিত হলো যূপকাষ্ঠে। আবার একই নাটক, একই সংলাপ। আচার্যমশায়ের বলিষ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণ, শোণিত নিবেদন, তন্ত্রধারীর সমবেত মন্ত্রপাঠ, উচ্চতর গ্রামে বাদ্যের শব্দ, যূপকাষ্ঠে বন্দির আর্তনাদ এবং মহারাজের নরবলি মুদ্রায় চন্দ্রহাসের অবতারণ-ঠিক বন্দির ঘাড় চিরে, কণ্ঠনালি কেটে গলা বরাবর বেরিয়ে যাওয়া। আবার ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোনো এবং মায়ের পিপাসা তৃপ্ত হওয়া।
আগামী এক ঘণ্টা এভাবেই চললো মারণ উৎসব, ধর্মের নামে নরবলি । যুদ্ধ বন্দি এলো এবং চন্দ্রহাস তার এক আঘাতে তার প্রাণ হরণ করলো। নরমুণ্ডু জমা হল ছাগমুণ্ডের ঠিক পাশে।
ধড় সরিয়ে নেওয়া হতে থাকলো। নরমাংসের ভোগ হবে।
মহারাজের সাদা ধবধবে মখমল এখন লাল রক্তে পরিপূর্ণ। মন্দিরের এমন কেউ নেই আর যার গায়ে এই পাপের ছিটে পড়েনি। সবাই উন্মাদ হয়ে আছে, তাই সবাই তাদের গায়ে-কপালে রক্ত মেখে নিচ্ছে। তারা হয়তো জানেও না, এই পাপ তাদের আগামী কয়েক প্রজন্ম গা থেকে ধুতে পারবে না।
পরবর্তী বন্দিকে যূপকাষ্ঠে আনা হয়ে গেছে। রীতি মেনে যেই না চন্দ্রহাস নামবে, ঠিক তখনই মন্দিরে হুলস্থুল এক কাণ্ড ঘটে গেল। কোথা থেকে জানা নেই, দশ জিপ ভর্তি সরকারি সিপাহি বাহিনী এসে জুটলো। সবই ইংরেজ সরকারের সিপাহি। যে যেখানে ছিল তাকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিপাহিরা তাড়া করলো এবং তাতে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো। কেউ বা ধরা পড়লো। রাজার হাতের চন্দ্রহাস আর নামলো না। সবটাই এত দ্রুত সংগঠিত হলো যে কেউই এর মোকাবিলা করার মতো অবস্থায় রইলো না।
মহারাজ সুভদ্রের তৎপরতায় রক্ষা পেলেন। সুভদ্র যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাজার প্রাণ বাঁচালেন এবং তাকে পালাতে সাহায্য করলেন। মহারাজাকে সুরক্ষিত করলেন ঠিকই কিন্তু নিজে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করলেন
না। নিজের পোশাক খুলে নিলেন এবং ভেতর থেকে বের হলো লাল রঙা এক পোশাক। অনেকটা মহারাজের রক্তসিক্ত বর্তমান পোশাকের মতো দেখতে সে পোশাক। এরকম কিছু ঘটতে পারে আগেই যেন আন্দাজ করেছিলেন তিনি, তাই তৈরি ছিলেন। চন্দ্রহাস মহারাজের সঙ্গেই আছে, সুভদ্র নিজের তলোয়ার দিয়েই ইংরেজ সিপাহিদের মোকাবিলা করতে লাগলেন এবং যূপকাষ্ঠের শেষ বন্দিটিকেও হত্যা করতে উদ্যত হলেন।
কিন্তু তিনি তা করতে পারেননি। ইংরেজ সিপাহির গুলি ঠিক তার মাথায় এসে লাগে এবং তিনি লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। তার রক্তের ছিটেও সেদিন মা দন্তেশ্বরীর গায়ে গিয়ে পড়েছিল বলে শোনা যায়।
রক্ষা পায় যূপকাষ্ঠের শেষ যুদ্ধবন্দি এবং অপেক্ষারত আরও অনেকে। এও শোনা যায় মন্দির ত্যাগ করার সময় বন্দিদের সবাই মা দন্তেশ্বরীকেই নাকি ধন্যবাদ জানায় তাদের প্রাণ রক্ষা করার জন্য।
সত্য সেলুকাস!
