৩. নির্বাচনের দিন

১১.

নির্বাচনের দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। লড়াইটা আরও জোরদার হয়ে উঠেছে।

অহিওতে জয়লাভ করতেই হবে। পিটার ট্যাগার বললেন, এখানে একুশটা ভোট আছে, আলাবামাতে কোনো অসুবিধা নেই। আলাবামায় নটা ভোট আছে। ফ্লোরিডার পঁচিশটা ভোট আমরাই পাব। ইলিন্সের বাইশটা, নিউইয়র্কের তেত্রিশটা, ক্যালিফোর্নিয়ার চুয়াল্লিশটা।

দেওয়ালে টাঙানো বিরাট চার্টের দিকে তাকিয়ে আছেন পিটার ট্যাগার। একটা একটা করে দেশের দিকে হাত তুলছেন এবং ভোটর সংখ্যা গুনে চলেছেন।

সেনেটর ডেভিস ছাড়া আর সকলে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

ডেভিস বললেন–আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, শেষপর্যন্ত আমরাই জিতব।

.

 ফ্রাঙ্কফুর্ট হাসপাতালে মিরিয়ান তখনও পর্যন্ত কোমাতে আচ্ছন্ন।

.

 নির্বাচনের দিন, নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার। লেসলি টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। অলিভার কুড়ি লক্ষেরও বেশি ভোটে জিতে গেছেন, এটা হল সাধারণ মানুষদের ভোট। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটেও তিনি এগিয়ে আছেন। অলিভার রাসেল এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, পৃথিবীর সবথেকে বড় বিস্ময়!

লেসলি স্টুয়ার্ট ছাড়া আর কেউ ভালোভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখেনি। লেসলি প্রত্যেক ব্যাপারের ওপর নজর রেখেছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সংক্রান্ত যত প্রতিবেদন, সব সে খুঁটিয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রাজিল।

প্রধান সম্পাদক ডারিন সোলানা জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার কাজ শেষ হতে আর কতদিন লাগবে?

 লেসলি বলল–খুবই তাড়াতাড়ি কাজটা আমি শেষ করব।

আর একটা পদক্ষেপ ফেলতে হবে, এটাই হয়তো বা শেষ। একটা জবরদস্ত ডিনার পার্টির আয়োজন করতে হবে।

একজন অতিথি বললেন–আমি একটা গোপন খবর শুনেছি, মার্গারেট পোর্টম্যাডের নাকি বিবাহ বিচ্ছেদ হতে চলেছে।

মার্গারেট পোর্টম্যাড হলেন ওয়াশিংটন ট্রিবিউন পত্রিকার মালিক।

লেসলি কোনো কথা বলল না। পরের দিন সকালে সে চাড মরটনের সঙ্গে ফোনে আলাপ করল। মরটন হলেন তার একজন অ্যাটর্নি।

লেসলি বলল–ওয়াশিংটন ট্রিবিউন কি বিক্রি হবে?

কয়েক ঘণ্টা বাদে অ্যাটর্নির ফোন–আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা গুজবমিসেস চেম্বারস, এখন মনে হচ্ছে আপনার ধারণাই সঠিক। মিসেস পোর্টম্যাড এবং তার স্বামীর মধ্যে ডিভোর্স হতে চলেছে। তারা সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে চাইছেন। তাই মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজকে বিক্রি করে দেওয়া হবে।

–আমি এটা কিনতে চাইছি।

–এটা কিন্তু মস্ত বড়ো একটা ব্যবসায়িক লেনদেন। ওয়াশিংটন ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজের হাতে বেশ কয়েকটা সংবাদপত্র আছে। একটা পত্রিকা, একটা টেলিভিশন নেটওয়ার্ক।

–আমি তা জানি। সবটাই আমার দখলে আনতে হবে।

 সেদিন বিকেল বেলা লেসলি এবং মরটন ওয়াশিংটন ডিসির দিকে রওনা হলেন।

.

লেসলি মার্গারেট পোর্টম্যাডকে টেলিফোন করলেন। কয়েক বছর আগে ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে তার একবার দেখা হয়েছিল?

লেসলি বলল–আমি ওয়াশিংটনে এসেছি।

–আমি জানি।

পৃথিবীটা কি ছোটো হয়ে গেছে? শব্দগুলো কত তাড়াতাড়ি এক জায়গা থেকে অন্য  জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে। লেসলি ভাবল।

–আপনি ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজ বিক্রি করতে চাইছেন?

সম্ভবত।

–এই কোম্পানিটা কি আমার হাতে তুলে দেবেন?

–লেসলি, সত্যি আপনি এটা কিনতে চাইছেন?

সম্ভবত।

মাগারেট পোর্টম্যাড বেকারকে ডেকে পাঠালেন–লেসলি চেম্বারস সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে কি?

-হ্যাঁ, আমি জানি।

–উনি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এখানে এসে পৌঁছোবেন।

 ট্রিবিউনের সব কর্মচারী জেনে গেছেন যে, পত্রিকাটির হাত বদল হতে চলেছে।

ট্রিবিউন পত্রিকা লেসলি চেম্বারসকে বিক্রি করা উচিত হবে না। মনে হয় ভদ্রমহিলার এই সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। যে কটা পত্রিকা ও হাতে নিয়েছে, তার কী হাল হয়েছে দেখেছেন তো? ও ট্রিবিউনের আভিজাত্য, সম্মান সবকিছু ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।

–ম্যাক তাকালেন, দেখলেন লেসলি চেম্বারস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সব কথা শুনছেন।

মাগারেট পোর্টম্যাড বললেন–লেসলি, আপনাকে দেখে খুবই ভালো লাগছে। ইনি হলেন ম্যাক বেকার। ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজের প্রধান সম্পাদক।

শীতল সম্ভাষণ।

–ম্যাক আপনাকে সবকিছু দেখাবে।

–আমি এখনই দেখতে চাইছি।

 ম্যাক বেকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে আমি আপনার সঙ্গী হতে চাইছি।

.

অভিযানটা শুরু হল। ম্যাক বেকার বললেন–এই হল আমাদের গঠনতন্ত্র। সবার ওপরে প্রধান সম্পাদকের অফিস।

–সেই পদে আপনি আছেন মি. বেকার, তাই তো?

-হ্যাঁ, আমার তলায় আছেন ম্যানেজিং এডিটর, তার তলায় সম্পাদকমণ্ডলী। এর অনেকগুলো ধাপ আছে। যেমন, মেট্রো, জাতীয় অঞ্চল, বিদেশী বিভাগ, খেলাধুলো, বাণিজ্য, জীবন ও জীবিকা, জনগণ, বই সমালোচনা, বাড়িঘর, ভ্রমণ, খাদ্য ইত্যাদি।

-বাঃ, ভারী সুন্দর। কতজন এখানে চাকরি করেন?

–পাঁচ হাজারের কিছু বেশি।

 কপিডেস্কের কাছে তারা পৌঁছে গেলেন।

–এখানে নিউজ এডিটররা এক-একটা পাতা তৈরি করেন। এই ভদ্রলোক দেখেন, কোন্ ছবিটা যাওয়া উচিত এবং কোন গল্পের কতটা ছাপা হবে। এখানে হেডলাইন তৈরি হয়। এই অঞ্চলে গল্পগুলো কাটছাট করা হয়। তারপর সেগুলোকে কম্পোজ ঘরে পাঠানো হয়।

–অবিশ্বাস্য!

–আপনি কি প্রিন্টিং প্রেসে যাবেন?

–হ্যাঁ, আমি সবকিছু দেখব।

এলিভেটর ওপর-নীচ করতে থাকে। প্রিন্টিং প্ল্যানটা একটা বিরাট বাড়িতে অবস্থিত। চারটে বড়ো ফুটবল মাঠ তার মধ্যে ঢুকে যাবে। সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে চলেছে। তিরিশটা রোবটের মতো মেশিন অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছে।

বেকার বলতে থাকলেন-কাগজের এই বাণ্ডিলগুলোর ওজন পঁচিশশো পাউণ্ডের মতো। যদি এটাকে সোজাসুজি খুলে দেন, তা হলে আট মাইল লম্বা হবে। এই কাগজ অত্যন্ত দ্রুত মেশিনের মধ্যে পুরে দেওয়া হয়।

সবকিছু দেখে লেসলি সত্যি সত্যি অবাক হয়ে গেছে। এত বড়ো কর্মযজ্ঞ সে ভাবতে পারেনি।

ম্যাক বেকার বলেই চলেছেন, লেসলি তন্ময় হয়ে শুনছে।

এবার লেসলির বলার পালা–সব নিয়ে আপনাদের কাগজগুলোর প্রচার সংখ্যা খুব একটা কম নয়। অন্তত কুড়ি লক্ষ তো হবেই। রোববার আরও বেড়ে যায়। তবে এটাই পৃথিবীর সব থেকে জনপ্রিয় সংবাদপত্র নয়, তাই না মিঃ বেকার? লন্ডন থেকে যে দুটো পত্রিকা বেরোয়, তার প্রচার সংখ্যা অনেক বেশি। সান পত্রিকা রোজ চল্লিশ লক্ষ কপি ছাপা হয়। ডেইলি মিরর ছাপা হয় তিরিশ লক্ষ কপি।

ম্যাক বেকার বললেন–আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

–জাপানে অন্তত দুশোটা দৈনিক পত্রিকা বেরোয়। তার মধ্যে অনেকগুলোর প্রচার সংখ্যা। ট্রিবিউনের থেকে অনেক বেশি। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন?

না, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

ঠিক আছে মিঃ বেকার, চলুন, আমরা মিসেস পোর্টম্যাডের অফিসে চলে যাই।

.

পরের দিন সকাল বেলা, লেসলিকে ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের এগজিকিউটিভ কনফারেন্স রুমে বসে থাকতে দেখা গেল।

মিসেস পোর্টম্যাড এবং অন্তত ছজন অ্যাটর্নির সঙ্গে কথা বলছে।

-এবার টাকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। লেসলি বলল।

আলোচনা চলেছিল চার ঘণ্টা ধরে। যখন সেটা শেষ হল লেসলি স্টুয়ার্ট চেম্বারসের হাতে ওয়াশিংটন ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজের চাবি পৌঁছে গেছে। ..

অনেক বেশি টাকা লাগল, লেসলি যা ভেবেছিল। তাতে কী এসে গেছে? একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তো দেখা গেল।

.

বাণিজ্যিক লেনদেন শেষ হল। লেসলি ম্যাক বেকারকে ডেকে পাঠাল।

আপনি এখন কী ভাবছেন?

আমি চাকরি ছেড়ে দেব।

–কেন?

–আপনার ভালো পটভূমি আছে। জানি না কেন লোকেরা আপনার সঙ্গে কাজ করতে চায় না। এই কাগজটা খুবই ভালো। এটা ছাড়তে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু আমাকে যেতেই হবে।

–আপনি কত দিন এই কাগজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

কমবেশি পনেরো বছর।

–এই চাকরিটা এখনই ছেড়ে দেবেন?

–হ্যাঁ, এছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।

–আমার কথা শুনুন। ট্রিবিউনকে একটা মহান কাগজে পরিণত করতে হবে। আমি আপনার সাহায্য চাইছি।

না, আমি থাকতে পারব না।

মাত্র ছমাস, ছমাস থাকুন। আমরা আপনার মাইনের দ্বিগুন করে দেব।

ম্যাক বেকার তাকিয়ে থাকলেন, বয়স কম, সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী। কিন্তু কেমন একটা শিরশিরানি অনুভূতি।

–কে এখানে প্রধান দায়িত্ব নেবেন?

মুখে হাসি–আপনি হবেন ওয়াশিংটন ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজের সর্বময় কর্তা। আপনি থাকবেন তো?

শেষ পর্যন্ত ম্যাক স্বীকার করতে বাধ্য হলেন।

.

১২.

ছমাস কেটে গেছে। ডানার ল্যান্ডরোভার যখন বিস্ফোরণে আক্রান্ত হয়, কোনোরকমে ডানা ওই ঘটনায় বেঁচে গেছে। হাতটা ভেঙে গেছে। দেহের সর্বত্র কালসিটে পড়েছে। আগুনের পোড়া দাগ। জোহনও যথেষ্ট আহত হয়েছিল। ম্যাক বেকার টেলিফোন করে ডানা সম্পর্কে খবর নিয়েছিলেন।তখন ওয়াশিংটনেফিরতে বলেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা জানার মনকে আরও সাহসী করে তুলেছিল। ডানা ওখানেই থাকবে বলে স্থির করল।

ডানা বলেছে- লোকগুলো বেপরোয়া। কেন আপনি আমাকে ফিরতে বলছেন, তা হলে চাকরি ছেড়ে দেব।

–তুমি কি আমাকে ব্ল্যাকমেল করছ?

–হ্যাঁ।

–ঠিক আছে, ম্যাক বলেছিলেন–আমি চাই না, কেউ আমাকে ব্ল্যাকমেল করুক। কদিন ছুটি নেবে কি?

না, আমি ছুটি নেব না।

দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ফোনে শোনা গেল।

–ঠিক আছে। থেকে যাও। কিন্তু ডানা

কী বলছেন বলুন?

সাবধানে থেকো কিন্তু।

 হোটেলের বাইরে এসে ডানা শুনতে পেল মেশিনগানের শব্দ। আবার গুলিবর্ষণ শুরু হল।

.

সমস্ত রাত নির্বিচারে বোমা বর্ষণ চলে। ডানা ঘুমোতে পারে না। তার পাশাপাশি মর্টারের অবিরত আক্রমণ। একটির পর একটি বাড়ি ধ্বংস হচ্ছে। তার মানে, কত পরিবার আজ রাতে পথে বসবে। কত জনের মৃত্যু হবে। গালে হাত দিয়ে ডানা ভাবতে থাকে।

সকালবেলা ডানা রাস্তায় একা একা ঘুরে বেড়ায়। বুঝতে পারে যে কোনো মুহূর্তে দাঙ্গা শুরু হবে।

এভাবে আর কতদিন? বেনের সঙ্গে দেখা হয়, বেনও বোধহয় ভয় পেয়ে গেছেন।

…এই শহর তিলে তিলে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার মানে এই শহরে এখন ঘন অন্ধকার। টেলিভিশন আর রেডিও স্টেশন কাজ করছে না। তার মানে এই শহরে কোনো প্রাণ নেই। শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই শহরটা তার পা দুটো হারিয়ে ফেলেছে।

এভাবেই ডানা বলে চলেছে, ক্যামেরা প্যান করা হয়েছে। একটা জনহীন শহর, চারপাশে ধ্বংসের ছবি। সব কিছু ভেঙে পড়েছে বুঝি।

..কোনো একদিন ছেলেরা এখানে খেলা করত। এখন তাদের হাসির শব্দ বাতাস ধরে রেখেছে।

শোনা গেল মরটারের শব্দ। আবার বিপদ সংকেত বেজে ওঠে। ডানার পাশে যে সমস্ত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, তারা এমন ভাব করছে, বুঝি কিছুই শুনতে পায়নি।

..যে শব্দ আপনারা শুনলেন সেটা হল বিমান আক্রমণের সম্ভাব্য সংকেত। এখনই লুকোচুরি খেলা শুরু হবে। কিন্তু সারাজেভোর মানুষ বুঝে গেছেন। পিঠ বাঁচানোর কোনো জায়গা নেই। এখন কী হবে? অনেককে এখানেই থাকতে হবে। শোনা যাচ্ছে এখানে নাকি শান্তি স্থাপিত হবে। সবটাই গুজব, শান্তির আশা কোথায়? কবে শান্তি আসবে? কীভাবে? সত্যি সত্যি ছোটো শিশুরা কি তাদের বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তরে আবার ছুটোছুটি করে খেলতে পারবে? আমরা কেউ জানি না। ডব্লিউ টি ই-র পক্ষ থেকে ডানা ইভান্স, সারাজেভো।

ক্যামেরার লাল আলো জ্বলে উঠল। বেন বললেন–এখান থেকে চলে যেতে হবে।

 নতুন ক্যামেরাম্যান অ্যান্ডির সমস্ত অভিব্যক্তিতে ভয় বিহ্বলতা।

ধারে একটা ছোটো ছেলে দাঁড়িয়েছিল। সে ডানার দিকে তাকিয়ে ছিল। রাস্তার অনাথ শিশু। নোংরা পোশাক। ছেঁড়া জুতো, তার চোখের সবুজ তারায় এক অদ্ভুত আশার দীপ্তি। তার ডান হাত শরীর থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।

ডানা বলল–হ্যালো?

