চন্দ্রহাস – ১.৪

অধ্যায় ৪

অষ্টমীর রাতের শেষ প্রহর, নবমী শুরু হবে। ঢাকের মাদকতায় কলকাতা শহর আচ্ছন্ন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধুনুচি নাচের আসর। ছোট থেকে বড় সবাই পূজা মণ্ডপ, মন্দির প্রাঙ্গণ ইত্যাদিতে বসে আছে। সন্ধি পূজার রাত আজ।

শহর জুড়ে এত রোশনাই কলকাতা শহর বছরের বাকি দিনগুলোতে দেখে না। চারদিকের আলো ঝলমলে রাস্তা দেখে বোঝার উপায় নেই, কিছুদিন আগে এই শহরই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দামামায় তর্ক জুড়েছিল। বোঝার উপায় নেই এটা নকশাল পিরিয়ডই কি না।

আজ বাঙালি শুধু এটা জানে যে মা এসেছেন, আর কিছুক্ষণ আছেন আমাদের সঙ্গে। তারপরই দশমী ঘাটে নিরঞ্জন। আবার এক বছরের অপেক্ষা। যা করবার আজ রাতেই করতে হবে।

হ্যাঁ, ওই একই কথা, যা করবার আজই করতে হবে ভেবে হর নারায়ণ রাজবাড়ির অন্দর মহলে প্রবেশ করলেন। রাজবাড়িতেও আজ নবমী পূজা শুরু হবে, সন্ধি পূজার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু শহরের বাকি পূজাগুলোর মতো এখানে আজ আলোয় আলোয় ভরে ওঠা নেই, বরং গোটা শহরের অন্ধকার যেন আজ আশ্রয় নিয়েছে রাজবাড়িতে, আর তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে নিভে যাওয়া প্রদীপ শিখাগুলো। তিমির নাশ নয়, তিমির গ্রাস করেছে এই রাজবাড়ি। দুর্গাপূজায় যখন চারদিকে সাজো সাজো রব, তখন এই রাজবাড়িতে যেন শোকের ছায়া নেমে আসে। নিয়ম করে পূজো তো হয়, কিন্তু সে পূজোয় আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই-আছে শুধু ভয়। যে ভয় এ পরিবার বহন করে আসছে বিগত প্রায় একশো বছর ধরে।

হর নায়ায়ণ ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসছেন। প্রাসাদের এই দিকের একটি ঘরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। যেন ইচ্ছে করেই ঘরটাকে তমসায় পূর্ণ করা হয়েছে। হর নারায়ণ সেই ঘরের দিকেই হেঁটে গেলেন।

“মা…?” হর নারায়ণ শব্দ করে ডাকলেন। নিস্তব্ধ রাজবাড়িতে সেই শব্দের অনুরণন শোনা গেল।

“ভেতরে আয়।” ভেতর থেকে ভারী এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

হর নারায়ণ ভেতরে ঢুকতেই ল্যাম্পের টিমটিমে আলোয় দেখতে পেলেন পালঙ্কের এক কোণে সাদা ধপধপে শাড়ি পরে, হাতে জপের মালা নিয়ে বসে আছেন বছর পঁয়ষট্টির এক বৃদ্ধা। এই আলোতেও তার মুখ দেখা যাচ্ছে। সে মুখ গম্ভীর কিন্তু চোখ উজ্জ্বল। সেই উজ্জ্বল চোখে একই সঙ্গে শান্ত দিঘির গভীরতা এবং ভ্রূপল্লবের গুণে ঝড়ের পূর্বাভাস।

“এখানে এসে বসো মাটিতে।”

যদিও এখানে মাটি নেই, সিমেন্টের মেঝে, হর নারায়ণ কিছু বললেন না। রাজমাতা শিবাঙ্গী যে কথার পিঠে কথা পছন্দ করেন না, সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। চুপচাপ এসে বসলেন।

রাজমাতা দেখলেন বংশের বড় ছেলে এসে তার পায়ের কাছে বসেছে। আলো কম, তবু তিনি বুঝতে পারলেন হর নারায়ণ লাল শালু পরে এসেছে। হাতে কী যেন একটা আছে, সেটা মেঝেতে নামিয়ে রেখেছে সে।

“সময় কি উপস্থিত?” ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর রাজমাতার।

হর নারায়ণ আবিষ্কার করলেন, তার গলা দিয়ে প্রথমবারের চেষ্টায় শব্দ বেরোল না। শব্দ জিভে পৌঁছানোর আগেই গহ্বরে হারিয়ে গেল। দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় তিনি বলতে পারলেন, “হ্যাঁ, মা। সময় উপস্থিত।”

“বেশ। আমার বলার বিশেষ কিছু নেই। শুধু এটা মনে রেখো যে আগামী বছর সেই ভয়ানক রাতের একশো বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ভৈরবের বলা প্রত্যেকটা কথা যেন পালন করা হয়, ঠিক যেভাবে আজ থেকে পাঁচ দশক আগে আমরা পালন করেছিলাম।”

“মা, একটা প্রশ্ন ছিল।”

“এই মুহূর্তে আমি আর কারোও মা নই। আমি রাজমাতা, এই রাজবাড়ির রাজমাতা শিবাঙ্গী।”

“ক্ষমা করবেন আমাকে, রাজমাতা। আমার প্রশ্নটা কি করতে পারি?”

“বলো।”

“এই অভিশাপ থেকে কি আমাদের মুক্তি নেই? কোন নিদান নেই এই অভিশাপের!”

“আমি জানি না। শুধু দুটো জিনিস জানি, সেটা তোমাকে জানাতে পারি।

“বলুন রাজমাতা।”

“ভৈরব মৃত্যুর পূর্বে জানিয়েছিল, সে প্রতি পঞ্চাশতম বছরে একবার সম্পূর্ণ নরদেহের নিবেদন চায়। প্রথম বার আমরা উপেক্ষা করেছিলাম। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তোমার বড় ভাই কালসর্পের কামড়ে মারা যায়। এ ঘটনা আমাদের চোখে দেখা। কিন্তু শরীরে কোনো বিষ ডাক্তারি পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি।”

“সে ঘটনা আমি জানি রাজমাতা।”

“বংশ রক্ষা করতে চাইলে প্রতি বছর নররক্ত, উনপঞ্চাশতম বছর টাটকা অস্থিসহ মাংস এবং পঞ্চাশতম বছর নরমুণ্ড-ব্যস! এর বেশি আমরা আর ভাবতে চাইনি।”

“বেশ তাই হবে। আর দ্বিতীয় কথা কী ছিল?”

রাজমাতা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। হাতের মালায় দ্রুত কর বদলে যাচ্ছে। তিনি জপ করছেন। এভাবে কিছু সময় কাটলো।

“রাজমাতা?”

“সেবার একজন তপস্বী এসেছিলেন আমাদের রাজবাড়িতে। অনেক কাল হতে চললো সে ঘটনার। তোমরা সবাই তখন রাজকার্যে বাইরে। আমি একাই ছিলাম। তাকে মন্দিরে নিয়ে যাই, বিগ্রহের দর্শন করাই এবং ওর আহারাদির ব্যবস্থা করি। উনি যখন খেতে বসেছেন, তখন আচমন সম্পূর্ণ করে প্রথম গ্রাস মুখে তোলার সময় ওর হাত সেখানেই আটকে গেল। মুখ অবধি পৌঁছালো না। তখন তিনি আহার্য বস্তু নামিয়ে হাত ধুয়ে আমায় বলেছিলেন… কে, কে ওখানে?”

রাজমাতা শিবাঙ্গী কথা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। হর নারায়ণের পেছনে কীসের যেন একটা ছায়া দেখে তিনি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন। হর নারায়ণও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকালেন এবং ছুটে গিয়ে ঘরের আলো বাড়িয়ে দিলেন।

“কেউ নেই মা, কেউ নেই এখানে।”

রাজমাতা এই সময়ের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। মুখে বললেন, “আবার ভুল। মা নয়, রাজমাতা। তুমি আর দেরি করো না, ভৈরব ক্ষুধার্ত। তুমি কার্য সম্পন্ন করো।”

“কিন্তু আপনি বলুন, সেই তপস্বী আপনাকে কী বলেছিলেন?”

“ভৈরব চায় না তুমি তা শোনো। আমি বলতে পারবো না। তুমি এখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করো এবং পূজা সম্পূর্ণ করো।

হর নারায়ণের আর কিছু বলার নেই। তিনি আবার ঘরের আলো কমিয়ে দিলেন এবং রাজমাতার দিকে অগ্রসর হলেন। ঘরে ঢোকার সময় যে বস্তুটি তিনি নিয়ে এসেছিলেন, সেটা তিনি মেঝে থেকে তুলে নেন। অল্প আলোতেও এবার স্পষ্ট দেখা যায়-সুপুরি কাটার আঁতি।

হর নারায়ণ রাজমাতার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার পায়ের কাছে গিয়ে বসে পড়লেন। নিজের হাত দুটো রাজমাতার পায়ে রাখলেন এবং সেখানেই মাথা রেখে কেঁদে ফেললেন।

শত হলেও তো তিনি মা। এবার আর রাজমাতার কাঠিন্যে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। জপের মালাসহ হাতটি সন্তানের মাথায় রেখে বললেন, “দুঃখ করিস না। আবার জন্মালে তোকেই সন্তানরূপে পাবো।”

কথাটি বলে নিজের অধর সন্তানের মাথার কাছে এনে চুমু খেলেন তিনি। আর ঠিক তখনই ফিসফিসিয়ে হর নারায়ণের কানে কিছু কথা বললেন রাজমাতা শিবাঙ্গী। আর তা শুনে হর নারায়ণ বজ্রাহতের ন্যায় মাথা তুলে তাকালেন রাজমাতার দিকে। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পেরেছেন।

“কে, কে ওখানে?” রাজমাতা আবার চিৎকার করে উঠলেন, “হর, আর সময় নেই বাবা, এবার শেষ কর।”

রাজমাতার ভূমিকায় না থেকে এবার সরাসরি নিজের ছেলের কাছে অনুনয় করলেন শিবাঙ্গী।

“আমি করতে পারব না মা। পারব না। এ কার্য আমার দ্বারা হবে না।

“সব হবে। একদিন চন্দ্রহাসও তুলবে এই হাত, আজ তো কেবল একটা জাঁতি তুলতে হচ্ছে। আর শোনো, আজ থেকে মনে রাখবে, তুমি মহারাজ। রাজার মতো চলবে, সিদ্ধান্ত নেবে।”

এই কথাগুলো যখন রাজমাতা বলছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি কখন যে জাঁতির দুই ধারালো অংশের মাঝে নিজের পায়ের আঙুলগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছেন হর নারায়ণ বুঝতেই পারেনি। শিবাঙ্গী ছেলের মাথায় হাত রেখে তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করলেন, “সবাইকে বলতে শেখাতে হবে, ‘মহারাজের জয় হোক’। কী বলতে হবে?”

হর নারায়ণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললেন, “মহারাজের জয় হোক।”

পরপর রাজমাতা এবং হর নারায়ণ একই কথা বলতে লাগলেন, “মহারাজের জয় হোক।”

“মহারাজের জয় হোক।”

“মহারাজের জয় হোক।”

একত্রে ধ্বনিত হওয়া এই শব্দপুঞ্জ রাজবাড়ির নিস্তব্ধতা এক নিমেষে ভেঙে ফেললো আর তারই মাঝে রাজমাতা তার ছেলের হাতে ধরে থাকা জাঁতির হাতলে সজোরে চাপ দিলেন।

“আ-হ-হ।”

এক বীভৎস চিৎকারে রাজবাড়ির বাকি নিস্তব্ধতা চিরতরের জন্য ভঙ্গ হলো। হর নারায়ণ আবিষ্কার করলেন, তার শরীরে রক্তের স্রোত বইছে। রাজমাতার পাঁচটি আঙুল জাঁতির আঘাতে টুকরো হয়ে হর নারায়ণের কোলে এসে পড়েছে এবং আঙুলবিহীন পা থেকেই এই রক্তের স্রোত উপচে পড়ছে তার গায়ে। কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন তিনি। রাজমাতা বিকৃত শব্দে চিৎকার করে চলেছেন এবং হাত দিয়ে হর নারায়ণকে এই ঘর পরিত্যাগ করতে বলছেন। হর নারায়ণ ঠিক কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কোনক্রমে উঠে দাঁড়ালেন। হাতে, পায়ে, গায়ে মায়ের রক্ত মেখে, চোখে জল নিয়ে এবং সর্বোপরি নিজের মায়ের বলি দিয়ে এর আগে কোনো ছেলে রাজ্যাভিষেক করেছিল কি? জানা নেই।

“চলে যা হর এখান থেকে। এখন আমি ভৈরবের। তুই এখানে থাকলে তোকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবো আমরা।”

নাহ, এরপর মহারাজ হর নারায়ণ আর সাহস করে সে ঘরে থাকতে পারেননি। মেঝে থেকে মায়ের পাঁচটি আঙুল কুড়িয়ে তুলতে গেলেন। চারটি আঙুল পেলেন। ল্যাম্পের আলো নিয়ে আরেকটি আঙুল খুঁজতে গিয়ে মহারাজ হর নারায়ণ আবিষ্কার করলেন রাজমাতা নিজের কাটা কড়ে আঙুল হাতে তুলে নিয়েছেন এবং মুখে পুরে ফেলেছেন। দাঁতে কাটছেন নিজেরই আঙুল। আর কিছু বোঝার বাকি থাকে না। একটা পাত্রে কোনক্রমে চারটি আঙুল এবং রক্ত সংগ্রহ করে ল্যাম্প নিভিয়ে বের হয়ে এলেন তিনি।

সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছেন, ঘর থেকে শোনা যেতে লাগলো মানুষের মাংস খুবলে খাওয়ার শব্দ এবং রাজমাতার মায়াবী কান্না। এ কান্না কষ্টের নয়, বিরহের। সময়ের আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার মায়া কান্না।

যতক্ষণে মহারাজ হর নারায়ণ মন্দিরে প্রবেশ করলেন, ততক্ষণে তার চোখের জল শুকিয়ে মুখে এক আলাদা কাঠিন্য চলে এসেছে। কোনো মহারাজ প্রকাশ্যে চোখের জল ফেলেন না।

মন্দিরে পুরোহিতমশাই অপেক্ষা করছিলেন এতক্ষণ ধরে, ছিলেন হর নারায়ণ পত্নী সুরবালা, ছোট ভাই ব্রজ নারায়ণ এবং বোন সৌদামিনী। বাড়ির অনুগত ভৃত্যরাও ছিল। সবাই অপেক্ষা করছিলেন হর নারায়ণের ফিরে আসার। তাকে ফিরতে দেখেই মহিলারা সবাই কাপড়ে মুখ ঢাকলেন। ব্রজ নারায়ণ দাদার সামনে ছলছল চোখে এসে দাঁড়ালেন, “দাদা?”

“চোখের জল মুছে ফেলো। এটা পূজার সময়। আমাদের বাড়িতে রক্ত ছাড়া পূজা অসম্ভব। অভ্যস্ত হয়ে যা।”

মহারাজ হর নারায়ণ কথা বাড়ালেন না আর। পুরোহিতকে বললেন, পূজা পদ্ধতি শুরু করতে । পুরোহিতমশাই সেই মতো সন্ধি পূজার সমস্ত ব্যবস্থাদি সম্পূর্ণ করলেন। রাজমাতা শিবাঙ্গীর রক্তাহুতি দেওয়া হলো। পূজা সম্পূর্ণ হলে মহারাজ তার ভাই ব্রজ নারায়ণ এবং পুরোহিতমশায়কে নিয়ে রাজবাড়ির উত্তর দিকে অগ্রসর হলেন। অন্য কেউ তাদের অনুসরণ করলেন না। ব্রজ নারায়ণ এবং পুরোহিতমশায় হাতে একটা করে মশাল নিলেন। মহারাজা একটি পূজা পাত্রে ফুল-চন্দন শোভিত রাজামাতার অস্থিমজ্জাসহ চারটি আঙুলের বাহক হলেন।

উত্তরদিক বরাবর শেষ প্রান্তে যেখানে রাজবাড়ি শেষ হয়েছে, সেখানে পৌঁছে ব্রজ নারায়ণ মশালটা দেয়ালের গায়ে লাগালেন। দেখা গেল, এক মস্ত বড় ঢিপি আছে এখানে। সেই ঢিপির মুখে একটি লোহার বলয়। সেই বলয়ে চাপ দিয়ে কিছু সংখ্যা জুড়তেই সেই বলয় খুলে গেল এবং ঢিপির ভেতর ঢোকার একটি রাস্তা পাওয়া দেখা গেল। প্রথমে মশাল হাতে ব্রজ নারায়ণ, তারপর মহারাজ হর নারায়ণ এবং সবশেষে মশাল হাতে পুরোহিতমশাই ভেতরে প্রবেশ করলেন।

নিচ্ছিদ্র অন্ধকার রাজত্ব করছিল ওই সুড়ঙ্গে। মশালের আলো যেন অনেক কষ্টে নিজের শেষ জীবনী শক্তিটুকু খরচ করে অন্ধকার কেটে কেটে রাস্তা বানাচ্ছে তিন মনুষ্যের জন্য।

তিনজন অতি সন্তর্পণে এগোতে লাগলেন। চারদিকে পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথ, অথচ কোথা থেকে এই জলের উৎস, তা জানা নেই। এত দিন বন্ধ থাকার ফলে মাকড়সার ঝুল ছড়িয়ে আছে চারদিকে। হাত দিয়ে সরিয়ে এগোতে হচ্ছিল তিনজনকেই। অন্ধকার এক সুড়ঙ্গে লাল শালু পরা তিনজন পুরুষ, হাতে মশাল এবং রক্তে ডোবানো কাটা আঙুল নিয়ে এগিয়ে চলেছে এক অজানা গহ্বরের ভেতর, এ দৃশ্য যেন শত্রুর জীবনেও না ঘটে।

অবশেষে তারা একটা কয়েদখানার দরজার সামনে এসে পৌঁছালেন। লোহার গারদের ভেতরে কী আছে, বোঝার কোনো উপায় নেই। কিন্তু একটা জিনিস তারা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। তাদের আগমনের শব্দে কেউ যেন জেগে উঠেছে। কারাবাসের ভেতর এক অদ্ভুত ছোটাছুটির শব্দ। যেন কেউ কারাবাসের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, এ দেয়াল থেকে সে দেয়াল ছুটে বেড়াচ্ছে। ব্রজ নারায়ণ মশাল উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এই গহীন অন্ধকার ভেদের শক্তি একটা মশালের নেই, হয়তো এরকম একশো মশালেরও নেই।

“পুরোহিতমশাই, আপনি মন্ত্রপাঠ শুরু করুন।”

মহারাজ হর নারায়ণ আদেশ দিলেন। পুরোহিতমশাই তৎক্ষণাৎ জোরে জোরে মন্ত্র পাঠ শুরু করলেন।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরের অদ্ভুত ছোটাছুটির শব্দ শান্ত হল। পরক্ষণেই যেন ধুলোর ঝড় উঠলো কারাগারের ভেতরে। বাইরেও সেই আঁচ এলো, মশাল রক্ষা করা দুরূহ হয়ে উঠলো।

“পুরোহিত মশাই, আপনি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করুন।”

মহারাজের আদেশে মন্ত্রোচ্চারণ বৃদ্ধি পেলো, ততক্ষণে বাইরেও ধুলিঝড় শুরু হয়ে গেছে। কারাগারের ভেতর থেকে হঠাৎই একটা হাড় এসে পড়লো পুরোহিত মশাইয়ের মশালের উপর। কিছু বোঝার আগে আরও কিছু পড়লো। মশাল গেল নিভে। আর একটি মশাল টিম টিম করে জ্বলতে থাকলো। মহারাজ বললেন, বিগত বছরের বলির মহিষ ফেরত দিচ্ছেন তিনি, আমাদেরই ভুল হয়েছিল। ভৈরব শুধুমাত্র নররক্ত লোভী।

পুরোহিতমশাই বললেন, “আপনি এবার পাত্রের বলিপ্রদত্ত আঙুলগুলো কারাগারে নিবেদন করুন।”

মহারাজ তাই করলেন। এক একটা আঙুল ভেতরে যেতে থাকলো আর ঝড় যেন দ্বিগুণ থেকে চর্তুগুণ বেগে বাড়তে লাগলো। কারাগারের লোহার গরাদ ঝনঝন করে উঠলো, যেন এখনই ভেঙে ভয়ঙ্কর কিছু বেরিয়ে আসবে। মহারাজ শেষ আঙুলটা ভেতরে সমর্পণ করে পাত্রটিকেও ভেতরে ফেলে দিলেন। আর থাকা যাচ্ছে না। হাড়গোড় যা আছে সব যেন একে একে বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। তিনজন এক মশালকে আশ্রয় করে বাইরে বেরোনোর পথের দিকে দৌড় লাগালেন।

ব্ৰজ নারায়ণ মহারাজকে বললেন, “দাদা, আমাদের পেছনে কিছু একটা দৌড়ে আসছে। আমি শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”

“আর দেরি নয়, জোরে দৌড়ো। পুরোহিতমশাই আপনিও জোরে দৌড়ান। দৌড়ে রাস্তা শেষ করুন।

মহারাজ নিজেও তাই করতে লাগলেন। সত্যি কিছু একটা এগিয়ে আসছে তাদের লক্ষ্য করে। কিন্তু কী? কারাগারের লোহা এতটাই শক্ত যে কোনো মানুষ বা সাধারণ জন্তুর পক্ষে তা ভাঙা কঠিন। তিনজন মানুষ প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলেন। তাদের পেছনেও একটি শব্দ এগিয়ে আসছে, দীর্ঘশ্বাসের শব্দও এখন স্পষ্ট।

দৌড়াতে দৌড়াতে সুড়ঙ্গের মুখের কাছে পৌঁছালেন তারা। প্রথমে পুরোহিতমশাইকে উপর তোলা হলো। নীচ থেকে ব্রজ নারায়ণ সাহায্য করলেন। মশাল ধরলেন মহারাজা নিজে। শব্দ আরও অনেকটা এগিয়ে এসেছে।

ব্রজ নারায়ণ বললেন, “দাদা আপনি উঠে পড়ুন।”

“কথা না বাড়িয়ে উপরে ওঠো আগে। আমি নীচে আছি।”

“আপনাকে ফেলে যেতে পারবো না।”

“এটা মহারাজের আদেশ।”

আর কিছু করার ছিল না। ব্রজ নারায়ণ যখন উঠে পড়ছেন তখন মহারাজের একটা কথা মনে এলো, রাজমাতা যেটা কানে কানে বলে গেছিলেন। কিন্তু সেই কথা মতো কাজ করার সময় আর হয়তো তিনি পাবেন না। সেই শব্দ এখন অনেকটাই কাছে। অন্ধকারে বোঝার উপায় নেই ঠিক কত কাছে। মহারাজ ছোট ভাই ব্রজ নারায়ণের উদ্দেশে চিঙ্কার করে বললেন শুধু একটাই কথা, “অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে হলে চন্দ্রহাস খুঁজিস। একমাত্র চন্দ্রহাসেই মুক্তি।”

শব্দটা এবার প্রায় ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে, এখন আর উপরে ওঠার চেষ্টা করেও লাভ নেই। মহারাজ মশাল তুলে পেছনে তাকালেন। ব্রজ নারায়ণ উপর থেকে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি দেখলেন, মশাল পেছনে ঘোরানো মাত্র তার দাদা মহারাজ হর নারায়ণের চোখ-মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার পরক্ষণেই মশালটা নিভে গেল।

এক প্রাণঘাতী আর্তনাদ ছাড়া মহারাজা হর নারায়ণ আর কিছুই করার সুযোগ পাননি।

ব্রজ নারায়ণ শক্ত করে লোহার বলয় আটকে, ঢিপির মুখ বন্ধ করে পুরোহিতমশাইকে নিয়ে মন্দিরের দিকে রওনা হলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *