চন্দ্রহাস – ১.১০

অধ্যায় ১০

আজ জন্মাষ্টমী। কৃষ্ণের জন্মতিথি। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লেন রাঘব এবং রিশান। কাছেই এক কৃষ্ণমন্দিরে পূজো দিলেন তারা। সন্ধেবেলা থেকে মেলা শুরু। কিন্তু এই সকাল সকালই প্রচুর যাদবের আগমন ঘটেছে মন্দিরে। পূজো শেষে কিছুক্ষণ নাম সংকীর্তন হলো। সেখানেও ঠায় বসে রইলেন তারা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে আজ দুজনকেই বেশ লাগছে।

মন্দিরে সময় কাটানোর আলাদা করে কোনো কারণ ছিল না। তবে কাল রাতে যখন তারা বাড়ি ফিরলেন এবং অনেকটা সময় নিজের মতো করে ভাবলেন যে এবার কীভাবে সেই রাজবাড়িতে প্রবেশ করা যায়, তখন হঠাই রাঘব বলে উঠেছিলেন, “জানি না কেন এত কিছু করছি। উদ্দেশ্যবিধেয় সবই অসংজ্ঞাত। এও জানি না ঠিক কীসের মুখোমুখি হতে চলেছি নিকট ভবিষ্যতে। কিন্তু তা যে চরম অশুভ কিছু, তারই আভাস প্রতিদিন পাচ্ছি।”

রিশান বুঝতে পারছিল না এই মুহূর্তে ঠিক কী বলা উচিত ।

“ইতিহাসের শিক্ষক হয়ে, নরবলি এবং তৎসম্পর্কিত ফিউডাইল বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ঈশ্বরকে ঘৃণা করেছি। ঈশ্বরের নামে এত হিংসা, রক্তপাত ইতিহাসের পাতায় পড়েছি এমনকী ঘটমান বর্তমানে দেখেছি যে বারবার মনে হয়েছে ওই মূর্তিগুলো না থাকলে বোধহয় এই হানাহানি, ধর্মের নামে বলি, বিরোধ সব কমে যেত। কিন্তু এখন মনে হয় ভুল ভেবেছি। ভুল লোককে দোষ দিয়েছি।”

“ভুল?” রিশান এতক্ষণে কিছু একটা বলার সুযোগ পেলো।

“ভুল নয়? বল রিশান! ঈশ্বর মানে তো পিতা। পিতা কি সন্তানের রক্তে খুশি হতে পারে? আমরা সন্তানেরা পিতার ভাগ করেছি। পিতা এক ও অভিন্ন, সন্তান হয়ে পিতার জন্ম দিতে গেলে গোল তো বাধবেই রে।”

“কিছু বুঝতে পারছি না আমি।”

“তুই অনেক ছোট, একদিন তুই কেন, সবাই বুঝবে। আপাতত এই বিশাল কর্মকাণ্ডে রত হবার আগে কৃষ্ণের নাম নিতে চাই। জানিস রিশান, বাইরে থেকে আমি নিজের শাক্ত পরিবারের অংশ হবার কথা যত জেনেছি, ভেতর থেকে ততই কৃ-আমায় জড়িয়ে ধরেছেন। শুনেছি বৈষ্ণব আর শাক্ত এক দেহে হওয়া যায় না। হায়! আমি কী করে আমার অনুভূতি বোঝাই!”

রিশানকে চুপ করে থাকতে দেখে রাঘব বুঝলেন, এ অরণ্যে রোদন। ছেলেটাকে আর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিতে রাঘব বললেন, “কাল জন্মাষ্টমী। কৃষ্ণের জন্মদিন, কাল কৃ-মন্দিরে যাবো। পূজো দেবো, তারপর ভোগ নেবো। তারপর রওনা দেব অদৃষ্টের পথে। কে জানে আর সুযোগ হবে কি হবে না!”

রিশান এবার বুঝতে পারলো। মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।

সেই মতো বর্তমানে মন্দিরে বসে আছে তারা। ভোগ নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। সেদিকে ডাকতেই দুজনে প্রসাদ গ্রহণ করতে চলে গেল। পাত পেড়ে কৃষ্ণের প্রসাদ নিলো দুজনে। রাঘবের মনে হলো, এত তৃপ্তি আর কোনোদিন আহার করে হয়নি।

মুরলীধরকে প্রণাম করে এবার শক্তি পূজার দিকে অগ্রসর হলেন রাঘব। এ শক্তি ভয়াল, ভয়ঙ্কর। বিশাল তার রূপ, বীভৎস তার তেজ-যার সম্পর্কে ছিটেফোঁটা আন্দাজও তাদের নেই। কোথায় যাত্রা করছে সেটা জানলে হয়তো শেষ মুহূর্তে কৌতূহল দমিয়ে রিশান এবং রাঘব দুজনেই ঘরে ফিরে আসতো। কিন্তু এই যাত্রা হবারই ছিল। বহু বছর আগেই এই যাত্রার আদেশ এসেছিল। আজ শুধু সেই আদেশ পালিত হলো।

গাড়ি যখন উত্তর কলকাতার উপকণ্ঠে তুলনামূলক একটু নির্জন অঞ্চলে এক রাজবাড়ির সামনে এসে থামলো তখন বেলা চারটে। সূর্য অস্ত যেতে এখনও অনেকটা সময় বাকি। রাজবাড়ি যে আর রাজবাড়ি নেই, সেটা আর বলে দিতে হয় না। শুধুমাত্র সকল ঐতিহ্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিংহদুয়ার। সামনে বিশালাকার দুই সিংহ। সোনালি সিংহটির রঙ ক্ষয়ে গেছে, তবু সোনালি রঙ বোঝা যায়। কিন্তু কালো সিংহটি কী করে এত মিশমিশে কালো হয়ে গেল তা বোঝার উপায় নেই। বৃদ্ধ বলেছিলেন। দুটোই সোনালি রঙের ছিল শুরুর সময় থেকে। একটার রঙ কালো কী করে হলো? সত্যি আশ্চর্য হলেন রাঘব এবং রিশান।

গাড়ি থেকে নেমে কালো সিংহের মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন দুজনে।

রিশান প্রশ্ন করল, “বজ্রপাত কি?”

“ধারনা নেই।”

দরজা খোলাই ছিল। আশেপাশে কোনো গার্ডকে দেখতে পেলেন না তারা। অগত্যা ভেতরে ঢোকার মনস্থ করলেন।

প্রকাণ্ড রাজবাড়ি। উত্তর কলকাতার উপকণ্ঠে এরকম রাজবাড়ি আছে, এতকাল জানাই ছিল না। এককালে যে ঢালাও ভাবে সাজানো হয়েছিল এই রাজবাড়িকে, তা দেখেই বোঝাই যাচ্ছে। আরেকটা জিনিসও স্পষ্ট। যিনি সাজিয়েছিলেন তিনি নিশ্চয়ই মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী। সিংহদুয়ারের ফলকেও তার নাম দেখেছিলেন রাঘব। আর তার নামেই রাজবাড়ির নামাঙ্কণ হয়েছে সেটাও বোঝা গেল। ঢুকেই ডান দিকে তুলনামূলক নতুন এক ফলক। তাতে বড় বড় করে লেখা, প্রতাপ নারায়ণ এস্টেট।

এককালে নুড়িবিছানো মসৃণ পথ হলেও বর্তমানে এবড়ো-খেবড়ো হয়ে আছে রাস্তা। ভাঙা লাল ইটের প্রচুর টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চারদিকে। সাবধানে পা ফেলতে হয়। এক সময় হয়তো সুন্দর আম, জাম, কাঁঠালের বাগান ছিল সামনে। সুন্দর বিলিতি ও দেশি ফুলের মনোরম বাগান ছিল, ঝরনায় ঝরঝর করে জল পড়তো। কিন্তু এখন সেই ঝরনায় খরা এসেছে, ফোয়ারার পরির জাদু ছড়ি ভেঙে গেছে। সে একলা দাঁড়িয়ে আছে বিষন্ন হয়ে। বাগান এখন কাঁটাঝোপে ভর্তি। বিলিতি ফুলের বাগানে দু-চারটে জবা আর গাঁদা ফুটে যেন লজ্জা নিবারণ করছে।

সব দেখে-শুনে মনে হলো, এ রাজবাড়ির বর্তমানে যা অবস্থা তাতে এই বাড়ির সম্পর্কে ইতিহাসও হয়তো উদাসীন। কোনো অভিশাপে হয়তো ইতিহাস একে ক্ষমা করেনি, বরং সর্বস্বান্ত করেছে।

রাঘব শুধু একটা কথাই ভাবছেন, এ বাড়িতে আমাদের থাকতে দেবে কেন? কী এমন কারণ হবে যে আমরা অপরিহার্য, সেটা বোঝাতে পারবো।

রিশান একটা জুতসই উত্তর দিয়েছিল বটে, “অন্ধকার এক ইতিহাসের খোঁজে নেমে এতটা পথ এত তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবো, সেটাও তো আগে ভাবিনি। এটাও হয়ে যাবে।”

যা করার তা রাজ্য সরকারের কাছে এ রাজবাড়ি হস্তান্তরের আগেই করতে হবে। সময় খুব কম। মনে পড়তেই পা চালালেন রাঘব। আর এগোতেই একটা বিকট চিৎকার কানে এলো তাদের। এবার হাঁটা থামিয়ে দৌড়াতে হলো।

শ্বেতপাথরের পুরোনো সিঁড়ি ভেঙে মূল ফটকের সামনে এসে দেখা গেল, সেখানে কেউ নেই অথচ ভেতরে একটা চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। শব্দ লক্ষ্য করে ছুটলো রিশান, পেছনে রাঘব। ভেতরে ঢোকার পরোয়ানার চিন্তা কেউ করলো না।

ডান দিকের বিশাল একটি হলঘর পেরোলেই ঘোরানো একটি সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। সেদিক দিয়েই শব্দ আসছে দেখে দুজনেই উপরে উঠতে লাগলেন। দোতলায় উঠে, যে ঘরটি থেকে শব্দ আসছে সে ঘরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন তারা। দেখলেন এক ভয়াবহ কাণ্ড।

ঘরের ছাদে এক প্রকাণ্ড ঝালর ছিল। সেই ঝালর এখন মেঝেতে। চারদিকে কাচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার হয়ে আছে। আর ঘরের তিন দিকে তিনজন ছিটকে পড়ে আছে মেঝেতে। একজন যুবক কোনোক্রমে উঠে ঝালরের সামনে এসেছেন। ঝালরের ঠিক নীচে যে প্রৌঢ় বেশ খানিকটা চাপা পড়ে আছেন তার মুখ যন্ত্রণায় বেঁকে গিয়েছে। অন্য প্রৌঢ়া মহিলা ঝালর থেকে কিছু দূরে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। যুবকটি প্রাণপণ চেষ্টা করেও ঝালর একা সরিয়ে প্রৌঢ়কে বের করতে পারছেন না। | সেকেন্ড কয়েক এই দৃশ্য দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও পরক্ষণেই রিশান এবং রাঘব হাত লাগালেন যুবকের সঙ্গে। তিনজনের চেষ্টায় ঝালর সরানো গেল। বের করা হল প্রৌঢ়কে। সময় নষ্ট না করে তিনজনকে নিজেদের গাড়িতে বসিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন রাঘব-রিশান। রাস্তায় যুবক ছেলেটি একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনারা কারা? এভাবে হঠাৎ…

কথা শেষ করার আগেই রাঘব বলেন, “সেসব পরে হবে, আগে চিকিৎসা শুরু হোক।”

হাসপাতালে ভর্তির পর একদিন কেটে গেছে। রাঘব-রিশান কেউই হাসপাতাল ছেড়ে যাননি। ঠায় বসে আছেন এবং সমস্ত ফর্মালিটি পূরণ করে রোগীদের সমস্ত রক্ষণাবেক্ষণের খোঁজখবর নিচ্ছেন। যুবক ঝালরের

আঘাতে অল্প চোট পেয়েছেন কিন্তু জখম গুরুতর কিছু নয়। প্রৌঢ়াও অল্প চোট পেয়েছেন, চিন্তার সেরকম কিছু নেই। শুধু ঝালর সরাসরি প্রৌঢ়ের উপর পড়ায় তার ডান কাঁধ ভেঙে গেছে। অপারেশন করতে হবে না যদিও, তবে প্লাস্টার করা হয়েছে, এক মাসের ধাক্কা। বিকেলে যুবক কিছুটা সুস্থ বোধ করছে দেখে রাঘব রিশানকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

ডবল বেডের পারসোনাল কেবিনে প্রৌঢ়া এবং যুবক ছিলেন। সম্পর্কে মা ও ছেলে হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক কামরায় এদের রাখতে রাজি হয়, মাঝে যদিও পর্দা টানানো হয়েছে। যুবকের বয়স মেরে কেটে বত্রিশ-তেত্রিশ। যুবক জেগেই ছিলেন, “রাঘবদের দেখে উঠে বসার চেষ্টা করলেন। প্রৌঢ়া ঘুমোচ্ছেন।”

সেই যুবক তাদের দেখে সাগ্রহে আহ্বান জানালেন, “আসুন, আসুন।”

রাঘব সোফায় বসে বললেন, “আপনি একদম ব্যস্ত হবেন না। এখন কীরকম আছেন বলুন?”

“কাল আচমকা এই ঘটনা ঘটায় মাথাটা কীরকম করছিল। হাতে-পায়ে যা লেগেছে তাতে আজ খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। একটু ব্যথা ব্যথা আছে। তবে এমনিতে আজ ভালোই আছি।”

“বাহ, এত ভালো কথা। আপনাকে কালই ছুটি দিয়ে দেবে। ওকে হয়তো আর একদিন থাকতে হবে।”

প্রৌঢ়ার দিকে দেখিয়ে বললেন রাঘব।

“সে থাকুক। মা দুটো দিন এখানে থাকলেই ভালো। সম্পূর্ণ সুস্থ হলেই ছুটি নেবো। বাবাকে নিয়েই চিন্তা।”

“চিন্তা করবেন না। ডাক্তার বলেছেন এক মাসের মধ্যে আবার আগের মতো হয়ে যাবে। অসুবিধার কিছু নেই। এক মাস একটু কষ্ট হবে আর কি!”

“আপনাদের যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো। কোন দৈব অনুগ্রহে আপনারা সেই সময় আমাদের সামনে যেভাবে এলেন, রক্ষা করলেন। জানি না কীভাবে ধন্যবাদ দিতে হয়। আপনারা যা করেছেন সেটা ভাবলে ধন্যবাদ বড্ড ছোট শব্দ।

যুবকের চোখে-মুখে শ্রদ্ধা ও আবেগের ঝলক স্পষ্ট। রাঘব পরিস্থিতি সামলান, “দেখুন, কাল আমাদের ওই সময় আসাটা আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় হলেও গত প্রায় কয়েক মাস ধরে আমাদের জীবনে যা যা ঘটছে তাতে আমি অন্তত তাকে আর কাকতালীয় বলতে পারছি না। এসবই যেন কোনো গল্পের অংশ। আমরা নাম ভূমিকায় অভিনয় করছি মাত্র। কোন বিনি সুতোয় আপনাদের জীবনের সঙ্গে বা আপনাদের পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের জীবন জড়িয়ে গেছে সত্যি আমরা জানি না। শুধু গিঁট খোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি আপ্রাণ । একা আর সম্ভব নয়। আপনার সহায়তা চাই।”

যুবক কিছুই বুঝলেন না, তবে নড়েচড়ে বসলেন।

“কে আপনারা? কী চান? খুলে বলুন। আপনারা আমাদের জন্য যা করেছেন, পরিবর্তে যে কোনো কিছু করতে পারলেই আমরা নিজেদের ধন্য মনে করবো।”

এতক্ষণে তাদের নাম, পরিচয় সব জানায় রাঘব। পরিবর্তে জানতে পারে এই ছেলেটি বর্তমানে এই এস্টেটের শেষ বংশধর, নাম আদিত্য।। রাঘব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কাহিনি তাকে বলে। মহারাজা প্রতাপ নারায়ণের গল্প, তনুশের গল্প, মহাষ্টমীর রাতের গল্প, মা দন্তেশ্বরীর যাত্রার যাবতীয় সমস্ত কিছু জানালেন তিনি। সব শুনে আদিত্য চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ।

“আপনারা সাহায্য না করলে সম্ভব নয়। জানি না আপনাদের পরিবারে ঠিক কী অভিশাপ আছে আর তার সঙ্গে আমাদেরই বা কী সম্পর্ক। তবুও চাই এই অভিশাপ দূর হোক।”

আদিত্য সব শুনে এবার বললেন, “এই ইতিহাস আমাদের পরিবারের বাইরে আর কেউ জানে না। এমনকী আমিও অনেক বড় হয়ে জেনেছি। কিন্তু ঐটুকুই, যতটুকু আপনি বললেন। ধীরে ধীরে এই ইতিহাস বিলুপ্তির পথে। কেউ মনে রাখতে পারে না সে ইতিহাস। ভৈরব বলেছিল, এই ইতিহাস সম্পূর্ণ কেউ মনে রাখতে পারবে না। আর ইতিহাস না জানলে চন্দ্রহাস পাওয়া যাবে না। তাই আমরা কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারবো ঠিক জানি না। আর তাছাড়া এই এস্টেট আমরা রাজ্য সরকারের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছি। পাকা কথা হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।”

রাঘব জিজ্ঞেস করলেন, “সেটা শুনেছি। কিন্তু ভৈরবটা কে?”

“জানি না। কেউ জানে না। এই কাহিনি শুনে গুটিকয়েক মানুষই মনে রাখতে পেরেছিলেন। তাও সবটা নয়।”

“তারা কি কেউ বেঁচে আছেন?

আদিত্য এ প্রশ্নের জবাব দেন না। চুপ করে থাকেন। রাঘব আবার জিজ্ঞেস করেন, “দেখুন আদিত্যবাবু, আপনি রাজবাড়ি হয়তো বিক্রি করে দেবেন, কিন্তু তাতে অভিশাপ আপনাদের তাড়া করা বন্ধ করবে কি? আর যদি চন্দ্রহাস কোনোভাবে রাজবাড়িতে লুকানো থাকে তবে তো এই অভিশাপ থেকে নিস্তারের সমস্ত আশা রাজবাড়ি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে।”

আদিত্য বুঝতে পারছিলেন না কী বলবেন। এমন সময় প্রৌঢ়ার কণ্ঠ শোনা গেল, খুব দুর্বল সে কণ্ঠস্বর।

“এই প্রথম অভিশাপ থেকে নিস্তারের কথা কেউ বলল। এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে শুধু ভয়ে ভয়ে আছি। কত যে দুর্ঘটনা জীবনে দেখেছি তার অন্ত নেই। এই যেমন গতকাল, কেউ যেন ঝালর ছিঁড়ে আমাদের গায়ে ছুড়ে দিলো। আমরা এই রাজবাড়ি বিক্রি করতে চাইছি, কেউ যেন পছন্দ করছে না এই ব্যাপারটা।”

তারপর রাঘবের উদ্দেশে বললেন, “আপনারা আসুন আমাদের প্রাসাদে। আমরা যে কয়দিন আছি, ততদিন থাকুন আমাদের সঙ্গে। দেখুন, যদি কিছু করতে পারেন। শেষ জীবনটা আর ভয়ে কাটাতে চাই না।”

রিশান এগিয়ে প্রৌঢ়ার এক হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, “শুধু কি আপনাদের জীবন, আমরাও দিন-রাত এই ভয়ে ভয়েই কাটাচ্ছি। কদিন আগেই হারিয়েছি আমার ভাইকে, এই অভিশাপ থেকে মুক্তি এবার পেতেই হবে। দেড়শো বছর কেটে গেছে, আর না! ইতিহাস যাই হোক, আমরা প্রয়োজনে মাটি খুঁড়ে তা বের করবো। আপনাকে কথা দিলাম।”

প্রৌঢ়া রিশানের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, “মহামায়া তোমাদের মঙ্গল করুন।”

সেদিন কেউ বুঝতে পারেনি রিশানের কথার অর্থ, হয়তো রিশানও না। যতক্ষণে এর অর্থ বোঝা যাবে ততক্ষণে দেরি না হয়ে যায়!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *