চন্দ্রহাস – ১.১৩

অধ্যায় ১৩

একটা বোঁটকা গন্ধে ঘুমটা ভেঙেছিল রিশানের। যখন ঘুমিয়েছিল, এই গন্ধটা ছিল না। উঠে রিশান দেখলো, পাশের বিছানায় রাঘবস্যার নেই। বাইরে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির শব্দ আসছে। একটা জানালা কোন ভাবে খুলে গেছে এবং কাঠের পাল্লাগুলো বাতাসের দাপটে দড়াম দড়াম শব্দ করছে। একা ঘরে একটু ভয়ই করলো রিশানের। গন্ধের তীব্রতা বাড়ছিল, গা গুলিয়ে উঠছিল রিশানের। সে ওয়াশরুমে গেল। বমি করে কিছুটা অস্বস্তি কমলো যেন। ওয়াশরুম থেকে যখন বেরোতে যাবে তখন বেরোবার পথের ঠিক ডান দিকে দরজায় হাতলের মতো কী যেন একটা দেখতে পেলো। এটা আগে এখানে ছিল কি? নিশ্চয়ই ছিল। রিশান দেখতে পায়নি শুধু।

অদ্ভুত গড়নের লোহার হাতল। দেওয়ালের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে রঙ করায় হঠাৎ দেখলে বোঝা যায় না। এ জন্যই হয়তো অন্য দিন খেয়াল করেনি সে। সে হাত দিয়ে চাপ দিল হাতলটা। ঘড়ঘড় শব্দ হল একটা, পিছিয়ে গেল রিশান। তার চোখের সামনে একটু একটু করে দেয়াল দু’ ভাগ হয়ে গেল। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অবধি গিয়ে দেয়াল থেমে গেল। ওয়াশরুমের আলোয় ভেতরটা আবছা দেখা যায়। একটা ছোট ঘর। রিশান কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাবলো, কী করা উচিত। তারপর যা হয় কপালে ভেবে তাতে ঢুকে গেল সে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে দেয়াল আবার জুড়ে গেল।

দরজাটা বন্ধ হতেই অন্ধকারে ঢেকে গেল ঘর। কিছুই আর দেখা যাচ্ছে । বোঁটকা গন্ধটা এখন আর নাকে আসছে না। এই পথের হদিশ দিতেই যেন গন্ধের আবির্ভাব হয়েছিল। কিছুক্ষণ অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে রইলো সে। চোখ এক সময় অন্ধকার সয়ে গেল আর তখনই সে দেখতে পেলো সামনে ঘরের এক কোণ থেকে একটা হালকা লাল আলো দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সেদিকেই এগিয়ে গেল সে। আলোর উৎসের কাছে যখন পৌঁছালো, তখন একটা দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেলো। হাত দিয়ে চাপ দিতেই সে দরজা খুলে গেল। আর খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ফ্যাসফ্যাসে নারী কণ্ঠ শুনতে পেলো সে, “এসে গেছিস বাবা?”

রিশান থমকে দাঁড়ালো। ইনি কে আর কার অপেক্ষা করছেন? ভেবে পেল না সে।

“আয় বাবা, ভেতরে আয়। তোকে অনেক কথা বলার আছে।” আবার সেই কণ্ঠ।

রিশান জিজ্ঞেস করে, “আপনি আমাকে চেনেন নাকি?”

এবার আবার চুপ। উত্তর এলো না।

রিশান আবার জিজ্ঞেস করলো, “চেনেন আমাকে?”

এবার উত্তর এল, “না, সে তো চিনি না। কিন্তু ওরা আমাকে বলেছে তোকে ঠিক পথ চিনিয়ে নিয়ে আসবে। আর কথা বাড়াস না বাপ, গল্পটা যেটুকু মনে আছে বলে ফেলি। কাজ শেষ তবে আমার।”

গল্প শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই এবার মাথা কাজ করলো রিশানের। ইনি নিশ্চয়ই সৌদামিনী। রাঘবস্যারের অভাব অনুভব করলো রিশান । অগত্যা সে একাই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো।

লাল আলোয় ছেয়ে আছে ঘর। সামনে বিছানায় লিকলিকে এক বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন, বোঝা যাচ্ছে। আলোর উল্টো দিকে মুখ করে থাকায় চেহারা বোঝা যাচ্ছে না।

“কাছে এসো না বাপ, ওদিকটায় বসো।”

কথা শেষ করে বৃদ্ধা ঘরের কোণে একটি জায়গা দেখালেন। রিশান চুপচাপ গিয়ে ওই জায়গায় বসে পড়লো।

“সব কিছু আর মনে নেই। যেটুকু মনে পড়ছে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বলছি।”

“বলুন।”

“একটা গণেশ মূর্তি এসেছিল মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের হাতে। ভৈরব দিয়েছিল সেই মূর্তি। বলেছিল সেই মূর্তির যেন নিত্য পূজা হয়। পূজাপদ্ধতিও ভৈরব লিখে দিয়েছিল মহারাজকে। সন্তান লাভের আশায় মহারাজ সেই মূর্তির পূজা শুরু করলেন।”

“এটা কবেকার ঘটনা?” অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় কথার মাঝেই প্রশ্ন করে বসে রিশান।

“বাবা, আমি কিছুই জানি না। শুধু যেখান থেকে মনে পড়ছে, স্মৃতি যতটুকু দান করছে আমাকে, আমি ততটুকুই দিচ্ছি তোমায়। কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে।”

রিশান নিরস্ত হয়।

“মহারাজ প্রথমে কিছুদিন পূজা করতে শুরু করেন ঠিকই, কিন্তু ভক্তিতে বোধহয় অভাব ছিল। সেটা বুঝতে পেরে ভৈরব নিজে একদিন পূজার সময় মন্দিরে উপস্থিত হয় এবং মহারাজের পাশে বসেই তান্ত্রিক উপাচারে সেই গণেশের পূজা শুরু করে। মহারাজ তাকে বাধা দেননি।

মহারাজ এতদিন যেভাবে পূজা করছিলেন, এবার দেখলেন, ভৈরব সম্পূর্ণ অন্য প্রথায় পূজা করছে। পূজার সময় পূজাকক্ষে ভৈরব আর মহারাজ ছাড়া আর কেউ থাকছে না। ভৈরব নিজে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর পূজা করতে বসে সে ধীরে ধীরে নিজের অঙ্গবস্ত্র খুলতে আরম্ভ করে, মুখে বিড় বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে মুখে তুলে নেয় কয়েক টুকরো নাড়ু, যা গণেশের প্রিয় খাদ্য। সেই নাড়ু চিবিয়ে ছড়িয়ে দেয় গণেশের দিকে। পাশে রাখা সুরাপাত্র থেকে সুরা ঢেলে নিজে পান করে এবং মন্ত্র পড়তে পড়তে সেই পাত্রের সুরাই গণেশের দিকে এগিয়ে দেয়। যেসব উপাচার এবং ক্রিয়া সে পূজার সময় ব্যবহার করে, মহারাজ সেগুলো দেখেন এবং শিহরিত হয়ে ওঠেন। বুঝতে পারেন এই সবই হচ্ছে তান্ত্রিক বামাচার। এ জিনিস যে বাড়িতে হয় সে বাড়ির অমঙ্গল নিশ্চিত। কিন্তু তবু সন্তান লাভের তীব্র ইচ্ছায় মহারাজ কোনোরূপ বাধা দেন না। জোড় হাতে বসে থাকেন ভৈরবের পাশে।

একদিন ভৈরব মন্দিরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করার পর মহারাজকে জানায়, রোজ আমি পূজা করছি, তাতে আমার কোনো অভীষ্ট থাকলে পূরণ হবে। আপনার অভীষ্টের জন্য আপনাকে অন্তত পূজাপদ্ধতি পালন করতে হবে। আমার সঙ্গে আজ আপনি একইভাবে পূজা করবেন।

মহারাজ নিরুপায় হয়ে রাজি হলেন। ভৈরব নিজে হাতে মহারাজের সমস্ত অঙ্গবস্ত্র খুলে ফেললো। একজন পুরুষ এই প্রথম মহারাজের গায়ে হাত দিলো, লজ্জা নয় বরং এক অন্যরকম শিহরণ খেলে গেল যেন তার শরীরে। আগে কখনো তার এই উপলব্ধি হয়নি।

ভৈরব সুরাপাত্র এগিয়ে দিলেন প্রতাপ নারায়ণের দিকে। তিনি তা পান করলেন। বেশ কয়েক বার পান করার পর তার চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করলো। অবশিষ্ট উচ্ছিষ্ট সুরা গণেশকে উৎসর্গ করলো ভৈরব। ভৈরব নিজেও বস্ত্রহীন, সে নিজেও গণেশের উপাসনায় ব্রতী হল। মহারাজ ভৈরবের দেখাদেখি সমস্ত তান্ত্রিক বামাচার ক্রিয়া করতে লাগলেন।

গণেশ মূর্তিটা থেকে যেন আজ তেজ ঠিকরে বেরোচ্ছে। দুই ভক্ত সমস্ত নিয়ম মেনে তার সামনে বিবস্ত্র হয়ে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করছে, উচ্ছিষ্ট খাবার একের পর এক ছুড়ে দিচ্ছে, তীব্র ঝাঁঝালো সুরার গন্ধে মন্দির ম ম করছে, ধূপের ধোঁয়া ঢেকে ফেলেছে পূজাকক্ষ। আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সেই ধোঁয়াচ্ছন্ন ঘরে মহারাজ হঠাৎ অনুভব করলেন ভৈরবের স্পর্শ। ভৈরব ধীরে ধীরে তার জঙ্ঘাদেশে এসে বসছে। শারীরিক উত্তেজনা অনুভব করলেন প্রতাপ নারায়ণ। বহু সুন্দরী নারীর সঙ্গেও এইরকম উত্তেজনা তিনি অনুভব করেননি। এত বছর ধরে প্রায় সমস্ত নেশা করার কারণে যে জীবনীশক্তি শূন্যতে গিয়ে ঠেকেছিল, সেই শক্তি যেন আজ তিনি ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছিলেন।

মন্দিরের বাইরে থেকে সিপাহিরা হঠাৎ ভৈরবের তীব্র চিৎকার শুনতে পেলো। এ চিৎকার ব্যাথার নয়, এটা মর্ষকামের আনন্দধ্বনি।

এই ঘটনার পর রোজ মহারাজ ভৈরবের সঙ্গে নিজে গণেশ পূজা শুরু করলেন। তিনি দিনে পুরুষসঙ্গ পেয়ে যতটা উল্লাসিত হতেন, রাতে রানি বিম্ববতীকে বিছানার চাদরের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পেরে ততটাই আনন্দ পেতেন। বিম্ববতীও এতদিন পর মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের মধ্যে এক কামার্ত পুরুষকে খুঁজে পেয়ে নিজের এতদিনকার ক্ষুধা নিবৃত্তি করছিলেন। প্রতি রাতে সম্পূর্ণ সঁপে দিতেন তিনি নিজের দেহটাকে। মহারাজ তাকে নিয়ে বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতেন। রানি বিম্ববতীর শীৎকার নাকি সেই সময় চন্দ্রহাস মহলের সবাই শুনতে পেতো। মহারাজও পিঠভর্তি টাটকা নখের আঘাত নিয়ে পরদিন পূজায় বসতেন। একই সঙ্গে নারী এবং পুরুষ দুইয়েতেই মজেছিলেন তিনি। সবাই সব জানতো, কিন্তু মহারাজা প্রতাপ নারায়ণকে প্রশ্ন করার সাহস কারোও ছিল না।

এভাবেই দিন কাটতে থাকে। প্রথম দিনের পূজার প্রায় মাস চারেক পর একদিন দূতসভায় বসে কথাবার্তা চলাকালীন হঠাৎ অন্দরমহলের ডাক পেলেন মহারাজ।

অন্দরমহলে যাওয়া মাত্র রানি বিম্ববতী তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং প্রতাপ নারায়ণের হাত নিজের নিম্ন উদরে ছোঁয়ালেন। এর অর্থ মহারাজ বুঝতে পারলেন। খুশিতে আত্মহারা হলেন। নতুন প্রাণ, নতুন প্রাণ!

ভৈরবকে এই ঘটনা জানাতে সে হেসে শুধু বলেছিল, “বলেছিলাম না, উচ্ছিষ্ট গণেশ খুব জাগ্রত দেবতা। তিনি কারোও মনোবাঞ্ছা অপূর্ণ রাখেন না। মহারাজের জয় হোক।”

সেদিনের পর থেকে মহারাজের ভেতরে আবার এক পরিবর্তন শুরু হলো। তিনি রানি বিম্ববতীর সঙ্গেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে শুরু করেন। এখন আর উচ্ছিষ্ট গণেশ পূজা তিনি করেন না। ভৈরবকেই সে দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি রানির স্ফিত উদরে হাত রেখে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারেন। এতকাল যে রাজা শুধু মানুষের প্রাণ নিয়েছেন, সেই রাজাই এই প্রথম প্রাণের সৃষ্টি করে এক অপার্থিব ভালো লাগায় আবিষ্ট হয়েছেন। তার মন প্রসন্নতায় পূর্ণ। তিনি সকল রকম মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধ, নারীসঙ্গ এমনকী সুরাপান থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিলেন। এ যেন এক অন্য মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ। রানি বিম্ববতীর সঙ্গে সময় কাটানো ছাড়া বাকি সময় তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন বেদ-উপনিষদ পাঠে।

এই নতুন রাজাকে দেখে তার সকল সভাসদ থেকে প্রজা সবাই ধন্য ধন্য শুরু করল। শুধু একমাত্র ভৈরবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে যেন অন্য কিছুর আভাস পাচ্ছে যা তার মনোস্কামনা পূরণের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
 

যথা সময়ে দুর্গাপূজা শুরু হলো। রাজবাড়িতে হইহই কাণ্ড। দেশবিদেশ থেকে অতিথি সমাগম হলো। মন্দিরে বসে ভৈরব শুধু অপেক্ষা করতে থাকলে সন্ধি পূজার। সে এই দেহরূপ খাঁচা থেকে মুক্তি চাইছে প্রাণপণে। তার লক্ষ্য অনেক বড়।

মহাষ্টমী রাতে রাজবাড়িতে প্রতি বছরের ন্যায় প্রচুর লোকসমাগম হলো। নরবলি হবে এ কথা সবাই জানতো, তাই বলি দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় আছড়ে পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। তাছাড়া এ বছর এক সৎ সন্ন্যাসী নিজে থেকে নিজেকে বলি প্রদত্ত করেছেন এবং বিগত এতগুলো সময় রাজ্যের কোনো প্রজার কোনো অনিষ্ট তিনি করেননি-এই সব কথা প্রচার হয়ে গেছিল। তদুপরি মহারাজের কোলে যে শিশু আসতে চলেছে তাও নাকি এই সন্ন্যাসীর জন্যই, এসব রটে গেছিল। আজ তাই রাজবাড়িতে ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে সিপাহিরা।

ব্রাহ্মমুহূর্তে ভৈরবকে মা রক্তদন্তিকার সামনে আনা হলো। খাটো ধুতি পরা খোলা চুলের ভৈরবকে দেখে অনেকেই নাকি সেদিন আঁতকে উঠেছিলেন। কপালে তার লাল টিকা, গলায় রুদ্রমালা, হাতে বেঁধেছেন লাল চুনরি। পিছমোড়া করে তাকে বেঁধে আনা হচ্ছে। এত দিনে ভৈরবের গোঁফ জোড়া আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে, সেই দাড়ি-গোঁফের আড়াল থেকে অক্ষিকোটরে বসা রক্তবর্ণ চোখে সে চারদিকে তাকাচ্ছে। যূপকাষ্ঠে তার মাথা গলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক থেকে বেঁধে ফেলা হলো। মাথায় পরিয়ে দেওয়া হল কালো কাপড়। ভৈরবের দৃষ্টিতে অন্ধকার নামলো। শুধু শ্রবণেন্দ্রিয় জাগ্রত রইলো। সে নিজের গায়ে জলের ধারা অনুভব করলো, বলির আগে স্নান করানো হচ্ছে তাকে। প্রধান পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। চারদিক ঢাক-ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রে মুখরিত। দেবীর মূর্তির সামনে একজন ধুনুচি নিয়ে আরতি শুরু করেছে। সন্ধি পূজার মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। উপস্থিত নরবলির সময়ও।

ভৈরব শুধু অপেক্ষা করতে লাগলো চন্দ্রহাসের আঘাতের। এক আঘাতেই সে দ্বি-খণ্ডিত হতে চায়।

সব আয়োজনের পর মহারাজের ডাক পড়েছিল। শোনা যায়, তিনি নাকি আজকের আয়োজনের কথা বিস্মৃত হয়েছিলেন, ধ্যানস্থ ছিলেন চন্দ্রহাস মহলের এক অজানা কক্ষে। ডাক পড়ার কিছু সময় পর তিনি

সেখানে উপস্থিত হলেন। বিগত তিন বছরের ন্যায় লাল শালুতে জড়িয়ে এলেন না, এলেন সাদা পোশাকে। পুরোহিতরা তৈরিই ছিল। মহারাজের আগমনে মন্ত্রোচ্চারণ এবং পুষ্পবর্ষণ বৃদ্ধি পেলো।

প্রধান পুরোহিত এসে প্রতাপ নারায়ণের হাতে তুলে দিলেন সদ্য পূজা করা চন্দ্রহাস। গলায় মালা এবং কপালে টিকা নিয়ে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ চন্দ্রহাস অন্যবারের মতোই রক্তের অপেক্ষায়। মহারাজ যূপকাষ্ঠের নিকট উপস্থিত হলেন এবং চন্দ্রহাসকে মাথার উপর তুলে পূর্ববত বলির মুদ্রায় গেলেন। কাঁসর-ঘণ্টা-চামর-ঢাক-ঢোল-শঙ্খধ্বনির মাঝে প্রধান পুরোহিত চিৎকার করে বলে উঠলেন,

‘তৎ ক্ষমস্ব মহাভাগ, গান্ধর্ববং লোক মাপুহি।’

ভৈরব দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তৈরি হয়ে গেল, মুহূর্ত উপস্থিত। মহারাজ চন্দ্রহাস উপরে তুলে সজোরে নীচে নামালেন।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।

জনতা হতবাক হয়ে গেল। মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী চন্দ্রহাস নামিয়েছেন সরাসরি মন্দিরের মেঝে লক্ষ্য করে। মেঝেতে ফাটল ধরেছে কিন্তু ভৈরবের গায়ে সেই আঘাতের আঁচড়টুকু লাগেনি।

প্রধান পুরোহিত বলেছিলেন, ‘এ কী করলেন মহারাজ?’

মহারাজ এর উত্তরে সমগ্র প্রজার উদ্দেশে বললেন, ‘এই জীবনে অনেক অন্যায় করেছি আমি, যার মধ্যে এই নরবলি সর্বপ্রধান। যেদিন থেকে প্রাণ সৃষ্টির অর্থ অনুধাবন করেছি, সেদিন থেকে আমার চিত্ত শুদ্ধি ঘটেছে। আজ থেকে আমি আমার রাজ্যে নরবলি বন্ধ করলাম।’

কথাটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রজাগণ আনন্দে ফেটে পড়লো। মহারাজের জয়ধ্বনি শুরু হলো। সেই গর্জনে ভৈরবের চিৎকার চাপা পড়ে গেছিল। ভৈরব কিন্তু সেদিন মৃত্যুই চেয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়েই ভৈরব চিকার থামিয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলো।

এই ঘটনার পর ভৈরবকে ছাড়লেন না মহারাজ। রাজ্যের প্রধান পুরোহিতের পদে উন্নীত করলেন। ভৈরবের ক্ষমতা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকলো। বিভিন্ন রকম তান্ত্রিক বামাচারের আরাধনা সে করতে লাগলো। সমস্ত তান্ত্রিক অভিচার যথা মারণ, উচাটন, স্তম্ভন, সম্মোহন, বিদ্বেষণ, বশীকরণ সবকিছুতেই সে উঠেছিল একমেবাদ্বিতীয়ম।

ভৈরব কিন্তু এসবের মাঝে মহারাজকে আবার ভোগী করার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু মহারাজ আর সে পথে ফিরে তাকাননি। অগত্যা বুদ্ধি করে ভৈরব মহারাজকে বলেছিল বাড়িতে দেবীমূর্তির সঙ্গে দেবীবাহন থাকলে পরিবারের তথা রাজ্যের মঙ্গল। মহারাজ এই কথায় রাজি হয়েছিলেন। সুদূর আফ্রিকা থেকে এসেছিল পশুরাজ সিংহ। সিংহের চোখের মতো অবিকল দৃষ্টি আনার চেষ্টা করে নিজের ছবিও আঁকিয়েছিলেন মহারাজ। কিন্তু তখন আর তার সেই তেজ ছিল না। তাই চিত্রকরকে মহারাজের চোখ আঁকার সময় মহারাজের পুরোনো ছবির সাহায্য নিতে হয়েছিল।

জন্তু-জানোয়ারদের পোষ মানাতে মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের চেয়ে দক্ষ বোধহয় ভূ-ভারতে কম লোক ছিলেন। অচিরেই পশুরাজ পোষ মেনেছিল। তখনও এই পরিবারে জানে না কী দুর্যোগ আসতে চলেছে।

নির্দিষ্ট সময়ে মহারাজের কোল আলো করে সন্তান এলো। ভগবান যখন দেন, বেশিই দেন। যমজ সন্তান হল মহারাজের। রাজ্যে খুশির হাওয়া বইতে লাগলো।

ইতিমধ্যে ভৈরব মহারাজকে এই খুশিতে বাসন্তী পূজা করার জন্য বলে। মহারাজ পূজার কথায় রাজি হলেন। যথা সময়ে পূজার দিন এগিয়ে আসে এবং পূজা শুরু হয়। মহাষ্টমীর দিন মহারাজ পূজা আসরে বসেছিলেন। ভৈরব এসে বলেছিল, ‘মহারাজ, রাজাদেশে নরবলি বন্ধ হয়েছে। এ বড় শুভ উদ্যোগ। কিন্তু মা বারবার তার পিপাসা জানান দিচ্ছেন আমাকে।’

‘কিন্তু নরবলি তো আর সম্ভব নয়।’

‘নরবলি কেন হবে মহারাজ! কিন্তু অন্যান্য বলি তো হতেই পারে। আর এখন থেকে সেই বলির রক্ত আপনার হাতে না লাগলেই তো হয়। আমি বলি দেবো।’

মহারাজা এবারেও আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু ভৈরব এতটাই দেবীর প্রকোপের ভয় দেখালো যে মহারাজ শেষ পর্যন্ত ভৈরবের কথা মানতে বাধ্য হলেন। ভৈরব একটা তলোয়ার নিয়ে বেরিয়ে গেল মণ্ডপ ছেড়ে। বলে গেল, ‘দেবীর সামনে গত বছর বলিতে বাধা দিয়েছেন। আমি দূর থেকেই বলি দিয়ে কাটা মুণ্ডু আনছি। আপনারা অপেক্ষা করুন।’

মহারাজ স্বীকৃতি দিলেন।

কিন্তু অনেকটা সময় অপেক্ষা করেও যখন ভৈরব ফিরলো না, তখন সবাই প্রতাপ নারায়ণকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করলেন। কদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না, তিনি রাজি হলেন।

তিনি অন্দরমহলে যখন প্রবেশ করছেন, তখন ভৈরবকে দেখতে পেলেন। তাকে অন্দরমহলের কাছে দেখে বেশ অবাকই হলেন তিনি। জিজ্ঞেস করায় ভৈরব বলে, ‘ওই দেখুন মহারাজ, মায়ের ভোগ।’

মহারাজ মুখ ফিরিয়ে তাকানোর আগেই এক দাসী দৌড়ে এসে কী একটা বলল। মহারাজ তৎক্ষণাৎ শয়নকক্ষের দিকে চলে গেলেন। কিছু বুঝতে না পারার ভান করে ভৈরবও সেদিকেই গেল।

মহারাজ যখন পৌঁছালেন, তখন সেই ঘরে দাস-দাসী কেউ নেই। শুধু বিম্ববতী জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে হেলান দিয়ে সন্তানকে স্তন্য পান করাচ্ছেন। এ দৃশ্য তার চেনা। মাঝে ভারী পর্দা থাকায় বিম্ববতীকে আবছা দেখা যাচ্ছে। প্রতাপ নারায়ণ কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। ধীরে ধীরে পর্দা তুলতে থাকলেন। এক এক করে পর্দা উঠতে থাকলো আর সামনের দৃশ্য পরিষ্কার হলো। শেষ পর্দাটা ওঠানো মাত্র চোখ ফেটে রক্ত এলো যেন। বিম্ববতী এখনও হেলান দিয়েই বসে আছেন আসনে। যমজ শিশুপুত্রের একজনকে স্তন্য পান করাচ্ছিলেন। সেই অবস্থাতেই কেউ তার মস্তক ছেদন করেছে। শুধু তাই নয় শিশুপুত্রের মাথাও কেউ কেটে নিয়েছে। মুণ্ডুবিহীন একটি ধড়কে স্তনের সামনে ধরে বসে আছেন মুণ্ডুবিহীন বিম্ববতী । হাতের বাঁধন এখনও অটুট, শিশুটি যেন মাটিতে না পড়ে যায়। স্তনবৃন্ত এখনও খোলা। তা থেকে দুধ পড়ছে অল্প অল্প, রক্তের সঙ্গে মিশে সে রঙও লাল।

মহারাজ চিৎকার করতে গিয়ে বুঝলেন তার কণ্ঠ রোধ হয়েছে। শব্দ বেরোচ্ছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে ভৈরবের শান্ত কণ্ঠস্বর শুনলেন তিনি, ‘মহারাজ, এই দেখুন।’

মহারাজ ভৈরবের দিকে ফিরে চাইলেন। ভৈরব দু’হাতে দুটো থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। থালা দুটোতে বিম্ববতী এবং তাদের শিশুপুত্রের খণ্ডিত মস্তক সাজানো রয়েছে।

মহারাজ শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ভৈরবকে মেরে ফেলতে গেলেন। কিন্তু অসুস্থ শরীর একটু উঠেই পড়ে গেলেন। ততক্ষণে সিপাহিরা চলে এসেছিল। তারাই ভৈরবকে বন্দি করল। মহারাজ জ্ঞান হারালেন।

সেদিন রাতেই মহারাজের জ্ঞান ফিরলো এবং তিনি সন্ধি পূজার সময় মা বাসন্তীর সামনে ভৈরবকে বলি দেবেন ঠিক করলেন।

রাজার একান্ত অনুগত সিপাহিদের সামনে সেই বলির আয়োজন হয়েছিল। তখনও রানি বিম্ববতী ও তার পুত্রের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি। মুণ্ডুহীন দুটো ধড় মহলের এক ঘরে অপেক্ষা করছিল, আর মহারাজ চন্দ্রহাস নিয়ে মন্দির চত্বরে অপেক্ষা করছিলেন। ভৈরবকে আনা হলো এবং যূপকাষ্ঠে তার মাথা রাখা হলো। দেহ বাঁধা হলো বজ্র আঁটুনিতে। প্রতাপ নারায়ণ আদেশ করলেন মাথার কাপড় সরিয়ে দিতে। আদেশ পালন করা হলো তৎক্ষণাৎ। ভৈরব মহারাজকে দেখে বিদঘুটে হাসতে লাগল।

‘কী করেছিলাম আমি? কেন করলি তুই আমার সঙ্গে এমন?’

‘কী করেছি? সামান্য নিজের প্রাণাহুতি চেয়েছিলাম সন্ধি পূজা তিথিতে। সেটা আপনি বন্ধ করেছিলেন। এই তিথিতে মায়ের সামনে আমার বলি না হলে আমার সারা জীবনের সমস্ত পরিশ্রম, সাধনা বিফলে যেতো। তাই আজ আমার শেষ সুযোগ ছিল। অকালবোধনে যা হয়নি, অন্তত বাসন্তী পূজায় তা পেতে চেয়েছিলাম। তাই বাধ্য হয়েই আজ রানি বিম্ববতী ও আপনাদের পুত্রসন্তানকে খুন করতে হলো। নইলে আপনি কোনোভাবেই আমাকে বলি দিতে প্ররোচিত হতেন না। এই সবই নিজের এক অভীষ্ট লাভের চেষ্টা ছিল। নইলে এত সহজে বলির জন্য লোক পাওয়া যায় কি মহারাজ? আর দেখুন, আমি এখন আমার অভীষ্ট লাভ করতে চলেছি। আর যে পুত্রের মায়া আপনি করছেন সেই পুত্র কিন্তু আমার জন্যই আপনি পেয়েছিলেন। যে প্রাণ দেয়, সে নিতেও পারে মহারাজ।’

‘ভুল, ভুল। সারা জীবন এই ভুলটা করে শিখেছি ভৈরব। প্রাণ নেওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই। একমাত্র ঈশ্বর পারেন সেটা। আজ তোকে আমি বলি নয়, শাস্তি দিচ্ছি। অপরাধের শাস্তি, রাজদণ্ড। দু-দুটো খুনের জন্য শাস্তি দিচ্ছি তোকে।’

‘বেশ দিন। তবে তো রাজদণ্ডের নিয়মানুসারে শেষ ইচ্ছে জানতে হয়। মহারাজ।’

সুচতুর ভৈরব আবারও কথার জালে ফাঁসিয়েছিল প্রতাপ নারায়ণকে।

‘বল, কী চাস তুই?’

‘আমার আগে আপনাকে আপনার পোষ্যের প্রাণ হরণ করতে হবে। আপনার আদরের পশুরাজ সিংহকে বধ করুন।’

‘অসম্ভব। আমার রাজ্যে বলি আর দেওয়া হবে না। অন্য কিছু চাইতে পারিস, সুযোগ দিচ্ছি।’

‘না, আর কিছু চাই না। এই আমার শেষ ইচ্ছে। হয় পূরণ করুন আমার শেষ ইচ্ছে, নয় আমাকে রাজদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।’

এ মহারাজ আগের অমানুষ প্রতাপ নারায়ণ নন, তিনি বাধ্য হয়ে মেনে নিলেন এই ইচ্ছে। তার সাধের পশুরাজকে এনে ভৈরবের মুখোমুখি যুপকাষ্ঠে বেঁধে ফেলা হলো। সিংহগর্জনে রাজবাড়ি মুখরিত হয়ে উঠলো। শেষবারের মতো সিংহটির কেশরে হাত বুলিয়ে আদর করে নিলেন মহারাজ। পরক্ষণেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং এক কোপে সিংহের মাথা কেটে নিলেন। সে রক্ত গিয়ে পড়েছিল ভৈরবের গায়ে। জিভ দিয়ে সে রক্ত পান করে। মুখে বলে, ‘আমাদের একই সঙ্গে সমাধিস্থ করবেন মহারাজ।’

মহারাজ তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চন্দ্রহাসের আঘাতে ছিন্ন করেছিলেন ভৈরবের মস্তক।

উপস্থিত সবাই এবার এক আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ করে। ভৈরবের গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে, সে রক্তের বর্ণ লাল নয়, ঘন কালো। আর সেই কালো রক্ত সরাসরি গিয়ে পড়ছে দ্বিখণ্ডিত সিংহের উপর। সেই রক্ত স্রোতে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে সিংহের দেহ। আর তারপর সে দেহে যেন প্রাণ সঞ্চারিত হচ্ছে। নড়েচড়ে উঠছে সে দেহ। যূপকাষ্ঠ থেকে ঘাড়ের অবশিষ্টাংশ বের করে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে সেই নিকষ কালো সিংহ।

উপস্থিত সবাই এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলেন। একমাত্র মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ হাতে চন্দ্রহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেখানে। ঘরটা হঠাৎই গমগম করে উঠলো। একটা কণ্ঠস্বর যেন মহলের চারদিকে পাক খেতে লাগল। ভৈরবের কণ্ঠস্বর, যা চেয়েছিলাম আজ তাই হলো। রাজা, সে রাতে মা দন্তেশ্বরী মন্দিরে তুই আমার পিতাকে হত্যা করেছিলিস। আজ তোর স্ত্রী-পুত্রকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিলাম। আমার মৃত শরীরের রক্ত পড়েছে এই সিংহের উপর। আর তান্ত্রিক বামাচারী ভৈরবের কালো রক্ত পড়া মানে জগতের সমস্ত কালো দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই সিংহ। যতক্ষণ না এর মাথা জোড়া লাগছে ততক্ষণ তোরা জীবিত। আর রাজা, তুই বলি বন্ধ করেছিলিস না? আজকের পর প্রতি অকালবোধনে সন্ধি পূজা তিথিতে তোকে বা তোর পরিবারকে বলি দিতে হবে। সে রক্ত মানুষের হতে পারে কিংবা যে কোনো পশুর। কিন্তু প্রতি উনপঞ্চাশতম এবং পঞ্চাশতম বছরে যথাক্রমে অস্থিমজ্জা সহ নররক্ত এবং পূর্ণাঙ্গ নররক্ত পান করব আমি। বলি দিবি তোরা, আর সে রক্ত পৌঁছাতে হবে আমার সমাধিতে। যে বছর বলি হবে না সে বছরই মড়ক লাগবে। আর আমার কাহিনি তোরা কেউ সম্পূর্ণ মনে রাখতে পারবি না। তবে হ্যাঁ, আমি আমার কাল আমার কাহিনিতে লুকিয়ে রেখেছি। মনে করতে না পারলে এই অভিশাপ বছরের পর বছর চলবে। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়ে গেলাম নিজের জীবন দিয়ে। মর তোরা, মর, মর, মর…’

কথাগুলো পাক খেতে লাগলো মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে। মহারাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলেন শুধু। মন্ত্রীরা দেখলেন সত্যি সত্যি সিংহটা আবার জীবিত হয়ে উঠছে। রাজাকে তারা বললেন, ‘কিছু করুন মহারাজ। আর বেশি সময় নেই।’

মহারাজ নিজেই জানতেন না কী করতে হবে। হঠাৎ তার মনে পড়লো জীবদ্দশায় বলা ভৈরবের শেষ কথাটা। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিলেন সুড়ঙ্গ পথ খুলে দিতে। মন্ত্রীরা উঠে-পড়ে লাগলেন। খোলা হলো সুড়ঙ্গ পথ। ভৈরবের মৃতদেহ এবং প্রায় জীবিত হয়ে ওঠা সিংহকে বেঁধে নিয়ে চললেন সবাই সুড়ঙ্গ দিয়ে। সিংহের মাথাটিও সঙ্গে নেওয়া হলো। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের এক কালকুঠুরিতে সেদিন কবর দেওয়া হয়েছিল ভৈরব এবং সেই কালো সিংহকে। অতি দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। কারণ সিংহের মাথাটিও নড়তে শুরু করেছিল এবং ধড়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। যারা ধরে রেখেছিল, তারা সিংহের ধড় ও মাথার মধ্যে ক্রিয়া করতে থাকা এক আশ্চর্য আকর্ষণ বলকে অনুভব করেছিল।

কাজ শেষ করে কোনোক্রমে একে একে সবাই সুড়ঙ্গ দিয়ে যখন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন তখন প্রথম বার সিংহের গর্জন শোনা গিয়েছিল। একটা চাপা রুক্ষ দীর্ঘশ্বাস যেন ধীরে ধীরে ফণা তুলছিল-মৃত্যুর ফণা। সেই শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছিল।

মহারাজ ঠিক করেছিলেন সবাইকে তুলে তারপর নিজে উঠবেন। কিন্তু মন্ত্রীরা প্রায় আদেশ অমান্য করেই সেদিন মাঝপথে মহারাজকে উপরে তুলে দেন। তারপর আর এক-দুজন উঠতে পেরেছিল। মহারাজ দেখেছিলেন এক মিশমিশে কালো দীর্ঘকায় যমদূত একে একে বাকি সবার প্রাণ হরণ করছে। একবার সে মহারাজের দিকেও চেয়েছিল। চোখ রাখতে না পেরে মহারাজ সুড়ঙ্গ পথ আটকে দিয়েছিলেন।”

থামলেন বৃদ্ধা, হাঁপাচ্ছেন তিনি।

“আর মনে নেই। মায়ের সঙ্গে এক সন্ন্যাসী দেখা করে কীসব দরকারি কথা বলেছিলেন, আমি শুনে ফেলেছিলাম বাড়ি ফেরার পথে। কিন্তু মনে নেই। ভৈরব ভুলিয়ে দিয়েছে। কিছু করার নেই। আমার কাজ আমি এখানেই শেষ করলাম। এবার তুই চলে যা বাপ, একটু বিশ্রাম নেব আমি।”

রিশান যখন এক তলার শোয়ার ঘরে ফিরলো তখন ভোর হয়ে গেছে। বৃষ্টি থেমেছে বহুক্ষণ। তার রাঘবস্যার এখন চণ্ডী পাঠের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রিশানকে দেখেই রাঘব যা বোঝার বুঝে ফেললেন। রিশানের চোখের নীচে এক রাতেই যেন অনেক কালো জমেছে। রাঘব সস্নেহে বললেন, “রাতভর তো ঘুমোসনি। এখন এ বেলা একটু ঘুমিয়ে নে। দুপুরে দুজনে মিলে বসছি। সৌদামিনী দেবীর গল্পটা আমার শোনা ব্রজ নারায়ণের গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিলে আশা করি একটা স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাবে। নে, চটপট শুয়ে পড়। আমি আসছি।”

রাঘব বেরিয়ে গেলেন আর রিশান বিছানায় মাথা রাখতেই রাজ্যের ঘুম যেন তার চোখে নেমে এলো।

‘ওঁ নমশ্চণ্ডিকায়ৈ।

ওঁ মার্কণ্ডেয় উবাচ।।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাঘবের চণ্ডী পাঠে গমগম করতে লাগলো চন্দ্রহাস মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *