৬. অ্যারেস্ট

২৬.

–আপনাকে অ্যারেস্ট করা হল, নিজের স্ত্রীকে আপনি হত্যা করেছেন।

সব ঘটনা ঘটে চলেছে, সিনেমায় দেখা এক-একটি ছবির মতো। আবার তার হাতের ছাপ নেওয়া হল। ছবি নেওয়া হল। তাকে প্রিজন সেলে বন্দি রাখা হল। উনি বিশ্বাস করতে পারছেন না, পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আজ তাকে এইভাবে চোর-ঘঁচোরদের সঙ্গে দিন কাটাতে হবে।

–পিটার ডেমোনিসের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি এখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইছি।

মিঃ ডেমোনিডাস তার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ঠিক অবসর নয়, তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার গতিবিধির ওপর সতর্ক নজর রাখা হয়েছে।

তাহলে? কে এখন আমাকে সাহায্য করবেন? এই অন্ধকার বিবর থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। আমি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস, পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী মানুষ।

তিনি স্পেশ্যাল প্রসিকিউটরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন।

ঠিক সময়ে ডেলমা এলেন, এক ঘণ্টা বাদে। বললেন–আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন?

–হ্যাঁ, ডেমিরিস বললেন, আমি বুঝতে পারছি না, কেন আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? দুপুর তিনটের সময় আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে, ব্যাপারটা কি ঠিক?

–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন।

–তাহলে? আমাকে গ্রেপ্তার করার আগে কিছু কথা আমার কাছ থেকে শুনবেন তো? আমি তখন বীচ হাউসে ছিলাম না। আমি অন্য কোথাও ছিলাম।

–আপনি কি তা প্রমাণ করতে পারবেন?

–হ্যাঁ, আমার একজন প্রত্যক্ষদর্শী আছে।

.

স্পাইরস লামব্রো এসে হাজির হলেন পুলিশ কমিশনারের অফিসে। স্পাইরসকে দেখে ডেমিরিসের মুখে আশার আলো ফুটে উঠল।

স্পাইরস, ভগবান তোমাকে ঠিক সময়ে এখানে পাঠিয়েছেন। এই বোকারা মনে করছে, আমি মেলিনাকে হত্যা করেছি। তুমি তো জানো আমি তা করতে পারি না। তুমি পরিষ্কার করে বলল।

স্পাইরস বললেন–কী বলব?

–মেলিনাকে তিনটের সময় হত্যা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরবেলা। তখন তুমি আর আমি আক্রোকরিন্থে বসেছিলাম। আমি কি অত তাড়াতাড়ি বীচ হাউসে পৌঁছোতে পারি? অন্তত ঘণ্টা চারেক সময় তো লাগবে। তুমি ওই ব্যাপারে সব কথা খুলে বলল।

স্পাইরস লামব্রো অবাক হলেন–কী ব্যাপারে?

এবার ডেমিরিসের মুখে রক্তের ছটা–কেন? তুমি আর আমি গতকাল আলোচনা সভায় বসেছিলাম। অ্যাক্রোকরিন্থের লজে?

–তোমার ভুল হচ্ছে কোস্টা। আমি কাল দুপুরে একা একাই গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আমি তোমার জন্য মিথ্যে কথা বলব কেন?

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মুখ এখন রাগে পরিপূর্ণ।

তুমি এটা করতে পারো না। তিনি এগিয়ে গেলেন, লামব্রোর গলা চেপে ধরলেন, ঈশ্বরের দোহাই, সত্যি কথাটা বলল।

স্পাইরস লামব্রো তাঁকে সরিয়ে দিলেন–সত্যিটা হল, আমার বোন মারা গেছে। তুমি ঠান্ডা মাথায় তাকে হত্যা করেছ।

মিথ্যুক, ডেমিরিস চিন্তা করলেন। মিথ্যক। তিনি লামব্রোর দিকে কঠিন চোখে তাকালেন, না, দুজন পুলিশ তাকে আটকে রেখেছে।

কুকুরির সন্তান, তুমি জানো আমি নির্দোষ।

–এটা বিচারকরা বিচার করবেন। তোমার একটা ভালো আইনজীবী দরকার। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস বুঝতে পারলেন, এখন কেবল একজনই তাকে সাহায্য করতে পারেন।

তিনি হলেন নেপোলিয়ান ছোটাস। কিন্তু তিনি কোথায়? তিনি কি আর বেঁচে আছেন!

.

২৭.

কনফিডেনসিয়াল ফাইল–

ক্যাথেরিন ডগলাসের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তগুলিঃ

ক্যাথেরিন– অ্যালান, আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, আমরা ভবিষ্যতের কথা আগে থেকে জানতে পারি?

অ্যালান- বিজ্ঞানীরা তা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, কোনো কোনো সময় আমরা চোখ বন্ধ করলে ভবিষ্যতের স্পষ্ট ছবি দেখতে পাই। ক্যাথরিন, আপনি এমন কোনো ছবি দেখেন কি?

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাবে আমার জীবনে।

অ্যালান–এটা কি আপনার পুরোনো স্বপ্নের অংশ?

ক্যাথেরিন না, আমি তো বলেছি, এথেন্স থেকে কয়েক জন প্রতিনিধি এসেছেন।

অ্যালান–হ্যাঁ ।

ক্যাথেরিন– ডেমিরিস বলেছেন, তাঁদের দেখাশোনা করতে হবে। তাদের সকলের সাথেই আমার ভালো সম্পর্ক।

অ্যালান– তাঁদের কারও সাহচর্য কি আপনি পছন্দ করছেন না?

ক্যাথেরিন– না, আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। তারা এখনও পর্যন্ত আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, যে-কোনো মুহূর্তে একটা খারাপ ঘটনা ঘটে যাবে। আমি কি আমার মনের অবস্থা আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পেরেছি?

অ্যালান- ঠিক আছে। ওই প্রতিনিধি দল সম্পর্কে গুছিয়ে বলুন তো?

ক্যাথেরিন– একজন ফরাসি এসেছেন ইভেস রেনার্ড, তিনি বারবার মিউজিয়ামে যেতে চান। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুই দেখেন না। ইতিহাসের কোনো ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। তিনি শনিবার আমাকে নিয়ে স্টোনহেঞ্জে যাবেন।

আর একজনের নাম জেরি হ্যালি। তিনি এসেছেন আমেরিকা থেকে। তার ব্যবহার খুব একটা খারাপ নয়। তিনি কখনও আমাকে বিরক্ত করেন না।

তৃতীয় প্রতিনিধি ডিনো মাত্তুসি। তিনি বোধহয় মিঃ ডেমিরিসের কোম্পানির এক মস্ত বড়ো আধিকারিক। তিনি আমার অতীত জীবন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন, যেসব প্রশ্ন করা উচিত নয়। মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে আমাকে লং ড্রাইভে যেতে হয়। আমি একবার উইমকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম। তিনি রাজি হননি।

অ্যালান– আর কিছু কথা?

ক্যাথেরিন–উইম এখন অদ্ভুত আচরণ করছেন।

 অ্যালান- গুছিয়ে বলুন তো?

ক্যাথেরিন–সকালে আমি অফিসে আসি। উইম আমার জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু তিনি মুখ ফুটে কখনও তার অপেক্ষা করার কথা স্বীকার করেন না। আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখটা রাগে থমথম করতে থাকে। কেন এমন হয় বলুন তো?

অ্যালান– ক্যাথেরিন, আর কোনো স্বপ্ন? বলুন তো?

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে স্বপ্নে দেখলাম। স্বপ্নটা অদ্ভুত!

 অ্যালান- স্বপ্নের কিছুটা কি আপনার মনে আছে?

ক্যাথেরিন–আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি আমার প্রতি সদয় আচরণ কেন করছেন? তিনি কেন আমাকে এত বড়ো চাকরির দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। থাকার জন্য সুন্দর ফ্ল্যাট দিয়েছেন, কেন আমার হাতে সোনার ওই স্মারকচিহ্নটি তুলে দিয়েছেন?

অ্যালান- উনি কী উত্তর দিয়েছিলেন?

 ক্যাথেরিন– আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তখনই আমার ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল।

ডঃ অ্যালান হ্যামিল্টন কথোপকথনের এই পত্রটা ভালোভাবে পড়লেন। কোথাও কোথাও দাগ দিলেন। আহা, অবচেতন মনের উদ্ভাস। একটা সুত্র পাওয়া যাচ্ছে কী? কেন ক্যাথেরিনের মন এত চঞ্চল? ওই তিনজনের মধ্যে কি তার সম্ভাব্য আততায়ী লুকিয়ে আছেন? উইম এই নাটকে কোন ভূমিকাতে অবতীর্ণ হয়েছেন? নাকি সবই ক্যাথেরিনের মনের কল্পনা। উইমের আচরণের মধ্যে কি মানসিক প্রতিবন্ধকতার ছাপ রয়েছে। সব কিছু খতিয়ে দেখতে হবে। উইমের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অ্যালান ভাবলেন। একদিন তার সাথে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা দরকার।

অ্যালান বসে বসে ক্যাথেরিনের কথা চিন্তা করছেন। তিনি কখনও কোনো পেশেন্টের সাথে আবেগসঞ্জাত আচরণ করেন না। ক্যাথেরিনের ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। ক্যাথেরিন সত্যিই সুন্দরী, দারুণ ঐশ্বর্যশালিনী, তাকে আমি কীভাবে সাহায্য করব? আরও একটু বেশি সহযোগিতা? কোনো একটা ব্যাপারে মনস্থির করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

.

ক্যাথেরিনের মনেও অ্যালান হ্যামিল্টনের ছবি। আমি কী বোকা? ক্যাথেরিন ভাবল, উনি একজন বিবাহিত পুরুষ। সব পেশেন্টরা এমন ব্যবহার করলে কী করে হবে? ক্যাথেরিন কিন্তু মনের আবেগ চেপে রাখতে পারছে না। আর একজন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।

দুদিন বাদে অ্যালানের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

ক্যাথেরিন ভাবল। আমি যদি এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ক্যানসেল করে দিই? পরক্ষণেই অন্য চিন্তা। নাঃ, এখন আর তা করার উপায় নেই।

.

সকালবেলা, সেদিনই বিকেলে অ্যালানের সঙ্গে দেখা হবে, ক্যাথেরিন সুন্দরভাবে সাজল। অনেকদিন বাদে বিউটি পার্লারে গেল। আঃ, কতক্ষণ তাকে দেখিনি আমি। ক্যাথেরিন মনকে বোঝাবার চেষ্টা করল। নিজেকে সাজানো কি অন্যায়? অপরাধ প্রবণতা? না, তা কেন হবে!

ক্যাথেরিন অ্যালানের অফিসের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার মন ভাঙতে শুরু করেছে। উনি কি আমাকে তারিফ করবেন? ওঁনার বিয়ের আগে কেন যে দেখা হল না, কেন? কেন? আমি তো একজন সাধারণ রমণী। ভালো পুরুষের সান্নিধ্যে আসতে তো চাইবই। আমি তো এক তৃষিত রমণী। আঃ, অনেক ভাবনা আসছে মনের মধ্যে।

–আমি কি আসব?

ক্যাথেরিন বুঝতে পারল, সে একটু জোরে কথা বলে ফেলেছে। এটাই বোধহয় তার শেষতম সাক্ষাৎকার।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল–অ্যালান, একটা ফাটোগ্রাফের দিকে তাকাল, কফিটেবিলের ওপর পড়ে আছে, কতদিন আগে আপনার বিয়ে হয়েছে?

ক্যাথেরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে অ্যালান হেসে ফেললেন বিয়ে? ও এই ছবি, আমার বোন আর তার ছোট্ট ছেলে।

ক্যাথেরিনের মনের ভেতর ঝরনার কলতান।

–ওহ, অসাধারণ, এত সুন্দরী মহিলা!

–আপনি কি ঠিক আছেন ক্যাথেরিন?

কির্ক রেনল্ডসের স্মৃতি এখনও ক্যাথেরিনের মনকে আচ্ছন্ন করে থাকে।

আমি ঠিক নেই, কোনো দিন ঠিক হতে পারব না। ক্যাথেরিন ভাবল। কিন্তু মুখে সেই ভাবনার প্রতিফলন আনল না। সে বলল–আমি ভালো আছি। তা হলে আপনি বিয়ে করেননি?

না।

তুমি কি আজ রাতে আমার সাথে ডিনারে যাবে? তুমি কি আমাকে নিয়ে বিছানাতে শোবে? তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? না, ক্যাথেরিন এই কথাগুলো মনে মনে ভেবেছিল। মুখে বলতে পারেনি।

অ্যালান সন্তর্পণে তার এই রোগিনীটিকে নজর করছিলেন। তিনি বললেন–ক্যাথেরিন, মনে হচ্ছে, আর বোধহয় আমাদের দেখা হবে না। আজই আমাদের শেষ সাক্ষাৎকার।

ক্যাথেরিনের হৃদয় দুলতে শুরু করেছে কেন? আমি কি কোনো খারাপ ব্যবহার করেছি?

না, এভাবে ভাববেন না। আমার আর আপনার মধ্যে একটা পেশাগত সম্পর্ক থাকাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে, আমরা একে অন্যকে উন্মাদের মতো ভালোবাসতে শুরু করেছি। আমি বোধহয় আরও বেশি আবেগসঞ্জাত হয়ে উঠছি।

-হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, এটাই আমার খারাপ লাগছে।

–সত্যি আপনাকে না দেখলে আমার ভীষণ মন কেমন করে।

কথাগুলো বলতে পেরে ক্যাথেরিন খুবই খুশি হয়েছে।

আজ কি আপনার হাতে সময় আছে? ডিনারে যাবেন?

বলি-বলি করে শেষপর্যন্ত ক্যাথেরিন কথাটা বলেই ফেলল।

.

তারা একটা ছোট্ট ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে বসে নৈশ আহার সেরেছিল। সোহোতে এই রেস্টুরেন্টটির অবস্থান। খাবারটা খুব একটা ভালো নয়। তাতে কী হয়েছে? তারা পরস্পরকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে। একে অন্যের অভাব-অভিযোগ বুঝেছে।

ক্যাথেরিন বলেছে–অ্যালান, তুমি তো জানো আমার সম্পর্কে সব কিছু। তোমার অতীত? বলবে না? তুমি কি কখনও বিয়ে করেছিলে?

না, তবে আমি একজনকে কথা দিয়েছিলাম। বলতে পারো আমি তার বাগদত্তা।

তারপর কী হয়েছিল?

