অধ্যায় ১৬
আজ বোধন। গত সাতদিন ধরে এই দিনের অপেক্ষায় ছিলেন রাঘব। সেদিন সুড়ঙ্গ থেকে ঘরে ফিরেই তড়িঘড়ি কাঠের বাক্সটা খুলে ফেলেছিলেন তিনি। ভেতরে পেয়েছিলেন দুটো জিনিস। এক, ব্রজ নারায়ণ বর্ণিত পুস্তক এবং দ্বিতীয়- একটা লোহার চাবি। চাবিতে কোনো রাসায়নিক আস্তরণ দেওয়া ছিল, তাই এত বছরেও জং ধরেনি তাতে। পুস্তকের পাতা জীর্ণ হয়ে এসেছে। হয়তো বইয়ের পাতা সংরক্ষণের উপায় জানা ছিল না মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের।
পুস্তকটি কোলে নিয়ে উল্টাতে যাবার আগেই থামতে হল তাকে। পরিষ্কার সংস্কৃতে লেখা আছে,
‘দেবী রক্তদন্তিকায়াঃ বোধনস্য দিবসে পুস্তকং পঠিষ্যতু, তৎ পূর্বে মাস্তু।’ বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়াচ্ছে –
‘দেবী রক্তদন্তিকার বোধন দিবসে পুস্তক পড়িবে, তাহার আগে নয়।’
রাঘব সেদিন নিরস্ত্র হয়েছিলেন। চাবিটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেও কীসের চাবি, তিনি বুঝতে পারেননি। সযত্নে নিজের আলমারিতে পুস্তকটি রেখে তালা বন্ধ করেছিলেন। কেউ এখনও জানতে পারেনি এই পুস্তকের কথা। শুধু সেদিন রাতে তিনজনের নৈশ অভিযানের কথা শুনে অনুজ নারায়ণ বলেছিলেন, “আমি আটকাবো না তোমাদের। দেখো, যদি বংশটাকে বাঁচানো যায়। আমি অনুভব করি জল দিলেও পিতৃপুরুষেরা সেই জল পান না। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই শুধু।” বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
বর্তমানে রাঘব মন্দিরে বসে আছেন। ধুতি পরে অপেক্ষা করছেন অনুজ নারায়ণের আগমনের। দুজনে মিলে মাকে স্নান করিয়ে অলঙ্কারে আর নতুন শাড়িতে সাজাবেন। বাড়ির বাকি সকলেও এখন এখানেই উপস্থিত। সন্ধ্যায় বোধন। অবশ্য কলকাতায় বিগত কিছু বছরের ন্যায় এবারও চতুর্থী থেকেই দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে রাস্তায়। লাখোয়ারি বাজেটের থিম পূজোর রমরমাই আলাদা। অন্য বছর হয়তো এক-আধটা পূজো দেখে আসতেন রাঘব, এবার শুধু দিন গুনছেন তিনি। রিশান, আদিত্য, রেবা, অনুজ নারায়ণ-সকলের একই অবস্থা।
রাঘব লক্ষ করলেন, এ বাড়িতে পূজোর সময়েও বিশেষ লোকজন আসেন না। এ বাড়ির পূজো যে অভিশপ্ত, তা বোধহয় এ চত্বরের সবাই জানেন। লোক নেই ঠিকই, কিন্তু পুজোর আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখেন না অনুজ নারায়ণ। মহালয়ার পরদিন প্লাস্টার খোলা হয়েছিল। এ কদিনে হাত আগের থেকে অনেকটাই ভালো।
“চলুন।”
অনুজ নারায়ণ চলে এসেছেন। এই লোকটাকে খুব ভালো লাগে রাঘবের। শিরায় যে রাজরক্ত বইছে, দেখলে বোঝা যায়। এ কদিন অসুস্থ থাকায় সেভাবে কিছুই করতে পারেননি। এখন সুস্থ হতেই আভিজাত্যপূর্ণ ব্যবহারে ফিরেছেন। সাদা ধবধবে চুল ও ফর্সা গায়ের রঙের এই ষাটোর্ধ্ব যুবককে বাড়ির পুরুতঠাকুরের মতো লাগছে এখন। রাঘব মন্দিরে উঠে মায়ের মূর্তির কাছে গিয়ে বসলেন।
“বেশ রাঘববাবু, আপনি তো যখন তখন আমাদের ইতিহাস ক্লাস নিয়ে নেন। বোধনের ইতিহাসের উপর কোনো ক্লাস নেবেন না?” হাসতে হাসতে প্রশ্ন করেন অনুজ নারায়ণ।
রাঘবের সহাস্য উত্তর, “না, এ বিষয়ে জ্ঞানগম্যি একটু তলানিতে।” “বেশ, তবে মা’কে সাজাতে সাজাতে সংক্ষেপে বলি। সবাই শুনছো তো?”
রেবা-আদিত্য-রিশান ঠাকুরদালান থেকে এবং রাঘব মায়ের পায়ের কাছে বসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। কয়েকজন ভৃত্য এসে ঠাকুরদালানের মেঝেতে বসেছে। অনুজ নারায়ণ শুরু করেন, “সর্বমঙ্গলা সর্বার্থসাধিকা শ্ৰীশ্ৰীশারদীয়া দুর্গাদেবীর বোধন, আমন্ত্রণ এবং অধিবাসের মধ্যে দিয়ে আমাদের বহু আকাক্ষিত শারদোৎসবের নন্দিত সূচনা। জগৎত্রয়হিতৈষিণী আনন্দময়ী শারদাজননীর আগমনে শঙ্খে শঙ্খে বেজে উঠেছে মঙ্গলগান। দুর্গাপ্রতিমার অধিবাসের মঙ্গল সম্ভারে সুসজ্জিত পূজাপ্রাঙ্গণ, জগন্মাতা জগদম্বিকার আগমন -‘রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রাহায় চ’।
এই সব কম-বেশি আমাদের জানা। কেন এই বোধনের প্রয়োজন? বাসন্তী পূজায় তো বোধন নেই।
আমাদের দুর্গাপূজার সংকল্প সাত প্রকার। যথা- কৃষ্ণনব্যমাদিকল্প, প্রতিপদাদি কল্প, ষষ্ঠাদি কল্প, সপ্তমাদি কল্প, মহাষ্টম্যাদি কল্প, মহাষ্টমী কল্প এবং মহানবমী কল্প। এর মধ্যে সমগ্র বঙ্গদেশে দুর্গাপূজায় সংকল্পে ষষ্ঠাদি কল্প প্রচলিত। এই কল্পে বিল্ববৃক্ষে দেবীর মঙ্গল বোধন অনুষ্ঠিত হয়। এরপরে আমন্ত্রণ ও অধিবাস। সপ্তমীর রাতে নবপত্রিকা স্নানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক পূজা আরম্ভ।
দেখা যাচ্ছে, অন্য কোনো পূজায় এই বোধনকর্ম নেই। কারণ কী? পুরাণ বলছে, দেবতাদের ছয় মাস দিন এবং ছয় মাস রাত্রি। মানুষের দিবারাত্রি বারো ঘণ্টা করে। অর্থাৎ মানুষের এক বছরে দেবতার এক দিন । সম্বৎসর দুটি ভাগে বিভক্ত-উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছমাস উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ দক্ষিণায়ন। এ জন্যই আষাঢ় মাসের শুক্ল একাদশীর নাম শ্রীহরির শয়ন একাদশী। একইভাবে মাঘ মাসের শুক্ল একাদশীর নাম উত্থান একাদশী।
এবার শারদীয় আশ্বিন মাস দক্ষিণায়নের অন্তর্গত। মহাবিদ্যা মহামায়া অম্বিকা কিংবা আমাদের রক্তদন্তিকা তখন নিদ্রিতা। অকালে এই মহাদেবীকে নিদ্রিত অবস্থা থেকে জাগিয়ে তার বোধনের ব্যবস্থা করতে হয়। তাই শারদীয়া পূজা অকালপূজা বলে কথিত হয়। গোদা বাংলায় আমাদের সবার শোনা অকালবোধন।”
রিশান বলে উঠলো, “বেশ অদ্ভুত । কত কিছু জানি না।”
মায়ের মুখ পত্রিকার আবরণ থেকে সরিয়ে অনুজবাবু বললেন, “এই যে বছর বছর দুর্গাপূজা হয়ে আসছে, তারও একটা ইতিহাস আছে।”
“বলুন তবে।”
রাঘব যেন দিনের পর দিন এসব কাহিনি শুনতে পারেন। অনুজ নারায়ণও আজ বলার মুডে আছেন, “বাংলার কবি কৃত্তিবাসের রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গোৎসব ও অকালবোধনের সবিস্তারে উল্লেখ আছে। যদিও বাল্মিকী রামায়ণে সেটা নেই। তবুও শ্রীরামচন্দ্রের অকাল বোধনের উল্লেখ যেসব পুরাণে আমরা পেয়েছি তার মধ্যে বৃহদ্ধর্মপুরাণ, দেবীভাগবত, কালিকাপুরাণ এবং মহাভাগবতপুরাণ উল্লেখযোগ্য। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি হলো বৃহদ্ধর্মপুরাণের, যেখানে বলা হচ্ছে…”
কথা শেষ করতে পারলেন না অনুজ নারায়ণ। হঠাৎ করে সমগ্র চন্দ্রহাস মহল যেন কেঁপে উঠলো। কে যেন পাতালপুরী থেকে মহলের সমস্ত ভিতটাকে ধরে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে।
অনুজ নারায়ণ বললেন, “ঘাবড়াবেন না। প্রতি বছর এই সময় এরকম নানাবিধ উপদ্রব শুরু হয়। নীচের যমপুরীতে মায়ের পূজার মাস হলো রক্তমাস। আর আজ বোধন মানেই তো রক্তের বোধন।”
অনুজ নারায়ণ চোখ বন্ধ করেন। পুরাণের গল্প আর এগোয় না, সবার মনে আবার একটু একটু করে ভয় ফিরে আসছে।
রাঘব বেশ কিছু সময় ধরে শুধু রক্তদন্তিকার মূর্তিটার দিকে চেয়ে আছেন। সমগ্র কাঠামোতে ঠিক কী যেন একটা বেমানান। চোখে পড়েও পড়ছে না যেন।
মায়ের দাঁত বেদানার রঙের মতো টুকটুকে লাল। অথচ কী ভীষণ ভাবে শেষ হতে চলা বিকেলের প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে মুখ জুড়ে। দুর্গা সপ্তসতীর একাদশ অধ্যায়ে মা রক্তদন্তিকার উল্লেখ পেয়েছিলেন রাঘব, যেখানে মা দুর্গা নিজে তার অবতারগুলির ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। বিপ্রচিতি নামক এক অসুর হত্যার জন্য মা দুর্গা এই রক্তদন্তিকা রূপ ধারণ করেছিলেন। বিপ্রচিতি হত্যার পর তার রক্ত দেবী পান করেছিলেন বলেই তার দাঁতের এই লাল রঙ। মা রক্তদন্তিকার চার হাত। উপরে এক হাতে এক পাত্র রক্ত, অন্য হাতে খড়্গ। নীচে এক হাত বরাভয় মুদ্রায়, অন্য হাতে ধরে রেখেছেন হাতুড়ি। সাধারণ দুর্গা মূর্তি থেকে অনেকটাই আলাদা এই মূর্তি।
মা’কে স্নান করিয়ে শেষবারের মতো খটকার জায়গাটা দেখে নিলেন রাঘব। তারপর চলে এলেন ঘরে। আজ বোধনের দিন পুস্তকটা পড়তে বলা হয়েছিল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন তিনি। আলমারি থেকে বের করলেন কাঠের বাক্স। বিছানায় বসে খুলে ফেললেন সেই বাক্স।
ঝুরঝুরে হয়ে আসা পাতাগুলোকে সন্তর্পণে নিয়ে ধীরে ধীরে পড়তে থাকলেন সেই পুস্তক। মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ সমস্ত ঘটনাই সংস্কৃতে লিখে গেছেন এই পুস্তকে। সংস্কৃত নিয়ে তুখোড় পড়াশোনা থাকাটা আজ রাঘবের কাছে আশীর্বাদ বলে মনে হলো। সংস্কৃত পড়ে পড়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই মহারাজের লেখা কাহিনির মর্ম উদ্ধার করতে পারছিলেন। হয়তো এও ভবিতব্য ছিল। ভৈরবের অভিশাপে এই কাহিনি কেউ সবটা মনে রাখতে পারবে না জেনেই মহারাজ লিখে রেখে গেছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। ভৈঁরো দেও থেকে শুরু করে সেই কাহিনি গড়িয়েছে ভৈরবের শাস্তি বিধান পর্যন্ত। যে কাহিনির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন বস্তার, তনুশকে দিতে হয়েছে প্রাণ, রাঘব-রিশানকে রাতের অন্ধকারে ভয়কে জয় করতে হয়েছে সৌদামিনী ও ব্রজ নারায়ণের কাছে পৌঁছাবার জন্য-সেই কাহিনির সিংহভাগ এই বইতেই ছিল। শুধু মহারাজ হয়তো কাউকে বিশ্বাস করে যেতে পারেননি বলে রেখে এসেছিলেন গুহায়, কারণ ওখানে বছরে একবার কাউকে না কাউকে যেতেই হতো। আর হয়তো মহারাজ চেয়েছিলেন, যে বা যিনি তার পরিবারকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করবেন, তিনি যেন এই পরীক্ষায় পাশ করে তবেই বড় পরীক্ষায় নামেন।
রাঘব গোগ্রাসে কাহিনি পড়ছিলেন, কারণ তার লক্ষ মহারাজ প্রতাপ নারায়ণের শেষ জীবন। স্বেচ্ছায় গুহায় ঢুকে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটার হাতে মৃত্যুবরণের আগে ঠিক কী জানতে পেরেছিলেন তিনি? তার জীবনের শেষ কিছু বছর ঠিক কোন খাতে বইছিল?
এ পুস্তক যে মহারাজ যে নিজে লিখেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। এতটাই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ বর্ণনা। ভৈরবের মৃত্যুর আগের কাহিনি সবটা জেনে ফেললেও পড়ার সময় রাঘবের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ভৈরবের মৃত্যু পরবর্তী ঘটনায়ও যে একই দশা হবে তা বলাই বাহুল্য। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায়, তা হলো :
“ভৈরবের মৃত্যুর পর প্রায় কুড়ি বছর কেটে গেছে। সুড়ঙ্গে যে এক নরপিশাচের উপস্থিতি আছে, তা এখন আমি সহ মহলের সকলেই বুঝতে পারি। এ কয় বছরে মাঝেমাঝেই পৈশাচিক গর্জন বা মহলের হঠাৎ নড়ে ওঠা- এগুলোতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শুরুতে ত্রস্ত হয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে সবাই স্বাভাবিক হচ্ছে, এমনকী আমিও হচ্ছিলাম। কিন্তু তারপর আমার সঙ্গে যে ঘটনাটি ঘটলো, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
“সেদিন আমি রাতের বেলায় তপস্যা করে সবে শুয়েছি। তন্দ্রা এসেছে কি আসেনি, হঠাৎ একটা বিকট গন্ধে ঘুম ভাঙল। অনেক মানুষ এক জায়গায় বলি হলে চারদিকে যেরূপ গন্ধ ছড়ায়, এ গন্ধ সেরকম। আগে আমার এ গন্ধে উত্তেজনা হতো, এখন গা গোলায়। আমি উঠে দেখলাম এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে, যেন আমার জেগে ওঠার অপেক্ষা করছিল সে। ভালো করে চোখ রগড়েই বুঝতে পারলাম, এ কার ছায়ামূর্তি। ভৈরব এসেছে।
সেদিনের পর থেকে সে প্রায় রোজ আসতে থাকে আমার শয়নকক্ষে। বেশিরভাগ সময় শুধু দাঁড়িয়ে আমাকে দেখতো। তারপর চলে যেতো। মাঝে মাঝে সে কথাও বলতো, যেন কোনো জটিল ধাঁধা কিংবা ভবিষ্যতের কোনো সূত্র বলছে সে। আমি বুঝতে পারতাম না। তবে ধ্যানে বসে যখন মাথাটা হালকা হয়ে যেতো, নিজেকে একটা পালকের থেকেও বেশি নরম মনে হতো, তখন মাঝে মাঝে ভৈরবের কথার অর্থ বুঝতে পারতাম।
বুঝতে পারতাম সে ইঙ্গিত করছে ভবিষ্যতের দিকে। সে আবার আমাদের এক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। আবার হয়তো ভৈরবের সঙ্গে মৃত্যুর খেলায় মেতে উঠতে হবে। একটা সময়ের পর থেকে আমি আমার সঙ্গে শয়নকক্ষে চন্দ্রহাস রাখা শুরু করি। তারপর থেকেই ভৈরবের আগমন বন্ধ হয়। আমি বুঝতে পেরেছিলাম চন্দ্রহাসই পারে ভৈরবকে শেষ করতে। যদি আবার সে এ বাড়িতে কোনোভাবে আবির্ভূত হয়, তবে চন্দ্রহাসই পারবে পুনরায় তার নিধন করতে। কারণ চন্দ্রহাসের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এই চন্দ্রহাস যদি একবার হারিয়ে যায় তবে আমার বংশকে ধ্বংস হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, চন্দ্রহাস আমাকে লুকিয়ে রাখতে হবে। আর সে কারণেই চন্দ্রহাস সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছি। চাবিটা রইলো, আশা করি কোনো বুদ্ধিমানের হাতেই পড়বে। সে যদি বোধনের দিন এই পুস্তক পাঠ করে, তবে খুব একটা অসুবিধে হবার কথা নয়। আমি কোনো ধাঁধা রাখতে চাইছি না, কারণ চন্দ্রহাস খুঁজে না পাওয়া গেলে আমার উত্তর পুরুষদেরই অমঙ্গল। কিন্তু সরাসরি বলেও দিতে পারছি না কারণ ভুল হাতে পড়লেও বিপদ। উভয়ই সংকটে পড়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে হ্যাঁ, এই চন্দ্রহাস ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় ছাড়া কেউ তুলতে পারবে না বলে যে বিধান ছিল তা আমি তুলে দিচ্ছি। আমার পরিবারের রক্ষাকর্তা কোন জাতের বা ধর্মের হবে যেহেতু জানি না, তাই আজ থেকে চন্দ্রহাস যে কেউ তুলতে পারবে। আমি মহারাজ প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী সজ্ঞানে এই অনুমতি দিলাম।
তবে ছোট ছোট কয়েকটা কথা মনে রাখলে ভালো। আমি ধ্যান যোগে কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করতে পেরেছিলাম। এই কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের পেছনেও আছে একটা ছোট কাহিনি। এই ঘটনা না ঘটলে বোধহয় রক্তস্নানে অভ্যস্ত এক রাজা কোনোদিন সন্ন্যাস জীবন যাপন করতে পারতো না। আগেই সবাইকে জানিয়েছিলাম যে পুত্রসন্তান লাভের পর আমার চিত্তশুদ্ধি ঘটেছে। এই রাজ্যে নরবলি সহ অন্যান্য সমস্ত পাপকর্ম বন্ধ করার ব্যবস্থা আমি ধীরে ধীরে করছিলাম। তবু একান্তে আমার মনে হতো আরও গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমি সেই রাস্তা জানতাম না। এরকমই একদিন আমি চন্দ্রহাস মহলের বাইরে পায়চারি করছি। সিপাহি এসে জানায়, পাশেই এক গাছতলায় এক সন্ন্যাসী এসেছেন। তিনি নাকি চোখ মেলেই আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাম সেখানে। এত সৌম্যদর্শন ব্যক্তি আমি জীবনে দেখিনি। অথচ মুখে দাড়ি গোঁফ ভর্তি, গায়ে ছাইভস্ম, পরনে গেরুয়া কাপড়, বয়সের গাছ-পাথর নেই। সমস্ত প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে তার দুই নয়নে। শিশুর সারল্য খেলা করছে সেখানে। প্রথম দর্শনেই তিনি আমায় বললেন, “অন্তঃস্নান বিহীনস্য, বহিঃস্নানের কিম্ফলম্।”
আজ্ঞাচক্রে এক গভীর হ্রদ আছে, মনকে সেখানে স্নান করাও।
জীবনে কোনোদিন কাউকে গুরু মানিনি। সেই মুহুর্তে আমার মনে হলো একে গুরু না মানলে আমার জীবন বিফল। জীবনে গুরু প্রয়োজন। বললাম, আমাকে মার্গ দর্শন করান গুরুদেব। বড় কষ্টে আছি।
তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমি ওকে আমার চন্দ্রহাস মহলে আসার অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। অগত্যা আমিই তার সঙ্গে বৃক্ষতলে থাকতে শুরু করলাম। দীর্ঘ দিন ওর সাহচর্য লাভ করেছি। ধীরে ধীরে তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে অভিষিক্ত করালেন। পূর্ণাভিষেক, শাক্তাভিষেক। ধীরে ধীরে মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ মানুষটাকেই বদলে দিলেন তিনি। সবসময় বলতেন, “অনেক তো বাহ্য মৈথুন করলি, এবার অন্তর মৈথুনে নিজেকে নিয়োজিত কর। আড়াই প্যাচে কুলকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে সহস্রাকে পরমশিবে মিলিত কর। এটাই আসল মৈথুন।”
একদিন তিনি বৃক্ষতল ছেড়ে চলে গেলেন। আমার শত অনুরোধ সত্ত্বেও চন্দ্রহাস মহলে এলেন না। বললেন, “যদি প্রয়োজন মনে করি, নিজে থেকেই আসব।”
এইটুকু পড়ে রাঘবের মনে পড়লো সেই সন্ন্যাসীর কথা, যিনি রাজমাতা শিবাঙ্গীর কাছে এসেছিলেন। এত বছর বাঁচাটা অলৌকিক বটে, কিন্তু এ কাহিনি লৌকিক-অলৌকিকের বেড়াজাল টপকেছে অনেকদিন আগেই। হয়তো তার শিষ্যের পরিবারের বিপদ অনুধাবন করেই তিনি এসেছিলেন। ফিসফিস করে কী বলেছিলেন হয়তো আর জানা যাবে না, কিন্তু এর উপজীব্য যে চন্দ্রহাস খুঁজে বের করা এবং তা দিয়েই একমাত্র ভৈরবের নিধন সম্ভব, তা এখন স্পষ্ট।
রাঘব আবার পড়তে শুরু করলেন।
“চন্দ্রহাস মহলে রাজা প্রতাপ নারায়ণ হয়ে নয়, ফিরেছিলাম এক সাধারণ সন্ন্যাসী হয়ে। দিনের অধিকাংশই সময়ই ধ্যানে কাটতো আমার। আর তখনই এরকম কিছু জিনিস জানতে পারি, যা জানার পর আমার বুক ফেটে গিয়েছিল। ভৈরবের তন্ত্রসাধনা এতই মারাত্মক ছিল যে শুধু আমি বা আমার পরিবার নয়, সেদিন দন্তেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত আমার সমস্ত অনুগতদের আত্মা এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদের আত্মাও শান্তি পাবে না। তারাও আমার মতো মারা গিয়েও অশান্ত থাকবে। পিতৃতর্পণের জলটুকুও পাবে না। অথচ মুখ ফুটে চাইতে গেলে জলের বদলে কেবল রক্তই চাইতে পারবে। তখনই নিজের শক্তি একত্রিত করে এর একটা সমাধান করার চেষ্টা করি আমি। ততদিনে নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তির স্ফুরণ অনুভব করছি। সব শক্তি পুঞ্জীভূত করে তার ধনাত্মক উপাদান ছড়িয়ে দিই সেই অভুক্ত অশরীরীদের মধ্যে। তারা অসহ্য যাতনা থেকে সাময়িক রেহাই পায়। তারাই আমাকে কথা দেয়, যখন আমার পরিবারের রক্ষাকর্তা আসবে তারা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন রূপে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।”
রাঘব পড়া থামান। কেন এত সব অজানা-অচেনা লোক এসে তাদের সাহায্য করেছিল, সেই ব্যাপারটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার, সেই ঘটি-গরমওয়ালা, দন্তেশ্বরী মন্দিরের সেই লোকটা কিংবা মহারাজের তৈলচিত্র আঁকা সেই চিত্রকর-সবাই শুধু নিজেদের মুক্তির জন্যই সাহায্য করে চলেছে রাঘব আর রিশানকে। রাঘব এত কিছু জানতে পেরে ভেতর থেকে ফুটছিলেন যেন। তিনি পড়তে থাকেন-
“আমি কিছু জিনিস সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে যেতে চাই। এগুলো যদি মনে রাখো, পরিবারের কল্যাণ হবে। তার মধ্যে একটি হলো, প্রতি উনপঞ্চাশতম বছরে যখন অস্থি-মজ্জা সহ রক্ত নিবেদন করা হবে তখন যে ব্যক্তির অস্থি-মজ্জা বলি প্রদত্ত হবে, সে ব্যক্তি সত্তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হবে। কিছু সময়ের মধ্যেই সেই ব্যক্তি নরপিশাচে রূপান্তরিত হবে। মানুষ হয়েও সে মানুষের মাংস খেতে উদ্যত হবে। তখন তার মোহ ত্যাগ করে তাকে একা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। কারণ কিছু সময়ের মধ্যেই ভৈরব নিজের বিকটরূপে উপস্থিত হয়ে সেই বলিপ্রদত্তকে ছিড়ে খাবে। আর অন্যান্য বছর যাই বলি দেবে, পরবর্তী বছর ভৈরব সেসব হাড়গোড় ফেরত দেবে। সুতরাং প্রতি বছর বলি নিবেদনের সময় সাবধানে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করবে।”
এইটুকু পড়ে আবার রাঘব থামলেন। তনুশের দেওয়া বইয়ে রাজমাতা শিবাঙ্গীর অবস্থা তার মনে পড়লো। তিনি নিজের কাটা আঙুল নিজে চিবিয়ে খেয়েছিলেন। তারপর মহারাজ হর নারায়ণ বাইরে থেকে রাজমাতার বিকট আর্তনাদ শুনেছিলেন এবং পরে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
রাঘব একটু দম নিয়ে আবার পড়া শুরু করলেন। পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে খুলে আসছিল প্রায়, এক পাতা এক পাতা করে খুলে নিয়ে পড়তে হচ্ছে। পড়া পাতাগুলো রাঘব বাক্সে রেখে দিচ্ছিলেন।
“দ্বিতীয়ত, উচ্ছিষ্ট গণেশকে খুশি করলে যেমন ফল পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি তিনি কুপিত হলেই একমাত্র তার রোষানলে পড়তে হয়। আমি আমার পূজায় তাকে তুষ্ট করতে পেরেছিলাম। তাই আমার সন্তান লাভ হয়েছিল। সেই সন্তুষ্টির কারণেই হয়তো সেদিন আমার এক সন্তান দাসীর কাছে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায় এবং আমার বংশ লোপ হয় না। কিন্তু আমি অনেক পরে বুঝতে পারি, ভৈরব তার পূজায় কিছু অনিয়ম করেছিল। সেটার মধ্যে আমার সঙ্গে যৌন সংসর্গও আছে। এই যৌনতা পূজার উপাচারে ছিল না। সে হয়তো ইচ্ছে করেই নিজের সর্বনাশ ডাকতে চেয়েছিল শুধুমাত্র আমার সর্বনাশ করতে চায় বলে। তবে হ্যাঁ, আমি ভৈরবের সঙ্গে কাটানো পূজোঘরের মুহূর্তগুলোর জন্য ওর কাছে কৃতজ্ঞ। হয়তো আমার মরে যাওয়া যৌন ক্ষুধা, আমার নিভে আসা পৌরুষ একজন পুরুষ সেদিন আবার জাগিয়ে তুলেছিল, তবু সে মুহূর্তগুলো নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে আমার মনে হয় ভৈরবের প্রতি উচ্ছিষ্ট গণেশের রোষ এই বিশ্বসংসার শেষ হবার দিন অবধি থাকবে। সে মূর্তিও সংরক্ষিত আছে। এমন এক জায়গায় রেখেছি সেই মূর্তি, যে জায়গায় থাকার ফলে আগামী দিনে তবুও তুলনামূলক ভাবে স্বস্তিতে থাকবে আমার পরিবার। অশুভ শক্তিকে প্রবেশ করতে দেবে না আমার চন্দ্রহাস মহলে।”
রাঘব বুঝতে পারে এই মূর্তিটিও খুঁজে বের করতে হবে তাকে। সে পড়তে থাকে।
“আমি সেদিন মায়ের মন্দিরে বসে ধ্যানে বসে দেখতে পাই একটা সময় পর আমার বংশের রক্ত বিভিন্ন জাতি-উপজাতির সঙ্গে মিশে দেশের কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যাবে। ভাগ্য দোষে তারাও আমার অভিশাপের অংশীদার হবে। মহাকাল যতটুকু আমাকে বুঝিয়েছেন, তাতে বুঝেছি সেখান থেকেই হয়তো উঠে আসবেন আমার বংশের রক্ষাকারী। হয়তো এর বাইরে থেকেও আসতে পারেন কোনো সংশ্রব ছাড়াই। তবে এইটুকু জানি, আমার আর এই পৃথিবীর মায়া নেই। যদি আবার আসতেও হয় এই পরিবারের অংশ হয়ে, তবুও মায়া কাটাতে সময় লাগবে না। কিন্তু বাকিদের জন্য এই তৃতীয় কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভৈরব…”
শেষ করতে পারলেন না রাঘব । দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে।
ঠক ঠক ঠক ঠক…
বেশ জোরে শব্দ হচ্ছে। রাঘব পৃষ্ঠাটা বিছানায় রেখে দরজা খুলতে গেলেন। খুলেই দেখলেন রিশান দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, এত জোরে দরজা ধাকাচ্ছিস কেন?”
রিশান ভুল হয়ে যাবার মতো ভঙ্গি করে বলে, “আমি কী করবো! অনুজ নারায়ণবাবু তাড়া দিচ্ছিলেন।”
“তাড়া? কীসের তাড়া?”
“আমি কী জানি! বললেন তোমার কাছে নাকি কী একটা পুস্তক এসেছে, উনি খবর পেয়েছেন। এক্ষুনি দেখতে চেয়েছেন।”
রাঘব এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, “কিন্তু উনি কী করে জানলেন পুস্তকের ব্যপারে? আমি তো কাউকে বলিনি, তোকেও না।”
“তোমাকে নাকি পিতৃতর্পণ করতে যাওয়ার সময় দেখেছিলেন, তুমি নাকি সুড়ঙ্গ থেকে উঠেছিলে।”
রাঘব এই উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন না। রিশান তাড়া দিলো, “ওদিকে পূজা শুরু হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি দাও।”
রিশানের এই আচরণও অদ্ভুত ঠেকলো রাঘবের। তবুও উনি ভেতরে গেলেন এবং বাক্সবন্দি পুস্তক এনে রিশানের হাতে তুলে দিলেন। রিশান তা নিয়ে হাওয়ার বেগে অদৃশ্য হয়ে গেল মন্দিরের দিকে।
রাঘব ঘরে এলেন। দুমিনিট বসে কী যেন ভেবে তৈরি হয়ে নিলেন এবং মন্দিরের দিকে রওনা হলেন। বোধন শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। আশেপাশের কিছু মানুষও এসে উপস্থিত হয়েছে ভয়ডর উপেক্ষা করে। এটাই বোধহয় দেবী মাহাত্ম্য।
রিশান এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, কাঁসর বাজাচ্ছে। ঢাকিরাও দুলে দুলে ঢাক বাজাচ্ছে। অনুজ নারায়ণ চামর-ধুনুচি সহযোগে দেবীকে স্বাগত জানাচ্ছেন পিতৃগৃহে। পুরোহিত মশায় মন্ত্র পড়ছেন। রাঘব আসার অনেক আগেই মা রক্তদন্তিকার হাত অস্ত্রসজ্জিত হয়ে গেছে।
লোকজন চলে আসায় বেশ একটা আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হলেও রাঘবের মনে শান্তি নেই। তিনি চিন্তিতভাবে মন্দিরের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আধঘণ্টা পর যখন বোধন পর্ব সম্পূর্ণ হলো, তৎক্ষণাৎ রাঘব অনুজ নারায়ণকে বললেন, “পুস্তকটা দিন, একটা জিনিস দেখার ছিল।”
অনুজ নারায়ণ আকাশ থেকে পড়লেন, “পুস্তক? কোন পুস্তক?”
“যে পুস্তক রিশান আমার থেকে এনে আপনাকে দিলো। যে পুস্তক আমি সুড়ঙ্গে নেমে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটার সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করে এনেছি। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের শেষ বয়সে নিজে হাতে লেখা পরিবারের ইতিহাস আছে তাতে।” রাঘব বুঝে গেছেন যা বোঝার। শুধু মরিয়া চেষ্টাটুকু করলেন।
অনুজ নারায়ণের বিস্ময় এখনও কাটেননি। আবারও বললেন, “কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। এরকম পুস্তকের কথা আমি প্রথম বার শুনলাম।
বাড়ির সবাই কথাবার্তা শুনে কাছে চলে এসেছিল। রিশানকে কাছে পেয়ে রাঘব জিজ্ঞেস করলেন, “তুই পুস্তকটা এনে কাকে দিলি?”
রিশানও অবাক হলো, “আমি কখন পুস্তক আনলাম! আমি তো তুমি যাবার পর থেকে এখানেই আছি।”
সকলে এই উত্তরে সায় দিল।
“হ্যাঁ, রিশান তো সেই কখন থেকেই এখানে বসে আছে, জোগারযন্তর করছে।”
রাঘব সঙ্গে সঙ্গে ছুটলেন ঘরে। পেছন পেছন বাকিরা। বিছানার উপর শেষ পৃষ্ঠাটি রাখা ছিল। রাঘব খুঁজতে গেলেন। কিন্তু পেলেন না। নীচু হয়ে ঝুঁকতেই দেখলেন বিছানার নীচে চলে গেছে পৃষ্ঠাটি। শুয়ে পড়ে সেটা বের করলেন। যতটা পড়েছিলেন, তারপর থেকে লেখা আছে।
“কিন্তু বাকিদের জন্য এই তৃতীয় কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পূজার বোধন ক্রিয়া শুরু হওয়া থেকে সন্ধি পূজায় বলি হওয়া পর্যন্ত যে কারো রূপ ধারণ করতে পারে ভৈরব। সাবধানে থেকো সবাই।”
রাঘবের চোখ বড় হয়ে গেছে। তিনি বুঝে গেছেন এই যুদ্ধ এখন সত্যিই অসম। এই যুদ্ধ জয়ের শেষ আশাটুকুও যেন নিভে গেল। ঢেকে গেল একরাশ অন্ধকারে। তিনি দরজার সামনে দাঁড়ানো অনুজ নারায়ণের হাতে কাগজটা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। অনুজ নারায়ণের হাত থেকে বাকিরাও দেখে নেয় সে লেখা। প্রত্যেকের হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে এলো।
শুধু রাঘব কোনোক্রমে পকেটে হাত ঢোকালেন। যাক! চাবিটা অন্তত সুরক্ষিত আছে। ভাগ্যিস! আগেই বের করে নিয়েছিলেন।
উপর থেকে ধুপ করে কী একটা যেন বারান্দায় এসে পড়লো। সবাই গিয়ে দেখলো একটা বাক্স জ্বলছে। কেউ যেন আগুনে পুড়িয়েই ছিটকে ফেলে দিয়েছে নীচে।
রাঘব বুঝতে পারে এ কোন বস্তু। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের লেখা পুস্তক, দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে সেটা। এই ইতিহাস আর কোথাও লেখা নেই, লেখা হবেও না।
