চন্দ্রহাস – ১.৭

অধ্যায় ৭

বস্তার, এক কালে এই বস্তার জেলা মধ্যপ্রদেশের রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। কিন্তু সন ২০০০-এ যখন ছত্তিশগড় রাজ্য তৈরি হয় তখন বস্তারকে ছত্তিশগড়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ যে সময়ের কাহিনি লিপিবদ্ধ আছে প্রফেসর রাঘবের বইয়ে, তা তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের ঘটনা, কিন্তু বর্তমানে তা ছত্তিশগড়ে অবস্থিত।

বস্তার জন্মলগ্ন থেকেই রাজন্যশাসিত ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীতে এই রাজ্যের পত্তন করেন রাজা আন্নামা দেব। তিনি ছিলেন ওরাঙ্গেলের কাকাতিয়া রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের ভাই।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শেষে ১৯৪৭-এ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে রাজি হয়েছিল বস্তার। বস্তারের মূল জেলা হেড কোয়ার্টার অবস্থিত জগদলপুরে, বস্তারের প্রাণভোমরা এই জগদলপুর। দান্তেওয়াড়া, কাঁকেড় এবং কোন্ডাগাঁও নিয়ে বস্তার। আর এদের মধ্যে মা দন্তেশ্বরী মন্দির অবস্থিত দান্তেওয়াড়ায়। জগদলপুর তহসিল থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরত্বে এই মন্দিরের অবস্থান। মায়ের মন্দিরের নামেই জায়গার নাম। কাকাতিয়া রাজারাই মায়ের পূজা শুরু করেন বলে শোনা যায়।

***

হাওড়া থেকে কোরাপুট এক্সপ্রেস নিয়েছিলেন প্রফেসর রাঘব-রিশান জুটি। প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টার পথ । বেশিরভাগটাই দুজনে দুজনের মতো কাটিয়েছেন। কখনো বই পড়ে, কখনো অডিও স্টোরি শুনে, কখনো পেরিয়ে যাওয়া সবুজ মাঠ দেখতে দেখতে। শুকনো খাবার সঙ্গেই নিয়েছিলেন তারা, বাকি স্টেশনে এবং ট্রেনে সারলেন। এক কথায় ছাব্বিশ ঘণ্টায় যতটা ধকল হবার কথা, ততটা ক্লান্ত হলেন না তারা। বরং দুজনেই ভেতরে ভেতরে খুব উত্তেজিত হয়ে আছেন যে কখন দান্তেওয়াড়াতে গিয়ে মন্দিরে পৌঁছাবেন তারা। রাস্তায় মাঝে মাঝে রাঘব বস্তার সম্পর্কে অল্প অল্প করে রিশানকে যেটুকু বললেন, তাতে সে উপরোক্ত জিনিসগুলো জেনে বস্তার ও মা দন্তেশ্বরী মন্দির নিয়ে অল্প কিছুটা ধারণা পেলো মাত্র। বাকি কাহিনি যে সুবিশাল ইতিহাস নিয়ে হাজির হবে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না রিশানের।

গতকাল রাত সাড়ে ন’টায় ট্রেন ছেড়েছিল। আজ রাত এগারোটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা জগদ্দলপুর। ট্রেন লেট হওয়ায় তারা পৌঁছালো যখন তখন রাত প্রায় দেড়টা।।

ট্রেন থেকে লাগেজ নিয়ে নেমেই দুজনেই বুঝলো যে, এই জায়গাতেই আজ রাত কাটাতে হবে। কারণ এখান থেকে আজ দান্তেওয়াড়া গিয়ে কিছু করার নেই এবং ব্যাপারটায় খানিকটা ঝুঁকিও আছে। একে তো অচেনা জায়গা, তার উপর ভাষা বিভ্রাট। এখানে বেশিরভাগ লোক লোকাল গণ্ডি ভাষায় কথা বলে, বাকিরা হালবি ভাষায় যেটা ছত্তিশগড়ের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা। এছাড়া অন্যান্য লোকজন সব ভাত্রি ভাষায় কথা বলে যা উড়িয়া ভাষারই এক অংশ। এখানে হিন্দিতে কাজ চালাতে হবে ভেবেই এসেছেন। রাঘব।

রিশানকে নিয়ে স্টেশন থেকে বেরোলেন তিনি। রাত অনেক হয়ে গেছে তাই গাড়ি-ঘোড়া তেমন কিছুই চোখে পড়লো না। তাদের সঙ্গে যারা এসেছিলেন সবাই হুটহাট কোথায় কীভাবে রিকশা অটো ইত্যাদি নিয়ে বেরিয়ে গেল, দুই বাঙালি বুঝতেও পারলো না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পথচলতি এক-আধজনকে আশেপাশের হোটেলের সন্ধান জিজ্ঞেস করলো দুজনে।

“ভাই সাব, এখানে ভালো কোন হোটেল আছে? রাতে থাকতে…?”

“এখন তো সব বন্ধ হয়ে গেছে। সব বন্ধ!”

উত্তরগুলো ভাঙা হিন্দিতে আসছিল। ক্যাব বুক করা, অনলাইন হোটেল বুকিং ইত্যাদির চেষ্টাও করলো তারা। কিন্তু ভালো নেটওয়ার্ক না থাকায় সেসব চেষ্টা বিফলে গেল।

“হোটেল আগে বুক করে নেওয়া উচিত ছিল, স্যার।”

“হ্যাঁ, সেটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু করেই বা কী করতাম? সেখানে যেতাম কীভাবে? গাড়ি সমস্যা তো থাকছেই। এখন বলিস না ফ্লাইটে এলেই ভালো হতো। আমি জিজ্ঞেস করেই টিকিট করেছিলাম। তখন তুইই বলেছিলিস, ‘ট্রেনের অ্যাডভেঞ্চারই আলাদা’।”

রিশান হাত তুলে আত্মসমর্পনের ইঙ্গিত দেয়। এই কথাবার্তার মাঝেই একটা ছোট কালো ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে।

“দান্তেওয়াড়া যাবেন বাবু?”

রিশান এবং রাঘব দুজনেই চমকে উঠলেন। ছত্তিশগড়ের ট্যাক্সিচালক বাংলায় জিজ্ঞেস করছে! তাও আবার গন্তব্য আগে থেকেই জানে? বেশ আশ্চর্য হয়ে রাঘব ঘাড় নেড়ে উত্তরে হ্যাঁ বললেন।

“উঠে পড়ুন তবে। আমি ডিকি খুলে দিচ্ছি।”

কিছুই বুঝতে পারছিলেন না দুজনে। আর এভাবে অচেনা জায়গায় হুট করে এরকম সন্দেহজনক একটা লোকের গাড়িতে উঠেই পড়েন কী করে তারা? কয়েক মুহূর্তেই সংবিৎ ফেরে তাদের। রাঘব জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কী করে জানলে আমরা বাঙালি এবং দান্তেওয়াড়াই যাব?”

শুনে ডাইভার লোকটা যেন খুব মজা পায়। খসখসে গলায় উত্তর দেয়, “বাংলা ছেড়ে এখানে আছি অনেককাল। বাঙালি আর উড়িয়ার পার্থক্য এ চোখ চিনে নেয়।”

“সে না হয় বুঝলাম। আমাদের বেশভূষা দেখে আন্দাজে ঢিল মেরে লাগিয়েও দিয়েছ। কিন্তু আমাদের গন্তব্য জানলে কী করে? সত্যি করে বলল নইলে আমরা যাব না তোমার সঙ্গে।” এবার রাঘব প্রশ্ন করে।

লোকটা হেসে বলে, “বাবু, আমরা ট্যাক্সি চালাই। প্যাসেঞ্জারদের জায়গার নাম করেই ডাকি। দান্তেওয়াড়া না হলে কাঁকেড় বলতাম। প্রথমেই আপনারা উত্তরে জানিয়ে দিলেন সেখানেই যাবেন তাই অন্য কিছু বলার প্রয়োজন হল না। চলুন বাবু, উঠে পড়ুন। রাত বাড়ছে।”

“আমরা ভেবেছিলাম এখানেই আজ রাতে থাকি। এত রাতে ভালো হোটেল কোথায় পাবো, কিছু বলতে পারবে?” রাঘব এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না লোকটার কথা।

“বাবু, দন্তেশ্বরী মা যখন ডাকছেন তখন আর সময় নষ্ট কেন? সরাসরি সেখানেই চলুন। আমার চেনা হোটেল আছে। সেখানে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নিন, উঠে পড়ুন।”

রিশানের দিকে চেয়ে চোখে চোখে জিজ্ঞেস করলেন রাঘব। রিশান বলল, “চলুন স্যার, যা হবে দেখা যাবে। দুজন আছি যখন এত ভয় কী?”

রাঘব আর আপত্তি করলেন না। লাগেজ ডিকিতে রেখে দুজনেই উঠে পড়লেন গাড়িতে।

অন্ধকার কেটে কেটে ট্যাক্সি এগোতে লাগলো। সব চুপচাপ, সব নিঝুম। যেন রাত্রির গর্ভগৃহে সেঁধিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সি। চারদিকে ফুট দশেক উঁচু পাথরের টিলা, তার উপর নানারকম গাছগাছালিও আছে হয়তো। ট্যাক্সির আলোতে সেভাবে বোঝার উপায় নেই। কুমড়ো ফালি চাঁদের আলোও মেঘে ঢেকে গেছে আজ। এরকম দম বন্ধ করা নিস্তব্ধতায় প্রাণ আইঢাই করে ওঠে রাঘবের। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কতক্ষণ লাগবে পৌঁছাতে?”

“রাস্তা এই সময় ফাঁকা থাকে বাবু। চারটের আগেই পৌঁছে যাবো।”

“হুম, তুমি থাকো কোথায়?”

“এই বস্তারেই আছি বাবু, অনেক বছর হলো। দিনে ট্যাক্সি চালাই, দান্তেওয়াড়াতে রাতে ঘুমোই।”

“তাহলে আমাদের পেয়ে ভালোই হলো। একেবারে প্যাসেঞ্জার নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছো।”

“আমি তো আপনাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম বাবু। এবার গিয়ে শান্তিতে ঘুমাবো।”

রাঘব আর কথা বাড়ালেন না। ড্রাইভারের এই সব হেঁয়ালি তার আর ভালো লাগছে না। ওদিকে রিশানও চোখ বন্ধ করে আছে। তিনিও ঘুমোবার চেষ্টা করলেন।

তন্দ্রা এসেছিল যেন, ঘোরের ভেতর রাঘব শুনতে পেলেন একটা কণ্ঠ।

“বাবু, ও বাবু। যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সেখানে একটিবারের জন্য আপনাদের আসার কারণটি বলবেন। ওখানেই সব পেয়ে যাবেন। চন্দ্রহাসটা খুঁজে বের করুন বাবু। অনেককাল হলো, রক্ত না পেয়ে গলাটা কেমন কাঠ হয়ে গেছে। কতকাল আমরা রক্ত পাই না। বাবু, ও বাবু!”

ধড়মড়িয়ে উঠলেন রাঘব। সব আগের মতোই নীরব, নিস্তব্ধ। রিশান ঘুমোচ্ছে, ডাইভার চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার ।

রাঘব ডাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কিছু বললে আমাকে?”

ডাইভার না তাকিয়েই উত্তর দেয়, “না বাবু। আমি কী বলব? আপনার চোখ লেগে গেছিল বোধহয়।”

“তাই হবে। এবার ক্লান্ত লাগছে। প্রায় দেড় দিনের জার্নি এখনও শেষ হয়নি। একটু ঘুমানো দরকার। পৌঁছে গেলে তুলে দিও আমাদের। আর সাবধানে চালাও, বাইরে যা অন্ধকার!”

“চিন্তা করবেন না। ঘুমোন আপনারা।”

রাঘব এবার ঘুমোলেন। বাইরে এক অবাক করা পৃথিবী এখন। যেন হাজার অভুক্ত ছায়ামূর্তি এই গাড়ির পেছন হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটছে। সবার যেন একটাই কামনা!

রক্ত, রক্ত চাই। কতকাল তেষ্টা মেটেনি। বলি দাও, নররক্ত দাও।

এই সব ছায়ামূর্তি দান্তেওয়াড়া অবধি পেছন পেছন গেল। তারপর শঙ্কিনী এবং ধঙ্কিনী নদীর কোলে এসে থেমে গেল। নদী দুটির জলের রঙ আলাদা। এরই কোলে মা দন্তেশ্বরীর বাস। সকল ছায়ামূর্তি এসে কালো জলে ডুবে গেল। গাড়িটা মন্দির সংলগ্ন একটি ইটের পাঁজর বের হয়ে আসা ছোট বাড়ির সামনে এসে থামলো।

“বাবু, বাবু!”

ড্রাইভারের খসখসে গলায় ঘুম ভাঙলো রিশানের। ডাক দিতে রাঘবও উঠে পড়লেন। বিল মিটিয়ে নেমে পড়লেন। ডাইভার বলল, “এই বাড়িতে গিয়ে উঠুন। বলবেন ট্যাক্সি করে একজন এখানে নামিয়ে দিয়ে গেছে।”

“একজনের নামটা জানলে হয়তো সে চিনতে পারবে।”

“নাম লাগবে না। বলবেন, মা দন্তেশ্বরীর মন্দিরে যাওয়ার জন্য এসেছেন।”

লোকটার সঙ্গে কথা বাড়াতে আর ইচ্ছে করছিল না রাঘবের। রিশানকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি।

“চন্দ্রহাসের কথা বলবেন, জায়গা পেয়ে যাবেন।”

এবার রাঘব আর রিশান দুজনেই থমকে দাঁড়ালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরলেন। একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই কিন্তু তাতে কোনো ড্রাইভার আর বসে নেই। দুজনেই এই আকস্মিকতায় অবাক হয়ে গেলেন। এত তাড়াতাড়ি একটা লোক কোথায় উবে গেল?

“কেউ আছেন? হ্যালো?”

রাঘব ঘরটির সামনে গিয়ে হিন্দিতে চেঁচিয়ে ডাকলেন। একটা ছোট একচালা ইটের ঘর, টিনের ছাদ। মেরেকেটে দুটো ঘর হবে ভেতরে। ড্রাইভার হোটেলে নিয়ে যেতে বলার পরেও, এখানে কেন নিয়ে এলো কেউই বুঝতে পারছেন না। কিন্তু যেহেতু এক অপার্থিব ইতিহাসের খোঁজেই বেরিয়েছেন, সুতরাং ভবিতব্য যেদিকে নিয়ে যাবে সেদিকে যাওয়াই সমীচিন। আবার ডাকলেন রাঘব, “কেউ আছেন?”

এবার দরজার কড়া একটু জোরেই নাড়লেন রাঘব।

ভেতরে এবার শব্দ হলো। কেউ যেন আসছে। দরজা খুলে গেল পরক্ষণেই। ভেতরে হারিকেন জ্বলছে। একজন অতি বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে পিঠ, মুখে অজস্র বলিরেখা।

বৃদ্ধ বেশ ঝাঁঝিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে তোমরা?”

রাঘব সবিনয়ে জানালেন, “আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। ঐযে বাইরে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে, সেটার চালক আমাদের বললেন এখানে আশ্রয় পাওয়া যাবে।”

“কোথা থেকে যে উটকো ঝামেলা এসে ঘাড়ে জোটে! বলি এটা কি কোনো হোটেল? দেখে সেরকম লাগছে? কলকাতার লোকেদের কি ঘটে এইটুকু বুদ্ধি নেই?” বিরক্ত হয়ে, কাঁপা গলায় কথাগুলো বললেন বৃদ্ধ। তারপর আরও যোগ করলেন, “চলে যাও তোমরা। এত রাতে বুড়ো মানুষের ঘুমটা ভাঙালে।”

দরজা প্রায় বন্ধই করে দিচ্ছিলেন তিনি। রাঘব কোনোক্রমে হাত দিয়ে থামিয়ে বললেন, “আমরা দন্তেশ্বরীকে দর্শন করতে এসেছি।”

বৃদ্ধ এবার খিঁচিয়ে উঠলেন, “তাতে আমি কী করবো? রোজ শয়ে শয়ে লোক আসে, সবাইকে আমার ঘরে আশ্রয় দেব না কি! কী আবদার!”

রাঘব বুঝলেন এবার আর কিছু করার নেই। তবু শেষ চেষ্টা চালালেন। তখন পেছন থেকে আচমকা ভেসে আসা আদেশের পালন করলেন মরিয়া হয়ে, “দেখুন, আমরা চন্দ্রহাস খুঁজছি। সেটার খোঁজেই আসা।”

এই কথায় কাজ হল। বৃদ্ধ দরজা বন্ধ করতে গিয়েও করলেন না।

“কী খুঁজছো?”

“চন্দ্রহাস।”

বৃদ্ধ যেন এবার ভয় পেলেন, “কে দিয়ে গেছে তোমাদের এখানে?”

“জানি না। অদ্ভুত কথা বলছিল লোকটা। কিছুই বুঝিনি সেরকম। শেষে বলল যে আপনাকে চন্দ্রহাসের কথা বললেই আপনি থাকতে দেবেন এবং পরক্ষণেই ট্যাক্সি এখানে রেখে কপূরের মতো উবে গেল যেন। রাঘব কিছুটা সাহস পেয়ে গড়গড় করে সব বলে দিলেন।

বৃদ্ধ সব শুনে বললেন, “তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢোকো তোমরা, জলদি।” বলেই তাদের ঘরে ঢুকিয়ে দরজার খিল দিয়ে দিলেন।

দুটো ঘর বাড়িতে। একটা রান্নাঘরও আছে যেটা ভেতরের ঘরের লাগোয়া। মাটি লেপা মেঝে। শুধু দেয়ালটাই যা ইট আর সিমেন্ট দিয়ে বানানো। এরকম নিকানো ঘরে বহুকাল থাকা হয়নি রাঘবের, আর রিশানের এ অভিজ্ঞতা প্রথম বার। হারিকেনে দপ দপ করে আগুন জ্বলছে। বৃদ্ধ দুই গ্লাস জল এনে দিলেন, “আজ তোমরা ক্লান্ত। বিশ্রাম নাও এই ঘরে। আমি পাশের ঘরে আছি। প্রয়োজনে ডাকবে। আর প্রকৃতির ডাকে এই দরজাটি দিয়ে বেরোবে। বেরোলেই স্নানঘর পেয়ে যাবে।” বৃদ্ধ একটা দরজার দিকে আঙুল নির্দেশ করেই পাশের ঘরে চলে গেলেন।

রাঘব, রিশান দুজনেই কিছুক্ষণের মধ্যে লাগেজ রেখে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লেন। ওদিকে ভোর হয়ে এসেছে।

জানালাটা খোলা ছিল। সেদিক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। রাঘব একবার উঠে জানালা বন্ধ করতে গেলেন। যেদিক দিয়ে ভেতরে এসেছিলেন তারা, সেদিকটা দেখা যায় জানালা দিয়ে। রাঘব সেদিকে চাইলেন, কিন্তু এখন এই ভোরের আলোতে আর কোনো ট্যাক্সি সেখানে দেখা যাচ্ছে না। দূরেই মা দন্তেশ্বরী মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। একবার চেয়ে মনে হলো, সেই ড্রাইভার যেন সেদিকে হেঁটে চলে যাচ্ছে। এবার তার গায়ে পুরোহিতের বেশ। একবার ফিরে তাকালো যেন রাঘবের দিকে, রক্তাভ সে দৃষ্টি। রাঘব চাইতে পারলেন না। জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন।

ঘুম চাই একটা, অখণ্ড ঘুম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *