অধ্যায় ১৭
আজ মহাষ্টমী। সকালে পঞ্জিকামতে সঠিক সময়ের মধ্যে দেবীর পূজা শেষ হয়েছে। ষষ্ঠীর রাতের ঘটনার পর এই দুদিন আবার লোক সমাগম বন্ধ বাড়িতে। বাড়ির কয়েকজন লোককে নিয়েই মাতৃ-আরাধনা হচ্ছে। ধীরে ধীরে সময় এগোল, রাত বাড়লো।
ঠাকুরদালানে বসে আছেন সবাই। রাঘব, রিশান, আদিত্য নারায়ণ, অনুজ নারায়ণ, রেবা এবং বাকি সব অনুগত ভৃত্যরা। আজ আবার একটা পঞ্চাশতম বছরের সন্ধি পূজোর রাত, সব মিলিয়ে ভৈরবের মৃত্যুর দেড়শোতম বছর। মাঝে আরও দুটো পঞ্চাশ বছর কেটেছে। প্রথমবার কার বলি হয়েছিল জানা নেই। দ্বিতীয়বার হর নারায়ণের কন্যার বলি হয় ব্রজ নারায়ণের হাতে। আজ রাতে আবার বলি হবার কথা। আর যদি না হয়, অপঘাত মৃত্যু অনিবার্য।
সকাল থেকেই এই বাড়ির সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে যুক্ত এমন অনেকেই ফোন করে কুশল বিনিময় করছেন। সবাই আজ ভীত, সন্ত্রস্ত। কার মৃত্যু আসবে কেউ জানে না। সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন বাড়ির তিনজন। রাঘব তাদের মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের পুস্তকে লেখা সবকিছু জানিয়েছেন। বইটা যে ভৈরবের মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর পর লেখা এবং সেই সময়ে যে নররক্তপিপাসু মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের মধ্যে এতটা আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এসেছিল, এটা জেনে প্রায় সকলেই আশ্চর্য হয়েছেন।
“আজ রাতে সবাই তৈরি থাকবেন। কী, হবে আমরা জানি না, যেহেতু বলির কোনো জোগাড়যন্ত্র নেই। এমনকী সামান্য পশু যথা ছাগ ইত্যাদি বলির ব্যবস্থাও আমি রাখবো না ঠিক করেছি, তাই আজ রাতে আমাদের প্রতি পদেই হয়তো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। কেউ ভয় পাবেন না, আমরা একসঙ্গে থাকব আজ।”
বৃদ্ধ অনুজ নারায়ণের থেকে এই কথাগুলো শুনে সবারই ভালো লাগে। শুধু আদিত্য বললেন, “সবই তো ঠিক ছিল। কিন্তু ভৈরবের রূপ পরিবর্তনের ব্যাপারটাই…”
কথা শেষ করলেন না তিনি। কিন্তু এতেই তার মনের উদ্বেগ বোঝা গেল। সত্যি, ভৈরব যেভাবে রিশানের বেশে এসে মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের লেখা পুস্তক নিয়ে গেল, তাতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
রিশান দুদিন ধরে চেপে রাখা একটা কথা আজ জিজ্ঞেস করেই বসলো। “আচ্ছা, এই পুস্তক তো কারাগারের মধ্যেই ছিল, ভৈরবের সমাধির পাশেই। সেখানেই সে এটাকে নষ্ট করেনি কেন?”
রাঘব ভেবে ভেবে বলেন, “আমি যখন তালা ভেঙে লোহার বাক্সটা খুলি তখন এতটা গুরুত্ব দিইনি ব্যাপারটায়, তবে এখন মনে হচ্ছে এর কারণ মহারাজ উল্লিখিত দুই নম্বর বিষয়ে আছে। সেই লোহার বাক্সে আমি গণেশের প্রতিকৃতি দেখেছিলাম। হয়তো সেটা উচ্ছিষ্ট গণেশেরই প্রতিকৃতি। এতকাল পর সে মূর্তি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। গণেশের শুঁড় অবধি ছিল তাই কোন দেবতা বুঝতে পেরেছিলাম। সে জন্যই হয়তো ভৈরব সেখান থেকে বের করতে পারেনি, কারণ উচ্ছিষ্ট গণেশ তার উপর কুপিত ছিলেন।”
তার কণ্ঠস্বরে দুশ্চিন্তার ছাপ। অনুজ নারায়ণ বললেন, “হুম! তাহলে এখন চন্দ্রহাসের পাশাপাশি উচ্ছিষ্ট গণেশের মূর্তিটাও খুঁজে বের করতে হবে।”
আজ থেকে থেকেই চন্দ্রহাস মহল কেঁপে উঠছে। সুড়ঙ্গের প্রাণীটার গায়ের জোর যেন আজ অন্য দিনের তুলনায় অধিক। সবার মুখ থমথমে হয়ে যাচ্ছে প্রাণীটির গর্জন শুনে।
রাঘব হঠাৎ করে এমন এক কথা বললেন যে সবাই আঁতকে উঠলো, “আজ বলি হবে এ বাড়িতে।”
“মানে?” সকলেই প্রায় একযোগে ফেটে পড়লেন।
“মহারাজ লিখে গেছিলেন যে আবার মৃত্যুর খেলায় মেতে উঠতে হবে। তার মানে একটাই। নরবলি। ইতিহাস আজ আবার নিজেই নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।”
এ বাড়ির সবাই যেন ভাষা হারিয়েছেন। চুপচাপ বসে আছেন সবাই। পুরোহিত মশাই কিছুক্ষণ পর এসে বসলেন। পূজার সময় ব্যতিরেকে অন্য সময় তিনি বাইরেই থাকছেন।
“পুরোহিত মশাই, কোনো নিদান নেই এই অভিশাপের? বছরের পর বছর হয় মারতে হবে নইলে মরতে হবে-এ কীরকম বিধান?” অনুজ নারায়ণ জিজ্ঞেস করে প্রায় কেঁদেই ফেললেন যেন।
পুরোহিত মশাইও বৃদ্ধ মানুষ। মুখে বললেন, “এ অভিশাপ নয় অনুজ, এ হল পাপের বোঝা। পূর্বপুরুষের পাপের বোঝা বইতে হচ্ছে শুধু। এই উঠোন কত রক্ত দেখেছে, কত কত দীর্ঘশ্বাস! মানুষই হোক কিংবা পশু, খড়্গ যখন ঘাড় কেটে কেটে গলার নলি চিরে নীচে নামে, সেই মুহূর্তে যে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়- সেই অভিশাপ, সেই পাপ কীভাবে মোচন করি বলো? মা মঙ্গলময়ী আছেন, তিনি যা ভালো মনে করেন করবেন।”
অনুজ নারায়ণ পুরোহিত মশাইকে একবার প্রণাম করলেন, তারপর বললেন, “চলুন, আমরা সন্ধি পূজার ব্যবস্থাদি শুরু করি।”
শুরু হল সন্ধি পূজার প্রস্তুতি। একশো আটটি নীল পদ্ম এবং একশো আটটি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হল। রেবা, আদিত্য সহ সবাই এ কাজে হাত লাগালেন।
পূজোর আয়োজন করতে করতে গল্পছলে সন্ধি পূজার কাহিনি বলতে শুরু করেন পুরোহিত মশাই, “আজ ঠিক মাঝরাতের দুদিকে পড়েছে সন্ধিপূজার সময়। রাত বারোটার আগের চব্বিশ মিনিট এবং রাত বারোটার পরের চব্বিশ মিনিটে এই সন্ধি পূজা করতে হবে। অর্থাৎ অষ্টমী তিথি শেষ হবার আগের চব্বিশ মিনিট এবং নবমী তিথির শুরুর চব্বিশ মিনিট।
এই সন্ধিপূজার সময়ে দেবী মহামায়া চণ্ড ও মুণ্ডু নামক দুই অসুর বধ করেছিলেন। মহিষাসুরের সঙ্গে তখন ঘোর যুদ্ধ চলছে। দেবী হলুদ শাড়ি পরিহিতা, হাতে সজ্জিত দশ অস্ত্র। মহিষাসুর কোনোভাবেই দেবীর সঙ্গে পেরে উঠছেন না। ঠিক সে সময় এই চণ্ড আর মুণ্ডু পেছন থেকে দেবীকে আক্রমণ করে যুদ্ধনীতি ভঙ্গ করেন। দেবী সেই সময় কুপিত হন এবং চণ্ডিকা রূপ ধারণ করেন। দেবী চণ্ডিকার তৃতীয় নয়ন উন্মীলিত হয় এবং তিনি চণ্ড ও মুণ্ডের মস্তক ছেদন করেন।”
সবাই মন দিয়ে সে গল্প শোনে। এত দিনে একটা জিনিস পরিষ্কার, এই বাড়ির সবাই গল্প পেয়ে গেলে, কিছু সময়ের জন্য হলেও ভয়কে ছুটি দেয়।
আজ কলকাতা শহর আলোর রোশনাইয়ে মাতোয়ারা। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ভিড়, মানুষ সেজেগুজে বেরিয়েছে ঠাকুর দেখতে। অথচ জোড়া সিংহের মূর্তিওয়ালা এই চন্দ্রহাস মহল অন্ধকারে ডুবে আছে। বাইরে আলো জ্বালানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ হলো সব অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। চারদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। রাজবাড়ির প্রত্যেক কোনায় যেন একটা পচা গন্ধ পাক খেয়ে খেয়ে ফিরে আসছে। চাঁদটা মেঘের আড়ালে গেছে অনেকক্ষণ। কোত্থেকে কিছু কাক এসে জুটেছে বাগানের গাছগুলোতে। সন্ধে থেকে শুধু কা কা রব তুলেছে। মনে হচ্ছে যেন আজ কারো প্রাণ হরণের জন্য যমকুলির আবির্ভাব হয়েছে এই বাড়িতে। সন্ধি পূজার সময় যত এগোচ্ছিল এই জমাট অন্ধকার, এই মেঘ, পচা গন্ধ এবং কাকের উপদ্রব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। এ সবই যেন আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস। সবাই মন্দিরে বসেও এসব শুনতে পাচ্ছে, আর তাই গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে সকলের। গল্প শেষে আবার ভয় ফিরে আসছে সবার মনে।
এ সবকিছুকে এক প্রকার তুচ্ছ করেই পুরোহিত মশাই বলে ওঠেন, “কই হে অনুজ, চলো এবার পূজায় বসা যাক। সাড়ে এগারোটা বাজে। আর ছয় মিনিট বাকি।”
“হুম! চলুন, পূজা আরম্ভ করি।”
রক্তদন্তিকা মূর্তির পাশেই ছোট চণ্ডিকা মূর্তি। এই মূর্তি প্রতি বছর নতুন আসে। ঘটের সঙ্গে এই মূর্তিই বিসর্জন দেওয়া হয় দশমীতে। পুরোহিত মশায় এবং অনুজ নারায়ণ পূজায় বসলেন।
ষোড়শোপচারের পূজা শুরু হলো ভূতশুদ্ধ্যাদি কর্ম সম্পন্ন করার পর। চামুণ্ডার ধ্যানে বসলেন পুরোহিত মশায়-
“ওঁ কালী করালবদনা বিনিষ্ক্ৰাস্তাসিপাশিনী।
বিচিত্র খট্টাঙ্গধরা নবমালা বিভূষণা।।
দ্বীপিচর্মপরীধানা শুষ্কমাংসাদিভৈরবা।
অতিবিস্তারবদনা জিহবাললনভীষণা।
নিমগ্নারক্তনয়না নাদাপুরিতদিঙ্মুখা।।”
অনুজ নারায়ণ বলিষ্ঠ উচ্চারণে বলে উঠলেন, “ওঁ হ্রীং শ্রীং চামুণ্ডায়ৈ নমঃ।”
আর তখনই কাণ্ডটা ঘটলো। চন্দ্রহাস মহল যেন প্রবল ভূমিকম্পে নড়ে উঠলো। কোথা থেকে যেন ঝড় উঠলো, সেই ঝড়ে এক এক করে সমস্ত প্রদীপ নিভতে শুরু করলো। একটা মঙ্গল কলস সশব্দে ঠাকুরদালানের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়লো। উপস্থিত সবাই সেই শব্দে কেঁপে উঠলো। রেবা “মা গো” বলে চিৎকার করে কানে হাত দিলেন। ভূমিকম্প যেন আজ চন্দ্রহাস মহল গুঁড়িয়ে দিয়েই যাবে।
“পূজা বন্ধ করবেন না পুরোহিত মশায়। পূজা যেন বন্ধ না হয়।” রাঘব কোনোমতে ধুলোর ঝড়ে নিজেকে সামলে কথাটা বলেই উঠে দাঁড়ালেন। আর তখন এরকম এক দৃশ্য ঘটে গেল যেটা চৌধুরী পরিবার বিগত পঞ্চাশ বছরে দেখেনি।
একটা মিহি আর্তনাদ ভেসে এলো। একটা একতলা থেকেই, অপরটা তেতলা থেকে। সেই আর্তনাদ এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকেই, যেখানে সন্ধি পূজা হচ্ছে । বৈদ্যুতিক আলো দপ দপ করছে। রিশান ও আদিত্য মোম জ্বালিয়ে নিলেন। ওদিকে পুরোহিত মশাই কোনোক্রমে চোখ বন্ধ করে মন্ত্র আউড়ে যাচ্ছেন-
“ওঁ কালী করালবদনা বিনিষ্ক্ৰাস্তাসিপাশিনী।”
আর্তনাদ এখন গোঙানিতে পরিণত হয়েছে। সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে মিহি করুণ সুরে ক্রমাগত রূপান্তরিত হওয়া গোঙানির শব্দের উৎসের দিকে। মোমের আলো ও ক্ষীণ বৈদ্যুতিক আলোতে শেষ পর্যন্ত দেখতে পাওয়া গেল ছায়ামূর্তির। একটা নয় দুটো ছায়ামূর্তি। তাদের এভাবে এই অবস্থায় এগিয়ে আসতে দেখে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন আদিত্য নারায়ণ। রিশানেরও একই অবস্থা, ভয়ে রাঘবের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
রাঘব নার্ভ শক্ত রেখে চেয়ে রইলেন।
মলিন, প্রায় ছেঁড়া বস্ত্রে আলোর সামনে এসে উপস্থিত হলেন প্রায় পাঁচ দশক নিজেকে ঘর বন্দি করে রাখা ব্ৰজ নারায়ণ, তার দিকে একবার তাকালে চোখ সরিয়ে নিতে হয়। ঠিক তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছেন ব্রজ নারায়ণের ছোট বোন সৌদামিনী, পরনে একটি পেটিকোট এবং ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাবরণ।
ব্রজ নারায়ণ চিৎকার করে উঠলেন। “আলো নেভাও, আলো নেভাও। চোখ জ্বলে যাচ্ছে।”
কাঁঠালের খোলের মতো চামড়াগুলো কুকড়ে যাচ্ছে এত দিন পর ধুলোর ঝড়ের সামনে পড়ে ।
রেবা কোনোক্রমে প্রশ্নটা করলেন, “আপনারা এখানে কেন এসেছেন?”
সৌদামিনী বিচ্ছিরি শব্দ করে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “কান ফেটে যাচ্ছে আমাদের, ভৈরবের চিৎকারে। ওকে কেউ বলির রক্ত দাও। এই দেখো, ভৈরবের চিৎকারে আমার কান দিয়ে রক্ত পড়ছে।”
সত্যি দূর থেকে রাঘব দেখলেন, কালচে তরল গড়িয়ে পড়ছে বৃদ্ধা সৌদামিনীর কান বেয়ে।
প্রায় একইসঙ্গে ব্রজ নারায়ণ বলে উঠলেন, “আমিও সহ্য করতে পারছি না আর এ শব্দ। কেউ না থাকলে আমাকে বলি দাও। আমি নিজেকে বলি দেবো প্রয়োজনে।”
সকলে দেখলো, ব্রজ নারায়ণেরও একই অবস্থা। এককালে যে এদের উপর ভৈরব চড়াও হয়েছিল, এত দিনেও এরা আর স্বাভাবিক হলেন না। ভৈরবের চিৎকার উপস্থিত আর কেউ শুনতে পাচ্ছে না। হয়তো সাধারণ মানুষের শ্রবণসীমার উপরে বা নীচে সে শব্দের সীমা, তাই শোনা যাচ্ছে না। যদিও এটা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। অন্য ব্যাখ্যা সহজেই অনুমেয়, হয়তো ব্রজ নারায়ণ এবং সৌদামিনী এখন আর মানুষের তালিকাতেই পড়ছেন না।
রাঘব হঠাৎ বলে উঠলেন, “সরে যাও ওদের সামনে থেকে।”
বিদ্যুৎবেগে রেবা, আদিত্য, রিশান সরে গেলেন।
সৌদামিনী প্রবল আর্তনাদ করে কান চেপে মাটিতে বসে পড়লেন। ব্রজ নারায়ণ এগিয়ে এলেন সামনে। পুরোহিত মশাই মন্ত্র বন্ধ করেননি।
“বিচিত্র খট্টাঙ্গধরা নবমালা বিভূষণা।।
দ্বীপিচর্মপরীধানা শুষ্কমাংসাদিভৈরবা।”
“জয় ভৈরবের জয়, জয় ভৈরবের জয়।” বলতে বলতেই ফল কাটার যে বড় বঁটিটা সোজা করে রাখা ছিল, তাতে ঝুপ করে পড়ে গলা দিলেন ব্রজ নারায়ণ। মুহূর্তে ছিন্ন হলো মস্তক। রক্ত ছিটকে পড়লো মন্দির প্রাঙ্গণে, রক্তাক্ত হল মা রক্তদন্তিকার মূর্তি। ধড়টা মাটিতে ছটফট করতে লাগলো।
রেবা ভয়ে সংজ্ঞা হারালেন, অনুজ নারায়ণ এসে তাকে ধরলেন। রিশান-আদিত্যের হাত-পা যেন অবশ হয়ে এলো। রাঘব নিজেকে স্থির রাখার সমস্ত চেষ্টা করেও যেন বারবার অসফল হচ্ছিলেন।
সৌদামিনী মাটিতে বসে পড়েছিলেন। ব্রজ নারায়ণের রক্ত গড়িয়ে এসে তার পায়ে লাগতেই তার মধ্যেও একটা অস্বাভাবিক চঞ্চলতা লক্ষ করা গেল। তিনিও প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এলেন ছটফট করতে থাকা ব্রজ নারায়ণের শরীরটার কাছে। একবার ব্রজ নারায়ণের বুকে হাত রাখলেন। পরক্ষণেই চিৎকার করে উঠলেন, “দাদা-আ-আ-আ!”
সবাই ভাবলেন এতক্ষণে হয়তো স্বাভাবিক হয়েছেন সৌদামিনী। পরক্ষণেই সবার সব চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করলেন তিনি। মুণ্ডুহীন ব্রজ নারায়ণের বুক দু’হাতের প্রবল শক্তিতে চিরে ফেললেন। বৃদ্ধ সৌদামিনীর গায়ে এত জোর কোথা থেকে এলো, একমাত্র ভৈরবই জানে। মৃতদেহটি যেন ক্ষণিকের জন্য আবার নড়ে উঠল। সৌদামিনী তার বাম পাঁজরের হাড় ভাঙলেন হাত দিয়েই, যেন কসাইখানার কোনো জন্তু। মনেই হলো না মানুষের দেহ। হাত ঢুকিয়ে রক্তাক্ত এক মাংসপিণ্ড বের করলেন তিনি, এটা হৃৎপিণ্ড। সৌদামিনী আর আগের সৌদামিনী নেই। দাঁতগুলো কালো হয়ে গেছে। চুল জটায় পরিণত হয়েছে, চোখে আর মণি বলে কোনো বস্তু দেখা যাচ্ছে না—সবটাই সাদা।
রাঘব পকেটে হাত দিলেন। চাবিটা ছিলই। এক লাফে ঠাকুরদালানে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। এগিয়ে গেলেন মা রক্তদন্তিকার মূর্তির দিকে। সেদিন বোধনের সময় একটা খটকা লেগেছিল তার, আজ সেটা পরীক্ষা করে দেখবার সময় এসেছে। মা’কে স্নান করানোর সময় নীচের পাটাতনটা ভালোভাবে দেখা যায়। রাসায়নিক দিয়ে এমনভাবে লেপন করা হয়েছে যে লোহার পাটাতন হলেও জং পড়েনি। ঠিক এরকমই এক রাসায়নিক চাবির গায়েও ছিল। বোধনের দিন স্নান করানোর সময় দেবী মূর্তির পেছনের অংশও পরিষ্কার করা হয়। আর এই পেছনেই পাটাতনের দিকটার একটা ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে যা রাঘব সেদিন লক্ষ করেন। দেবীর পেছনে গিয়ে পাটাতনের সেই ছিদ্রে চাবিটা ঢুকিয়ে দিলেন তিনি। ততক্ষণে সৌদামিনী রূপী পিশাচী ব্ৰজ নারায়ণের হৃৎপিণ্ড খেয়ে ফেলেছে এবং রেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রেবাকে ধরে রাখা অনুজ নারায়ণ ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন দেয়ালে।
“নারী রক্ত, নারী রক্ত! আহ কতদিন নারী রক্তের স্বাদ গ্রহণ করি না।”
অদ্ভুত পুরুষালি কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে এগিয়ে যায় সৌদামিনী রূপী পিশাচী।
এদিকে রাঘব চাবি ঘোরাতেই ঘরঘর শব্দে পাটাতন দুদিকে ফাঁক হলো। আর তখনই এই প্রায়ান্ধকার যমপুরীতেও একটা চিরস্থায়ী আলোর আভাস পাওয়া গেল। কিছুটা মরচে ধরে গেছে, ধারও নিশ্চয়ই কমেছে তবু আলো ছড়াচ্ছে চন্দ্রহাস। রাবণের চন্দ্রহাস তুলে নিলেন রাঘব। তুলতে কষ্ট হলো। এত ওজন তোলার অভ্যেস তার নেই, কিন্তু সামলে নিলেন।
সৌদামিনীকে রুখতে গেছিলেন আদিত্য নারায়ণ। তাকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে ফেলে দিয়েছে সেই পিশাচী।
অনুজ নারায়ণ কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হাতের কাছে একটা ভাঙা লাঠি পেয়ে তাই দিয়ে প্রতিরোধ করলেন। পিশাচী তা টুকরো করে ফেলে দিলো। আর সেই মুহূর্তেই ভাগ্যদোষে রেবার জ্ঞান ফিরলো। চোখ খুলেই তিনি দেখতে পেলেন পেটিকোট পরিহিত, জটাধারী, দাঁতে রক্ত-মাংস-পিত্ত লেগে থাকা এক পিশাচীকে। সেই পিশাচী রেবার মুখের দিকে নিজের মুখ নিয়ে যাচ্ছে, যেন রেবার ঠোঁট উপড়ে খাবে। রেবা চিৎকার করে উঠলেন।
আর তখনই চন্দ্রহাসের এক আঘাতে দানবীর কাটা মুণ্ডু এসে পড়লো রেবার বুকে। কালো রক্তে ভরে উঠল তার শরীর। রেবা মেঝে থেকে উঠে বমি করতে শুরু করলেন।
নরবলি নয়, সন্ধিপূজায় পিশাচী বলি দিলেন রাঘব।
কিছুক্ষণের জন্য মাটিতে ঝিম ধরে বসে পড়লেন রাঘব। রক্তাক্ত চন্দ্রহাস তার পাশেই বিশ্রাম নিচ্ছে।
পুরোহিত মশাই এখনও চোখ খোলেননি। বাইরে কী হচ্ছে আদৌ তিনি জানেন কিনা সন্দেহ আছে। বললেন, “সুড়ঙ্গে নামতে হবে । আজকেই ধুয়ে ফেলতে হবে গত দেড়শো বছরের পাপ।”
কোনোক্রমে চন্দ্রহাস তুলে পুরোহিত মশায়ের জিম্মায় দিলেন রাঘব। বললেন, খড়্গ শুদ্ধি করুন। পিশাচী বধ করেছে এই খড়্গ।
পেছনে ফিরে আবার মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লেন তিনি। রিশান ও আদিত্যকে উদ্দেশ করে বললেন, “নীচের প্রাণীটাকে আটকানোর জন্য মাংসের প্রয়োজন। এই দুটি লাশ নীচে নিতে হবে। তোমরা যত তাড়াতাড়ি পারো ব্যবস্থা করো। আর অনুজবাবু, আপনি আপনার স্ত্রীকে সামলান। বাকি যা করার আমরাই করব। শুধু খেয়াল রাখবেন পূজা যেন বন্ধ না হয়।”
সন্ধি পূজা সবে পনেরো মিনিটের মাথায় পড়েছে। এত দ্রুত সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যে এক একটা মিনিট এক এক বছরের ন্যায় ঠেকছে। ব্রজ নারায়ণ বা সৌদামিনীর মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। এক কোণে টেনে নিয়ে যাওয়া হল লাশ দুটো। রিশান বা আদিত্যের কারো বিশ্বাস হচ্ছে না তারা কী করছে। রাঘবের কথায় তারা মনে জোর পেলো। রাঘব তাদের বোঝালেন, “এরা আর মানুষ ছিল না। যেভাবে কসাই মুরগি কাটে সেভাবেই পশু-পাখি ভেবে দুটো অপদেবতাকে টুকরো টুকরো করে ফেলো।”
আদিত্য তলোয়ার এনে দেয় রিশানের হাতে এবং নিজেও কাজে লেগে পড়ে। ধারালো তলোয়ারের ফলায় কাটতে থাকে মাংস, ছিটতে থাকে রক্ত।
অনুজ নারায়ণ মন্দিরে বসে একবার চোখ বন্ধ করে বললেন, “মা, মা গো, এই প্রথম বার পিশাচের রক্তে পিশাচকে ভোগ দেওয়া হবে। মা, তুমি দেখো।”
রাঘব যেন শুনেও শুনলেন না। তিনি এক অন্য স্তরে উপনীত হয়েছেন বিগত কিছু সময়ে। আর তাই হয়তো রিশানের হাত থেকে ভয়ে তলোয়ার ছিটকে যেতে দেখে নিজে উঠে পিশাচীর মাংস কর্তন করলেন। রক্ত ছিটকে পড়ে বীভৎস হয়ে উঠল তার মুখ।
পুরোহিত ততক্ষণে খড়্গ শুদ্ধি মন্ত্র পড়ে ফেলেছেন। চন্দ্রহাসে শিরীষ কাগজ ঘষতে ঘষতেই তিনি পড়েছেন মন্ত্র। যদিও খড়্গ শুদ্ধিতে শিরীষ কাগজ শুধু নিয়মমাফিক ছোঁয়াতে হয়, সেই সঙ্গে এত দিনের মরচে যতোটা সম্ভব পরিষ্কার করলেন তিনি। চন্দ্রহাস আজ বলিতে নয়, যুদ্ধে নামছে।
“রিশান তুই চন্দ্রহাস নে, আমি আর আদিত্য মাংসের টুকরোগুলো নিচ্ছি।”
রাঘবের কথা শুনে রিশান চন্দ্রহাস তুলতে গেল। কিন্তু তোলা মাত্র বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো রেখে দিলো। বসে পড়লো মাটিতে।
রাঘব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে? কী হলো তোর?”
“আমি পারবো না। আমি বরং মাংসগুলো তুলছি। তুমি নাও চন্দ্রহাস।”
এইবার সুড়ঙ্গ পথে এগোল তারা। সামনে চন্দ্রহাস হাতে রাঘব, মাঝে আদিত্য, পেছনে রিশান। তাদের হাতে একটা করে থলি, থলিতে সদ্য কাটা পিশাচপিণ্ড। সুড়ঙ্গের ঢাকনা খুলেই রাঘব হাতে মশাল নিলেন। বাকি দুজনের হাতে মশাল নেই। আছে হাই ভোল্টেজ ব্যাটারির টর্চ। আজ অন্তত অন্ধকারে হারিয়ে যাবার ভয় নেই।
আজ কালচে জলের স্রোত যেন অন্য দিনের চেয়ে বেশি। সাবধানে পা ফেললেও ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হয়। হাড়গোড়ের স্তূপ পেরিয়ে সোজা হাঁটতে থাকেন তারা। উপর থেকে যত জোরে কম্পন অনুভূত হচ্ছিলো, নীচে ততটা নয়। তবে গর্জন শোনা যাচ্ছে। বিকট সেই শব্দ। অন্য দিনের মতো ক্রুদ্ধ গর্জন নয়, থেমে থেমে গর্জন হচ্ছে। যেন বলি হয়েছে বুঝে, শুধু খাবার পরিবেশনে দেরি হওয়ায় তুলনামূলক মৃদুমন্দ গর্জন। কান খাড়া করে এগিয়ে চলেন তিন জন। এক হাতে চন্দ্রহাস ও অপর হাতে মশাল নিয়ে অন্যান্য দিন রাঘবের পক্ষে চলা মুশকিল হতো। আজ কোন জাদুবলে তিনি এসব অবলীলায় করতে পারছেন একমাত্র মা চণ্ডীই হয়তো জানেন।
তারা আরও কিছুটা এগিয়ে যাবার পর মনে হলো সুড়ঙ্গ প্রথম বারের মতো কেঁপে উঠলো, সঙ্গে গর্জন। প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন তিনজন, সেই ঝাঁকুনিতে। প্রাণীটা যেন এতক্ষণে কোনো কু-অভিসন্ধির কথা জানতে পেরেছে। আর তা বোঝা মাত্রই থাবা দিয়ে মাটিতে আঘাত করে তেড়ে আসছে এদিকে। ততক্ষণে পুস্তক যে কারাগারে রাখা ছিল, সেখানে চলে এসেছেন তারা। সেটা তালা ভাঙা অবস্থাতেই ছিল। রাঘব নির্দেশ দিলেন, “সবাই কারাগারে ঢুকে পড়ো।”
সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজন তাতে ঢুকে পড়লেন। শেষে ঢুকলেন রাঘব । পূর্ণাঙ্গ প্রাণীটাকে এই প্রথম বারের জন্য আদিত্য ও রিশান দেখতে পেলেন রাঘবও চেয়ে রইলেন সেদিকে। আজ যেন আরও বিকট লাগছে প্রাণীটাকে। খড়্গ দন্ত দুটি অপেক্ষা করছে অস্থি থেকে মাংস খুবলে নেওয়ার সময় মাংসে চেপে বসবে বলে। কালো লোমশ শরীর আর কানঢাকা কেশরগুচ্ছ নিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো কারাগার ধরে। মুহূর্তের মধ্যে থলি থেকে মাংসের একটা বড় খণ্ড তুলে কারাগারের ডান দিকে, মানে যেদিকে সুড়ঙ্গ দ্বার সেদিকে ফেলে দিলেন আদিত্য। সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীটি সেদিকে লাফিয়ে পড়লো। টর্চের ঝলকানিতে এক পলকে মনে হল ব্রজ নারায়ণের ডান হাতটা ছুড়ে দিয়েছেন আদিত্য।
“আদিত্য আপনি এদিকটা সামলান, আমি আর রিশান ভৈরবের সমাধিতে যাচ্ছি।”
তালা খুলে উল্টো পথে চলতে থাকলেন রাঘব আর রিশান। পেছন থেকে রাস্তা আগলে দাঁড়ালেন আদিত্য নারায়ণ। এক হাতে সৌদামিনীর বাঁ পায়ের কাটা অংশ, ডান হাতে তলোয়ার, এক কোণে টর্চটাকে ঝুলিয়ে রাখলেন। কালো সিংহ ও আদিত্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললেন রাঘবরিশান। যখন শেষ কারাগারের দরজায় এসে পৌঁছালেন তারা, ততক্ষণে পেছন থেকে শুধু গর্জন শোনা যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে আদিত্যের হুঙ্কার। দু’বার পিস্তল গর্জে ওঠায় সুড়ঙ্গে কাটাফাটানো শব্দ হলো। চোখে কিছুই আর দেখা যায় না। আলো এই অন্ধকার কাটাতে অক্ষম।
নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলেন রাঘব, “রিশান, দরজাটা খোল। তালাটা ভেঙে ফেল।”
রিশান যন্ত্রবৎ আদেশ পালন করলো। টর্চের তীব্র আলো এবং মশালের শিখায় চেষ্টা করলো ভৈরবের সমাধি খোঁজার। বাকি সমস্ত কক্ষে কালচে জলের স্রোত থাকলেও একমাত্র এই কক্ষে জলের চিহ্নমাত্র নেই। আলোতে স্পষ্ট দেখা গেল, কক্ষের মাঝে রাখা আছে একটা ফলক। তাতে লেখা আছে একটি মন্ত্র। সংস্কৃতে লেখা সেই মন্ত্র। রাঘব পড়তে শুরু করেও থামিয়ে দেন পড়া। এ এক সঞ্জীবনী মন্ত্র ।
আর তখনই অবাক হয়ে যান তিনি। তাকে অবাক করে দিয়ে এক অদ্ভুত স্বরে সেই মন্ত্র আওড়াতে থাকে রিশান এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে সে।
“ওঁ অঘোরেভ্য ঘোরেভ্যো ঘোরতরেভ্যঃ
সৰ্ব্বতঃ সৰ্ব্বতরেভ্যঃ নমস্তে রুদ্ররূপেভ্যঃ।”
ভৈরবের সমাধি খুঁড়ছে রিশান, লাগাতর আওড়াচ্ছে সঞ্জীবনীমন্ত্র। রাঘবের থেকে রিশানের দূরত্ব হাত দশেক। কক্ষের ঠিক মাঝখানে আছে সমাধি। রাঘব এগিয়ে গিয়ে রিশানকে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রিশানের এক ধাক্কায় অনেকটা দূর ছিটকে পড়লেন তিনি। এত গায়ের জোর রিশানের থাকার কথা নয়। তবে এ কে?
রিশান পাগলের মতো মাটি খুঁড়েই চলেছে। গর্ত গভীর হচ্ছে। রাঘবের চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবু মাঝে মাঝেই তিনি রিশানকে ডাকতে থাকেন, “রিশান, রিশান। বন্ধ কর মাটি খোঁড়া। ভৈরব জেগে উঠলে অনৰ্থ হয়ে যাবে।”
কে শোনে কার কথা! খোঁড়ার গতি বাড়ে এবং অচিরেই কী যেন একটা খুঁজে পায় সে! একটা মাটির হাঁড়ি। রিশান সেই হাঁড়ি দু’হাতে উপরে তুলে নিজের পায়ের কাছে রাখে এবং আবার মাটি খোঁড়ায় মন দেয়। আরও কিছুক্ষণ খোঁড়ার পর রাঘব দেখলেন, একটা বড় কফিন ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে মাটির পর্দা সরিয়ে। রাঘব শেষ বারের মতো বলেন, “তুই খোঁড়া বন্ধ কর। নইলে এই মুহূর্তে তোকে বলি দেবো।”
রিশান কথার উত্তর না দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো মাটি খুঁড়তে থাকে। রাঘব চেষ্টা করেও রিশানের প্রাণ নিতে পারেন না। রিশানের বাবার কাছে রিশানকে অক্ষত ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা তাকে এ কাজ থেকে বিরত করে। আগত বিপদের কথা ভাবতে থাকেন তিনি। ইতিমধ্যে আদিত্য নারায়ণ এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “সিংহটা খাবার খেয়ে ভেতরে আমাদের দিকে না এসে বাইরে বেরিয়ে গেছে। বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে অনর্থ হয়ে যাবে।”
“হায় ঈশ্বর!” রাঘব চোখ বন্ধ করেন।
রিশান ধুলোমাখা কফিনের ঢাকনা সরানোর চেষ্ট করছে। রাঘব আদিত্যকে ইশারা করতে তিনিও আটকাতে যান রিশানকে। কিন্তু ব্যর্থ হন। এক দানবীয় শক্তিতে ভর করে রিশান এসব কাজ করছে। রাঘব বুঝতে পেরে গেছেন এর অর্থ। নিজেকে তৈরি করছেন বিপদের মোকাবিলা করতে ।
রিশান একাই কফিনের ঢাকনা সরিয়ে ভেতরে হাত ঢোকায়। কিছু মাটি সে সেখান থেকে তুলে আনে। পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে তা দিয়ে নিজের গালে আঁচড় কাটে, যেন মাখন কাটছে এরকম ভঙ্গি। গাল কেটে রক্ত ঝরতে থাকে। সেই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত হাতের মাটিতে পড়তে থাকে, রিশান আরও জোরে পড়তে থাকে সঞ্জীবনী। তার সঙ্গে একটা নতুন জিনিস সে করা শুরু করে। মাটি খুঁড়ে প্রাপ্ত মাটির হাঁড়ির শক্ত ঢাকনা সে উপড়ে ফেলে দেয়। তাতে গাঢ় কালো তরল দেখতে পান রাঘব এবং আদিত্য। এই কালো তরল রিশান ঢালতে থাকে তার হাতের মধ্যে থাকা কফিনের মাটির ওপর। তেলের সঙ্গে রক্ত মেশানো মাটি মাখতে থাকে সে। সঙ্গে জোরে জোরে পড়তে থাকে মৃত সঞ্জীবনী।
“ওঁ অঘোরেভ্য ঘোরেভ্যো ঘোরতরেভ্যঃ
সৰ্ব্বতঃ সৰ্ব্বতরেভ্যঃ নমস্তে রুদ্ররূপেভ্যঃ।”
রাঘব আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে জিগ্যেস করলেন, “ওটা কী? রিশান ওটা কী, আমায় বল।”
রিশান অল্প সময়ের জন্য থামলো। এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই যেন সে বিশ্রাম নিয়েছে। স্থির অক্ষিগোলক নিয়ে রাঘবের দিকে তাকালো সে, গম্ভীর গলার স্বর শোনা গেল,
“মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ আমাকে শুধু ঘৃণা করতেন এরকম নয়, ভালোও বাসতেন। শুধু গ্রন্থ লিখে তোদের উপকার করতে এই সুড়ঙ্গে তিনি প্রবেশ করেছিলেন এরকম ভাবাটাই তোদের ভুল । সাধক প্রতাপ নারায়ণ তান্ত্রিক উপাচারে এই তেল বানিয়েছিলেন আমার জন্য। বিভিন্ন শষ্য একত্রিত করে মাটির হাঁড়িতে রেখে তা উল্টো করে দীর্ঘদিন রেখে দিয়েছিলেন সূর্যালোকে। সূর্যের তাপে শষ্য থেকে নিঃসৃত তেল নিয়ে তিনি প্রবেশ করেছিলেন এই সুরঙ্গে। কালো সিংহের তোয়াক্কা না করে মৃত সঞ্জীবনীর ফলক বসিয়েছিলেন। আমার শক্তি কমে এসেছিল সেদিন, যখন সাধক নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে প্রয়োগ করেছিলেন। সিংহটাও কার্যত জড়বত বসেছিল। তবে কতক্ষণ?”
বিচ্ছিরি হাসে রিশান। তারপর হাসতে হাসতেই বলে,
“আমি ভৈরব। আমি কাল ভৈরব। সাধকের শক্তি শূন্য হতেই আমার কালো যম অল্প সময়ের মধ্যেই তার ক্ষুধা নিবারণ করে।”
রিশান ভৈরবের কণ্ঠে কথাগুলো উগরে দিয়েই আবার মৃত সঞ্জীবনী পাঠে মন দেয়।
রাঘব শুধু একটা কথাই উত্তরে বলে, “মহারাজ তোকে ভালোবেসে নয়, তোর কাহিনি যেন আমি চিরতরে মুছে দিতে পারি এজন্যে তোকে জাগাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছেন। ওঠ, জেগে ওঠ।”
রুদ্র দর্পে কথা শেষ করেন রাঘব। একথায় রিশান ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করে উঠে মন্ত্র পড়া থামায়। আর ঠিক তখনই আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। রাঘব-আদিত্য দুজনেই সাধারণ জামাকাপড় পরে এসেছিলেন, এখন তাদের রীতিমতো ঠান্ডা লাগছে। যেন সুড়ঙ্গের পৃথিবী আবার ফিরে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক যুগে, সেরকম অনুভূতি হতে থাকে তাদের। টর্চ ও মশালের আলোতে দেখা যায় সুড়ঙ্গের কালো দেয়াল থেকে ডানা মেলে ধীরে ধীরে কিছু পাখি ওড়ার চেষ্টা করছে। পাখিগুলোর নাম তারা জানে না, হয়তো অনেক বছর আগেই লুপ্ত হয়ে গেছে এই প্রজাতি। রাঘব আর আদিত্য বুঝতে পারেন ভৈরব তার তন্ত্রবলে সুড়ঙ্গের ভেতরে এক আলাদা বাস্তুতন্ত্র বানিয়ে রেখেছিল। এক অবিশ্বাস্য বাস্তুতন্ত্র, যা স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি এমনকী স্বাভাবিক তন্ত্রবিদ্যারও বাইরে হয়তো। কালো সিংহ কীভাবে এত বছর ধরে এই সুড়ঙ্গে বেঁচে থাকছে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না আর। সুড়ঙ্গের শুরুতে এত যে হাড়-গোড়, সন্দেহ হয় সব মানুষের নয়। কিছু হয়তো এই সুড়ঙ্গের বাস্তুতন্ত্রজাত প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণীর। পাখিগুলোকে দেখে রাঘবের মাথায় এই সব কথাই ঘুরতে থাকে। এক-আধটার ডানার ঝাপটায় শুয়ে পড়তে বাধ্য হলেন তারা। শুয়ে শুয়েই দেখলেন সেই আশ্চর্য দৃশ্য। দেখে গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠলো, শিরদাঁড়া দিয়ে যেন হিমবাহ বয়ে গেল। ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন। দুজনে। লড়াই এবার ভৈরব সনে।
রিশানের রক্ত ভৈরবের সমাধির মাটিতে পড়ছে আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটা অবয়ব। সমাধি জুড়ে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে সেই অবয়ব। সেই অবয়বে মন্থর গতিতে জুড়ছে অস্থি-মজ্জা-রক্ত-মাংস। অবয়ব একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হচ্ছে। না, মানুষ বলা ভুল হলো। এ এক দানব, কারণ মানুষের এই প্রজাতি বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে। ভৈরব যেন আবার জন্ম নিয়েও নিজের তন্ত্র বলে সিংহটার মতোই ফিরে গেছে মানুষের আদি রূপে। এ রূপ কদর্য, এ রূপ বীভৎস, এ রূপ নারকীয়।
রাঘব উঠে দাঁড়ালেন, পেছনে আদিত্য। ভৈরব সম্পূর্ণ আকৃতি পেয়ে গেছে। তার করোটি বৃহদাকার, সারা শরীর লোমে আবৃত, হাত তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত এবং কাঁধ ঈষৎ কুঁজো। এত দিন পর মুক্তি পেয়ে দু’হাত দুদিকে ছড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলো ভৈরব। তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সুড়ঙ্গের বাতাস গরম হয়ে উঠলো, যেন এই মাত্র কেউ বিষ মিশিয়েছে সে বাতাসে। তারপর রিশানকে কোলে তুলে নিলো সে, ততক্ষণে রিশান ক্লান্ত হয়ে ভৈরবের পায়ের কাছে প্রায় লুটিয়ে পড়েছে। রাঘব ও আদিত্যকে একবার দেখে নিলো ভৈরব।
রাঘব আর উপায়ান্তর না দেখে চন্দ্রহাস নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু কোপ দেবার আগেই ভৈরব চোখের পলকে, বিদ্যুতের বেগে অন্তর্ধান করলো। কিছু মুহূর্ত পরেই সুড়ঙ্গের অপর প্রান্ত থেকে শব্দ পাওয়া গেল, কেউ বাইরে থেকে আটকে দিচ্ছে সুড়ঙ্গের মুখ।
রাঘব এবং আদিত্য এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটলেন সেদিকে। মশাল এতক্ষণে নিভে গেছে। টর্চের আলোতেই বাকি রাস্তা পার করতে হলো।
সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ। উপরে যাবার রাস্তা নেই। সুড়ঙ্গের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন রাঘব। হতাশাভরা কণ্ঠে বললেন, “আর কিছু সম্ভব নয়। আদিত্য, আপনাদের বংশকে বাঁচাতে পারলাম না।”
আদিত্য কী যেন একটা ভাবছিলেন। বললেন, “এখনও সম্ভব। আসুন।”
রাঘব কালবিলম্ব না করে আদিত্যের পিছু নিলেন। আদিত্যের এতক্ষণের দৌড়ঝাঁপে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও আদিত্য এগিয়ে চলেছেন।
“প্রথম যেবার এই সুড়ঙ্গে ঢুকে পা-টা হারাই সেবার কিন্তু সুড়ঙ্গ দ্বার দিয়ে ঢুকিনি, ঢুকেছিলাম সৌদামিনী পিসির ঘরের পেছনের একটা রাস্তা দিয়ে। অবশ্য সুড়ঙ্গের ঢাকা খুলে এসেছিলাম, যদি দরকার পড়ে ভেবে। ভেতরের দরজাটা বাইরে-ভেতরে দু’দিকে খোলার হাতল ছিল। খুঁজে পেলে বেরোতে অসুবিধে হবার কথা নয়। এই যে সিংহটা মাঝে সাঝে বলির প্রাক্কালে বেরিয়ে পড়তো, সেই রাস্তা দিয়েই হয়তো বেরোত। সৌদামিনী বা ব্রজ নারায়ণ কেউ যে ঠিক আর মানুষ ছিলেন না, সেই পরিচয় তো আমরা পেয়েই গেলাম। হয়তো ভৈরব তাদের নিজের বশে নিয়েছিল।”
“হুম! বশীকরণ তো সে জানতোই। মরার পরেও সে তা প্রয়োগ করছে।”
“কিন্তু ওই বনমানুষের মতো রূপ কী করে হলো ভৈরবের?”
“কেন, আপনি কালো সিংহটাকে ভালো করে দেখেননি! দাঁতগুলো দেখেছেন?”
“হ্যাঁ, খড়্গ দন্ত।”
“এই প্রাণীও কিন্তু পৃথিবীতে আর একটাও নেই। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভৈরবের মূল ক্ষমতা শুধু মৃতদেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠাই নয়, সেই প্রাণীকে তার প্রাগৈতিহাসিক রূপে নিয়ে যেতে সে সক্ষম।”
“ভয়াবহ!”
আদিত্য কোনোক্রমে হাতড়ে হাতড়ে সেই লোহার হাতল খুঁজে পেলেন। তাতে চাপ দিতেই দরজা ঘড় ঘড় শব্দে খুলে গেল। রাঘব ও আদিত্য আর দেরি না করে ঢুকে পড়লেন ঘরে। রাঘব বললেন, “আদিত্য, আপনি এক কাজ করুন, উচ্ছিষ্ট গণেশকে নিয়ে আসুন।”
রাঘবের কথায় এই অবস্থাতেও কৌতুকের আভাস পেলেন যেন আদিত্য বললেন, “ইয়ার্কি করছেন? আমি কি জানি উচ্ছিষ্ট গনেশ মূর্তি কোথায়?”
“ইয়ার্কি নয়। চন্দ্রহাস মহলের যে একমাত্র জিনিস হুবহু আগের মতোই আছে, কোনো অভিশাপ তাকে স্পর্শ করেনি, ম্লান করতে পারেনি তার ঔজ্জ্বল্য, আমার মনে হয় তার ভেতরেই মূর্তিটা আছে। তাছাড়া মহারাজও লিখেছিলেন যে এমন জায়গায় তিনি রাখছেন যে অশুভ শক্তি আর প্রবেশ করতে পারবে না তার চন্দ্রহাস মহলে। এর অর্থ একটাই, প্রবেশপথের সোনালি সিংহ মূর্তি। আপনি এক্ষুনি গিয়ে সে মূর্তি ভেঙে দেখুন! আশা করি পেয়ে যাবেন। আর না পেলে এই মুহূর্তে কিছু করার নেই।”
ঘর থেকে সোজা রাঘবদের ওয়াশরুমের গোপন দরজাটি ধরে বেরোলেন তারা। আদিত্য বললেন, “ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। আপনি ততক্ষণ ভেতরটা সামলান।”
আদিত্য বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, রাঘব পেছন থেকে ডাকলেন, “শুনুন, কালো সিংহের মাথাটাও ভেঙে ফেলবেন। কয়েকজন দাস-দাসী নিয়ে যান। একা এ কাজ সম্ভব নয়। অশুভ কালো রঙের কিছুই অবশিষ্ট রাখবো না এ বাড়িতে। আমার বিশ্বাস এতে মঙ্গলই হবে।”
আদিত্য স্থির হয়ে মাথা নাড়লেন, শেষ কথাটিতে যেন আলাদা শক্তি পেলেন মজ্জায়। তলোয়ার হাতে বেরিয়ে পড়লেন।
রাঘব সন্তর্পণে এগোলেন মন্দিরের দিকে। কাছাকাছি পৌঁছে চুপিসারে দেখলেন আপাতভাবে সব শান্ত। ঘড়ি বলছে সন্ধি পূজার শেষ দশ মিনিট বাকি। অনুজ নারায়ণ বসে আছেন মন্দিরে। নীচে চাতালের কাছে চেয়ারে বসে আছেন রেবা। কয়েকজন দাস-দাসী আশেপাশেই আছে। বাকিরা আদিত্যের সঙ্গে গেছে।
কোনো অস্বাভাবিকতা নেই দেখে রাঘব সামনে এলেন।
অবিন্যস্ত চুল, জামাকাপড় ভিজে একসার, তাকে এরকমভাবে দেখে অনুজ নারায়ণ বললেন, “আরে এ কী! আপনি ঠিক আছেন তো?”
“আমি ঠিক আছি, এখানে কোনো গন্ডগোল হয়নি?”
“না। আপনারা যাবার পর থেকে সব কিছুই শান্ত। শুধু থেকে থেকে কেঁপে উঠছে মহল। আর রেবাকেও সবাই মিলে ধরে পাশের ঘরে শুইয়ে রেখে এসেছি আমরা। তাতে কী, তিনি চলে এলেন! মায়ের পূজো দেখবেন…”
রাঘব এই কথাটা শুনেই তড়াক করে সোজা হলেন। যেন কিছুর গন্ধ পেলেন। “ইনি শোওয়ানোর পর ঘরে একা ছিলেন?”
“হ্যাঁ, সামনেই তো ঘর। শুইয়ে দাস-দাসী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পূজো দেখছিল।
“না না, এ ইনি রেবা নন। এটা ভৈরবের রূপ, ভৈরব রূপ পাল্টে রেবা হয়ে এসেছে। সবাই সরে যান।” বলেই রাঘব চন্দ্রহাস হাতে রেবার সম্মুখে উপস্থিত হলেন। সবাই হতচকিত হয়ে সরে গেল।
“আরে করছেন কী?”
অনুজ নারায়ণ উঠে দাঁড়ালেন। রেবা ভয় পেয়ে গেলেন খড়্গোদ্যত রাঘবকে দেখে।
“ভৈরব সমাধি থেকে মুক্তি পেয়েছে। মুক্ত হয়েছে সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটাও, কালো সিংহ।”
“সর্বনাশ, কিন্তু এর থেকে কীভাবে প্রমাণ হচ্ছে এ রেবা নয়।”
অনুজ নারায়ণের কথাতেও চন্দ্রহাস নামালেন না রাঘব। বললেন, “নইলে এত শরীর খারাপ নিয়ে একজন এভাবে বসে থাকতে পারে না। বেশ, তোমাদের কেউ গিয়ে দেখে এসো ঘরে কেউ শুয়ে আছে কি না। যদি সেখানে রেবাদি থেকে থাকেন তবে এ নিশ্চয়ই ভৈরব।”
“আমার শরীর খারাপ, একা থাকতে ভয় পাচ্ছিলাম বলেই চলে এসেছি।”
রেবার এই আর্তি রাঘবের কর্ণপটহে স্থান পেল না। রাঘবের আদেশমাত্র দুজন দাসী দেখতে চলে গেল ঘরে রেবা আছেন কি না। আর ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হলেন আদিত্য নারায়ণ। তার হাত খালি, শুধু তলোয়ারটা আছে।
“কী হলো? পেলেন না?” রাঘব চন্দ্রহাস না নামিয়ে কথা বলছেন।
“না, কিছুই নেই। এরকম কিছু আদৌ রেখে গেছেন কিনা সন্দেহ।”
রাঘবের খটকা লাগল। আর তখনই নাটক চরমে পৌঁছালো।
বারান্দায় অন্য প্রান্ত থেকে উপস্থিত হলেন আরেক আদিত্য নারায়ণ। হাতে তলোয়ার ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তার পেছনে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ তিনি ওই দিক থেকে কীভাবে আবির্ভূত হলেন, সেটাও প্রশ্ন। তিনি সামনে এসে আরেক আদিত্যকে দেখে থমকে গেছেন। উপস্থিত সবাই এই দৃশ্যে হতবাক। ভৈরব একসঙ্গে কটা রূপ নিতে পারে তবে?
এদিকে রেবাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, ওদিকের ঘরে আরেক রেবার শুয়ে থাকার সম্ভাবনা। সামনে দুজন আদিত্য। দুজনের হাতেই একইরকম তলোয়ার। তবে এটা রাঘব স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এর মধ্যেই একজন ভৈরব।
“তোদের মধ্যে যে ভৈরব সে বেরিয়ে আয়। আজ মায়ের সামনে আবার বলি হবে তোর।”
রেবা, আদিত্যদ্বয় সবাই একযোগে চিৎকার করতে লাগলো “আমি আসল, আমি, আমি! এদিকে তাকাও আমিই আসল, বিশ্বাস করো।”
রাঘব এবং অনুজ নারায়ণ নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এমনকী পুরোহিত মশায় এতক্ষণে মন্ত্র থামালেন এবং জোরে বলে উঠলেন,
“ওঁ হ্রীং শ্রীং চামুণ্ডায়ৈ নমঃ
পথ দেখাও মা, পথ দেখাও। এত বছর ধরে এই পরিবার তোমার পূজা করে এসেছে, শত বাধা থাকলেও তোমার পূজা বন্ধ করেনি, পথ দেখাও মা।” বলেই হোমের আগুনে ঘি ঢাললেন, দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো হোমের শিখা।
দাসী দু’জন দৌড়ে এসে বলল, “মা, ওখানে নেই। ঘরে নেই মা।”
রেবার দিকে চাইলেন রাঘব।
“আমি বলছি তো, চলে এসেছি আমি ঘর থেকে। তোমরা বিশ্বাস করছো না কেন?”
আর তখনই দ্বিতীয় আদিত্য বললেন, “আমার কাছেও প্রমাণ আছে। এই দেখুন।” বলেই তিনি অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন ক্ষণিকের জন্য । পরক্ষণেই কয়েক জন দাস-দাসীর সাহায্যে দুটো জিনিস নিয়ে হাজির হলেন। প্রথমে ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়া কুচকুচে কালো এক সিংহের মাথা, সিমেন্টে তৈরি। তারপর দেড় ফুট উচ্চতার পেতলের এক গণেশ মূর্তি। মূর্তি ছয় হাত বিশিষ্ট এবং তার কোলে বসে আছেন চিরযৌবনা এক নারী। এ মূর্তি উচ্ছিষ্ট গণেশের।
“এই দেখুন, মূর্তি পেয়ে গেছি। আপনি ঠিক বলেছিলেন, সোনালি সিংহের পেটের ভেতরেই ছিল এই মূর্তি। শুধু এদিক দিয়ে এলাম কারণ এদিক দিয়ে এলে দূরত্ব কম। দুটো ভারি জিনিস বয়ে আনতে হলো আমাদের। ভৃত্যরা ধীরে ধীরে আসছিল, তাই আমি খবরটা জানাতে খালি হাতেই উপস্থিত হয়েছিলাম।”
আদিত্য নারায়ণ এখনও নিজ সত্তার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু ততক্ষণে রাঘব যা বোঝার বুঝে গেছেন। পুরোহিত মশাই আবার চিৎকার করে উঠলেন-জয় মা রক্তদন্তিকা।
রাঘব, অনুজ নারায়ণ, রেবা, আদিত্য নারায়ণ, সমস্ত দাস-দাসী এবার চাইলেন অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা প্রথম আদিত্য নারায়ণের দিকে। তিনি হাসছেন, হাতের তলোয়ার ফেলে দিলেন মেঝেতে। খালি হাতে হাসতে থাকলেন আর হাসতে হাসতেই তার রূপের পরিবর্তন ঘটতে লাগলো। ধীরে ধীরে আদিত্য নায়ায়ণের উজ্জ্বল মুখ বদলে গিয়ে তার জায়গা নিতে লাগলো কুৎসিত এক দানবের মুখাবয়ব। হনু উঁচু, কাঁধ গোঁজা, লোমশ শরীর, চোখে পশুর হিংস্রতা। মুখের ওপরের অংশ বানরের মতো। এককালের তান্ত্রিক ভৈরব এখন আদিম যুগের মানুষ কিংবা দানব। সে হাসছে আর তার হাসির দমকে গোটা চন্দ্রহাস মহল থরথর করে কাঁপছে। আবার শুরু হয়েছে শৈত্য প্রবাহ। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে সবার।
“পুরোহিত মশাই, শত কষ্ট হলেও মন্ত্র বন্ধ করবেন না।” দাঁতে দাঁত ঠুকে কথাগুলো বলে ঠাণ্ডার মধ্যেই রাঘব এগিয়ে গেলেন ভৈরবের দিকে।
“বলেছিলাম না দেখা হবে আবার, শুরু হবে মৃত্যুর খেলা।”
এই প্রথম ফ্যাসফ্যাসে বিচ্ছিরি কণ্ঠে ভৈরব কথা বলে, “সন্ধি পূজার মধ্যে বলি দেবো। রক্ত পান করবো আকণ্ঠ। তোদের বলির খুব শখ না, আমার বাবাকে সেদিন রাতে তোরা খুন করেছিলিস। দেড়শো বছর হয়ে গেল! পারলি সে পাপ থেকে মুক্ত হতে?”
রাঘব সাহস নিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কে ছিল তোর বাবা?”
“আ-হ-হ! যে ছাব্বিশ জন যুদ্ধবন্দিকে সেদিন রাতে খুন করা হয়। তাদের মধ্যে একজন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে কাটা মাথাটা পেয়েছিলাম আমরা। ধড়টা নাকি ভোগ রান্নার জন্য কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল তারা। মা দন্তেশ্বরীর ভোগ হচ্ছিলো আমার বাবার মাংসে! আ-হ-হ!”
বোঝা যাচ্ছে ভৈরবের এই কাহিনি বলতে ভেতর থেকে কষ্ট হচ্ছে। ঘড়ঘড় করছে শব্দগুলো, ডুকরে উঠছে সে।
রাঘব বলেন, “তুই তো প্রতাপ নারায়ণকে শাস্তি দিয়েছিস। তার বংশকে কেন ধ্বংস করছিস? তারা তো কিছুই করেনি।”
এই কথা শুনে বাঁ পা উপরে তুলে মেঝেতে আছড়ে ফেললো ভৈরব, সঙ্গে সঙ্গে এক হাত জায়গায় ফাটল তৈরি হলো। বলতে থাকে, “আমার বংশ যে এগোতেই পারেনি পাষণ্ড প্রতাপ নারায়ণের জন্য। বাবা বলি হয়, মা আত্মঘাতী হয় মহারাজার সেনাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে। বোনকে তুলে নিয়ে চলে আসে তারা। সুভদ্র জানোয়ারটা তো সব দেখেছিল সেদিন। তোকে কি জানাতে হবে এসব?”
ভৈরবের প্রশ্নে রাঘব স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার মানে তিনি যা যা অনুধাবন করতে পারছিলেন, সুড়ঙ্গে রিশানের আচরণ নিয়ে যা যা ভাবছিলেন, সব সত্যি? তার মানে সত্যি আবার পুনর্জন্ম হয়েছে এই কাহিনির সূত্ৰধারদের? কিছুটা সময় চাই।
রাঘব কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেন। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন এক ঘন কালো গহ্বরে তলিয়ে গেলেন। রাঘবকে যেন কেউ সময়ের হিসেব পেরিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে ইতিহাসের এক কালো রাতের গর্ভে। আর তাতেই তিনি দেখতে পান ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন সুভদ্র। পেছনে তিন সৈনিক। মহারাজের তিন কুমারী চাই। সুভদ্র শুনেছে যুদ্ধবন্দিদের নিরীহ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে এই রাজ্যের সীমান্তে। এ রাজ্যে এমনিতেও মহারাজের জন্য কুমারী কমই অবশিষ্ট আছে। সীমান্ত থেকেই কুমারী তুলতে হবে আজ।
সীমান্তে পৌঁছে কিছু ছন দেওয়া চালাঘর দেখতে পেলেন সুভদ্র। ঘোড়া থেকে নেমে ঘরগুলোতে ঢুকে কুমারীর খোঁজ করতে লাগলেন। সবাই রাজসৈন্য দেখে ভয়ে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো। তবু দুজন কুমারী জোগাড় করা গেল। আরও একজন চাই। শেষ চালাঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই মশাল হাতে এক মহিলা এগিয়ে এলেন, সঙ্গে এক যুবতী, হাতে দাঁ।
“এক পা এগোলে গায়ে আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলবো। এক পা এগোবে না, চলে যাও তোমরা।”
মহিলা হিন্দিতে হুমকি দিলেন।
মহিলার কথা উপেক্ষা করে এগোতেই এক-দু’বার শূন্যে তিনি আগুন চালালেন। সুভদ্র দেখলেন এভাবে হবে না, তিনি ইশারায় সৈন্যদের বুঝিয়ে দিলেন পেছন থেকে যুবতীকে জাপটে ধরতে, তিনি সামনে থেকে মহিলাকে ব্যস্ত রাখছেন। দুমিনিটেই যুবতী ধরা পড়লো। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে নিজের গায়ে আগুন লাগালেন।
কুমারী কিনা পরীক্ষা করার জন্য মেয়েটাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন সুভদ্র এবং অচিরেই বেরিয়ে এলেন। ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাজমহলের উদ্দেশে রওনা দিলেন।
চোখ খুলেই রাঘব আঁতকে উঠলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই ভৈরব তার কুৎসিত রূপ নিয়ে রাঘবের একদম মুখের কাছে উপস্থিত হয়েছে। তিনি ঘাবড়ে দু’কদম পিছিয়ে গেলেন।
“এই সব দেখেছি আমি নিজের চোখে। পাশেই পূজা করছিলাম। মায়ের মৃত্যু, বোনের অসম্মান এবং পিছু করে শেষ পর্যন্ত বাপের বলি, সব একদিনে দেখেছিলাম। বাংলা জানতাম না। তিন বছর অপেক্ষা করেছি, বাংলা শিখেছি, সাধনায় শক্তি সঞ্চয় করেছি-তারপর রাজাকে খুঁজে বের করেছি। আর গত দেড়শো বছর ধরে…”
কথা শেষ না করেই আবার শব্দ করে পৈশাচিক হাসি হাসলো ভৈরব।
রাঘব এখন জানে এই পুনর্জন্মের মানে। চন্দ্রহাস হাতে নেবার পর থেকেই তিনি এসব দেখতে শুরু করেছেন আজ। বুঝতে পারছেন পুনর্জন্মের ব্যাখ্যা। কেন রিশান চন্দ্রহাস তুলেই রেখে দিলো, তার মানেও এখন পরিষ্কার। এই রিশানই হচ্ছে ভৈরবের পুনর্জন্ম। তাই চন্দ্রহাস ভোলা মাত্র পূর্বস্মৃতি মনে পড়ায় এবং চন্দ্রহাস ভৈরবের মারণাস্ত্র হওয়ায় সে তা তুলতে পারেনি। মহারাজ লিখেছিলেন, তিনি ক্ষণজন্মা হবেন। এর অর্থ একটাই-তনুশ। ভৈরব ও মহারাজ এ জন্মে একই গর্ভ ভাগ করে নিয়েছিলেন ভেবেই রাঘব শিহরিত হলেন। আর তার নিজের পরিচয়? এই বংশের আজীবনের দাস, মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের সেনাপ্রধান সুভদ্রকে চিনতে দেরি হয়নি আজকের রাঘবের। তার এই বাড়ির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক হবে না তো আর কার হবে? সে ওই কাহিনি বইয়ে পড়ে তিনি বিচলিত হবে না তো আর কে হবে? ইতিহাস আর ভাগ্য তাকে এই চন্দ্রহাস মহলে এনে ফেলবে না তো আর কাকে আনবে! এই কাহিনির শুরুই যে তার হাতে।
ভাবতে ভাবতেই বুকে সজোরে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়লেন রাঘব।
“সময় অল্প বাকি। আমার রক্ত চাই। বাধা দিতে এলে সব কটাকে আজ ছিঁড়ে, নিংড়ে রক্ত খাব।”
“এ বংশের দাস আমি, আমি সুভদ্র। আমি থাকতে এ কাজ তোর মতো তান্ত্রিককে করতে দেবো না। আর শুনে রাখ পাপী, গত জন্মের সুভদ্র আর এ জন্মের রাঘবের মধ্যে পার্থক্য আছে। গত জন্মে বুঝিনি, এ জন্মে জানি মা রক্ত চান না। মা শুধু সন্তানের ভালো চান। কখনো কোনো মা তার সন্তানের বুকের রক্ত পান করতে চাইতে পারেন না। সে মানুষ হোক কিংবা মহিষ। আর যদি চেয়েও থাকেন, তবে মা অশুভ শক্তি বিনাশ করে তাদের রক্ত চান। তোর মতো অসুরের রক্ত মা সবসময় কামনা করেন।”
“আ-হ-হ, তোর মা নয়। আজ আমি, ভৈরব খাবে এই বাড়ির রক্ত।”
বলেই মুহূর্তের ভগ্নাংশে অনুজ নারায়ণের সামনে এসে উপস্থিত হলো ভৈরব। তিনি ভয় পেয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। সামনে উদ্বাহু ভৈরব-নগ্ন, লোমশ, বীভৎস এক দানব। মেঝেতে পড়ে থাকা তলোয়ার নিজে থেকেই চুম্বকের মতো ভৈরবের হাতে চলে এলো। আর তখনই গর্জনটা শোনা গেল।
এত কথার মাঝে কখন কালো যমদূত মন্দিরে উপস্থিত হয়েছে কেউ লক্ষ্যই করেনি। এত বড় সিংহ দেখে দাস-দাসী যে যেদিকে পারে দৌড়ালো। জন্তুটি তাদের একজনের উপর লাফিয়ে পড়লো এবং একটা কানফাটানো শব্দ করে মাথাটি ধড় থেকে উপড়ে ফেললো।
এবার সে সামনে রেবাকে দেখতে পেয়ে সেদিকেই এগোল ধীর পায়ে। মিশমিশে গড়নের কালো প্রাগৈতিহাসিক সিংহকে এগিয়ে আসতে দেখে রেবা বুঝলেন তার শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
ওদিকে ভৈরব মন্ত্র পাঠ শুরু করেছে, তলোয়ারের ডগা ঘোরাচ্ছে অনুজ নারায়ণের সমস্ত শরীর জুড়ে। আদিত্য নারায়ণ তার মাকে বাঁচাতে ঝাপালেন সিংহের উপর। সিংহের কাঁধের কাছে গিয়ে পড়লেন, দু’হাতে জাপটে ধরে সিংহের গতি কমানোর চেষ্টা করলেন। কালো সিংহটা শুধু তার ঘাড়সহ কেশর নাড়িয়ে এক ঝটকায় আদিত্য নারায়ণকে ছুড়ে ফেলে দিলো। সজোরে নিক্ষেপ করায় মেঝেতে পড়া মাত্র কাঠের পা ভেঙে আলগা হয়ে গেল। এবার খোঁড়া পায়ে আর কোনোভাবে রাঘবকে সাহায্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সন্ধি পূজার প্রায় শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। পুরোহিত মশায়ের চোখে জল, কণ্ঠে চণ্ডী পাঠ। তেজের সঙ্গে তিনি আরতি করছেন এবং মন্ত্র পড়ছেন। এখনও বিশ্বাস করছেন যে অশুভ শক্তি কখনো এই তিথিতে জয়ী হতে পারে না। ঘণ্টা বাজাচ্ছেন এক হাতে, মাঝে মাঝে শঙ্খে দিচ্ছেন ফুৎকার।
রাঘব বুঝতে পারছিলেন না ঠিক কাকে আগে বাঁচাতে উদ্যত হবেন। সিংহের হাত থেকে রেবাকে নাকি ভৈরবের হাত থেকে অনুজ নারায়ণকে । কাছাকাছি অনুজ নারায়ণ ছিলেন। তিনি আগে তাকেই বাঁচাতে গেলেন।
ইতিমধ্যে এক ভৃত্য রেবাকে সাহায্য করার জন্য শক্ত এক লাঠি নিয়ে এগিয়েছে। সিংহটা শুধুমাত্র একটি থাবায় লাঠি ভেঙে বুকের কয়েকটা হাড় সুদ্ধ বের করে দিয়েছে তার। মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে সে, মৃত্যু শুধু সময়ের অপেক্ষা। অপর দিকে অনুজ নারায়ণ মেঝেতে, তার একদিকে ভৈরব অপর দিকে রাঘব। রাঘব চন্দ্রহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে ভৈরবের মন্ত্র পড়তে অসুবিধে হচ্ছে। সে বাম হাত তুলে দু’বার সমকোণে ঘোরালো। সঙ্গে সঙ্গে শীতের প্রকোপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেলো। আর সাধারণের সহ্যক্ষমতার মধ্যে রইলো না। বাগানে যে সমস্ত কাক জমা হয়েছিল যমকুলির বেশে, সেই সব কাক ঝাঁকে ঝাঁকে রাঘবের দিকে উড়ে এলো। তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতে লাগল রাঘবকে। চন্দ্রহাসকে শূন্যে লাট্টুর মতো ঘুরিয়ে কোনোক্রমে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন রাঘব।
ওদিকে সিংহ আর রেবার মধ্যে হাত পাঁচেক দূরত্বও নেই। আদিত্য হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসার বৃথা চেষ্টা করছেন। সিংহের রেবাকে ছিড়ে দাঁতে কড়মড় করে পিশে ফেলা যখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, ঠিক তখন সিংহের সামনে এসে পড়লো রাঘবের প্রিয় ছাত্র। রিশান। তার হাতে তলোয়ার চকচক করছে।
ভৈরব সেদিকে তাকালো একবার। তারপর মুচকি হাসলো। বিড়বিড় করে বলতে থাকলো, “তুমি আমার পুনর্জন্ম। তুমি আমার পুনর্জন্ম।”
এবার রিশান অদ্ভুত রুক্ষ্মভাবে বলল, “তুই আমার পূর্বজন্ম। আমি রিশান, আমি ভৈরব নই। আমার ভাইও মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ ছিল না, তনুশই ছিল। তার কাজের জন্য আমাকে যতটুকু ব্যবহার করার ছিল তা আমাকে দিয়ে করে ফেলেছিস। আর না।”
বলেই হাতের তলোয়ারটা সজোরে বসিয়ে দিল সিংহের সামনের ডান পায়ের থাবার। প্রচণ্ড গর্জন করে উঠলো সিংহ এবং ভৈরব দুজনেই। সিংহের মুখের ঠিক সামনে একই বিক্রমে গর্জন করে উঠলো রিশান।
ভৈরব আর দেরি না করে অনুজ নারায়ণের মাথা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালিয়ে দিলেন, চোখ বন্ধ করলেন অনুজ নারায়ণ। পরক্ষণেই চোখ খুলে দেখলেন তার গলা এবং ভৈরবের তলোয়ারের মাঝে রয়েছে চন্দ্রহাস। যার হাতল রাঘবের হাতে। সারা গায়ে কাক ঠোকরাচ্ছে লোকটাকে, তবুও প্রাণপণে চন্দ্রহাস দিয়ে আটকে দিয়েছেন তার অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।
ভৈরব এবার অনুজকে ছেড়ে রাঘবকে ধরলো। নিমেষে পরিশ্রান্ত রাঘবকে চন্দ্রহাস সহ তুলে ফেলে দিলো সে। আর ঠিক তখনই পুরোহিতমশাই জানালেন, “শেষ হল সন্ধি পূজা। এবার বাকি নবমী, শুধুই অসুর বধের দিন।”
রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়লো ভৈরব। মনে হল যেন চন্দ্রহাস মহলে মহাপ্রলয় আসছে। সিংহও রক্তাক্ত থাবা সামলে রিশানের চারদিকে ঘুরতে থাকলো। কাকের উপদ্রব সামলে কোনোক্রমে উঠে দাঁড়ালেন রাঘব। চন্দ্রহাস উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে।
ভৈরব আর রাঘব নিজেদের প্রদক্ষিণ করছে, পাশাপাশি কালো সিংহ এবং রিশানও তাই করছে। প্রত্যেকের মুখই বজ্রকঠিন। রাঘব-রিশান দুজনেই লড়ছে পূর্বজন্মের পাপস্খলনের জন্য, আলোর পক্ষে। অন্য দিকে অন্ধকার গায়ে মেখে অতীতের পাপের পক্ষে দুই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী।
ভৈরব রূপ পরিবর্তন করলো। এক উন্মাদ হাতির রূপ নিলো সে। এ হাতি আজকের হাতি নয়, হারিয়ে যাওয়া এক উন্মাদ ম্যামথ। আকারে-আয়তনে প্রকাণ্ড। চন্দ্রহাস মহলের ছাদে ঠেকলো তার পিঠ, এর রঙও নিকষ কালো। ম্যামথ এগিয়ে গেল রাঘবকে থেঁতলে দিতে। পাশাপাশি সিংহটাও বিরাট থাবা নিয়ে রিশানের দিকে লাফালো।
সিংহ সফল হলো, রিশানকে এক থাবায় কয়েক হাত দূরে নিয়ে ফেললো সে। হাতের তলোয়ার গেল ছিটকে। রিশান আর মৃত্যুর দূরত্ব কয়েক মুহূর্তের।
হাতিটা তেড়ে গেছিল রাঘবের দিকে, রাঘব লাফিয়ে সরে গেলেন এবং হাতির পায়ে সজোরে চন্দ্রহাস দিয়ে আঘাত করলেন। পেছনের দু’পা কেটে মাংস ছড়িয়ে পড়লো মন্দির চত্বরে। এত রক্তপাত হয়েছে আজ উঠোনে যে এটা মন্দির চত্বর নয়, কসাইখানা লাগছে।
হাতি ব্যর্থ হতেই ভৈরব আবার নিজ রূপে ফিরে এলো। রাগে-অপমানে ফুঁসছে সে। রেবা ইতিমধ্যে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। অনুজ নারায়ণ কোনোক্রমে মন্দিরের দেয়ালে হেলান দিয়ে পড়ে আছেন। প্রাণ আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না।
সিংহ এগিয়ে আসছে রিশানের দিকে। মাটিতে পড়ে রিশান মুখ উঁচিয়ে চাইলো, ঠিক মাথার উপরে খড়্গদন্ত দুটো উপস্থিত হয়েছে। না, মৃত্যুকে ভয় পেলো না সে, বরং মৃত্যুর চোখে চোখ রাখলো। আর তখনই একটা ফাঁস এসে পড়লো সিংহের গলায়।
আদিত্য নারায়ণের কীর্তি। নির্দেশ দিলেন, “কালো সিংহের মাথাটা এর মাথায় পরাও। এ কিছু দেখতে পাবে না।”
আদিত্য সিংহদুয়ারের ভাঙা মাথাটা কোনোক্রমে ঠেলে দেয় রিশানের দিকে। কিন্তু সে মাথা এতই ভারি যে রিশান অবধি পৌঁছায় না। পুরোহিত মশাই আর এক ভৃত্য এগিয়ে আসে। দুজন ভৃত্য এসে আদিত্য নারায়ণের সঙ্গে ফাঁসটিকেও শক্ত করে ধরে। রিশান এবং বাকিরা মিলে কোনোক্রমে ভারি পাথরের কালো সিংহের মাথাটা উপরে তুলে এক ঘা বসিয়ে দেয় জ্যান্ত ছটফট করতে থাকা কালো সিংহের মাথায়। এরকম আরও দু’ঘা দিতে কিছুটা নিস্তেজ হয় সিংহ। তারপর সবাই মিলে মোটা দড়ি দিয়ে সিংহটাকে বাঁধার চেষ্টা করে।
এদিকে পুরোহিত মশায় আবার চণ্ডী পাঠ শুরু করেছেন, ভৈরবের অসহ্য লাগছে সে মন্ত্র। সে এবার তার প্রকাণ্ড ভয়াবহ রূপ নিলো। প্রায় গোটা মন্দির জুড়ে শুধু ভৈরবের রূপ। প্রাগৈতিহাসিক সিংহকেও আকারে এক-তৃতীয়াংশ মনে হতে লাগলো। মনে হলো, আলতামিরার গুহাবাসীদের আঁকা প্রকাণ্ড প্রাগৈতিহাসিক বাইসন এসে দাঁড়িয়েছে মা রক্তদন্তিকার মন্দিরে। সেই বাইসনকে রোখার মতো ক্ষমতা এই ধরাধামে কারো নেই।
রাঘব চন্দ্রহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে। সত্যি তার জানা নেই, এখন কী করতে হবে। বাইসন দৌড়ে এলো এবং মাথা দিয়ে তুলে ফেলে দিলো রাঘবকে। এরকম আরও দু’বার। রাঘব বুঝতে পেরেছে আর সম্ভব নয়। আছাড়ের আঘাতে একটা হাতও ভেঙে গেছে রাঘবের। এক হাতে চন্দ্রহাস ধরেছেন ঠিকই, কিন্তু চন্দ্রহাসকে এই বাইসনের সামনে। এত ছোট লাগছে যে এত উঁচুতে, এর ঘাড়ে পৌঁছানো অসম্ভব।
চতুর্থ বারের জন্য বাইসন এগিয়ে আসছে, এবার হয়তো শিং দিয়ে রাঘবের শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে ছিটকে ফেলে দেবে তাকে। কিন্তু বাইসন রাঘব অবধি পৌঁছানোর আগেই আদিত্য নারায়ণ উচ্ছিষ্ট গণেশ মূর্তি নিয়ে সামনে এলেন, আর ক্ষণিকের জন্য হলেও ভৈরব যেন বাইসনের ভেতরে থেকেও কেঁপে উঠলো। আদিত্য নারায়ণ এক পা নিয়ে মেঝেতে বসেই উচ্ছিষ্ট গণেশ মূর্তি উঠিয়ে ধরে রাখলেন বাইসনরূপী ভৈরবের দিকে। মন্ত্রপাঠ করতে থাকলেন।
“একদন্তায় বক্রতুণ্ডায় গৈরিতনায়ায়ৈ ধীমহি
গজেশানায় ভালচন্দ্রায় শ্রী গনেশায় ধীমহি!”
আর তখনই রিশান এক পা গেড়ে এসে বসলো রাঘবের সামনে। রাঘব আর কালবিলম্ব না করে দৌড়ে রিশানের উপর ভর করে শূন্যে উঠে চন্দ্রহাসের কোপ বসাল বাইসনের মাথায়। সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। তবু মাথা কাটতে পারলেন না। শুধু ভয়াবহ বাইসন পুনরায় ভৈরবে রূপান্তরিত হল। আর রাঘব ভাঙা হাত নিয়ে নিজের শেষ চেষ্টা করে পড়ে রইলেন মেঝেতে।
ভৈরব দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুই হয়নি। রিশান, আদিত্য, রাঘব সবাই ভয় পেলো। তবে আর কীভাবে সম্ভব? আর কীভাবে?
ভৈরব এবারও হয়তো কিছু করতো, কিন্তু করতে গিয়েও লুটিয়ে পড়লো। তার ঠিক মুখের কাছেই পড়েছিল উচ্ছিষ্ট গণেশের মূর্তি। আদিত্য নারায়ণের হাত থেকে ছিটকে পড়েছে মূর্তিটা।
এবার এক অভিনব বলির আয়োজন করা হলো। ঠিক যেভাবে আজ থেকে দেড়শো বছর আগে মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ বলি দিয়েছিলেন তার পোষ্য সিংহ এবং ভৈরবকে, একইভাবে প্রাগৈতিহাসিক সিংহ এবং প্রাগৈতিহাসিক ভৈরব রূপকে যূপকাষ্ঠে বাঁধা হলো।
পুরোহিত মশাই একবার বললেন, নবমীতে অশুভের বলি দেওয়া পুরোনো রীতি । অশুভ শক্তি বিনাশ হয় নবমীতে।
আদিত্য নারায়ণ ও রিশান প্রস্তুত ছিলেন। ইতিমধ্যেই আরেকটা কাঠের পা লাগিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন আদিত্য। এক ভৃত্য অন্দরমহল থেকে কাঠের পা এনে সাহায্য করেছে আদিত্যকে। রাঘবও আদিত্যকে দেওয়া কথা রাখতেই সিংহটাকে ছেড়ে দিয়েছেন তার হাতেই। রিশানের এবার চন্দ্রহাস তুলতে গিয়ে কোনো অসুবিধে হয়নি। তার চিত্ত শুদ্ধি হয়ে গিয়েছে।
পুরোহিত মশাই মন্দির কাঁপিয়ে মন্ত্রপাঠ করতে থাকলেন-
“তৎ ক্ষমস্ব মহাভাগ, গান্ধববং লোক মাপুহি।”
রিশান নিজের পূর্বজন্মের পাপী রূপ ভৈরবকে এবং আদিত্য নারায়ণ কালো সিংহটাকে বলি দিলেন। এবারেও ভৈরবের রক্ত গিয়ে পড়লো কালো সিংহটার উপর। এবারেও সবাই আশ্চর্য হলো, যেভাবে দেড়শো বছর আগে মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ হয়েছিলেন। তবে এবার বোধহয় শুভ কিছুই ঘটবে। কালো সিংহের রঙ ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে যাচ্ছে। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের সাধের চন্দ্রহাস মহলও ধীরে ধীরে অভিশাপ মুক্ত হচ্ছে।