কোনো উত্তর নেই।

ডানা এগিয়ে গেল, কিছুক্ষণ বাদে তারা হলিডে ইনে ফিরে এল।

হলিডে ইনে অনেক কাগজপত্রের ভিড়। রেডিও এবং টেলিভিশনের রিপোর্টাররা এসে গেছেন। মনে হচ্ছে, সেখানে বোধহয় এক পরিবার তৈরি হয়েছে পরিবারের লোকেরা অসহায়। একটির পর একটি খবর আসছে।

কোন খবরকে আগে প্রাধান্য দেওয়া হবে? কোথাও বোমাবর্ষণ, কোথাও হাসপাতাল ভেঙে পড়েছে, কোথাও দাঙ্গা বেধে গেছে।

জ্যানকে অন্য কাজ দেওয়া হয়েছে। খবরটা শুনে ডানা নিজেকে অসহায় বোধ করল।

.

একদিন সকালবেলা ডানা হোটেল থেকে বেরোতে যাবে, বাচ্চা ছেলেটি এসে দাঁড়াল তার চোখের সামনে। সেই ছেলেটি, যার একটি হাত কেটে নেওয়া হয়েছে।

জোহন দরজা খুলে দিল।

–শুভ সকাল, ম্যাডাম।

ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে, ডানা এগিয়ে গেল। কোনো উত্তর নেই।

ছেলেটি কী যেন বলতে চাইছে, সে বোধহয় ইংরাজি জানে না। তার কথা শুনে ডানার মনে হল, সেও বোধহয় গুডমর্নিং বলেছে।

ডানা জিজ্ঞাসা করল–তুমি কি ইংরাজি বুঝতে পারো?

–অল্প অল্প।

–তোমার নাম কী?

–কামাল।

–তোমার বয়স কত?

 ছেলেটি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল। জোহন বলল–ও বোধহয় নতুন লোককে দেখে ভয় পাচ্ছে।

-হ্যাঁ, ওকে আমি দোষ দিচ্ছি না। আমাদেরও তো একই অবস্থা হয়। 

.

চার ঘণ্টা কেটে গেছে, হলিডে ইনে গাড়ি ফিরে এসেছে। কামাল তখনও দাঁড়িয়ে আছে।

ডানা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, কামাল, তোমার বয়স কত?

-বারো।

বয়সের তুলনায় তাকে ছোটো দেখাচ্ছে। ডান হাতাটা হাওয়াতে থরথর করে উড়ছে।

কামাল তুমি কোথায় থাকো? তোমাকে কি বাড়িতে নিয়ে যাব?

 জোহন বলল–ছেলেটি কোনো ভদ্রতা জানে না?

–হাতটা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সে বোধহয় সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা, হোটেলের ডাইনিং রুম, রিপোর্টাররা নানা গুজব নিয়ে কথা বলছেন। শোনা যাচ্ছে, শান্তি চুক্তি সই হতে চলেছে।

গাব্রিয়েলা, ওরসি বললেন–শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জ হস্তক্ষেপ করেছে।

-তাইতো করা উচিত।

–আমি বলব, অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।

ডানা বলল–কোনো ব্যাপারেই দেরি হয় না।

পরের দিন সকালবেলা, দুটো নতুন খবর পাওয়া গেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্য চেষ্টা করছে। আর একটি খবর শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল। সারাজেভোর একমাত্র খবরের কাগজের অফিসটা বোমা মেরে বিধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

.

ডানা ওই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্যামেরার লাল আলো জ্বলে উঠল।

ডানাকে লেন্সে দেখা গেল- প্রত্যেকদিন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাড়িগুলো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এটাই হল সেই বাড়িটার মৃতদেহ, যেখান থেকে সারাজেভোর কাগজ বেরোত। যে কাগজ সবসময় সত্যি কথা বলত। হেডকোয়ার্টার ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অফিসটা কোনোরকমে মাটির তলার বেসমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখনও গণমাধ্যম বেঁচে আছে। তবে নিউজ স্ট্যান্ডগুলো সবই বন্ধ। রিপোর্টাররা রাস্তায় যেতে ভয় পাচ্ছে। জানি না, কতদিন আর এইভাবে চলবে? এভাবে স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে।

.

অফিসে বসে ম্যাক বেকার নতুন ব্রডকাস্ট দেখছিলেন। তিনি তার সহকারীর দিকে তাকিয়ে বললেন–বাঃ, মেয়েটা তো ভালো কাজ করছে। এখনই কথা বলতে হবে।

ইয়েস, স্যার।

ডানা ঘরে ফিরে এল। একজন ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন। কর্নেল গরডন। ডানা সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

–আমি তো জানি না, আমার জন্য আপনি অপেক্ষা করছেন?

এটা নেহাতই একটা সামাজিক কাজ। ভদ্রলোকের কালো চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল–আমি আপনাকে টেলিভিশনে দেখলাম।

-হ্যাঁ।

–আপনি আমাদের দেশে এসেছেন খবর সংগ্রহ করতে। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন না।

–আমি কি কোনো ভুল করেছি?

-না, আমাকে বাধা দেবেন না। আপনি যে স্বাধীনতার কথা বলছেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই স্বাধীনতা কাম্য নয়। আশা করি, আপনি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন।

না, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

–তাহলে মিস ইভান্স, আপনাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলব কি?

আপনি আমাদের দেশের আর অতিথি নন, মনে হচ্ছে, এদেশে গুপ্তচরের কাজ করার জন্য সরকার আপনাকে পাঠিয়েছে।

–আমি…

 ডানা আমতা আমতা করতে থাকে।

–আমাকে বাধা দেবেন না। এয়ারপোর্টে আমি আপনাকে সাবধান করেছিলাম। আমরা দু নম্বরী খেলা ভালবাসি না। এখন যুদ্ধের পরিবেশ। যদি কেউ স্পাই হয়ে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে।

ভদ্রলোক ধীরে ধীরে কথাগুলো বলছিলেন। বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, তার কথার মধ্যে ওজন আছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–এটাই আপনাকে আমার শেষ সতর্কবাণী।

ডানা তাকিয়ে থাকল। ভাবল, না, ভয়ের কাছে আমি কিছুতেই নতি স্বীকার করব না।

লোকটি চলে যাবার পর ডানার মনে হল, সত্যি সে ভয় পেয়েছে।

.

ম্যাক বেকারের কাছ থেকে একটা প্যাকেট এসেছে। কী আছে তাতে? ক্যানডি, টিন ভরতি খাবার, আরও অনেক কিছু জিনিস, যা সহজে পচে যায় না। ডানা সেটা লবিতে নিয়ে গেল। অন্য রিপোর্টারদের সঙ্গে ভাগ করে খেল। সকলেই খুশি হয়েছে।

বোঝা গেল, তার সাথে রিপোর্টারদের বন্ধুত্ব জমে উঠেছে।

.

 কামাল অলিন্দপথে অপেক্ষা করছিল। ছেঁড়া ফাটা জ্যাকেট তার পরনে।

শুভ সকাল।

কামাল দাঁড়িয়ে আছে। নো কথা বলছে না। চোখের পাতা পিটপিট করছে।

–আমি দোকানে যাচ্ছি, তুমি কি যাবে?

কোনো উত্তর নেই।

-চলো।

সে কামালের হাত ধরে গাড়িটার কাছে চলে গেল।

কামাল একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর গাড়িতে ঢুকে গেল।

ডানা আর জোহন তাকিয়ে থাকল।

ডানা জোহনকে বলল–কোনো জামাকাপড়ের দোকান খোলা আছে কি?

গাড়িটা সেখানে পৌঁছে গেল।

যেতে যেতে ডানা অনেক প্রশ্ন করেছিল।

কামাল, তোমার মা-বাবা কেউ আছে কি?

কামাল মাথা নাড়ল।

-কোথায় তুমি থাকো?

কামাল কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিল। ডানা একটু পাশে এগিয়ে গেল।

–আঃ ছেলেটার শরীরের উষ্ণতা তাকে এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তি দিচ্ছে।

.

একটা জামাকাপড়ের দোকান পাওয়া গেল। সারাজেভোর পুরোনো বাজার অঞ্চলে। সামনের দিকটা বোমা মেরে বিধ্বস্ত করে দেওয়া হয়েছে। দোকানটা খোলা ছিল।

ভেতরে ঢুকে ডানা জানতে চাইল, তোমার কোন পোশাকটা পছন্দ?

 কামাল দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না।

ডানা দোকানদারকে বলল–এই বাদামী পোশাকটা দেবেন?নতুন জুতো দরকার, প্যান্টও লাগবে।

আধ ঘণ্টা বাদে ওরা দোকান থেকে বাইরে এল। কামাল নতুন পোশাক পরেছে। সে গাড়ির পেছনে ছুটে গিয়ে বসল। কোনো কথা বলছে না।

জোহন জানতে চাইল- তুমি কি জানো না, ধন্যবাদ বলতে হয়।

 কামালের দুচোখ জল। ডানা তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল–ঠিক আছে।

এই ছেলেটির ঠিকানা কী? এর ভবিষ্যৎ? ডানা অবাক হয়ে ভাবতে থাকে।

.

ডানা হোটেলে ফিরে এসেছে। ডানা দেখল, ছেলেটি কথা না বলে হেঁটে যাচ্ছে।

ডানা জোহনকে জানতে চাইল ও কোথায় থাকবে?

ম্যাডাম, রাস্তায় শুয়ে থাকবে। সারাজেভোতে এর মতো অনেক ছেলে আছে। যাদের মা-বাবার অস্তিত্ব এখন আর নেই।

–এরা কীভাবে বেঁচে আছে?

কাঁধ ঝাঁকানি–আমি বলতে পারব না।

.

ডানা হোটেল থেকে বেরিয়ে আসছে। কামাল দাঁড়িয়ে আছে। নতুন পোশাক পরেছে। মুখটাও পরিষ্কার করেছে।

.

লাঞ্চের টেবিল, রিপোর্টারদের পার্টি, ডানা অধ্যাপক ট্যাকের সাথে কথা বলছে। ট্যাকেকে দেখে মনে হল, উনি বোধহয় এই কদিনে একটু বুড়িয়ে গেছেন।

–তোমাকে দেখে ভালো লাগছে মিস ইভান্স। তুমি সাংঘাতিক কাজ করছ।

 উনি কাঁধ ঝাঁকালেন, দুর্ভাগ্যবশত আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। আমি টেলিভিশন দেখতে পাচ্ছি না। তোমার জন্য কী করব?

–অধ্যাপক, নতুন শান্তি চুক্তি সম্বন্ধে আপনার কী অভিমত?

ভদ্রলোক ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন–ব্যাপারটা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হবে তো? তাহলে সারাজেভোর ভবিষ্যৎ পাল্টে যাবে।

-হ্যাঁ, তিনজনের সরকার স্থাপিত হবে। একজন মুসলমান, একজন ক্রোড এবং একজন সার্ব।

-হ্যাঁ, যদি সত্যি সত্যি স্বপ্নটা সফল হয়। দেখা যাক শেষ অব্দি কী হয়।

উনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, সকালবেলা এখানে শান্তির বাতাবরণ, রাত্তিরটা সাবধানে থেকো, কেমন?

.

ডানা ইভান্স এখন শুধু রিপোর্টার হিসেবেই থাকতে চাইছে না, ধীরে ধীরে তার নাম পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। যখনই তার ব্রডকাস্টিং শুরু হয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ সাগ্রহে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে। ডানার বক্তব্য, ডানার আবেগ, সকলেই ভাগ নিতে চায়।

ম্যাক বেকার নিয়মিত টেলিফোন পাচ্ছেন। ডানা ইভান্সের ব্রডকাস্টিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, ম্যাক বেকারের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত, হ্যাঁ, মেয়েটি কথা রেখেছে।

.

নতুন স্যাটেলাইট ট্রাক স্থাপিত হয়েছে। ডানা আরও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখন তাকে আর যুগোশ্লোভিয়া স্যাটেলাইটের দয়ায় থাকতে হচ্ছে না। সে আর বেন ঠিক করল, গল্পগুলো গুছিয়ে বলতে হবে। ডানা সেগুলো লিখবে, সেগুলো সম্প্রচার করবে। এইভাবে তারা এক নতুন স্বপ্নের পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাবে।

.

লাঞ্চের সময়, হোটেলের ডাইনিংরুম। ডানা স্যান্ডউইচে কামড় দিয়েছে। সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। বিবিসি এটিপি বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা এসেছেন।

একজন একটা ক্লিপিং দেখিয়ে বললেন–ডানা ইভান্সের নাম জানা আছে তো? এই তো ডব্লিউ টি ইর ফরেন করেসপনডেন্ট, তাকে কিবডি পুরস্কারের জন্য চিন্তা করা হচ্ছে।

খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। ডানাকেও এই খবরটা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

ডানা ভাবতেই পারেনি, তাকে এত বড়ো সম্মান দেওয়া হবে।

ডানা বাইরে বেরিয়ে এল। কামাল দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বোবা চোখের দৃষ্টি।

ডানা বলল–শুভ সন্ধ্যা, কামাল।

কোনো উত্তর নেই।

–গাড়িতে উঠে পড়ো।

কামাল পেছনের সিটে গিয়ে বসল। ডানা তার হাতে একটা স্যান্ডউইচ দিল। দেখল সে খুব তাড়াতাড়ি সেটা খেয়ে ফেলল। আর একটা দিল, সে সেটাও খেয়ে ফেলল।

জোহন জিজ্ঞাসা করল- কোথায় যাব?

ডানা কামালের দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি কোথায় যাবে? তোমাকে আমরা বাড়িতে নিয়ে যাব। তুমি কোথায় থাকো?

ছেলেটি মাথা নাড়ছে।

 ডানা অধৈর্য হয়ে বলল–তাড়াতাড়ি বলল, তুমি কোথায় থাকো।

.

কুড়ি মিনিট কেটে গেছে। মিরজাকা নদীর তীর, বড়ো বড়ো কাঠবোর্ডের বাক্স চারদিকে ছড়ানো ছেটানো রয়েছে।

ডানা গাড়ি থেকে নামল। কামালের দিকে তাকাল। তুমি এখানে থাকো?

ঘাড় নাড়ল সে অনিচ্ছা সহকারে।

–অন্য ছেলেরা এখানে থাকে?

আবার ঘাড় নাড়ল।

-আমি এটা টেলিভিশনের পর্দায় দেখাব, কেমন?

 কামাল মাথা নাড়ল।

-কেন?

–তাহলে পুলিশ এসে এগুলো ভেঙে দেবে। আমরা মাথার ওপর ছাদ হারাব।

ডানা বলল–ঠিক আছে, আমি প্রতিজ্ঞা করছি।

.

পরের দিন সকাল বেলা, ডানা হলিডে ইন থেকে বেরিয়ে এল। ব্রেকফাস্টের আসরে তাকে দেখা গেল না। অন্য সাংবাদিকরা বলাবলি করল, সে বোধহয় আর এই হোটেলে থাকবে না।

একজন বলল–সে একটা ফার্ম হাউস ভাড়া নিয়েছে। এখন থেকে সেখানেই থাকবে।

রাশিয়ান সাংবাদিকের চোখে-মুখে বিস্ময় তার মানে?

–ও বোধহয় আমাদের বন্ধুত্ব পছন্দ করছে না।

সকলের মনে আশঙ্কার কালো মেঘ।

.

বিকেলবেলা, আর একটা মস্ত বড়ো প্যাকেট এসেছে ডানার জন্য।

রাশিয়ান সাংবাদিক বলল–ডানা এখানে নেই, এসো আমরা এটা ভাগাভাগি করে খেয়েনি।

হোটেলের ক্লার্ক বলল–আমি দুঃখিত। মিস ইভান্স বলছেন, এটা যথাস্থানে পৌঁছে দিতে।

কিছুক্ষণ বাদে কামাল এল। রিপোর্টাররা অবাক হয়ে দেখল, কামাল ওই প্যাকেটটা নিয়ে চলে যাচ্ছে।

একজন রিপোর্টার বলল–তার মানে? ডানা আমাদের সঙ্গে খাবারও ভাগ করে খাবে না। খ্যাতি আর প্রতিপত্তি ওর মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছে।

.

পরের সপ্তাহ, ডানা এক মনে কাজ করে চলেছে। হোটেলে সে আর কখনও আসেনি। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ক্রমশ ধূমায়িত হচ্ছে।

সকলের আলোচ্য বিষয়, ডানা এবং তার ব্যক্তিত্ব। তার ঔদ্ধত্য কেউ পছন্দ করছে না। কয়েক দিন কেটে গেছে। আবার একটা মস্ত বড়ো প্যাকেট এল। হোটেল ক্লার্কের কাছে এগিয়ে গেল রাশিয়ান রিপোর্টার- মিস ইভান্স কী বলেছে? এ প্যাকেটটাও তাকে পাঠাতে হবে?

–হ্যাঁ, স্যার।

রাশিয়ান সাংবাদিক ডাইনিং রুমে গিয়ে বলল, আর একটা প্যাকেট এসেছে। কেউ এটাকে নিতে আসবে। আমরা ছেলেটিকে অনুসরণ করব। মিস ইভান্সের সঙ্গে দেখা করব। আমাদের মনোভাবটা তাকে জানানো দরকার।

সকলেই হৈ-হৈ করে প্রস্তাবটা সমর্থন করল।

কামাল এসে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিল। রাশিয়ান সাংবাদিক বলল–তুমি কি এটা নিয়ে মিস ইভান্সের কাছে যাবে?

কামাল ঘাড় কাত করল।

-তোমাকে আমরা গাড়ি করে নিয়ে যাব।রুশ সাংবাদিক বলল, বলো কোথায় যেতে হবে?

দশ মিনিট কেটে গেছে। বেশ কয়েকটা গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে জনহীন রাস্তার ওপর দিয়ে। শহরের বাইরে কামাল একটা পুরোনো ফার্ম হাউস দেখাল। সেখানে ধ্বংসের ছাপ।

রাশিয়ান সাংবাদিক বলল–তুমি এগিয়ে যাও। আমরা সেখানে গিয়ে ওকে চমকে দেব।

কামাল ফার্ম হাউসের মধ্যে ঢুকে গেল। সাংবাদিকরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর তারা দরজা ঠেলে হৈ-হৈ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারা অবাক হল, এই ঘরের ভেতর অনেক অনাথ ছেলে বসে আছে। দেখলেই বোঝা যায়, দরিদ্রতা ওদের গ্রাস করেছে। সমস্ত শরীরে অপুষ্টির ছাপ। সাংবাদিকরা অবাক হয়ে গেছে। তারা ভাবতেই পারেনি, এমন একটা অভাবিত ঘটনার সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে। বেশির ভাগ শিশু পঙ্গু, হাঁটতে পারছেনা। এখানে সেখানে কতগুলো ছেঁড়া বিছানা পড়ে আছে। ডানা ওই প্যাকেটের খাবারগুলো বাচ্চাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সে অবাক হয়ে তাকাল।

একজন সাংবাদিক বলল ডানা, তুমি এখানে কী করছ?

আর একজন বলল–আমরা দুঃখিত ডানা, আমরা একটা ভুল করেছি।

ডানা এগিয়ে গেল- এরা একেবারে অনাথ শিশু। এদের মা-বাবা কেউ নেই। এরা হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে একা দিন কাটাচ্ছিল। সকলেরই আঘাত আছে। পুলিশ এদের খুঁজে পেয়েছে। তারা এই ছেলেগুলোকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেখানে ওরা মরে যেত। এখানেও হয়তো মরে যাবে। আমি চেষ্টা করছি, এই ছেলেদের দেশের বাইরে নিয়ে যেতে। কিন্তু বুঝতে পারছি না, শেষ পর্যন্ত কী করব।

সে অন্যান্য সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা কিছু বলতে পারো?

রাশিয়ান সাংবাদিক অবাক হয়ে বলল–রেডক্রশের একটা প্লেন আজ রাতে প্যারিসে যাবে। পাইলট আমার খুবই পরিচিত। দেখি কিছু করা যায় কিনা।

ডানা বলল–তুমি একটু সাহায্য করবে?

ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বলল–দেখি কী করতে পারি।

আর একজন বলল–ঠিকই বলেছ, কিন্তু এব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে কী লাভ? খবরটা জানাজানি হলে ওরা কিন্তু আমাদের তাড়িয়ে দেবে।

ডানা তবুও বলে চলল- চোখের সামনে মৃত্যু দেখে চুপ করে থাকব? না, তাতো হবে না।

সে আবার বলল–এই ছেলেদের জীবন বাঁচাতেই হবে।

তার কণ্ঠে উদ্বিগ্নতার সুর।

সন্ধ্যেবেলা, রাশিয়ান সাংবাদিক ডানার সঙ্গে দেখা করতে এল। সে বলল আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছি। সে রাজী হয়েছে। ওদের প্যারিসে নিয়ে যাওয়া হবে।

ডানার মন উত্তেজনায় ভরপুর। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

রাশিয়ান সাংবাদিক তার দিকে তাকিয়ে বলল, ডানা, আমাদের ক্ষমা করো। আমরা ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইছ না। আমরা তোমাকে ভুল বুঝেছি। সত্যি এই অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই।

.

সন্ধ্যে আটটা বেজেছে। ফার্ম হাউসের সামনে রেডক্রশের একটা ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভার আলো জ্বেলে দিল। ডানা অনাথ ছেলেদের নিয়ে তাড়াতাড়ি ভ্যানের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

পনেরো মিনিট কেটে গেছে, ভ্যান ধীরে ধীরে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে চলেছে। এয়ারপোর্টটা এখন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু রেডক্রশ বিমানকে নামার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা খাদ্য আর ত্রাণ নিয়ে আসে। আহতদের অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।

বিশাল অভিযান। ডানার মনে হল, এ পথ কখনও ফুরোবে না। শেষ পর্যন্ত ডানা এয়ারপোর্টের আলো দেখতে পেল। সে অনাথ শিশুদের উদ্দেশ্য করে বলল–আমরা পৌঁছে গেছি। কামাল তার হাত ধরে রেখেছে। কামাল ভয়ে কাঁপছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

ডানা বলল–তোমরা ভয় পেও না। ওখানে সকলেই ভালো থাকবে।

মনে মনে ভাবল, আহা, কাল থেকে তোমাদের সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।

এয়ারপোর্টে একজন গার্ড দাঁড়িয়েছিল। সে সবুজ নিশান দেখাল। গাড়িটা ভেতরের দিকে চলে গেল।

বিমান দাঁড়িয়ে আছে, রেডক্রশের ছাপ মারা। পাইলট সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।

তিনি দ্রুত ডানার কাছে ছুটে এলেন। তাড়াতাড়ি আসুন, আপনার জন্য আমরা কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করছি। প্লেন এক্ষুনি ছাড়বে।

ডানা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো হাত নাড়ল।

কামাল সবার শেষে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু যেন বলার চেষ্টা করছে। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে থরথর করে। আবেগের উত্তেজনায়। সে বলল তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে তো?

-হ্যাঁ, আমি বলছি, নিশ্চয়ই হবে।

শেষবারের মতো কামালের হাতে হাত রাখল ডানা। ঈশ্বরের কাছে নীরব প্রার্থনা করল ভগবান এরা যেন ভালো থাকে।

বিমানের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। প্লেনটা ধীরে ধীরে আকাশের বুকে উড়ে যাচ্ছে।

ডানা আর রাশিয়ান ভদ্রলোক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সব কিছু দেখল। প্লেনটা শেষ পর্যন্ত চোখের বাইরে চলে গেল। পুবাকাশের দিকে, প্যারিস অভিমুখে।

–আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু আপনি একটা ভালো কাজ করেছেন। ড্রাইভার বলল।

একটা গাড়ি নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কর্নেল গরডন গাড়ি থেকে নামলেন। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। না, উড়ান পাখিটাকে আর দেখা যাচ্ছে না।

তিনি ডানার কাছে এসে বললেন–আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল, এর আগে আপনাকে আমি কয়েকবার সাবধান করে দিয়েছিলাম। আপনি কি জানেন, এখানে গুপ্তচরবৃত্তির একমাত্র শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড।

ডানা বলল–কর্নেল, আপনি আমার বিচার করবেন তো?

উনি কঠিন দৃষ্টিতে ডানার দিকে তাকালেন এদেশে এসপিয়েনোজের অভিযোগের কোনো বিচার হয় না।

.

১৩.

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, প্যারেড, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সবকিছু ভালোয় ভালোয় হয়ে গেল। অলিভারের মন এখন ব্যাগ্র ও ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন ডিসির সিংহাসনে কবে তিনি বসতে পারবেন? ওয়াশিংটন হল বিশ্বের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র। পৃথিবীর মানুষ এই শহরটির দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকে। এখন অলিভারই হবেন এই অঞ্চলের প্রধান ব্যক্তি। কত মানুষের সঙ্গে তাকে কথা বলতে হবে। ওয়াশিংটনে পাঁচ হাজার আলোকচিত্রী এবং সংবাদদাতা এসেছেন। সকলেই অলিভারের সঙ্গে কথা বলতে উদগ্রীব।

জন কেনেডির সেই বিখ্যাত উক্তি অলিভারের মনে পড়ে গেল–ওয়াশিংটন ডিসি হল এমন একটি শহর যেখানে দক্ষিণের দক্ষতা এবং উত্তরের বৈশিষ্ট্য মিলেমিশে একাকার হয়ে। গেছে।

.

প্রেসিডেন্ট পদে প্রথম দিন, অলিভার হোয়াইট হাউস ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। স্ত্রী জ্যানকে সঙ্গে নিয়ে। ১৩২টা ঘর, ৩২টা বাথরুম, ৩০টা ফায়ারপ্লেস, ৩টি এলিভেটর, একটা সুইমিংপুল। টেনিস কোর্ট, জগিং ট্যাগ, ঘোড়াদের থাকার জায়গা, খাবার ঘর, মুভি থিয়েটার, আঠারো একরের সুন্দর বাগান। এখানে থাকলে মনে একটা অন্য শিহরণ দেখা দেয়।

সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। তাই না সোনা? স্বা

মীর হাতে হাত রেখে জ্যান হাসতে হাসতে জানতে চাইল।

অলিভার চাপ দিয়ে বলল–হ্যাঁ, তোমার সাথে সব কিছু ভাগ করে নেব, ডার্লিং।

অলিভার জানেন, জ্যানকে আরও বেশি ভালোবাসতে হবে। জ্যান তার কাছে একটা মইয়ের মতো। জ্যান আছে বলেই তো তিনি আজ এই পদে আসতে পেরেছেন।

.

অলিভার ওভাল অফিসে ফিরে গেলেন। পিটার ট্যাগার তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ট্যাগারকে প্রধান স্টাফ করে দেওয়া হয়েছে।

অলিভার বললেন–পিটার, আমি এখনও এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। পিটারের মুখে হাসি–জনগণ ভোট দিয়ে তোমাকে এখানে বসিয়ছে অলিভার। সে কথাটা ভুলে যেও না।

 অলিভার বললেন–আমি কিন্তু এখনও সেই অলিভারেই থেকে গেছি।

–ঠিক আছে, যখন আমরা একলা থাকব, কিন্তু তুমি যখন এই চেয়ারে বসবে তখন মনে রাখতে হবে, তুমি পৃথিবীর রাজা। তুমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তোমার দিকে কত মানুষ সাগ্রহে তাকিয়ে আছে, সেটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না। তোমার হাতে এত ক্ষমতা আছে, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রনায়কের হাতে সেই ক্ষমতা নেই।

ইন্টারকম শব্দ করতে শুরু করেছে–মিঃ প্রেসিডেন্ট, সেনেটর ডেভিস এসেছেন।

–ওনাকে এখানে পাঠিয়ে দাও।

 ট্যাগার দীর্ঘশ্বাস ফেলল–কাজ শুরু করা যাক। আমার টেবিলটা দেখে মনে হচ্ছে বাজে কাগজের পাহাড় হয়ে উঠেছে।

দরজাটা খুলে গেল, টড ডেভিস ঢুকলেন–পিটার?

সেনেটর দুজনের হাতে হাত রাখলেন।

ট্যাগার বললেন–মিঃ প্রেসিডেন্ট এবার কথা শুরু হোক।

সেনেটর ডেভিস অলিভারের ডেস্কের কাছে এসে দাঁড়ালেন। মাথা নেড়ে তিনি বললেন বাঃ, অলিভার, তোমাকে তো ভারী ভালো মানিয়েছে। তুমি কী বুঝতে পারছ, এই পদে কতখানি উত্তেজনা আছে?

ধন্যবাদ টড, আমি বোঝার চেষ্টা করছি। এই আসনে একদিন বসেছিলেন লিঙ্কন, রুজভেল্ট।

সেনেটর হাসলেন- তারা কিন্তু সাধারণ মানুষ ছিলেন। কেউ তাদের নাম জানত না। এখানে বসার পর তারা তাদের কর্মদক্ষতার গুণে কিংবদন্তি মানুষ হয়ে উঠেছেন। আশা করি, আমার কথার আসল অর্থ তুমি বুঝতে পারছ। আমি এইমাত্র জ্যানের সঙ্গে দেখা করলাম। মনে হচ্ছে, জ্যান বোধহয় স্বর্গে পৌঁছে গেছে। তাকে এখন ফার্স্ট লেডি বলা হবে। এটা কী কম কথা?

-হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন।

–তোমার সাথে কিছু আলোচনা করতে চাইছি মিঃ প্রেসিডেন্ট।

–বলুন, কী আলোচনা করবেন?

কথাগুলো মনে রেখো, প্রেসিডেন্ট হবার পর তোমাকে এই ব্যাপারগুলো মনে রাখতে হবে।

সেনেটরের কণ্ঠস্বর ঠান্ডা হয়ে গেছে। অলিভারের চোখ ছোটো হয়ে গেছে–টড।

সেনেটর ডেভিস হাত বাড়িয়ে দিলেন। অলিভার, আমি তোমাকে বরাবর সাহায্য করব। তোমার কোনো কাজ ভুল হলে আমি সেটা শুধরে দেবার চেষ্টা করব। এখানে একটা তালিকা আছে। তালিকাটা ভালো করে দেখো। মনে রেখো, আমি একজন দেশপ্রেমিক, এর জন্য বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ করি না। এই দেশই আমার কাছে সব….

ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর ডুবে এসেছে আবেগের উত্তেজনায় সবকিছু, তুমি আমার জামাই। এজন্য আমি তোমার দোষ ক্ষমা করব না। আমি তোমার জন্য কেন লড়াই করেছি বলো তো? কারণ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, এই পদের জন্য তুমি আমার উপযুক্ত বাজি। যদি দেখি, তুমি খুব ভুল করছ, তাহলে কিন্তু আমি তোমাকে আর সমর্থন করব না।

অলিভার বসে থাকলেন। কোনো কথা বলতে পারছেন না।

–আমি অনেক বছর ধরে এই শহরের বাসিন্দা, অলিভার। আমি এখানে থেকে কী শিখেছি বলোত, বুঝতে পেরেছি মাত্র একবারের জন্য রাষ্ট্রপতি হয়ে কোনো লাভ নেই। চারটে বছর তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে। যখন তুমি সত্যিকারের কাজ করতে শুরু করবে, তখন যদি তোমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কেউ তোমাকে মনে রাখবে না। সব স্বপ্ন কোথায় উড়ে যাবে। তুমি কি জানোনা, ১৮৯৭ সালে ম্যাককিংলি এই অফিসে বসেছিলেন। বেশির ভাগই তাকে অনুসরণ করেছেন। তাঁরা মাত্র একবারের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু অলিভার, আমি চাই, তুমি অন্তত এই কাজটা করো না। তোমাকে দু-দুবার রাষ্ট্রপতি হতে হবে। তাহলেই সব স্বপ্ন সফল করতে পারবে। তোমাকে আবার নির্বাচিত হতে হবে। সেটা যেন মনে থাকে।

সেনেটর ডেভিসতার ঘড়ির দিকে তাকালেন। উঠে পড়লেন–আমাকে এখন যেতে হবে। সেনেটে একটা অধিবেশন আছে। ডিনারে দেখা হচ্ছে, কেমন?

তিনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। অলিভার অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। হ্যাঁ, এবার লিস্টটা পড়তে হবে। অলিভার সেদিকে মন দিলেন।

.

স্বপ্নের মধ্যে মিরিয়াম বার বার ভয় পেয়েছে। বিছানাতে উঠে বসেছে। একজন পুলিশ তার বিছানার ধারে পাহারায় ছিল। সে মিরিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলেছে–এবার বলতে পারবেন, কে এই কাজটা করেছে?

-হ্যাঁ, আমার সবকিছু মনে পড়ছে।

পুলিশের ঘুম ছুটে গেছে, সমস্ত শরীরে ঘামের শিহরণ।

.

 পরের দিন সকালবেলা, অলিভার হাসপাতালে ফোন করলেন। যেখানে মিরিয়াম ছিলেন।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হচ্ছে, কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ব্যাপারটা খুব একটা ভালো লাগছে না।

অলিভার বললেন–ওর তো কোনো পরিবার নেই। এখন কী করা যায়? ওই রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো দরকার আছে কি?

–আর একটু অপেক্ষা করতে হবে, অনেক সময় অলৌকিক ঘটনাও ঘটে যায়।

.

 জে পার্কিংস, প্রোটোকলের প্রধান। প্রেসিডেন্টর কাছে বসে কাজের হিসাব দিচ্ছিলেন।

তিনি বললেন–ওয়াশিংটনে ১৪৭টি দেশের দূতাবাস আছে। মিঃ প্রেসিডেন্ট ওই নীলবইয়ের মধ্যে তার তালিকা পাবেন। প্রত্যেকের নাম সেখানে দেওয়া আছে। শুধু দূতাবাস কর্মীদের পরিচয় নয়, প্রত্যেকের স্ত্রীদের খবরও লেখা আছে। সবুজ বইয়ের মধ্যে পাবেন উল্লেখযোগ্য কূটনীতিকদের পরিচয়। ওয়াশিংটনে কারা বাস করেন, সেইসব বিখ্যাত মানুষদের নামও ওখানে পাবেন। কংগ্রেস সদস্যদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে।

তিনি অলিভারের হাতে বেশ কয়েকটা কাগজ তুলে দিলেন। এখানে বিখ্যাত রাষ্ট্রদূতদের কথা লেখা আছে, এদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলতে হবে।

অলিভার তাকালেন, দেখলেন সেখানে ইতালিয় রাষ্ট্রদূত এবং তার স্ত্রীর নাম লেখা আছে–ইকোনো ও সিলভা। সিলভা অলিভারের মনে হল, তিনি জানতে চাইলেন–ওঁরা কি স্ত্রীদেরও সঙ্গে নিয়ে আসেন?

না, স্ত্রীদের সাথে পরে আপনার পরিচয় হবে। আমার মনে হয়, আপনি এখনই পরিচয় করাটা শুরু করুন।

-ঠিকই বলেছেন।

পার্কিংস বললেন–আমি আগামী শনিবার থেকে কাজটা শুরু করতে চাইছি। সব বিদেশী দূতাবাসে খবর পাঠাতে হবে। রাষ্ট্রদূতদের তৈরি থাকতে বলা হবে। আপনি তাদের সাথে হোয়াইট হাউসে ডিনারের আসরে বসবেন।

অলিভার আবার তালিকার দিকে তাকালেন–হ্যাঁ, ইকোনো ও সিলভা, নামদুটো তাকে অজানা আকর্ষণে ডাক দিচ্ছে।

.

শনিবার সন্ধ্যেবেলা। স্টেট ডাইনিং রুমটাকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন দেশের পতাকা দেওয়া হয়েছে। অলিভার দুদিন আগেই ইতালিয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন শ্ৰীমতী কেমন আছেন? অলিভারের প্রশ্ন।

একটুখানি বিরতি আমার স্ত্রী ভালোই আছেন। মিঃ প্রেসিডেন্ট অনেক ধন্যবাদ।

.

ডিনার এগিয়ে চলেছে। অলিভার এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যাচ্ছেন। অতিথিদের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন।সকলকে মুগ্ধ করছেন তার সুন্নত ব্যক্তিত্বের ছোঁয়ায়। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী মানুষের আগমন ঘটে গেছে।

অলিভার রাসেল তিনজন ভদ্রমহিলার কাছে গেলেন। তারা তিনজনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে করেছেন বিখ্যাত পুরুষদের। তারা হলেন লিওনোরা, ডলোরাস আর ক্যারল।

অলিভার একটু এগিয়ে গেলেন। সিলভাকে দেখা গেল। সিলভা তার হাতে হাত রেখেছেন–এইমুহূর্তটার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম। সিলভার দুটি চোখের তারায় অদ্ভুত দ্যুতি।

–আমিও, অলিভার বললেন।

–আমি জানতাম, আপনাকে নির্বাচিত করা হবে।

–আমরা কি পরে কথা বলব?

হ্যাঁ, পরে অবশ্যই, কেমন?

.

ডিনার শেষ হয়ে গেছে। বলরুমে নাচের আসর। মেরিন ব্যান্ড বেজে উঠেছে। অলিভার জ্যানকে নাচতে দেখলেন। ভাবলেন, আহা, কী সুন্দরী না আমার স্ত্রী। অসাধারণ শরীর তার?

এইভাবেই সন্ধ্যেটা কেটে গেল। সফলতার মধ্যে দিয়ে।

.

পরবর্তী সপ্তাহ, ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের প্রথম পাতায় মস্ত বড়ো খবর বেরিয়েছে। খবরটা পড়ে সকলে অবাক হয়ে গেছেন। বলা হয়েছে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ।

অলিভার বিশ্বাস করতে পারেননি। এটা কারা প্রকাশ করল? তিনি দেখতে পেলেন এর অন্তরালে প্রকাশক লেসলি স্টুয়ার্টের নাম আছে।

পরের সপ্তাহে ওয়াশিংটন ট্রিবিউনে আর একটা খবর বেরোল। বলা হল–কেনটাকি ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা উচিত।

দুসপ্তাহ কেটে গেছে। ট্রিবিউনে আর একটা মারাত্মক বিস্ফোরক খবর। লেখা হয়েছে প্রেসিডেন্ট রাসেলের প্রাক্তন কর্মচারী তার বিরুদ্ধে যৌন অভিযোগ আনতে চলেছেন।

ওভাল অফিসের দরজা খুলে গেল। জ্যান ভেতরে ঢুকে প্রশ্ন করল- আজকের খবরের কাগজটা দেখেছ?

-হ্যাঁ।

–এটা কী করে হল অলিভার? তুমি কিনা…

একটু অপেক্ষা করো, জ্যান, বুঝতেই পারছ, অনেকে এমন কথা রটাতে পারে। লেসলি স্টুয়ার্ট এর অন্তরালে আছে। আমার মনে হচ্ছে সে ওই মেয়েটাকে টাকা দিয়ে হাত করেছে। আমি তাকে প্রত্যখ্যান করেছিলাম, সে বোধহয় এভাবেই প্রতিশোধ নিতে চাইছে। দেখাই যাক, কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়।

.

সেনেটর ডেভিসকে টেলিফোনে পাওয়া গেল–অলিভার এক ঘণ্টার মধ্যে তোমার কাছে যাচ্ছি।

–আমি এখানেই থাকব।

অলিভার ছোট্ট লাইব্রেরিতে বসেছিলেন। টড ডেভিস ঢুকলেন। অলিভার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–শুভ সকাল।

নিকুচি করেছে তোমার শুভ সকালের। সেনেটর ডেভিসের কণ্ঠস্বরে উদ্বিগ্নতা ওই মেয়েটি আমাদের ধ্বংস করে দেবে।

না, কিছুই করতে পারবে না। ও সবেমাত্র কামড় দিতে শুরু করেছে।

সবাই এই খবরের কাগজগুলো পড়ে, গুজব বাতাসের বেগে দ্রুত ছড়িয়ে যায়, মানুষ । তাই বিশ্বাস করে।

টড, ব্যাপারটাকে থামাতে হবে।

–অত সহজ নয়, তুমি কি জানো ডব্লিউ টি ই-র প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে? বলা হয়েছে, কে আমাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবে? তোমার নাম সকলের নীচে। লেসলি স্টুয়ার্ট তোমার বারোটা বাজিয়ে দেবে। তুমি ওকে থামাও, যে করেই হোক।

–আর একটা কথা মনে পড়ছে টড, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। এক্ষেত্রে আমরা কিছু করতে পারব না।

সেনেটর ডেভিস কী একটা ভাবলেন। হ্যাঁ, কিছু একটা উপায় বের করতে হবে।

–আপনি কী চিন্তা করছেন?

বসো।

 দুজনে বসলেন।

–ওই মেয়েটি এখনও তোমাকে ভালোবাসে, তাই না অলিভার? তুমি ওকে প্রত্যাখ্যান করেছ, তাই ও রেগে গেছে। এখন দেখো, শান্তি স্থাপন করা যায় কিনা।

কী ভাবে?

 মাথা ব্যবহার করো।

এক মুহূর্তের অপেক্ষা–টড, আপনি কী বলছেন?

–তুমি ওর সঙ্গে দেখা করো। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও। তোমাকে ও এখনও ভালোবাসে। দেখো, ও আর তোমার বিরুদ্ধাচারণ করবে না।

-আপনি ঠিক কী করতে বলছেন?

–এ ব্যাপারে তুমি এক পাকা খেলোয়াড়, তোমাকে আমি নতুন করে কী বলব? আরও একবার তোমাকে অভিনয় করতে হবে। মেয়েটির মন জয় করার চেষ্টা করো। এখানে ওকে ডেকে পাঠাও। শুক্রবার রাতে। ডিপার্টমেন্ট ডিনারের আসরে। তুমি বোঝাবার চেষ্টা করো।

–আমি বুঝতে পারছি না।

–কেন বুঝতে পারছ না? ব্যাপারটা বাড়তে দিলে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যাবে। ভার্জিনিয়াতে আমার একটা ছোট্ট কান্ট্রি হাউস আছে। ব্যাপারটা খুবই গোপনীয়। আমি সপ্তাহের শেষে ফ্লোরিডাতে যাব। জ্যান, আমার সঙ্গে থাকবে।

উনি কাগজের একটা টুকরো এবং কয়েকটা চাবি অলিভারের হাতে দিলেন।

সব কিছু লেখা আছে, ওই বাড়িটার চাবি।

অলিভার অবাক বিস্ময়ে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বললেন–হায় ঈশ্বর, আপনি সব পরিকল্পনা আগে থেকেই ঠিক করেছেন! কিন্তু লেসলি কি রাজী হবে? আমার তো মনে হচ্ছে না, যদি ও রাজী না হয়?

সেনেটর ডেভিস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–ও অবশ্যই রাজী হবে। সোমবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে, ভাগ্য তোমার সদয় হোক।

অলিভার অনেকক্ষণ বসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভাবলেন, না, ওর সঙ্গে এই ব্যবহার করা আর উচিত হবে না। ভালোবাসার নামে প্রতারণা? না, ভগবান বোধহয় আমাকে ক্ষমা করবেন না।

.

সেদিন সন্ধ্যেবেলা, ডিনারের জন্য দুজনে তৈরি হচ্ছে। জ্যান বলল–অলিভার, বাবা আমাকে ফ্লোরিডাতে যেতে বলেছে। সপ্তাহের শেষে। তাকে কীসব পুরস্কার দেওয়া হবে। সে আমাকে পাশে রাখতে চাইছে। কারণ আমি তো প্রেসিডেন্টের পত্নী, আমি গেলে তুমি কি রাগ করবে? শুক্রবার, এখানে নৈশভোজের আসর আছে। তুমি যদি চাও, তাহলে আমি যাব না।

-না, তুমি ঘুরে এসো, বাবা যখন ডাক দিয়েছেন, তুমি না থাকলে আমার খুবই খারাপ লাগবে সোনা।

মনে মনে অলিভার ভাবলেন–হ্যাঁ, এই সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে হবে। দেখা যাক, শেষ অব্দি আমি জিততে পারি কিনা?

.

লেসলিকে টেলিফোনে পাওয়া গেল। সেক্রেটারি এসে বলল–মিস স্টুয়াট?

–হ্যাঁ, কী হয়েছে?

–প্রেসিডেন্ট রাসেল আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন।

 লেসলি এক মুহূর্ত তাকাল। তারপর হাসল- ঠিক আছে। সে ফোনে বলল–আমি পরে ফোন করছি।

একটু বাদে আবার ফোন বেজে উঠেছে।

–মিঃ প্রেসিডেন্ট আবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন।

 কিছুক্ষণের নীরবতা। রিসিভারটা হাতে নিয়েছে লেসলি। কোনো কথা বলছে না।

মিঃ প্রেসিডেন্ট বললেন–লেসলি, আমি তোমাকে দেখতে চাইছি, তোমাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।

–সত্যি বলছ?

–হ্যাঁ।

–তুমি এখন প্রেসিডেন্ট, আমি তোমার কথা মান্য না করি কী করে বলোতা?

–তুমি যদি এক মহান দেশপ্রেমিক হয়ে থাকো, হোয়াইট হাউসে শুক্রবার রাতে নৈশভোজের আসর। তুমি আসবে তো?

–কটার সময়?

–রাত আটটায়।

–ঠিক আছে, আমি যাব।

.

অসাধারণ দেখাচ্ছে তাকে। আহা, এত সুন্দরী সে। স্তন বিভাজিকা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বাইশ ক্যারটের সোনার গয়না পরা। হীরের দ্যুতি ঠিকরোচ্ছে তার অনামিকায়।

অলিভার তার দিকে তাকালেন, পুরোনো স্মৃতিরা ভিড় করেছে। তিনি বললেন–লেসলি?

–মিঃ প্রেসিডেন্ট?

হাতে হাত রাখলেন। ঘামে হাত ভিজে গেছে। এটা কি কোনো চিহ্ন? অলিভার ভাবলেন, কীসের? স্নায়ুর দুর্বলতা? উত্মা? পুরোনো স্মৃতির বিচ্ছুরণ?

লেসলি, তোমাকে দেখে আমার খুবই ভালো লাগছে।

–আমিও ভালোভাবে এখানে এসেছি।

–আমরা পড়ে কথা বলব, কেমন?

মুখে সুস্মিত হাসি- ঠিক আছে।

.

অলিভারের পাশেই একদল আলোক প্রতিনিধি বসেছিলেন। তাদের একজনকে দেখতে খুবই সুন্দর। কালো দুটি চোখ। তিনি অলিভারকে ভালোভাবে দেখছেন।

অলিভার পিটার ট্যাগারের দিকে ঘুরে বললেন–এই ভদ্রলোক কে?

ট্যাগার বললেন–আলি আল খুলনানি। উনি ইউনাইটেড আরব আমীরশাহীর একজন সেক্রেটারি। কেন?

অলিভার আবার তাকালেন। না, কোনো কারণ নেই।

তিনি বেশ বুঝতে পারছেন, ওই ভদ্রলোকের দুটি চোখ তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

.

অলিভার সমস্ত সন্ধ্যেটা বাড়ির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। প্রত্যেক অতিথির দিকে আলাদাভাবে নজর দিয়েছেন। সিলভা একটা টেবিলে বসে ছিলেন। লেসলি অন্য একটাতে। অলিভার লেসলির জন্য আলাদা করে সময় বের করার চেষ্টা করলেন।

শেষ পর্যন্ত অলিভার বললেন–আমাদের কিছু বিষয়ে কথা বলতে হবে। অনেক কিছু বলার আছে লেসলি। সময় পাইনি। আমরা অন্য কোথাও দেখা করতে পারি কি?

লেসলির কণ্ঠস্বরে সামান্য উদ্বিগ্নতা-অলিভার, না, আর বোধহয় কথা বলা উচিত নয়।

ভার্জিনিয়াতে আমার একটা বাড়ি আছে। এখান থেকে ঘণ্টা খানেক লাগবে। তুমি সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করবে?

লেসলির চোখে বিস্ময়। তারপর সে বলল–তুমি যদি চাও, তাহলে আমি নিশ্চয়ই আসব।

অলিভার মোটামুটি জায়গাটা বুঝিয়ে দিলেন- কালরাত্রি আটটার সময়। ঠিক আছে?

লেসলির চোখ বলছে- হ্যাঁ, সে ইচ্ছুক। সে বলল, আমি যথা সময়ে পৌঁছে যাব।

.

 পরের দিন সকালে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল। সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স-এর ডিরেক্টর জেমস ফ্রিস একটা বোমা ফাটিয়ে দিলেন।

–মিঃ প্রেসিডেন্ট, সকালবেলা একটা মারাত্মক খবর এসেছে। লিবিয়া, ইরান এবং চিনের কাছ থেকে নানা ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র কিনছে। তারা ইজরায়েলকে আক্রমণ করবে। দু একদিনের মধ্যেই জোর লড়াই বেঁধে যাবে।

 স্টেট সেক্রেটারি বললেন–এখন আর অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না। এখনই আমাদের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে হবে। যত রকমভাবে সম্ভব।

অলিভার বললেন–অন্য কোনো খবর আছে কি? আরও বেশি তথ্য চাই।

সমস্ত সকাল ধরে এই মিটিংটা অনুষ্ঠিত হল। অলিভার মাঝে মধ্যেই ভাবছেন, লেসলির কথা, সত্যি, দেখা হবে তো? সময় করতে পারবেন তো?

শ্বশুরের কণ্ঠস্বর যে করেই হোক লেসলির হৃদয় জয় করতে হবে।

.

শনিবার সন্ধ্যাবেলা। অলিভার হোয়াইট হাউস স্টাফকারে বসে আছেন। তার বিশ্বস্ত সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট গাড়িটা চালাচ্ছেন। গাড়ি এগিয়ে চলেছে ভার্জিনিয়ার দিকে। সব অভিযান নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেল। এতক্ষণ কি মেয়েটি আছে?

.

রাত্রি আটটা বেজেছে, অলিভার জানলা দিয়ে তাকালেন। দেখলেন লেসলির গাড়ি ঢুকে পড়েছে সেনেটরের বাড়ির মধ্যে। তিনি দেখলেন, লেসলি গাড়ি থেকে নেমেছে। প্রবেশ পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অলিভার সামনের দরজাটা খুললেন। দুজনে দাঁড়ালেন। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। সময় কেটে যাচ্ছে, তারা কেউ কোনো কথা বলতে পারছেন না।

অলিভার নীরবতা ভঙ্গ করলেন- হে ঈশ্বর, গতরাতে যখন তোমাকে দেখেছিলাম, আমি বলতে ভুলেই গেছি, তুমি আগের মতোই সুন্দরী রয়ে গেছে।

অলিভার লেসলির হাতে হাত রাখলেন। তারা লিভিং রুমের মধ্যে চলে গেলেন।

-সোনা, তুমি কী খাবে?

আমি কিছু খাব না। তোমাকে ধন্যবাদ।

অলিভার কৌচে লেসলির পাশে বসলেন। বললেন–আমি একটা ব্যাপার জানতে চাইছি, তুমি কি আমাকে ঘেন্না করো?

 লেসলি মাথা নাড়ল–না, ঠিক বুঝতে পারছি না। আগে করতাম, কিন্তু তোমাকে দেখার পর সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

লেসলির মুখে বিষ হাসি। আসলে তোমার ওই প্রত্যাখানই আজ আমাকে এখানে এনেছে।

–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

–অলিভার, আমি তোমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। আমি একটার পর একটা খবরের কাগজ কিনেছি। টেলিভিশন চ্যানেল কিনেছি যাতে আমি তোমাকে আক্রমণ করতে পারি। তুমি আমার জীবনে একমাত্র পুরুষ, যাকে আমি সত্যি সত্যি ভালো বেসেছিলাম। যখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল।

লেসলির চোখে উদগত অর ইশারা। কোনোরকমে কান্না সংবরণ করল সে।

অলিভার তাকে জড়িয়ে ধরেছেন- লেসলি!

তারপর ঠোঁটে ঠোঁটে মিলন। তারা একে অন্যকে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে।

লেসলি বলল–হায় ঈশ্বর, আমি ভাবতে পারিনি, এই ঘটনাটা ঘটবে।

তখনও তাদের আলিঙ্গন শেষ হয়নি। তারা ধীরে ধীরে বেডরুমে পৌঁছে গেছে। একে অন্যকে নগ্ন করার চেষ্টা করছে।

লেসলি বলল তাড়াতাড়ি ডার্লিং, তাড়াতাড়ি। আমি আর থাকতে পারছি না।

তারপর তারা বিছানাতে শুয়ে পড়ল। একে অন্যকে শক্ত করে চেপে ধরেছে। শরীরে শরীর মিলে গেছে। পুরোনো স্মৃতির উতরোল। ভালোবাসার খেলা এগিয়ে চলেছে। কখনও মৃদু, কখনও ভয়ঙ্কর। শুরু থেকে শেষ। নতুন একটা অধ্যায় শুরু। তারপর তারা অনেকক্ষণ সেখানে শুয়ে রইল। তৃপ্ত পরিশ্রান্ত এবং সন্ত্রস্ত।

লেসলি বলল ব্যাপারটা খুবই মজার, তাই না?

কী?

–তোমার সম্পর্কে কতগুলো খবর আমি ছেপে দিলাম, আমি এভাবেই তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলাম। তুমিই বলল, একাজে আমি সফল হয়েছি কিনা?

-হ্যাঁ, তুমি সফল হয়েছ।

লেসলি উঠে বসল এবং অলিভারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল তোমার জন্য আমার অহঙ্কার হয় অলিভার। তুমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামান্য প্রেসিডেন্ট।

ব্যাপারটা এমন করে ভাবছ কেন? হ্যাঁ, এটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি কী পাল্টে গেছি?

অলিভার তার ঘড়ির দিকে তাকালেন আমাকে এখনই ফিরতে হবে।

-ঠিক আছে। তুমি আগে যাবে তো?

–লেসলি, তোমার সঙ্গে আমার আবার কবে দেখা হবে?

যখন তুমি চাইবে আমি আসব।

–কিন্তু আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।

হ্যাঁ, আমি জানি।

লেসলি সেখানে শুয়ে রইল। স্বপ্ন দেখল, অলিভার পোশাক পরছেন।

অলিভার যখন যাবার জন্য প্রস্তুত, উনি ঝুঁকে দাঁড়ালেন এবং বললেন–তুমি আমার অলৌকিক স্বপ্ন।

–তুমিও আমার স্বপ্ন। এই স্বপ্নটা আমি সব সময় দেখতে ভালোবাসব।

অলিভার চুমু দিয়ে বললেন–তোমাকে কাল ফোন করব কেমন?

অলিভার অত্যন্ত দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলেন। তাকে এখন ওয়াশিংটন ফিরতে হবে। ঘটনা যে কোনো মুহূর্তে পাল্টাতে পারে। এখানে থাকলে আবার একই গল্প। অলিভার ভাবলেন, আমাকে আরও সুনিশ্চিত হতে হবে। মেয়েটিকে আর কষ্ট দেব না। তিনি গাড়ির টেলিফোনটা তুলে দিলেন। ফ্লোরিডাতে ফোন করলেন। সেনেটর ডেভিসকে পাওয়া গেল।

সেনেটর বললেন–হ্যালো?

–আমি অলিভার বলছি।

–তুমি এখন কোথায়?

–আমি ওয়াশিংটনের পথে, আপনাকে একটা ভালো খবর দেব। ওই সমস্যাটা সমাধান হয়ে গেছে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

বাঃ, খবরটা শুনে ভালো লাগছে। তুমি তো দেখছি পাকা খেলোয়াড়। কলির কেষ্ট হে!

সেনেটর ডেভিসের গলায় একটা সুনিশ্চিত নিরাপত্তর ছাপ।

আমি পরে সব বলব, টড, কেমন?

.

পরের দিন সকালবেলা, অলিভার পোশাক পরছেন। ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের প্রথম পাতা। খবরটা পড়ে, তিনি চমকে উঠলেন। প্রথম পাতায় সেনেটর ডেভিসের কান্ট্রি হোমের ছবিটা ছাপা হয়েছে। তলায় মস্ত বড়ড়া শিরোনাম প্রেসিডেন্ট রাসেলের গোপন ভালোবাসার নীড়!

.

১৪.

অলিভার বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এ কত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা! কীভাবে এটা সম্ভব হল? তিনি ভেবেছিলেন, মেয়েটি বোধহয় যৌনকাতর। তিনি আবার ভুল করলেন? না, তীব্র কামনার সাথে ঘৃণার সংমিশ্রণ। ভালোবাসার মিশ্রণ নেই। কীভাবে মেয়েটিকে থামানো যেতে পারে, অলিভার পাগলের মতো হয়ে গেলেন।

.

সেনেটর টড ডেভিস প্রথম পাতার খবরের দিকে তাকিয়ে আছেন। সমস্ত মনে জমেছে। দুরাশা এবং সংশয়। তিনি বুঝতে পারলেন যে, সংবাদপত্র কতখানি শক্তিশালী। না, এই ব্যাপারটা তাকেও কষ্ট দেবে। অনেক দিন ধরে তিল তিল করে তিনি যে ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছেন, তা হয়তো ধুলিসাৎ হয়ে যাবে।

সেনেটর ডেভিস ভাবলেন, নিজেই চেষ্টা করব, মেয়েটিকে থামাতে হবে।

তিনি সেনেট অফিসে ঢুকলেন। টেলিফোনে লেসলিকে ধরলেন। বললেন–অনেক দিন পর কথা হচ্ছে মিস স্টুয়ার্ট। আপনি কেমন আছেন?

-হ্যাঁ, আপনার কথা মনে পড়ে সেনেটর ডেভিস, আমি আজ যেখানে এসে পৌঁছেছি, এর অন্তরালে আপনার অবদান আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।  

মুখে শব্দ–না, কখনওই পারবেন না। যখনই আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে, সেই সমস্যা সমাধান করার জন্য আমি চেষ্টা করেছি। কি করিনি?

–সেনেটর আপনার জন্য আমায় কী করতে হবে?

–না। মিস স্টুয়ার্ট, আমি আপনার সঙ্গে কয়েকটা ব্যাপার আলোচনা করতে চাইছি। আমি হলাম আপনার কাগজের একজন পাঠক। আমি জানি, ট্রিবিউন পত্রিকা কীভাবে সত্যি কথা বলে। আমি বুঝতে পেরেছি, ট্রিবিউনে আমাদের আরও বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত। আমি কয়েকটা বড়ো কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। ট্রিবিউনে অনেক বিজ্ঞাপন দেব।

–এ খবর শুনে, সেনেটর, খুবই ভালো লাগছে। হ্যাঁ, আরও বিজ্ঞাপন দরকার। আমি কি আমার বিজ্ঞাপন প্রতিনিধিকে আপনার কাছে পাঠাব?

-হ্যাঁ, তার আগে আপনার সঙ্গে আমাকে বসতে হবে। প্রত্যেকটা ছোটোখাটো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

কী সমস্যা? লেসলি জানতে চাইল।

–প্রেসিডেন্ট রাসেলের ব্যাপারে।

কখন কবে কোথায়?

ব্যাপারটা খুবই গোপন মিস স্টুয়ার্ট। একটু আগে আপনি বললেন না, আপনার এই সফলতার অন্তরালে আমি আছি। কী আমি আছি তো? আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে।

–আপনাকে সাহায্য করতে পারলে আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করব।

–ঠিক আছে, আমি চাইছি, প্রেসিডেন্ট যেন আবার এই পদে জিততে পারেন।

–আমি জানি।

উনি খুব ভালো কাজ করছেন। তবে ট্রিবিউনের মত একটা পত্রিকা যদি অলিভারকে আক্রমণ করে, তা হলে বেচারীর কাজ করা মুশকিল।

–সেনেটর, আপনি বলুন, আমাকে কী করতে হবে?

ওই আক্রমণটা বন্ধ করতে হবে। এটাই আমার অনুরোধ।

কীসের বিনিময়ে? আমি শুধুমাত্র কয়েকটা বিজ্ঞাপনের জন্য এই কাজ করতে পারি না।

–অনেক টাকার বিজ্ঞাপন, মিস স্টুয়ার্ট?

-সেনেটর, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। অন্য কিছু দেবার থাকলে বলবেন। তখন আপনার প্রস্তাবটা ভেবে দেখব আমি, কেমন?

– তারপর লাইনটা কেটে দেওয়া হল।

.

ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের অফিস, ম্যাক বেকার প্রেসিডেন্ট রাসেলের গোপন ভালোবাসার নীড় সম্পর্কে খবরটা পড়ছিলেন।

তিনি চিৎকার করে বললেন–কে এই খবরটা ছাপবার অনুমতি দিয়েছে?

–হোয়াইট টাওয়ার থেকে এই অনুমতিটা এসেছে।

–হায় ঈশ্বর, ভদ্রমহিলার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

 তিনি ভাবলেন, আর এখানে এক মুহূর্ত থাকা উচিত নয়। কত টাকার বিজ্ঞাপন, তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। মাঝে মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেবার কথা ভাবেন। তখনই লেসলির সাথে দেখা হয়ে যায়। না, লেসলির সঙ্গে কাজ করার একটা আলাদা আনন্দ আছে। কিন্তু এইভাবে? এই দুঃসাহস?

এবার অন্য একটি প্রস্তাব। ট্রিবিউনে এক রিপোর্টার ভালো কাজ করছেন। আপনি কি জানেন?

-কেন? ম্যাক বেকার জানতে চেয়েছিলেন।

–হ্যাঁ, যে করেই হোক ওই ভদ্রলোককে আনতে হবে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা ম্যাক বেকার বললেন–আমি জোলটেয়ার সম্বন্ধে খবর নিয়েছি। ওনার চার্জ কিন্তু অনেক বেশি।

–যে করেই হোক ওনাকে আনতেই হবে।

পরের সপ্তাহে জোলটেয়ার এলেন। তার আসল নাম ডেভিড হেওয়ার্ড। উনি ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের কাজে যোগ দিলেন। বছর পঞ্চাশ বয়স। চেহারাটা ছোটোখাটো, গায়ের রং কালো। চোখের তারায় তীক্ষ্ণতা আছে।

ম্যাক অবাক হয়ে গেছেন। লেসলির আচরণ ঠিক বুঝতে পারা যাচ্ছে না। লেসলি যে ধরনের মহিলা, তাতে তো জ্যোতিষী বিদ্যায় আস্থা থাকার কথা নয়।

ধীরে ধীরে দেখা গেল, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অন্তরালে ডেভিড হেওয়ার্ডের একটা অবদান থাকছে।

.

প্রথম দিন ম্যাক প্রকাশনা সংস্থার নাম নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তিনি লিখলেন–লেসলি চেম্বারস, পাবলিসার।

লেসলি বলল–এটাকে পাল্টে লেসলি স্টুয়ার্ট করতে হবে।

তার মানে? ম্যাক ভাবলেন, মেয়েটার মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত আছে। লেসলি তার বিয়ের আগের নামটা রাখতে চেয়েছিল। অলিভার যাতে বুঝতে পারেন, ওই ভয়ঙ্কর প্রচারের অন্তরালে কে আছে?

.

কাগজটা নিয়ে লেসলি তাকিয়ে আছে–আমরা একটা হেলথ ম্যাগাজিন কিনব।

 ম্যাক অবাক চোখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন- কেন?

এই ব্যাপারটার মধ্যে উন্মাদনা আছে। আগামী দিনে এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অনেক বাড়বে।

লেসলির অনুমান সত্যি বলে প্রমানিত হল। কাগজটা দাঁড়িয়ে গেল।

লেসলি বেকারকে বলল–আমরা বাড়তে শুরু করেছি। এবার বিদেশে পাড়ি দিতে হবে।

-ঠিক আছে।

–রিপোর্টারদের বলুন আরও তৎপর হতে।

–আমরা এমন তরুণ সাংবাদিকদের খুঁজে বেড়াব, খবরের জন্য যারা ক্ষুধার্ত।

লেসলি ইন্টারভিউর আসর বসাল। প্রত্যেক আবদেনকারীর জীবনপঞ্জী খুঁটিয়ে পড়তে থাকল। তারপর একটাই প্রশ্ন–তুমি কী ধরনের কাজ ভালোবাসো?

এই প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর এল। যে উত্তরগুলো মনের মতো হল, সেই জীবনপঞ্জীগুলো লেসলি বারবার খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।

ওয়াশিংটন ট্রিবিউনকে ভালোবাসতে হবে, এর জন্য একদল আত্মনিবেদিত সাংবাদিক চাই।

.

লেসলি স্টুয়ার্টের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সকলের দারুণ উৎসাহ। সে সত্যি এক সুন্দরী রমণী। এখনও পর্যন্ত কারও সঙ্গে সংযুক্ত নয়। কোনো পুরুষ বন্ধু নেই। নিষিদ্ধ জীবনের উন্মাদনা নেই। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মহিলা। অনেকে ডিনার পার্টিতে যোগ দেয়। লেসলি কিন্তু খবু একটা উৎসাহী নয়। একা একা করে কী? অনেকে বলল, সে নাকি সারারাত বসে বসে কাজ করে। রাতে তার ঘুম হয় না। স্টুয়ার্ট সাম্রাজ্যের নতুন ভিত্তি স্থাপন করে।

আরও কিছু আলাদা গুজব শোনা গেল। সেই গুজবের ভিত্তি নেই, তাই তাদের উল্লেখ করা হল না।

.

লেসলি সংবাদপত্রের সমস্ত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে শুরু করে খবর আনা, বিজ্ঞাপন সবকিছু। একদিন সে তার বিজ্ঞাপন বিভাগে ঢুকে পড়ল। বলল, আমরা কেন গিসান থেকে বেশি বিজ্ঞাপন পাচ্ছি না? ব্যাপারটা দেখতে হবে তো?

ভদ্রলোক আমতা আমতা করতে থাকেন ম্যাডাম, অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না।

-ঠিক আছে আমি মালিকের সাথে কথা বলব।

 সে মালিককে ফোন করে বলল–অ্যালান, আপনি ট্রিবিউনে বিজ্ঞাপন বন্ধ করলেন কেন?

 ভদ্রলোক বললেন–লেসলি, তোমার পাঠক-পাঠিকারা আমার দোকানে আসে না।

.

লেসলির একটা গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। লেসলি দেখে নিল, সেখানে কারা কারা আসবেন। সে প্রত্যেকের শক্তি সম্পর্কে খবর নিয়েছে। এখানে ভালোভাবে কাজ করতে হবে।

ম্যাক বেকার বললেন–সকলের সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে লেসলি।

–এটা ভুলে যান, আমি নতুন একটা পদ্ধতি বার করব।

.

পরের বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ট্রিবিউন এন্টারপ্রাইজের সাম্রাজ্যের সীমা অনেক বেড়ে গেল। তারা আর একটা নতুন কাগজ কিনল। অস্ট্রেলিয়াতে রেডিও স্টেশন স্থাপন করল। ডেনভারে নতুন টেলিভিশন স্টেশন। ইণ্ডিয়ানাতে আর একটা কাগজ। যখনই নতুন লেনদেন হয়, কর্মচারীরা ভয় পায়। কিন্তু লেসলি সকলকেই অভয় মন্ত্র দিয়েছে। কাউকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হবে না।

.

ক্যাথারিন সম্পর্কে লেসলির আগ্রহ এবং হিংসা দুটোই আছে।

লেসলি বলেছে–ওই মহিলা খুবই ভাগ্যবতী। কিন্তু এত ভাগ্য ওনার থাকা উচিত নয়।

ম্যাক বেকার শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। লেসলি রাজি হয়নি।

একদিন সকালবেলা লেসলি অফিসে এসেছে। দেখল, কেউ বোধহয় তার ডেস্কের ওপর একটা কাঠের বাক্স রেখেছে।

ম্যাক বেকার খুবই অবাক হয়ে গেছেন আমি দুঃখিত, আমি এটা নিয়ে যাচ্ছি।

না, এটা রেখে দিন।

.

 ম্যাক বেকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্স আছে, লেসলির কণ্ঠস্বর ভেসে এল ইন্টারকমে ম্যাক, এক্ষুনি এখানে আসুন।

গুড মর্নিং বলা হয়নি, তার মানে দিনটা খারাপভাবে কাটবে।

এবার বোধহয় লেসলির মন পাল্টে গেছে।

 কী হয়েছে?

ম্যাক অত্যন্ত দ্রুত করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলেন।কর্মচারীরা কাজে নিমগ্ন। তিনি এলিভেটর ধরলেন, হেয়াইট অফিস। জনা ছয়েক এডিটর কাজে ব্যস্ত আছেন।

বিশাল ডেস্কের একদিকে লেসলি স্টুয়ার্ট বসে আছে। সে ম্যাক বেকারের দিকে তাকাল–এবার শুরু হোক।

এটা বোধহয় সম্পাদকদের একটা মিটিং। ম্যাক বেকারের মনে পড়ল আপনারা খবরের কাগজ চালাচ্ছেন। আমাকে সবদিকে মাথা দিতে হচ্ছে কেন? উনি তো সব কিছু জানেন।

এভাবে কথা বলা হচ্ছে কেন? লেসলি তো ওয়াশিংটন ট্রিবিউনের প্রকাশক এবং মালিক।

ম্যাক বেকার বললেন–আমি ভার্জিনিয়াতে প্রেসিডেন্ট রাসেলের গোপন নীড় সম্পর্কে আলোচনা করতে চাইছি।

লেসলি বলল–এ বিষয়ে আলোচনার দরকার কী?

ওয়াশিংটন পোস্ট কাগজটা তার হাতে ধরা আছে। তাদের সবথেকে সফল প্রতিদ্বন্দ্বী এই কাগজটা দেখেছেন?

-হ্যাঁ, এখনও দেখার সময় পাইনি।

আগেকার দিনে এটাকে স্তূপ বা নিষিদ্ধ খবর বলা হত ম্যাক। যখন পোস্ট এই খবরগুলো সংগ্রহ করছে, আপনার সাংবাদিকরা তখন কি নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে?

ওয়াশিংটন পোস্টের শিরোনাম- ডিফেন্স সেক্রেটারিকে আরও উদার হতে বলা হয়েছে। তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যা আইনত সিদ্ধ নয়?

–এটা কোথা থেকে বেরিয়েছে?

–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এখনও পর্যন্ত সরকারী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।

–নিকুচি করেছে, ব্যাপারটা ধরার চেষ্টা করুন।

ম্যাক বেকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে বসে পড়লেন। হ্যাঁ, ঝড় উঠেছে, আকাশে তারই পূর্বাভাস।

–আমরা এক নম্বর অথবা আমরা সবার নীচে থাকব, মাঝামাঝি কোনো পন্থা আমি বিশ্বাস করি না, লেসলির ঝাঝানো কণ্ঠস্বর, যদি আমরা শূন্যে পৌঁছে যাই, তাহলে এখানে কেউ থাকবে না। সকলকে চাকরি ছাড়তে হবে। আশা করি আপনি আমার কথাটা বুঝতে পারছেন।

লেসলি রবিবাসরীয় সংস্করণের প্রধান সম্পাদকের দিকে তাকালেন। রোববার সকালবেলা মানুষের যখন ঘুম ভাঙে, তখনই তারা একটা ভালো খবরের কাগজ হাতে চায়। দেখবেন, রোববারের পত্রিকা বিভাগ যেন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখব না। গত রোববারের রবিবাসরীয়টা একেবার মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। বিরক্তিকর কিছু প্রতিবেদন।

ভদ্রলোক চিন্তা করলেন। তিনি বললেন–দুঃখিত, আসছে সংখ্যাটা ভালোভাবে সাজাব।

লেসলি ক্রীড়া সম্পাদকের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোকের বয়স পঁয়ত্রিশ, দেখতে মোটামুটি ভালো। চেহারাটাও সুন্দর। সোনালী চুল। ধূসর দুটি চোখ। তিনি মানুষকে সহজেই জানতে পারেন।

–আপনি এসব কী খবর দিয়েছেন? খবরগুলো একেবারেই ভুল।

আমাকে যেমনটি বলা হয়েছিল।

–কেন মাঠে নিজে যান না? ট্রিবিউন এমন একটা গল্প ছাপাচ্ছে, এটা কী সহ্য করা যায়?

 একে একে সব সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলা হল। তারা অবাক হয়ে গেল। লেসলি খুটিনাটি খবর রেখেছে। সবকিছু তার নখদর্পণে। না, এই মহিলার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই হবে।

ম্যাককে ডেকে লেসলি বলেছে- হোয়াইট হাউসের জন্য একজন জবরদস্ত সাংবাদিকের খোঁজ করুন। প্রেসিডেন্টের প্রত্যেকটি কার্যকলাপের ওপর গোপন নজর রাখতে হবে।

প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে লেসলির এত উৎসাহ কেন? ম্যাক মনে মনে ভেবেছিলেন। লেসলি বললেন–প্রেসিডেন্ট যেন আবার নির্বাচনে জিততে না পারেন, সেটা দেখতে হবে।

ডব্লিউ টি ই-র প্রধান প্রতিনিধি ফিলিপ কোলের ফোন, তিনি ম্যাক বেকারের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। ম্যাক বেকার তখন অফিস থেকে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন।

চিন্তিত কণ্ঠস্বর- ম্যাক, একটা সমস্যা হয়েছে।

কালকে শুনলে হবে না? আমার খুব দেরি হয়ে গেছে।

–ডানা ইভান্সকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

–সে কী? কী কারণে? ম্যাকের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ আকুলতা।

বলা হয়েছে, ও নাকি একজন স্পাই। ব্যাপারটা আমি কি দেখব?

-না, আমিই দেখছি। ম্যাক বেকার অতি দ্রুত ডেস্কে ফিরে এলেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টে ফোন করলেন।

.

১৫.

তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হল। সম্পূর্ণ উলঙ্গ করা হয়েছে। তাকে পুরে দেওয়া হল একটা ঠান্ডা ছোট্ট ঘরের মধ্যে। সে চেষ্টা করেছিল, দুজন পুরুষের সঙ্গে লড়াই করতে। এটা ছিল একটা অসম যুদ্ধ। রাইফেল হাতে দুজন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। তার জন্য অপেক্ষা করছে। কর্নেল গরডন সব ব্যাপারটা দেখছেন। বলা হল, মেয়েটিকে কাঠের পোস্টের সঙ্গে বেঁধে ফেলতে।

সে বলবার চেষ্টা করেছিল আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছেন কেন? আমি তো পাই নই। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর ফুটল না। মরটারের শব্দ হল। কাছাকাছি কোথাও আলোর বিস্ফোরণ। :

কর্নেল তার কাছ থেকে দূরে চলে গেলেন। তারপর বললেন–এবার শুরু হোক।

ফায়ারিং স্কোয়াডের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা গুলি করবে।..

–আর চিৎকার করতে হবে না।

সমস্ত শরীর কাঁপছে। ডানা চোখ খুলল। তার হৃদয়ের গতি অত্যন্ত দ্রুত। সে ছোট্ট ঘরে বিছানার ওপর শুয়ে আছে। কর্নেল সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

ডানা উঠে বসল। সমস্ত শরীরে আতঙ্ক। এই দুঃস্বপ্নটা ভালো লাগছে না তার।

-আমাকে নিয়ে কী করা হবে?

 কর্নেল শান্তভাবে তাকালেন–যদি বিচারব্যবস্থা থাকত তা হলে বলা হত আপনাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আপনাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

ডানা বিশ্বাস করতে পারছে না।

–আপনি বিমানে চড়ে এদেশ থেকে চলে যাবেন। আর কখনও এখানে ফিরে আসবেন না।

 স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে নজর দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিজে চেয়েছেন, ডানাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। পিটার ট্যাগার যখন এই গ্রেপ্তারের খবরটা শুনেছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

–ডানা ইভান্সকে স্পাই হওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে হত্যা করা হবে।

–হায় ঈশ্বর, এটা কখনও হতে দেওয়া যায় না।

–আমি তোমার নাম বলছি?

–হ্যাঁ, সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

–আমি স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কথা বলছি। এই ব্যাপারটা হলে ট্রিবিউন বোধহয় আমাদের প্রতি সদয় হবে।

অলিভার মাথা নাড়লেন না, আমি ওসব কিছু ভাবছি না। যে করেই হোক মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।

.

একটির পর একটি টেলিফোন আসছে। ওভাল অফিস থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। স্টেট সেক্রেটারীর ফোন, রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সচিবের আবেদন। শেষ পর্যন্ত ডানাকে ছেড়ে দেবার কথা ঠিক করা হল।

খবরটা শুনে পিটার ট্যাগার অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি অলিভারকে বললেন–ওকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, বাড়িতে ফিরে আসছে।

বাঃ, এতক্ষণে আমি শান্ত হলাম।

 ডানা ইভান্স, আগামীকাল সকালে তার দেখা হবে। না, মেয়েটির সাহসের প্রশংসা করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ভাবলেন, তিনি জানেন না, এই মুক্তির ঘটনা তাকে কী বিড়ম্বনার সামনে ফেলবে ভবিষ্যতে।

.

ডানার উড়ানপাখি ডালাস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট অবতরণ করল। ম্যাক বেকার সহ বারোজন স্টাফ এবং চব্বিশজন সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা এসেছেন বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা থেকে। কেউবা দূরদর্শন অথবা আকাশবাণী থেকে। তারা সকলে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডানাকে অভিনন্দন জানাবেন বলে।

ডানা জনতার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল–ওরা কেন এসেছেন?

–ডানা, তোমাকে অভিনন্দন জানাবার জন্য।

–আমি ভাবতেই পারছি না।

–এখন কেমন লাগছে?

–খুবই ভালো লাগছে।

–তুমি কি আবার ওখানে ফিরে যাবে? নিজের সৌভাগ্যকে ডানা বিশ্বাস করতে পারছে না। কথা বলার মতো অবস্থা এখন আর নেই তার।

ম্যাক বেকার তাকে একটা অপেক্ষমান লিমুজিনে নিয়ে গেলেন। গাড়িটা অত্যন্ত দ্রুত চলে গেল।

–কী হচ্ছে আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

ডানার জিজ্ঞাসা।

–তুমি তো কিংবদন্তীর নায়িকা হয়ে উঠেছ।

–আমি এটা মোটেই পছন্দ করি না ম্যাক।

 ডানা চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল–আমাকে ছাড়িয়ে এনেছেন, এজন্য অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

–তুমি আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং পিটার ট্যাগারকে ধন্যবাদ জানিও। তারাই বোতাম টিপেছেন। লেসলি স্টুয়ার্টকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

ম্যাক এই খবরটা লেসলির কানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। লেসলি বলেছিল, ওই বেজন্মার দল, দেখি আমি ট্রিবিউনের মাধ্যমে সাহায্য করতে পারি কিনা। আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করব ডানা যাতে মুক্তি পায়।

ডানা জানালা দিয়ে তাকাল। মানুষজন পথেঘাটে আপন কাজে চলেছে। গল্প করছে, হাসছে। এখানে বন্দুকের শব্দ নেই, নেই মরটারের আর্তনাদ। জীবন এখানে কত সুন্দর এবং শান্ত।

–আমার রিয়েল এস্টেট এডিটর তোমার জন্য অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করেছেন। আমি এখন তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব। সেখানে তুমি বিশ্রাম নেবে। যতদিন খুশি থাকতে পারো। মন ঠিক হলে তোমাকে আবার কাজে নেওয়া হবে।

ভদ্রলোক ডানার দিকে এগিয়ে এলেন-তুমি কি ঠিক আছে ডানা, নাকি ডাক্তার দেখাতে হবে?

–আমি ঠিকই আছি, প্যারিসে ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে।

.

ক্যালভারি স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্ট। ভারী সুন্দর সাজানো এক বেডরুমের একটি ফ্ল্যাট। একটা লিভিং রুম আছে। কিচেন, বাথরুম এবং ছোট্ট স্টাডি।

ম্যাক জানতে চাইলেন- এতে হবে তো?

-এটা অসাধারণ ম্যাক, আপনাকে ধন্যবাদ।

–রেফ্রিজারেটরে খাবার ভরতি আছে। তুমি জামাকাপড় কেনার জন্য দোকানে যেও। তারপর বিশ্রাম নিও, কেমন?

ধন্যবাদ। সবকিছুর জন্য আবার ধন্যবাদ।

পরে তোমার সঙ্গে কথা হবে। এখন আসি কেমন।

.

ডানা একটা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বন্দুকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বুলেট বর্ষণ। একটির পর একটি মৃতদেহের মিছিল। ডানার ঘুম ভেঙে গেল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। না, এটা একটা স্বপ্ন, কিন্তু এটা ঘটেছিল। আহা, কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। নারী-পুরুষ এবং শিশু, তাদের হত্যা করা হচ্ছে। জবাই করা হচ্ছে। প্রফেসার ট্যাকার ঠিকই বলেছিলেন বসনিয়া এবং হারজেগোভিনার মধ্যে এই লড়াই অনন্তকাল ধরে চলবে।

এর জন্য কে দায়ী?

ডানা ঘুমোতে পারছে না। আবার দুঃস্বপ্ন। তার থেকে সারারাত জেগে থাকলে কেমন হয়? সে হাঁটতে হাঁটতে জানলার কাছে চলে গেল। শহরের দিকে তাকাল। শান্ত, কোনো বন্দুক নেই, কোনো মানুষজন ছুটছে না, আহা, আর্তনাদ নেই। শান্তির বাতাবরণ। সে ভাবল, কামাল কেমন আছে? কামালের সঙ্গে আর দেখা হবে কি?

পরক্ষণেই তার মনে হল, কামাল বোধহয় আমাকে ভুলে গেছে।

.

ডানা সকালবেলা দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াল। ইচ্ছে মতো জামাকাপড় কিনল। যেখানেই সে যাচ্ছে, লোকজন তার দিকে তাকাচ্ছে। ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর- ইনি হলেন ডানা ইভান্স, এমন কী দোকানের নোকজনও তাকে চিনতে পেরেছে। এত খ্যাতি, এত নাম? না, ডানা কিন্তু এই জনপ্রিয়তাটাকে কিছুতেই মানতে পারছে না।

.

ডানা ব্রেকফাস্ট করেনি, লাঞ্চও খায়নি। খিদে পেয়েছে, খেতে ইচ্ছে করছে না। এখনও মনে নানা আতঙ্কের ভিড়। সে কিছু একটা বিপদের আশঙ্কা করছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে, অপরিচিত লোকের দিকে তাকায়নি, প্রত্যেককেই সন্দেহ হচ্ছে তার। বোধহয় বন্দুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ডানা ভাবল, কেন এমন হচ্ছে আমার?

দুপুরবেলা সে ম্যাক বেকারের অফিসে পৌঁছে গেল।

এখানে কেন এসেছ? এখন তো তোমার ছুটি কাটাবার সময়।

ম্যাক, আমাকে অবিলম্বে কাজে ফিরতে হবে।

ম্যাক, এই তরুণী মেয়েটির মুখের দিকে তাকালেন। কয়েক বছর আগে এই মেয়েটি এসেছিল। বলেছিল, আমার একটা চাকরি চাই। আমি একটা কাজ করছি। বলতে পারেন, সেখান থেকে ট্রান্সফার নেব।

–তোমার বস তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। ম্যাক বলেছিলেন।

তারা লেসলি স্টুয়ার্টের অফিসের দিকে হেঁটে চলল।

.

দুজন মহিলা পরস্পরের মুখোমুখি বসেছেন।

–ডানা, তোমাকে ধন্যবাদ।

–আপনাকেও।

–বসো।

ডানা এবং ম্যাক বসল।

ডানাকে ওখান থেকে নিয়ে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

–হ্যাঁ, ওটা একটা নরক।

লেসলি ম্যাকের দিকে তাকালেন ম্যাক, বলুন ডানাকে নিয়ে আমরা এখন কী করব?

উনি ডানার দিকে তাকালেন। হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি হিসেবে ডানাকে নিয়োগ করতে, হবে। ডানা, তোমার কাজটা কেমন লাগবে?

এটা হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ, ডানা জানে।

 ডানার ঠোঁটে উজ্জ্বল আলো- হ্যাঁ, আমি এটা করতে পারব।

লেসলি বলল, তুমি একাজে লেগে পড়ো।

ডানা উঠে দাঁড়াল, আপনাকে আবার ধন্যবাদ।

–ভালো থেকো কেমন?

ডানা এবং ম্যাক অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।

ম্যাক বললেন–এবার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাক।

তিনি টেলিভিশন বিল্ডিং-এর দিকে হেঁটে গেলেন। সমস্ত কর্মচারী অপেক্ষা করছিল। তারা সকলে ডানাকে অভিনন্দন জানাবে। পনেরো মিনিট সেখানে ডানাকে থাকতে হল।

–এ হল তোমাদের নতুন হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি। ম্যাক ফিলিপ কোলেকে বললেন।

ব্যাপারটা সত্যিই সুন্দর। চলুন আপনার অফিস দেখিয়ে দিচ্ছি।

লাঞ্চ করেছ? ম্যাক জানতে চাইলেন।

না, এখনও করার সময় পাইনি।

–চল, আমরা কিছু খেয়ে নিই।

.

এগজিকিউটিভ ডাইনিং রুম, চতুর্থ তলায়, বেশ বড়ো ঘর, ছাব্বিশখানা টেবিল আছে।

 ম্যাক ডানাকে নিয়ে একটা টেবিলের কাছে চলে গেলেন। সেখানে বসলেন।

মিস স্টুয়ার্টকে দেখে মনে হল অসাধারণ মহিলা। ডানার মন্তব্য।

ম্যাক বললেন–যা, কী খাবে বলো?

–আমার খিদে পায়নি।

–তুমি তো লাঞ্চ খাওনি।

না। ব্রে

কফাস্ট করোনি?

–না।

–ডানা, তুমি কখন শেষ খেয়েছিলে?

–ঠিক মনে পড়ছে না। ব্যাপারটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

-না, ডানা, এভাবে শরীরকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ? তুমি কি চাইছ আমাদের নতুন হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি অনাহারে মারা যাক?

ওয়েটার জানতে চাইলেন–মিঃ বেকার কী খাবেন?

–মেনুকার্ড দেখাও। সামান্য কিছু হলেই চলবে। মিস ইভান্স, তুমি কী খাবে? শুয়োরের মাংস? লেটুস পাতা? টমেটোর স্যান্ডউইচ? নাকি পেস্ট্রি? আইসক্রিম?

না, আমি কিছুই খাব না।

–আচ্ছা, আমাকে বিফ স্যান্ডউইচ দাও।

–ইয়েস স্যার।

ডানা চারদিকে তাকাল। এই সব কিছুকেই অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে। আসল জীবন ওখানে পড়ে আছে। ম্যাক, ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর। কেউ কাউকে দেখার নেই।

-ওটা ভুলে যাও। আমরা কী পৃথিবীকে চালাব? আমরা কী পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করব? যতটা সম্ভব আমরা তো করছি।

-না-না, আমরা কিছুই করছি না।

ডানার কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ।

উনি চুপ করে গেলেন। উনি বুঝতে পারছেন, ডানার মন এখন অনেক দূরে চলে গেছে।

ওয়েটার খাবার নিয়ে এসে হাজির।

খাবার এসে গেছে, স্যার।

–ম্যাক, আমি কিছুই খেতে চাইছি না।

–তোমাকে কিছু একটা খেতেই হবে।

ম্যাকের কণ্ঠস্বরে আদেশ।

জেব কনারসকে দেখা গেল, তিনি এই টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি বললেন হাই ম্যাক।

জেব?

জেব কনারস ডানাকে প্রশ্ন করলেন- হ্যালো?

ম্যাক বললেন–ডানা, ইনি হলেন জেব কনারস। ইনি ট্রিবিউনের স্পোর্টস এডিটর।

 ডানা ঘাড় নাড়ল।

-আমি আপনার মস্তবড়ো ফ্যান মিস ইভান্স। আপনি যে নিরাপদে ফিরতে পেরেছেন তার জন্য ভালো লাগছে।

ডানা আবার ঘাড় নাড়ল।

ম্যাক বললেন–তুমি কি আমাদের সঙ্গে খাবে জেব?

-অবশ্যই।

জেব চেয়ার টেনে ডানার পাশে বসলেন।

–আমি আপনার কোনো ব্রডকাস্ট শুনতে ভুল করি না। ওগুলো অসাধারণ।

ডানা বলল–অনেক ধন্যবাদ।

-জেব মস্তবড়ো অ্যাথলেট। একসময় বেসবলে হল অফ ফ্রেমে ওর নাম ছিল।

ডানা অবাক হয়ে গেছে।

–কখন আপনি ফাঁকা থাকবেন? শুক্রবার? ওদিন কিন্তু জমজমাট খেলা আছে। জেব বললেন।

ডানা জেবের দিকে ভালোভাবে তাকালেন।

ব্যাপারটা সত্যিই উত্তেজনার। এই খেলাটা আমার খুবই ভালো লাগে।

–হ্যাঁ, তবে আপনি আসবেন তো?

ডানা উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে আমি অন্য একটা খেলার কথা ভাবছি। মানুষজন ছুটে পালাচ্ছে, যে কোনো সময় তাদের নিহত হতে হবে। হত্যা- শুধু হত্যার উন্মাদনা।

ডানাকে দেখে মনে হল, সে বুঝি মানসিক রোগিণী হয়ে গেছে।

না, এটা কোনো খেলা নয়, এটা হল এক সত্যি ঘটনা।

 এই ডাইনিং রুমে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অবাক হয়ে ডানার দিকে তাকালেন।

ডানা বলল–আমরা নরকের বাসিন্দা হয়ে যাব কি? অতি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।

জেব ম্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল–আমি খুব দুঃখিত, আমি এভাবে ডানাকে আঘাত দিতে চাইনি।

–এটা তোমার কোনো দোষ নয়, ডানা এখনও স্বাভাবিক হতে পারছে না। জানি না, সে কবে আবার সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে হয়ে উঠবে।

 ডানা অফিসে ঢুকে পড়ল, দরজটা বন্ধ করে দিল। ডেস্কে গেল। বসে রইল। তাকে এখন লড়াই করতে হবে। হায় ঈশ্বর, আমি এভাবে কেন সবার কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করছি। আমি কী এভাবেই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাব নাকি? মানুষকে আক্রমণ করব? কেন আমি আবার সুস্থ সবল জীবনের পথিক হতে পারছি না?  

কয়েক মিনিট পর দরজটা খুলে গেল। কেউ ভেতরে এল। ডানা তাকাল। জেব কনারস। হাতে একটা ট্রে। সেখানে শুয়োরের মাংস, লেটুস, টমেটো স্যান্ডউইচ আছে।

–আপনি লাঞ্চ খেতে ভুলে গেছেন? জেব শান্তভাবে বললেন।

ডানা চোখের জল মুছে বলল–হ্যাঁ,হা, আমি এর জন্য দুঃখিত।সত্যি আমার খুবই খারাপ লাগছে। আপনাকে কষ্ট দিলাম।

-না-না, এতে আপনার অধিকার আছে, জেব বললেন–কে আর এই পুরোনো বেসবল খেলা দেখতে চায় বলুন?

জেব ডেস্কের ওপরে ট্রে-টা রাখলেন। আমি কি আপনার সঙ্গে লাঞ্চ খেতে পারি?

–আমার খিদে পায়নি। আপনাকে ধন্যবাদ।

 দীর্ঘশ্বাস- আপনি আমাকে একটা বিচ্ছিরি অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। ম্যাক বলেছেন, আপনাকে খাওয়াতে হবে। আপনি খেতে চাইছেন না, আমি কী করি বলুন তো?

 ডানার মুখে হাসি-না, কোনো ক্ষতি নেই। শেষ পর্যন্ত ডানা স্যান্ডউইচের খানিকটা তুলে নিল। ছোট্ট কামড় দিল।

-না-না, আর একটু বেশি খান।

ডানা আর একটা ছোট্ট কামড় দিল।

দুজনে তাকিয়ে আছে। শেষ অব্দি ঠিক হল, ডানা খেলাটা দেখতে যাবে।

.

দুপুর তিনটে বেজেছে। ডানা হোয়াইট হাউস এনট্রান্সে ঢুকে পড়েছে। গার্ড বলল–মিঃ ট্যাগার, আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব। মিস ইভান্স, আমি কি কাউকে দেব?

কয়েক মিনিট কেটে গেছে। একজন গাইড ডানাকে লম্বা করিডর পার করে পিটার ট্যাগারের অফিসে নিয়ে গেছে।

–মিঃ ট্যাগার।

–এত তাড়াতাড়ি আপনার সঙ্গে দেখা হবে আমি ভাবতেই পারিনি মিস ইভান্স।

–আমাকে কাজ করতে হবে, আমি কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালোবাসি।

–বসুন। আমি আপনার জন্য কিছু আনব কি?

–না, এই মাত্র লাঞ্চ করে এসেছি।

 জেব কনারসের কথা মনে পড়ল।

ডানা বলল–মিঃ ট্যাগার, আপনাকে এবং প্রেসিডেন্ট রাসেলকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি জানি, ট্রিবিউন প্রেসিডেন্ট রাসেলের প্রতি খারাপ ব্যবহার করেছে, আমি সেজন্য আন্তরিক দুঃখিত।

পিটার ট্যাগার হাত তুললেন-না-না, এসব ব্যাপারের মধ্যে রাজনীতিকে জড়াবেন না। আপনি হেলেন অফ ট্রয় গল্পটা জানেন তো?

হ্যাঁ।

মুখে হাসি তাহলেই বুঝতে পারছেন, আমরা একটা যুদ্ধ শুরু করতে চলেছি। ইতিমধ্যে আপনি এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়েছেন।

–না, আমি নিজেকে মোটেই তা মনে করি না।

প্রেসিডেন্ট আর আমি আপনার কথা শুনেছি। শুনেছি, আপনাকে নাকি হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।

-হ্যাঁ, অনেক ধন্যবাদ।

 ট্যাগার একটুখানি চুপ করলেন-ট্রিবিউন প্রেসিডেন্ট রাসেলকে পছন্দ করে না, ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক। আপনার এতে কোনো কিছুই করার নেই। তবু বলব, আপনি একটু দেখবেন আমরা যাতে একে অন্যের পরিপূরক হতে পারি।

-হ্যাঁ, আমি চেষ্টা করব।

 দরজা খুলে গেল, অলিভার ঢুকলেন। ডানা এবং পিটার উঠে দাঁড়ালেন।

বসুন, বসুন। অলিভার বললেন। তিনি এগিয়ে গেলেন, ডানাকে বললেন, আমেরিকা আপনাকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাচ্ছে।

-ধন্যবাদ মিঃ প্রেসিডেন্ট। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

অলিভারের মুখে হাসি–আমি কারোর জীবন বাঁচাবার জন্য চেষ্টা করেছি, তাতে কী হল? সত্যি কথা বলতে কী মিস ইভান্স, আমি কিন্তু আপনার সংবাদপত্রের পাঠক নই। তবে অন্য সকলে এই কাগজটা খুবই ভালোবাসে।

–অনেক ধন্যবাদ।

-পিটার আপনাকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাবে। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে বলবেন কিন্তু।

-হ্যাঁ, আপনার মহানুভবতার জন্য ধন্যবাদ।

.

সেক্রেটারি অফ স্টেটের প্রাইভেট কনফারেন্স রুম। অন্তত বারোজন বসে আছেন। ডানা তার অভিজ্ঞতার কথা বলে চলেছে।

সারাজেভোতে বেশির ভাগ বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বাড়ি এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। আলো নেই, মানুষ নরকের অন্ধকারে বেঁচে আছে। কার ব্যাটারির আলোতে পথ চলতে হয়। এই ব্যাটারি দিয়েই টেলিভিশন সেট চালানো হয়।

… রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা, মাঝে মধ্যে পাথরের টুকরো পড়ে আছে। অটোমোবাইলে আগুন জ্বলছে। হেঁটে যেতে হচ্ছে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায়।

… বৃষ্টি হলে সেই জল মানুষ ধরে রাখে। সেই জলই খেতে হয়।

… রেডক্রশের প্রতি ভালোবাসা নেই। সাংবাদিকদের ঘেন্না করা হয়, বসনিয়া যুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে জনা চল্লিশ সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হয়েছে। অন্তত কয়েকশ জনকে আহত হতে হয়েছে। বুঝতে পারা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কী হবে।

দুঘণ্টা ধরে এই আলোচনা চলেছিল। ডানা মন খুলে সব কথা বলে দিল, যা যা ঘটেছে।

সেক্রেটারি অফ স্টেট বললেন–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মিস ইভান্স। এই খবরগুলো পাওয়া খুবই দরকার ছিল। এখানে যে আপনি ভালোভাবে ফিরতে পেরেছেন, তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

.

শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা। ডানা জেব কনারসের পাশে বসে আছে। প্রেস বক্সে। বেসবল খেলা শুরু হয়েছে। ফেরার পর এই প্রথম ডানা একটু ছুটি পেয়েছে। যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু ভাববার অবসর। দুরন্ত গতিতে খেলাটা এগিয়ে চলেছে। নানা শব্দ শোনা যাচ্ছে।

জেব জানতে চাইলেন- ডানা, বলুন তো খেলাটা আপনার ভালো লাগছে কিনা?

 ডানা অবাক চোখে জেবকে নিরীক্ষণ করে বলল–হ্যাঁ, খুবই ভালো লাগছে।

.

ওয়াশিংটন ডিসি, খেলাটা শেষ হয়ে গেছে। প্রিয় দল জিতেছে।

–আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন। ডানা বলল। আমি এমন একটা পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলাম, যেখানে সুন্দর জীবন বলতে কিছু নেই।

ডানা নিজেকে ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারছেনা। তারপর কোনোরকমে বলল—ওখানে সর্বত্র জীবন আর মৃত্যুর খেলা। ব্যাপারটা ভাবতে গেলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। যুদ্ধ আমাদের কত সর্বনাশ করে, জেব, আপনি তা বুঝতেই পারবেন না।

জেব বললেন–ডানা, আপনাকে তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। নতুন করে পা ফেলতে হবে। এখানে এবং এখন থেকে।

–আমি জানি। কয়েকটা সময় দিন। ব্যাপারটা খুব একটা সহজ নয়।

–আমি সহযোগিতা করতে রাজী আছি। আপনি কি আমার সাহায্য নেবেন?

ডানা অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–ঠিক আছে, আপনি কি আমার বন্ধু হবেন?

.

পরের দিন, ডানা জেব কনারসের সঙ্গে লাঞ্চের টেবিলে বসেছে।

জেব জানতে চাইলেন আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে কি?

 ডানা মুখ নামাল। বোঝা গেল, এই প্রস্তাবে তার সম্মতি আছে।

একটু বাদে জেবকে দেখা গেল একদল বেসবল খেলোয়াড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে। তাদের বয়স নয় থেকে তেরো। তারা বিভিন্ন রকম ইউনিফর্ম পরেছে। সবকিছু ভালোভাবে দেখল।

জেব বললেন, মনে রাখবেন, কোনো কাজে তাড়া করবেন না। আসুন আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। সবকিছু।

শুরু হল এক নতুন জীবন।

একটা ছেলে জিজ্ঞাসা করল–জেব, এই কি সেই ভদ্রমহিলা?

 জেব হাসল, আমি জানি না, ভাগ্য আমার সহায় হবে কিনা।

ডানা বলল–দেখছি, আপনি নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন।

-হ্যাঁ, ওরা ভালো ছেলে। সপ্তাহে একদিন আমি ওদের মধ্যে কাটাই।

হঠাৎ কামালের মুখখানা মনে পড়ে গেল ডানার। কেন? সে নিজেই জানে না।

.

দিন এগিয়ে চলেছে। ডানা এবং জেব কনারস পরস্পরের কাছাকাছি এসে গেছে। জেবকে এক বুদ্ধিমান পুরুষ বলা যায়। স্পর্শকাতর, আমুদে এবং কৌতুক প্রিয়। জেবের সাহচর্য ডানার ভালোই লাগে। ধীরে ধীরে সারাজেভোর ভয়ংকর স্মৃতিটা তার মন থেকে মুছে গেল। সকাল এল অজস্র আলোর উৎসব নিয়ে। ডানার ঘুম ভেঙে গেল। না, কাল রাতে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেনি সে।

জেবকে সব কথা বলল।

 জেব বলল–এই তো, আমার ছোট্ট মেয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে।

ডানা ভাবতে পারছে না, এই কথার অন্তরালে অন্য কোনো অর্থ আছে কিনা।

.

হাতে লেখা একটা চিঠি, অফিসে পড়ে আছে। ডানার জন্য অপেক্ষা করছে। লেখা আছে–মিস ইভান্স, আমার জন্য ভাববেন না। আমি ভালোই আছি। আমি খুব একা। তবে এখানে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। আমি ওই জামাকাপড়গুলো আপনাকে ফেরত পাঠাব। এখন আর সেগুলোর দরকার নেই। আমার নিজস্ব জামাকাপড় আছে, গুডবাই।

তলায় কামালের নাম লেখা।

প্যারিস থেকে চিঠিখানা ছাড়া হয়েছে। একটা ঠিকানা লেখা আছে।

ডানা দুবার চিঠিখানা পড়ল। তারপর টেলিফোনটা তুলে নিল। চার ঘণ্টা বাদে কামালের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে।

কামালের গলা- হ্যালো?

কামাল, আমি ডানা ইভান্স।

 কোনো উত্তর নেই।

–তোমার চিঠিখানা পেয়েছি।

কোনো উত্তর নেই।

-তোমার চিঠি পেয়ে আমার খুবই ভালো লেগেছে। তুমি ভালোভাবে সময় কাটাচ্ছ? আহা, তোমার ওই সুখ যেন বরাবর বজায় থাকে। তুমি কি বুঝতে পারছ, আমার মনের অবস্থা কেমন? আমার ভালো লাগছে না, তোমার কথা মনে পড়ছে।

কামালের কণ্ঠস্বর- না, আমার জন্য চিন্তা করতে হবে না। আমার জন্য ভাববেন না।

–তুমি ভুল বলছ, তোমার কথা আমার সবসময় মনে থাকবে। তুমি কি ওয়াশিংটনে আসবে? আমার সঙ্গে থাকবে?

দীর্ঘক্ষণ নীরবতা–সত্যি? সত্যি আপনি তাই চাইছেন?

–কামাল, প্রস্তাবটা কেমন?

কান্নার শব্দ।

কামাল তুমি আসবে?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ, ম্যাডাম।

–আমি ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।

মিস ইভান্স?

–কী বলো?

–আমি আপনাকে সত্যি ভালোবাসি।

.

ডানা এবং জেব কনারস হাঁটছে ওয়েস্ট পোটোম্যাক পার্কে।

ডানা বলল–আমি শিগগিরই একজন রুমমেটকে পাচ্ছি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে চলে আসছে।

জেব অবাক হয়ে বলল–তার মানে? তুমি কার কথা বলছ?

 ডানা বলল–হ্যাঁ, তার নাম কামাল। বারো বছরের একটি দুষ্ট ছেলে।

ডানা পুরো গল্পটা বলল।

গল্পটা শুনে জেব অবাক হয়ে গেলেন । ২য়, পৃথিবীতে এখনও কতরকম মানুষ আছে।

সেই রাতে ডানা আর জেব প্রথম ভাললাবাসা বিনিময় করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *