অধ্যায় ৬
প্রফেসর রাঘব চুপ করে বসে আছেন তার রুমের চেয়ারে। দেখে মনে হচ্ছে। ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। সামনের চেয়ারে আরও দু’জন লোক বসে আছেন। একজন প্রৌঢ়, অন্য জনের বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ হবে।
কুণ্ঠা নিয়ে বলে উঠলেন সেই প্রৌঢ়, “আপনি যে এভাবে ভয় পেয়ে যাবেন আমরা বুঝতে পারিনি। ভেরি সরি প্রফেসর।”
রাঘব মাথা নীচু করে উত্তর দিলেন তাকে, “আপনি আমাকে কোনভাবে সরি বলবেন না প্লিজ। সারাজীবন রোজ ওই সরি শব্দটা আপনার বাড়ি বয়ে বলে এলেও আমার পাপ কমবে না।”
দেখে মনে হচ্ছে ভেতর ভেতর কিছু যেন কুরে খাচ্ছে তাকে।
“এভাবে বলবেন না প্রফেসর। যেটা ঘটেছে সেটা সমাজের চোখে দুর্ঘটনা, কিন্তু এরকম কিছু আশঙ্কা আমি আজীবন করে এসেছি। তাই হয়তো এই ঘটনায় তনুশের বাবা হিসেবে যতটা দুঃখ আমার পাওয়া উচিত, ততোটা আমি পাইনি।”
অবাক হয়ে তনুশের বাবা, মানে মি. চৌধুরীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন রাঘব, “কী বলছেন এসব? আশঙ্কা করেছিলেন মানে? কীসের আশঙ্কা?”
“আমার ছেলেটা ছোট থেকেই একটু অন্যমনস্ক ছিল। বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতো যে স্বপ্নের কোনো ভিত্তি আমরা পেতাম না। আবার যে কথাগুলো সে বলতো বা যে জায়গায় তার স্বপ্নগুলোর অবস্থান, এরকম বেশ কিছু জায়গা আমার চাকরিসূত্রে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেসব জায়গায় এর আগে আমি ছাড়া আমার বংশের জীবিত কেউ কখনো যায়নি, তনুশের যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। অথচ স্বপ্নে সে যে ঘটনাগুলো বলতো, আমি যাচাই করে দেখেছি সেগুলো সেখানে ঘটেছে। অথচ তনুশের মাথা পরিষ্কার ছিল। পড়াশোনা, খেলাধুলা সবেতেই সে ভালো ছিল। ডাক্তাররা তার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুই পায়নি। শেষ দিকে সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল যে তার এসব অসংলগ্ন কথায় আমরা বিব্রত বোধ করি, তাকে নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করি। তাই সে আর সেগুলো আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেনি। কিন্তু যেসব ঘটনার খোঁজ আমি পেয়েছিলাম, তাতে কোথাও গিয়ে আমার মনে হয়েছিল তনুশের হয়তো কোনো পূর্ব জন্মের অভিজ্ঞতা আছে যা তাকে এই জন্মে কষ্ট দিচ্ছে।”
“এক সেকেন্ড। পূর্ব জন্ম, মানে আপনি বলতে চাইছেন তনুশ জাতিস্মর ছিল?”
“দেখুন রাঘববাবু, আপনি বিজ্ঞানের শিক্ষক হলে আপনার সঙ্গে এই আলোচনায় বসার কথা আমি ভাবতাম না। কিন্তু আপনি যে বিষয়ের পণ্ডিত, তাতে আমার মনে হলো আপনার সঙ্গে এই কথাগুলো একবার আলোচনা করা প্রয়োজন। আমি নিজে এসব জাতিস্মর ইত্যাদি মানি না, কিন্তু আজ আমার ছেলেটা আর নেই সেটাও একটা সত্যি। আর এই সত্যিটা এ জন্যে বেশি করে অনুভব হচ্ছে কারণ আমি আগে থেকেই এরকম কিছু ঘটার আশঙ্কা করেছিলাম।”
“আপনি নির্দ্বিধায় বলুন, আমি শুনছি সব মন দিয়ে। কিছু মনে করার প্রশ্নই উঠছে না।”
“সে যেসব ঘটনা শুরুতে বলেছিল, সবেতেই নরবলির একটা ছাপ থাকতো। আর আমাদের পরিবারের ইতিহাসেও ঘুরে-ফিরে শুনেছি বলি এক বড় ভূমিকা পালন করেছে। সে বিভিন্ন গল্প, যে গল্পগুলো সময়ের সঙ্গে ভেঙে-গড়ে পরিবেশিত হয়েছে। আমরা বেশ কিছু পুরুষ আগেই ত্রিপুরায় চলে গিয়েছিলাম। তখন ত্রিপুরায় বাঙালি প্রায় নেই। এমনকী যতদূর জানি যিনি প্রথম আমাদের পরিবারের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন, তিনিও নাকি উপজাতি ছিলেন। সেসব গল্পও তনুশ শুরুতে জানত না। তার আগেই সে নরবলি সংক্রান্ত অনেক স্বপ্নের উল্লেখ আমার কাছে করেছিল। তাই আমার মনে হয়েছে এই সব স্বপ্ন, আমাদের পরিবারের মিথ এগুলো শুধুমাত্র গালগল্প নয়, পুরোনো কোনো সম্পর্ক আছে এদের মধ্যে।”
“কীরকম সম্পর্ক?”
“হয়তো কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে ইতিহাসে। ইতিহাস তাই বারবার মনে করানোর চেষ্টা করছে। আমাদের পরিবারে অপঘাতে মৃত্যু এই প্রথম নয়। আমি নিজে এসব ভয় পেতাম। সারাজীবন তাই এসব থেকে দূরে থেকেছি, ছেলেদের দূরে রেখেছি। কিন্তু এখন যখন এক ছেলে গেছে আর অন্য ছেলেও জানালো যে সেও একই ঘটনার শিকার, এবার ঠিক করেছি পরিবারের ইতিহাস ঠিক করতে হবে। এভাবে ভয়ে ভয়ে থেকে আর কিছু লাভ দেখছি না। অনেক মৃত্যু দেখেছি আমরা, আর না।”
“আমি তনুশের ভাইয়ের ব্যপারে জানতাম না। সে কিছু বলেনি, তাই রুমে ঢুকে ওকে দেখে ঘাবড়ে গেছিলাম।”
“তনুশ আর রিশান যমজ। আপনি ভয় পাবেন, সত্যি আমরা বুঝতে পারিনি।”
“আসলে দুর্ঘটনার পর আমি তনুশের মুখটা এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারিনি, তাই আজ হঠাৎ তনুশের মতো কাউকে বসে থাকতে দেখে…”
রাঘবকে মাঝপথে থামিয়ে চৌধুরীবাবু বললেন, “রিশান কয়েক দিন আগে একটা অদ্ভুত জিনিস জানালো আমাকে। সেও নাকি তার ভাইয়ের মতো একই জিনিস দেখে আসছে এত বছর ধরে। কিন্তু কখনো আমাদের কিছু বলেনি।”
“মানে? রিশান তুমি বলো তো ব্যাপারটা কী?”
এবার রিশান প্রথম বার কথা বলে। দেখতে অবিকল তনুশ, কিন্তু গলার স্বর দুজনের আলাদা। তনুশের কণ্ঠ শুতিমধুর ছিল, সে তুলনায় ঘড়ঘড়ে।
“স্যার, আমি দেখতাম ভাই ওই একই স্বপ্নের কথা বলতে যা আমিও আগের দিন রাতে দেখেছি। কিন্তু ভাই বলার পর বাবা-মা সবাই এত বেশি চিন্তায় পড়ে যেতো যে আমি আর বলার সাহস করতে পারতাম না।”
“ওই একই স্বপ্ন তুমিও দেখতে? এমনকী বলি নিয়ে যে স্বপ্নের কথা আমাকে বলেছিল তনুশ, সেটাও?”
রিশান মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ স্যার।”
“আর তাই আপনার কাছে আসা প্রফেসর । আমার এই ছেলেও যখন এসব দেখে আসছে, নিশ্চয়ই ওর সঙ্গে কিছু একটা সম্পর্ক আছে ইতিহাসের। এক ছেলে হারিয়েছি, আরেকজনকে হারালে বাঁচতে পারবো না।”
মি. চৌধুরীর চোখ এবার ছলছল করে ওঠে। রাঘব ওর হাত দুটো ধরে বলেন, “আমি কী করতে পারি বলুন। আপনার এক ছেলেকে ইতিহাস আমার দ্বারা কেড়ে নিয়েছে, আপনার অন্য ছেলেকে বাঁচাতে আমি সব করবো।”
“এ জন্যেই আসা প্রফেসর। আমি জানতাম আপনি ফেরাবেন না। আমাদের।”
“বলুন।”
“রিশানও যখন একই স্বপ্ন দেখছে, আপনি তনুশের সঙ্গে যে বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন, সেটার অনুসন্ধান করুন। দরকারে আপনি রিশানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন ইতিহাসের সন্ধানে। সমস্ত খরচ আমি বহন করব। শুধু পরিবারের সত্যিটা জানতে চাই। কীসের অভিশাপ এত বছর ধরে তাড়া করছে সেটা জানতে চাই। তনুশও তো শুনলাম এটা নিয়েই রিসার্চ করবে ঠিক করেছিল।”
“হ্যাঁ, তনুশ আমাকে তাই বলেছিল।”
বইয়ের কথাটা এখানে তুললেন না রাঘব। বরং অন্য একটা প্রস্তাব দিলেন, “আমি রাজি। তবে এক কাজ করুন, রিশানকে তনুশের জায়গায় এখানে ভর্তি করে দিন। হয়তো আগামী দিনে রিশানের কোনো কাজেই লাগবে না, তবু পেপারটা তনুশের ভাইয়ের নামে সাবমিট করা যাবে। যদি আপনার আপত্তি না থাকে।”
চৌধুরীমশায় ছেলেকেই জিজ্ঞেস করলেন, “রিশান?”
“প্রাইভেট জবটা আপাতত ছাড়তে হবে, এই যা। আমি রাজি।”
“বেশ। তবে বাকি সব আমি দেখে নিচ্ছি। আর রিশান আমার সঙ্গেই আপাতত থাকুক। আমার ভালো লাগবে।”
মি. চৌধুরী এতেও রাজি হলেন। আসলে তিনজনের কাছেই আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। চৌধুরীমশায় ইতিহাসের কোনো অজ্ঞাত অভিশাপে ছেলেকে হারাতে চাইছেন না, রিশান দিনের পর দিন দেখে চলা স্বপ্নগুলোর সত্যতা জানতে চাইছে আর প্রফেসর রাঘব এত দিনে বুঝে গেছেন, এই খেলায় ইতিহাসের কাছে তিনি এক প্রধান ঘুঁটি-যাকে এবার চৌষট্টি ঘরের খেলায় দাপিয়ে বেড়াতেই হবে। যেন এক সুনিপুণ গল্পের ছকে অদৃষ্ট প্রফেসর রাঘবকে চৌধুরী পরিবারের কাছে এনে দিলো। এক নতুন অভিযান শুরু, যার গন্তব্য ফেলে আসা অতীতের দিকে।
***
কয়েক দিনের মধ্যেই রিশানের ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। রিশান এখন প্রফেসরের সঙ্গেই থাকে। সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কথা হচ্ছিলো তাদের মধ্যে। রাঘব হঠাৎ বলে উঠলেন, “সবাই দ্বিতীয় সুযোগ পায় না রিশান, সেটা তুই জানিস?”
এ ক’দিনে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক গাঢ় হয়েছে।
“জানি স্যার। হয়তো ভাইয়ের মতো সেই সুযোগ আমিও পেয়েছি।”
“শুধু তুই? আমি পাইনি! এই যে তুই এলি, তোদের পরিবারের জন্য কিছু একটা অন্তত করার সুযোগ পেলাম-সব খুনিরা সেটা পায়?”
“স্যার, ওভাবে বলবেন না প্লিজ।”
“ড্রিংক করিস?”
“স্যার?”
“আরে বাবা, ড্রিংক করিস?”
“ওই অকেশানালি।”
“বেশ, দাঁড়া আসছি।”
রাঘব উঠে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’পেগ স্কচ এবং এক বাটি কাটা আপেল নিয়ে ফিরলেন। “ধর।”
রিশান একটা গ্লাস নিলো। “স্যার একটা কথা বলবো?”
“বল না।”
“আপনাকে যখনই দেখেছি একদম স্বাস্থ্যকর ডায়েটে দেখেছি। ব্রেকফাস্ট হোক কি কলেজের লাঞ্চ। একদম মেপে নির্দেশানুসারে ক্যান্টিনের ছেলেটা আপনাকে খাবার দিয়ে যায়। আজ হঠাৎ…?”
“আজ হঠাৎ নয়, অনেক কিছুই ঘটে গেছে গত কয়েকদিনে। আসলে কী বল তো রিশান, নিয়মানুবর্তিতা মাঝে মাঝে জীবনে অবসাদ আনে। তখন একটু পাল্টে নিতে হয় নিয়মগুলো। অনিয়ম করতে হয়। তবে অনিয়মকে নিয়ম বানালে জীবনে ক্ষতি। ওই শীতের দিনে হঠাৎ একদিন ঝড় উঠলে ঠিক আছে, রোজ হলে প্রকৃতিরও অসুবিধা, আমাদেরও। নে, আপেল খা।”
গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো বললেন রাঘব। রিশানও ধীরে ধীরে গ্লাস খালি করতে লাগলো।
“স্যার, আমাদের প্ল্যান কী? কীভাবে ইতিহাস খুঁজবো?”
“টাফ কোশ্চেন। অনেক ভেবেছি। মাথায় একটা জিনিসই আসছে।”
“কী সেটা?”
“শুরু থেকেই শুরু করতে হবে। আমাদের হাতে সেরকম কিছু নেই যা থেকে এই কাহিনি জানা সম্ভব। শুধু দুটো ক্লু আছে।”
“চন্দ্রহাস এবং বস্তার?”
গ্লাস শেষ করে আরেক পেগ বানাতে যাচ্ছেন রাঘব। রিশানের উত্তরে ওর দিকে তাকালেন তিনি, “তুই পড়েছিস দ্বিতীয় বইটি?”
“ভাই যেদিন আপনার কাছে আসবে, সেদিনই প্রথম সে বই পড়লাম। ভাই দেখতে পেয়ে গেছিল। তারপর নিজে থেকেই আপনার কথা, আপনার গল্পের কথা আমাকে জানায়। তারপর ভাইয়ের খবর জানার পর বাবার সঙ্গে আলোচনা করি জীবনে প্রথমবার। তারপর আজ এখানে।”
“হুম। আমিও তাই ভাবছিলাম, তোরা জানলি কী করে এত সব! একদিকে ভালোই করেছিল তোকে বলে, দ্বিতীয় চান্সটা নয়তো পেতাম কীভাবে?”
স্কচের বোতলটা এবার এলো। টেবিলের উপরেই রইলো।
“স্যার, আপনি বইয়ের উল্লেখ কোথাও করেননি। পুলিশ ফাইলেও না।”
রাঘব গ্লাস নামিয়ে রাখলেন। মুখে প্রশান্তির ছাপ, চিন্তার লেশমাত্র নেই।
“কী হতো বলে? আমি অ্যাক্সিডেন্টের পরে উঠে তনুশ এবং ড্রাইভারকে দেখে, গাড়ি থেকে বই নিয়ে তারপর আমার গাড়িতে ফিরে জ্ঞান হারিয়েছিলাম! ওরা বিশ্বাস করতো? কেউ করত?”
“আমি করি স্যার।”
রাঘব চাইলেন রিশানের দিকে। ইতিমধ্যেই রিশানকে কীরকম আবছা লাগছে।
“এরকম কিছু একটা আমাদের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে, যেখান থেকে আমাদের বেরোনোর উপায় নেই। সব লেখা হয়ে আছে। আপনার এতদিনকার কাহিনি, দাদার সঙ্গে আপনার দেখা হওয়া, আমাদের স্বপ্ন, দাদার মৃত্যু-সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা। সব জুড়ে জুড়ে সুতোর শেষ প্রান্তে যেতে হবে আমাদের।”
“যাব। খুঁজে বের করবোই। আগে শুধু কৌতূহল ছিল। এখন মনে হচ্ছে কেউ যেন চাইছে এই সব কিছু ঘটুক।”
গ্লাসের পর গ্লাস শেষ হচ্ছে, পৃথিবী আরও আবছা হয়ে উঠছে দুজনের কাছেই।
“স্যার চন্দ্রহাস নাম কেন? কোন আইডিয়া?”
রাঘব প্রশ্ন শুনে শব্দ করে হাসলেন।
“ওরে, চন্দ্রহাস এক বিখ্যাত অস্ত্র। আজকের কথা নয়, এই গল্পের শুরু রামায়ণে।”
“রামায়ণ?”
“হ্যাঁ রামায়ণ, আরও স্পেসিফিকভাবে বললে রামায়নের উত্তর কাণ্ড। তবে আজ এই গল্পটাই বলি।”
রিশানের নেশা ধরছিল। নতুন গল্পের কথা শুনে নড়েচড়ে বসলো সে। হাতে কিছু কুচো আপেল তুলে নিলো।
রাঘব বলতে শুরু করলেন, “তিরুভন্নামালাইয়ের আন্নামালাই মন্দিরে এই কাহিনির চিত্র খোদাই করা আছে, এর নাম বলা হয় রাবণানুগ্রহ। রাবণের রাবণ নামের পেছনেও উত্তর কাণ্ডের এই গল্পটির অসীম ভূমিকা। আর আমাদের চন্দ্রহাসের ইতিহাসের পেছনে তো অবশ্যই। এই কাহিনি ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে খোদাই করতে গুপ্ত যুগের রাজাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
“স্যার গল্পটা কী?”
“এত অধৈর্য হলে হয়? তিষ্ঠ বৎস, তিষ্ঠ। ইতিহাসের জন্ম হয় কত হাজার বছরে, আমরা কি আধ ঘণ্টাও ধৈর্য ধরতে পারি না? শোনো তবে।”
রিশানের চোখ টানছে, তবু সে সজাগ থাকার চেষ্টা করে।
“রাবণ সেবার তার বৈমাত্রেয় ভাই কুবেরের রাজ্য আক্রমণ করে এবং সেখানে জয়ী হয়। কুবেরের সমস্ত অর্থ সে লুটপাট করে এবং লঙ্কার উদ্দেশে যাত্রা করে। কুবেরের পুষ্পক রথে চড়েই সে লঙ্কা যাত্রা করেছিল। এবার কী হলো বলো তো?”
“আমি কী জানি?”
“এবার যাত্রা পথে কৈলাস পর্বত চলে এলো। পুষ্পক রথ কৈলাস টপকে যেত পারবে না। রাবণ প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। এদিকে কৈলাসে রাবণকে দেখে শিবের পরমভক্ত নন্দী সেখানে এল। তাকে দেখেই রাবণ হুঙ্কার দিয়ে জানালো যে সে এই পথেই লঙ্কার দিকে এগোবে। তাকে যেন বাধা দেয়া না হয়। নন্দী তাকে যথাসাধ্য নম্রভাবে জানালো যে এই মুহূর্তে শিব এবং মা পার্বতী একাকী সময় কাটাচ্ছেন। এই মুহূর্তে এই পারাপার সম্ভব না।”
“সর্বনাশ! শিব এবং রাবণ মুখোমুখি?”
“রাবণের সর্বনাশের সেই শুরু। সে খেপে গিয়ে শিব এবং নন্দীকে যা নয় তাই বলে অপমান করল। অপমানে নন্দীও গেলেন খেপে। রাবণকে অভিসম্পাত দিলেন যে বানরদের হাতেই তার সর্বনাশ হবে। তখন অবশ্য রাবণ এসব পাত্তা দেয়নি। সে এক সাংঘাতিক রূপ ধারণ করলো। দশ মাথা এবং কুড়ি হাতের রাবণ, বিভীষণ রাবণ।”
“বিভীষণ রাবণ! এই প্রথম রাবণের বিশেষণে বিভীষণের প্রয়োগ দেখলাম।”
“হ্যাঁ, পুরো কৈলাস পর্বতকে তুলে উপড়ে ফেলে দিতে গেলেন সেই বিভীষণ রাবণ। কুড়ি হাতের একশো আঙুল তিনি কৈলাসের নীচে দিলেন এবং স্বভাবতই পরম পরাক্রমী রাবণের শক্তিতে কৈলাস নড়ে উঠলো। এই সময় মা পার্বতী খুব ভয় পেলেন। তিনি শিবের কাছে এর থেকে পরিত্রাণ চাইলেন। শিব ততক্ষণে বুঝে গেছেন এ কার কীর্তি। শিব ক্রোধিত হলেন এবং এক পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে কৈলাসের এক কোনা চেপে ধরলেন। সেই বুড়ো আঙুলের ভার মহাবীর রাবণ নিতে পারলেন না। সেই বুড়ো আঙুলের চাপে কৈলাসের নীচে চাপা পড়লেন তিনি। ব্যথায়, বেদনায় রাবণ কাঁদতে শুরু করলেন এবং বুঝতে পারলেন কীভাবে শিব মাথায় চাঁদের মতো ভারী বস্তু নিয়ে ঘোরেন। যার বুড়ো আঙুলেরই এই শক্তি, তিনিই তো চাঁদ মাথায় নেবেন।”
“কিন্তু রাবণ মুক্তি পেলেন কীভাবে?”
“ওই যে বললাম, ইতিহাস তৈরি হতে হাজার বছর লাগে। এই গল্পের পরিণতিও হয়েছিল এক হাজার বছর পর। ওয়েট মাই ডিয়ার স্টুডেন্ট, দাড়াও। আমাকে আর এক গ্লাস বানিয়ে দাও। ওয়ান ইসটু ওয়ান; জল অ্যান্ড স্কচ।”
রিশান আদেশ পালন করলো।
“রাবণের মন্ত্রীরা তাকে শিবের নাম-গান করার পরামর্শ দিলেন। রাবণও ততক্ষণে বুঝে গেছেন কার কোপে পড়েছেন। রামায়ণের এই অংশের তামিল ভার্সানে লেখা আছে রাবণ নাকি সেই সময় তার দশ মাথার মধ্যে একটি কেটে ফেলেন এবং তা দিয়ে বীণা তৈরি করেন। তারপর বিখ্যাত শিব তাণ্ডব স্তোত্র রচনা করেন এবং গাইতে থাকেন।”
রিশান তাজ্জব হয়ে যায় একইসঙ্গে তার স্যারের পাণ্ডিত্য এবং গুণ দেখে। রাঘব ইতিমধ্যে গানটি গাইতে শুরু করলেন। এতক্ষণে চোখ লাল হয়ে উঠেছে রাঘবের, চৈতন্য প্রায় নেই। কোনোক্রমে ঢুলে ঢুলে কাহিনি বলছিলেন, আর এখন কী সুন্দর গান গাইছেন! শুধু গান নয়, শিব তাণ্ডব স্তোত্র পাঠের সময় কী অপূর্ব সংস্কৃত উচ্চারণ । নিস্তব্ধ রাতে খোলা গলায় গাওয়া গান এক আলাদা নৈসর্গিক অধ্যায় রচনা করছিল যেন। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাঘব গাইছেন-
জটাটবীগলজ্জলপ্রবাহপাবিতস্থলে
গলেবলংব্য লংবিতাং ভুজংগতুংগমালিকাম্।
ডমড্ডমড্ডমড্ডমন্নিনাদবড্ডমর্বযং
চকার চন্ডতান্ডবং তনোতু নঃ শিবঃ শিবম্।।
জটাকটাহসংভ্রমভ্রমন্নিলিংপনির্ঝরী-
বিলোলবীচিবল্পরীবিরাজমানমূর্ধনি।
ধগদ্ধগদ্ধগজ্জ্বলল্ললাটপট্টপাবকে
কিশোরচন্দ্রশেখরে রতিঃ প্রতিক্ষণং মম।।
ধরাধরেন্দ্রনন্দিনীবিলাসবন্ধুবন্ধুর
স্ফুরদ্দিগংতসংততিপ্রমোদমানমানসে।
কৃপাকটাক্ষধোরণীনিরুদ্ধদুর্ধরাপদি
ক্বচিদ্দিগম্বরে মনো বিনোদমেতু বস্তুনি।।
জটাভুজঙ্গপিঙ্গলস্ফুরৎফণামণিপ্রভা
কদম্বকুঙ্কুমদ্রবপ্রলিপ্তদিগ্বধূমুখে।
মদান্ধসিন্ধুরস্ফূরত্ত্বগুত্তরীযমেদুরে
মনো বিনোদমদ্ভুতং বিভর্তু ভূতভর্তরি৷।
সহস্রলোচনপ্রভৃত্যশেষলেখশেখর
প্রসূনধূলিধোরণী বিধূসরাংঘ্রিপীঠভূঃ।
ভুজঙ্গরাজমালয়া নিবদ্ধজাটজূটক
শ্রিযৈ চিরায় জায়তাং চকোরবন্ধুশেখরঃ।।
ললাটচত্বরজ্বলদ্ধনঞ্জয়স্ফুলিঙ্গভা-
নিপীতপঞ্চসায়কং নমন্নিলিম্পনায়কম্ ।
সুধামযুখলেখযা বিরাজমানশেখরং
মহাকপালিসম্পদেশিরোজটালমস্তু নঃ।।
করালভালপট্টিকাধগদ্ধগদ্ধগজ্জ্বল-
দ্বন্নজয়াধরীকৃতপ্রচন্ডপঞ্চসায়কে।
ধরাধরেন্দ্ৰনন্দিনীকুচাগ্রচিত্ৰপত্ৰক-
-প্রকল্পনৈকশিল্পিনি ত্রিলোচনে মতির্মম।।
নবীনমেঘমন্ডলী নিরুদ্ধদুর্ধরস্ফুরত্-
কুহূনিশীথিনীতমঃ প্রবন্ধবন্ধকন্ধরঃ।
নিলিম্পপনির্ঝরীধরস্তনোতু কৃত্তিসিন্ধুরঃ
কলানিধানবন্ধুরঃ শ্রিযং জগদ্ধুরন্ধরঃ।।
প্রফুল্লনীলপঙ্কজপ্রপঞ্চকালিমপ্রভা-
বিল্মবিকণ্ঠকন্দিলীরুচিপ্রবদ্ধকংধরম্।
স্মরচ্ছিদং পুরচ্ছিদং ভবচ্ছিদং মখচ্ছিদং
গজচ্ছিদাংধকচ্ছিদং তমন্তকচ্ছিদং ভজে।।
অগর্বসর্বমঙ্গলাকলাকদম্বমঞ্জরী
রসপ্রবাহমাধুরী বিজৃম্ভণামধুব্রতম্।
স্মরান্তকং পুরান্তকং ভবান্তকং মখান্তকং
গজান্তকান্ধকান্তকং তমন্তকান্তকং ভজে।।
জযত্বদভ্রবিভ্রমভ্রমদ্ভুজঙ্ঘমশ্বস-
-দ্বিনির্গমত্ক্ৰমস্ফুরত্করালফালহব্যবাট্।
ধিমিদ্ধিমিদ্ধিমিধ্বনন্মৃদংগতুঙ্গমঙ্গল
ধ্বনিক্রমপ্রবর্তিত প্ৰচংডতান্ডবঃ শিবঃ।।
দৃষদ্বিচিত্রতল্পযোর্ভুজঙ্গেমৌক্তিকস্রর্জো-
-গরিষ্ঠরত্নলোষ্ঠযোঃ সুহৃদ্বিপক্ষপক্ষযোঃ।
তৃষ্ণারবিন্দচক্ষুষোঃ প্রজামহীমহেন্দ্রযোঃ
সম প্রবৃন্তিকঃ কদা সদাশিবং ভজাম্যহম্।।
কদা নিলিম্পনির্ঝরীনিকুঞ্জকোটরে বসন্
বিমুক্তদুর্মতিঃ সদা শিরঃ বহনস্হমঞ্জলিং।
বিমুক্তলোললোচনো ললাটফাললগ্নকঃ
শিবেতি মংত্রমুচ্চরন্ সদা সুখী ভবাম্যহম্।।
ইদম হি নিত্যমেবমুক্তমুত্তমোত্তমং স্তবং
পঠন্স্মরন্ব্রুবন্নরো বিশুদ্ধিমেতিসংততম্।
হরে গুরৌ সুভক্তিমাশু যাতি নান্যথা গতিং
বিমোহনং হি দেহিনাং সুশংকরস্য চিন্তনম্।।
পূজাবসানসমযে দশবক্তগীতং যঃ
শংভুপূজনপরং পঠতি প্রদোষে।
তস্য স্থিরাং রথগজেন্দ্ৰতুরঙ্গযুক্তাং
লক্ষ্মীং সদৈব সুমুখিং প্রদদাতি শম্ভুঃ।।
শান্ত হলেন রাঘব। শান্তি নামলো যেন চরাচরে। রাঘবের মুখেও দেখা দিলো সেই প্রশান্তির ছাপ। আহা রোজ যদি এরকম অনিয়মের রাত নামতো! স্যারের দিকে আরেক পেগ এগিয়ে দেয় রিশান, নিজেও নেয় শেষ পেগ। জিজ্ঞেস করে, “স্যার, তারপর?”
“শিব এবার সন্তুষ্ট হলেন। হাজার বছর কেটে গেছে পুরাণ মতে। নিজের একটি লিঙ্গস্বরূপ দিলেন রাবণকে আজীবন পূজা করার জন্য। আর দিলেন চন্দ্রহাস। এরকম এক অস্ত্র যার কোনো ধ্বংস নেই। রাবণ আসবে রাবণ যাবে, পৃথিবীরও তাই অবস্থা হবে কিন্তু চন্দ্রহাস কোনদিন ধ্বংস হবে না। এই শক্তি বিচ্ছুরণকারী দিব্য অস্ত্র রাবণ গ্রহন করেছিলেন।”
“মানে এই চন্দ্রহাসই আমাদের গল্পের চন্দ্রহাস?”
“জানি না, ধারণা নেই। কিন্তু যে কোন অস্ত্রের নাম চন্দ্রহাসই বা হবে কেন? নিশ্চয়ই সেই অস্ত্রই কোনভাবে এসে পড়েছিল মহারাজা প্রতাপ নারায়ণ কিংবা তার কোনো পূর্বপুরুষের হাতে। আর সেই পবিত্র চন্দ্ৰহাসকেই তারা নরবলির মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত করেছিলেন।
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। ফ্ল্যাটের জানালা খোলা ছিল, বাইরে বৃষ্টি স্পষ্ট দেখা যায়। শনশন করে হাওয়া ঢুকছে ঘরে। দূরের কিছু গাছের মাথা দেখা যায়, দুলছে তারা। আজ পূর্ণিমা। বিশ্বচরাচর আলোকিত হয়ে আছে চন্দ্র মহিমায়। রাঘব হাতের গ্লাসটি রেখে জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। রিশান সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। চাঁদের দিকে চাইলেন প্রফেসর রাঘব । এত দিন অনেক হয়েছে স্বপ্ন, বইয়ে পড়া কাহিনি এবং হাওয়ায় ঢিল মেরে ইতিহাস খোঁজা!
এই সপ্তাহ থেকে এক নতুন অভিযান শুরু হচ্ছে। বাস্তবের মাটি থেকে ইতিহাস খুঁড়ে বের করতে হবে। চন্দ্রহাসকে খুঁজে বের করতে হবে।
রাঘব আনমনে বললেন, “বস্তার, আসছি আমরা।”
