১. লেসলির ডায়েরি

দি বেস্ট লেড প্ল্যানস (ভয়ংকর ষড়যন্ত্র) — সিডনি সেলডন

গল্প শুরুর আগে

 ওই পুরুষটি চেয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত শক্তিকে মুঠো বন্দী করতে। মেয়েটি চেয়েছিল প্রতিশোধ নিতে। প্রিয় দিনপঞ্জিকা–এই সকালে এমন একজনের সঙ্গে আমার দেখা হল, যাকে আমি বিয়ে করতে চলেছি।

এভাবেই এক তরুণীর দিন যাপনের ইতিকথা লেখা হয়েছে। সে জানতো না একটু বাদেই কি ঘটনা ঘটতে চলেছে।

তার নাম লেসলি স্টুয়ার্ট, সে অসাধারণ রূপসী এবং তার দুচোখে স্বপ্নের ইশারা, সে জেনেছিল পুরুষের হাতেই পৃথিবীর সব শক্তি লুকিয়ে থাকে।

অলিভার রাসেল, দক্ষিণ অঞ্চলের একটি ছোট্ট প্রদেশের গভর্নর। শেষপর্যন্ত তিনি তার তীব্র নারীতৃষ্ণার কারণ অনুসন্ধানে সফল হয়েছিলেন কী?

এভাবেই সিডনি সেলডন মানুষের ব্যক্তিগত আশা আকাঙ্খকে নিয়ে এক রহস্য রোমাঞ্চ ভরা কাহিনী শুরু করেছেন। অলিভার চেয়েছিলেন হোয়াইট হাউসের যুদ্ধে জয়লাভ করতে। লেসসির ইচ্ছে ছিল অলিভারকে এমন আনন্দ দিতে যা তিনি কখনও পাননি। এভাবেই তাদের দুজনের মধ্যে এক অসম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শুরু হয় ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্র..

.

০১.

লেসলির ডায়েরিটা শুরু হয়েছিল এইভাবে প্রিয় ডায়েরি, এই সকালে এমন একজন পুরুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে যাকে আমি বিয়ে করবো।

সহজ সরল স্বীকারোক্তি। কিন্তু, লেসলি কী জানতো এর পরের ঘটনা পরম্পরা তাকে কোন পথের পথিক করে দেবে!

.

দিনটা একই রকমভাবে শুরু হয়েছে। লেসলির মনে একই রকম আশা ও আনন্দ। জ্যোতিষীকে সে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না। কিন্তু সেদিন সকালবেলা লেক্সিংটন হেরাল্ড লিডার। পত্রিকাতে সে একটা প্রতিবেদন দেখে অবাক হয়ে গেল। বিখ্যাত জ্যোতিষীর লেখা প্রবন্ধ বলা হয়েছে–এবার আপনার জীবনে নতুন চাঁদের উদয় হবে। আপনার প্রভাব প্রতিপত্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। ২৩শে জুলাই থেকে ২২শে আগস্ট–সব বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। আজকের দিনটা আপনার কাছে লাল অক্ষরের দিন হবে। এর জন্য প্রস্তুত হন, এটাকে পুরো উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন।

লেসলি ভাবল, আজ কী ঘটবে? আকাশের দিকে তাকালেন, একই রকম মেঘের খেলা। একই রকম গতানুগতিক জীবন।

লেসলি লেক্সিংটন কোম্পানির পাবলিক রিলেশনস এগজিকিউটিভ। আজ সারাদিন তাকে অত্যন্ত কর্মব্যস্ততার মধ্যে কাটাতে হবে। তার মধ্যে…

.

কুড়ি বছরের মেয়েটি ছিল অত্যন্ত আবেদনী চেহারার অধিকারিনী। যে কোনো পুরুষ তাকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেত। হ্যাঁ, তার অসম্ভব আমন্ত্রণী চেহারা সকলকে আকর্ষণ করতো। চোখের তারায় কি এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলা করতো। চুলের রং মধুর মতো, যথেষ্ট লম্বা এবং আকর্ষণীয়। লেসলির এক ঘনিষ্ট বান্ধবী তার কানে কানে শুনিয়ে ছিল সেই গোপনমন্ত্র–তুমি সুন্দরী, তোমার মাথাটা খুব পরিষ্কার, তোমার স্ত্রী-অঙ্গটিও সুন্দর। একদিন তুমি পৃথিবীর রানী হবে।

লেসলি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, বুদ্ধ্যাঙ্ক পৌঁছে গেছে একশো সত্তরের ঘরে। কিন্তু এই রূপ? এটা কি আমার চলার পথের অন্তরায়?

পুরুষেরা তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায় না, তাদের চোখের তারায় শুধুই আমন্ত্রণী ইশারা ফুটে ওঠে।

ওই কোম্পানিতে আর দুজন পুরুষ সেক্রেটারী কাজ করে, অর্থাৎ লেসলি সেখানকার একমাত্র মহিলা। সব মিলিয়ে পনেরো জন পুরুষ কর্মচারি আছে। তাদের মধ্যে লেসলিকে নানা অস্বস্তিকর পরিবেশের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে সে সব ব্যবস্থার সাথে আপস করতে সমর্থ হয়েছে।

.

একজন পার্টনার, জিম বেলি। বছর চল্লিশ বয়স। আরেকজন আল টমকিন্স। বয়সে জিমের থেকে দশ বছরের ছোটো। লেসলিকে পটাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লেসলি সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

এমন কি একদিন রেগে গিয়ে লেসলি বলেছিল–বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হব।

গল্পটা সেখানেই শেষে হয়ে গেছে। আল জানতেন, এই সংস্থায় লেসলি একটি উজ্জ্বল রত্ন।

মনে পড়ে যায়, চাকরিতে যোগ দেবার পর প্রথম সপ্তাহ। কফি খেতে খেতে লেসলি তার বান্ধবীদের জোকস শোনাচ্ছিল।

–এক পরীর গল্প। তিন পুরুষ গিয়েছিল এক পরীর কাছে। প্রথম পুরুষ বলেছিল–হে পরী, তুমি আমাকে পঁচিশ শতাংশ বুদ্ধিমান করে দাও। আবেদন মঞ্জুর হয়।

দ্বিতীয় পুরুষটির ইচ্ছে ছিল, পঞ্চাশ শতাংশ বুদ্ধির। তার আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল।

 তৃতীয় পুরুষ বলেছিল, আমাকে একশো শতাংশ বুদ্ধিমান করো।

মুহূর্তের মধ্যে সে এক নারীতে পরিণত হয়।

 লেসলি জানে এই আপাত কৌতুকের অন্তরালে কোন সত্যিটা লুকিয়ে আছে।

.

সকাল এগারোটা। জিম বেলি লেসলির ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করলেন।

তিনি বললেন–আমাদের একটা নতুন ক্লায়েন্ট আসছেন। আমি চাইছি তুমি এই ব্যাপারটা দেখাশোনা করো।

লেসলির ঘরে অনেক ফাইলের বোঝা। তা সত্ত্বেও নতুন একটি?

 লেসলি জানতে চেয়েছে–কে?

–তুমি কি অলিভার রাসেলের নাম শুনেছো?

প্রত্যেকেই অলিভার রাসেলের নাম জানে। স্থানীয় অ্যাটর্নি, গভর্নর পদের প্রার্থী। কেনটাকির সর্বত্র অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব। অসাধারণ পটভূমি আছে তার, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স, এই প্রদেশের সবথেকে স্মরণযোগ্য ব্যাচেলার বলা হয় তাকে। টেলিভিশনের পর্দায় মাঝেমধ্যে তার মুখ ভেসে ওঠে। স্থানীয় রেডিও স্টেশনে তার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। ভারী সুন্দর চেহারা তাঁর। কালো এলোমেলো চুল, কালো দুটি চোখের তারা। অ্যাথলেটের মতো সুগঠিত দেহ। মুখে উষ্ণ হাসি। বলা হয় তিনি নাকি লেক্সিংটন শহরের সব মেয়েকেই শয্যাসঙ্গিনী করেছেন।

মুহূর্তের মধ্যে এতগুলো কথা মনে পড়ে গেল লেসলির। লেসলি জানতে চাইল হ্যাঁ, ওঁর নাম আমি শুনেছি। কী করতে হবে?

উনি যাতে কেনটাকির গর্ভণর হতে পারেন, তার জন্য সাহায্য করতে হবে। উনি এখুনিএখানে এসে পড়বেন।

.

কয়েক মিনিট পরেই অলিভার রাসেল পৌঁছে গেলেন। ফোটোগ্রাফির থেকেও আরো আকর্ষণীয় তার চেহারা।

লেসলির সাথে তাকে পরিচিত করানো হল। তিনি বললেন–তোমার কথা অনেক শুনেছি, তুমি আমার প্রচার পরিকল্পনার দায়িত্ব নেবে ভাবতেই কেমন ভালো লাগছে।

–লেসলি ভেবেছিল, ভদ্রলোক বোধহয় অহংকারি হবেন। কিন্তু না, তার মধ্যে একটা অদ্ভুত চুম্বক ক্ষমতা আছে।

লেসলি জানতে চেয়েছিলেন একবারে প্রথম থেকেই শুরু করি কেমন। মিস্টার, আপনি কেন গভর্নর হতে চাইছেন?

ব্যাপারটা খুবই সোজা, কেনটাকি এক অসাধারণ রাজ্য। আমরা এখানে বাস করি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশের কাছে এই রাজ্যটার আলাদা কোনো সম্মান নেই। আমার মনে হয় বারোটা প্রদেশ মিলেও যা দিতে পারবে না, কেনটাকিএকাই তা দিতে পারবে। আমাদের দেশের মহান ইতিহাস এই রাজ্য থেকেই শুরু হয়েছিল। এখানেই আমরা প্রাচীনতম বাড়িটি বানিয়েছি। কেনটাকি থেকেই দুজন প্রেসিডেন্টের আবির্ভাব ঘটেছে। এই রাজ্যের প্রকৃতি উজার করে দিয়েছে অসাধারণ সম্পদ। এখানে উত্তেজক ভিলা আছে, কল্লোলিনী নদী আছে, আছে অসাধারণ তৃণক্ষেত্র। আমি চাই পৃথিবীর সর্বত্র এই রাজ্যের কথা পৌঁছে যাক।

নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস, প্রতিটি শব্দ ঠিকরে বেরোচ্ছে। লেসলি বুঝতে পেরেছিল, নাঃ, ভদ্রলোক হয়তো কাজে সফল হবেন।

তখনই ওই জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী–নতুন চাঁদ এসে তোমার জীবনটাকে আলোকিত করে দিক।

.

অলিভার চলে গেলেন। লেসলি জিম বেলির অফিসে ঢুকল স্যার, ওঁকে আমার ভালো লেগেছে। আমার মনে হচ্ছে উনি এই যুদ্ধে জয়লাভ করবেন।

জিম চিন্তিতভাবে তাকিয়ে বললেন–ব্যাপারটা অত সহজ নয়।

-কেন?

–আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। তুমি রাসেলকে সর্বত্র দেখে থাকবে, বিল বোর্ডে এবং টেলিভিশনে।

–তাতে কী হয়েছে?

–এই ব্যাপারটা বন্ধ করতে হবে।

–কেন?

রাসেলকে ঘিরে অনেক গুজব। কেউ কেউ বলে থাকেন রাসেলের অন্তরালে কালো টাকার খোঁজ আছে। এই ব্যাপারটা তার ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে।

কিন্তু, আমার তো মনে হয় উনি খুবই আত্মপ্রত্যয়ী।

–আমি জানি।

উনি কেন আমাদের কাছে এসেছেন?

–ওঁর সাহায্য দরকার ছিল। উনি প্রচার পরিকল্পনার জন্য আমাদের নিযুক্ত করেছেন। হয়তো গভর্নর অ্যাডিসনের কথা ওঁর মনে ছিল। গত দুসপ্তাহের রেকর্ড দেখো। রাসেল কিন্তু ক্রমশই পেছনের দিকে চলে যাচ্ছেন। উনি এক বিখ্যাত আইনজীবী।

-তাতে কী হয়েছে? ব্যাপারটা আরো ভালোভাবে বুঝতে হবে।

সেই রাতে লেসলি নতুন ডায়েরিতে লিখেছিল–প্রিয় ডায়েরি, এই সকালে এমন একজনের সাথে আমার দেখা হয়েছে, যাকে আমি বিয়ে করবো!

লেসলির ছোটোবেলা–অসম্ভব বুদ্ধিমতী, বাবা ছিলেন ইংরাজির অধ্যাপক, মা গৃহকত্রী। লেসলির বাবা যথেষ্ট সুপুরুষ, দেশপ্রেমি এবং বুদ্ধিজীবী, মেয়েকে যত্ন করতেন। তারা কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। মেয়েকে ডাকতেন ছোট্ট খুকি বলে। ছোটো থেকেই লেসলি অসাধারণ রূপসী। তার সুস্নাত ব্যবহার সকলকে আকর্ষণ করতো। চোখের সামনে কোনো খারাপ সে দেখতে পারতো না। নবছরের জন্মদিন, বাবা তার জন্য বাদামী ভেলভেটের সুন্দর পোশাক এনেছিলেন, লেসের ঝালর দেওয়া। এই পোশাক পরে যখন লেসলি ঘুরে বেড়াতো, মনে হতো সে বুঝি সত্যিই এক জলপরী।

এক সকাল, লেসলির জীবনটা হারিয়ে গেল। মা বললেন, কাঁদতে কাঁদতে ডার্লিং, তোমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

লেসলি বিশ্বাস করতে চায়নি বাবা কবে ফিরে আসবে?

-সে আর কখনও আসবে না।

 প্রতিটি শব্দ বুঝি তীক্ষ্ণ ছুরির আঘাত।

লেসলি ভেবেছিল, মা বুঝি বাবাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মায়ের জন্য দুঃখ, বিবাহ-বিচ্ছেদের আকাঙ্খ, আইনের ঝামেলা।

দিন কেটে সপ্তাহ, সপ্তাহ কেটে মাস। প্রতি মুহূর্তে লেসলির চিন্তা, টেলিফোনের ঝনঝনাৎ শব্দ, বাবার কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই শুভক্ষণ কখনও এল না।

লেসলির এক বৃদ্ধা কাকিমা সবকিছু বললেন। তিনি বললেন, লেসলির বাবা এক বিধবার প্রেমে পড়েছেন। ভদ্রমহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। লেসলির বাবা তার সঙ্গে চলে গেছেন ওই মহিলার বাড়িতে, লাইসটোন স্ট্রিটে। একদিন বাজারের পথে লেসলির মা বাড়িটা দেখিয়েছিলেন। কণ্ঠে তিক্ত আভাস।

লেসলি ভেবেছিল বাবার সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু, সেটা কি সম্ভব?

শুক্রবার, স্কুলের পরে লেসলি গিয়ে হাজির হল লাইসটোন স্ট্রিটের ওই বাড়িতে। ডোরবেল বাজিয়ে দিল। দরজা খুলে গেল, লেসলির বয়েসী একটি মেয়ে। লেসলি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালে। একই রকম বাদামী ভেলভেটের পোশাক, লেসের ঝালর।

ছোট্ট মেয়েটি বলল–তুমি কে?

ভয়ে লজ্জায় অপমানে লেসলি পালিয়ে গেল। 

.

বছর কেটে গেল, মা নিজের কাজে ব্যস্ত। জীবনের প্রতি উদাসীন। লেসলি বুঝতে পারলো, দিন অবসান হবে। লেসলি দেখতে পেল, মৃত্যুর সাথে মায়ের লড়াই। তারপর? মায়ের মৃত্যু, ভাঙা হৃদয়ের অন্বেষণ।

লেসলি বুঝতে পেরেছিল, পৃথিবীর সব পুরুষ এভাবেই বিশ্বাসঘাতকের কাজ করে।

মায়ের মৃত্যু, লেসলি এবার এল তার কাকিমার বাড়িতে। পড়াশোনা করল ভালোভাবে। কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হল। তখনই সে অসামান্যা রূপসী। বিভিন্ন মডেল কোম্পানি তার পাশে ঘুর ঘুর করছে। ছোট্ট দুটি প্রেম পর্ব, একজন কলেজের ফুটবল হিরো, অন্যজন অর্থনীতির অধ্যপক। দুজনেই লেসলিকে বিরক্ত করেছিল। আসলে লেসলি ছিল তাদের থেকে বেশি বুদ্ধিমতী।

স্নাতক ডিগ্রি পাবার আগে কাকিমার মৃত্যু হল। লেসলি বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে কাজের জন্য আবেদন করল। চাকরি পেল বেলি অ্যান্ড টমকিন্স এজেন্সিতে। শুরু হল নতুন জীবন।

তারপর? তারপর আর কী!

.

সেক্রেটারী হিসেবে লেসলির কাজ শুরু হয়। তাকে সমস্ত মিটিং-এ যোগ দিতে হতো। সে চিন্তা করতে কীভাবে বিজ্ঞাপনের পরিকল্পনাগুলোকে আরও তীক্ষ্ণ করা যেতে পারে। মাঝে মধ্যে ছোটো ছোটো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতো।

এভাবেই তার কর্মধারা আরও সফল হয়ে ওঠে। তারপর? তারপর আরেকটু পদোন্নতি!

.

পরের সপ্তাহে একটি মিটিং, নতুন একটা বিউটি সোেপ বাজারে এসেছে। সেটা জনগণের মধ্যে প্রচার করতে হবে।

কিন্তু কীভাবে?

বলা হল এই বিউটি সোপটা সুন্দরীরা মাখতে পারে।

লেসলি বলেছিল- এইভাবে না, বলতে হবে এটা সকলের জন্য। যে কোনো কুৎসিতকে আমরা এই সাবান মাখিয়ে সুন্দরী করবো।

হ্যাঁ, লেসলির ঘোষণাই জয়যুক্ত হল।

এক বছর কেটে গেছে, লেসলি তখন জুনিয়র কপিরাইটার।দুবছর পর সে হল অ্যাকাউন্ট এগজিকিউটিভ। তখন তাকে বিজ্ঞাপন এবং পরিকল্পনা দুদিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হচ্ছে।

.

অলিভার রাসেল, লেসলির এজেন্সির সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। অলিভারের পদার্পণের পর দুসপ্তাহ কেটে গেছে। বেলি ভেবেছিলেন, ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া উচিত। ভদ্রলোক হয়তো ঠিকমতো অর্থ দিতে পারবেন না। কিন্তু লেসলি এই ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।

.

ট্র্যাঙ্গেল পার্কের একটি বেঞ্চ, লেসলি এবং অলিভার বসে আছেন। ভারী সুন্দর একটি সকাল। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে লেকের দিক থেকে।

অলিভার বললেন আমি রাজনীতি ঘেন্না করি।

লেসলি তাকালো অবাক চোখে তাহলে কেন এই জগতে?

–আমি ব্যবস্থাটার পরিবর্তন চাইছি। এটা আমার ভালো লাগছে না। যে সমস্ত মানুষ এই দেশটাকে চালাচ্ছেন, তাদের মাথায় বুদ্ধি নেই, পরিকল্পনা নেই, সফলতার আকাঙ্খ নেই। এ ব্যবস্থাটাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করব।

অলিভার বলে চলেছেন, লেসলি অবাক বিস্ময়ে সব কিছু শুনছে। সত্যি, ভদ্রলোকের জ্ঞানের বহর দেখলে অবাক হতে হয়। এমন মানুষকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আহা, উনি কবে সেনেটর হবেন। হয়তো একদিন…

.

অলিভারের প্রচার পরিকল্পনাটা মোটেই ভালো নয়। খুব একটা পয়সা-কড়ি নেই, কর্মচারিদের বেতন দিতে পারেন না। টেলিভিশনের সাহায্য নেই, রেডিও নেই, কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন নেই। এখন যিনি গভর্নর, সেই গ্যারি অ্যাডিসনের সঙ্গে লড়াই করা কী করে সম্ভব? ভদ্রলোক যথেষ্ট পরিচিত, অসামান্য ভাবমূর্তির অধিকারী। লেসলি অলিভারকে নানা কথা বলেছিল, বলেছিল অলিভার যেন কোম্পানি পিকনিকে অংশ নেন। ফ্যাক্টরি পরিভ্রমণ করেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কিন্তু এভাবে কী এগোনো যেতে পারে?

একদিন জিম বেলি লেসলির কাছে জানতে চাইলেন- তুমি কি ওর রেজাল্ট দেখেছো? নাঃ, অলিভারের কোনো আশা নেই। আরও–আরও নীচে নেমে গেছেন তিনি।

লেসলি ভেবেছিল, না, এই ডুবন্ত মানুষটাকে উদ্ধার করতেই হবে।

.

ডিনারের আসর, লেসলি এবং অলিভার।

অলিভার শান্তভাবে জানতে চাইলেন–আমার পরিকল্পনা কী ব্যর্থ হয়েছে?

লেসলি বলেছিল- এখনও অনেক সময় আছে। আগে, ভোটারদের মন বোঝার চেষ্টা। করুন।

-তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি আমার জন্য অনেক করেছে।

 লেসলি তাকালো অলিভারের চোখের দিকে। আহা, এমন সুন্দর সুপুরুষ।

লেসলি ভাবল, কীভাবে আমি আরও বেশি সাহায্য করবো?

যখন লেসলি উঠে দাঁড়াল, এক পরিবার সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক বললেন–অলিভার, আপনি কেমন আছেন?

অলিভার হাতে হাত দিলেন। হ্যালো পিটার, এ হল লেসলি স্টুয়ার্ট, আর এ হল পিটার ট্যাগার।

ট্যাগার লেসলির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হ্যালো লেসলি। এ হল আমার বউ বেটলি, এ হল এলিজাবেথ আর ও হচ্ছে রেবেকা।

অহংকার আর গর্ব ঝরে পড়ছে তার গলা থেকে ছিটকে আসা প্রতিটি শব্দে।

 পিটার ট্যাগার অলিভারের দিকে তাকালেন। কী হচ্ছে? কেন এমন হচ্ছে বলো তো?

–আমি বুঝতে পারছি না পিটার।

–তুমি আরেকটু ভালোভাবে চেষ্টা করো। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে।

এভাবেই শেষ হল এই সংলাপ।

.

লেসলি থাকে একঘরের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে। লেক্সিংটন শহরের একপ্রান্তে। তারা যখন বাড়িটার দিকে এগোচ্ছে, অলিভার বললেন–লেসলি, মনে হচ্ছে এটা এমন একটা যুদ্ধ যেখানে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আমি ভাবছি ব্যাপারটার এখানেই ইতি ঘটাবো।

না, লেসলির কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতা অলিভারকে অবাক করেছে, আপনি পালাতে পারবেন না। আমরা আবার নতুনভাবে শুরু করবো।

অলিভারের বিস্মিত চোখ- তুমি বলছো? আবার শুরু করা যাবে?

–হ্যাঁ, আমি আন্তরিকভাবে বলছি।

অলিভার লেসলির অ্যাপার্টমেন্টে এলেন। লেসলি তাকালো তার চোখের দিকে–আপনি কি ভেতরে আসবেন?

দৃষ্টি বিনিময়ের পর হ্যাঁ, আসছি।

কী করা উচিত? লেসলি ছটফট করছে। কিন্তু? এভাবেই কী শুরু হতে পারে?

হ্যাঁ, বন্য আবেগ এবং উন্মাদনা। সময় অনন্তকাল। মনে হল এমন আনন্দ লেসলি এর আগে কখনও পায়নি।

সমস্ত রাত তারা এক সঙ্গে কাটিয়েছিল। ব্যাপারটার মধ্যে যাদু ছিল। অলিভার সব কিছু দিয়েছেন, আনন্দ-সুখ-সন্তুষ্টি। এক বুনো জন্তু, লেসলি ভেবেছিল, হে ঈশ্বর, আমি কেমন যেন হয়ে গেলাম।

.

সকাল হয়েছে, কমলালেবুর জুস, গরম ডিম সেদ্ধ, টোস্ট এবং শুয়োরের মাংস। লেসলি বলেছিল–শুক্রবার গ্রিন লেভার লেকে একটা পিকনিকের আসর। অনেক মানুষের সমাবেশ। আমি আপনার জন্য সবকিছু করে রাখবে। আপনি ভাষণ দেবেন। রেডিওতে কিছুটা সময় কিনতে হবে। সকলের কাছে এই ভাষণ পৌঁছোতে হবে।

না, প্রতিবাদ, অত টাকা আমার পকেটে নেই।

–কেন? কীসের চিন্তা? এজেন্সি টাকা দেবে।

এজেন্সি দেবে না, লেসলি জানতো। জিম বেলির সঙ্গে কথা বলা যায় কী? বুঝতে পারা যাচ্ছে না। কিন্তু লেসলির একান্ত ইচ্ছে, প্রচারটা এভাবেই শুরু হোক।

.

পিকনিকে দুশো মানুষের সমাবেশ। অলিভারের ভাষণ অসাধারণ।

তিনি বলেছিলেন–এই দেশের অর্ধেক তোক ভোট দেয় না। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশের মধ্যে এখানে ভোটের হার সবথেকে কম। যদি পরিবর্তনটা আপনারা সত্যি সত্যি চান, তাহলে নাগরিকের দায়িত্ব পালন করুন। আরেকটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আপনি ইচ্ছে করলে আমার বিরুদ্ধ প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারেন। তবে অবশ্যই আপনার মত প্রকাশ করুন। এটাআমাদের মহান গণতান্ত্রিক অধিকার।

হাততালি আর হাততালি!

.

একটির পর একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অলিভার যোগ দিচ্ছেন। তিনি ছোটোদের একটা ক্লিনিকের শুভ উদ্বোধন করলেন। একটা সেতু জনগণের হাতে তুলে দিলেন। মহিলা শ্রমিকদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র, দানসভা, আরও কত কী। তা সত্ত্বেও ভোটে সম্ভাব্য ফলাফলে পিছিয়ে আছেন তিনি। কেন? কারণটা বুঝতে পারছেন না। শেষ অবধি তারা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে ট্র্যাঙ্গেল পার্ক পার হয়ে চলে এলেন অ্যানটিক মার্কেটে। শনিবারের সন্ধ্যেবেলা। ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ডিনার, অলিভার লেসলির হাতে ফুলের গোছা তুলে দিয়েছিলেন। ভালোবাসার শব্দ বিনিময় করা হয়েছিল।

একটি অসাধারণ উপহার, লাভমেসিন বলছে, ডার্লিং, তুমি কোথায়? প্রতি মুহূর্তে আমি তোমাকে অনুভব করছি।

-কী অসাধারণ এই মেসিনটি। আমি এটার প্রেমে পড়ে গেছি।

না, ওকে সুখী করে লাভ নেই, লেসলি, সত্যি আমি তোমাকে ভালোবাসি!

.

একটির পর একটি উত্তেজক ঘটনা ঘটে চলেছে। এক রবিবার রাসেল ফর রিভারে র‍্যাফসিঙের আসর বসল। হঠাৎ নদীটা ভয়ংকর হয়ে উঠল। মনে হয় লেসলি বুঝি ডুবে যাবে। সাড়ে তিন ঘণ্টার এই অভিযান। লেসলি এবং অলিভার নৌকোতে চড়ে বসেছে। ভারী আনন্দঘন মুহূর্ত। হাতে হাত। কেবিনে বসে ভালোবাসা বিনিময়, ফিরে আসা বাস্তব পৃথিবীতে।

সন্ধ্যেবেলা, অলিভার নিজের হাতে ডিনার তৈরি করেছেন। ভাউ ফাইডের সুন্দর বাড়িতে লেক্সিংটনের কাছে এক ছোট্ট শহর। সয়সেস, পেঁয়াজ, রসুন, কত রকম পাতা, তার সাথে আলুসেদ্ধ, স্যালাড, লাল মদ।

লেসলি বলল–আপনি তো চমৎকার রাঁধতে পারেন, আঃ, প্রিয়তম, এত সুন্দর রান্না আমি কখনও খাইনি।

–তোমাকে ধন্যবাদ, তোমার জন্য আরও অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

 উনি বেডরুমে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। একটু বাদে একটা ছোট্ট বোতল নিয়ে এলেন। তার ভেতর টলটলে তরল পদার্থ।

–এটা হল ওই জিনিসটা।

–এটা কী?

তুমি উন্মাদনার নাম শুনেছো?

–হ্যাঁ শুনেছি।

–উন্মাদনা, যে ওষুধটির নাম, এটা হল সেই তরল।

ডার্লিং, এটার দরকার কী, তুমি কি এটা ব্যবহার করো নাকি?

না, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় এটা ব্যবহার করা উচিত।

–এই প্রথম?

–হ্যাঁ।

–এটা বাইরে ফেলে দেবে?

–হ্যাঁ।

অলিভার বাথরুমে চলে গেলেন। ক্রাসের শব্দ হল।

তিনি বললেন–সব চলে গেছে। কে বলছে এইভাবে ওষুধ খেয়ে যৌন অনুভূতি আনতে হয়? আমার হাতে এমন সুন্দর প্যাকেট থাকতে?

বন্য আক্রমণ। হ্যাঁ, সেই অরণ্য সংগীত বেজে উঠেছে। অসম্ভব উত্তেজনা। আবেগ এবং আদর। বৃষ্টি ঝরার মতো ভালোবাসা। এক যাদুদণ্ড, কে সেই ম্যাজিসিয়ান? হ্যাঁ, উনি হলেন অলিভার রাসেল।

.

শনিবার সকালবেলা, অলিভার এবং লেসলি পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অসাধারণ দৃশ্যাবলী।

লেসলি বলল–এত সুন্দর জায়গায় এর আগে আমি কখনও আসিনি।

এসো, তোমাকে আরও ভালো জায়গাতে নিয়ে যাচ্ছি।

সামনে একটা বাঁক। পথের ধারে গাছের ডালে লেখা আছে লেসলি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?

অসাধারণ প্রস্তাব, লেসলি তাকাল অলিভারের দিকে। কথা বলতে পারছে না।

সে অলিভারকে জড়িয়ে ধরে বলল–তুমি কী করবে?

 লেসলি বলল, আমি ভাবতেই পারছি না, আমার এই ভাগ্য?

–শোনো, আমি এক গভর্নর হয়ে তোমার স্বামী হব না। তুমি একটা ভালো অ্যাটর্নিকে বিয়ে করছো, এটা বলতে পারি।

লেসলি হেসে ফেলল। বলল–বাঃ, সুন্দর বলেছো তো, কথাটা মনে রেখো কিন্তু।

.

কয়েক রাত কেটে গেছে, লেসলি পোশাক পরছে, অলিভারের সঙ্গে ডিনারের আমন্ত্রণ। টেলিফোন বেজে উঠল।

–ডার্লিং, খারাপ খবর আছে। এই মাত্র আমাকে একটা মিটিং-এ যেতে হবে। ডিনারটা ক্যানসেল করতে বাধ্য হলাম। ক্ষমা পাব তো সুন্দরী?

লেসলির ঠোঁটে হাসি- মৃদু শব্দ- তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

.

পরের দিন সকালবেলা, স্টেট জার্নাল পত্রিকার একটি কপি লেসলির হাতে। শিরোনাম কেনটাকির নদীতে এক রমণীর মৃতদেহ। গল্পটা এই রকম–আজ সকালবেলা বছর কুড়ির একটি মেয়ের নগ্ন মৃতদেহ পাওয়া গেছে কেনটাকি নদীতে। লেক্সিংটন শহর থেকে দশ মাইল পূর্বে। তার মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে, মৃত্যুর কারণ জানবার জন্য…

কেন মারা গেল? প্রেমিক ছিল কি? স্বামী? আমি তো বেঁচে আছি, প্রতি মুহূর্তে নতুন করে বাঁচার আনন্দ খুঁজে নিচ্ছি। যে মেয়েটিকে লেসলি কখনও চোখে দেখেনি, তার জন্য ঝরে পড়ল একরাশ অনুমান এবং সীমাহীন বেদনা।

.

লেক্সিংটনের সকলে আসন্ন বিয়ে নিয়ে খুবই উৎসাহী। লেক্সিংটন একটা ছোট্ট শহর। অলিভার রাসেল নামকরা ব্যক্তিত্ব। বলা হল, এক আদর্শ দম্পতি। অলিভারের রং ঘন তামাটে বর্ণের, লেসলির মুখখানা অসাধারণ। আহা, এমন মধুর মতো উজ্জ্বল চুল।

আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল এই খবর।

জিম বেলি বললেন–মনে হচ্ছে ভদ্রলোক খুবই ভাগ্যবান।

 লেসলির ঠোঁটে হাসি, আমরা দুজনেই।

–তুমি কি চাকরি ছেড়ে দেবে? অন্য কোথাও চলে যাবে?

না, সাধারণ বিয়ে। আমরা চ্যাপেল চার্চে যাব।

 কবে ওই শুভ ঘটনাটা ঘটবে?

–ছ সপ্তাহের মধ্যে।

.

কদিন কেটে গেছে।

স্টেট জার্নালে আবার খবর প্রকাশিত হল। শব ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। মেয়েটির নাম লিসা বারনেট্টি। তার মৃত্যুর কারণ হল উন্মাদনা আনতে পারে এমন একটি তরল। বাজারে এই তরল বিক্রি হয় না। চোরা পথে কিছু কিছু বোতল চলে আসে।

লেসলির মনে পড়ল অলিভারের কথা। ভাগ্যিস ওই বোতলটা ফেলে দেওয়া হয়েছে, মনে মনে ভাবল সে!

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে আসন্ন বিয়ের প্রস্তুতিতে। এত কাজ করতে হবে। দুশো জনের কাছে আমন্ত্রণ পত্র পৌঁছে গেছে। লেসলি একজনকে মেড অফ অনার নির্বাচিত করেছে। তার পোশাক কিনতে হল। গ্যালেরিনা চুলের গ্রেজ। ম্যাচ করা জুতো, হাতে গ্ৰোক। নিজের জন্য সে টেডি মলে চলে গেল। মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে পারে এমন স্কার্ট কিনলো। পছন্দ করা জুতো, লং গ্রোক।

অলিভার কালো কোটের অর্ডার দিয়েছিল, ডোরাকাটা ট্রাউজার। ধূসর রঙের ওয়েস্ট কোট। সাদা সার্ট, ডোরাকাটা এ্যাশট।

অলিভার লেসলিকে বললেন–সব কিছু ঠিকঠাক আছে। রিসেপশনের ব্যাপারটাও তৈরি হয়েছে। সকলেই আসবেন আমি কথা দিচ্ছি।

লেসলির সমস্ত শরীরে শিহরণ–ডার্লিং, আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

.

বৃহস্পতিবার রাত, এক সপ্তাহ বাকি আছে। অলিভার এলেন লেসলির অ্যাপার্টমেন্টে।

লেসলি, একটা খারাপ খবর আছে। আমার ক্লায়েন্টের কিছু সমস্যা হয়েছে। আমাকে। প্যারিসে উড়ে যেতে হবে।

–প্যারিস? কদিনের মধ্যে ফিরবে?

দু-তিন দিন, খুব বেশি হলে চার। তারপরেও হাতে অনেকটা সময় থাকবে।

 লেসলির চিন্তিত মুখ–পাইলটকে বোলোলা সাবধানে প্লেনটা চালাতে।

-হ্যাঁ, বলবো।

 অলিভার চলে গেলেন। লেসলি খবরের কাগজের পাতায় চোখ মেলে দিল। সেই জ্যোতিষী, কী লিখেছেন?

লেখা আছে–জুলাই তেইশ থেকে আগস্টের বারো, পরিকল্পনার পরিবর্তন করতে যাবেন না। অযথা ঝুঁকি নেবেন না। সাংঘাতিক ক্ষতি হতে পারে।

লেসলি আবার ওই সাবধানবাণী পড়ল। একটু বিরক্ত হল। ভেবেছিল টেলিফোন করবে অলিভারের কাছে। তাকে জানাবে না যেতে। ব্যাপারটা হাস্যকর, লেসলি ভাবল, নাঃ, জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করে কী লাভ!

.

সোমবার, লেসলি এখনও পর্যন্ত অলিভারের খবর পায়নি। অফিসে ফোন করেছে। কর্মচারী বলেছে কোনো খবর নেই। মঙ্গলবার, অলিভার কোনো কিছু বলছে না কেন? লেসলির মনে আতঙ্ক এবং ভয়। বুধবার সকাল, ভোর চারটে, টেলিফোনের শব্দ, কেন? ঘুমন্ত চোখে অলিভার, হায় ঈশ্বর, লেসলি ভাবল, আমি ভীষণ চিৎকার করবো।

রিসিভার তুলে নিয়ে লেসলি বলল–অলিভার?

পুরুষ কণ্ঠ–আপনি কী লেসলি স্টুয়ার্ট?

 মেরুদণ্ডে শীতল শিহরণ–আপনি কে বলছেন?

–আল টাওয়ারস, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আমরা এইমাত্র একটা খবর পেয়েছি মিস স্টুয়ার্ট, আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি।

তার মানে? ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে? অলিভারের মৃত্যু?

মিস স্টুয়ার্ট?

–হ্যাঁ।

লেসলির কণ্ঠস্বরে এখন ফিসফিসানি আর্তনাদ।

–আপনার কোনো উক্তি এই ব্যাপারে?

কী ব্যাপারে?

–অলিভার রাসেল, সেনেটর টড ডেভিসের মেয়েকে বিয়ে করছেন, প্যারিসে।

মাথা ঘুরছে লেসলির, ভূমিকম্প ঘটে গেছে।

–আপনি এবং মিঃ রাসেল ছিলেন পরস্পরের বাগদত্ত, তাই নয় কি? যদি আপনি এ বিষয়ে কিছু বলেন।

লেসলি বসে আছে, সমস্ত শরীরটা বুঝি তুষার ঢাকা।

মিস স্টুয়ার্ট?

 শেষ পর্যন্ত হারানো কণ্ঠস্বর ফিরে পেলো।

–আমি চাইছি এই বিয়েটা ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হোক।

লেসলি রিসিভারটা নামিয়ে দিল। কথা হারিয়ে গেছে। সবই দুঃস্বপ্ন, কয়েক মুহূর্ত সে সাংঘাতিক যন্ত্রণার মধ্যে কাটালো, মনে হল এসবই বুঝি স্বপ্নের জগৎ।

কিন্তু এটা স্বপ্ন নয়, না না, অনেকগুলো কথা। মা বলেছিল, তোমার বাবা আর কখনও ফিরে আসবে না।

লেসলি বাথরুমে গেল। আয়নাতে তার বিবর্ণ মুখের প্রতিচ্ছবি।

একটা খবর এসেছে, গুরুত্বপূর্ণ খবর।

 অলিভার অন্য কাউকে বিয়ে করেছে? কিন্তু কেন? কোথায় আমার দোষ?

জানি না, জানি না, ভবিষ্যতে কী হবে?

.

লেসলি এজেন্সিতে পৌঁছে গেল। কেউ তার দিকে তাকাতে সাহস করছে না। সে সোজা জিম বেলির অফিসে গেল।

জিম তার বিবর্ণ মুখের দিকে তাকালেন, বললেন–লেসলি, আজ তুমি অফিস থেকে ছুটি নাও, বাড়িতে চলে যাও।

 না, স্যার, আমি ভালোই আছি।

দীর্ঘশ্বাস, লেসলি চাপবার চেষ্টা করল, কাজের বোঝাই তাকে দুঃখের জগত থেকে মুক্তি দিতে পারে।

.

রেডিওতে, টেলিভিশনে, খবরের কাগজের সান্ধ্য সংস্করণে প্যারিসের ওই বিয়ের আলোচনা। সেনেটর টড ডেভিস কেনটাকির এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তার কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠান, লেসলিকে হারিয়ে দিয়ে, সকলের কাছে মস্তবড় খবর।

লেসলির অফিসের ফোন বেজেই চলেছে।

–আমরা কুরিয়ার জার্নাল থেকে কথা বলছি মিস স্টুয়ার্ট, এই বিয়ের ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাইছি।

–হ্যাঁ, আমি চাই অলিভার রাসেলের বিবাহিত জীবন যেন সুখের হয়।

–কিন্তু আপনাদের মধ্যে তো বিয়ে হতে মাত্র কয়েকদিন বাদে।

ব্যাপারটা হলে খারাপ হতো। সেনেটর ডেভিসের মেয়ে হল তার জীবনের প্রথম প্রেমিকা। আমি প্রার্থনা করছি তারা যেন ভালোভাবে থাকে।

কানফোর্ড থেকে স্ট্রেট জার্নাল। আরও অনেক পত্রিকা। সব জায়গাতেই একই প্রশ্ন। একই উত্তর। তারপর? এভাবেই দিনটা কেটে গেল।

ছোট্ট একটা কাজ ছিল, আমন্ত্রিত সকলের কাছে চিরকুট পাঠানো। আর কেউ কেউ উপহার পাঠিয়ে দিয়েছিল, সেগুলো যথাস্থানে ফেরৎ দেওয়া।

.

লেসলি ভেবেছিল, হয়তো অলিভারের কাছ থেকে ফোন আসবে। সে মনে মনে তৈরি হচ্ছিল, শেষ অবধি সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর।

–লেসলি, আমি জানি না কী বলব?

–এটা কি সত্যি বলো তো?

–হ্যাঁ।

–তুমি বলোনি কেন?

ঘটনাটা হঠাৎ ঘটে গেল। তোমার সাথে দেখা হবার আগে জ্যান আর আমি পরস্পরকে ভালোবাসতাম। অনেক দিন বাদে জ্যানের সাথে দেখা হল, মনে হল আমি এখনও তাকে ভালোবাসি।

–আমি বুঝতে পেরেছি অলিভার, গুডবাই।

পাঁচ মিনিট বাদে লেসলির সেক্রেটারী বলল–মিস স্টুয়ার্ট, আপনার জন্য টেলিফোন।

–আমি কথা বলতে চাইছি না।

–উনি সেনেটর ডেভিস।

কনের বাবা! উনি আমার কাছে কী চাইছেন?

লেসলি রিসিভার ধরলেন। দক্ষিণী কণ্ঠস্বর মিস স্টুয়ার্ট?

–হ্যাঁ।

–আমি টড ডেভিস। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছি।

 এক মুহূর্তের বিড়ম্বনা। সেনেটর, আমি জানি না আপনি কী বলতে চাইছেন।

–এক ঘন্টার মধ্যে আমি আসছি কেমন?

টেলিফোনটা স্তব্ধ হয়ে গেল।

.

এক ঘণ্টা কেটে গেছে, অফিস বাড়ির সামনে একটা লিমুজিন গাড়ি এসে থামলো। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল। সেনেটর ডেভিসকে ব্যাকসিটে বসে থাকতে দেখা গেল। মাথার চুল সাদা। সুন্দর করে ছাঁটা গোঁফ। পরিষ্কার সাদা পোশাক। মাথায় সাদা লেগন হ্যাট। মনে হচ্ছে উনি যেন গত শতাব্দীর বাসিন্দা। দক্ষিণ অঞ্চলের এক ভদ্রলোক।

লেসলি গাড়িতে উঠে বসল।

সেনেটর ডেভিস বললেন–বাঃ, আপনি সত্যিই সুন্দরী।

ধন্যবাদ, লেসলির কণ্ঠস্বরে তিক্ততা।

লিমুজিন চলতে শুরু করেছে।

–মিস স্টুয়ার্ট, আমি কিন্তু আপনার শারীরিক সৌন্দর্যের কথা বলছি না। যেভাবে আপনি সমস্ত সমস্যার সমাধান করেন। আমি সংবাদটা শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। এভাবেই আমাদের নৈতিকতার অপমৃত্যু ঘটে গিয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, অলিভারকে আমি কখনই ক্ষমা করতে পারবো না। আমার কন্যা জ্যান তাকে বিয়ে করছে, এটাও হয়তো আমি মন থেকে মানতে পারছি না। নিজেকে কেমন অপরাধী বলে মনে হচ্ছে, কারণ জ্যান তো আমারই মেয়ে।

ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেছে।

 নীরবতার আস্তরণ।

লেসলি কথা বলল–আমি অলিভারকে চিনি, অলিভার কখনও আমাকে দুঃখ দেবে না। যা ঘটবার তা ঘটে। এটা ভেবে আর কী লাভ?

–এটা হয়তো আপনার মহানুভবতা। সত্যি আপনার তুলনা নেই।

 লিমুজিন থেমে গেছে। লেসলি জানলা দিয়ে তাকালো। প্যারিস স্পাইট, কেনটাকি হর্স সেন্টার, একশোটার বেশি ঘোড়ার ফার্ম আছে এখানে। সবথেকে বড়োটার মালিক সেনেটর ডেভিস। যতদূর চোখ যায়, দিগন্ত বিস্তৃত তৃণক্ষেত্র, কেনটাকির বিখ্যাত নীল রঙের ঘাস।

গাড়ি থেকে লেসলি বেরিয়ে এল, সেনেটর ডেভিসও এলেন। ফেন্সের ওপর দিয়ে হাঁটা শুরু হয়েছে, আহ, কি অসাধারণ দৃশ্যপট।

সেনেটর ডেভিস বললেন–আমি অত্যন্ত সাধারণ মানুষ। এখানেই হয়তো জীবনের বাকি দিনগুলি কাটিয়ে দেব। পৃথিবীর অন্য কোথাও গেলে আমি শান্তি পাবো না। চারদিকে তাকিয়ে দেখুন মিস স্টুয়ার্ট। মনে কি হয় না, আমরা স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি? মার্ক টোয়াইন । বলেছিলেন, পৃথিবী যখন শেষ হয়ে যায়, তখন আমি কেনটাকিতে থাকবো। আমি আমার জীবনের অর্ধেকটা ওয়াশিংটনে কাটিয়েছে। এখন আর ভালো লাগে না।

–তাহলে কেন রাজনীতির আবর্ত?

জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা। জনগণের ভোটে আমি সেনেটে গেছি। তারা এখনও আমাকে ভোট দিচ্ছে। প্রতিদানে আমার কিছু করা উচিত।

এবার বিয়ের প্রসঙ্গ। ভদ্রলোক বললেন–প্যারিসে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে, জ্যান কিন্তু। এখানে এসে চার্চের ধর্মীয় আসরে যোগ দেবে। সেই অনুষ্ঠানে আপনি আসবেন তো?

বুকের ভেতর ছুরির আঘাত দেখবো, চেষ্টা করবো।

.

দুসপ্তাহ কেটে গেছে, বিয়ের আসর ক্যালভারি চ্যাপেল চার্চে। কী আশ্চর্য, এখানেই হয়তো লেসলি এবং অলিভারের বিয়ে হতো। অনেক মানুষের সমাগম।

বেরির সামনে অলিভার রাসেল, জ্যান এবং সেনেটর টড ডেভিস। জ্যান ডেভিসকে এক বাদামী চুলের আকর্ষণী তরুণী বলা যায়। চেহারাটা সত্যিই ভালো। আভিজাত্যের ছাপ আছে।

যাজকের কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হচ্ছে ল্যাটিন মন্ত্র।

চার্চের দরজা খুলে গেল। লেসলি স্টুয়ার্ট ঢুকে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। মন্ত্র উচ্চারণ শুনল। শেষ সারিতে গিয়ে বসল।

পাদ্রী সাহেব বলছেন–ঈশ্বরের আশীবার্দ নেমে আসুক।

হঠাৎ লেসলির দিকে নজর পড়ল তার এবং শান্তির বাতাবরণ।

অনেকে লেসলির দিকে তাকালো, ওই যাজকের চোখ অনুসরণ করে। ফিসফিসানি গুঞ্জন। একটা নাটকীয় মুহূর্তের উন্মাদ অপেক্ষা।

পাদ্রী একটু অপেক্ষা করলেন। তারপর আবার তার কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে। আমরা এই দুজনকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করলাম। কণ্ঠস্বরের উদ্বিগ্নতা হারিয়ে গেছে।

উনি আবার তাকালেন, না, লেসলির কোন চিহ্ন নেই।

.

লেসলি স্টুয়ার্টের ডায়েরি ডিয়ার ডায়েরি, অসাধারণ অনুষ্ঠান। অলিভারের বউ সত্যিই সুন্দরী, সাদা লেস এবং শার্টিনের পোশাক পরেছিল। অল্টার টপ, মানানসই জ্যাকেট। অলিভারকে ভারী সুন্দর লাগছিল। মনে হল সে খুবই সুখী।

শেষ কথা বলবো কি? ওর সঙ্গে আমার কেন দেখা হল? এটাই পরম বিস্ময়।

.

০২.

 টড ডেভিস, বিপত্নীক, অর্থের কোনো পরিসীমা নেই। তামাকের ক্ষেত আছে। কয়লার খনি। ওকলাহামা এবং আলাস্কাতে তেলের খনি। পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত রেসিং ঘোড়া। ওয়াশিংটনে যথেষ্ট প্রতিপত্তি আছে। পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন। জীবন সম্পর্কে খুব সাধারণ দর্শন তার, উপকারীর উপকার কখনও ভোলেন না। অপরাধীকে শাস্তি দেন। সব সময় বিজয়ী মঞ্চে দাঁড়াতে ভালোবাসেন। ঘোড়ার ট্র্যাক কিংবা রাজনীতির আসরে। অলিভার রাসেলকে তিনি নির্বাচিত করেছেন। হয়তো ঘটনাটা আকস্মিক, কিন্তু এর অন্তরালে কিছু কারণ আছে। যখন সেনেটর শুনেছিলেন অলিভারের সঙ্গে লেসলির বিয়ে হবে, তিনি ভেবেছিলেন ব্যাপারটা সত্যিই বিরক্তিকর। তাই কী করা যায়?

.

অলিভারের সাথে সেনেটরের আলাপ হয় একটা আইনী ব্যাপারে পরামর্শ নিতে। সেনেটর অলিভারের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বয়সে তরুণ হলে কী হবে, আইনের ধারা উপধারায় যথেষ্ট জ্ঞান। চেহারার মধ্যে বালকোচিত সারল্য আছে। সেনেটর লাঞ্চ খেতেন অলিভারের সাথে নিয়ম করে। অলিভার তখনও জানেন না, কীভাবে ওই ভদ্রলোক তাকে প্রভাবিত করছেন।

একমাস কেটে গেছে, সেনেটর পিটার ট্যাগারকে বললেন–পরবর্তী গভর্নরকে আমি পেয়ে গেছি।

ট্যাগার এক ধার্মিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। বাবা ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। মা সাধারণ গৃহকত্রী। নিয়মিত চার্চে যেতেন। এগারো বছর বয়সে ট্যাগারের জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। মা, বাবা এবং ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে গাড়িতে বেড়াচ্ছিলেন। ব্রেক ফেল হল, ভয়ংকর অ্যাক্সিডেন্ট। পিটার বেঁচে গেলেন, একটি চোখ হারিয়ে গেল, রাকি সকলের অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।

পিটারের বিশ্বাস, ভগবান তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

পিটার রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ ভালোই বোঝেন। পিটার জানেন কখন কাকে কোন পদে বসাতে হয়।

সেনেটর ডেভিসের সাথে তার আলাপটা হঠাৎ হয়েছিল। পিটার তখন মন্ত্রীসভায় ঢোকার চেষ্টা করছেন।

সেই আলাপ এখন বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে।

পিটারের দুটি চোখে জিজ্ঞাসা- কে ওই পদের উপযুক্ত প্রার্থী।

–অলিভার রাসেল।

অ্যাটর্নি?

–হ্যাঁ, ব্যাপারটা মনে রাখতে হবে।

–সেনেটর আপনার বক্তব্যটা পরিষ্কার তো?

এবার আলোচনা, শুধুই আলোচনা!

.

অলিভার রাসেল সম্পর্কে সেনেটর কিছু কথা বলেছিলেন তার মেয়ে জ্যানকে। তিনি বলেছিলেন হানি, এই ছেলেটার দিকে নজর রাখো। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধানী।

বাবা, ছেলেটার অতীত কিন্তু ভালো নয়। অনেক গুজব এবং দুঃসংবাদ। এই শহরে সে হল এক তেজী নেকড়ে।

ডার্লিং, গুজবে কান দিও না। শুক্রবার অলিভারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ডিনারের আসরে। তুমি অবশ্যই হাজির থেকো।

.

শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা, নৈশভোজের আসর। অলিভার, আকর্ষণীয় চেহারা, জ্যান হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সেনেটরের সতর্ক দৃষ্টি। একটির পর একটি প্রশ্ন।

সন্ধ্যে রাতের দিকে এগিয়ে চলেছে। শনিবার, জ্যানের আমন্ত্রণ, অলিভারকে, ডিনার পার্টিতে।

সেই রাত থেকে শুরু হল নতুন এক গল্প।

.

সেনেটর পিটার ট্যাগারকে বললেন–মনে হচ্ছে ওদের মধ্যে বিয়ে হবে, তাহলে? এখনই নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে হয়।

.

সেনেটর ডেভিসের অফিস, অলিভারকে ডেকে পাঠানো হল, জরুরী মিটিং আছে।

–আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাইছি, কেনটাকির গভর্নর হতে আপনার কেমন লাগবে?

দুটি চোখে বিস্ময় আমি এটা কখনও ভেবে দেখিনি।

–পিটার ট্যাগার এবং আমি ভেবেছি। আসছে বছর নির্বাচন। অনেকটা সময় আছে, নিজেকে গড়ে পিঠে নিতে হবে। লোকের সামনে আপনার আকাশ ছোঁয়া ভাবমূর্তি। আমরা আপনাকে সাহায্য করবো, এই লড়াইতে জয় অবশ্যম্ভাবী।

অলিভার জানতেন ব্যাপারটা সত্যি। সেনেটর ডেভিস এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। তরল সোনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতির যে আবর্তন, তিনি তা ভালোভাবেই বোঝেন। তিনি জানেন কীভাবে ক্ষমতা হস্তগত করতে হয়।

কর্তব্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন তো?

–চেষ্টা করবো।

কতকগুলো ভালো খবর আছে। আপনাকে বছর কয়েকের জন্য গভর্নর থাকতে হবে। আমি কথা দিচ্ছি, তারপর আপনাকে হোয়াইট হাউসে নিয়ে যাব।

অলিভার তোতলাতে থাকেন- আপনি কি সত্যি বলছেন?

এ ব্যাপারে আমি কখনও মজা করি না। টেলিভিশনের যুগে একথা বলার অর্থ কী জানেন তো? একটা বিষয় আপনি নিশ্চয়ই জানেন, টাকা দিয়ে আমরা কিন্তু জনপ্রিয়তাকে কিনতে পারি না।

টড, আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

–আমি কাল ওয়াশিংটনে যাব। ওখান থেকে ফিরে এসে আমার আসল কাজ শুরু হবে।

.

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল, এবার সত্যি সত্যি অভিযান শুরু হল। সর্বত্র অলিভারের হাসি মুখের ছবি। টেলিভিশনের পর্দায় ঘন ঘন তার উপস্থিতি। বিভিন্ন মিছিলের পুরোভাগে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। রাজনৈতিক আলোচনা সভায় যোগ দিচ্ছেন। পিটার ট্যাগারের ব্যক্তিগত অনুসন্ধান, অলিভারের জনপ্রিয়তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

তিনি সেনেটরকে বলেছিলেন–আর মাত্র পাঁচ পয়েন্ট পেতে দিন, তাহলে দেখবেন আমরা কোথায় পৌঁছে যাব। গভর্নরের থেকে তিনি মাত্র দশ পয়েন্টে পিছিয়ে আছেন। অনেকটা সময় আছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লড়াইটা সমানে সমানে পৌঁছে যাবে।

সেনেটর ডেভিস মাথা নাড়লেন অলিভার জিতবেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

.

টড ডেভিস এবং জ্যান প্রাতরাশের আসরে।

কী জ্যান, ছেলেটির কথা বল? কিছু বলেছে কি?

জ্যানের ঠোঁটে হাসি–এখনও বলার সময় হয়নি বাবা, আমি বুঝতে পারছি, আজ অথবা কাল সে প্রস্তাব দেবেই।

-বেশিদিন ঝুলিয়ে রেখো না। ও গভর্নর হবে, তার আগে বিয়ের ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেল। গভর্নরের সুস্থ স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন থাকলে ভোটাররা বেশি খুশি হয়।

জ্যান দুহাত বাড়িয়ে দিল বাবা, তুমি আমাকে একটা সুন্দর উপহার দিয়েছে। সত্যিই আমি ওকে পাগলের মতো ভালোবাসি।

সেনেটরের চোখের তারায় জ্যোতি- যতদিন ও তোমাকে খুশি রাখবে, আমিও সুখে শান্তিতে থাকতে পারবো।

সবকিছু এগিয়ে চলেছে, মসৃণ পথে, কোথাও কোনো বাধার চিহ্ন নেই।

.

পরের দিন সন্ধ্যেবেলা। সেনেটর ডেভিস ঘরে ফিরে এসেছেন। জ্যান তার ঘরে বসে আছে। ফোঁপানির কান্নার শব্দ।

সেনেটর তাকালেন–কী হয়েছে?

–আমি এখান থেকে চলে যাব। এ জীবনে আর অলিভারের মুখ দেখবে না।

–কী হয়েছে বলো তো?

–গতরাতে অলিভার একটা হোটেলে ছিল, আমার প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে বান্ধবী সবকিছু জানিয়েছে। তুমি বলো বাবা এমন মানুষকে বিশ্বাস করা যায়।

সেনেটরের মাথার ভেতর আশঙ্কার মেঘ–হয়তো ও মিথ্যে করে বলেছে।

না, আমি অলিভারকে ফোন করেছিলাম। অলিভার সব কিছু স্বীকার করেছে। আমি চলে যাচ্ছি, আমি প্যারিসে থাকবো।

-সত্যি?

–হ্যাঁ।

 পরের দিন সকালবেলা, জ্যানকে আর দেখা গেল না!

.

সেনেটর অলিভারকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, তোমার আচরণে আমি হতাশ হয়েছি।

অলিভার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন–যা ঘটে গেছে তার জন্য আমি দুঃখিত টড, এটা মুহূর্তের উত্তেজনা, আমি ড্রিঙ্ক করেছিলাম, মেয়েটি আমার কাছে আসে, প্রস্তাব রাখে, আমি না বলতে পারিনি।

–আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। সেনেটরের কথায় সহানুভূতি। আসলে তুমি তো একজন পুরুষ, এমন তো ঘটতেই পারে।

অলিভারের ঠোঁটে নিরাপত্তার হাসি–ভবিষ্যতে ঘটবে না আমি কথা দিচ্ছি।

–আগামী দিনে তুমি একজন গভর্নর হবে, ব্যাপারটা মনে রেখো।

রক্ত জমেছে অলিভারের মুখে–আপনি কী বলছেন?

কথাটা বলবো কী? আমি এখন তোমাকে আরে সমর্থন করবো না। কারণ তুমি আমার মেয়ের জীবনে আঘাত এনেছে।

-জ্যানের সঙ্গে এটার কী সম্পর্ক।

–আমি সকলকে বলেছিলাম, আগামী গভর্নর আমার ভবিষ্যৎ জামাই। যখন তুমি আমার জামাই হতে পারলে না তোমাকে সমর্থন করে কী লাভ? নতুন কোনো প্রার্থীর সন্ধান করতে হবে।

–ব্যাপারটা এভাবে নেবেন না টড।

সেনেটর ডেভিস হাসলেন–না, আমি যা বলি একবারই। বলি, অলিভার, তুমি ভেবো না আর আমি তোমাকে সাহায্য করবে। তবে তুমি লড়াই করলে আমি দূর থেকে শুভ কামনা জানাবো।

অলিভার বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলেন, তারপর বললেন–যা কিছু ঘটেছে আমি তার জন্য ক্ষমা চাইছি।

সেনেটরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। চোখে নেমেছে কঠিন চাউনি।

.

অলিভার চলে গেলেন, সেনেটর পিটার ট্যাগারকে ডাকলেন–প্রচার পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।

– কেন? দেখছেন না, জনপ্রিয়তা কীভাবে বাড়ছে?

–আমি বলছি এটা বাতিল করুন। সমস্ত দেওয়াল থেকে অলিভারের পোস্টার তুলে ফেলুন। অলিভারকে লড়াইয়ের বাইরে রাখতে হবে।

.

দু-সপ্তাহ কেটে গেছে। অলিভার রাসেলের রেটিং ক্রমশ পড়তির দিকে। ছবি আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রেডিওতে বক্তব্য নেই। টেলিভিশনে মুখ নেই।

-গভর্নর অ্যাডিসনের জনপ্রিয়তা চড়চড় করে বাড়ছে। তাড়াতাড়ি একজন নতুন প্রার্থীর সন্ধান করতে হবে।

পিটার ট্যাগারের মন্তব্য।

সেনেটর চিন্তিত অনেক সময় আছে, দেখাই যাক না শেষ পর্যন্ত কী হয়।

.

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে, অলিভার রাসেল এসেছেন বেলি অ্যান্ড টমকিন্স এজেন্সির অফিসে প্রচার পরিকল্পনার দায়িত্ব দেবার জন্য। জিম বেলি তাকে লেসলির মতো এক সুন্দরী মহিলার সাথে আলাপ করিয়েছেন। গল্পটা নতুন করে শুরু হয়েছে। মেয়েটির বয়স কম হলে কী হবে, যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করতে পারে। জ্যানের জন্য একটু ব্যথা, কিন্তু সে ব্যথাটাকে অতিক্রম করতে হবে। লেসলির জগতটা একেবার আলাদা। লেসলি আবেগী। এবং স্পর্শকাতরা। আহা, এমন মেয়েকে দেখলেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, অলিভার বোধহয় অরণ্য মধ্যে পথ হারিয়েছেন।

–এটাই প্রথম পদক্ষেপ, তুমি কিছুদিন গভর্নর হিসেবে থাকো, আমি কথা দিচ্ছি। শেষ পর্যন্ত তোমাকে আমি হোয়াইট হাউসে নিয়ে যাব।

না, নিকুচি করেছে হোয়াইট হাউসের। আমি লেসলিকে বিয়ে করে সুখী স্বামী হতে চাই। অলিভার শপথ নিলেন।কিন্তু, মাঝেমধ্যে হোয়াইট হাউস তাকে এক উন্মাদ উত্তেজনার হাতছানি দিয়ে ডাকে।

.

অলিভারের বিয়ের দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। সেনেটর ডেভিস ট্যাগারকে ডেকে পাঠালেন।

–পিটার, একটা সমস্যা হয়েছে, অলিভারকে আমরা এইভাবে শেষ করে দেব? এমন একজন মেয়েকে সে বিয়ে করবে যার কোনো অতীত নেই? ভবিষ্যৎ শূন্য?

পিটার ট্যাগারের চোখে কৌতূহল সেনেটর, বিয়ের ব্যাপারটা পাকা হয়ে গেছে। এখন এসব কথা বলে কী লাভ?

সেনেটর ডেভিসের মনে চিন্তা–এখনও তো বিয়েটা হয়নি, হয়েছে কি?

প্যারিসে মেয়েকে ফোন করলেন। জ্যান, আরেকটা খারাপ খবর দিচ্ছি। অলিভারের বিয়ে হতে চলেছে।

দীর্ঘক্ষণ নীরবতা আমি জানি।

সবথেকে মজার খবর কী জানো তো, অলিভার কিন্তু ওই মেয়েটাকে মোটেই ভালোবাসে না। তোমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ, তুমি কি চেয়ে চেয়ে দেখবে? অলিভার এখনও তোমাকেই ভালোবাসে।

–অলিভার নিজের মুখে একথা বলেছে?

অবশ্যই, তুমি তাকে এভাবে আত্মহত্যা করতে দেবে? বেবি, আরেকবার চিন্তা করো।

–বাবা, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

অলিভারকে দেখলে তোমার মায়া হবে।

–সত্যি ওসব কথা বলেছে।

–তুমি কি অলিভারকে এখনও ভালোবাসো?

–আমি জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত অলিভারকে ভালোবাসবো।

তাহলে এখনও কিন্তু গল্পটা শেষ হয়নি।

–বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে গেছে।

হানি, একটু অপেক্ষা করে দেখো না কী হতে পারে। হয়তো অলিভার তার ভুল বুঝতে পারবে।

সেনেটর ডেভিস রিসিভারটা নামিয়ে দিলেন, পিটার ট্যাগার প্রশ্ন করলেন সেনেটর আপনি কী চিন্তা করছেন?

সেনেটর বললেন–না, ভাবছি আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করলে কেমন হয়? অলিভারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

.

সেদিন বিকেলবেলা অলিভার রাসেলকে, সেনেটর ডেভিসের অফিসে দেখা গেল।

–অলিভার তোমাকে দেখে ভালোই লাগছে, তুমি কেমন আছো বলো?

টড, আমি ভালোই আছি।

অলিভার চেয়ারে বসে আছেন।

আমার একটা সমস্যা আছে, প্যারিসে, আমার একটা কোম্পানির সমস্যা। তোমায় এখনই সেখানে যেতে হবে।

–আমি অবশ্যই যাব, কবে ওই মিটিংটা আছে? ক্যালেন্ডারের দিকে নজর রাখতে হবে।

–এখনই যেতে হবে।

অলিভার অবাক হয়ে গেছেন এখনই?

–হ্যাঁ, তোমাকে এত তাড়াতাড়ি কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি বলে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। খবরটা এখন এসেছে। এয়ারপোর্টে আমার প্লেন দাঁড়িয়ে আছে, তুমি এখনই চলে যাও। ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অলিভারের চিন্তিত মুখ–আমি চেষ্টা করছি।

-এইজন্যই তোমায় এত ভালো লাগে, আমি তোমার ওপর নির্ভর করতে পারি। তোমার প্রতি খারাপ আচরণ করেছিলাম, তার জন্য আমায় ক্ষমা করো। তুমি কী সর্বশেষ ফলাফল দেখেছো? মনে হচ্ছে তোমার জনপ্রিয়তা কমছে।

–আমি জানি।

–তবে ভেবো না ব্যাপারটা উল্টে যাবে।

–কিন্তু?

–তুমি একজন ভালো গভর্নর হবে। তোমার ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তুমি যথেষ্ট অর্থ পাবে। অনেক ক্ষমতা। ক্ষমতা আর অর্থ থাকলে পৃথিবীর রাজা হওয়া যায়। জানো তো?

অলিভারের দুচোখে তখন অনেক স্বপ্ন। আমি একদিন বিশ্বের সবথেকে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হব? অলিভার ভাবতেই পারছেন না।

তারপর? সেনেটর বললেন–জ্যানের সাথে কথা হল, আজ সকালে, জ্যান প্যারিসে আছে। রিজে। আমি বললাম, তোমার বিয়ে হতে চলেছে, জ্যান কেঁদে উঠেছে। তার ফোঁপানির শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি।

টড, এব্যাপারে আমি দুঃখিত।

–তোমরা দুজন কেন পরস্পরকে ছেড়ে দিলে?

টড, আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে।

–আমি জানি, এ ব্যাপারে আমার নাক গলানো উচিত নয়। কিন্তু কেবলই আমার মনে হচ্ছে, বিয়ে হল পৃথিবীর সবথেকে পবিত্র ঘটনা। তুমি আমার আশীর্বাদ পাবে অলিভার।

–আমার ভালই লাগছে।

–আমি জানি, সেনেটর ঘড়ির দিকে তাকালেন, বাড়ি যাও এবং ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এসো। প্যারিসে গেলে সব জানতে পারবে।

অলিভার উঠে দাঁড়ালেন ভয় পাবেন না, আমি এখনই যাচ্ছি।

–ঠিক আছে, রিজ হোটেলে তোমার জন্য ঘর বুক করা আছে।

.

সেনেটর ডেভিসের চ্যালেঞ্জার এরোপ্লেন, প্যারিসের দিকে উড়ে চলেছে। সেনেটরের সঙ্গে কথাবার্তা, অলিভারের মনে পড়ছে। তুমি একজন ভালো গভর্নর হবে, তোমার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। অর্থ এবং ক্ষমতা থাকলে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় আনা যায়।

আরও একটি কথা, একটি উজ্জ্বল সুন্দর মুখ, অলিভার ভাবলেন–না, অর্থ অথবা সম্পত্তি নয়, আমি চাই একটি সুন্দরী মেয়েকে খুশি করতে। সেটাই হবে আমার এ জীবনের একমাত্র শপথ!

.

অলিভার এয়ারপোর্টে নামলেন। লিমুজিন দাঁড়িয়ে ছিল।

ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করলেন–মিঃ রাসেল কোথায় যাব?

–রিজ হোটেল।

কিন্তু সেখানে কি? আমি অন্য কোথাও থাকবো। না, একবার রিজেই যাই, জ্যানের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে

.

–আমি অলিভার, প্যারিসে এসে গেছি।

 অলিভারের টেলিফোন, জ্যানকে উদ্দেশ্য করে।

 জ্যানের নিষ্ঠুর উত্তর বাবা সবকিছু বলেছে।

–আমি নীচের লবিতে আছি, তুমি কি একবার আসবে?

–তুমি ওপরে উঠে এসো।

অলিভার ঢুকে পড়লেন জ্যানের সুইটের মধ্যে। কী বলবেন তা তখনও জানেন না।

 জ্যান অপেক্ষা করছিল। অলিভার সামনে এগিয়ে গেল।

জ্যান কাছে এল, হাতে হাত রাখলো, বলল বাবা বলেছে, তুমি আসছো। আমি খুব খুশি হয়েছি।

অলিভার অবাক হয়ে গেছেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। লেসলির কথা বলা উচিত । হবে কি? শব্দ হারিয়ে গেছে। যা ঘটে গেছে তার জন্য দুঃখিত। আমি অন্য একটি মেয়েকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি সবসময় তোমাকেই চাই.. তোমাকে কিছু বলতে এসেছি, অলিভারের কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

জ্যানের দিকে তাকালেন, না, কিছুই বলা সম্ভব হল না। মনে পড়ছে জ্যানের বাবার কথা। তুমি একদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবে। ভেবো না, এটা আমার বানানো প্রতিশ্রুতি।

–ডার্লিং ।

 তারপর? জীবন এগিয়ে চলল নিজের মতো।

–আমি একটা মস্ত বড় ভুল করেছি জ্যান, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে বিয়ে করবো।

–অলিভার?

–তুমি আমাকে বিয়ে করবে তো?

–হ্যাঁ-হ্যাঁ, তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারবো না।

বেডরুম। একটি নিষ্কলঙ্ক শয্যা। তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ।

কয়েকটা দিন কেটে গেছে দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে।

–তুমি কখনও আমার মনের বাইরে যেতে পারোনি।

তারপর?

চিৎকারের শব্দ।

অসাধারণ অনুভূতি। সন্তুষ্ট এবং আনন্দ। শিহরণ ও সুখ।

লেসলিকে সব কথা খুলে বলতে হবে।

.

পনেরো মিনিট কেটে গেছে, জ্যানের টেলিফোন–বাবা, অলিভার আর আমি বিয়ে করবো বলে ঠিক করেছি।

-সত্যিই একটা ভালো খবর জ্যান। আমার মনে আনন্দের শিহরণ জেগেছে। প্যারিসের মেয়র আমার পুরোনো বন্ধু। উনিও আমাকে ফোন করবেন। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখছি কেমন?

–কিন্তু।

অলিভারকে দাও।

–এক মিনিট বাবা।

–অলিভার, বাবা তোমাকে ডাকছেন।

–টড?

–তুমি আমাকে খুশি করেছে।

ধন্যবাদ, আমারও একই অনুভূতি।

–তোমাদের বিয়েটা প্যারিসে হবে। তোমরা এখানে এলে চার্চে আবার বিয়ের অনুষ্ঠান। ক্যালভারি চ্যাপেলে, কেমন?

অলিভারের মনে সংশয় ক্যালভারি চ্যাপেল? কেন?

সেখানে তো আমার আর লেসলির…

 সেনেটর ডেভিসের কণ্ঠস্বরে শীতলতা- অলিভার এখন এসব কিছু ভেবো না কেমন?

লেসলির কথা মনে হল, এক মুহূর্তের জন্য। তারপর? তারপর শুধুই জ্যান এবং জ্যান।

.

লেসলিকে অলিভার মন থেকে তাড়াতে পারেননি। মাঝে মধ্যে লেসলির মুখ মনে পড়ে। মনে হয় একবার লেসলির কাছে গিয়ে দাঁড়াবেন। সব কথা খুলে বলবেন। টেলিফোনে হাত রাখেন, কিন্তু কী বলবেন, অবশেষে এই ইচ্ছাটা মন থেকে ত্যাগ করলেন।

অলিভার এবং জ্যান লেক্সিংটনে ফিরে এসেছেন। অলিভারের প্রচার পরিকল্পনা জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। পিটার ট্যাগার সবকটি সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। অলিভারের মুখ বার বার টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিফলিত হচ্ছে। রেডিও খুললেই তার গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে উঠছে। খবরের কাগজে অলিভারকে নিয়ে একটির পর একটি প্রতিবেদন বের হচ্ছে। কেনটাকি কিংডম ফ্রিল পার্কে বিরাট জনসভায় ভাষণ দিলেন। টয়োটা মোটর প্ল্যান্টের মিছিলে যোগ দিলেন। ল্যানকাস্টারের মলেও ভাষণ দিলেন।

এভাবেই একটা গল্প শুরু হচ্ছে।

পিটার ট্যাগার ক্যাম্পিং বাসের আয়োজন করেছেন। এই বাস সমস্ত প্রদেশে পরিভ্রমণ করবে। জর্জটাউন থেকে স্টানফোর্ড, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ভার্সাইল, উইনচেস্টার সর্বত্র। অলিভার কেনটাকি ফেয়ার গ্রাউন্ডে ভাষণ দিলেন। তার সম্মানে বারগো দেওয়া হল। হাজার মানুষের উন্মাদ উত্তেজনা!

.

অলিভারের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে। বিয়ের জন্য মাত্র কয়েক দিনের বিরতি। লেসলিকে চার্চে দেখা গেল। অলিভারের মনে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। পিটার ট্যাগারের সাথে এ সম্পর্কে আলোচনা করলেন।

–লেসলি কি আমাকে আঘাত করবে? কোনো অনভিপ্রেত পরিবেশ?

না, কখনই তা হবে না। ওকে মন থেকে ভুলে যাও।

অলিভার বুঝতে পারছেন না। ঘটনাচক্র সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।

নির্বাচনের দিন এগিয়ে এসেঁছে, লেসলি একা বসে আছে তার অ্যাপার্টমেন্টে। টেলিভিশন সেটের সামনে। অলিভার জিততে জিততে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। মধ্যরাত, গভর্নর অ্যাডিসনের মুখ দেখা গেল। তিনি তার শেষ ভাষণ দিচ্ছেন। লেসলি টেলিভিশনটা বন্ধ করে দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

এখন আমাকে আরও বেশি কাঁদতে হবে। আজ সারা রাত আমি শুধু কাদবো। আমি পুরোনো কেনটাকির গান গাইবো। সেই গান যা আমি অনেকদিন আগে শুনেছিলাম।

এবার বোধহয় সময় হয়েছে।

.

০৩.

সেনেটর টড ডেভিসের সকালবেলাটা ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল। তিনি উড়ে গেলেন লুইস স্ক্রিলে। সারা দিন সেখানেই ছিলেন। সেখানে অনেকগুলো কাজ ছিল।

পিটার ট্যাগারকে বললেন–প্রত্যেকটা ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রাখবেন। দেখবেন ছোটখাটো । বিষয়গুলো যেন নজর এড়িয়ে না যায়।

একটা ভালো মাদী ঘোড়া কিনলেন। আগামী ডার্বিতে প্রথম পুরস্কার আমিই পাবো, মনে মনে ভাবলেন।

সেলুলার ফোনটা বেজে উঠল। পিটার ট্যাগার উত্তর দিলেন, কে বলছেন?

তারপর সেনেটরের দিকে তাকালেন, বললেন–লেসলি স্টুয়ার্টের ফোন। আপনি কথা বলবেন কি?

সেনেটর ডেভিস ভাবলেন নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। তারপর ট্যাগারের হাত থেকে ফোনটা তুলে নিলেন মিস স্টুয়ার্ট?

–সেনেটর ডেভিস, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। একবার দেখা করতে পারি কি?

–আজ রাতে আমি ওয়াশিংটনে যাব। মনে হচ্ছে

–আমি এখনই আসতে পারি, ব্যাপারটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

সেনেটর ডেভিস একটু ইতস্তত করলেন- যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে তুমি বরং আমার ফার্মে চলে এসো। তুমি কি সেখানে দেখা করবে?

এটাই ভালো প্রস্তাব।

–এক ঘণ্টার মধ্যে আসছে তো?

–অনেক ধন্যবাদ।

 ডেভিস ইন বোতামটা টিপলেন। ফোনটা ট্যাগারের হাতে তুলে দিলেন।

পিটার–তার সম্বন্ধে আমার ধারণা একেবারে অন্য রকম ছিল। আমি ভেবেছিলাম যে বিয়ের আগেই টাকা চাইবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অন্য রকম।

–কী হয়েছে সেনেটর?

–কেন এই তাড়া আমি বুঝতে পারছি। মিস স্টুয়ার্ট জানতে পেরেছে সে অন্তঃস্বত্তা। অলিভারের সন্তান তার পেটে। অর্থনৈতিক সাহায্য চাই। এটা হল পৃথিবীর এক আদিম খেলা!

.

এক ঘণ্টা কেটে গেছে, লেসলি ডাচ হিলে পৌঁছে গেছে। সেনেটরের ফার্ম। একজন গার্ড দাঁড়িয়েছিল–মিস স্টুয়ার্ট?

-হ্যাঁ।

–সেনেটর ডেভিস আপনার জন্য বসে আছেন। আপনি এই দিকে যান।

লম্বা করিডোর, লাইব্রেরির প্রত্যেকটি তাকে বই। সেনেটর ডেস্কে বসে ছিলেন। একটা বই পড়ছিলেন। লেসলির দিকে তাকালেন, মাই ডিয়ার, বোসো।

লেসলি বসল, সেনেটর বলতে থাকলেন ব্যাপারটা সত্যিই উত্তেজনায় ভরপুর। কেনটাকির ডার্বির নাম সকলেই জানে। তুমি জানো এই ডার্বিতে প্রথম কে জিতেছিল?

-না।

–১৮৭৫ সালে অ্যারিসটিডেস, তবে তুমি তো ঘোড়ার গল্প শুনতে এখানে আসোনি।

 বইটা বন্ধ করে তিনি বললেন–বলল, তুমি আমার কাছ থেকে কী সাহায্য চাইছো?

সেনেটর জানেন এখন কোন্ শব্দগুলো ভেসে আসবে ওই তরুণী বুদ্ধিমতী রূপসী মেয়েটির মুখ থেকে। ও এক্ষুনি বলবে আমি আবিষ্কার করলাম আমার পেটে অলিভারের বাচ্চা। কী করবো বুঝতে পারছি না। আমি চাইনা ব্যাপারটা জানাজানি হোক। আমি এই বাচ্চাটাকে মানুষ করতে চাইছি। কিন্তু অত টাকা আমার নেই।

আপনি কি হেনরি চেম্বারসকে চেনেন? লেসলির প্রশ্ন।

সেনেটর ডেভিস অবাক হয়ে গেছেন–এইভাবে প্রশ্ন হতে পারে তিনি ভাবতেই পারেননি- হ্যাঁ, আমি চিনি, কেন?

–একটা চিঠি লিখে দেবেন।

সেনেটর ডেভিস লেসলির দিকে তাকালেন।

–এটাই কী সাহায্য? তুমি হেনরি চেম্বারসের সঙ্গে দেখা করতে চাও?

-হ্যাঁ।

উনি এখন এখানে নেই মিস স্টুয়ার্ট, উনি এখন অ্যারিজোনাতে থাকেন।

আমি জানি, আমি অ্যারিজোনাতে যাচ্ছি। সেখানকার কারোর সাথে পরিচয় থাকলে ভালো হতো।

সেনেটর ডেভিস কিছু একটা ভাবলেন। এমন কোনো ঘটনা যা তিনি বুঝতে পারছেন না।

তিনি প্রশ্ন করলেন–হেনরি চেম্বারস সম্পর্কে তোমার কিছু জানা আছে কি?

না, শুধু জানি উনি কেনটাকি থেকে এসেছেন।

সেনেটর কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। মেয়েটি সুন্দরী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আচ্ছা কী করা যায় দেখছি। উনি বললেন–আমি ফোন করছি।

পাঁচ মিনিট বাদে উনি হেনরি চেম্বারসের সঙ্গে কথা বললেন।

–হেনরি, তেমাকে একটা খুশির খবর দিচ্ছি।

আমার এক বন্ধু কাল তোমার শহরে পৌঁছচ্ছে। ওখানে সে কিছুই চেনে না। তুমি একটু ওপর ওপর নজর রাখবে।

কেমন দেখতে?

সেনেটর লেসলির দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন–খুব একটা খারাপ নয়। তবে পেছনে লেগো না যেন।

কিছুক্ষণের নীরবতা, লেসলির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন–তোমার প্লেন কখন নামছে?

দুটো বেজে পঞ্চাশ, ডেল্টা ফ্লাইট একশো উনষাট।

সেনেটর খবরটা ফোন মারফত জানিয়ে দিলেন।

–ওর নাম লেসলি স্টুয়ার্ট, একটু দেখো হেনরি। তোমার সঙ্গে পরে যোগাযোগ রাখবো।

ধন্যবাদ, লেসলি বলল।

তারপর? সেনেটর ভাবতে বসলেন হেনরি চেম্বারসের সঙ্গে এই মেয়েটির কি দরকার থাকতে পারে?

.

ব্যাপারটা এতদূর পৌঁছে গেছে লেসলি ভাবতেও পারেনি। এটা যেন এক শেষ না হওয়া দুঃস্বপ্ন।

সব জায়গায় ফিসফিসানি, কানাকানি। কেউ বলছে–এই হল সেই মেয়েটি, না, এটা অলিভারের করা মোটেই উচিত হয়নি।

–আমি ভাবছি বিয়ের গাউনটা নিয়ে মেয়েটা এখন কী করবে?

এত সমালোচনা, এত তিক্ত ব্যক্য। লেসলি ভাবলো, না, এবার আর কোনো ক্ষমা নেই। অলিভারের হাতে টাকা এবং ক্ষমতা আছে। আমি তার থেকেও বেশি অর্থবান হয়ে উঠবো, কিন্তু কীভাবে?

.

ফ্রাঙ্কফুর্ট, সেন্ট ক্যাথিড্রাল ফুল দিয়ে সাজানো হল। সেখানেই উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান।

জ্যান অলিভারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। গর্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে স্বামীর দিকে। স্বামীকে কেনটাকির গভর্নর হিসেবে শপথ নিতে হল।

এবার অলিভারের গন্তব্য হোয়াইট হাউস, বাবা বলেছেন এটা উনি করবেন। জ্যান ভাবলো, সবকিছুই সুন্দরভাবে এগিয়ে চলেছে।

.

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে, অলিভার এবং শ্বশুরমশাই এগজিকিউটিভ ম্যানসনের বিরাট লাইব্রেরিতে দাঁড়িয়ে আছেন।

সেনেটর টড ডেভিস চারপাশে তাকালেন। বললেন–বাঃ, একটা সুন্দর জীবন, ভালো লাগছে তো?

অলিভার শান্তভাবে জবাব দিলেন–সবকিছুই আপনার জন্যে স্যার, আমি কোনোদিন ভুলবো না।

 সেনেটর ডেভিস হাত নাড়লেন–না, এই কথাটা মনে রেখো না। তোমার যোগ্যতা ছিল, তাই তুমি এখানে আসতে পেরেছে। আমি একটু সাহায্য করেছি মাত্র।

…আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তোমায় কিছু বলবো, তুমি শুনবে তো?

অলিভার বললেন–হা টড, আমি নিশ্চয়ই শুনবো।

–মনে রেখো, একজন রাজনীতিবিদকে নানা ধরনের সমস্যার সামনে দাঁড়াতে হয়। কখনও সমস্যার সামনে ভেঙে পড়ো না, বুঝলে?

সেনেটর তার দামী চামড়ার ব্রীফকেসটা খুললেন। একগোছা কাগজ তুলে দিলেন অলিভারের হাতে। বললেন–কেনটাকিতে যে সমস্ত মানুষের সঙ্গে তোমায় বাস করতে হবে এটা হল তাদের তালিকা। তাদের মধ্যে অনেকেই খুব শক্তিশালী। কিন্তু সকলেরই কিছু না কিছু দুর্বলতা আছে। যেমন ধরো মেয়র, তার দুর্বলতার কথা এই কাগজে লেখা আছে।

অলিভারের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে।

–আপনি এগুলো রেখে দিয়েছেন? আমি ভাবতেই পারছি না।

 টড হাসলেন। বললেন–হা। এটাই আমার সোনার খনি। অনেক বিশ্বাস করে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। দেখো নষ্ট কোরো না।

অলিভার মাথা নেড়ে বললেন–না, আমি নষ্ট করবো না।

 সেনেটর বললেন আমি ওয়াশিংটনে ফিরে যাব। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জানিও কেমন!

.

রোববার, সেনেটর ডেভিসের সঙ্গে কথা হল, অলিভার পিটার ট্যাগারকে খুঁজে বেড়ালেন।

-উনি চার্চে গেছেন গভর্নর।

–হ্যাঁ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম, কালকে যেন ওঁর সঙ্গে দেখা হয়।

পিটার ট্যাগার প্রতি রোববার চার্চে যান। পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে। দু-ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা করেন। এই মানুষটিকে দেখলে হিংসে হয়, অলিভার ভাবলেন।

সোমবার সকালবেলা, ট্যাগার অলিভারের অফিসে এসেছেন অলিভার, তুমি আমাকে ডেকেছো?

ব্যক্তিগত সাহায্য চাইছি।

–কী করতে হবে?

আমার একটা অ্যাপার্টমেন্ট চাই।

–কেন? এটা কী, তোমার পক্ষে থাকার ভালো জায়গা নয়।

না, রাত্রিতে ব্যক্তিগত অধিবেশন থাকে। সেগুলো বাইরে প্রকাশ করা যায় না। আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন।

কিছুক্ষণের নীরবতা–হ্যাঁ।

–শহর থেকে একটু দূরে। আপনি এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন কী?

–হ্যাঁ, পারবো।

–এটা কিন্তু আপনার আর আমার মধ্যে।

 পিটার মাথা নাড়লেন, বোঝা গেল খুশি হননি।

এক ঘণ্টা কেটে গেছে, সেনেটর ডেভিসের কাছে ফোন করলেন।

–অলিভার একটা অ্যাপার্টমেন্ট চাইছে, নিজের জন্যে। ব্যাপারটা গোপন রাখতে বলেছে।

–পিটার দেখো, জ্যান যেন জানতে না পারে। ইন্ডিয়ান হিলসের বাইরে একটা জায়গা বের করো। যেখানে গোপনে প্রবেশ করা যাবে।

পিটার অবাক হয়ে গেলেন, তিনি অন্যরকম ভেবেছিলেন।

.

০৪.

হঠাৎ দুটো নতুন সমস্যা এল লেসলির জীবনে। লেক্সিংটন হেরাল্ড লিডার পত্রিকার প্রতিবেদন। সম্পাদকীয় স্তম্ভে গভর্নর অলিভার রাসেলের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, একদিন অলিভার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামান্য প্রেসিডেন্ট হবেন।

পরর্বতী পাতায় আরেকটি প্রতিবেদন লেক্সিংটনের পুরোনো বাসিন্দা হলেন হেনরি চেম্বারস। তার ঘোড়া কেনটাকি ডার্বি জিতেছিল, পাঁচ বছর আগে। জেসিকা, তার তৃতীয় বউ, ডিভোর্স করেছেন। চেম্বারস এখন ফোনেইস্কে থাকেন। তিনি একটি পত্রিকার মালিক ও প্রকাশক।

গণমাধ্যমের বিপুল সম্ভাবনা। এটাই আসল শক্তি। আমরা জানি, ক্যাথেরিন গ্রাহাম এবং তার ওয়াশিংটন মোস্ট এক প্রেসিডেন্টের জীবন দুর্বিষহ করেছিল।

এই চিন্তাটা লেসলিকে আচ্ছন্ন করল।

.

দুদিন ধরে লেসলি ব্যস্ত ছিল হেনরি চেম্বারস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে। কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সে হাতে পেল। বয়েস পঞ্চান্ন বছর, পৃথিবীর সকলকেই ভালোবাসতে চান। বিরাট ব্যবসার মালিক। কিন্তু টাকাটা লেসলিকে আকর্ষণ করেনি।

আবার সেই পুরোনো কথা। সংবাদপত্র-এর মাধ্যকে জগৎ জয় করা যেতে পাবে।

.

সেনেটর ডেভিসের সঙ্গে কথা হল, লেসলি জিম বেলির অফিসে ঢুকে পড়ল–জিম, আমি যাচ্ছি।

–হ্যাঁ, তোমার ছুটির দরকার। কবে তুমি ফিরবে?

–আমি আর ফিরছি না।

–লেসলি কী বলছো? তুমি কেন পালিয়ে যাচ্ছ?

 না, আমি পালাচ্ছি না।

–তুমি কী ঠিক করেছো?

–হ্যাঁ।

–তোমাকে হারাতে হবে। সত্যি বলছো?

–হ্যাঁ, এটাই আমার স্থির সিদ্ধান্ত!

.

লেসলি স্টুয়ার্টের মনে নানা চিন্তার ভিড়। হেনরি চেম্বারসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। অনেকগুলো সম্ভাবনা। একটির পর একটি বাতিল করতে থাকে। ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে থাকে। সেনেটর ডেভিসের কথা মনে পড়ছে। ডেভিস আর চেম্বারসের একইরকম পটভূমি। একই বৃত্তের মধ্যে ঘোরাফেরা, দুজন দুজনের সাথে পরিচিত। তাই লেসলি ভাবল, আমার সিদ্ধান্তটা সঠিক।

.

ফোনেইস্কের ফ্লাই হারভার্ড এয়ারপোর্ট। লেসলির বিমান অবতরণ করেছে। সে টারমিনালের নিউজ স্ট্যান্ডের কাছে চলে গেল। ফোনেইস্ক স্টারের একটা কপি কিনলো। অ্যারিজোনার রিপাবলিক কিনলো। ফোনেই গেজেট কিনলো। হ্যাঁ, ওই জ্যোতিষীর কলামটা দেখা যাচ্ছে। আমি তো জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করি না। দেখা যাক কী লিখেছে? –ভবিষ্যতের দিনগুলো সোনালী হয়ে উঠবে। সাবধানে পা ফেলতে হবে।

লিমুজিন দাঁড়িয়েছিল, ড্রাইভার বলল–আপনি মিস স্টুয়ার্ট?

–হ্যাঁ

–মিঃ চেম্বারস তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন। আপনাকে হোটেলে নিয়ে যেতে হবে।

লেসলি একটু অবাক হয়েছে অনেক ধন্যবাদ। অবাকের সাথে হতাশা, লেসলি ভেবেছিল উনি বোধহয় নিজে আসবেন।

–আপনি কখন ডিনারে যোগ দেবেন?

–হ্যাঁ, উনি যখন আমাকে ডাকবেন।

.

আটটা বেজেছে, লেসলির সাথে হেনরি চেম্বারস নৈশভোজের আসরে বসে আছেন। চেম্বারস এক সুন্দর চেহারার পুরুষ। মুখের মধ্যে আভিজাত্যের ছাপ। ক্রমশ ধূসর হয়ে আসা–বাদামি চুল। সব সময়ে উৎসাহের আগুনে পুড়ছেন।

উনি লেসলির দিকে তাকিয়ে আছেন। শ্রদ্ধা ঝরে পড়ছে দৃষ্টি থেকে টড খুব একটা খারাপ বলেনি।

ধন্যবাদ।

লেসলি এখানে কেন এসেছো?

–আমি এই শহরটা সম্পর্কে অনেক শুনেছি, এখন থেকে এখানেই থাকবো।

-হ্যাঁ, এই শহরটাকে তুমি ভালোবেসে ফেলবে। অ্যারিজোনাতে সব আছে, গ্রান্ড ক্যানিয়ান, মরুভূমি, পাহাড়, তুমি সবকিছু পাবে।

লেসলি ভাবলো, হ্যাঁ, আমি সব পাবো।

–আমাকে একটা ছোট্ট জায়গা খুঁজে বের করে দিতে হবে। আপনি সাহায্য করবেন তো?

লেসলি জানে তার সঙ্গে যে টাকা আছে তাতে তিনমাসের বেশিচলবেনা। বড়জোড় দুমাস, কিন্তু দুমাসের পর সে এখানে নাও থাকতে পারে আর।

.

এ ধরনের অনেক বই পাওয়া যায়, কীভাবে ব্যক্তিত্বের বিকাশ করা সম্ভব। কীভাবে প্রতিপক্ষের মন জয় করবে। লেসলি এই সব বইতে বিশ্বাস করে না। মানুষকে জিতে নেবার নিজস্ব কৌশল ইতিমধ্যেই আয়ত্ব করেছে সে। একটির পর একটি অস্ত্র প্রয়োগ করতে থাকে হেনরি চেম্বারসের ওপর। হেনরি বিগলিত, স্বর্ণকেশী মেয়েরা সুন্দরী হয়ে থাকে, কিন্তু এত বুদ্ধিমতী?

আলোচনা এগিয়ে চলে–দর্শন, ধর্ম, আর ইতিহাস নিয়ে। শেষ অবধি বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

.

হেনরি চেম্বারস লেসলির সাহচর্য প্রার্থনা করছেন। অনেক বন্ধুকে তিনি একথা বলেছেন। জীবনে অনেক মহিলার সংস্পর্শে এসেছেন, অনেক বাজারী বেশ্যা, কিন্তু কাউকে তার ভালো লাগেনি। লেসলিকে নিয়ে তিনি আর্ট ফেস্টিভ্যালে গেলেন। অ্যাকট্রস থিয়েটারে। আরও কত জায়গাতে।

হকি খেলার আসর, হেনরি বললেন–তোমাকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে লেসলি। আমি কি তোমাকে ভালোবাসা জানাতে পারি?

লেসলি আনমনে হাত রাখলো হেনরির হাতে। শান্তভাবে বললো- অপেনাকে আমার ভালো লেগেছে হেনরি, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে আমি না বলবো।

.

পরের দিন লাঞ্চের আসর, হেনরি টেলিফোন করলেন–তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

 লেসলির জবাব–আমি যাব। এই ডাকটার জন্য লেসলি অপেক্ষা করছিল।

দুটো সংবাদপত্র, অ্যারিজোনা রিপাবলিক আর ফোনেই গেজেট। দারুণ চলেছে। কিন্তু হেনরির কাগজ? কার? কেন পাঠাকদের মন জয় করতে পারছে না? ব্যাপারটা দেখতে হবে।

.

ফোনেইক্স স্টারের অফিসটা ছোট, লেসলি যা ভেবেছিল। লেসলি সবদিক ভালোভাবে দেখল। না, এইভাবে কোনো কাগজ চালানো যায় না।

হেনরি প্রশ্নের জবাব দিল। অনেক প্রশ্ন, লেসলি ভাবতেই পারছেনা, হেনরি কীভাবে কাগজ সম্পর্কে এত খবর রাখেন। তাহলে কাগজটা চলছে না কেন!

দুর্গের মতো একটা রেস্টুরেন্ট। পুরোনো ইতালীয় আমলের ডিনারটা দারুণ। চিংড়ি মাছের চচ্চরি, সস মাখানো শূয়োরের ঠ্যাং, ভিনিগারে চোবানো গরুর মাংস। আহা, আরও কত কী।

হেনরি বলতে থাকেন- আমি ফোনেইস্ককে ভালোবেসে ফেলেছি। ভাবতেই পারা যায় না, পঞ্চান্ন বছর আগে এখানকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র পঁয়ষট্টি হাজার। এখন দশলক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।

–আপনি কেন কেনটাকি ছেড়ে এখানে এলেন হেনরি?

কাঁধ ঝাঁকিয়ে–এটা আমার নিজস্ব চিন্তাধারা নয়, আমার ফুসফুঁসে ফুটো দেখা দিয়েছিল। ডাক্তাররা মৃত্যু দাখিলা লিখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন অ্যারিজোনাতে থাকলে আমি সেরে উঠবো। ভেবেছিলাম জীবনের বাকি দিনগুলো এখানে থাকবো।

 মুখে হাসি–তারপর? এখানেই থেকে গেলাম। আমাকে দেখে খুব বুড়ো বলে মনে হয় কী?

না, বয়সের তুলনায় আপনাকে আরও ছোট দেখায়।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেনরি প্রশ্ন করলেন–আমি জানতে চাইছি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?

লেসলি চোখ বন্ধ করলো, মনে পড়ে গেল, সেই শব্দগুলোর কথা, গাছের গুঁড়িতে লেখা ছিল, লেসলি তুমি আমাকে বিয়ে করবে?

ভেবো না, তুমি এক গভর্নরকে বিয়ে করছো, আমি চিরদিন সামান্য অ্যাটর্নি হয়ে থাকবো।

 লেসলি চোখ খুললো, হেনরির দিকে তাকালো-হ্যাঁ, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

দু-সপ্তাহ বাদে তারা পরস্পরকে বিয়ের বাঁধনে বেঁধে ফেললেন!

.

লেক্সিংটন হেরাল্ড লিডার পত্রিকাতে বিয়ের খবরটা প্রকাশিত হল। সেনেটর টড ডেডিস অনেকক্ষণ খবরটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

বোঝা গেল, লেসলি কেন এখানে এসেছিল। ব্যাপারটার মধ্যে রহস্য আছে।

কিন্তু কী সমস্যা? ঠিক বুঝতে পারা যাচ্ছে না!

লেসলি আর হেনরি প্যারিসে গেল হানিমুন কাটাতে। যেখানে তারা গিয়েছিল, সব জায়গাতেই অলিভার এবং জ্যানের পদচিহ্ন আঁকা আছে। অবশ্য এসবই লেসলির কম্পনা। লেসলি ভাবলো, অলিভার নিশ্চয়ই জ্যানের কানে কানে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই রকম গল্পগাথা যা বলে পুরুষরা নারীর মন জয় করার চেষ্টা করে।

কিন্তু হেনরি মানুষটা একেবারে অন্যরকম। উনি মিথ্যে কথা বলতে শেখেননি, অন্য সময় হলে লেসলি হয়তো সত্যি সত্যি মানুষটাকে ভালোবাসতো। কিন্তু এখন লেসলি প্রতিজ্ঞা করেছে, কোনো পুরুষকে আর সে কখনও বিশ্বাস করবে না।

.

কয়েকদিন বাদে তারা ফোনেইস্কে ফিরে এল। লেসলি হেনরিকে বলল–হেনরি, আমি ওই কাগজের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছি। আমি একটা বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতাম। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো।

হেনরি বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলেন।

 হেনরি বুঝতে পারলেন, লেসলি মন দিয়ে লেক্সিংটন হেরাল্ড লিডার পত্রিকাটা রোজ পড়ে।

তিনি জানতে চেয়েছিলেন বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইছো?

লেসলির মুখে হাসি আমি দেখতে চাইছি এই কাগজটা কেন এত বিখ্যাত। আমাদেরও সেইভাবে চিন্তা করতে হবে।

লেসলি জানিয়েছিল, স্টার পত্রিকাটা লোকসানে চলছে। হেনরির মুখ হাসি-হাসি, আমি বিভিন্ন সূত্র থেকে টাকা আয় করি। এতে আমার কী হবে?

না, এতে অনেক কিছুই হবে, লেসলি ভাবলো। ফোনেইস্ক স্টার কেন এত খারাপ অবস্থায় চলবে? নতুন যন্ত্রপাতি নেই, ছাপার পদ্ধতি মান্ধাতা আমলের।

লেসলি নানা বিষয়ে হেনরির সঙ্গে আলোচনা করলো। কিন্তু হেনরি ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এই পত্রিকা তার কাছে বিনোদনের মাধ্যম। এটাকে দাঁড় করালে কী লাভ?

লেসলি ভাবতে থাকে, ব্যাপারটা পাল্টাতে হবে।

.

স্টারের অ্যাটর্নির সাথে লেসলির বৈঠক।

কীভাবে কাজ চলছে?

মিসেস চেম্বারস, ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।

–এখনও আমরা বাঁচতে পারি কী?

–হ্যাঁ, প্রিন্টার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জো রিলে, লোকটা সুবিধার নয়। এক ইঞ্চি জমি সে ছাড়বে না। যদি রিলে রাজি থাকেন তাহলে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে।

–আপনি ওকে বিশ্বাস করেন?

–হ্যাঁ করি বটে, কিন্তু ব্যাপারটা খুবই শক্ত।

–কেন বলুন তো?

-শ্রমিকদের মধ্যে আন্দোলন দেখা দিয়েছে। তারা আরও কম সময় কাজ করবে, বেশি বেতন চাইছে। আরও অনেক কিছু।

লেসলি চুপ করে গেল, ভাবলো, এই সমস্যাটার সমাধান করতেই হবে।

.

দুটোর সময় প্রস্তাবিত বৈঠকটা হবে। লেসলির একটু দেরি হয়েছে, সেরিসেপশন অফিসের দিকে গেল, জো রিলে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেক্রেটারীর সাথে কথা বলছিলেন। অ্যামি, সুন্দর দেখতে এক কালো চুলের তরুণী।

জো রিলেকে ভালো চেহারার এক আইরিশ ম্যান বলে বোঝা যায়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। পনেরো বছর ধরে এই জগতের সঙ্গে যুক্ত। তিন বছর আগে তিনি ইউনিয়নের প্রধান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। শ্রমিকদের জন্যে লড়তে বদ্ধপরিকর।

রিলে বলতে থাকেন তাহলে? অ্যামি? ব্যাপারটা এভাবেই চলবে তো?

অ্যামির মুখে হাসি জো, তোমার কথা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়।

–আজ রাতে ডিনার? হবে কি একসঙ্গে?

–হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে ডিনার খেলে আমার ভালোই লাগবে।

রিলে তাকালেন, দেখলেন লেসলিকে শুভ বিকেল মিসেস চেম্বারস।

-শুভ বিকেল মিঃ রিলে, আপনি ভেতরে আসবেন তো?

.

রিলে আর লেসলি কনফারেন্স রুমে বসেছিলেন।

কফি খাবেন?

না, ধন্যবাদ।

–আর কিছু?

আপনি কি জানেন মিসেস চেম্বারস, কোম্পানির কাজের মধ্যে ড্রিঙ্ক করা উচিত নয়।

–আপনার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি, এবার কাজের কথায় আসা যাক।

–ঠিক আছে, বলুন কী শুনতে চাইছেন?

ইউনিয়নের প্রতি আমার সহানুভূতি থাকবে সবসময়। আমার মনে হয় আপনারা সত্যি আরও কিছু পেতে পারেন। কিন্তু এমন কিছু চাইবেন না যা আমরা দিতে পারবো না।

–ঠিক করে বলুন তো?

–আপনি কী জানেন বেশিরভাগ সময়ে ওভারটাইম দেওয়া হয়। তিনটে শিফটে কাজ করানো হয়। সপ্তাহের শেষে ছুটি। এইভাবে আর কতদিন চলবে? আমরা সবকিছু আবার নতুন ভাবে ভাববো।

–তার মানে? নতুন যন্ত্রপাতি? শ্রমিক ছাঁটাই? না, এটা আমি কিছুতেই হতে দেব না। এই পুরোনো মেসিনগুলো আছে বলেই অনেক শ্রমিকের পেটে অন্নের সংস্থান হচ্ছে।

রিলে উঠে দাঁড়ালেন–আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত আমাদের চুক্তি আছে। তারপর? নতুন চুক্তি হলে আমরা কেউ কাজ করবো না।

.

হেনরির কাছে লেসলি সব কিছু গুছিয়ে বলেছে।

হেনরি জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি কেন এই ঝামেলায় মাথা গলাচ্ছো? ইউনিয়নের সাথে পেরে উঠবে না। ওদেরকে কোনো উপদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তুমি এসব ব্যাপার জানো না, তাছাড়া তুমি একজন মহিলা, ছেলেরাই এগুলোর সমাধান করুক।

–তুমি কী ঠিক করেছো?

–হ্যাঁ, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অক্সিজেনের ট্যাঙ্ক দরকার।

–আমি সব ব্যবস্থা করবো, আমি একজন নার্স রাখবো, যখন আমি এখানে থাকবো না তখন ওই নার্স তোমায় সাহায্য করবে।

না, না, আমার নার্স লাগবে না।

–এসো হেনরি, তোমাকে বিছানাতে শুইয়ে দিই।

.

তিনদিন কেটে গেছে। লেসলি দরকারী বোর্ড মিটিং ডেকেছে। হেনরি বলল যাও, আমি এখানে থাকবো।

অক্সিজেন ট্যাঙ্ক তাকে সাহায্য করছে। মনে হচ্ছে, তিনি বোধহয় আরও দুর্বল হয়ে উঠেছেন।

লেসলি ডাক্তারকে ফোন করল–কয়েকদিনে ওজন অনেক কমে গেছে, সব সময় যন্ত্রণা হচ্ছে। আপনি কি একবার আসবেন?

মিসেস চেম্বারস, আমরা যথাসাধ্য করছি। মনে হচ্ছে ওকে এখন বিশ্রাম নিতে হবে।

লেসলি বসে পড়ল, দেখল, হেনরি বিছানাতে শুয়ে আছে, কাশছে।

হেনরি বললেন–ওই মিটিংটার জন্য দুঃখ লাগছে। তোমাকে সবকিছু পরিচালনা করতে হবে। কেউ নেই সাহায্য করার।

লেসলির ঠোঁটের কোণে তখন একটুকরো দুষ্টু হাসির বিচ্ছুরণ!

.

০৫.

বোর্ডের সব সদস্য কনফারেন্স রুমে ঢুকে পড়েছেন। কফি খাচ্ছেন রিম চিভে ডাক রাখছেন। লেসলির জন্য অপেক্ষা করছেন।

লেসলি ঢুকে বললো- এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য খারাপ লাগছে, হেনরি তার ভালোবাসা ও প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

এটা হল প্রথম বোর্ড মিটিং যেখানে লেসলিকে দেখা যাচ্ছে।

ধীরে ধীরে লেসলি সকলের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে নিল। সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করল। এবার আসল কথাবার্তা শুরু হবে।

অ্যামি কফি দিচ্ছিল, লেসলি বলল–অ্যামি, তুমি কি এই মিটিং-এ থাকবে?

অ্যামি অবাক হয়ে গেছে না, আমার শর্টহ্যান্ড খুব একটা ভালো নয় মিসেস চেম্বারস, সিনথিয়া এই কাজটা আরও ভালোভাবে করতে পারবে।

আমি তোমাকে লিখতে বলছি না। তুমি দেখো আমরা শেষকালে কোন্ কোন্ সিদ্ধান্ত নিলাম। তার একটা নোট রাখতে হবে।

অ্যামি নোট বুক বের করল, কলম এল, বলল–আমি তৈরি আছি।

লেসলি বোর্ড সদস্যদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল–আমাদের একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রেস ম্যানের ইউনিয়ন আমাদের সাহায্য করবে না। তিনমাস ধরে কথাবার্তা চলছে, এখনও কোনো শর্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সব প্রতিবেদন আপনাদের কাছে পাঠিয়েছি। এ সম্পর্কে আপনারা কী বলেন?

স্থানীয় লফার্মের পার্টনারের দিকে তাকাল লেসলি। জেনে অক্সফোর্নে, তিনি বললেন–ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে গেছে। শ্রমিকদের যা পাওনা তা দিয়ে দিন। তাহলে দেখবেন কাল তারা আবার বেশি চাইছে।

লেসলি অ্যারনের দিকে তাকালেন। স্থানীয় ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রধান। বললেন অ্যারন, আপনি কিছু বলবেন?

–আমি বলছি, এভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। যদি স্ট্রাইক হয় তাহলেও কোনো অসুবিধে নেই।

নানা ধরনের মন্তব্য ভেসে এল। কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হল না।

মিটিং শেষ হয়ে গেল, একে একে সকলে বেরিয়ে গেলেন। অ্যামিকে লেসলি বলল—তুমি এগুলি টাইপ করবে।

–মিসেস চেম্বারস, আমি এখনই টাইপ করছি।

লেসলি এগিয়ে গেল তার অফিসের দিকে।

.

টেলিফোনটা বেজে উঠেছে, অ্যামি বলল–মিঃ রিলে। আপনি কথা বলবেন?

লেসলি ফোন ধরে বলল–হ্যালো? জো রিলে।

–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি চেষ্টা করছেন।

 লেসলি বলল–আমি বুঝতে পারছি না।

–বোর্ড মিটিং, আমি সব শুনেছি।

কী করে শুনলেন? এটা তো একদম প্রাইভেট মিটিং।

জো রিলের মন্তব্য সব জায়গায় আমাদের বন্ধুরা আছে। আপনার চেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানাই।

কিছুক্ষণ নীরবতা, লেসলি বলল–মিঃ রিলে, এবার কি কোনো চুক্তি হতে পারে?

কী বলতে চাইছেন?

–আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা এসেছে। ফোনে কথা বলা যাবে না। কোথাও যোগাযোগ করা যায়? গোপনে।

একটুক্ষণের নীরবতা–হ্যাঁ, আসা যেতে পারে। কিন্তু কোথায়?

এমন একটা জায়গায় যেখানে আমাদের কেউ চিনতে পারবে না। গোল্ডেন কাপ?

–ঠিক আছে, আমি এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।

.

গোল্ডেন কাপ একটা অত্যন্ত সাধারণ কাফে। ফোনেইস্কের এককোণে অবস্থিত। রেলবোর্ড ট্যাক্সের কাছে। এই জায়গাটা থেকে ট্যুরিস্টরা দূরে থাকতেই ভালোবাসে। জো রিলে একটা কোণে বসেছিলেন। লেসলি প্রবেশ করল।

–আপনি এসেছেন বলে ধন্যবাদ।

–আপনি নতুন কিছু বলতে চাইবেন সেই আশায়…

–হ্যাঁ, বোর্ড সদস্যদের মাথামোটা। আমি সকলকে বোঝাবার চেষ্টা করেছি। তারা কেউ শুনলেন না।

–হ্যাঁ, আপনি নতুন চুক্তির কথা বলেছেন।

–আপনি ঠিকই বলেছেন, ওঁরা বুঝতেই পারছেন না যে আপনাদের সাহায্য এবং সহযোগিতা ছাড়া একটা পত্রিকার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। 

–যদি আপনি ওদের বিরুদ্ধাচরণ করেন তাহলে কী হবে?

–হ্যাঁ, ওরা সংখ্যায় ভারী, হয়তো দীর্ঘ স্ট্রাইক ডাকা হবে। পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে যাবে।

–তাহলে?

-আমি খুব গোপন কথা আপনাকে বলছি। পাঁচ কান করবেন না যেন। আমি বেশ বুঝতে পারছি, ওঁরা চাইছেন পত্রিকাটা বন্ধ করতে। শুক্রবার মধ্যরাত অবধি চুক্তি আছে, তাই তো?

–হ্যাঁ।

একটা ব্যাপার বোঝাতে পারবেন? বোঝাবেন যে আপনাদের সাহায্য ছাড়া স্টার চলবে না। তাই কিছু কিছু ক্ষতি করুন, এমন ক্ষতি যা পূরণ করা যাবে।

শ্রমিক নেতার চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে।

লেসলি বলতে থাকে আমি সত্যি ভেবে কিছু বলছি না। বলতে চাইছি এভাবেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। কয়েকটা কেবলের তার কেটে দিন। দুটো প্রেসকে বাতিল করে দিন। ওরা বুঝুক, কী করে সারানো যেতে পারে। সবকিছুই এক দুদিনে সারানো সম্ভব। ওদের চেতনা জাগাতে হবে।

জো রিলে অনেকক্ষণ বসে থাকলেন। বললেন–বাঃ, আপনার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না।

এখন আর বুদ্ধির কী দেখলেন? আবার বলছি, যদি বাঁচতে চান তাহলে ছোট ছোট ক্ষতিসাধন করুন। বোর্ডের লোকেদের টনক নাড়িয়ে দিন। বোঝান স্ট্রাইক হলে তা মেটানো সম্ভব হবে না। সবকিছুই করছি পত্রিকাটাকে বাঁচানোর জন্য।

রিলের মুখে হাসি আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়াবো মিসেস চেম্বারস?

.

আমরা স্ট্রাইক ঘোষণা করবো।

শুক্রবার, বারোটা বেজে এক মিনিট। জো রিলে এই সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রেসের লোকেরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তারা মেসিনের ওপর আক্রমণ করল। টেবিল উল্টে দিল, দুটো প্রিন্টিং প্রেসে আগুন ধরিয়ে দিল। একজন রক্ষী বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল, তাকে প্রচণ্ডভাবে মারা হল।

এবার দেখা যাক ওই বেজন্মারা কী করে?

একজন চিৎকার করল।

–আমরা না থাকলে কাগজ মরে যাবে।

–আমরাই আসল স্টার।

হাততালি, আরও বেশি উত্তেজনা।

এই বুনো উত্তেজনার মধ্যে আলো জ্বলে উঠল, দেখা গেল টেলিভিশনের ক্যামেরা আলো জ্বেলেছে। ছবি তোলা হল। রিপোর্ট পৌঁছে গেল অ্যারিজোনা রিপাবলিক পত্রিকায়। ফোনেইক্স গেজেট পত্রিকায়, আরও কয়েকটি ছোট ছোট সাময়িক পত্রিকায়। হাজির হলেন একডজন পুলিশ এবং ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা।

জো রিলে সব ব্যাপারটা নিজেই তদারকি করলেন। এত দ্রুত সব হল কী করে? পুলিশ দরজা বন্ধ করে দিল। রিলে ভাবলেন, ব্যাপারটা কি ঠিক হল? কেউ কি আমার পেটে লাথি মারলো? আমি কি লেসলি চেম্বারসের কাছে হেরে গেলাম?

বোঝা যাচ্ছে না, বোঝা যাচ্ছে না, ওই শয়তানি মেয়েটা সত্যিই কী চাইছে?

.

টেলিভিশনে ধ্বংসের ছবি। রেডিওতে ধ্বংসের খবর। সারা পৃথিবীর খবরের কাগজে সচিত্র প্রতিবেদন। বোঝা গেল, ফোনেইস্ক স্টার এবার জনগণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

লেসলির পরিকল্পনা এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে। এর আগে সে স্টারের কয়েকজন ব্যক্তিকে কানসাসে পাঠিয়েছিল। কীভাবে বড় বড় প্রেস চালাতে হয় সে ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কীভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলতে হয় সে ব্যাপারেও কথা বলতে।

সকাল হয়েছে, স্ট্রাইক শুরু হয়ে গেছে, অ্যামি হঠাৎ রেগে গেল।

.

শুক্রবার বিকেলবেলা, বিয়ের পর দু-বছর কেটে গেছে, হেনরির শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। শনিবার সকালবেলা তার বুকে ব্যথা হল। লেসলি এ্যাম্বুলেন্সে খবর দিল। তাকে হাসপাতালে পাঠানো হল। রবিবার হেনরি চেম্বারসের মৃত্যু হল।

লেসলি এখন বিরাট সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী।

.

সমাধির পর সোমবার। ক্রাগ ম্যাক অ্যালিস্টার লেসলির সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

–আইনের কয়েকটি ব্যাপারে আপনার সঙ্গে দেখা করবো।

বলুন কী বলতে চাইছেন?

হেনরির মৃত্যু লেসলিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। হেনরি সত্যিই এক সুভদ্রলোক ছিলেন। হেনরির সাহায্য লেসলিকে অনেকখানি শক্তি দিয়েছে। লেসলি অনুভব করল, হেনরির মৃত্যুর অন্তরালে অলিভারের নীরব উপস্থিতি।

–স্টার নিয়ে আপনি কী করবেন? আপনি কী পত্রিকাটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন নাকি?

–শুধু বাঁচিয়ে রাখা নয়, আমরা এই পত্রিকাটাকে আরও বাড়াবো। এই আমার সিদ্ধান্ত।

.

লেসলি ম্যানেজিং এডিটার পত্রিকার একটি কপি চেয়ে পাঠালো। এটা মার্কিন বাণিজ্যিক পত্রিকা।

সে বলল–আমি মিসেস হেনরি চেম্বারস বলছি। আরেকটা পত্রিকা প্রকাশ করতে চলেছি। আপনারা কি সাহায্য করবেন?

ফোনটা পৌঁছে গেল বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছে। ফোন পৌঁছে গেল অরিবনের সান পত্রিকার পরিচালকমণ্ডলীর কাছে।

লেসলি ম্যাক অ্যালিস্টার নামে বিশিষ্ট সাংবাদিককে বলল–আমি অবিলম্বে অরিবমে যাব, পত্রিকার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে হবে।

দুদিন কেটে গেল, ম্যাক অ্যালিস্টার ফোন করে জানালেন–সানের কথা ভুলে যান মিসেস চেম্বারস।

কী সমস্যা?

–হ্যামন একটা ছোট শহর, এখানে দুটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সান পত্রিকার বিক্রি মাত্র পনেরো হাজার। আরেকটা পত্রিকা আছে, হ্যামন ক্রনিকেল, প্রতিদিন সেটা আঠাশ হাজার কপি করে ছাপা হয়। সানের মালিক পঞ্চাশ লক্ষ ডলার চাইছেন, এত টাকা দিয়ে পত্রিকাটা কেনা কি উচিত?

একমুহূর্ত চিন্তা করে লেসলি জবাব দিল- হ্যাঁ, আপনি কথাবার্তা চালিয়ে যান।

.

লেসলি দুদিন কাটালো সংবাদপত্র পড়ে। পাশাপাশি অনেকগুলো বই পড়ল সে।

ম্যাক অ্যালিস্টার বলেছিলেন- সান কিন্তু কোনোভাবেই ক্রনিকেলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে না। প্রতি বছর সানের প্রচার সংখ্যা ক্রমশ কমছে।

লেসলি বলেছিল–আমি এখনও আমার সিদ্ধান্তটা পাল্টাচ্ছিনা, যে করেই হোক পত্রিকাটা আমাকে কিনতেই হবে।

.

তিনদিনেই ব্যাপারটা হয়ে গেল। সানের মালিক হবার পর লেসলি আনন্দে পরিপূর্ণ।

এই প্রথম সে সংবাদপত্রের জগতে হানা দিয়েছে। পঞ্চাশ লক্ষ ডলার দিয়েছে।

হ্যামন ক্রনিকেলের মালিক ওয়াল্ট মেরি ওয়েদার অবাক হয়ে গেছেন। তিনি সোজাসুজি লেসলিকে ফোন করলেন। বললেন–ম্যাডাম, আমার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, সান কি আমাকে বিক্রি করবেন?

লেসলি হেসে জবাব দিলেন–সবকিছু ভালো মতো চললে আপনি হয়তো একদিন ক্রনিকেল নিয়ে আমার কাছে হাজির হবেন।

মেরি ওয়েদার ফোন রেখে ভাবলেন, ছমাসের মধ্যেই সান কিনে নিতে হবে!

.

লেসলি ফোনেইক্সে ফিরে গেল। স্টার পত্রিকার ম্যানেজিং এডিটারের সঙ্গে পরামর্শ করল। তারপর ভদ্রলোককে পাঠাল হ্যামনদের কাছে, ওই পত্রিকা সম্পর্কে সব খবর জেনে আসতে হবে। নিয়মিত খবর পাঠাতে হবে।

.

অরিবম, সান পত্রিকার সকলকে নিয়ে এক অধিবেশন।

–আমরা আজ থেকে একটু অন্যভাবে চলবো। এই শহরে মাত্র দুটি পত্রিকা আছে, দুটির মালিকানা একই ছাতার নীচে আসবে।

সান পত্রিকার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেডেক জোহনেক্স এই কথা শুনে অবাক হয়ে গেছেন। তিনি বললেন–মিসেস চেম্বারস, আপনি বোধহয় অবস্থাটা ঠিক বুঝতে পারছেন না। আমাদের পত্রিকা ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে। এখন অন্য পত্রিকার কথা আমরা ভাববো কী করে?

 লেসলি বলেছিল- হ্যাঁ, ক্রনিকেলকে আমরা লড়তেই দেব না।

সকলের মনে একই আশা। কিন্তু তা সম্ভব হবে কি? ঝানু সাংবাদিক এই কথা শুনে হেসে উঠেছিলেন। পত্রিকার জগত থেকে মহিলা এবং অ্যামেচারদের বাইরে থাকা উচিত।

জোহনেক্স শান্তভাবে জানতে চেয়েছিলেন- আপনার পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বলবেন কী?

লেসলি প্রশ্ন করেছিল- আপনি কখনও ষাঁড়ের লড়াই দেখেছেন?

-কেন?

যখন ষাঁড়টা রেগে গিয়ে রিঙের মধ্যে ছুটে আসে তখন মাতাতো ষাঁড়টাকে আঘাত করার জন্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। তখন রক্তক্ষরণ হতে থাকে। যাড়টা আহত ও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তারপর মাতাতোর হত্যা করে।

জোহনেক্সের মুখে হাসি–আমরা ক্রনিকেলকে আঘাত করবো? কী করে?

শুনবেন কী করে? সোমবার থেকে আমরা সান পত্রিকার দাম কমিয়ে দেব। পঁয়ত্রিশ সেন্টের বদলে পঁচিশ-কুড়ি সেন্ট। বিজ্ঞাপনের দামও ত্রিশ শতাংশ কমিয়ে দেব। পরের সপ্তাহে আমরা একটা পরিকল্পনা ঘোষণা করবো। আমাদের পাঠক পাঠিকারা সারা পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবেন। এইভাবে বিজ্ঞাপন চলতে থাকবে।

ঘরে উপস্থিত সকলে বুঝতে পারলেন, উচ্চাকাঙ্খী এক মহিলার হাতে এই সংবাদপত্রটা এসে পড়েছে।

.

রক্তক্ষরণ শুরু হল, সানের দ্বারা আঘাত এবং আক্রমণ।

ম্যাক অ্যালিস্টার লেসলির কাছে জানতে চেয়েছিলেন সান কত টাকা নষ্ট করছে সে বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা আছে কি?

এই মুহূর্তে আমি বলতে পারছি না।

কতদিন এই পরিকল্পনাটা চলবে?

–যতদিন পর্যন্ত আমরা না জিততে পারছি, তবে আর বেশিদিন নয়।

 লেসলির মনে চিন্তা, সত্যি, প্রতি সপ্তাহে বোঝার অঙ্কটা বাড়ছে। তবুও প্রচার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতারা খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করছেন না।

ম্যাক অ্যালিস্টার বললেন–আপনার প্রকল্পটা বোধহয় কাজ করছে না। আপনি এভাবে টাকা নষ্ট করছেন কেন?

পরের সপ্তাহে একটা অঘটন ঘটে গেল। প্রচার সংখ্যা আর কমল না।

.

আট সপ্তাহ পরে সান আবার পূর্ব আকাশে উড়তে শুরু করল। দুটো প্রকল্পই দারুণভাবে কাজ করেছে। বারো সপ্তাহ ধরে এই ঘটনা ঘটল। বিশ্ব ভ্রমণের এই পরিকল্পনাটা চমৎকার। দক্ষিণ সমুদ্র থেকে লন্ডন, প্যারিস এবং রিও। যারা লটারীতে জিতেছেন, প্রথম পাতায় তাদের ছবি ছাপা হল। সান পত্রিকায় বিস্ফোরণ ঘটে গেল।

ক্রেগ ম্যাক অ্যালিস্টার বলেছিলেন–আপনি জুয়া খেলেছেন, কিন্তু ব্যাপারটা কাজে লেগেছে।

লেসলি বলেছে–না, এটা কিন্তু জুয়া খেলা নয়। আমি অনেক ভেবেচিন্তে পা রেখেছি।

.

ওয়াল্ট মেরি ওয়েদার অবাক হয়ে গেছেন। এই প্রথম সান পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ক্রনিকেলকে ছাড়িয়ে গেছে।

মেরি ওয়েদার মাথা চুলকে বললেন–এই লড়াই করে কী লাভ? আমিও বিজ্ঞাপনের খরচ কমাবো। প্রতিযোগিতার ঘোষণা করবো।

ব্যাপারটা হাত থেকে চলে গেছে। এগারো মাস আগে লেসলি সান পত্রিকা কিনেছিল, ওয়াল্ট মেরি ওয়েদার তাকে ফোনে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।

শেষ অবধি উনি ভাবলেন–আমি পত্রিকাটা বিক্রি করতে চাইছি। আপনি কি কিনবেন?

-হ্যাঁ।

.

ক্রনিকেলের চুক্তি সই হল। লেসলি তার সমস্ত কর্মচারীদের ডেকে পাঠিয়েছিল।

লেসলি বলেছিল–সোমবার থেকে আমরা সানের দাম বাড়িয়ে দেব, বিজ্ঞাপনের খরচও বাড়াবো, প্রতিযোগিতাও শেষ হয়ে গেল।

.

একমাস কেটে গেছে। লেসলি ক্রেগ ম্যাক অ্যালিস্টারকে বলল–ডেথওয়ার থেকে ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকাটা বেরোয়। আমি শুনেছি এই পত্রিকাটা বিক্রি করে দেওয়া হবে। ওনাদের হাতে একটা টেলিভিশন স্টেশনও আছে।

ম্যাক অ্যালিস্টার বাধা দেবার চেষ্টা করলেন–আমরা টেলিভিশন সম্পর্কে কিছুই জানি না।

–শিখতে হবে। দোষ কী?

এবার এক তথ্য প্রযুক্তির সাম্রাজ্য তৈরি হবার পথে এগিয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *