চন্দ্রহাস – ১.১৪

অধ্যায় ১৪

রেবা আজ নিজের হাতে রান্না করেছেন রাঘব এবং রিশানের জন্য। অন্যান্য দিন বামুন ঠাকুর এই কাজটা করেন। আজ চণ্ডী পাঠের সময় সকালেই রেবা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আজ দুপুরে যেন রাঘবরা বাড়িতেই মধ্যাহ্নভোজন করেন। রাঘব তাতে রাজি হয়েছিলেন।

মধ্যাহ্নভোজে রেবার হাতের অপূর্ব সব রান্না খেয়ে দুপুরে রিশানকে নিয়ে বসেছিলেন রাঘব। কাল রাতের ধকলের জন্য আজ দুজনেই কলেজ কামাই করেছে। সমস্ত ইতিহাসকে এক জায়গায় করার চেষ্টা করলেন দুজনে মিলে।

ভৈঁরো দেওয়ের ইচ্ছে, তারপর প্রতাপ নারায়ণের বস্তার রাজত্ব লাভ, মা দন্তেশ্বরী মন্দিরে যুদ্ধবন্দিদের নরবলি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক বলি বন্ধ, প্রতাপ নারায়ণের চন্দ্রহাস সমেত বাংলায় ফিরে আসা, রক্তদন্তিকা মায়ের পূজায় নতুন করে নরবলি শুরু, বছর চারেক পর ভৈরবের আগমন, মহারাজের তান্ত্রিক উপাচারে উচ্ছিষ্ট গণেশের পূজারম্ভ, ভৈরবের তন্ত্রসাধনা, বিম্ববতীর গর্ভবতী হওয়া এবং মহারাজের চিত্ত শুদ্ধি, রক্তদন্তিকা পূজায় প্রতাপ নারায়ণ কর্তৃক নরবলি রদ করার ঘোষণা, ভৈরবের প্রধান পুরোহিত হওয়া, চন্দ্রহাস মহলে সিংহের আগমন, বাসন্তী পূজার প্রস্তাব, ভৈরব কর্তৃক বিম্ববতী সহ প্রতাপ নারায়ণের এক সন্তানের খুন, ভৈরবের নিজের পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়া, ভৈরবের শাস্তি বিধান, ভৈরবের অভিশাপ এবং তান্ত্রিক অভিচার ক্রিয়ায় মৃত সিংহের জীবিত হয়ে উঠা, গত পঞ্চাশ বছর আগে রাজমাতা শিবাঙ্গী এবং হর নারায়ণের মৃত্যু, ব্রজ নারায়ণ এবং সৌদামিনীর দুর্ঘটনায় স্বেচ্ছা নির্বাসন।

মোটামুটি এইভাবে সাজাতে পারলো রাঘব ও রিশান। এবার কাজ হচ্ছে হারানো সূত্রগুলো বের করা। সেই সূত্র ধরে চন্দ্রহাস খুঁজে পাওয়া এবং অভিশাপ দূর করা। লিখতে কম সময়ই লাগলো, কিন্তু এ কাজ যে ঠিক কতটা কঠিন তা দুজনেই বুঝতে পারছে। সবচেয়ে বড় কথা কাহিনি যদি ঠিক হয়, তাহলে বাড়ির সুড়ঙ্গে একটি কালো রঙের দীর্ঘকায় যমদূতের থাকার সম্ভাবনা আছে। তার সঙ্গে লড়াইয়ের কোনো প্রশ্নই ওঠে না-অসম লড়াই। ভাবতেই বুকটা ধড়াস করে ওঠে রাঘবের। কিন্তু পাছে রিশান ভয় পায়, তাই তিনি নিজের ভয়টা প্রকাশ করেন না। সমস্ত কিছু জানার পর থেকে রিশানের মুখটাও শুকিয়ে গেছে। সত্যি তো, এই ঘটনাই যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তাদের করার কিছুই নেই। শুধু একটা প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। রাঘব এবং রিশানের এই ইতিহাসের সঙ্গে ঠিক কী সম্পর্ক? কেন ভাগ্য তাদের টেনে আনলো এই চন্দ্রহাস মহলে? কেন এতগুলো লোক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলো?

না, উত্তরগুলো এখনও পাওয়া যায়নি। রাঘবদের দুর্গা পূজা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

এসব নিয়েই যখন আলোচনা চলছে, তখন হঠাৎ কাজের লোক চারুদি এসে জানিয়ে গেল, “দাদাবাবু মাকে নিয়ে এসেছেন। আপনারা আসুন বাইরে, দেখে যান।”

হাসি মুখে কথাটা জানিয়েই চারুদি দৌড়ে চলে গেল। অগত্যা রাঘব-রিশান আলোচনা বন্ধ রেখে বাইরে বেরিয়ে এলো। ঘর থেকে বেরিয়েই ঢাক ও শঙ্খের ধ্বনি শুনতে পেল তারা। দ্রুত পায়ে মন্দিরের দিকে চলে এলো সবাই।

একটা ছোটখাটো ট্রাকে চেপে মা রক্তদন্তিকা এসেছেন চন্দ্রহাস মহলে। মাকে ধরে রেখেছেন আদিত্য নারায়ণ। মুখে তার হাসি লেগে আছে। রেবা গলবস্ত্র হয়ে আরতির থালা নিয়ে অপেক্ষা করছেন মন্দিরের ভেতর। অনুজ নারায়ণ একটি চেয়ারে বসে আছেন, হাতের প্লাস্টারের জন্য বিশেষ কিছু করতে পারছেন না তিনি।

মা রক্তদন্তিকার মূর্তিটা নামানোর সময় আদিত্য নারায়ণ এবং ট্রাকের তিন জন লোকের সঙ্গে রাঘবরাও হাত লাগালো। সবার চেষ্টায় মাকে নিয়ে বসানো হলো মন্দিরের ভেতর, যেখানে পূজা হবে। বহু প্রাচীন মূর্তি হলেও আনা হয়েছে একদম নতুনের মতো। মায়ের মুখ পত্রিকা দিয়ে ঢাকা। মাকে নামানোর সময় সবাই মিলে যখন “বলো দুগগা মাই কি-জয়য়য়…” ধ্বনি দিচ্ছিলো, কিছুক্ষণের জন্য রাঘব, রিশান, আদিত্য নারায়ণ, রেবা, অনুজ নারায়ণ এবং ভৃত্যরা সবাই ভুলে গেছিল এই বাড়ির ইতিহাস, ভুলে গেছিল ভৈরবের অভিশাপের কথা। এই মুহূর্তগুলি নিয়েই বেঁচে থাকা, এই মুহূর্তগুলিই অনেক কঠিন সময়েও বেঁচে থাকার রসদ। এই মুহূর্তগুলিতেই জীবনের আসল মানে।

“বলো দুগগা মাইকি-

জয়য়য়…জয়য়য়…জয়য়য়।”

নির্দিষ্ট সময়ে ঢাক থামলো, শঙ্খ থামলো।

“সব ঠিক আছে, কিন্তু উচ্ছিষ্ট গণেশটা কে? আমি এর আগে এই নাম শুনিনি। যে মূর্তির বিবরণ বলছেন, সেই বিবরণও প্রথম বার শোনা।”

আদিত্য নারায়ণকে বিকেলে সমস্ত ঘটনা জানিয়েছিলেন রাঘব। রিশানও সঙ্গেই ছিল। শুধু কীভাবে এই ইতিহাস জানলেন রাঘব, সেই বিষয়ে কিছু বললেন না। ব্রজ নারায়ণ, সৌদামিনীকে নিয়ে যে কোনো কথাতেই চৌধুরী পরিবার বেশ বিব্রত বোধ করে ভেবেই কিছু বললেন না। সব শুনে আদিত্য উচ্ছিষ্ট গণেশকে নিয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা জানালেন।

“অধ্যাপক জীবনের শুরুতে তন্ত্রের উপর একটা ঝোঁক ছিল মশাই। তখন একটু ওই তান্ত্রিক দেব-দেবী নিয়ে পড়াশোনা করেছিলাম। তাতে উচ্ছিষ্ট গণপতির উল্লেখ আমি পেয়েছিলাম। শুনবেন?”

রাঘব প্রশ্ন করতেই রিশান-আদিত্য দুজনেই আগ্রহের সঙ্গে মাথা নেড়ে একত্রে বললেন, “নিশ্চয়ই।”

অধ্যাপক রাঘব শুরু করলেন :

“গণেশায় নমো নমঃ আদি ব্রহ্ম নিরুপম

পরমপুরুষ পরাৎপর।

খৰ্ব্বস্থূল কলেবর গজমুখ লম্বোদর

মহাযোগী পরম সুন্দর।।

ভক্তিশাস্ত্রে উল্লেখিত গণেশের বত্রিশটি রূপের অন্যতম হলেন উচ্ছিষ্ট গণেশ। উচ্ছিষ্ট গাণপত্য শাখার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন হেরম্বসূত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ‘হেরম্ব’ শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ‘হে’ অক্ষরের মাধ্যমে অসহায়তা বা দুর্বলতা বোঝায় এবং ‘রম্ব’ শব্দটির মাধ্যমে দুর্বলকে রক্ষা করা ও তাদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা বোঝায়। অর্থাৎ ‘হেরম্ব’ শব্দের অর্থ দুর্বলের রক্ষাকর্তা।

গণেশ পুরাণে গণেশের একটা বিশেষণ হল হেরম্ব।

উচ্ছিষ্ট গণেশ হলেন হিন্দু দেবতা গণেশের একটা তান্ত্রিক রূপ। গাণপত্য সম্প্রদায়ের ছয়টি প্রধান শাখার অন্যতম, উচ্ছিষ্ট গাণপত্য শাখায় ইনি প্রধান দেবতা। মূলত বামাচার প্রথায় তার পূজা প্রচলিত আছে। উচ্ছিষ্ট গণেশের মূর্তিতত্ত্বটি আদি। তার মূর্তিতে এক দেবীর উপস্থিতি দেখা যায় যা আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি।

‘উচ্ছিষ্ট’ শব্দ থেকে ‘উচ্ছিষ্ট গণেশ’ নামটি এসেছে। এই শব্দটিও এখানে তান্ত্রিক পরিপ্রেক্ষিতেই প্রযুক্ত।

গণেশের অন্যান্য রূপের মতো উচ্ছিষ্ট গণেশও গজানন। মন্ত্রমহার্ণব অনুসারে, তার গাত্রবর্ণ রক্তাভ। কিন্তু উত্তরকামিকাগম অনুসারে, তার গাত্রবর্ণ কৃষ্ণ। আরেক বর্ণনা অনুসারে, তার গাত্রবর্ণ নীল। বিভিন্ন বিবরণ অনুসারে, উচ্ছিষ্ট গণেশ চতুর্ভূজ বা ষড়ভূজ । মনে রাখতে হবে, আমাদের কাহিনিতে ভৈরব যে মূর্তিটি মহারাজ প্রতাপ নারায়ণকে দিয়েছিলেন সেটি ছিল ষড়ভূজ।

তিনি উপবিষ্ট অবস্থায় থাকেন। কোথাও কোথাও তার মূর্তি পদ্মের আসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। যদিও আমাদের কাহিনিতে পদ্মের উল্লেখ পাইনি। উত্তরকামিকাগম অনুসারে, তার মস্তকে থাকে একটি রত্নমুকুট এবং তার ললাটে থাকে একটি তৃতীয় নয়ন।

ক্রিয়াকর্মদ্যোতি গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে, উচ্ছিষ্ট গণেশের ছয় হাতে থাকে পদ্ম-কোনো কোনো বর্ণনা অনুসারে নীল পদ্ম, একটি দাড়িম্ব ফল, একটি বীণা, একটি অক্ষমালা ও একটি ধান্যশীর্ষ। অর্থাৎ এটিই আমাদের গল্পের সেই মূর্তির বিবরণ।

যদিও মন্ত্রমহার্ণব গ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে, তার হাতে থাকে একটা তীর, একটা ধনুক, একটি পাশ ও একটি অঙ্কুশ।

উচ্ছিষ্ট গণেশকে পাঁচটি শক্তি-গণেশ মূর্তির অন্যতম বলে বর্ণনা করা হয়। এই মূর্তিতে গণেশের একজন শক্তি বা স্ত্রী রয়েছেন। গণেশের বিরাট মূর্তির সঙ্গে একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকার স্ত্রীমূর্তি থাকে। একজন দেবী তার কোলে উপবিষ্টা অবস্থায় থাকেন। এই দেবীর দুটি হাত। তিনি নানাপ্রকার অলংকার পরিধান করে থাকেন। উত্তরকামিকাগম গ্রন্থে এই দেবীর নাম বিঘ্নেশ্বরী।

এই গ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে, এই দেবী সুন্দরী ও যুবতী।

বিঘ্নেশ্বরী দেবী বাঁ হাতে একটা পদ্ম বা অন্য কোনো ফুল ধরে থাকেন।

উচ্ছিষ্ট গণেশের শাস্ত্রসম্মত রূপটি সাধারণত ভাস্কর্যগুলিতে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। সাধারণত উচ্ছিষ্ট গণেশকে চতুর্ভূজ মূর্তিতেই দেখানো হয়েছে। তার তিনটি হাতে থাকে পাশ, অঙ্কুশ ও একটি লাড্ডু বা মোদক। মানে আমাদের কাহিনির মূর্তিটা দূর্লভ, অপ্রচলিত।

এই ধরনের মূর্তিতত্ত্ব তান্ত্রিক গাণপত্য শাখাগুলির প্রভাবকে প্রতিফলিত করে । দাড়িম্ব ফলটিও প্রজননের প্রতীক। গাণপত্য সম্প্রদায়ের নানান মূর্তিতে এটি দেখা যায়। তাহলে আমরা জানতে পারছি, ভৈরব যে বলেছিল এই মূর্তি পূজায় মহারাজের সন্তান লাভের কথা, তা সত্যি।

ক্রিয়াকর্মদ্যোতি অনুসারে, উচ্ছিষ্ট গণেশের পূজা করা হয় শ্রেষ্ঠ বর লাভের জন্য। অনেকে আবার নির্দিষ্ট কামনাপূরণের জন্যও উচ্ছিষ্ট গণেশের পূজা করেন। তাকে দেশের রক্ষাকর্তা মনে করা হয়। কথিত আছে, তার ধ্যান করলে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রাপ্ত হওয়া যায়।

উচ্ছিষ্ট গাণপত্য শাখার অনুগামীরা তান্ত্রিক বামাচারী। এই শাখাটি সম্ভবত শাক্তধর্মের কৌল পূজার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

উচ্ছিষ্ট গণেশের মূর্তিকল্পটিও কৌল তান্ত্রিক প্রকৃতির। এই মূর্তিকল্পটি গণেশ ও মহাশক্তির একত্বের দ্যোতক রূপে প্রতিভাত হয়।

এই শাখার অনুগামীরা তাদের কপালে লাল টিকা অঙ্কন করেন এবং বর্ণভেদ প্রথা মানেন না, সুতরাং ভৈরব যে অব্রাহ্মণ হয়েও এই পূজা করতেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

বামাচারী প্রথা অনুসারে, উচ্ছিষ্ট গণেশকে পূজার সময় পূজককে উচ্ছিষ্ট মুখে ও উলঙ্গ অবস্থায় পূজা করতে হয়। সে ব্যাপারটিও আমাদের কাহিনিতে আছে।

উচ্ছিষ্ট গণেশ ছয়টি অভিচার ক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত। মনে করা হয়, তার মন্ত্রের মাধ্যমে মন্ত্র-উচ্চারণকারী তার শত্রুকে মোহগ্রস্থ করতে পারেন, আকর্ষিত করতে পারেন, ঈর্ষান্বিত করতে পারেন, বশ করতে পারেন, অসার করতে পারেন বা হত্যা করতে পারেন।

আর ঠিক এখানেই আমার খটকা।”

একটানা এতগুলো কথা বলে থামলেন রাঘব।

“ওহ মাই গুডনেস। এ তো ভয়ানক দেবতা।”

আদিত্য নারায়ণ প্রায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। রিশান কিন্তু নিজের সহজাত গুণাবলী অনুসারে সঠিক প্রশ্নটা করলো, “খটকাটা কীসের?”

রাঘব বেশ চিন্তিত মুখে বললেন, “দেখ, মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ পূজা করেছিলেন সন্তানলাভের জন্য। এর ফল তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু তার পাশে বসে ভৈরব উচ্ছিষ্ট গণপতির পূজা কেন করেছিল সেটাই ভাবছি। এই দেবতা যেরকম দুর্বলের সহায় হতে পারেন ঠিক তেমনি ছয়টি তান্ত্রিক অভিচারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেবতা। ইনি তৃপ্ত হলে হেন কাজ নেই যা এর পূজারী করতে পারবেন না। আমার মনে হয় ভৈরব এই বংশের ধ্বংস কামনাতেই মহারাজাকে পাশে বসিয়ে পূজা করেছিলেন। এই দেবতাকে খুশি করতে পারলে এমনকী নিজের রক্ত দিয়ে নির্জীব প্রাণীতে প্রাণপ্রতিষ্ঠার সঞ্জীবনী মন্ত্রটিও আয়ত্ব করা সম্ভব।”

সন্ধে হয়ে এসেছে। আগামীকাল মহালয়া। মা রক্তদন্তিকা মন্দিরে পৌঁছে গেছেন। চন্দ্রহাস মহলে এই মধ্য শরতেও কীরকম যেন অভিশাপের কালো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর নয় দিন পর সন্ধি পূজার রাতে নরবলি না হলে ঠিক কী হবে, তা নিয়ে এই রাজবাড়ির একটি মানুষেরও কোনো ধারণা নেই। সবাই শুধু এইটুকু নিশ্চিত যে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। যেভাবে প্রতি বার মৃত্যু এসেছে অভিশাপ লঙ্ঘনের ফলে, এবারেও সেভাবেই আসবে । এত এত মৃত্যু দেখেও চন্দ্রহাস মহল নির্লিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বারান্দায় বসে সন্ধের জলখাবার করছিলেন তিনজন। রাঘব, রিশান, আদিত্য। চারুদি গরম গরম চা আর তেলেভাজা দিয়ে গেছেন।

“কোন সূত্র পেলেন?”

আদিত্যের কথাতে রাঘব উত্তর দিলেন না। কী যেন ভেবেই চলেছেন। স্যার অন্যমনস্ক, বুঝতে পেরে রিশান উত্তর দিলো, “প্রথমত সন্ন্যাসী রাজমাতাকে ঠিক কী বলেছিলেন? হর নারায়ণ মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলেন চন্দ্রহাসই পারে ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে। সেক্ষেত্রে চন্দ্রহাস আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। ভৈরবকে মারার পর মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ সেই চন্দ্রহাস কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন সেটা আমরা জানি না। সেটা খোঁজা প্রয়োজন। আর…”

রিশান চুপ করে থাকে। রাঘবের দিকে তাকায় সে। রাঘব অন্যমনস্ক থাকলেও সব শুনছিল।

“আর?” আদিত্য নারায়ণ প্রশ্ন করেন।

উত্তরটা আসে রাঘবের থেকে, “…আর আমাদের একবার সুড়ঙ্গে যেতে হবে। ঠিক কী আছে সেই সুড়ঙ্গে, না জানলে আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।”

কথা শেষ করে রাঘব চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলেন।

বাকিদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

“আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? যদি কাহিনি সত্যি হয়, আর যদি বলছি কেন- হর নারায়ণের মৃত্যুই স্পষ্ট করছে যে সুড়ঙ্গে ভয়াবহ কিছু আছে। সেক্ষেত্রে সুড়ঙ্গে যাওয়া মানে আত্মহত্যার সামিল।”

“এইটুকু ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে। এছাড়া আর উপায় কী? ভৈরবের সমাধি আমাদের একবার দেখা প্রয়োজন। ওখানেই লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্নের উত্তর। এমনিতেও যদি বলি না হয়, এই বংশে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যুই যদি একমাত্র রাস্তা, তবে অন্তত লড়ে মরা ভালো।”

আদিত্য নারায়ণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। শেষে কতকটা জোর দিয়েই বললেন, “বেশ। আমিও মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের বংশধর। রাজরক্ত আমার শরীরেও বইছে। মরলেও লড়ে মরবো। কবে যাবেন বলুন?”

রাঘব কাপের চা শেষ করে বললেন, “চলুন আজ রাতেই। রিশান তৈরি হয়ে নে।”

চোয়াল শক্ত হল তিনজনের। তিনজন তিন দিকে চলে গেলেন। রাঘব ঠাকুরদালানে পত্রিকায় মুখ ঢাকা মা রক্তদন্তিকার সামনে গিয়ে বসে রইলেন, রিশান ঘরে ফিরে মেঝেতে ডনবৈঠক দিয়ে নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করলো এবং আদিত্য সারাদিনের শেষে বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিলেন। শোয়ার আগে আদিত্য নিজের কাঠের বাম পা-টা কিছুক্ষণের জন্য খুলে রাখলেন পাশে। অনেক বছরের পুরোনো কিছু কথা মনে পড়লো তার, ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লেন। দেখতে লাগলেন পুরোনো কিছু দুঃস্বপ্ন, যার সঙ্গে সুড়ঙ্গের সরাসরি যোগাযোগ আছে। আবার এত বছর পর সুড়ঙ্গে নামবেন আদিত্য।

আজ মধ্যরাতে যখন পৃথিবী সুখদ্রিায় মগ্ন, ঠিক তখনই তারা তিনজন সুড়ঙ্গে পথে যাত্রা করবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *