অধ্যায় ৮
“তোমরা যে আমার দুয়ারে এসেছে তা কতটা কাকতালীয় বা কতটা অলৌকিক আমি জানি না। শুধু এইটুকু জানি, তোমরা আমাকে বস্তারের যে গল্পটি বলেছ সেটা বাপু সত্য। এই সত্য ভেঙে-চুরে এই অঞ্চলের অনেকেই জানেন কিন্তু আমি হয়তো একটু বেশিই জানি।”
বৃদ্ধ সকাল সকাল পূজা-আহ্নিক সেরে রাঘব ও রিশানকে নিয়ে বসেছেন। লিকার চায়ের সঙ্গে বিস্কুট এবং চিড়ে ভাজা খেতে খেতে কথা বলছেন তারা।
“আপনি আমাদের গল্পটা বলুন। আমাদের বিশ্বাস এই গল্পের জন্য আমাদের পরিবারে প্রচুর মৃত্যু ঘটে গেছে। জানা নেই আরও কত ঘটবে। রাঘবস্যারের হাতেও অজান্তে রক্ত লেগেছে, আমাদের বিশ্বাস ইতিহাসে এরকম কিছু একটা কাজ করে ফেলেছি আমরা, যার সমাধান করতে হলে এই গল্পের ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে।” কথাগুলো বলে দম নেয় রিশান।
বৃদ্ধ কী বুঝে মাথা নাড়লেন, বোঝা গেল না। মুখে বললেন, কাহিনির শুরু আমি করে দিতে পারি। কিন্তু এ কাহিনির শেষ নেই। কিছু তথ্য তোমরা পাবে যা তোমাদের সমস্যার সমাধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পূর্ণ তথ্য অন্য জায়গায় লুকিয়ে।
“বেশ। আপনি শুরু করুন।” রাঘব উন্মুখ হয়ে আছেন কাহিনির জন্য ।
“ধুরুয়া, হালবা, সওয়ারা, আবুঝমাড়িয়া আরও না জানি কত আদিবাসী অধ্যুষিত এই বস্তু কিংবা বস্তারে এক সময় চন্দ্রবংশীয় রাজপুত রাজারা রাজত্ব করতেন। এরকম এক রাজার নাম ভৈঁরো দেও। এই রাজা ভৈঁরো দেওয়ের আমলে মা দন্তেশ্বরীর মন্দিরে প্রচুর নরবলি হতো। রাজা নিজে এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উড়িষ্যার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নরবলির জন্য রাজার অনুগতরা মানুষ সংগ্রহ করতো।
এবার এভাবেই বছরের পর বছর চলতে থাকা নরবলির খবর একসময় সরকার বাহাদুরের কানে গিয়ে পৌঁছায়। তখন ইংরেজ শাসন শুরু হয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এই নরবলি নিয়ে প্রচুর অভিযোগ জমা পড়লো। শেষমেশ ১৮৪২ সালে কোম্পানি সাহেব সেপাই মোতায়েন করে দিল মায়ের মন্দিরে। ব্যস! দন্তেশ্বরী মন্দির চত্বর মানুষের রক্তে রক্তাক্ত হওয়া বন্ধ হলো।
কোম্পানি শুধুমাত্র নরবলি বন্ধ করলো না বা সশস্ত্র সেপাই বসিয়ে ক্ষান্ত হলো না। নোটিস পাঠালো রাজা ভৈঁরো দেওয়ের কাছে। নোটিসে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হলো, মন্দিরে নরবলি যাতে না হয় সে বিষয়ে রাজা নিজে যেন লক্ষ রাখেন। ইতিমধ্যে কিছু বছর আগেই আইন করে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা রদ করেছিল কোম্পানি…”
বৃদ্ধকে মাঝপথে থামিয়ে রিশানের দিকে তাকিয়ে রাঘব বললেন, “রেগুলেশান সিক্স অব এইট্টিন হান্ড্রেড টু অ্যান্ড রেগুলেশান টোয়েন্টি সেভেন অব এইট্টিন টোয়েন্টি নাইন।”
বৃদ্ধ এতে একদম বিরক্ত না হয়ে গল্প বলা চালু রাখলেন, “হ্যাঁ, সেসব তোমরা ভালোই জানবে। কিন্তু এত সবের পরও মানুষের মনে অসন্তোষ দেখা দিলো। শত হোক, ধর্মের উপর আঘাত মানুষ মেনে নিতে পারে না। তখনও পারেনি, এখনও পারে না। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক প্রকাণ্ড শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার ক্ষমতা রাজা ভৈঁরো দেওয়ের ছিল না। সুতরাং বেশ কিছু বছর বলি বন্ধই থাকল।
ইতিমধ্যে রাজা ভৈঁরো দেওয়ের বয়স বাড়ছে। তৎকালীন আচার্যমশায়কে বারংবার অনুরোধ করেও তার মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছে অনুসারে একটিবার নরবলি করানোর অনুমতি নেওয়া গেল না। আসলে সবাই তখন সাহেবদের ভয়ে তটস্থ। আর ঠিক এরকম সময়েই রাজা ভৈঁরো দেওয়ের রাজত্বে ঘুরতে এলেন তার বন্ধু-পুত্র প্রতাপ নারায়ণ। এই প্রতাপ নারায়ণের তখন বাংলার কোনো অঞ্চলের ছোটখাটো একটা জমিদারি ছিল। কিন্তু এই জমিদারের কিছু পাশবিক শখ ছিল। কুমারী যোনির রক্ত দেবীকে বলিতে দেওয়া, ম-কারের প্রতি তীব্র আসক্তি, জন্তু-জানোয়ার যেমন চিতা, বাঘ ইত্যাদি পোষা এগুলি ছিল প্রতাপ নারায়ণের শখ। বিচক্ষণ রাজা ভৈঁরো দেও দেখলেন এই প্রতাপ নারায়ণ যেন তারই যৌবনের প্রতিচ্ছবি। সেই তেজ, সেই বিক্রম, সেই নৃশংসতা। শেষ বয়সে নরবলি দেখার সাধ এই ছেলেই পূর্ণ করতে পারে।
একদিন প্রতাপ নারায়ণকে ডাকলেন তিনি। অর্ধেক সাম্রাজ্য তার নামে করে দিতে চাইলেন। প্রতাপ নারায়ণ ছিলেন অতিশয় লোভী। এ সুযোগ তিনি ছাড়লেন না। রাজা ভৈঁরো দেও শুধু একটামাত্র শর্ত রাখলেন। মা দন্তেশ্বরীর মন্দিরে আবার নররক্তের গঙ্গা বইয়ে দিতে হবে।
প্রতাপ নারায়ণ রাজার হাতে হাত রেখে কথা দিলেন যে তিনি সম্মত আছেন। রাজ্যাভিষেক হয়ে গেল তার। জমিদার প্রতাপ নারায়ণ থেকে তিনি হয়ে উঠলেন মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ। তার রাজত্ব দেখা-শোনার জন্য তিনি বাংলা থেকে আনালেন সুভদ্র নামের তার অত্যন্ত অনুগত এবং দক্ষ মন্ত্রীকে। রাজ্যে এক আলাদা ত্রাসের সঞ্চার হলো এই মহারাজা-মহামন্ত্রী জুটির জন্য। কোনো ঘরের কোনো কুমারী, মাঝবয়সী এমনকী বৃদ্ধা আর সুরক্ষিত রইলেন না। রাজ্যে অরাজকতা বৃদ্ধি পেলো। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠলো ঘরে ঘরে।
এত কিছুর পরেও প্রজারা বিদ্রোহ করতে পারলো না। পারলো না কারণ মহারাজার কাছে একজন সুভদ্র ছিল। ওর মতো ধুরন্ধর মন্ত্রী এই রাজ্য আগে কখনো পায়নি। তিনি কিছু সুদক্ষ, শক্তিশালী প্রজাকে নিজের দিকে টেনে নিলেন যারা মহারাজের অন্ধ ভক্তে পরিণত হল। তবু মহারাজের মনে শান্তি নেই। এতকাল ধরে যে স্বপ্ন দেখে এসেছেন, যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্যাভিষেক করেছেন, সেই নরবলি এখনও দেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে ভৈঁরো দেও বারংবার তাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এতটাই মজবুত অবস্থানে ছিল যে, মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের ইচ্ছা থাকলেও উপায় ছিল না। তারপর সেদিন উপস্থিত হল।।
প্রায় তেত্রিশ বছর নরবলি বন্ধ থাকার পর কোম্পানি সাহেব চৌকি উঠিয়ে নিলো মায়ের মন্দির থেকে। আর তারপরেই এলো সেই নিশাচরী রাত। সাল ছিল ১৮৭৬। সেই রাতের গল্প তোমরা জানো। তাই আর বলছি না। শুধু এটা যোগ করছি যে ভৈঁরো দেও সেদিন মন্দিরে উপস্থিত হতে পারেননি অসুস্থতার জন্য। শোনা যায় পরদিন তিনি ঘটনার খবর পেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন। এমনকী ছোটখাটো উৎসব করে প্রজাদের ভরপেট খাইয়েছিলেন। তবে সে উৎসব নেহাতই অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ ছিল। ইতিহাসে এর উল্লেখ পাবে না।” এবার বৃদ্ধ চুপ হলেন।
রাঘব বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন, “আচ্ছা, তাহলে এই হচ্ছে সেই রাতের আগের ইতিহাস। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর তো পেলাম না।”
“বলো, কী কী প্রশ্ন?”
“চন্দ্রহাস কোথা থেকে এই গল্পে এসেছিল?”
“শোনা যায় ভৈঁরো দেও অল্প বয়সে তিব্বত গিয়েছিলেন। সেখানেই নাকি এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী চন্দ্রহাস তুলে দিয়েছিলেন রাজার হাতে। রাজ্যের মঙ্গল কামনার প্রতীক হিসেবেই চন্দ্রহাস তাকে দিয়েছিলেন সেই সন্ন্যাসী। কিন্তু রাজা ভৈঁরো দেও শুধু চন্দ্রহাসের অপব্যবহার করেছিলেন।”
“এই কি সেই চন্দ্রহাস, যার বিবরণ আমরা…”
রাঘবের কথা শেষ হবার আগেই বৃদ্ধ বলেন, “একদম ঠিক। রাবণের মৃত্যুর পর চন্দ্রহাস নিয়ে কোথাও কিছু লেখা হয়নি। চন্দ্রহাস ধ্বংস হবার উপায় ছিল না। সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জানিয়েছিলেন, তিনি ধ্যানকালে এই চন্দ্রহাসের অবস্থান জানতে পারেন। তারপর মাটি খুঁড়ে এই তলোয়ার পাওয়া গিয়েছিল। নেহাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর অস্ত্রের প্রয়োজন নেই এবং রাজা ভৈঁরো দেওয়ের উপর কোনো কারণে প্রসন্ন হয়েছিলেন, তাই তিনি সেটা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। ভাবতে পারো, স্বয়ং শিব শম্ভুর অস্ত্র!”
এতক্ষণে মৌনতা ভেঙে বলে রিশান, “গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।”
রাঘব কিন্তু প্রশ্ন করেই চলেছেন। তাকে সব জানতে হবে যে…
“মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ সেদিন চন্দ্রহাস নিয়ে পালিয়ে গেছিলেন । তারপর?”
“হ্যাঁ, রাজাকে বাঁচাতে সুভদ্র প্রাণ দিয়েছিলেন। আচার্যমশায় থেকে শুরু করে উপস্থিত প্রত্যেককে সেদিন গুলি করেই হত্যা করেছিল সাহেব সেপাইরা। কয়েক জনের পাপের বোঝা সবাইকে বহন করতে হয়েছিল। এখনও করতে হচ্ছে।”
বৃদ্ধের শেষ কথাটির অর্থ রাঘব বা রিশান কেউ বোঝেনি সেদিন। বুঝেছিল অনেক পরে।
রাঘব পরের প্রশ্ন করেন, “কোথায় গিয়েছিলেন মহারাজ?”
“এটাই আসল প্রশ্ন। কোথায় গেছিলেন মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ। সেই যে গেলেন আর ফেরেননি এই বস্তারে। ভৈঁরো দেও আবার তার বাকি অর্ধেক রাজত্ব ফিরিয়ে নিয়েছিলেন কিছুকাল অপেক্ষা করে। কিন্তু তার বংশের বাকিরা সেটা মেনে নেয়নি। ততদিনে বাকি অর্ধেক রাজ্য প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ভৈঁরো দেওয়ের সন্তানরা পিতার এ হেন গা-জোয়ারি মেনে নিতে পারেননি যে বন্ধুর পুত্রকে অর্ধেক রাজ্য দিয়ে দেওয়া হলো শুধুমাত্র পুনরায় নরবলি শুরু করার জন্য। তারা বস্তারের সেই অভিশপ্ত অংশে আর রাজত্ব করতে যাননি। যদিও এতে মন্দিরের পূজা বন্ধ হয়নি। রাজ্যের জনগণ পূজা প্রথা চালু রেখেছিলেন। তবে নরবলি আর হয়নি। রাজতন্ত্র থেকে এভাবেই জমিদারি প্রথার শুরু হয়েছিল এখানেও।”
“মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের কোনো খবরই পাওয়া যায়নি?”
“বাংলায় ফিরে গেছিলেন তিনি। খুব শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এও জানি। কিন্তু কী শোক, কেন পেলেন এমনকী বাংলায় ঠিক কোথায়, সেসব কিছুই জানা নেই। শুধু এইটুকুই জানি, যে মহলে তিনি থাকতেন, সেই মহলের সিংহদুয়ারে দুটো বিশাল সিংহের মূর্তি। একটা সোনালি রঙের, অন্যটা কালো।
রিশান সকৌতুকে বলে ওঠে, “কালো সিংহ?”
“আগে দুটোর রঙ সোনালিই ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কী করে একটা সিংহের রঙ কালো হয়ে গেল, সে প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।”
বেশ কিছুক্ষণ রাঘব আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এক সময় বৃদ্ধ সেখান থেকে উঠেই পড়লেন। তার যে বলার আর কিছুই নেই, রাঘব বুঝতে পারছিলেন।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে মায়ের মন্দির দর্শনে বেরিয়ে পড়লেন তারা দুজনে। বৃদ্ধ খিচুড়ি বানিয়েছিলেন, যেন অমৃত। বাঙালি খিচুড়ির মতো স্বাদ নয়, একটু যেন মিষ্টি মিষ্টি। তবুও খেতে দারুণ লেগেছে। এবার ভরা পেটে ছয়শো বছরের প্রাচীন মন্দির দেখার পালা।
মা দন্তেশ্বরী মন্দির শক্তিপীঠের একটা হিসেবে বিখ্যাত হলেও চোদ্দ শতকের মন্দিরগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক স্টোনের কারুকার্যের উদাহরণ টানতেই বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এই মন্দিরের উল্লেখ করে থাকেন। রিশান তো বটেই, অভিজ্ঞ রাঘব পর্যন্ত ব্ল্যাকস্টোনের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন । মন্দিরের চারদিকের উঁচু উঁচু পাঁচিল জানান দিচ্ছে, কুলদেবীকে সুরক্ষিত রাখতে কোনো কিছু বাকি রাখেনি চন্দ্রবংশীয় রাজারা।
মন্দিরের শুরুতেই গরুড়ের এক পূর্ণাঙ্গ মূর্তি। তারপর মন্দির ভাগ হয়ে গেছে চারটি ভাগে-গর্ভগৃহ, মহামণ্ডপ, মুখ্যমণ্ডপ এবং শোভামণ্ডপ। গর্ভগৃহ এবং মহামণ্ডপ পাথরের বড় বড় টুকরো দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের শীর্ষ শিখর অবধি শুধুমাত্র সৌষ্ঠব মূর্তি বিলাসের নিদর্শন। সেসব মূর্তির একেকটি বিভিন্ন দেব-দেবীর বিভিন্ন রূপ ব্যক্ত করছে। এতটাই যত্নে রাখা সেসব মূর্তি যে এত বছরের পুরোনো হলেও মূর্তিগুলোর কোনো অঙ্গহানি ঘটেনি। কালো পাথরের ঔজ্জ্বল্য যেন এতটুকু ম্লান হয়নি। কারিগররা যেন ছেনি-খুন্তি দিয়ে পাথরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজেদের বিশ্বকর্মার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন এই মন্দিরগাত্র নির্মাণের সময়।
রাঘব পৃথিবীর বিভিন্ন মন্দিরে গেছেন, দেখেছেন কত শত দেব-দেবীর মূর্তি, কিন্তু মা দন্তেশ্বরীকে সবার চেয়ে আলাদা মনে হলো তার। এরকম পাথরের মধ্যে প্রায় জীবন্ত হয়ে ওঠা মূর্তি আর কোথাও দেখেননি তিনি। আহ! পাথরের হয়েও যেন প্রতি মুহূর্তে দেবী মূর্তি জানান দিচ্ছেন যে তিনি বিলোলবসনা। চক্ষু উন্মীলনে দেবী মূর্তি যেন ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান একাকার করে দিতে পারেন। এতই তার তেজ!
তুমি নমস্য হে শিল্পী, নমস্য!
রাঘব মনে মনে প্রণাম করলেন। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে করে রাঘব বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলেন ভেতর থেকে। যে কাহিনি এত বছর একটি বইতে পড়ে এসেছেন, ছাত্রদের বছরের পর বছর শুনিয়ে এসেছেন সেই কাহিনি এখন তার চোখের সামনে ভাসছে। সুভদ্র সেই রাতে বারংবার এই মন্দিরে এসে তদারকি করছিলেন, অনুগতরা এই শোভামণ্ডপে জড়ো হয়েছিলেন, গর্ভগৃহে দেবী বন্দনা এবং চন্দ্রহাসের পূজা হয়েছিল। এই মহামণ্ডপে একের পর এক নরমুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ছিল। মন্দিরের প্রত্যেকটা প্রকোষ্ঠে হাঁটছেন আর কল্পনায় সে রাতকে যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করছেন ইতিহাসের শিক্ষক রাঘব। আর ভাবতে ভাবতেই যখন জিভ বের করা মা দন্তেশ্বরীর সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন, তখন আচমকাই একটা ছবিতে তার চোখ পড়লো।
একজন লোক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। লম্বায় রাঘবের চেয়ে খাটো, তবে প্রশস্ত পিঠ জানান দেয় ইনি শরীরচর্চা করেন বা করতেন কোনো সময়। নিজের মোবাইলের স্ক্রিনে একটা ছবি বারবার জুম ইন- জুম আউট করছে সে। সেই ছবিতেই চোখ পড়েছে রাঘবের। যেন রাঘবের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই লোকটা এরকম করছে।
প্রথমটায় বিরক্ত হলেন রাঘব । মায়ের মন্দিরে এসেও মোবাইল! তারপর ছবিটা আরেকটু দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই একটা জিনিস লক্ষ করলেন এবং প্রায় পাখির চোখে আবিষ্কার করলেন, ছবিটায় একটি বাড়ির বা বলা ভালো এক রাজবাড়ির মন্দির দেখাচ্ছে। লোকটা জুম করে মা দন্তেশ্বরীর মূর্তির সঙ্গে রাজবাড়ির অন্দরের পূজার এক মূর্তির মিল খোঁজার চেষ্টা করছে। আর বড় মোবাইল হওয়ায় রাঘব বুঝতে পারলেন, মিল একটা আছে অবশ্যই। তবে আসল তথ্য বুঝলেন যখন খানিক পর জুম আউট করলো সেই ব্যক্তি। একটা রাজমহলের বাইরের থেকে ছবিটা নেওয়া। আর তাতে রাজবাড়ির সিংহদুয়ার দেখা যাচ্ছে, সেখানে দুটো সিংহমূর্তি। তবে একটাই অমিল-দুটোই সোনালি। কালো সিংহ নেই। তাতে কী! রাঘবের মনে হলো তিনি পেয়ে গেছেন তার অভীষ্ট লক্ষ্য। লোকটার থেকে এবার শুধু জায়গাটার নাম জেনে নেওয়া। সেটাই করতে গেলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই গর্ভগৃহের পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটা।
“এই রাজবাড়িটি কোথায়?”
রাঘব প্রশ্নটা ঠিকভাবে করার আগেই বেরিয়ে গেছে লোকটা। শুধু যেন একটা উত্তর এল বাইরে থেকে, “কলকাতায়।”
গর্ভগৃহ থেকে ছুটে বেরোলেন রাঘব। কিন্তু এসে কাউকেই দেখতে পেলেন না তিনি। কেউ নেই। শুধু রিশান দাঁড়িয়ে কাছে ।
“ভেতর থেকে কাউকে বেরোতে দেখলি?”
“কিছুক্ষণ আগে বেরিয়েছে কয়েকজন।” রাঘবের উদ্বিগ্ন হবার কারণ বুঝতে পারছে না রিশান।
“কিছুক্ষণ আগে নয়, এক্ষুনি। জাস্ট এক্ষুনি।”
“না। এখন আপনি বেরোলেন।”
রাঘব আশেপাশে আরেকবার ঘুরে এলেন। কিন্তু উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে আর দেখতে পেলেন না।।
মন্দির পরিদর্শন শেষে দুজনেই ফিরলেন বৃদ্ধের আশ্রয়ে। আজ রাতেই ট্রেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়তে হবে। রিশান লক্ষ করলো রাঘব স্যার মন্দির থেকে ফেরার পরে কীরকম চুপচাপ হয়ে আছেন। ফিরে অল্প খাওয়া-দাওয়া করেই শুয়ে পড়েছেন। এতই চুপচাপ যে কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয় লাগছে। একবার বৃদ্ধকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো রিশান। বৃদ্ধ হাতের ইশারায় ধৈর্য রাখতে বললেন। কেন, কে জানে!
বিদায় নেবার সময় উপস্থিত হলো। একটা গাড়ি জোগাড় করে দিয়েছেন বৃদ্ধ। সেটাই স্টেশনে পৌঁছে দেবে তাদের। রিশান মালপত্র সমেত গাড়িতে উঠে বসে আছে। রাঘব বৃদ্ধের কাছে এলেন, “অনেক সাহায্য করলেন আপনি। জানি না আবার দেখা হবে কিনা, কিন্তু জীবনে কখনো আপনার কথা ভুলবো না।”
বৃদ্ধ রাঘবের কথা শুনে হাসলেন। তারপর বললেন, মনের মধ্যে দুটো প্রশ্ন রেখে কী করবে? মুক্তি দাও ওদের।”
“বেশ।”
রাঘব দুপুরে মন্দিরের ঘটনাটা তাকে জানালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাওয়া, আমাকে অতর্কিতে কলকাতার সন্ধান দিয়ে যাওয়া এই লোকগুলো কারা?”
“জানি না। শুধু এইটুকু জানি, এই গল্পে শুধু প্রধান চরিত্ররা মুক্তি পায়নি এমন নয়; সেদিন পুলিশের গুলিতে এরকম অনেক প্রাণ গিয়েছিল যারা চাননি এই বলি হোক। তারাও এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। জড়িয়ে পড়েছিল তাদের পরিবারও। ঠিক যেভাবে রিশান কিংবা তুমি জড়িয়ে আছো। সবাই অভুক্ত হয়ে আছে রাঘব, সবাই। সেই কালো রাত কাউকে ছাড়েনি। সবাই মুক্তির আশায় আছে, মুক্তি দাও তাদের। মুক্তি দাও। আর যদি তা না পারো-ওদের রক্ত দাও।”
রাঘব আর কথা বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে ধীরে বললেন, “দ্বিতীয়টা ঠিক প্রশ্ন নয়, সন্দেহ।”
“করো।”
“আপনি কি রাজা ভৈঁরো দেওয়ের বংশধরদের কেউ, যাদের বঞ্চিত করেছিলেন রাজা ভৈঁরো দেও?”
“যথার্থ। রাজা ভৈঁরো দেও মুক্তি পাননি। যথেষ্ট পাপস্খালন হয়েছে বিগত প্রায় দেড়শো বছরে। এবার তারা সবাই মুক্তি পেলেই আমার শান্তি।” বৃদ্ধ জোড় হাত মাথার উপর তুলে ইষ্টদেবীর উদ্দেশ্যে প্রণাম করলেন, “জয় মা দন্তেশ্বরী। সন্তানের মঙ্গল করো মা।”
রাঘব বৃদ্ধকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেলেন স্টেশনের উদ্দেশে। গাড়ি মা দন্তেশ্বরী মন্দির পেরিয়ে, শঙ্কিনী ও ধাঙ্কিনী নদীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো। কেউ দেখতে পেলো না, এবারেও কত কত অভুক্ত ছায়ামূর্তি জড়ো হয়েছে তাদের প্রস্থান দেখার জন্য। সবাই যেন তাদের সফলতার উদ্দেশ্যে জোড় হাত মাথার উপরে তুলে একটা কথাই বলছিলেন, “জয় মা দন্তেশ্বরী!”