–এটা যুদ্ধের সময়। আমরা একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থাকতাম। চারিদিকে বোমা বিস্ফোরণ। হাসপাতালে কাজ করতে হচ্ছে। একরাতে বাড়ি ফিরে এলাম।

ক্যাথেরিন বুঝতে পারল, মাঝে ভয়ংকর কোনো ঘটনা ঘটে গেছে।

বাড়িটা একেবারে বিধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কোনো কিছুই ছিল না।

 সে অ্যালানের হাতে হাত রাখল। বলল–আমি দুঃখিত।

অনেকদিন পরে আমি শোকটাকে ভুলতে পেরেছি। তাই আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই না।

অ্যালান চোখ নামালেন। মনে মনে বললেন, কিছুদিন আগে পর্যন্ত, কিন্তু এখন আমি আমার মনকে পালটাতে পেরেছি।

চার ঘণ্টা তারা সেখানে বসেছিল। সব বিষয় নিয়ে মত বিনিময় করেছিল। থিয়েটার থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র, পৃথিবীর অবস্থা। আসল কথা কিন্তু বলা হয়নি, আহা, মাঝে এত বড়ো বাধা? তারা বুঝতে পেরেছে। শেষ অব্দি তাদের মধ্যে জেগেছে এক ধরনের যৌন উত্তেজনা।

অ্যালান আসল বিষয়টাতে এসে গেলেন ক্যাথেরিন, আজ সকালে আমি এই বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম তোমার সাথে, ডাক্তার এবং পেশেন্টের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক থাকা উচিত।

-না, এখানে বসে শুনব না। আমি এখনই তোমার সাথে ফ্ল্যাটে যাব। বাকি কথা সেখানে হবে।

.

তারা একসঙ্গে পোশাক খুলে ফেলল। দ্রুত এবং উৎসুক চিত্তে। ক্যাথেরিন যখন তার পোশাক খুলছিল, ভাবছিল, কির্ক রেনল্ডসের সঙ্গে কাটানো সেই মুহূর্তগুলোর কথা। এখন সব কিছু পালটে গেছে। প্রতিটি ভালোবাসার মধ্যে নতুন কবিতা লেখা হয় কি? ক্যাথেরিন আর একবার ভাবল। এখন আমি এই মানুষটিকে উন্মাদের মতো ভালোবাসছি।

সে উলঙ্গ হয়ে বিছানাতে শুয়ে আছে। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছে।

 অ্যালান এসে দাঁড়ালেন, আহা, একটি দৃঢ় আলিঙ্গন। সব দুর্দশা কোথায় হারিয়ে গেল। মৃত্যুর উন্মাদনা, মনে হল, না, কেউ আর কখনও আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। তারা একে অন্যকে আঘাত করল। ভালোবাসার আদর। প্রথমে আস্তে-আস্তে। তারপর বন্য উন্মত্ততায়। শেষ অব্দি তারা আরণ্যক এবং ভয়ংকর হয়ে উঠল। দুটো শরীর মিলেমিশে একাকার। ক্যাথেরিনের মুখ থেকে শিৎকারের শব্দ, খুশির উন্মাদনা। আমি আবার পরিপূর্ণ নারী হলাম। সে ভাবল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

সেখানে তারা অনেকক্ষণ শুয়েছিল। ক্যাথেরিন অ্যালানকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিছুতেই সে অ্যালানকে ছাড়বে না। না, পৃথিবীর সবথেকে মহার্ঘ্য বস্তু হাতে পেলেও নয়।

অবশেষে সে কথা বলল, তার কণ্ঠস্বর কেমন ভেঙে গেছে। সে বলল–ডাক্তার, এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, কীভাবে একজন পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট করতে হয়।

.

২৮.

কনস্টনটিন ডেমিরিসের গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটা পৌঁছে গেছে ক্যাথেরিনের কানে। খবরের কাগজে হেডলাইন। আচমকা আঘাত। ক্যাথেরিন তখন অফিস যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। সবকিছু কেমন ধূসর হয়ে গেল।

ইভলিন গুঙিয়ে উঠলেন- খবরটা শুনেছ? এখন আমরা কী করব?

–আমরা কাজ চালিয়ে যাব। মনে হচ্ছে, কোথাও একটা মস্ত বড়ো ভুল হয়েছে। আমি ওঁনার সাথে টেলিফোনে কথা বলার চেষ্টা করব।

কিন্তু কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে আর পাওয়া গেল না।

.

এথেন্সের সেন্ট্রাল প্রিজনে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস হলেন সবথেকে দামি বন্দি। তাঁর মতন নামি-দামি কেউ এর আগে ওখানে বন্দি হিসেবে আসেননি। প্রসিকিউটর বলেছেন, ডেমিরিস যেসব বিশেষ জিনিস চেয়েছেন, টেলিফোন করার অধিকার, টেলেক্স মেশিন, কুরিয়ার সার্ভিস, তার এই অনুরোধগুলো রাখা হয়নি।

 ডেমিরিস বেশির ভাগ সময় জেগে কাটান। তাঁর সব স্বপ্ন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মেলিনাকে তিনি হত্যা করেননি, কিন্তু হত্যার ঘটনাটা ঘটল কী করে?

প্রথম দিকে ডেমিরিস ভেবেছিলেন, একদল ছিঁচকে চোর ওই ভিলার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই চোরগুলোকে মেলিনাই বোধহয় ভাড়া করেছিল। তারা সবকিছু তছনছ করেছে। তারাই মেলিনাকে হত্যা করেছে। কিন্তু যখন পুলিশ বলল, সাক্ষ্যপ্রমাণ তার বিরুদ্ধে গেছে, ডেমিরিস বুঝতে পারলেন, এটা একটা ষড়যন্ত্র। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা কে করেছে? স্পাইরস লামব্রোর নামটাই প্রথমে মনে পড়ছে। তবে এই ভাবনার একটা দুর্বলতর জায়গা আছে। লামব্রো তার বোনকে ভালোবাসে একথা সত্যি। পৃথিবীতে আর কোনো বস্তুকে সে এতখানি ভালোবাসে না। সেই বোনের এত বড়ো ক্ষতি সে কখনোই করবে না। তার মানে এই প্রকল্পনাটা টিকছে না।

ডেমিরিস এবার টনি রিজোলির কথা ভাবলেন। টনির মস্তানবাহিনী কি শেষপর্যন্ত প্রতিশোধ নিল? তারা জানে রিজোলির হত্যাকাণ্ডের আন্তরালে কে আছে? তারা বোধহয় এভাবেই প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস এই ভাবনাটাও মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন। মাফিয়া গুণ্ডারা যদি প্রতিশোধ নেবার কথা ভাবত, তারা তাকেই পৃথিবী থেকে সরাত। এত ঝঞ্ঝাট ঝামেলা করত না।

তাহলে? ছোট্ট সেলের মধ্যে বসে ডেমিরিস নানা কথা ভাবতে থাকেন। অঙ্কের একটা ধাঁধা- ইচ্ছে করেই খেলছেন তিনি। কী হতে পারে তিনি জানেন না। শেষ অব্দি আশাহত হয়ে উঠলেন। একটি মাত্র উপসংহার পড়ে আছে মেলিনা আত্মহত্যা করেছে। নিজেকে নিজেই হত্যা করেছে সে। তার আগে একটা সুন্দর প্লট সাজিয়েছে। ডেমিরিস ভাবলেন, এখন নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের মতো অবস্থা। এখন ব্যাপারটা ঘুরে গেছে। একই জায়গায় তাকে থাকতে হচ্ছে। তাকে এমন একটি হত্যার জন্য অপরাধী ঘোষণা করা হয়েছে, যে হত্যাকাণ্ড তিনি কখনও করেননি। ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস!

.

জেলারকে দেখা গেল সেল দরজার সামনে আপনার আইনজ্ঞ এসেছেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে।

ডেমিরিস উঠে দাঁড়ালেন। জেলারের সঙ্গে বাইরে এলেন। ছোট্ট আলোচনা কক্ষ। আইনজ্ঞ বসেছিলেন। ভদ্রলোকের নাম ভাসিলিকি। মধ্য পঞ্চাশ। মাথায় ঘন ঝোঁপের মতো ধূসর রঙের চুল। মুভি স্টারের মতো চেহারাটা। তিনি নাকি নাম করা ক্রিমিনাল অ্যার্টনি। আমার কেসে কতটা সাহয্য করবেন?

জেলার বললেন–আপনাকে পনেরো মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে।

তিনি চলে গেলেন। আইনজ্ঞ এবং সম্ভাব্য অপরাধী ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই।

ডেমিরিস বললেন–আপনি আমার কাছ থেকে কী তথ্য শুনতে চাইছেন? বলুন আপনাকে কত টাকা দিতে হবে?

–মিঃ ডেমিরি, ব্যাপারটা খুব একটা সোজা নয়। চিফ প্রসিকিউটর কিন্তু এতে রাজি হননি।

চিফ প্রসিকিউটরের মাথাটা মোটা। ওরা আমাকে কিছুতেই এখানে আটকে রাখতে পারবে না। জামিনের কী হল? আমি জিজ্ঞাসা করছি, কত টাকা লাগবে?

ভাসিলিকি জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। বললেন–জামিন অগ্রাহ্য করা হয়েছে। পুলিশের । কাছে পরিষ্কার প্রমাণ আছে। মিঃ ডেমিরিস, আপনি ব্যাপারটা অত সহজ ভাববেন না।

–আমি মেলিনাকে হত্যা করিনি। আমি অসহায়। অ্যাটর্নি আমতা আমতা করতে থাকেন–হয়তো আপনার কথাই সত্যি। কিন্তু আপনার স্ত্রীকে কেউ তো হত্যা করেছে।

–কেউ না। আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।

অ্যাটর্নি তাকালেন–আমায় ক্ষমা করবেন মিঃ ডেমিরিস। মনে হয় না এই ব্যাপারটা আপনাকে সাহায্য করবে। আপনি অন্য কিছু ভাববার চেষ্টা করুন। এমন একটা তথ্য, যার সাহায্যে হয়তো শেষপর্যন্ত বাঁচতে পারবেন। আপনার এই তথ্যটা খুবই দুর্বল।

হৃদয় কাঁপতে শুরু করেছে। ডেমিরিস জানেন, অ্যাটর্নির কথাই সঠিক। পৃথিবীর কোনো জুরি এই বানানো গল্পটা বিশ্বাস করবে না। তাহলে উপায়?

.

পরের দিন সকালবেলা, অ্যাটর্নি আবার এসেছেন ডেমিরিসের সঙ্গে দেখা করার জন্য।

–আপনার জন্য একটা খারাপ খবর আছে।

ডেমিরিস হাসলেন। সেই হাসিতে বিষণ্ণতার চিহ্ন মাখা আছে। তিনি একটা জেলখানায় বন্দি, মৃত্যুদণ্ড শোনার জন্য অপেক্ষা করেছেন, আর এই মাথামোটা অ্যাটর্নিটা বলছেন, আরও খারাপ খবর? এর থেকে খারাপ খবর আর কী হতে পারে?

-বলুন?

–এটা আপনার শালাবাবু সম্পর্কে।

স্পাইরস? কী হয়েছে?

–আমার কাছে খবর আছে, উনি পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছেন। উনি ক্যাথেরিন ডগলাস নামে এক ভদ্রমহিলার কথা বলেছেন। ওই মহিলা নাকি বেঁচে আছেন। আমি জানি না, নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের বিচারে ঠিক কী হয়েছিল। তবে বুঝতে পারছি, ক্যাথেরিনকে হত্যা করার অপরাধে তাদের ফাঁসি হয়েছিল।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস আর শুনতে পারছেন না। সব ব্যাপার তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। ক্যাথেরিনকে তিনি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলেন। যদি ক্যাথেরিনকে খুঁজে পাওয়া যায়, আর ক্যাথেরিন মুখ খুলতে শুরু করে। তাহলে কী হবে? তাহলে নোয়েলে এবং ল্যারিকে হত্যা করার অপরাধে আবার অভিযুক্ত করা হবে আমাকে আঃ, লন্ডনে এখন আছে ক্যাথেরিন। তার সঙ্গে দেখা করাটা খুবই দরকার।

তিনি ঝুঁকলেন, অ্যাটর্নির হাত ধরলেন।

লন্ডনে একটা খবর পাঠাতে হবে, এখুনি।

.

খবরটা দুবার পড়লেন। প্রথম দিকটা আর একটু ভালো করলে ভালো হত। আঃ, ঈশ্বর, ঘটনাটা তাড়াতাড়ি ঘটাতেই হবে। অসীম ক্ষমতা একদিন আমার হাতে ছিল। এখন আমি সবকিছু হারিয়েছি। শেষ অব্দি? শেষ অব্দি খবরটা যাবে তো? যা কিছু করতে হবে আজ রাতের মধ্যে। ব্যাপারটা সুন্দর করে সাজাতে হবে। দেহের কোনো চিহ্ন যেন না থাকে। যা কিছু করতে হবে, আজ রাতের মধ্যে।

.

২৯.

কনফিডেনশিয়াল ফাইল—

 উইম ভ্যানডিলের সঙ্গে কথোপকথনের সারাংশঃ

 অ্যালান- আজ আপনি কেমন আছেন?

উইম–আমি ভালোই আছি ডাক্তার। আমি ট্যাক্সি নিয়ে এখানে এসেছি। ড্রাইভারের নাম রোনাল্ড ক্রিস্টি, লাইসেন্সের প্লেট ৩২৭১। ট্যাক্সি সার্টিফিকেট নাম্বার ৩৭। আমরা ৩৭টি রোভার পার করেছি। একটা বেন্টলে, দশটা জাগুয়ার, ছটা অস্টিন, একটা রোলস রয়েস, ২৭টি মোটর সাইকেল, ছটা বাইসাইকেল।

অ্যালান–আপনি কেন এখানে এসেছেন জানেন কি?

উইম–আপনি জানেন।

 অ্যালান– আমাকে বলুন তো?

উইম- আমি সব মানুষকে ঘেন্না করি।

অ্যালান– ক্যাথেরিন আলেকজান্ডার সম্পর্কে আপনার কী মত? উইম, বলুন, কথা বলুন?

উইম–ওখানে তিনি আর কাজ করতে পারবেন না।

অ্যালান- আপনি কী করে জানলেন?

 উইম- তাকে হত্যা করা হবে।

অ্যালান–কে আপনাকে একথা বলেছে?

 উইম- উনি আমাকে বলেছেন।

অ্যালান– ক্যাথেরিন বলেছে, তাকে হত্যা করা হবে?

উইম- না, অন্য একজন।

 অ্যালান– কে সেই লোক?

 উইম–একজনের স্ত্রী।

অ্যালান–কার স্ত্রী, উইম?

 উইম–কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের।

 অ্যালান–ক্যাথেরিন আলেকজান্ডারকে হত্যা করা হবে, এটা ডেমিরিস নিজে বলেছেন?

উইম- না, শ্ৰীমতী ডেমিরিস, ওঁনার স্ত্রী, গ্রিস থেকে ফোন করেছিলেন।

অ্যালান- কে ক্যাথরিনকে হত্যা করবে?

উইম- কেউ একজন।

 অ্যালান– তার মানে যাঁরা এথেন্স থেকে এখানে এসেছেন?

উইম- হ্যাঁ।

 অ্যালান– আমাদের কথাবার্তা এখানেই শেষ হল। আমাকে এখনই যেতে হবে।

উইম–ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ।

.

৩০.

হেলেনিক ট্রেড করপোরেশনের অফিস ছটার সময় বন্ধ হয়ে যায়। ছটা বাজার কিছুক্ষণ বাকি আছে। ইভলিন এবং আর সকলে গোছগাছ শুরু করে দিয়েছেন।

ইভলিন ক্যাথেরিনের অফিসের দিকে হেঁটে গেলেন। প্রশ্ন করলেন–মিরাকল অন থার্টিফোর স্ট্রিট দেখতে যাবে নাকি? ক্রাইটেরিয়নে এই নাটকটা হচ্ছে। রিভিউ করেছে। আজ রাতে তুমি ফাঁকা আছো?

ক্যাথেরিন জবাব দিল না, আমি পারব না। ইভলিন, জেরি হ্যালিকে কথা দেওয়া আছে, আজ তার সঙ্গে থিয়েটারে যেতেই হবে।

–ওঁরা সব সময় তোমাকে ব্যস্ত রাখেন, তাই তো? ঠিক আছে, ভালো থেকো, কেমন?

.

ক্যাথেরিন শুনতে পেল, একে একে সকলে অফিস থেকে চলে যাচ্ছে। আহা, এখন এখানে শুধু নৈঃশব্দ্য। সে শেষবারের মতো তার ডেস্কের দিকে তাকাল। সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো? কোট পরে নিল। পার্সটা হাতে নিল। ধীর পদক্ষেপে সামনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। টেলিফোনের আর্তনাদ। ক্যাথেরিন চিন্তা করল, এখন ফোনে উত্তর দেওয়া উচিত হবে কি? ঘড়ির দিকে তাকাল, এখনই যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। টেলিফোনটা চিৎকার করছে। সে ছুটে এল। রিসিভার তুলে বলল–হ্যালো।

ক্যাথেরিন, অ্যালান হ্যামিল্টনের গলা। নিশ্বাসের শব্দ, হায় ঈশ্বর, শেষপর্যন্ত তোমাকে ধরতে পেরেছি।

কিছু হয়েছে কি?

–তোমার জীবন এখন দারুণ সংশয়ের মধ্যে। কেউ তোমাকে মেরে ফেলতে চাইছে।

ক্যাথেরিন গোঙানির শব্দ করল, সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটা আবার তাকে তাড়া করছে। সে জানতে চাইল, কে?

–আমি ঠিক জানি না। তুমি যেখানে আছে সেখানেই থাকো। অফিস ছেড়ে কোথাও যেও না। কারও সঙ্গে কথা বলো না। আমি এখুনি আসছি।

–অ্যালান…

–না, ভয় পেও না। আমি রাস্তায় আছি। নিজেকে বন্ধ করে রাখো। আমি গেলেই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

লাইনটা কেটে গেল।

 ক্যাথেরিন রিসিভারটা রেখে দিল- ওঃ হায় ঈশ্বর!

আটানসকে দরজার সামনে দেখা গেল। সে ক্যাথেরিনের বিবর্ণ মুখের দিকে তাকাল। বলল–ম্যাডাম, কিছু হয়েছে কি?

ক্যাথেরিনের কণ্ঠস্বরে ভয়–কেউ আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে।

ছেলেটি বলল–কে? কেন?

–আমি ঠিক জানি না।

 সামনের দরজায় শব্দ পাওয়া গেল।

আটানস ক্যাথেরিনের দিকে তাকিয়ে বলল–আমি কি দরজা খুলব?

ক্যাথেরিন বলল–না, কাউকে ঢুকতে দিও না। ডাক্তার হ্যামিল্টন আসছেন।

আবার আবার জোরে জোরে শব্দ হল।

আটানস ফিসফিসিয়ে বলল–ইচ্ছে করলে আপনি বেসমেন্টে লুকোতে পারেন।

 ক্যাথেরিন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–তুমি ঠিকই বলেছ।

 তারা পেছনের করিডরে চলে গেল। এখানে একটা পথ আছে বেসমেন্টের দিকে।

ডাক্তার হ্যামিল্টন এলে বলল, ততক্ষণ আমি ওখানে আছি।

–এখানে লাফিয়ে পড়তে আপনি ভয় পাবেন না তো?

না, ক্যাথেরিন জবাব দিল। আটানস আলো দেখাল। বেসমেন্টের সিঁড়ি দেখা যাছে।

–কেউ আপনাকে এখানে খুঁজে পাবে না। আটানস বলল, কে বা কারা আপনাকে মারতে চাইছে? আপনি কিছু বলবেন কি?

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মুখখানা মনে পড়ে গেল। দুঃস্বপ্ন আবার তাকে তাড়া করল। দুঃস্বপ্নের মধ্যে আমি স্পষ্ট দেখেছি, ডেমিরিস আমাকে মারতে চাইছেন।

কিন্তু এটা তো একটা স্বপ্ন।

ক্যাথেরিন বলল–আমি জানি না।

 আটানস তাকাল তার দিকে আমি জানি।

 ক্যাথেরিন বলল–কী?

–আমি। দেখা গেল তার হাতে একটা ব্লেড রয়েছে। সে ধীরে ধীরে সেই ব্লেডটা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।

–আটানস, ক্যাথেরিনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, এখন ছেলেমানুষি কোরো না।

ক্যাথেরিনের মনে হল, কেউ বোধহয় একটা ছুরি তার ভেতর চালিয়ে দিয়েছে।

অ্যাপয়ন্টমেন্ট ইন সামারা ছবিটা দেখেছেন ক্যাথেরিন? হয়তো দেখার সুযোগ পাননি। কেউ একজন মৃত্যুর কাছ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। সে সামারার কাছে চলে যায়। সে জানত না, সামারার কাছেই মৃত্যু অপেক্ষা করছে। আমি হলাম আপনার সামারা, ক্যাথেরিন।

ওফ, এই শব্দগুলো শুনতে ভালো লাগছে না, এই বোকা বোকা মুখের ছেলেটি এমন সাজিয়ে কথা বলতে পারে?

–আটানস, প্লিজ, এমন আচরণ কোরো না।…

সে একটা চড় মেরে দিল ক্যাথেরিনের মুখের ওপর।

–আমি এটা করতে পারি, কারণ আমি কিশোর নই। আমি কি আপনাকে অবাক করে দিয়েছি? হ্যাঁ, আমি খুব ভালো অভিনেতা। আমার তিরিশ বছর বয়স। কেন আমার চেহারাটা এমন, আপনি জানেন কি? যখন আমি বড়ো হয়ে উঠেছিলাম, দুবেলা দুমুঠো খাবার পাইনি। রাস্তায় শুয়ে দিন কাটিয়েছি। লোকে যা ফেলে দিয়েছে, তাই খেয়েছি।

এখনও ছুরিটা তার হাতে ধরা আছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছে। ক্যাথেরিন পিছোতে পিছোতে দেওয়ালের কাছে চলে গেছে।

যখন আমি এক কিশোর ছিলাম, আমি দেখেছি, সৈন্যরা এসে আমার মাকে ধর্ষণ করেছে। আমার মা আর বাবা- দুজনকেই তারা মেরে ফেলে। তারপর? তারা আমাকে ধর্ষণ করে। আমাকে মরা ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। আটানস আরও সামনে এগিয়ে বেসমেন্টের মধ্যে।

–আটানস, আমি তো কখনও তোমার কোন ক্ষতি করিনি। তুমি কেন এভাবে আমাকে আঘাত করছ?

আটানস হাসল, সেই হাসি সরলতায় ভরা ম্যাডাম, এখানে ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে কিছু নেই। এটা একটা ব্যবসা। আপনার জীবনের দাম পঞ্চাশ হাজার ডলার। কিন্তু জীবন নয়, আপনার মৃত্যু। আপনাকে হত্যা করলে এই টাকাটা আমার হাতে আসবে।

পর্দাটা এবার উঠে যাচ্ছে। ক্যাথেরিন সবকিছু দেখতে পাচ্ছে, লাল আলোর মধ্যে। তার সমস্ত পৃথিবী এখন অন্ধকার। একটু বাদে কী ঘটবে সে জানে।

–এটা একটা সুন্দর পরিকল্পনা। কিন্তু আর সময় নেই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। খেলাটা এখানেই শেষ করা দরকার।

ক্যাথেরিন বুঝতে পারল, এই ছুরিটা এবার তার গলার ভেতর ঢুকে পড়েছে। কিন্তু, ছেলেটি ছুরি সরিয়ে নিয়েছে। তার পোশাক ছিঁড়ে দিয়েছে।

 সে বলল–সুন্দর, খুবই সুন্দর! এসো, আগে একটু মিলনের দৃশ্য অভিনীত হোক। হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই। একটু বাদে আবার তোমার ওই প্রেমিকটা এসে পড়বে। তাই তো? আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি। ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি। তুমি কি তা বুঝতে পারো সুন্দরী?

ক্যাথেরিন দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। সে বোধহয় আর নিশ্বাস নিতে পারছে না।

আটানস তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা বোতল বের করল। ঘন তরল, গোলাপী রঙের।

–তুমি কি কখনও স্লিভভাভিক খেয়েছ? আহা, তোমার মৃত্যু উপলক্ষে আজ আমি এটা পান করব।

সে ছুরি দিয়ে বোতলটা খুলে ফেলল। ক্যাথেরিন পালাতে চেয়েছিল।

আটানস শান্তভাবে বলল–চেষ্টা করো, কোথাও যেতে পারবে না।

ক্যাথেরিন জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল–আমার দিকে তাকাও। আমি তোমাকে টাকা দেব।

চুপ করো! আটানস ঝপ করে খানিকটা মদ তার গলায় ঢালল। বোতলটা ক্যাথেরিনের হাতে দিল, খেয়ে নাও, জীবনের শেষ খাওয়া।

-না, আমি খাব না।

–তোমাকে খেতেই হবে।

 আদেশ করছ।

ক্যাথেরিন বোতলটা নিল। একটুখানি খেল। আঃ, এই ব্রান্ডি বোধহয় তার দেহ জ্বালিয়ে দেবে। আটানস বোতলটা ফেরত নিল। অনেকটা খেয়ে ফেলল।

ডাক্তারকে কে বলেছে? কে বলেছে তোমাকে মেরে ফেলা হবে?

–আমি জানি না।

–তবে জানলেও কিছু আসে যায় না। আটানস এবার সিলিং-এর দিকে তাকিয়েছে। একটা মোটা কাঠের গুঁড়ি দেখিয়ে বলেছে ওখানে চলে যাও।

ক্যাথেরিন ইচ্ছুক চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে, মৃত্যু এসে গেছে। সে বলল তুমি এভাবে আমাকে মেরে ফেলবে?

আটানস চিৎকার করে উঠল তুমি আমাকে একদম প্রভাবিত করার চেষ্টা কোরো না।

ক্যাথেরিন কাঠের থামের আড়ালে চলে গেল।

বাঃ, এই তো আমার খুকুমণি। আটানস বলল, এবার ওখানে চুপটি করে বসো। সে এক মুহূর্ত ক্যাথেরিনের দিকে তাকাল এবার বোধহয় সব কিছুর অবসান হয়ে যাবে।

এবার কি ক্যাথেরিন ছুটে পালাবে, সিঁড়ি ধরে? বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছে সে। জীবনের জন্য তাকে এই কাজটা করতেই হবে। সে প্রথম সিঁড়িতে পা রাখল। দ্বিতীয় সিঁড়িতে। যখন সে চলে যাবে, কে যেন তাকে ল্যাং মেরেছে। সে পড়ে গেছে। না, নোকটাকে দেখতে ছোটোখাটো, কিন্তু পায়ে অসীম শক্তি ধরে।

কুকুরির বাচ্চা! এবার চুলের মুঠি ধরে সে তাকে টানল। তার মুখটা মেঝের সঙ্গে ঘষে দিয়েছে। তুই আবার এটা করার চেষ্টা কর, আমি তোর দুটো পা ভেঙে দেব।

আবার ক্যাথেরিন বুঝতে পারল, ছুরিটা তার শরীরের সাথে আটকে রয়েছে।

 চল, ওই থামের কাছে গিয়ে দাঁড়া।

আটানস তাকে থামের কাঠের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। বলল–এখানেই থাক।

.

ক্যাথেরিন সব কিছু তাকিয়ে দেখছিল। আটানস কার্ডবোর্ড বাক্সের ওপর হেঁটে চলেছে। সে একটা দড়ি দুভাবে ভাগ করল। আরও ভালোভাবে তাকে বেঁধে ফেলল। শেষবারের মতো ক্যাথেরিন প্রার্থনা করেছিল, কিন্তু তার এই ভিক্ষা রাখা হয়নি।

সে বলেছিল- আটানস, এভাবে আমাকে কষ্ট দেবে?

আটানস চড় কষিয়ে দিল ক্যাথেরিনের মুখের ওপর। আহা, কী তীব্র যন্ত্রণা।

 ফিসফিসিয়ে সে বলল–আমার কথার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা কোরো না। আমি বলেছি ততা, খুন করার আগে তোকে ধর্ষণ করব। তারপর…

ছেলেটি হাসছে। ছেলে, না যুবক কী নামে তাকে ডাকব! ক্যাথেরিনের হাত-পা শক্ত করে বাধা। সে বুঝতে পারল, এই বাঁধন সহজে খুলবে না। তার মনে হল রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সে বলল–একটু-একটু আলগা করবে?

লোকটা গুঙিয়ে উঠেছে- ঠিক আছে। সে সামান্য আলগা করল। কিন্তু পা দুটো বেঁধে দিয়েছে। বলল, এখানে আমরা থাকব। আহা, ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে। আর একটু মদ গিলে ফেলল সে। আধ ফাঁকা বোতলটা ক্যাথেরিনের হাতে তুলে দিল- তুমি একটু খাবে নাকি, সুন্দরী?

ক্যাথেরিন মাথা নাড়ল।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে বলল–ঠিক আছে।

ক্যাথেরিন সভয়ে দেখল, আরও কিছু মদ সে গিলে ফেলেছে। আহা, মদ গিলে সে যদি ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে কেমন হয়? বেঁচে থাকার এটাই বোধহয় শেষ রাস্তা।

আটানস বলল–আমি রোজ প্রচুর মদ খাই। আমার কিছু হবে না। ফাঁকা বোতলটা সে সিমেন্টের মেঝের ওপর ছুঁড়ে দিল। ঠিক আছে, এবার আসল কাজটা শুরু হোক।

-তুমি কী করতে চাইছ?

আমি একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা ঘটাব। ব্যাপারটা সুন্দর করে সাজানো হবে। তাহলে হয়তো ডেমিরিসের কাছ থেকে আমি দ্বিগুণ টাকা পাব।

ডেমিরিস? তাহলে এটা স্বপ্ন নয়! সমস্ত ঘটনার অন্তরালে ওই কুৎসিত মানুষটা বসে আছেন? কিন্তু কেন?

ক্যাথেরিন দেখতে পেল, আটানস বয়লার ঘরের দিকে এগিয়ে গেছে। সে বাইরের প্লেট সরিয়ে দিয়েছে। পাইলট লাইটটা ভালোভাবে দেখছে। আটটা বয়লার প্লেট সেখানে আছে। প্রত্যেকটিই গরম। সেফটিভাটা একটা মেটাল ফ্রেমের ওপর বসানো আছে। আটানস একটা ছোট্ট কাঠের টুকরো তুলে নিল। সেফটি ভালটাকে থামিয়ে দিল। ১৫০ ডিগ্রি। ক্যাথেরিন দেখতে পেল, আটানস ডায়ালটাকে সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গেছে। এবার সে ক্যাথেরিনের কাছে ফিরে এল।

-বুঝতে পারছ, এই ফার্নেসে কী আছে? গনগনে আগুন। এটাকে খুলে দিলে কী হবে?

সে ক্যাথেরিনের আরও কাছে এগিয়ে গেল।

যখন এই ডায়ালটা ৪০০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যাবে, বয়লারটা নিজেই বিস্ফোরিত হবে। তুমি বুঝতে পারছ কী হবে? গ্যাস লাইনগুলো ভেঙে পড়বে। বার্নার প্লেটগুলো চারদিকে ছিটকে যাবে। গোটা বাড়িটা বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হবে।

–তুমি! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এই বাড়িতে অনেক সাধারণ অসহায় মানুষ থাকে, তাদের এইভাবে মেরে ফেলবে?

–পৃথিবীতে কোনো অসহায় মানুষ নেই। তোমরা, আমেরিকানরা একথা বলো। তোমরা সব গল্পের একটা সুখী শেষ দেখতে চাও। তোমরা বোকা, পৃথিবীতে কোনো গল্পেই সুখী সমাপ্তি হয় কি?

সে নীচে নেমে এল। দড়িটা ভালোভাবে পরীক্ষা করছে। ক্যাথেরিনকে পোস্টের সঙ্গে বাঁধা হয়েছে। আঃ, কবজি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দড়ি বোধহয় তার মাংস কেটে শরীরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আটানস ক্যাথেরিনের নগ্নবুকের ওপর হাত রাখল। বৃন্ত নিয়ে ছেলেখেলা । খেলল। তারপর মুখে চুমু দিল।

–আহা, কতদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তুমি কি জানতে তোমাকে আমি কত ভালোবাসতাম।

সে ক্যাথেরিনের সোনালি চুল দু হাতে সরিয়ে দিল। ওপর ঠোঁটে চুমু খেল। তার নিশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে। সে বলল বরাবরের জন্য বিদায় ক্যাথেরিন।

আটানস উঠে দাঁড়াল। ক্যাথেরিন চিৎকার করছে আমাকে এভাবে একা ছেড়ে যেও না।

–আমাকে এখুনি যেতে হবে, প্লেন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এথেন্সে চলে যাব।

অসহায়ের মতো ক্যাথেরিন তাকিয়ে থাকল চলে যাচ্ছে, ওই দস্যুটা চলে যাচ্ছে।

–তুমি ঘড়ি দেখবে, তাহলে আমি কিছু আলোর ব্যবস্থা করতাম। এটা তোমার জানা দরকার।

এক মুহূর্ত কেটে গেছে। ক্যাথেরিন শুনতে পেল বেসমেন্টের দরজা বন্ধ করার শব্দ। তাহলে? এখন শুধু নীরব প্রতীক্ষা। নৈঃশব্দ্যের জগৎ। ক্যাথেরিন সেখানে একা। সে বয়লারের ডায়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে তা ওপরে উঠছে। ক্যাথেরিনের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠছে। ১৬০ ডিগ্রি থেকে ১৭০ ডিগ্রি। ক্যাথেরিন ছটফট করছে। যতই চেষ্টা করছে, দড়িগুলো ততই তাকে আরও জোরে–আরও জোরে বেঁধে ফেলছে। সে চারদিকে তাকাল। ডায়াল ১৮০ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে যাচ্ছে।, জীবনের বিন্দুমাত্র আশা নেই। এই পৃথিবীতে কেউ নেই, যে তাকে সাহায্য করবে।

.

অ্যালান হ্যামিল্টন উন্মাদের মতো ছুটে আসছেন, উইমপোল স্ট্রিটের ওপর দিয়ে। ট্রাফিকের বাধা মানছেন না। আঃ, ড্রাইভারদের হর্নের ধ্বনি, কোনো কিছুই তার কানে যাচ্ছে না। রাস্তাটা বন্ধ কেন? তিনি বাঁদিকে ঢুকে পড়লেন। পোর্টল্যান্ড প্লেস, অক্সফোর্ড সাকাস। নাঃ, এখানেও ট্রাফিকের বড় বাড়াবাড়ি।

.

ওদিকে ২১৭ বন্ড স্ট্রিট। বয়লার ২০০ ডিগ্রিতে পোঁছে গেছে। বেসমেন্ট আরও গরু হয়ে উঠেছে।

ট্রাফিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষজন চিৎকার করছে। কেউ বাড়ি ফিরবে। কেউ ডিনারের আসরে যোগ দেবে। কেউ থিয়েটার দেখতে যাবে। অ্যালান হ্যামিল্টন তার গাড়িতে বসে আছেন। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। আমি কি পুলিশকে ডাকব? কিন্তু পুলিশ কীভাবে সাহায্য করবে? আমি বলব, আমার এক নিওরোটিক পেশেন্ট বলেছে, তাকে হত্যা করা হবে? পুলিশ আমার কথা শুনে হেসে উঠবে। না, এখুনি ওর কাছে পৌঁছোতে হবে। ট্রাফিক আবার চলতে শুরু করেছে।

.

বেসমেন্টে তখন নাটকের শেষ দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে। তিনশোতে সূচক পৌঁছে গেছে। ঘরটা অসম্ভব গরম। ক্যাথেরিন চেষ্টা করছে, নিজেকে মুক্ত করার। না, কিছুতেই পারছে না সে।

অ্যালান অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়েছেন। পাশের একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়লেন। একজন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা রাস্তা পার হচ্ছিলেন। পুলিশের হুইসেলের শব্দ শোনা গেল। এক মুহূর্তের জন্য অ্যালান থমকে দাঁড়ালেন। সাহায্যের জন্য চেষ্টা করলেন। না, এখন তাকে যেতেই হবে।

মস্ত বড়ো একটা ট্রাক সামনে দিয়ে চলেছে। পুরো রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যালান, হ্যামিল্টনকে অসহায় মনে হল। তিনি বললেন, একটু তাড়াতাড়ি ভাই।

ট্রাক ড্রাইভার তার দিকে তাকালেন–কী হয়েছে? তুমি কি আগুন জ্বালাতে যাচ্ছো, না নেভাতে?

আবার ট্রাফিক বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাফিক পরিষ্কার হল। অ্যালান হ্যামিল্টন অতি দ্রুত গাড়ি চালাতে শুরু করেছেন। বন্ড স্ট্রিট পার হলেন।

.

বেসমেন্টের তাপমাত্রা চারশো ডিগ্রিতে উঠে গেছে।

.

শেষ পর্যন্ত বাড়িটা দেখা গেল। অ্যালান হ্যামিল্টন দেখতে পেলেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। আঃ, কেউ কি আছে কোথাও? এত গন্ধ কীসের? মনে হল, গোটা বাড়িটা ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশাল বোমা দিয়ে সেটাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাতাসে মৃত্যুর ইশারা। চারপাশে হৈ-হট্টগোল।

এখানে এখানে শুধুই ধ্বংস আর বীভৎস বিভীষিকা।

.

৩১.

আটানসকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা ভীষণ ভালো কাজ সে শেষ করেছে। শেষ অব্দি কাজটা ভালোভাবেই করেছে। আহা, সবসময় সে তার শিকারের সাথে যৌনতার খেলা খেলে, পুরুষ অথবা নারী, বাছবিচার করে না। তারপর হত্যা করে। জীবনে উত্তেজনা পছন্দ করে। এখানে বেশি সময় তার হাতে ছিল না, তাই ক্যাথেরিনকে বেশি অত্যাচার করতে পারেনি। আটানস ঘড়ির দিকে তাকাল। অনেকটা সময় আছে এখনও প্লেনটা আকাশের বুকে উড়তে শুরু করেনি। রাত এগারোটার সময় উড়বে। সে একটা ট্যাক্সি নিল। শেফার্ড মাকের্টে চলে গেল। ড্রাইভারকে টাকা দিল রাস্তায় ইতস্তত ঘুরে বেড়াল। দু-ধারে শিকারি মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে। সকলকে ডাকাডাকি করছে।

–হ্যালো, তুমি কি আমার কাছ থেকে ফরাসি শিখবে নাকি?

–একটা ছোটো পাখি হলে কেমন হয়?

–তুমি কি গ্রিক ভালোবাসো?

কেউ কিন্তু আটানসের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সে একটা লম্বা সোনালি চুলের মেয়ের কাছে এগিয়ে গেল। মেয়েটা ছোট্ট চামড়ার স্কার্ট আর, ব্লাউজ পরেছে। স্টিলেটো হিলের জুতো তার পায়ে।

আটানস শান্তভাবে বলল–শুভ সন্ধ্যা।

মেয়েটি তার দিকে তাকাল- হ্যালো, ছোট্ট খোকা। তোমার মা কি জানে তুমি এখানে এসেছ? মেয়েদের দেখতে?

আটানস হাসল- হা, ম্যাডাম। তুমি কি এখন ব্যস্ত আছো?

বেশ্যা মেয়েটি হেসে ফেলল–না, তুমি কী চাইছ? আমি সবসময় ব্যস্ত থাকি। তুমি কখনও কোনো মেয়ের কাছে এসেছ কী?

আটানস শান্তভাবে বলল–একবার। আমার এটা ভালো লাগে।

বেশ্যাটা খিলখিলিয়ে হাসল। সত্যি? আমি তোমার ওই জিনিসটা দেখতে চাইছি। ওটা কত বড়ো? তোমাদের মতো ছোট্ট ঘোড়াদের আমি ফিরিয়ে দিই। কিন্তু আজ বাজারটা ভালো নয়। তোমার পকেটে পয়সা আছে তো?

–হ্যাঁ, ম্যাডাম, সেদিকে কোনো সমস্যা নেই।

চলো, তাহলে আমরা ওপরে চলে যাই।

মেয়েটা আটানসকে নিয়ে একটা দরজার ভেতর ঢুকে পড়ল। কয়েকটা সিঁড়ি, তারপর এক ঘরের এক একটি অ্যাপার্টমেন্ট।

আটানস মেয়েটার হাতে পয়সা তুলে দিল।

–দেখি, ওটা নিয়ে তুমি কীভাবে আমাকে খুশি করতে পারো।

মেয়েটা চটপট ল্যাংটো হচ্ছে। সে দেখল আটানসও তার পোশাক খুলছে। আটানসের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।

হায় ঈশ্বর! তোমার ওটা তো মস্ত বড়ো!

–ঠিক আছে?

মেয়েটা বিছানাতে শুয়ে পড়ল। বলল–ভাই, আস্তে আস্তে করো। আমার যেন বেশি কষ্ট না হয়।

আটানস বিছানার দিকে এগিয়ে গেছে। সে এইসব বেশ্যাদের নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসে। বেশ্যাদের শারীরিক আঘাত করে একটা অদ্ভুত যৌন তৃপ্তি পায়। কিন্তু এখন এসব করার সময় নেই। পুলিশ হয়তো এসে যাবে। তাকে তাড়াতাড়ি সব কিছু করতে হবে।

সে বলল–এটা তোমার জীবনের একটা সুন্দর সুখী রাত।

–কী? কী চাইছ তুমি?

–কিছুই না। আটানস মেয়েটার ঘাড়ের ওপর চেপে বসল। চোখ বন্ধ করল। তার মধ্যে নিজের সবটুকু সত্তা ঢুকিয়ে দিল। তাকে আঘাত করল। মনে হল ক্যাথেরিন যেন দয়া ভিক্ষা করছে। সে দয়া করবে না। আঃ, এখানে-সেখানে আঘাত করছে। উত্তেজনা বাড়ছে। উত্তেজনার শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বেশ্যা মেয়েটি। শেষ পর্যন্ত প্রার্থিত বিস্ফোরণটা ঘটল।

–আঃ, মেয়েটি বলল, তোমার সাহচর্য আমার মনে থাকবে।

আটানস চোখ খুলল–কই ক্যাথেরিন কোথায়? সে তো একটা দম বন্ধ করা ঘরে বাজারি মেয়ের সাথে সঙ্গমের খেলায় মেতেছিল। চট করে পোশাকটা পরে নিল। সে ট্যাক্সি ধরে হোটেলে চলে এল। চটপট এখান থেকে পালাতে হবে।

এয়ারপোর্টের দিকে ছুটে চলেছে আটানস। নটা তিরিশ মিনিট। এখনও অনেকটা সময় তার হাতে আছে।

.

অলিম্পিক এয়ারওয়েজে ছোট্ট লাইন পড়েছে। আটানস ওই লাইনের সামনে এগিয়ে গেল ক্লার্কের হাতে টিকিট তুলে দিল।

ফ্লাইট কখন ছাড়বে?

ক্লার্ক তাকাল, টিকিটে নাম লেখা আছে–আটানস স্টাভিচ। সে আটানসের দিকে আরও একবার তাকাল। তারপর কাছেই দাঁড়ানো একজন লোকের দিকে মাথা নেড়ে ইশারা করল। লোকটি এগিয়ে এসে আটানসকে জিজ্ঞাসা করল- টিকিট কোথায়?

আটানস টিকিটটা লোকটার হাতে দিল- কিছু ভুল হয়েছে কি?

ভদ্রলোক বলল–এই ফ্লাইটে জায়গা হবে না। আপনি আমাদের অফিসে আসবেন কি? আমি আরও একবার সবকিছু দেখতে চাইছি।

আটানস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল–ঠিক আছে, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

সে লোকটিকে অনুসরণ করল। অফিসে পৌঁছে গেল। তার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত ধারণার জন্ম হয়েছে।

এখানে আর এক মুহূর্ত থাকতে চাইছে না আটানস। ডেমিরিস এতক্ষণে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন নিশ্চয়ই। আইন তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। সব কিছু নিখুঁতভাবে ঘটে গেছে। পঞ্চাশ হাজার ডলার। সুইস ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ছোট্ট ছুটি, সে রিভিয়ারাতে চলে যাবে। কিংবা রিওতে। রিওর ছেলেবেশ্যাগুলোর সংসর্গ খুবই ভালোবাসে সে।

আটানস অফিসে গেল। কিন্তু? কী হয়েছে? সে নিজের অজান্তে চিৎকার করে উঠল।

–এ হতে পারে না! এ অসম্ভব! আমি নিজের হাতে তোমাকে খুন করেছি!

আটানসের গলা থেকে এই শব্দগুলি বেরিয়ে এসেছে কী? তাকে একটা পুলিশ ভ্যানের ভেতর তুলে ফেলা হয়েছে।

অ্যালান হ্যামিল্টন ক্যাথেরিনের দিকে তাকালেন, বললেন–শেষ অব্দি, শেষ খেলাটায় আমরা জিতে গিয়েছি। এসো, এখন অত ভাববার কী আছে!

.

৩২.

কয়েক ঘণ্টা আগে, বেসমেন্টের নাটক, চরম পরিণতির দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ক্যাথেরিন নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। যতই চেষ্টা করেছে, দড়ির বাঁধন ততই দৃঢ় হয়েছে। তার হাত-পা কেটে গেছে। সে ডায়ালের দিকে তাকাল- ২৫০ ডিগ্রি। ডায়াল যখন ৪০০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যাবে বয়লারটা ফেটে যাবে। এখান থেকে বেরোবার সব আশা শেষ হয়ে যাবে। ক্যাথেরিন এক মুহূর্ত ভাবল। ব্র্যান্ডির বোতলের দিকে তাকিয়ে থাকল। আটানস সেটা মেঝেতে ফেলে গিয়েছে। অবাক চোখে তাকাল। মাথাটা কাজ করতে শুরু করেছে। শেষ সুযোগ, যদি সে আর একটু এগোতে পারে। ক্যাথেরিন কেঁকার চেষ্টা করল। পা-টা সামনের দিকে এগিয়ে দিল। আর এক ইঞ্চি নাঃ, কিছুতেই বোতলটার হদিশ পাচ্ছে না সে। আরও একবার চেষ্টা করল। কাঠের পিলারটা সামনের দিকে এগিয়ে এসেছে। আর এক ইঞ্চি। ক্যাথেরিনের চোখে জল এসেছে। আর একটু চেষ্টা করতে হবে আর একবার সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করল সে। দেহটাতে আঁকানি দিল। মনে হচ্ছে, শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে। সে সামনের দিকে এগোবার চেষ্টা করল। না, এটা যেন দূরে না চলে যায়। আস্তে আস্তে সে বোতলটাকে ধরার চেষ্টা করল। খুব সাবধানে। শেষ অব্দি বোতলটাকে আয়ত্ত করতে পারল।

সে ডায়ালের দিকে তাকাল–২৮০ ডিগ্রি। ভয় জেগেছে, আতঙ্ক আর বিভীষিকা। ধীরে ধীরে সে বোতলটাকে পা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আনল। পায়ের আঙুলকে কাজে লাগাল। মার্গো, হাতের থেকে রক্ত ঝরছে।

কী হবে এবার? বেসমেন্ট আরও গরম হয়ে উঠেছে। শেষ চেষ্টা করতেই হবে। বোতলটা পিছলে গেল। ক্যাথেরিন ডায়ালের দিকে তাকাল–৩০০ ডিগ্রি। ডায়ালটা ক্রমশ ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে। এবার বোধহয় বয়লারে ফাটল ধরবে। চিৎকার করার চেষ্টা করল সে। আঃ, বোতলটা হাতে এসে গেছে। সেটাকে সে শক্ত করে ধরল। চেষ্টা করল বাঁধন কেটে দিতে। কিছুতেই পারছে না। কোন কিছুই হচ্ছে না। সে চিৎকার করছে-ভয়ে এবং হতাশায়। আবার চেষ্টা করল। কিছুই হল না। ডায়াল ৩৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। ক্যাথেরিন একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিল। সমস্ত শক্তিকে আবার একসঙ্গে জড়ো করল। বোতলটা ভেঙে গেছে। আঃ, এবার শেষ কাজটা করতেই হবে। ভাঙা বোতলের প্রান্তভাগ দিয়ে দড়ি কাটার চেষ্টা করল, হাতের কবজি কেটে গেল। যন্ত্রণাটাকে উপেক্ষা করল সে। আরও আরও একবার চেষ্টা করতে হবে। হঠাৎ আবিষ্কার করল একটা নতুন তথ্য! একটা দড়ি খুলে গেছে। অন্য দড়িটা সে নিজের হাতে খুলে দিল। পায়ের বাঁধন মুক্ত করল।

ডায়াল ৩৮০ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেছে। গলগল করে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। ফার্নের্স গরম হয়ে উঠেছে। ক্যাথেরিনকে পালাতে হবে। আটানস দরজা বন্ধ করেছে। কিন্তু সে পালাবে কী করে? একটু পরেই বিস্ফোরণটা ঘটবে। ক্যাথেরিন ফার্নেসের ওপর এগিয়ে গেল। আঃ, সেফটিভাটা বন্ধ করতে হবে। ৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

এক মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে দূরের দরজার দিকে ছুটে গেল। এখানে বোম শেলটারটা আছে। তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে গেল সে। দরজাটা বন্ধ করে দিল। কংক্রিটের মস্ত বড় একটা পাটাতন। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। পাঁচ সেকেন্ড কেটে গেছে। মস্ত বড়ো বিস্ফোরণ, গোটা বাড়িটা ভেঙে পড়েছে। সে অন্ধকারের মধ্যে শুয়ে আছে। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে মাটির তলার ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তা না হলে বেঁচে থাকত না। আগুন ধরে গেছে। তার মানে আমি এখনও বেঁচে আছি। বিপদটা কেটে গেছে। নাঃ, আরও কিছু করতে হবে, তা না হলে?…

এক ঘণ্টা কেটে গেছে অ্যালান হ্যামিল্টন সেখানে পৌঁছে গেছেন। ক্যাথেরিনকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। বলেছেন ক্যাথেরিন, ডার্লিং, আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। কী করে এসব ঘটনা ঘটল?

ক্যাথেরিন বলল–পরে, পরে বলব। এখনই আটানস স্টাভিচের কাছে পৌঁছোতে হবে। লোকটা একটা পাকা শয়তান।

.

৩৩.

সাসেক্সের একটা ছোটো শহর। চার্চে বিয়ের কাজ শেষ হল। অ্যালানের বোন ভীষণ ভালো স্বভাবের মহিলা। তিনি সবকিছু ঠিকমতো সাজিয়েছেন। অ্যালানের বোনের দিকে তাকিয়ে ক্যাথেরিন অবাক হয়ে গেল–এই ছবিটাই তো ধরা আছে অ্যালানের অফিসে। তার ছেলে স্কুলে পড়ে, আবাসিক বিদ্যালয়। ক্যাথেরিন এবং অ্যালান ছুটি কাটাচ্ছে একটি ফার্মের মধ্যে, তারপর তারা ভেনিসে উড়ে যাবে, মধুচন্দ্রিমার রাত কাটাতে।

.

ভেনিসকে আমরা মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে উঠে আসা এক অসাধারণ শহর বলতে পারি। যে শহরে বেশ কটি সুন্দর খাল আছে, আছে ১২০টি দ্বীপপুঞ্জ, ৪০০টি সেতু। অ্যালান এবং ক্যাথেরিন হ্যামিল্টন ভেনিসের এয়ারোপোটো মার্কোপোলোতে ঘুরে বেড়াল। মেসট্রেতে গাছের তলায় বসে হৃদয় বিনিময় করল। পিয়াজা সান মার্কোতে সন্ধ্যা কাটাল। রয়্যাল ডানিয়েলিতে বেশ কিছুটা সময় উপভোগ করল। আহা, একটা হোটেল ডগস প্যালেস,–প্রেমিক প্রেমিকার আদর্শ বিচরণভূমি।

স্যুইটটি চমৎকার। প্রাচীন যুগের ফার্নিচার দিয়ে সাজানো। গ্রান্ড ক্যানাল চোখে পড়ছে।

–তুমি প্রথমে কী করতে চাও?

অ্যালান জানতে চাইলেন।

ক্যাথেরিন অ্যালানের কাছে পৌঁছে গেল। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল কল্পনা করতে পারি।

তারপর? ভেনিসের এই সুন্দর শহর, ক্যাথেরিন তার দুঃস্বপ্ন ভুলে গেছে। অতীত আর এখন তাকে আঘাত করে না।

সে এবং অ্যালান সব কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। সেন্ট মার্কস স্কোয়ার। হোটেল থেকে মাত্র কয়েক শো গজ দূরে তার অবস্থিতি। ইতিহাসের পাতা উলটোদিকে ঘুরে যাচ্ছে। সেন্ট মার্কস চার্চ, আর্ট গ্যালারি, ক্যাথিড্রাল সিঁড়ি এবং সিলিং, মোজেক আর ফ্রেসকোতে পরিপূর্ণ।

ডগস প্যালেস, অসাধারণ চেম্বার। ব্রিজ অফ সাইটস। কত বছর আগে এখান থেকে বন্দিদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হত।

তারা একটির পর একটি মিউজিয়ামে গেল। চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করল। সেই ছোটোখাটো দ্বীপে মন্দাক্রান্তা ছন্দে জীবন কাটাল। মুরানোতে বসে গ্লাসব্লোয়িং খেলা দেখল। বুরাননাতে গিয়ে দেখল মহিলাদের, তারা অসাধারণ নৃত্যপটিয়সী। মোটর লঞ্চের সওয়ার হয়ে চলে গেল টরসেলোতে। লোক্যান্ডা কিপ্রিয়ানিতে রাতের খাওয়া সারলো। ফুলে পরিপূর্ণ একটা উদ্যানের মধ্যে হাতে হাত রেখে হেঁটে গেল।

ক্যাথেরিনের মনে পড়ে গেল কনভেন্টের সেই পুষ্পিত উদ্যানটির কথা। সেখানেই তার জীবনের চাকা ঘুরতে থাকে। আহা, অ্যালানকে পাশে নিয়ে সে বসে আছে। হায় ঈশ্বর, তুমি কত করুণাময়!

.

মার্সেরি হল এখানকার প্রধান বাজার। তারা নানান জিনিস দেখতে পেয়েছে। একটির পর একটি দোকান। রুবেলিতে গিয়ে ফেব্রিকের জিনিসপত্র কিনল। ক্যাসালা থেকে দামি জুতো, জিওকনডো ক্যাসিনি থেকে প্রাচীন যুগের স্মারকচিহ্ন। কোয়াদ্রিতে বসে রাতের খাবার খেল। আলগ্রাসপোতে গিয়ে কিছুটা বিয়ার ঢেলে ফেলল গলার ভেতর। এইভাবেই দিন । কাটল আনন্দে, গল্পে এবং অতীতের রোমন্থনে।

শুক্রবার, মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ বৃষ্টি এল। আকাশে বজ্রপাত। ক্যাথেরিন এবং অ্যালান হোটেলে ফিরে এল। তারা ঝড়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।

শ্ৰীমতী হ্যামিল্টন, এই বৃষ্টিপাতের জন্য দুঃখিত, রিপোর্ট বলেছিল আজ সূর্য উঠবে।

ক্যাথেরিন হাসল বৃষ্টি কোথায়? আমি তো সুখী, খুবই সুখী।

বজ্রালোক, মাঝে মধ্যে আকাশ উদ্ভাস। কড়কড় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ছে। ক্যাথেরিনের। মনের ভেতর অন্য শব্দ। চোখ বন্ধ করলে সে বয়লারের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

সে অ্যালানের দিকে তাকিয়ে বলল–আজই বোধহয় জুরিরা তাদের মন্তব্য জানাবেন, তাই তো?

অ্যালান কথা বলতে চাননি না, আমি ওসব জগৎ থেকে দূরে আছি।

–আমি জানতে চাইছি।

ক্যাথেরিনের দিকে তাকিয়ে অ্যালান বলল–ঠিক আছে, আমি দেখছি।

ক্যাথেরিন দেখল, অ্যালান রেডিয়ো শোনার জন্য ঘরের এক কোণে চলে গেল। রেডিয়োটা খুলে দিল। বিবিসি স্টেশন ধরা পড়েছে। কে যেন গমগমে কণ্ঠস্বরে খবর পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী তার পদত্যাগপত্র আজই দাখিল করেছেন। তিনি নতুন সরকার গঠন করার চেষ্টা করবেন।

শব্দটা ভালো, শোনা যাচ্ছে না, কিড়মিড়ে আওয়াজ আসছে।

অ্যালান মন্তব্য করল ঝড়বাদলের জন্য এমনটি হচ্ছে।

আবার শব্দ শোনা গেল- এথেন্সে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের বিচার শেষপর্বে এসে পৌঁছেছে। কিছুক্ষণ আগে জুরিরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলে অবাক হয়ে গেছেন।

বিচারটা হল…

রেডিয়ো স্তব্ধ হয়ে গেছে।

 ক্যাথেরিন অ্যালানের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল বিচার কী হতে পারে?

ক্যাথেরিনকে জড়িয়ে ধরে তার কানের কাছে মুখ এনে দুষ্টুমির স্বরে অ্যালান বলল জানি না, তুমি কী চাইছ? গল্পটা ভালোভাবে শেষ হোক!

.

৩৪.

উপসংহার

 কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের বিচার শুরু হবে। পাঁচদিন বাকি আছে। জেলার সেলের দরজাটা খুলে দিলেন। এজন এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস সামনের দিকে তাকালেন অ্যাটর্নি ছাড়া আর কাউকে এখানে আসতে দেওয়া হয় না। এখনও পর্যন্ত কেউ তো আসেনি। তিনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। তাকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছে। কিন্তু কে? এখন আবেগ দেখালে চলবে কি? তিনি জেলারকে অনুসরণ করলেন। ছোট্ট আলোচনা কক্ষে গিয়ে পৌঁছোলেন।

উনি ওখানে বসে আছেন।

ডেমিরিস ভেতরে ঢুকলেন, থমকে থামলেন। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, হুইলচেয়ারে বসে আছেন। তার চুল তুষারের মতো সাদা। তার মুখে ভৌতিক অপচ্ছায়া। বেশ বোঝা যাচ্ছে অনেক বয়স হয়েছে। ঠোঁট দুটো একেবারে শুকিয়ে গেছে। হাসবার চেষ্টা করছেন। ওই ভদ্রলোককে দেখে ডেমিরিস অবাক হয়ে গেলেন। স্মৃতির সমুদ্রে আলোড়ন। তাঁ, চিনতে পেরেছেন কি?

–আমি ভূত নই, নেপোলিয়ান ছোটাস বললেন। তার কণ্ঠস্বর খড়খড়ে শোনাচ্ছে। আসুন, আসুন কোস্টা।

ডেমিরিস চিৎকার করলেন আপনি!

–আমি জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলাম। আমার কোমর ভেঙে গেছে। আমার বাটলার ঠিক সময়ে খবরটা আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। আমি এটা আপনাকে জানতে দিতে চাইনি। বেঁচে আছি জানলে আপনি হয়তো অখুশি হতেন। আপনার সঙ্গে আর যুদ্ধ করার মতো মানসিকতা আমার ছিল না।

–কিন্তু ওরা একটা অগ্নিদগ্ধ দেহ আবিষ্কার করেছিল।

–ওটা আমার চাকরের।

ডেমিরিস ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন–আপনাকে জীবন্ত দেখে কী যে ভালো লাগছে।

–ভালো লাগারই কথা। আমি আপনার জীবন বাঁচাতে এসেছি।

ডেমিরিস বললেন–সত্যি? সত্যি!

–হ্যাঁ, আমি এই কেসটা লড়ব।

ডেমিরিস হাসলেন–সত্যি লিয়ন। এত দিন বাদে? আপনি কি আমাকে বোকা বলে মনে করছেন? আমি আমার জীবন আপনার হাতে তুলে দেব?

কারণ আপনি জানেন কোস্টা, এই পৃথিবীতে একমাত্র আমিই আপনাকে বাঁচাতে পারি। আপনার বাঁচা-মরা আমার ওপর নির্ভর করছে।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–না, ধন্যবাদ।

তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

আমি স্পাইরস লামব্রোর সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাকে দিয়ে বলাব, আপনি তার। সাথে ব্যস্ত ছিলেন, যখন আপনার স্ত্রীর মৃত্যু হয়।

ডেমিরিস অবাক হয়ে গেলেন ও কী বলেছে?

ছোটাস হুইলচেয়ারে ঝুঁকে পড়লেন–আমি ওঁকে সবকিছু বুঝিয়েছি। আমি বলেছি, ভবিষ্যতে ওঁর জন্য একটা সুখী দিন অপেক্ষা করে আছে। এভাবে প্রতিশোধ নিয়ে কী লাভ?

–আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না!

–আমি বলেছি, যদি লামব্রো এইভাবে সাক্ষ্য দেন, তা হলে আপনার সমস্ত সম্পত্তি আপনি এঁকে দিয়ে দেবেন। আপনার জাহাজ, আপনার কোম্পানি, সবকিছু ওঁর হাতে চলে যাবে।

–আপনি একথা বললেন কী করে?

–আমি কি ভুল বলেছি? কোস্টা, একবার চিন্তা করুন তো। এইভাবে হয়তো আপনি ফাঁসির দড়ি থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এখন এই বিচারটা আপনাকেই করতে হবে। কোষ্টা বেশি মূল্যবান? জীবন, নাকি অশেষ ধনসম্পত্তি?

দীর্ঘক্ষণের নীরবতা। ডেমিরিস বসে পড়লেন। তিনি ছোটাসকে ভালোভাবে দেখলেন।

–লামব্রো সত্যি সত্যি একথা বলবে? মেলিনার যখন মৃত্যু হয় তখন আমি তার সঙ্গে ছিলাম? সমুদ্র সৈকত থেকে অনেক দূরে?

–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন।

–এর বিনিময়ে সে কী চাইছে?

–আপনার বিশাল সাম্রাজ্যের সবটুকু।

ডেমিরিস মাথা নাড়লেন–না, আমি সেটা কখনও চাইব না।

–আপনাকে ছাড়তেই হবে। উনি আপনাকে নিঃস্ব করবে। এটাই হল ওঁনার প্রতিশোধ।

ডেমিরিস তার মন স্থির করতে পারছিলেন না।

–লিয়ন, আপনি কথা দিচ্ছেন, এই অন্ধকার অবস্থা থেকে আমাকে মুক্ত করবেন?

ছোটাসের ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠল আমি কথা দিচ্ছি।

–আমি বুঝতে পারছি না।…।

–হেলেনিক ট্রেড করপোরেশনকে লামব্রোর হাতে তুলে দিতে হবে। তার আগে আমি একটা ছোট্ট খেলা খেলাব। আপনি এই কোম্পানির সমস্ত অ্যাসেট একটি নতুন কোম্পানিতে পাঠিয়ে দেবেন। ওই কোম্পানিটার মালিক হব আমি।

ডেমিরিস বললেন–তার মানে লাবব্রো আসলে কিছুই পাবে না?

ছোটাস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন–এই পৃথিবীতে কাউকে জিততে হয়, কেউ আবার হেরে যায়।

–লামব্রো সন্দেহ করবে না তো?

–পুরো ব্যাপারটা আপনি আমার ওপর ছেড়ে দিন। আমার অভিজ্ঞতার ওপর আপনার আস্থা আছে তো?

ডেমিরিস বললেন–লামব্রোর সাথে আপনি বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করছেন? কিন্তু আপনি আমাকেও যে ঠকাবেন না, তা কী করে বুঝব?

–এটা তো খুবই সহজ ব্যাপার কোস্টা। আপনার জীবন আমার ওপর নির্ভর করছে। আমার সঙ্গে আপনার একটা চুক্তিপত্র সই করা হবে। আপনি এই নতুন কোম্পানির দায়িত্ব আমার হাতে তুলে দেবেন। অবশ্য তখনই, যখন আপনি মুক্ত হবেন। আর যদি শেষপর্যন্ত এই বিচারে আপনার মৃত্যুদণ্ড হয়, আমি কিছুই পাব না।

এই প্রথম কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মনে হল, ব্যাপারটার মধ্যে কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে। তিনি ওই প্রতিবন্ধী আইনজ্ঞের পাশে কিছুক্ষণ বসলেন। এবার বিচার শুরু হবে। বিচারের ফলাফল কী হবে তা ডেমিরিস বুঝতেই পারছেন। না, এত বোকা তিনি নন।

ডেমিরিস শান্তভাবে জবাব দিলেন- ঠিক আছে, ছোটাস, আপনার প্রস্তাব আমি মেনে নিচ্ছি।

ছোটাস বললেন–ঈশ্বর আপনার সহায় হোন। কোস্টা, এভাবেই আপনি নিজের জীবন বাঁচালেন।

ডেমিরিস ভাবতে থাকলেন, আরও অনেক কিছু আমি বাঁচাব। আমি বাঁচিয়ে রাখব আমার এক কোটি মিলিয়ন ডলার। সেটা কোথায় আছে, একমাত্র আমি জানি। আপনি অথবা অন্য কেউ তার হদিস করতে পারবেন না।

স্পাইরসের সাথে ছোটাসের কথাবার্তা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা খুব একটা সহজ ছিল । প্রথমবার তিনি ছোটাসকে তার অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন।

-আপনি কী ভাবছেন? ওই দৈত্যটার জীবন আমি বাঁচাব? আমার চোখের সামনে থেকে এখনই বেরিয়ে যান।

আপনি প্রতিশোধ নেবেন তো? এটাই আপনার আসল অভিপ্রায়?

 ছোটাস শান্তভাবে জানতে চেয়েছিলেন।

–হ্যাঁ, আমি প্রতিশোধ নিতে পেরেছি।

–সত্যি-সত্যি? কোস্টার ব্যাপারে আপনি সব কিছুই জানেন। জীবন চলে গেলেও তার সম্পত্তি বিনষ্ট হবে না। যদি কোস্টাকে ফাঁসি দেওয়া হয়, কয়েক মুহূর্তের যন্ত্রণা আর যদি আপনি তার কাছ থেকে সব নিয়ে নেন? কপর্দকশূন্য জীবন তাকে কাটাতে হবে। ভেবে দেখুন তো এটা কি বড়ো শাস্তি নয়?

আইনবিশারদের কথার মধ্যে সত্যি লুকিয়ে আছে। সত্যিই তো, ডেমিরিসকে এভাবে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দিয়ে কী লাভ? ডেমিরিস এক লোভী মানুষ। টাকা ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না।

–আপনি কোস্টার সব কিছু আমার হাতে তুলে দেবেন?

–হ্যাঁ, আমি কথা দিচ্ছি, ওঁনার সমস্ত জাহাজ, ব্যবসা সব কিছু। সব কটা কোম্পানি।

ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো।

স্পাইরস বললেন–আমায় কিছু সময় দিন।

 উনি অবাক চোখে আইনবিশারদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আহা, এই লোকটার কি এত ক্ষমতা আছে? দেখাই যাক।

.

মধ্যরাত। স্পাইরসলামব্রো নেপোলিয়ান ছোটাসকে বললেন–আমি মনস্থির করেছি। চুক্তিটা পাকা করতে হবে।

প্রেসের লোকজন অবাক হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের বিচার শুরু হবে। নিজের স্ত্রীকে তিনি হত্যা করেছেন এই অপরাধে। আর যে মানুষটি তাঁর হয়ে মামলা লড়বেন তিনি মৃত্যুর কোল থেকে উঠে এসেছেন। এই দেশের সবথেকে বিখ্যাত ক্রিমিনাল অ্যাটর্নি। মনে করা হয়েছিল, তিনি অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন।

.

বিচার শুরু হল, সেই কোর্টরুমে যেখানে নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের বিচার হয়েছিল। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে আনা হল অভিযুক্তের নির্দিষ্ট জায়গাতে। হুইল চেয়ারে চড়ে নেপোলিয়ান ছোটাস এলেন। সরকার পক্ষের উকিল হলেন স্পেশ্যাল প্রসিকিউটর ডেলমা।

ডেলমা জুরিবৃন্দকে উদ্দেশ করে বলতে শুরু করলেন- কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে আমরা পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি বলতে পারি। অনন্ত অর্থের অধিকারী তিনি। তাই আইন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা খেলেছেন। কিন্তু একটি ব্যাপারে তিনি সিদ্ধহস্ত, উনি ঠান্ডা মাথায় খুন করেছেন।

ডেলমা ডেমিরিসের দিকে তাকালেন–কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস তার স্ত্রীকে মেরেছেন। স্ত্রীর কোনো দোষ ছিল না। একটির পর একটি প্রমাণ আমি আপনাদের হাতে তুলে দেব। সবকিছু দেখার পর আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন, এটি হল প্রথম ডিগ্রির হত্যাকাণ্ড।

উনি সিটে গিয়ে বসলেন। প্রধান বিচারপতি এবার নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন- আপনি কি কোনো বক্তব্য রাখবেন?

ছোটাস বললেন–হ্যাঁ, আমি কিছু বলতে চাইছি।

তিনি জুরিদের মুখের দিকে তাকালেন। সকলের মুখেই প্রশ্ন জেগেছে।

বলা শুরু হল–কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস ধনী অথবা শক্তিশালী বলে এই কাঠগড়ায় আসেন নি। তাকে এখানে আনা হয়েছে জোর করে। আমরা সকলেই জানি, ধনী মানুষকে কেউ কেউ ঘৃণা করে থাকেন। মিঃ ডেমিরিসকে আমরা এই ব্যাপারে অভিযুক্ত কেন করব? তিনি কখনোই তার স্ত্রীকে হত্যা করেননি। আমার কাছে আসল যুক্তি লুকিয়ে আছে।

এবার বিচার শুরু হল।

.

প্রসিকিউটর ডেলমা পুলিশ লেফটেন্যান্ট থিওফলিসকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করালেন।

প্রশ্নোত্তরের পালা শুরু হল।

প্রথম প্রশ্ন–অপনি যখন ডেমিরিসের বীচ হাউসে গিয়েছিলেন, তখন কী দেখেছিলেন? লেফটেন্যান্ট থিওফলিস, সব কথা খুলে বলবেন আদালতের সামনে?

–টেবিল চেয়ারগুলো ভেঙে পড়ে আছে। বেশ বোঝা যাচ্ছিল, সেখানে একদল চোর ঢুকে পড়েছিল।

-মনে কি হয়নি সেখানে ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে?

–ইয়েস স্যার। মনে হয়েছে, সেখানে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে গেছে।

–সেখান থেকে আপনি একটা রক্তামাখা ছুরি পেয়েছেন তো?

–হ্যাঁ, স্যার।

ছুরির ওপরে হাতের ছাপ পাওয়া গেছে?

হ্যাঁ।

 কার হাতের ছাপ?

–কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের।

 জুরিরা ডেমিরিসের দিকে তাকালেন।

–যখন আপনারা বাড়িটি সার্চ করলেন, আর কী পাওয়া গিয়েছিল?

-ক্লোসেটের মধ্যে আমরা রক্তমাখা সাঁতারের পোশাক পেয়েছি। এতে ডেমিরিসের নামের আদ্যাক্ষর লেখা ছিল।

–পোশাকগুলো কি অনেক দিন ওখানে পড়ে ছিল?

–না, স্যার। সেগুলো সমুদ্রের জলে ভেজা ছিল।

–অনেক ধন্যবাদ।

এবার নেপোলিয়ান ছোটাসের পালা। তিনি বললেন–ডিটেকটিভ থিওফলিস, আপনি ওই অভিযুক্তের সাথে কি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন?

–হ্যাঁ, স্যার।

-উনি কী বলেছেন?

–উনি বলেছেন, ডেমিরিসের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, উনি কী বলেছেন, সেটা এখানে বলতে হবে কি?

–ওঁনাকে কি শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে? মানে, শরীরের দিক থেকে উনি কতখানি শক্তিশালী বলে আপনার মনে হয়?

–আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

একজন তার স্ত্রীকে হত্যা করার জন্য এমন কাজ করবে কেন? ঘরের জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড করার কোনো প্রয়োজন আছে কি?

ডেলমা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–মহামান্য বিচারপতি, আমি এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করছি।

–এ ব্যাপারে আপনি আর কিছু বলবেন না, সাক্ষ্যকে বিরক্ত করবেন না।

–আমি ক্ষমা চাইছি, মাননীয় মহাশয়। ছোটাস ওই গোয়েন্দার দিকে তাকিয়ে বললেন, মিঃ ডেমিরিসের সাথে আপনার কী কথা হয়েছিল? তার থেকে আপনার কি মনে হয়েছে ভদ্রলোক কি বুদ্ধিমান নন?

–হ্যাঁ, স্যার। ভদ্রলোক অত্যন্ত ধনী, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উনি বুদ্ধিমান, সেটাও মানতে হবে।

–লেফটেন্যান্ট, আর একটি প্রশ্ন করার আছে। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মতো মানুষ কি এইভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারেন? হত্যার সব চিহ্ন চোখের সামনে ফেলে পালাতে পারেন? যে রক্তমাখা ছুরির ওপর তার হাতের দাগ আছে, সেটিও সামনে রাখবেন কেন? রক্তমাখা সাঁতারের পোশাক? ব্যাপারটা আপনার কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয় না কি?

অনেক সময় উত্তেজনার মুহূর্তে আমরা সবকিছু গুলিয়ে ফেলি। এর আগে এমন অনেক ঘটনা আমি চোখের সামনে দেখেছি।

–পুলিশ একটা সোনার বোতাম পেয়েছে। ডেমিরিসের জ্যাকেট থেকে বোতামটা পাওয়া গেছে। সেই জ্যাকেটটি কি ডেমিরিস পরেছিলেন?

–হ্যাঁ, স্যার।

–এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুলিশের তথ্যানুসারে তার স্ত্রী লড়াই করার সময় এই জ্যাকেটটা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন।

–হুঁ, ঠিকই বলেছেন।

–আমরা ডেমিরিস সম্পর্কে যতটুকু জানি, তিনি ভালো পোশাক পরতে ভালোবাসেন। বোতামটা ছেঁড়া, অথচ তিনি তা খেয়াল করলেন না। তিনি বাড়িতে বসেছিলেন জ্যাকেট পরে? তা কি সম্ভব? জ্যাকেটটা খুলে রাখলেন। ক্লোসেটে টাঙিয়ে দিলেন। তখনও কোনো কিছু তার নজরে পড়ল না। এভাবে কি কেউ নিজেকে হত্যাকারী সাজায়। অন্ধরাও বোধহয় এমন কাজ করবে না।

.

মিঃ কাটালানোস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালেন। তিনি একটা ডিটেকটিভ সংস্থার প্রধান। ডেলমার সাথে এবার শুরু হল তার প্রশ্নোত্তরের পালা।

–আপনি একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির মালিক, তাই তো?

–হ্যাঁ, স্যার।

কদিন আগে মিসেস ডেমিরিসকে হত্যা করা হয়। এই ভদ্রমহিলা কি আপনার কাছে এসেছিলেন সাহায্যের জন্য?

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।

–কী ধরনের সাহায্য উনি প্রার্থনা করেছিলেন?

নিরাপত্তা। উনি বলেছিলেন যে, ওঁনার স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ আসন্ন। স্বামী বারবার ওঁনাকে হত্যা করবেন বলে শাসিয়েছেন।

দর্শকদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ধ্বনি শোনা গেল।

শ্ৰীমতী ডেমিরিস খুবই ভেঙে পড়েছিলেন, তাই তো?

–হ্যাঁ, উনি খুবই ভেঙে পড়েছিলেন।

উনি আপনাকে নিযুক্ত করেছিলেন স্বামীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য। ঠিক বলছি তো?

–হ্যাঁ, স্যার।

আমার আর কিছু প্রশ্ন নেই, ডেলমা এবার ছোটাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি প্রশ্ন করবেন তো?

ছোটাস তার হুইলচেয়ার নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এলেন–বললেন, মিঃ কাটালানোস, কতদিন ধরে আপনি এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত?

–পনেরো বছর ধরে।

ছোটাস খুশি হলেন–বাঃ, অনেক বছর! আপনি আপনার কাজটা কি ভালোভাবে করেন?

–আমার তো তাই মনে হয়। অন্তত আমার ক্লায়েন্টদের তাই অভিমত।

–তাহলে এই ব্যাপারে আপনার অশেষ অভিজ্ঞতা, তাই তো? যেসব মানুষেরা সমস্যার মুখোমুখি হয়, তাদের মন কেমন, তা তো আপনি জানেন?

কাটালানোস বললেন–হ্যাঁ, এ জন্যই তো তারা আমাদের কাছে আসেন।

–যখন মিসেস ডেমিরিস আপনার কাছে এসেছিলেন, তাকে কি খুব উদ্বিগ্ন বলে মনে হয়েছিল?

–হ্যাঁ, তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর মুখে চোখে আতঙ্কের ছাপ ছিল।

বুঝতে পেরেছি, তার মনে ভয় ঢুকেছিল। স্বামী তাকে যে-কোনো মুহূর্তে হত্যা করতে। পারেন, তাই তো?

–আপনি ঠিকই বলেছেন।

তিনি যখন আপনার অফিস ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন আপনি কতজনকে তার সাহায্যে পাঠিয়েছিলেন? একজন, নাকি দুজন?

না, তখনই আমি কাউকে পাঠাইনি।

 ছোটাস আবাক হয়ে গেলেন কেন? এই কাজ আপনি কেন করেননি?

উনি বলেছিলেন, সোমবারের আগে লোক দরকার নেই। ছোটাস অবাক চোখে তাকালেন।

–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না মিঃ কাটালানোস। ওই ভদ্রমহিলা, আপনার কাছে এসেছিলেন, ভয়ে কাঁপছেন, স্বামী তাকে যে-কোনো মুহূর্তে হত্যা করতে পারে, অথচ অফিস থেকে বেরোবার সময় উনি মন পালটে ফেললেন। সোমবার অব্দি ওঁনার কোনো সাহায্য লাগবে না, একথা বললেন!

–ঠিকই বলেছেন।

 নেপোলিয়ান ছোটাস এবার নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করে দিচ্ছে, সত্যি সত্যি মিসেস ডেমিরিস কি ভয় পেয়েছিলেন? নাকি এসবই তাঁর সাজানো অভিনয়? কেন তিনি সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়ে নিয়েছিলেন।

.

ডেমিরিসের কাজের মেয়েটিকে ডাকা হল।

–এখন সত্যি করে বলো তো, মিসেস ডেমিরিস এবং তার স্বামীর মধ্যে টেলিফোনে যা কথা হয়েছিল, তুমি তা শুনেছিলে কী?

হ্যাঁ, স্যার।

–কী কথা হয়েছিল তা গুছিয়ে বলল।

মিসেস ডেমিরিস তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন উনি ডির্ভোস চাইছেন। স্বামী বলেছিলেন, এ ডির্ভোস তিনি দেবেন না।

ডেলমা জুরিদের দিকে তাকালেন–ঠিক আছে। আবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, এছাড়া তুমি আর কী, শুনেছিলে?

মিঃ ডেমিরিস বলেছিলেন বীচ হাউসে দেখা করতে। তিনটের সময়। একা আসতে।

মিঃ ডেমিরিস বলেছিলেন ওঁনার স্ত্রী বীচ হাউসে একা আসবেন, তাই তো?

–হ্যাঁ, স্যার। আরও বলেছিলেন, যদি আমার মালকিন ছটার মধ্যে ফিরে না আসেন, তাহলে আমি যেন পুলিশের শরণাপন্ন হই।

এই কথা শুনে জুরিদের মধ্যে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। তারা সকলে ডেমিরিসের দিকে তাকালেন।

-তোমাকে আর কোনো প্রশ্ন করব না। ডেলমা এবার ছোটাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কোনো প্রশ্ন করবেন?

নেপোলিয়ান ছোটাস হুইল চেয়ারটা আর একটু কাছে এগিয়ে নিয়ে এলেন তোমার নাম আনড্রিয়া, তাই তো?

-হ্যাঁ স্যার।

আনড্রিয়াকে দেখে বুঝতে পারা গেল, সে খুব ভয় পেয়েছে। কিন্তু ভয়টাকে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

–আনড্রিয়া, তুমি বলেছ, মিসেস ডেমিরিস তাঁর স্বামী সম্পর্কে কিছু তথ্য তোমাকে দিয়েছেন। তার স্বামীকে তিনি ডির্ভোস দিতে চাইছেন, মিঃ ডেমিরিস ডির্ভোস দেবেন না বলেছেন। মিঃ ডেমিরিস বলেছেন, তাঁর স্ত্রীকে একা বীচ হাউসে আসতে। আমি কি ঠিক : বলছি?

-হ্যাঁ, স্যার।

–তুমি কিন্তু শপথ নিয়ে বলেছ, আনড্রিয়া, কী শুনেছ ঠিক করে বলল।

–হ্যাঁ, স্যার, আমি এই শুনেছি।

–যখন এই কথা হচ্ছিল তখন ওই ঘরে কটা টেলিফোন ছিল?

–কেন স্যার, মাত্র একটা।

 নেপোলিয়ান ছোটাস এবার বললেন–তাহলে? অন্য প্রান্তে কী কথা হচ্ছে, তুমি তা শুনতে পাওনি?

না, স্যার। আমি তা জানি না।

–তাহলে আসল সত্যিটা আমিই বলি। মিসেস ডেমিরিসের কথাই তুমি শুনেছ, তার স্বামী কী বলছেন, সেটা তোমার পক্ষে শোনা সম্ভব হয়নি।

-না, আমি তা শুনব কেমন করে?

–তার মানে, তুমি শোনোনি যে মিঃ ডেমিরিস তার স্ত্রীকে ভয় দেখিয়েছেন। মিঃ ডেমিরিস তার স্ত্রীকে একা বীচ হাউসে আসতে বলেছেন। এসব তোমার কল্পনা, কেননা শ্ৰীমতী ডেমিরিস তোমাকে এসব কথা বলেছিলেন।

আনড্রিয়া রেগে গেল। বলল–হ্যাঁ, এইভাবে ব্যাখ্যা করা যেতেই পারে।

–আমি যদি এইভাবে ব্যাখ্যা করি- ডেমিরিস যখন টেলিফোনে কথা বলছিলেন, তখন তুমি কোথায় ছিলে?

উনি আমাকে চা আনতে বললেন।

–তুমি চা আনতে গিয়েছিলে?

–ইয়েস, স্যার।

–তুমি চা-টা টেবিলে রেখেছিলে?

–ইয়েস, স্যার।

–তুমি ঘর ছেড়ে যাওনি কেন?

–মিসেস ডেমিরিস আমাকে থাকতে বলেছিলেন।

–মিসেস ডেমিরিস চেয়েছিলেন, তুমি যাতে এই ফোনের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করো। অথবা তোমাকে শোনানোর চেষ্টা করা হয়।

আমতা আমতা করে মেয়েটি বলল–হ্যাঁ, তাই হয়তো হবে।

এবার ছোটাসের কণ্ঠস্বরে জেগে উঠেছে এক জাগ্রত উন্মাদনা।

–তার মানে, তুমি জানো না সত্যি সত্যি ভদ্রমহিলা তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলছিলেন কিনা। হয়তো উনি কারোর সঙ্গেই কথা বলেননি। কথা বলার অভিনয় করছিলেন।

ছোটাস চেয়ারটা আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এলেন–ব্যাপারটা তোমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগেনি কি? উনি ব্যক্তিগত কথা বলছেন, তোমাকে সেখানে থাকতে বললেন কেন? আমি তো এব্যাপারটা কখনও ভাবতেই পারি না। ব্যক্তিগত কথার সময় আমরা বাড়ির কোনো কাজের মেয়েকে সেখানে থাকার অনুমতি দিই না। মিসেস ডেমিরিসের এই আচরণটা সত্যি সন্দেহজনক। এই ব্যাপারে আর একটু বেশি নজর দেওয়া দরকার। আমার মনে হয়, উনি বোধহয়, স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস তার স্ত্রীকে হত্যা করেননি। সাক্ষ্যপ্রমাণ হয়তো তার বিরুদ্ধে যাবে, কিন্তু এই সবই সাজানো। সব কিছু দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হয়েছে। যে-কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাছেই এই যুক্তির অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়ে যাবে। দেখা যাক কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে কী করে আমরা আরও বুদ্ধিমান মানুষে পরিণত করতে পারি।

দশদিন ধরে এই সওয়াল-জবাব চলেছিল। একটির পর একটি তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তীব্র বাদানুবাদ, ধারা, উপধারা বিশ্লেষণ। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে করোনার। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে শেষ পর্যন্ত অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে কী? প্রেসের লোকেরা তখন উদগ্রীব।

নেপোলিয়ান ছোটাস শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। স্পাইরস লামব্রোকে সাক্ষী হিসাবে ডেকে পাঠানো হল। ডেমিরিস এর মধ্যেই ওই চুক্তিপত্রে সই করেছেন। হেলেনিক ট্রেড করপোরেশন এবং তার সমস্ত সম্পত্তি স্পাইরস লামব্রার হাতে হস্তান্তরিত করা হয়েছে। একদিন আগে এইসব সম্পত্তি গোপনে নেপোলিয়ান ছোটাসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বলা হয়েছে যদি কনস্ট্যানটিন ডেমিরস ওই বিচারে মুক্তি পান, তাহলেই এই চুক্তিটা কাজ করবে।

–মিঃ লামব্রো আপনি এবং আপনার ভগ্নিপতি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস মাঝে মধ্যেই নানা জায়গাতে দেখা করতেন?

-না, আমরা কখনও দেখা করিনি।

–সত্যি কথা বলতে কি, আপনাদের মধ্যে সম্পর্কটা মোটেই ভালো ছিল না, তাই তো? আপনারা একে অন্যকে টেক্কা দেবার চেষ্টা করতেন।

লামব্রো কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের দিকে তাকালেন–হ্যাঁ, তবে মাঝে মধ্যে আমরা কিছুটা সুসম্পর্ক কাটিয়েছি।

–যেদিন আপনার বোন অদৃশ্য হয়ে যান, সেদিন কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস বীচ হাউসে যাননি বলে জানিয়েছেন। তিনটের সময় তিনি নাকি আপনার সাথে একটি গোপন আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাটা হয়েছিল অ্যাক্রোকরিন্থের একটি লজে? এই বক্তব্য কি সত্যি? যখন পুলিশ আপনাকে এই মিটিং সম্পর্কে প্রশ্ন করে আপনি তা অস্বীকার করেছিলেন।

-হ্যাঁ, আমি করেছিলাম।

–কেন?

 লামব্রো অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর দুচোখে রাগ ভেসে উঠল–ডেমিরিস, আমার বোনের সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করেছে। সে সব সময় আমার বোনকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে আঘাত করত। আমি তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। আমার একটা অ্যালিবাই দরকার ছিল। তাই আমি মিথ্যে কথা বলেছিলাম।

এখন কী বলবেন?

–মিথ্যেকে নিয়ে দীর্ঘদিন কেউ বাঁচাতে পারে না। আমি সত্যিটা বলতে চাইছি।

–তাহলে ভেবেচিন্তে বলুন তো ওইদিন কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের সাথে আপনার দেখা হয়েছিল কিনা দুপুর তিনটের সময় অ্যাক্রোকরিস্থের লজে?

-হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গে বসেছিলাম।

কোর্টরুমে আবার চিৎকার শুরু হল। ডেলমা উঠে দাঁড়ালেন। ডেলমা বললেন ইয়োর অনার, আমি প্রতিবাদ করছি।

প্রতিবাদ আগ্রাহ্য করা হল।

ডেলমা চেয়ারে বসে পড়লেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে মনে হল, চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

–ওই মিটিং সম্পর্কে সব কিছু বলুন। এটা কি আপনার বুদ্ধি?

না, মেলিনা এই কথাটা বলেছিল। সে আমাদের দুজনকেই বোকা বানিয়েছে।

–বোকা বানিয়েছে কীভাবে?

–মেলিনা আমাকে ফোন করে বলে তার স্বামী আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। আমার লজে। সে একটা ব্যবসার ব্যাপারে কথা বলবে। মেলিনা আবার ডেমিরিসকেও ফোন করেছিল। বলেছিল, আমি নাকি তার স্বামীর সাথে কথা বলতে উদগ্রীব। আমরা । দুজনে সেখানে গিয়েছিলাম। গিয়ে আমরা একটা সরল সত্য আবিষ্কার করলাম, তা হল, আমাদের দুজনকেই বোকা বানানো হয়েছে। বলার মতো কোনো কথা আমাদের ছিল না।

তার মানে? ইচ্ছে করেই ওই মিটিংটা ডাকা হয়েছিল। ওই সময়টার সাথে মিসেস ডেমিরিসের মৃত্যুর সময়টা মিলে গেছে তাই তো?

–আপনার অনুমান সঠিক।

–অ্যাক্রোকরিন্থ থেকে বিচে পৌঁছোতে গেলে চার ঘণ্টা সময় লাগবে। আমি যেতে যেতে তা মেপে নিয়েছি। নেপোলিয়ান ছোটাস জুরিদের দিকে তাকালেন–তাহলে? অ্যাক্রোকরিন্থে যদি তিনটের সময় কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস বসে থাকেন, তিনি সাতটার আগে এথেন্সে পৌঁছোতে পারবেন না।

এবার ছোটাস স্পাইরাস লামব্রোর দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনি বাইবেল স্পর্শ করে শপথ নিয়েছেন, যা বলবেন সত্যি বলবেন।

–হ্যাঁ, আমি কোনো মিথ্যে কথা বলছি না।

নেপোলিয়ান ছোটাস আবার জুরিদের মুখের দিকে তাকালেন। ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ, তিনি বলতে থাকলেন, একটি মাত্র সঠিক সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হতে পারছি। যদি মনে করা হয় যে, ডেমিরিস কজন ভাড়াটে গুণ্ডাকে লাগিয়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন, তাহলেও সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। কারণ যে-সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে, তাতে মনে করা যেতেই পারে যে তিনি নিজেই স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। মহামান্য বিচারপতিরা এই ব্যাপারটা ভাবনাচিন্তা করবেন, যে-কোনো বিচারে দুটি বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হয়। উদ্দেশ্য এবং সুযোগ।

…উদ্দেশ্য এবং সুযোগের কথা আমরা বলছি না। আমরা কিন্তু উদ্দেশ্য এবং সুযোগ, দুটোকে একসঙ্গে করতে চাইছি। আইনের চোখে শ্যামদেশীয় সেই যমজের গল্প আছে। তাদের কাটা সম্ভব ছিল না। ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রহোদয়গণ, এক্ষেত্রে হত্যাকারীর কী উদ্দেশ্য? কীভাবে সুযোগকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন? আশা করি, সামান্যতম সন্দেহ থাকলেও আপনারা চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। যে অপরাধ কখনও করা হয়নি, তার জন্য কেউ শাস্তি পাক, এটা নিশ্চয়ই আমাদের অভিপ্রেত নয়।

.

চার ঘণ্টা বাদে জুরিরা আবার এসে বসলেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে দেখা গেল আকুল হয়ে তাকিয়ে আছেন। তার মুখে বিবর্ণতার ছাপ। মন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। ছোটাস কিন্তু জুরিদের দিকে তাকাননি। তিনি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাবছেন, মুখের সেই উদ্ধতভাব কোথায় হারিয়ে গেছে। যে মানুষটি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, সে তো এমন উদ্বিগ্ন হবেই।

চিফ জাস্টিস বললেন–এবার জুরিরা একটি রায় ঘোষণা করবেন।

-ইয়োর অনার। জুরিদের মধ্যে একজন উঠে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটা কাগজ।

–বেলিফের হাতে কাগজটা তুলে দিন।

বেলিফ জুরিদের দিকে এগিয়ে গেলেন। কাগজটা নিয়ে এলেন। সেটা বিচারকের হাতে তুলে দিলেন। বিচারক ওই কাগজটা খুললেন। দেখলেন, জুরিরা বলছে, ওই অভিযুক্তকে কোনো মতেই দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়।

কোর্টরুমে তখন চিৎকার শুরু হয়ে গেছে। অনেকে আনন্দ প্রকাশ করছে। অনেকে মুখে। শব্দ করছে। তাদের সকলেই কোনো না কোনো ভাবে ডেমিরিসের কাছে কৃতজ্ঞ। ।

ডেমিরিসের মুখে আনন্দের ছাপ। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উঠে দাঁড়ালেন। নেপোলিয়ান। ছোটাসের দিকে এগিয়ে গেলেন।

–শেষ পর্যন্ত আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আপনার এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

ছোটাস বললেন–না-না, এভাবে আমাকে প্রশংসা করতে হবে না। আমি ভীষণ বড়োলোক, আপনি কপর্দকহীন। আসুন, আমরা এই মুহূর্তটাকে আনন্দে উদ্বেল করে তুলি।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস ছোটাসের হুইল চেয়ারটাকে ধীরে ধীরে টান দিলেন। দুপাশে হাজার মানুষের ভিড়। রিপোর্টাররা হেঁকে ধরেছে। তিনি পার্কিং লটে এলেন। ছোটাস একটা সেডান গাড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার গাড়ি তো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।

ডেমিরিস বললেন–আপনার কোনো ড্রাইভার নেই?

–আমার ড্রাইভারের দরকার হয় না। এই গাড়িটা আমার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। আমি ওটা চালাব। আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন?

ডেমিরিস দরজা খুলে দিলেন। ছোটাস গাড়িতে গিয়ে বসলেন। তিনি হুইলচেয়ারটা পাশে রাখলেন। ব্যাকসিটে ঢুকিয়ে দিলেন। ডেমিরিস গাড়িতে ছোেটাসের পাশে বসলেন।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস হেসে বললেন–আপনাকে কেন পৃথিবীর সেরা আইনবিশারদ বলা হয় তা বুঝতে পারছি।

হ্যাঁ, নেপোলিয়ান ছোটাস গাড়ির গিয়ারে চাপ দিলেন–আমরা এখন কোথায় যাব কোস্টা?

ডেমিরিস বললেন–আমি অন্য কোথাও যেতে চাইছি।

এক কোটি ডলার আমার সাম্রাজ্য আমি আবার গড়ে তুলব। ডেমিরিস মনে মনে ভাবলেন। মুখে কিছু বললেন না। তারপর? মুখে বললেন, স্পাইরস যখন জানতে পারবে তাকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে, সে তখন আপনাকে আঘাত করার চেষ্টা করবে।

স্পাইরস আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ উনি এমন একটা কোম্পানি কিনেছেন, খাতায়কমে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।

তারা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চললেন, ডেমিরিস ছোেটাসের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোটাস ভীষণ ভালোভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন।

–বাঃ, আপনি তো পাকা ড্রাইভার।

 ছোটাস বললেন–এসব আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।

তারা একটা উঁচু রাস্তার ওপর ধীরে ধীরে উঠছেন।

-কোথায় চলেছি আমরা?

পাহাড়ের মাথায় আমার একটা ছোট্ট বাড়ি আছে। আপনার জন্য শ্যাম্পেনের বোতল তৈরি আছে। আমি না হয় ট্যাক্সি ডেকে দেব। আপনি আবার শহরে ফিরে আসবেন। কোস্টা, অনেক কিছু ভাবনাচিন্তা করতে হবে। যা কিছু ঘটে গেছে, তার জন্য আমরা কি দায়বদ্ধ? নোয়েলের মৃত্যু, ল্যারি ডগলাসের মৃত্যু, আহা, স্টারস আমাদের কেউ কি এভাবে ভাগ্যকে মেনে নেব?

তিনি ডেমিরিসের দিকে তাকালেন। শুধু ঘৃণা আর ঘৃণা। ঘৃণা আর ভালোবাসা।

–আপনি সত্যি সত্যি নোয়েলেকে ভালোবাসতেন, তাই তো?

কেমন অসংলগ্ন কথা বলছেন ছোটাস। বোঝা যাচ্ছে, বিবেকের কাছে বারবার দংশিত হতে হচ্ছে তাকে।

ডেমিরিস বললেন–হ্যাঁ, এই জীবনে আমি একমাত্র নোয়েলেকেই ভালোবেসেছিলাম।

–আমিও তাকে খুব ভালোবাসতাম। ছোটাস বললেন। আপনি কি তা জানতেন?

ডেমিরিস অবাক হয়ে গেছেন না!

–আমি আপনাকে সাহায্য করেছি, তাকে হত্যা করতে, এ জন্য সবসময় নিজেকে দোষী বলে মনে হয়। কোস্টা, আপনি কি নিজেকে দায়মুক্ত করতে পেরেছেন?

না, তবে আমার কি মনে হয় জানেন, মেয়েটিকে আমরা তার প্রাপ্যের বেশি দিয়েছিলাম।

সব খেলার শেষে এটাই বোধহয় আমাদের আসল পুরস্কার। একটা কথা, কোস্টা, আপনাকে আমি বলেনি, সেই আগুনটা,…আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। ডাক্তাররা আমাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা হয়নি, দেখছেন তো, ওই অগ্নিকাণ্ডই আজ আমাকে সব দিক থেকে কেমন পঙ্গু করে দিয়েছে।

উনি একটা লিভারে চাপ দিলেন। গাড়িটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। আরও দূর আরও দূরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। এক-একটা বাঁক, বিপজ্জনক, আরও উঁচুতে, দূরে আজিয়ান সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।

-সত্যি কথা বলতে কী,…ছোটাসের কণ্ঠস্বরে তীব্রতা, আমাকে এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, মাঝে মাঝে ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করব।

উনি লিভারে চাপ দিলেন। গাড়িটা আরও গতিশীল হয়ে উঠেছে।

ডেমিরিস চিৎকার করছেন কী করছেন কী? আর একটু আস্তে করুন।

–আমি আর কতদিন বেঁচে থাকব? কতদিন? আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনি আর আমি একসঙ্গে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব।

ডেমিরিসের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। তিনি চিৎকার করলেন আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? গাড়িটার গতি কমান। দেখছি, আপনি একটা মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট ঘটাবেন।

ছোটাস হাসলেন, শয়তানের হাসি- আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন।

তিনি লিভারে চাপ দিলেন। গাড়িটা ওপর দিকে উঠে গেল।

ডেমিরিস চিৎকার করছেন–আপনার অনেক টাকা আছে। আপনি কেন এভাবে মৃত্যুকে বরণ করছেন?

ছোটাসের ঠোঁটে আবার শয়তানের হাসি।

না-না, আমি খুব একটা ধনী নই। কে বলেছে, আমি ধনী? আপনার বন্ধু, সিস্টার থেরেসা, আমি সমস্ত টাকা তাকে দিয়ে দিয়েছি। মনে আছে সেই কনভেন্টের কথা, অনাথ ছেলেমেয়েদের যেখানে বড়ো করা হয়। আমি আজ কপর্দকশূন্য। আমার সব অর্থ আইওনিনাতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একটা অন্ধ বাঁকের সামনে গাড়িটা থমকে থেমেছে। সামনে উঁচু পাহাড়ি পথ।

–এখনই থামান। ঈশ্বরের দোহাই। ডেমিরিসের আর্তনাদ শোনা গেল। ডেমিরিস চেষ্টা করেছিলেন ছোটাসের হাত থেকে গাড়ির চাবি কেড়ে নিতে। কিন্তু পারেননি।

–আমি আপনাকে সব দেব, আপনি যা চাইছেন।

 ছোটাস বললেন কেটে কেটে- যা কিছু স্বপ্ন, তা তো আমার সফল হয়েছে। আমি, আর কিছু চাইছি না।

মনে হল, গাড়িটার বুঝি দুটো পাখা গাজিয়েছে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো সেটা আকাশ পথে উড়ে চলেছে। একটু বাদে? কোথায় তলিয়ে গেল সেই গাড়িটা। যান্ত্রিক শব্দ, মৃত্যুর আর্তনাদ, শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের অতল তলে হারিয়ে গেল সে। অনেক দূর থেকেও শোনা গেল সেই বিস্ফোরণের শব্দ। তারপর? তারপর আর কী থাকে? নাটক শেষ হয়ে গেছে। এখন সেখানে বিরাজ করছে চিরন্তন নৈঃশব্দ্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *