৫. প্রতিনিধি দল

২১.

এথেন্স থেকে যে প্রতিনিধি দল এসেছেন, তাঁদের নিয়ে ক্যাথেরিনের দিন কাটছে। একটির পর একটি মিটিং-এর বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। অন্যান্য কোম্পানির প্রতিনিধিরা আসছেন। পারস্পরিক মত বিনিময় হচ্ছে। ক্যাথেরিনের কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি দেখে ওঁরা খুবই খুশি হয়েছেন। কাজের প্রতিটি ধারা সম্পর্কে ক্যাথেরিন সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এই ব্যাপারটা ওঁদের আনন্দ দিয়েছে।

সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি দিন কেটে যাচ্ছে কর্মব্যস্ততার মধ্যে। নিজের জন্য এতটুকু সময় রাখতে পারছে না ক্যাথেরিন। রেখেই বা কী হবে?

***

জেরি হ্যালিসম্পর্কে অনেক কথা জেনে ফেলেছে ক্যাথেরিন। তার বাবা ছিলেন অত্যন্ত বড়োলোক। তেলের ব্যবসা করতেন। ঠাকুরদা ছিলেন সম্মানীয় বিচারক। জেরি হ্যালির বয়স যখন একুশ, তাঁকে অটো চুরি করার জন্য তিন বছরের জেল খাটতে হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আরও কতগুলো অভিযোগ আনা হয়। তিনি নাকি একটা ধর্ষণ কাজে লিপ্ত ছিলেন। শেষ অব্দি পরিবারের সকলে মিলে যুক্তি পরামর্শ করে তাকে ইউরোপে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

জেরি ক্যাথেরিনকে বলেছিলেন আমি নিজেই নিজেকে নষ্ট করেছি। নষ্ট করেছি কিনা জানি না, তবে ইউরোপে গিয়ে জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলাম।

***

রেনার্ডকে এক তেতো স্বভাবের মানুষ বলে মনে হল। ক্যাথেরিন তার বাবা-মা সম্পর্কেও অনেক কথা জানতে পেরেছে। জানতে পেরেছে, ভিচির কাছাকাছি একটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তাঁরা। সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন।

এই জীবনটা রেনার্ডের ভালো লাগেনি। পনেরো বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। প্যারিসের পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে থাকেন।

***

এবার ডিনো মাভুসির কথা বলা যাক। ভদ্রলোককে দেখলেই মনে হয় সবসময় আনন্দে  ভরপুর। জন্ম হয়েছিল তাঁর সিসিলিতে। মধ্যবিত্ত পরিবারে।

–যখন আমার ষোলো বছর বয়স, তখন আমার থেকে দশ বছরের বড়ো এক বিবাহিতা মহিলার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। আহা, সেই মহিলার কথা মনে হলে এখনও আমার রক্ত গরম হয়ে ওঠে।

কী হয়েছিল? ক্যাথেরিন চোখ বড়ো বড়ো করে জানতে চেয়েছিল।

ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস–ওরা জোর করে আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে। রোমে পাঠিয়ে দেয়। আসলে ওই মহিলার স্বামী ছিলেন খুবই ক্ষমতাবান মানুষ। অঢেল টাকার অধিকারী। পরিবারের লোকজনেরা চায়নি, আমি তার রোষানলে জ্বলেপুড়ে মরে যাই।

ক্যাথেরিন হেসে ওঠে দেখছি, তারপরেই আপনি ডেমিরিসের সংস্পর্শে এলেন, তাই তো?

-হ্যাঁ, পরবর্তীকালে। আপনি তো জানেন না আমার অতীতের কথা। এখানে সেখানে কত কী করেছি, জীবিকার জন্য!

-তারপর? আপনার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হল?

ক্যাথেরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে ডিনো বললেন না, আমার স্ত্রী কিন্তু এখানে নেই।

ডিনো ভালোভাবে ক্যাথেরিনকে অবলোকন করলেন। তার সঙ্গে কথা বললেন। আহা, মেয়েটির কণ্ঠস্বর ভারি সুরেলা। ক্যাথেরিনের গা থেকে উঠে আসা প্রসাধনের গন্ধ, তার মনটাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ক্যাথেরিন সম্পর্কে সব কিছু জানতে হবে। ক্যাথেরিনের প্রতিটি পদক্ষেপ ভালো লাগছে। চোখ বন্ধ করলেন ডিনো, নগ্ন ক্যাথেরিনকে দেখতে কেমন লাগবে, মনে মনে ভেবে নিলেন। খুব তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি এই স্বপ্নটা সফল করতে হবে। ডিনো আবার কোনো ব্যাপারে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেন না।

জেরি হ্যালিক্যাথেরিনের অফিসে পৌঁছে গেছেন ক্যাথেরিন? আপনি কি থিয়েটারে যাবেন?

-কেন?

–একটা নতুন থিয়েটার প্রদর্শিত হচ্ছে ফিনিয়ানস রেইনবো। আমি আজ রাতে এটা দেখতে চাইছি।

–আপনার জন্য একটি টিকিটের ব্যবস্থা করব কী?

–একা গেলে ভালো লাগবে না, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন কী? আপনি কি ফাঁকা আছেন?

এক মুহূর্তের চিন্তা হা। হাতে হাত। ছোট্ট একটি হাতের সাথে বিরাট করতলের ঘর্ষণ।

–ঠিক আছে, সাতটার সময় হোটেল থেকে আমাকে তুলে নেবেন কিন্তু।

নির্দেশ ঝরছে। উনি বেরিয়ে গেলেন। পেছন ফিরে তাকালেন না।

ব্যাপারটা অদ্ভুত। ক্যাথেরিন ভাবল। ভদ্রলোক কি বন্ধু হতে চাইছেন? কিন্তু কেন? আমি কেন রাজি হলাম, ক্যাথেরিন ভাবতে থাকে। ওই মস্ত বড়ো হাতটার ছবি তখনও তার মনে ভেসে চলেছে।

জেরি হ্যালি হোটেল স্যাভয়ের লবিতে অপেক্ষা করছেন, ক্যাথেরিনের জন্য। একটু বাদে তারা কোম্পানির লিমুজিনে চড়ে বসলেন।

লন্ডন শহরটা ভারি সুন্দর! জেরি হ্যালিবললেন, আমি বারবার এই শহরে আসতে চাই। আপনি কি এখানে অনেক দিন আছেন?

–মাত্র কয়েক মাস।

–আপনি কোন্ রাষ্ট্র থেকে এসেছেন?

–চিকাগো থেকে।

–সেটাও তো ভারি সুন্দর শহর! আমি কয়েকবার সেখানে গেছি। কিন্তু কেন? কোনো মহিলাকে ধর্ষণ করতে? ক্যাথেরিনের হঠাৎ মনে হল। কেন? তা সে জানে না।

***

তারা থিয়েটারে এসে পৌঁছোল। জনারণ্যে মিশে গেল। আহা, অসাধারণ উপস্থাপনা। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সকলেই নামকরা কিন্তু ক্যাথেরিনের মনে হল, সে যেন কোনো অজ্ঞাত কারণে নাটকটা দেখতে পাচ্ছে না। জেরি হ্যালিতার হাতে হাত রেখেছেন। মাঝে মধ্যে কোলে হাঁটুতে হাত রাখার চেষ্টা করছেন। বরফের মতো ঠান্ডা বিশাল হাত, তার হাতের ওপর পাথরের মতো ভারি হয়ে চেপে বসেছে।

***

নাটক শেষ হয়ে গেছে। হ্যালিক্যাথেরিনের দিকে তাকালেন। বললেন–এই,শুভ। সন্ধ্যাটা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। চলুন আমরা হাঁটতে হাঁটতে হাইড পার্কে চলে যাই।

কাল ভোরবেলা অফিসে যেতে হবে, আরও অনেক কাজ আছে।

 ক্যাথেরিন বাধা দেবার চেষ্টা করল।

হ্যালিক্যাথেরিনের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন তাতে কী হয়েছে? অনেক সময় আছে। এত চিন্তা করে কী হবে?

***

রেনার্ড ভালোবাসেন জাদুঘরে ঘুরে বেড়াতে।

একদিন ওই ফরাসি ভদ্রলোক ক্যাথেরিনকে বলেছিলেন–প্যারিসে এমন একটা মিউজিয়াম আছে, দেখলে তাক লেগে যাবে। লভরের নাম শুনেছেন আপনি? গেছেন কখনও?

ক্যাথেরিন মাথা নেড়েছে না, আমি এখনও পর্যন্ত প্যারিসে যাইনি।

–হায়, আপনার জন্য আমার খারাপ লাগছে। একদিন প্যারিসে অবশ্যই আসবেন। ভদ্রলোক মনে মনে ভাবলেন, আমি জানি, এই মহিলাটি আর কখনও প্যারিসে আসতে পারবেন না।

তারপর তিনি বললেন লন্ডন শহরের মিউজিয়ামগুলোতে একবার ঢু মারতে হবে। শনিবার দিনটা আমার জন্য রাখবেন কী? আমি সেখানে যেতে চাই।

ক্যাথেরিন অন্য কিছু করার কথা ভেবেছিল। শনিবার তার অনেক কাজ থাকে। কিন্তু কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের আদেশ তো মানতেই হবে। ডেমিরিস বারবার বলে দিয়েছেন, অতিথিদের যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর দিতে হবে।

–ঠিক আছে, ক্যাথেরিন বলল, শনিবার দিনটাই ঠিক হল তাহলে।

 ক্যাথেরিন একটা দিন ওই ফরাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে কাটাবে। লোকটার স্বভাবচরিত্র মোটই ভালো নয়। তিনি এমন আচরণ করতে চান, মনে হয় তিনি যেন স্বয়ং হিটলার! কী আর করা যাবে, ওপরওয়ালার নির্দেশ, সব কিছু তো মুখ বুজে পালন করতেই হবে।

***

দিনটা শুরু হয়েছে সুন্দরভাবে। তারা প্রথমে গেল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। কত সুন্দর জিনিস সাজানো আছে গ্যালারিতে। কাচের আধারে বন্দি। আহা, অতীতের ইতিহাস বুঝি বাগ্ময় হয়ে উঠেছে। ম্যাগনা কার্টার-এর একটা কপি দেখা গেল, ১২১৫ সালে এই চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়েছিল।

রেনার্ড সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক কথা ক্যাথেরিন জেনে ফেলেছে। লোকটার সাহচর্য মোটেই ভালো লাগছে না তার। মিউজিয়ামে ঘুরে বেড়াবার পর ক্যাথেরিন এই সরল সত্যটা উপলব্ধি করতে পারল।

অ্যাডমিরাল নেলসনের হাতে লেখা একটি নথি–ঐতিহাসিক বললেও কম বলা হবে।

আমার মনে হয় এটাই মিউজিয়ামের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য। ক্যাথেরিন বলল। অ্যাডমিরাল নেলসন যুদ্ধে যাবার আগে এই নথিতে সই করেছিলেন। তিনি কি তার ভাগ্যের কথা জানতেন?

রেনার্ড এই সব আলোচনায় মোটেই আগ্রহী নন। তার উদাসীনতা ধরা পড়েছে তার মুখমণ্ডলে। আর একটা ব্যাপার ক্যাথেরিনের মনে হল, মিউজিয়ামে যেসব জিনিস সাজানো আছে, সেদিকে রেনার্ডের দৃষ্টি নেই। তিনি বোধহয় অন্য কিছু ভাবছেন। তাহলে কেন? কেন উনি জাদুঘর পরিদর্শনে এলেন? এর অন্তরালে অন্য কোনো মতলব আছে কী?

***

সেখান থেকে ভিক্টোরিয়া এবং অ্যালবার্ট মিউজিয়াম। একই রকম অভিজ্ঞতা। ক্যাথেরিন ভালো ভাবে এই অতিথিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। রেনার্ড একটা ঘর থেকে অন্য ঘরে যাচ্ছেন। কোনো কিছুই দেখছেন না। মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। কিন্তু কোথায়? ক্যাথেরিন । কি তার খবর রাখে?

মিউজিয়াম ঘোরা শেষ হয়ে গেল। ক্যাথেরিন জানতে চাইল–আপনি কি ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে যাবেন

… রেনার্ড মাথা নাড়লেন–হ্যাঁ, অবশ্যই যাব।

বিশাল অ্যাবের মধ্যে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিখ্যাত মানুষদের স্মৃতিচিহ্ন। স্মারক সৌধ। মাটির তলায় ঘুমিয়ে আছেন তারা। আহা, কত কবি আর রাজনীতিবিদ। রাজা-মহারাজা।

ক্যাথেরিন বলল দেখুন। এটা হল রবার্ট ব্রাউনিং-এর সমাধি।

রেনার্ড তাকালেন- ওঃ, ব্রাউনিং। তিনি এগিয়ে চললেন।

ক্যাথেরিন ভাবতে থাকে–ভদ্রলোক কিছু খুঁজছেন। কিন্তু কী? গোটা দিনটা এভাবে নষ্ট করার কোনো মানে হয়।

***

তারা হোটেলে ফিরে এসেছে।

রেনার্ড বললেন আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, মিস আলেকজান্ডার। আপনার সাহচর্য আমার ভালো লেগেছে।

ক্যাথেরিন ভাবল, ভদ্রলোক মিথ্যে কথা বলছেন। কিন্তু, কেন?

–আমি একটা জায়গার নাম শুনেছি, স্টোনহেঞ্জ। এটা স্যালিসবারি প্লেইন-এ, তাই তো?

–হ্যাঁ। ক্যাথেরিন বলল।

–আমরা সেখানে কেন গেলাম না? আসছে সপ্তাহে কি যাওয়া যাবে? ধরুন আগামী শনিবার।

ক্যাথেরিন ভাবতে পারছে না, স্টোনহেঞ্জে গিয়ে কী হবে? এখানে দেখার মতো আরও সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে।

তবু মনের বিস্ময় মনে চেপে রেখে সে বলতে বাধ্য হল- ঠিক আছে, তাই হবে।

***

ডিনো মাত্তুসিকে কি এই দলভুক্ত করা যায়? মাঝে মধ্যে তিনি হাতে একটা গাইডবুক নিয়ে ক্যাথেরিনের অফিসে প্রবেশ করেন।

তিনি বলেছেন ক্যাথেরিন, এই হল লন্ডন শহরের বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট। আমি ইতিমধ্যে একটা তালিকা বানিয়ে ফেলেছি। আপনি আমার সঙ্গে যাবেন তো? :

–কেন? আমাকে কেন?

–আজ রাতে আমি আর আপনি কনটে খেতে যাব।

 ক্যাথেরিন বলল–আজকে? আমার কিছু…।

-কোনো ওজর আমি শুনব না, ঠিক আটটার সময় আপনাকে তুলে নেব, কেমন?

ক্যাথেরিন আমতা আমতা করে বলল ঠিক আছে।

ডিনো বললেন আপনার সঙ্গে না খেলে মজাটা উপভোগ করব কী করে?

তাঁর কণ্ঠস্বরে সুস্পষ্ট আভাস। উনি কী চাইছেন? ক্যাথেরিন ভাবল। তবে, মনে হচ্ছে এই তিনজনের মধ্যে ডিনোর ওপর নির্ভর করা যেতে পারে। লোকটি চমৎকার, অন্তত বন্ধু হিসেবে।

***

কনটের খাবারগুলো সত্যি অসাধারণ! তারা প্রথমে স্কটিশ স্যালমন খেল। তারপর রোস্ট, বীফ, ইয়র্কশায়ারের পুডিং।

স্যালাড খাবার সময় ডিনো মন্তব্য করলেন–অপূর্ব! ক্যাথেরিন, আপনাকে আমার মনে ধরেছে। আসলে মার্কিন দেশের মহিলাদের মধ্যে একটা আলাদা চটক আছে।

–মশাই, আপনার স্ত্রী কি মার্কিনদেশীয়?

ক্যাথেরিন টিপ্পনি কাটল।

ডিনো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন না, ও ইতালি দেশের মেয়ে। আমার সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া আছে ওর।

–তাহলে জীবনটা তো ভালোই কাটছে। ক্যাথেরিনের পরবর্তী মন্তব্য।

 ডিনোর মুখে হাসি বিষণ্ণতা–হ্যাঁ, কেটে যাচ্ছে কোনোরকমে।

ডিনো ডিজার্ট নিয়েছেন। বললেন আপনি এই দেশটাকে ভালোবাসেন? আমার এক বন্ধুর গাড়ি আছে। চলুন না, শনিবার কোথাও বেড়িয়ে আসি।

ক্যাথেরিন না বলতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু উইমের কথা মনে পড়ে গেল। আহা, ভদ্রলোক বড়ো একা। একবার ওঁকে নিয়ে বেরোলে কেমন হয়?

–ভালোই লাগবে। ঠিক আছে।

–আমি আপনাকে কিছু স্মরণযোগ্য মুহূর্ত উপহার দেব।

উইমকে সঙ্গে নেব?

–না-না, এটা একটা ছোট্ট গাড়ি। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব।

***

এথেন্সের প্রতিনিধিরা আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন। বেচারি ক্যাথেরিন, নিজের মতো সময় একটুও হাতে নেই তার। হ্যালি, রেনার্ড আর মাসি তার অবসরের মুহূর্তগুলো কেড়ে নিচ্ছেন। উইম ভ্যানডেনের সঙ্গেও একটির পর একটি মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। ক্যাথেরিনের দিনগুলো তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে কেটে যাচ্ছে।

ক্যালকুলেটর ছাড়া ওই ভদ্রলোক এত বড়ো বড়ো যোগবিয়োগ করেন? হ্যালিঅবাক হয়ে গেছেন।

–আপনি ঠিকই বলেছেন।

–আমি ওঁনার মতো আর কাউকে কখনও দেখিনি!

আটানস সম্পর্কে ক্যাথেরিনের মনোভাব অনেক পালটে গেছে। ছেলেটা সত্যি খাটতে পারে। ক্যাথেরিন যখন সকালে অফিসে আসে, তখন তাকে দেখতে পায়। তার সব কাজ ছেলেটি হাতে হাতে করে দেয়। সবসময় মুখে হাসি লেগে আছে। কাজ করার জন্য উদগ্রীব। এই ছেলেটাকে দেখলে ক্যাথেরিন একটা ছোট্ট কুকুরছানার কথা ভাবে। ক্যাথেরিন অ্যালান হ্যামিল্টনের সঙ্গে কথা বলেছে, আটানস সম্পর্কে। ছেলেটার মনের ভেতর আত্মবিশ্বাস আনতে হবে। অ্যালান এব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন।

একদিন ইভলিন জানতে চাইলেন–তুমি কি বুঝতে পারো, ওই ছেলেটি তোমাকে কত ভালোবাসে?

–আপনি কী বলছেন!

–আটানস। ওর চোখের ভাব দেখে কিছু বুঝতে পারো না? ও তোমাকে কীভাবে অনুসরণ করে?

ক্যাথেরিন হেসেছে–আপনি বড় কল্পনা করছেন।

একদিন ক্যাথেরিন আটানসকে লাঞ্চে আমন্ত্রণ জানালো।

রেস্টুরেন্টে?

ক্যাথেরিন হেসে বলেছিল কেন তোমার আপত্তি আছে?

ওর মুখে লজ্জার লাল আলো–আমি জানি না কোথায় যাব। এমন পোশাক পরে যাব কি? আপনার পাশে আমাকে এই অবস্থায় দেখে লোকেরা হাসাহাসি করবে।

আমি কোনো মানুষকে তার পোশাক দিয়ে বিচার করি না। ক্যাথেরিন বলেছিল। আমি আগে থেকে বলে রাখব। জায়গা রিজার্ভ করা থাকবে কিন্তু।

সে আটানসকে নিয়ে লায়ন্স কর্নার হাউসে গেল। আটানস জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল। বোঝা যাচ্ছিল, চারপাশের লোকজন দেখে ভয় পেয়ে গেছে সে।

সে বলেছিল জীবনে আমি কখনও এমন জায়গায় আসতে পারব ভাবতে পারিনি। জায়গাটা সত্যি সুন্দর।

ক্যাথেরিন হেসেছে। বলেছে–তুমি কী খাবে মুখ ফুটে বলো। তুমি যা খেতে চাইবে, তোমাকে আমি তাই খাওয়াব।

ছেলেটি মেনুকার্ডের দিকে চোখ বুলিয়েছে। মাথা নেড়েছে। বলেছে–সব কিছু খুব দামি।

ক্যাথেরিনের মুখে আবার অমায়িক হাসি।

–আজ দাম নিয়ে চিন্তা করবে না। আমরা এমন একটা জায়গাতে কাজ করি, যার মালিক পৃথিবীর অন্যতম বড়োলোক। মনে হয় এভাবে লাঞ্চ খেলে উনি কিছু মনে করবেন না।

ক্যাথেরিন কিন্তু বলেনি, লাঞ্চের সব খরচ সে তার নিজের পকেট থেকে দেবে।

আটানস শ্রিম্প ককটেল বলেছিল, সঙ্গে স্যালাড, রোস্ট চিকেন, আর আলু ভাজা। চকোলেট কেক দিয়ে খাওয়া শেষ করল, আইসক্রিমের টুকরো মাখানো।

ক্যাথেরিন সব কিছু দেখেছে। কৌতূহলের সঙ্গে। আহা, ছেলেটা বেশি খায় না তো?

–তুমি এত রোগা কেন?

 ছেলেটি চটপট, জবাব দিয়েছে আমি কোনদিন মোটা হব না।

-এই শহরটা তোমার কেমন লাগে, আটানস?

ঘাড় নেড়েছে আটানস–আমি তো এই শহরের কিছুই দেখিনি।

–তুমি এথেন্সে অফিস বয় হিসেবে কাজ করতে?

ছেলেটি মাথা নেড়েছে–ডেমিরিসের অফিসে।

ওর কণ্ঠস্বরে তিক্ততা।

কাজটা তোমার ভালো লাগেনি?

-ওটা ভুলে যাবার চেষ্টা করুন। ওই কাজটা আমার মনের মতো ছিল না। ডেমিরিসকে আমি কিন্তু কখনোই ভালো লোক বলব না। ওঁনাকে আমি মোটেই পছন্দ করি না।

ছেলেটি চকিতে ক্যাথেরিনের চোখের দিকে তাকিয়েছে, কথাটা ঘুরিয়ে নিয়েছে। আমি একথা বললাম বলে কিছু মনে করবেন না যেন।

ক্যাথেরিন বুঝতে পেরেছে, এই নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সে বলেছে তোমাকে এখানে কে পাঠালো?

আটানস কিছু বলতে চাইছিল। ফিসফিসিয়ে ক্যাথেরিন বুঝতে পারেনি।

–তুমি কী বলছ?

–আমি একজন ডাক্তার হতে চাই।

ক্যাথেরিন অবাক চোখে প্রশ্ন করেছে কেন?

কথাটা আমার মুখে বোকার মতো শোনাচ্ছে। আমার পরিবার ম্যাসেডোনিয়া থেকে এসেছে। আমি সারাজীবন ধরে তুরস্কের মানুষদের কথা শুনেছি। তারা আমাদের গ্রামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। আমার গ্রামে কোনো ডাক্তার ছিল না। আহতদের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠত। এখন এই গ্রামটা নষ্ট হয়ে গেছে। পরিবারের সকলকে নানা জায়গাতে চলে যেতে হয়েছে। পৃথিবীতে অনেক দুঃখিত মানুষ আছে, আমি তাদের সাহায্য করতে চাই।

ছেলেটা চোখ নামিয়ে নিল। বলল, আপনি আমার কথা শুনে আমাকে পাগল বলে ভাবছেন?

না, ক্যাথেরিন শান্ত ভাবে বলল, তোমার ভাবনাটা খুবই ভালো। তাই তুমি লন্ডনে এসেছ ডাক্তারি পড়বে বলে?

–আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি সারাদিন কাজ করি। রাতে শুতে যাই। একদিন না একদিন আমি ডাক্তার হবই।

ছেলেটির কণ্ঠস্বরে আত্মপ্রত্যয়ের সুর। ক্যাথেরিন অবাক হয়ে গেছে। ক্যাথেরিন শান্তভাবে বলল আমি বিশ্বাস করি তোমার এই স্বপ্ন একদিন সফল হবে। এসো তুমি আর আমি পরে এই নিয়ে আলোচনা করব। এ ব্যাপারে আমি তোমার একজন বন্ধু হতে পারি। আমি জানি, সামনের সপ্তাহে কোন্ রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা আবার লাঞ্চ খাব। তুমি আমার সঙ্গে আসবে তো?

***

মধ্যরাত। স্পাইরস লামব্রোর ভিলাতে একটি বোমার বিস্ফোরণ শোনা গেল। আগুনের শিখা জ্বলে উঠেছে। দুজন পরিচারকের মৃত্যু হয়েছে। স্পাইরস লামব্রোর শোবার ঘরটা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি বেঁচে গেছেন। কেন? শেষ মুহূর্তে তিনি এবং তার স্ত্রী মত পরিবর্তন করেছিলেন। এথেন্সের মেয়র একটা বিশেষ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন। নৈশ ভোজের আসর। তারা ওই সংবর্ধনা সভায় গিয়েছিলেন।

পরের দিন সকালবেলা একটা চিঠি এসেছে, নাম-ঠিকানা লেখা নেই। লেখা আছে–পুঁজিবাদীদের মৃত্যু হোক।– তলায় লেখা আছে–হেলেনিক রেভেলিউশনারি পার্টি।

চিন্তিত মুখে মেলিনা জানতে চেয়েছেন–ওরা তোমাকে হত্যা করতে চাইছে কেন?

 স্পাইরস জবাব দিয়েছেন ওদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এ হল কোস্টার কাজ।

–কোনো প্রমাণ আছে তোমার হাতে?

–আমার কোনো প্রমাণের দরকার নেই। তুমি কি জানো, কোস্টা কতখানি প্রতিহিংসা পরায়ণ?

–না-না, আমি তা বিশ্বাস করছি না।

মেলিনা, যতদিন ওই লোকটা বেঁচে থাকবে, তোমার আর আমার জীবন নিরাপদে থাকবে না। ও আমাদের ভালো ভাবে বাঁচতে দেবে না।

আমরা পুলিশের শরণাপন্ন হতে পারি না?

–আমাদের হাতে কোন প্রমাণ আছে কি? পুলিশ আমার কথা শুনে হেসে উঠবে।

 শেষ অব্দি মেলিনার হাতে হাত রেখে স্পাইরস বললেন–তুমি এই গোলমাল থেকে দূরে চলে যাও। যত দূরে যাওয়া সম্ভব। তা না হলে তুমি কিন্তু বাঁচবে না।

তারপরও অনেকক্ষণ মেলিনা দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কথা বললেন। মনে। হল, এবার একটা স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন।

–ঠিক আছে স্পাইরস, আমি তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।

স্পাইরস বললেন–ঠিক আছে, চিন্তা করো না। যে করেই হোক লোকটাকে পথ থেকে সরাতেই হবে।

***

মেলিনা তার বেডরুমে বসে আছেন, একা। দীর্ঘ বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যের দিকে। তার মনে নানা প্রশ্নের ভিড়। সত্যিই তো, ঘটনাটার অন্তরালে কে আছে? স্বামীর কথামতো সব ঘটনা ঘটছে কী? হয়তো তাই। কিন্তু কেন? সত্যি সত্যি ওই শয়তান ভদ্রলোক কি তাকে এবং তার ভাইকে হত্যা করতে চাইছে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তবে তার জীবন যে অনিশ্চিত, এটা মেলিনা বুঝতে পেরেছেন। যেমন ভাবে, বিপদের কালো মেঘ ক্যাথেরিন ডগলাসকে ঘিরে রেখেছে, ঠিক তেমনই। ক্যাথেরিন কোস্টার হয়ে কাজ করছে, লন্ডনে, আমি কি তাকে সাবধান করব? মেলিনা ভাবলেন। কিন্তু কোস্টাকে কী করে ধ্বংস করা যায়? সে যাতে আর কাউকে কোনো ক্ষতি করতে না পারে। কিন্তু কীভাবে?

শেষ অব্দি একটা উত্তর ভেসে এল। মেলিনা ভাবলেন, আমি কেন এই পন্থাটা আগে ভাবিনি? কী বোকা আমি!

.

২২.

কনফিডেনশিয়াল ফাইল—

 ক্যাথেরিন ডগলাসের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তগুলি।

ক্যাথেরিন আমি দুঃখিত, আমার আসতে দেরি হয়েছে অ্যালান। শেষ মুহূর্তে একটা মিটিং-এ যেতে হয়েছিল।

অ্যালান কোনো সমস্যা নেই। এথেন্স থেকে যে প্রতিনিধি দল লন্ডনে এসেছেন, তারা এখনও আছেন তো?

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, ওঁরা আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে চলে যাবেন।

অ্যালান আপনার গলা শুনে মনে হচ্ছে আপনি এখন খুবই শ্রান্ত। কোনো অসুবিধা হয়েছে কী?

 ক্যাথেরিন না, কোনো অসুবিধা হয়নি। ওই মানুষগুলো সম্পর্কে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছে।

অ্যালান–অদ্ভুত?

ক্যাথেরিন–আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। হয়তো শুনলে আপনি হেসে উঠবেন। আমার কেবলই মনে হয়েছে, ওঁদের অতীত জীবনটা খুব একটা ভালো নয়।

অ্যালান কীভাবে আপনি এই সিদ্ধান্তে এলেন?

ক্যাথেরিন–ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। গতরাতে আমি আবার দুঃস্বপ্নটা দেখেছি।

অ্যালান সেই দুঃস্বপ্ন, যার মধ্যে আপনি মৃত্যুর ছবি দেখেন? কেউ আপনাকে জলে ডুবিয়ে মারছে তো?

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, অনেক দিন বাদে ওই স্বপ্নটা আবার দেখলাম। এবার একটু অন্যভাবে।

 অ্যালান– কী ভাবে?

 ক্যাথেরিন– আরও বাস্তব। কীভাবে শুরু করব,…বুঝতে পারছি না।

 অ্যালান– বলুন, আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।

ক্যাথেরিন– ওরা আমাকে ডুবিয়ে মারতে চেষ্টা করছে। হঠাৎ আমি একটা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেলাম?

অ্যালান– ওই কনভেন্টে?

ক্যাথেরিন–আমি সুনিশ্চিত নই, হতে পারে, একটা সাজানো বাগান। একজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ওঁনার মুখটা আমি স্বপ্নে কোথাও দেখেছি। কিন্তু চিনতে পারছি না।

অ্যালান– ভদ্রলোক কে বুঝতে পারেননি?

ক্যাথেরিন– হ্যাঁ, উনি হলেন কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস।

 অ্যালান– তাহলে এই আপনার স্বপ্ন।

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, স্বপ্নের মধ্যে ওঁনার সঙ্গে দেখা হল। কিন্তু বিশ্বাস করুন,এটা স্বপ্ন নয়, মনে হল, কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস আমার হাতে সোনার পিন তুলে দিচ্ছেন। সত্যি সত্যি ওই পিন কিন্তু তিনি আমাকে দিয়েছিলেন।

অ্যালান– আপনার অবচেতন মনের মধ্যে এই চিন্তাগুলো থেকে গেছে। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছিল, আর কোনোদিন ঘটবে না। এ বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত।

ক্যাথেরিন– আমি জানি, কিন্তু কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস সত্যি সত্যি আমাকে ওই স্মারক চিহ্নটা দিয়েছিলেন।

অ্যালান–আপনি বলেছেন কয়েকজন সন্ন্যাসিনী আপনাকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে যান, তাঁরাই আপনাকে কনভেন্টে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ক্যাথেরিন– ব্যাপারটা সত্যি।

অ্যালান– তাহলে? কনভেন্টের কাউকে আপনি চেনেন কি?

ক্যাথেরিন –না, আমি কাউকে চিনি না।

অ্যালান– তাহলে? কীভাবে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস আপনাকে চিনতে পারলেন? আপনার হদিশ উনি পেলেন কী করে?

ক্যাথেরিন– আমি জানি না। সত্যিই তো, এই ব্যাপারটা কখনও ভেবে দেখিনি। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। স্বপ্নটা ভেঙে গেল, কানের কাছে সাবধান বাণী, ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে চলেছে, আমার মন বলছে।

অ্যালান– দুঃস্বপ্ন এভাবেই আমাদের মনের ভেতর খারাপ প্রভাব ফেলে। দুঃস্বপ্ন হল একজন মানুষের সবথেকে পুরোনো শত্রু। আপনি কি জানেন, মধ্যযুগীয় ইংরেজিতে nitz শব্দটা বলা হত night শব্দের পরিবর্তে। আর mare শব্দটির মানে কী বলুন তো? এর মানে হল ভয়ংকর কিছু। একটা পুরোনো প্রবাদ বাক্য আপনাকে শুনিয়ে রাখি। অনেকে বলে থাকেন, রাত চারটের পরে ঘুমোতে যাওয়া উচিত। তা হলে আমাদের আর দুঃস্বপ্ন দেখতে হবে না।

ক্যাথেরিন– না-না এভাবে ভাববেন না।

অ্যালান– কোলরিজ লিখেছিলেন,–স্বপ্ন কিন্তু কোনো ছায়া নয়, তারা হল জীবন্ত সত্তা, তারা হল আমার অতীত জীবনের বিপর্যয়।

ক্যাথেরিন– ভারি সুন্দর বলেছেন তো! এবার থেকে আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে। দুঃস্বপ্ন ছাড়া আমি কিন্তু ভালো আছি। মাঝে মধ্যে আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয়। আর এক জনের কথা আপনাকে তো বলাই হয়নি।

অ্যালান– সে কে?

ক্যাথেরিন–সে হল আটানস স্টাভিচ। এক কিশোর বালক। লন্ডনে এসেছে ডাক্তারি পড়বে বলে। অসম্ভব দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে তার জীবন এগিয়ে চলেছে। মনে হয় একদিন তার সাথে আপনার দেখা হবে। আপনি তাকে একটু উপদেশ দেবেন কি?

অ্যালান– নিশ্চয়ই। এ কাজ করতে পারলে আমি খুশি হব। সত্যি বলুন তো, আপনার মনের অবস্থা এখন কেমন?

ক্যাথেরিন– কিছু কিছু মনে করতে পারছি। অ্যা

লান–বলবেন আমাকে?

ক্যাথেলিন–শুনে আপনি হাসবেন।

অ্যালান–না, হাসব না। আমাদের অবচেতন মনের মধ্যে এখন অনেক ঘটনা লুকিয়ে থাকে, যারা বাইরে আসতে চায়।

ক্যাথেরিন– স্বপ্নে দেখলাম, মিঃ ডেমিরিস আমার হাতে সোনার স্মারক চিহ্নটি তুলে দিচ্ছেন।

অ্যালান–তখন কিছু শুনেছিলেন কি?

ক্যাথেরিন–হ্যাঁ, আমি শুনতে পেলাম, সাবধান–সাবধান, ডেমিরিস কিন্তু একদিন আপনাকে হত্যা করবেন। মনে হবে এটা একটা দুর্ঘটনা, জানি না কীভাবে ঘটনাটা ঘটবে। কেউ আমার মৃত দেহ সনাক্ত পর্যন্ত করতে পারবে না। নানাভাবে আমার মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু কীভাবে?

বুঝতে পারা যাচ্ছে না, কীভাবে? আততায়ীরা ভাবছে মৃত্যুই হল শেষতম আনন্দ। শেষ অব্দি কীভাবে এটা ঘটবে? এমন ঘটনা, যার কোনো চিহ্ন থাকবে না এবং এমন ঘটনা ঘটাতে হবে, যাতে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস খুবই খুশি হবেন।

.

২৩.

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের বিচ হাউস। পিরাউস থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। এখানে তার এক একর মতো জলাশয় আছে। ডেমিরিস সন্ধ্যা সাতটায় সেখানে অবতরণ করলেন। ড্রাইভওয়ে দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত ছুটে এসেছেন। গাড়ির দরজাটা খুললেন। বিচ হাউসের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তিনি যখন গিয়ে পৌঁছোলেন, অচেনা একটা লোককে দেখা গেল।

–শুভ সন্ধ্যা মিঃ ডেমিরিস।

 ডেমিরিস কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে দেখতে পেলেন।

তিনি জানতে চাইলেন–এখানে কী হচ্ছে?

–আমি পুলিশ লেফটেন্যান্ট থিওফিলস।

ডেমিরিস তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। লিভিং রুমে গিয়ে পৌঁছোলেন। কী ঘটছে? বুঝতে পারা যাচ্ছে, একটু আগে এখানে ধ্বস্তাধ্বস্তির ঘটনা ঘটেছে। চেয়ার টেবিলগুলো ওল্টানো পড়ে আছে। মেলিনার পোশাক দেখা গেল। মেঝের ওপর পড়ে আছে। ছেঁড়া। ডেমিরিস পোশাক তুলে নিলেন। তাকিয়ে থাকলেন।

আমার স্ত্রী কোথায়? আমি তো আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে এসেছি।

 পুলিশ লেফটেন্যান্ট বললেন–উনি এখানে নেই। আমরা বাড়ির প্রত্যেকটা কোণায় ঘুরেছি। সব জায়গায় দেখেছি। বিচ পর্যন্ত ঘুরে এসেছি। মনে হচ্ছে, এই বাড়িতে মস্ত বড়ো চুরির ঘটনা ঘটে গেছে।

–মেলিনা কোথায়? মেলিনা কি আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছে? সে কোথায়?

–মনে হচ্ছে, উনি এখানে নেই স্যার।

 একটা ঘড়ি দেখা গেল, ক্রিস্টালটা ভেঙে গেছে। তিনটের সময় বন্ধ হয়ে গেছে ঘড়িটা।

–এটি কি আপনার স্ত্রীর ঘড়ি?

–হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে।

উলটোদিকে খোদাই করা আছে–মেলিনাকে ভালোবাসার সঙ্গে কোস্টা।

–তাহলে এটা কোনো জন্মদিনের উপহার হবে।

 গোয়েন্দা থিওফিলস কতগুলি জায়গা চিহ্নিত করলেন। বললেন–রক্তের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

মেঝের ওপর একটা ছুরি পড়েছিল। তিনি হ্যাঁন্ডেলে হাত দিলেন না। তাতে রক্তের । ছিটে।

–এই ছুরিটা কখনও দেখেছেন কি?

ডেমিরিস তাকালেন–কী মনে হচ্ছে? আমার স্ত্রী কি মরে গেছে?

–মনে হচ্ছে তাই। আমরা রক্তের দাগ দেখতে পেয়েছি। বালির ওপর বিন্দু বিন্দু রক্ত। সমুদ্র অব্দি চলে গেছে।

–হায় ঈশ্বর, ডেমিরিস চিৎকার করলেন।

–একটা কথা জানিয়ে রাখি, ছুরির ওপর কিন্তু হাতের দাগ আছে।

ডেমিরিস হেসে বললেন তাহলে? খুনিকে ধরা কি সম্ভব হবে?

–দেখব, যদি ফাইলের সঙ্গে তার হাতের ছাপ মিলে যায়। আসলে এই বাড়িটার সর্বত্রই ওই আততায়ীর হাতের ছাপ পড়ে গেছে। আমরা সবরকম তদন্ত শুরু করেছি। যদি কিছু মনে না করেন,… আপনার হাতের ছাপ দেবেন কি? তাহলে আমরা একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারব।

ডেমিরিস ইতস্তত করতে থাকেন যদি প্রয়োজনে লাগে নিশ্চয়ই দেব।

–ওই সার্জেন্টের কাছে চলে যান, তিনি এটার ব্যবস্থা করবেন।

ডেমিরিস ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশের কাছে চলে গেলেন। তার কাছে ফিঙ্গার প্রিন্টের প্যাড ছিল।

–আপনি দয়া করে আপনার আঙুলগুলো এখানে রাখবেন।

এক মুহূর্ত কেটে গেল। কাজটা হয়ে গেছে।

–আপনি কিছু মনে করবেন না। এটা আমাদের করতেই হবে।

–আমি বুঝতে পারছি।

লেফটেন্যান্ট থিওফিলস ডেমিরিসের হাতে একটা বিজনেস কার্ড তুলে দিলেন–আচ্ছা ভেবে দেখুন তো এই নামের কাউকে আপনি চেনেন কিনা? এই কার্ডটা কি আগে কোথাও দেখেছেন?

ডেমিরিস কার্ডের দিকে তাকালেন লেখা আছে, ক্যাটেলানোস ডিটেকটিভ এজেন্সি, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশনস। কার্ডটা ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, না এই নামটা আমি চিনতে পারছি না।

–দেখতে হবে, আমরা এখনও তদন্তটা সেইভাবে শুরু করতে পারিনি।

–ঠিকই আছে, সব দিকে নজর দেবেন কিন্তু। ভেবে দেখবেন, এই ব্যাপারটার সাথে আমার স্ত্রীর জীবন জড়িয়ে আছে।

লেফটেন্যান্ট থিওফিলস তার দিকে তাকালেন আমরা চেষ্টা করব, সর্বতোভাবে চেষ্টা করব।

***

মেলিনা, সোনার মেয়েটি, সুন্দরী এবং উজ্জ্বল, বিচিত্র স্বভাবের অধিকারিণী। কীভাবে শুরু করব। কেউ তাকে হত্যা করেছে? কিন্তু সে তো নিজের সন্তানকেই মেরে ফেলেছে। তাকে ক্ষমা করা যায় কী? মৃত্যুই হতে পারে তার ওই জঘন্য অপরাধের একমাত্র শাস্তি।

***

পরের দিন দুপুরবেলা ফোন এল। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস তখন এক কনফারেন্সে ব্যস্ত ছিলেন। সেক্রেটারির গলা শোনা গেল আমাকে ক্ষমা করবেন মিঃ ডেমিরিস।

–আমি বলেছি না, এ সময় আমাকে বিরক্ত না করতে।

–স্যার, ইনসপেক্টর লাভানস ফোনে আছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাপারটা খুবই জরুরি। তিনি এখুনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন।

-না, ঠিক আছে। আমি কথা বলব, আমাকে ফোনটা দাও।

ডেমিরিস মিটিং-এ উপস্থিত ভদ্রমহোদয়দের দিকে তাকিয়ে বললেন আমাকে এক মুহূর্তের জন্য ক্ষমা করবেন।

উনি রিসিভার তুলে নিলেন ডেমিরিস বলছি।

একটা গলা ভেসে এল–চিফ ইনসপেক্টর লাভানস, সেন্ট্রাল স্টেশন। আমরা কয়েকটা তথ্য পেয়েছি। তথ্যগুলো শুনলে আপনি হয় তো খুশি হবেন। ঠিক বুঝতে পারছি না, কখন আপনি পুলিশ হেড কোয়ার্টারে আসতে পারবেন?

আমার স্ত্রী সম্পর্কে কোনো খবর পাওয়া গেছে কি?

–হ্যাঁ, ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ খবর। কিন্তু টেলিফোনে সেগুলো বলা উচিত হবে না। আপনি কি একবার আসতে পারবেন?

ডেমিরিস্ এক মুহূর্ত ইতস্তত করতে থাকেন।

–ঠিক আছে, আমি আসছি।

 তিনি রিসিভারটা রেখে দিলেন। অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এসে গেছে। আপনারা ডাইনিং রুমে চলে যান। আমি ঠিক সময়ে এসে আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব। আমি যাচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না যেন।

গুঞ্জন শোনা গেল। পাঁচ মিনিট পর ডেমিরিসকে দেখা গেল পুলিশ হেড কোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে যেতে।

***

জনা ছয়েক মানুষ বসে আছেন অফিসে, পুলিশ কমিশনারকে দেখা গেল। ডেমিরিস সেই পুলিশকে চিনতে পারলেন, যার সাথে বীচ হাউসে দেখা হয়েছিল।

ইনি হলেন স্পেশ্যাল প্রসিকিউটর ডেলমা।

 ডেলমা খর্বাকৃতি একজন মানুষ। মোটা ভুরু, গোলাকার মুখ, চোখ দুটো কোণাকৃতি।

ডেমিরিস জানতে চাইলেন কী হয়েছে? আমার স্ত্রী সম্পর্কে কোনো খবর জানা গেছে কী?

 চিফ ইন্সপেক্টর বললেন সত্যি কথা বলতে কি, মিঃ ডেমিরিস, আমরা এমন কতগুলো তথ্যের সন্ধান পেয়েছি যা আমাদের ধাঁধার মধ্যে ফেলেছে। তাই আপনাকে এখানে ডেকে এনেছি। আপনি হয়তো একটা স্থির সিদ্ধান্তে পা রাখতে পারবেন।

–জানি না, এ ব্যাপারে আমি কতখানি সাহায্য করতে পারব। গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে এত মর্মান্তিক, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।

আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য আপনার স্ত্রী বীচ হাউসে গিয়েছিলেন। তাই তো? কালকে বিকেলবেলা, এই ধরুন তিনটের সময়?

কী বলছেন? না, আমার স্ত্রী ফোন করেছিল, বলেছিল সেখানে সন্ধ্যে সাতটার সময় যেতে।

প্রসিকিউটর ডেলমা বলে উঠলেন–তাহলে? একটা ব্যাপার আমাদের অবাক করে দিয়েছে। আপনার বাড়ির এক কাজের মেয়ে বলেছে, আপনি টেলিফোন করে স্ত্রীকে সেখানে যেতে বলেছিলেন। দুটোর সময় এই ফোনটা এসেছিল। আপনি বলেছিলেন তিনি যেন সাগর সৈকতে একা চলে যান। আপনার জন্য অপেক্ষা করেন।

ডেমিরিস গর্জন করেন উঠলেন মেয়েটি বোধ হয় ভুল করছে। আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করেছিল। বলেছিল, সাতটার সময় তার সঙ্গে দেখা করতে।

-ঠিক আছে তার মানে মেয়েটি ভুল করেছে।

–নিশ্চয়ই।

–আপনি কি জানেন, আপনার স্ত্রী কেন আপনাকে ডেকেছিলেন? বীচ হাউসে একা দেখা করার জন্য?

আমার মনে হয় সে বোধহয় ডিভোর্সের ব্যাপারে আলোচনা করতে চাইছিল।

–আপনি তো আগে বলেছেন যে, আপনি তাকে ডির্ভোর্স দেবেন। বলেছিলেন তো?

–হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম।

–ওই কাজের মেয়েটি কিন্তু আপনাদের টেলিফোনের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছে। সে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছে, মিসেস ডেমিরিস আপনার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদে রাজি ছিলেন।

ওই কাজের মেয়েটি কী বলেছে, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আপনি আমার কথাকেই সত্যি বলে ভাবতে পারেন।

–মিঃ ডেমিরিস, আপনি কি বীচ হাউসে সুইমিং ট্রাঙ্ক রাখেন? চিফ ইনসপেক্টর জিজ্ঞাসা । করলেন।

বীচ হাউসে? না, আমি অনেক দিন সাঁতার ছেড়ে দিয়েছি। এখন দরকার হলে টাউনহাউসের পুল ব্যবহার করি। 

চিফ ইন্সপেক্টর ডেস্কের ড্রয়ারটি খুললেন। সেখানে একটি প্লাস্টিক ব্যাগ ছিল। ব্যাগ থেকে সাঁতারের পোশাক পাওয়া গেল। তিনি সেগুলো ডেমিরিসের সামনে তুলে ধরলেন। বললেন–এগুলো কি আপনার পোশাক?

মনে হয়, আমার।

–পোশাকের ওপর আপনার সই রয়েছে।

–হ্যাঁ, আমি চিনতে পেরেছি, এগুলো আমারই পোশাক।

–আমরা বীচ হাউসের ক্লোসেটের নীচে এগুলি পেয়েছি।

–হতে পারে, হয়তো অনেকদিন আগে সেখানে রেখেছিলাম। আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।

না, পোশাকগুলো ভেজা। বুঝতে পারা যাচ্ছে, সমুদ্রের জল লেগেছে তাতে। বিশ্লেষণ। করা হয়ে গেছে। দেখা গেছে আপনার বীচ হাউসের সামনে সমুদ্রের সে জল, সেই জলই এখানে আছে। শুধু জল নয়, তার মধ্যে রক্তের ছিটেও।

ঘরের আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

 ডেমিরিস বললেন তার মানে কেউ এগুলো পরেছিল। তাতে আমি কী করতে পারি?

স্পেশ্যাল ইন্সপেক্টর বলে উঠলেন কে হতে পারে? এই প্রশ্নটাই আমাদের ভাবনার জগতে রাখছে মিঃ ডেমিরিস।

চিফ ইন্সপেক্টর একটা ছোটো এনভেলপ খুললেন। সোনার বোম নিলেন আমার এক বন্ধু এটা বীচ হাউসে পেয়েছে, এটা কম্বলের তলায় ছিল। এটা কি আপনি চিনতে–পারছেন?

না।

–এটা আপনার জ্যাকেট থেকে ছিটকে এসেছে। আজ সকালে আমরা আপনার ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। আপনার ওয়ারড্রোব তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। দেখেছি, আপনার জ্যাকেটের একটা বোম খুলে গেছে। সুতোটাও ম্যাচ করে যাচ্ছে, তার মানে? ওই। জ্যাকেটটা লন্ড্রি থেকে এসেছে একসপ্তাহ আগে।

–এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।

মিঃ ডেমিরিস, আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছিলেন যে, আপনি তাকে ডিভোর্স দিতে চাইছেন। আর তিনিও আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে কিছু বলবার আছে কি?

না, ঠিকই বলেছেন আপনি।

চিফ ইন্সপেক্টর এবার বিজনেস কার্ডটা হাতে নিলেন, যে কার্ডটা বীচ হাউসে দেখানো হয়েছিল।

–আমাদের একজন প্রতিনিধি ক্যাটেলানোস ডিটেকটিভ এজেন্সি ঘুরে এসেছে। আজ সকালে।

-আমি ওদের নাম শুনিনি। এই প্রথম শুনলাম।

–আপনার স্ত্রী ওদের ভাড়া করেছিলেন নিজেকে বাঁচানোর জন্য।

এই খবরটা একটা আকস্মিক আঘাতের মতো এল ডেমিরিসের কাছে।

–মেলিনা? কীসের থেকে বাঁচতে চেয়েছিল?

আপনার কাছ থেকে। ওই এজেন্সির মালিক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্ত্রী আপনাকে ডিভোর্স করতে চেয়েছিলেন। আপনি বলেছিলেন, ডিভোর্সের কথা উঠলে আপনি ওঁনাকে খুন করে ফেলবেন। এমনকি উনি যাতে পুলিশের কাছে যেতে না পারেন, তার বন্দোবস্তও করেছিলেন। ব্যাপারটা গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। ভদ্রমহিলা হয়তো সকলের সামনে ব্যাপারটা আনতে চাননি।

ডেমিরিস দাঁড়িয়ে উঠলেন।

–আমি এখানে আর থাকতে চাইছি না। এসব কথার মাথামুণ্ডু নেই। কেন আমাকে ডেকে পাঠালেন?

চিফ ইন্সপেক্টর ড্রয়ারের কাছে পৌঁছে গেলেন। রক্তের ছিটে লাগা ছুরিটা বের করলেন। –এই ছুরিটা বীচ হাউসে পাওয়া গেছে। আপনি আমার অফিসারকে বলেছেন, এই অস্ত্রটা আপনি কখনও দেখেননি।

–হ্যাঁ, এটাই সত্যি।

কিন্তু এই ছুরিতে আপনার হাতের ছাপ এল কী করে?

ছুরিটার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ডেমিরিস মন্তব্য করলেন আমার হাতের ছাপ? নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হয়েছে। এটা হতেই পারে না।

তার মন তখন ঘোড়ার বেগে ছুটে চলেছে। তিনি সব কিছু চিন্তা করছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ সব তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। প্রথমত যদি আমরা কাজের মেয়েটির কথা ধরি। তিনি ফোন করেছিলেন ঠিকই, বলেছিলেন দুটোর সময় দেখা হবে। স্ত্রী যেন একা একা বীচ হাউসে থাকেন। তারপর পাওয়া গেছে সাঁতারের পোশাক। রক্তের চিহ্ন আছে। জ্যাকেট থেকে একটা বোম ছিঁড়ে গেছে। এমন একটা ছুরি পাওয়া গেছে, যেখানে তার হাতের চিহ্ন মাখা। ফাঁসির দড়িটা কি কাছে এগিয়ে এল?

–আপনারা বুঝতে পারছেন না, সবটাই সাজানো। তিনি চিৎকার করলেন, কেউ হয়তো ওই বাক্সগুলো বীচ হাউসে নিয়ে গিয়েছিল। তার ওপর রক্ত ছিটিয়ে দিয়েছে। ওই ছুরিটার ওপরেও। আমার জ্যাকেট থেকে একটা বোম ছিঁড়ে দিয়েছে।

স্পেশ্যাল প্রসিকিউটর বাধা দিয়ে বললেন মিঃ ডেমিরিস, আপনার এসব কথার অর্থ আছে আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বলুন তো, ছুরির ওপর আপনার হাতের দাগ এল কী করে? আপনি এটার কী ব্যাখ্যা দেবেন?

এই প্রথম আমতা আমতা করতে থাকেন ডেমিরিস।

–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, এখন মনে পড়েছে; মেলিনা আমাকে বলেছিল একটা প্যাকেট কেটে দিতে হবে, ওই ছুরিটাই দিয়েছিল হয়তো আমার হাতে। তাই আমার হাতের দাগ আছে ওই ছুরির ওপরে।

–প্যাকেটটা কী, আপনি তা বলতে পারবেন?

–না, আমি ঠিক জানি না।

–আপনি জানেন না প্যাকেটটা কী?

–না, আমি খালি দড়িটা খুলে দিয়েছিলাম। মেলিনা প্যাকেটটা কখনও খোলেনি।

কার্পেটের ওপর রক্তের চিহ্ন, বালির নানা দিকে রক্তের চিহ্ন, এর কোনো ব্যাখ্যা আছে আপনার কাছে?

–এটা তো হবেই। ডেমিরিস মাথা নাড়লেন। মেলিনা কী করেছে? সে নিজের শরীরের কোথাও আঘাত করেছে। জলের দিকে এগিয়ে গেছে। আপনাদের ভুল বোঝাবার চেষ্টা করেছে। সবাই ভাববে আমি তাকে হত্যা করেছি। সে আমাকে এই ব্যাপারে জড়ানোর চেষ্টা করেছে। কারণ আমি তাকে ডিভোর্স দেব। এখন সে কোথাও লুকিয়ে আছে। বসে বসে হাসছে। আর আপনারা আমাকে অ্যারেস্ট করতে চলেছেন। মেলিনা, এখনও বেঁচে আছে, যেমন আমি বেঁচে আছি।

স্পেশ্যাল প্রসিকিউটর বললেন ব্যাপারটা সত্যি হলে ভালো হত। কিন্তু আসল ঘটনাটা তা নয়। তার মৃতদেহটা সমুদ্র থেকে পাওয়া গেছে। শরীরের নানা জায়গাতে আঘাতের চিহ্ন। জলে ডুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মিঃ ডেমিরিস নিজের স্ত্রীকে হত্যা করার অপরাধে আপনাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হলাম।

.

২৪.

এইভাবেই শুরু হয়েছে। মেলিনা জানতেন না, ব্যাপারটা কীভাবে শেষ করতে হবে। তার মনের ভেতর শুধু একটি চিন্তার অনুরণন, যে করেই হোক, স্বামীর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই হবে। কোস্টাকে কীভাবে থামানো সম্ভব? নিজের জীবন নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তা করেননি। এমনিতেই তাঁর দিন এবং রাত পরিপূর্ণ হয়ে আছে বেদনা ও অপমানের জ্বালায়। তার মনে পড়ে গিয়েছিল, কীভাবে স্পাইরস এই বিয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। স্পাইরস বারবার বলেছিলেন, তুমি ডেমিরিসকে বিয়ে কোরো না। ও একটা জীবন্ত শয়তান। ও তোমার জীবনটাকে নরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। আঃ, তখন কেন যে ভাইয়ের কথা শুনিনি আমি। এত বেশি ভালোবাসা উথলে উঠল কী করে? এখন আমার স্বামী আমাকে হত্যা করতে উদ্যত। কোস্টা, এই কাজ তোমাকে আমি করতে দেব না। সকালবেলা, মেলিনা সবকিছু ভেবে নিলেন, তারপর কাজগুলো ধীর লয়ে এগিয়ে চলল।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস তখন তার স্টাডিতে ছিলেন। মেলিনা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁর হাতে একটা প্যাকেট ছিল। মোটা দড়ি দিয়ে বাধা। তিনি একটা বুচার নাইফ হাতে রেখেছিলেন।

-কোস্টা, তুমি কি এই দড়িগুলো কেটে দেবে? আমি কাটতে পারছি না।

ডেমিরিস বউয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, অধৈর্যভাবে–এসো, তুমি কি ছুরি ধরতে শেখোনি?

তিনি দ্রুত ছুরিটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। দড়ি কাটতে কাটতে বলেছিলেন–কোন একজন চাকরকে ডাকলে পারতে তো?

মেলিনা উত্তর দেননি।

ডেমিরিস দড়ি কেটে দিয়েছিলেন হয়েছে তো?

তিনি ছুরিটা রেখেছিলেন। মেলিনা আলতো করে ছুরিটা তুলে নিয়েছিলেন।

তারপর? মেলিনা বলেছেন–কোস্টা, এইভাবে চলতে পারে না। আমি তোমাকে এখনও ভালোবাসি। তুমিও হয়তো আমার প্রতি কিছু ভালোবাসা অবশেষ রেখেছ। ভেবে দেখো, কী সুন্দর দিন না কেটে গেছে আমাদের মধ্যে। তোমার কি মনে আছে মধুচন্দ্রিমার সেই রাত।

ডেমিরিস চিৎকার করে উঠেছিলেন ঈশ্বরের দোহাই, এভাবে আমাকে আর বিরক্ত কোরো না। তোমার সাহচর্য আমাকে শেষ করে দিয়েছে। তুমি এখনই আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাও। তুমি থাকলে আমি অসুস্থ বোধ করি।

মেলিনা সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন। স্বামীর দিকে তাকিয়েছিলেন। সব শেষে শান্তভাবে বলেছিলেন–ঠিক আছে, আমরা আমাদের পথেই চলব।

তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। ছুরিটা মনে করে হাতে নিলেন।

ডেমিরিস চিৎকার করে উঠলেন–তোমার প্যাকেটটা নিয়ে নাও।

 মেলিনা চলে গিয়েছিলেন।

***

মেলিনা এলেন তার স্বামীর ড্রেসিং রুমে। একটা ক্লোসেটের দরজা খুললেন। অসংখ্য স্যুট ঝুলছে। একটা দিকে কেবল স্পোর্টস জ্যাকেট রয়েছে। তিনি একটা জ্যাকেটের কাছে পৌঁছোলেন। সোনার বোতামটা জ্যাকেট থেকে খুলে নিলেন। সেটা রেখে দিলেন নিজের পকেটের মধ্যে।

এবার কী করবেন? ড্রয়ার খুললেন। স্বামীর সাঁতারের পোশাক। বেছে নিলেন। সব কাজ শেষ হয়ে গেছে। শান্তভাবে, কোনো ঝামেলা হয়নি। মেলিনা ভাবলেন।

***

ক্যাটেলানোস ডিটেকটিভ এজেন্সি সোফকলিয়স স্ট্রিটে অবস্থিত। পুরোনো দিনের একটা ধূসর বাড়ি। একেবারে কোণের দিকে। মেলিনা অফিসে ঢুকে পড়লেন। মালিকের সাথে কথা বললেন। ভদ্রলোকের নাম ক্যাটেলানোস। মাঝবয়সি টাকমাথা, পাতলা গোঁফ আছে।

–শুভ সকাল শ্রীমতী ডেমিরিস। বলুন আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?

–আপনার সহযোগিতা চাইছি।

কী ধরনের সহযোগিতা?

–আমার স্বামীর হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে হবে।

ক্যাটেল।নোস অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বিপদের গন্ধ পেয়েছেন। যে ধরনের মামলা তার হাতে আসে। এটা সেই পর্যায়ভুক্ত নয়, কিন্তু কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের বিরুদ্ধে যাবেন। কী করে। ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো।

–আপনি কেন পুলিশের সাহায্য নিচ্ছেন না?

 উনি জানতে চেয়েছিলেন।

-না, আমি চাই না, সকলে এই ঘটনাটার কথা জানুক। আমি ব্যাপারটা গোপন রাখতে চাইছি। আমি আমার স্বামীকে বলেছি যে, আমি তাকে ডিভোর্স দেব। সে আমাকে হত্যা করবে বলে শাসিয়েছে। তাই আপনার কাছে এসেছি।

-ঠিক আছে, বলুন তো আপনাকে কী ধরনের নিরাপত্তা দিতে হবে?

কয়েকজন শক্তসমর্থ লোক দরকার, যারা সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে।

 ক্যাটেলানোস মেলিনার মুখের দিকে তাকালেন। আহা, এমন লাবণ্যবতী মহিলা, মনে হচ্ছে নিউরোটিক রোগী। ওঁর স্বামী এই ধরনের ব্যবহার করতেই পারে না। এটা বোধহয় কোনো পারিবারিক সমস্যা। মনোমালিন্যের ব্যাপার। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আহা, এঁনার কাছ থেকে ভালো টাকা আদায় করা যেতে পারে। ক্যাটেলানোস ঠিক করলেন, তাহলে সমস্যাটা সমাধানের চেষ্টা করলে কেমন হয়। হ্যাঁ, ব্যাপারটা একটু গোলমেলে কিন্তু তাতে কী? এই পেশার মধ্যে তো গোলমাল লেগেই আছে।

তিনি বললেন, ঠিক আছে, আমি একজন ভালো চেহারার শক্তসমর্থ লোককে আপনার সঙ্গে দিচ্ছি। কবে থেকে কাজ শুরু হবে?

–সোমবার থেকে।

তার মানে? একটু সময় আছে।

 মেলিনা ডেমিরিস বললেন আমি আপনাকে টেলিফোন করে সব খবর দেব। আপনার কোনো বিজনেস কার্ড আছে কি?

ক্যাটেলানোস বলেছিলেন–অবশ্যই আছে। তিনি মেলিনার হাতে নিজের বিজনেস কার্ডটি তুলে দিলেন। আহা, এমন সুন্দর খদ্দের, এই নামটাই যথেষ্ট, নামটা বাঁধিয়ে রাখতে হবে। তাহলেই সহজে আমরা অন্যদের প্রভাবিত করতে পারব।

***

মেলিনা বাড়িতে ফিরে এলেন। ভাইকে ফোন করলেন।

–স্পাইরস, তোমার জন্য একটা ভালো খবর আছে। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন। কোস্টাকে ফঁদে ফেলার সব বন্দোবস্ত পাকা।

কী বলছ? আমি ওকে বিশ্বাস করি না। কোস্টা তোমার সঙ্গে সন্ধি করতে চায়? মেলিনা, এটা মনে হচ্ছে, ওর কোনো একটা চাল। সবদিক বিবেচনা করে দেখ। এই জালে পা দিও না।

–না-না, অত চিন্তা কোরো না। ওকে দেখে অনুতপ্ত বলে মনে হচ্ছে। ও বোধহয় বুঝতে পেরেছে, তোমাদের মধ্যে যুদ্ধ করে কোন লাভ নেই। ও পরিবারের শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

দীর্ঘক্ষণের নীরবতা।

–আমি বিশ্বাস করছি না।

-ওকে একটা সুযোগ দিলে কী ক্ষতি? ও তোমার সঙ্গে দেখা করবে। তোমার লজে। অ্যাক্রোকোরিন্থে। আজ তিনটের সময়।

-তিন ঘণ্টা লাগবে সেখানে পৌঁছোতে। আমরা শহরের মধ্যে কোথাও দেখা করতে পারি না?

না, মেলিনা বলেছেন, ওখানে গেলেই ব্যাপারটা নিরাপদে থাকবে।

–ঠিক আছে, আমি ওখানে পৌঁছে যাব। দেখি তোমার জন্য কী করা যায়।

মেলিনা বলেছিলেন- শুধু আমার একার জন্য নয়, আমাদের দুজনের জন্য। এখনকার মতো গুডবাই।

–গুডবাই।

.

মেলিনা কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের অফিসে ফোন করলেন। ভেসে এল তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর কী হয়েছে? আমি এখন ব্যস্ত।

–এইমাত্র স্পাইরসের কাছ থেকে একটা ফোন পেয়েছি। সে তোমার সাথে বিবাদ মেটাতে চাইছে।

হাসির শব্দ–আমি বাজি ফেলে বলতে পারি, এই ব্যাপারটায় সে রাজি হবে না। অনেকবার আমি এই প্রস্তাব রেখেছি। সে কিন্তু রাজি হয়নি।

ভবিষ্যতে সে আর কখনও তোমার পথের কাঁটা হবে না। কোস্টা, তুমি শেষবারের মতো আমাকে বিশ্বাস করো। সে তার সমস্ত জাহাজ তোমাকে বিক্রি করতে চাইছে।

–আমাকে বিক্রি করবে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?

ডেমিরিসের কণ্ঠস্বরে ঔৎসুক্য আগ্রহ এবং আতিশয্য।

-হ্যাঁ, সে বলেছে, অনেক হয়েছে, আর ঝগড়াঝাটি নয়। এবার শান্তিতে থাকবে।

–ঠিক আছে, তার অ্যাকাউটেন্টকে আমার অফিসে পাঠিয়ে দাও।

না, সে তোমার সাথে নিজেই কথা বলতে চাইছে। তোমাকে আজ বিকেল তিনটের সময় তার অ্যাক্রোকোরিন্থ লজে যেতে হবে।

–ওর লজে?

–হ্যাঁ, ওটা একটা শান্ত নিরাপদ জায়গা। তোমরা দুজন ছাড়া কেউ থাকবে না। সে চায় না, এই খবরটা বাইরে পৌঁছে যাক।

ডেমিরিস ভাবতে লাগলেন, শেষ পর্যন্ত মস্ত বড়ো এক যুদ্ধে জিততে চলেছেন তিনি। –ঠিক আছে, ডেমিরিস বললেন, তুমি জানিয়ে দাও, আমি ঠিক সময়ে ওখানে পৌঁছে যাব।

.

অ্যাক্রোকোরি জায়গাটা খুব একটা কাছে নয়। শহর ছাড়িয়ে দীর্ঘ রাস্তা চলে গেছে। দুপাশে সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ। আহা, আঙুরের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পাতিলেবু। ধান পেকে গেছে কী? স্পাইরস লামব্রো প্রাচীন ধ্বংসাবশেষকে এড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। এলিফসিসের উঁচু স্তম্ভগুলো দেখা যাচ্ছে। ছোটো ছোটো দেবতাদের বেদী। ডেমিরিসের কথা মনে হল তার।

.

লজে পা রাখলেন তিনি। কেবিনের দরজাটা খুলে দিলেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। একটু পরে কোন্ ঘটনা ঘটবে? মনের মধ্যে তোলপাড়। সত্যি সত্যি কনস্ট্যানটিন সন্ধি চাইছে? নাকি এটা তার আর একটা চাল? যদি ভয়ংকর কিছু ঘটে যায়, মেলিনা সব খবর ঠিক মতো পাবে কী? স্পাইস গাড়ির বাইরে চলে এলেন। সেই ফাঁকা লজের ভেতর ঢুকে পড়লেন।

এই লজটা একটা পুরোনো কাঠের বাড়ি। এখান থেকে দূরের কোরিন্থের দৃশ্যাবলি, দেখা যায়। ছোট্টবেলায় স্পাইরস এখানে আসতেন। বাবা সঙ্গে থাকতেন। পাহাড় চূড়ার এখানে সেখানে শিকারের খেলা চলত। তিনি এখন একটা বড়ো শিকার ধরতে এখানে এসেছেন।

.

পনেরো মিনিট কেটে গেছে। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস এসে গেলেন। স্পাইরসকে দেখতে পেলেন। স্পাইরস তার জন্য অপেক্ষা করছেন। আহা, মুখে আনন্দের চিহ্ন। অনেকদিন বাদে, দিন কেন অনেক বছর কেটে গেছে। এবার সব থেকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেই পরাজয় স্বীকার করতে চাইছে। এর থেকে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে।

ডেমিরিস গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। কেবিনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী এখন মুখোমুখি বসে আছেন। একে অন্যকে মাপবার চেষ্টা করছেন।

ডেমিরিস নীরবতা ভেঙে বললেন–কী প্রিয় ভগ্নিপতি, শেষ অব্দি আমরা পথের প্রান্তে এসে পৌঁছোতে পেরেছি, তাই তো?

–এই উন্মত্ততা বন্ধ করতে হবে কোস্টা, অনেক হয়েছে, আর নয়।

–আমিও তোমার সাথে একমত। তোমার হাতে কতগুলো জাহাজ আছে স্পাইরস?

লামব্রো অবাক হলেন- তুমি কী বলছ?

-তোমার হাতে কতগুলো জাহাজ আছে? সঙ্গি করে বলো তো? আমি সব কটা কিনে নেব। তবে একটু কম টাকা দেব। তুমি তো আমার আত্মীয়।

লামব্রো কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছেন না।

–আমার জাহাজ কিনবে?

-হ্যাঁ, আমি সব কটা কিনে নেব। তাহলে আমি পৃথিবীর সবথেকে বড় জাহাজ বাহিনীর অধীশ্বর হব।

–তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুমি কেন এই কথাটা ভাবছ বলো তো? আমি কি পাগল! আমার জাহাজ তোমার হাতে তুলে দেব?

এবার ডেমিরিসের অবাক হওয়ার পালা।

-কেন এই জন্যই তো আমরা এখানে এসেছি। আমি তো তাই শুনেছি।

–আমরা এখানে এসেছি, যেহেতু তুমি সন্ধি করতে চাইছ।

 ডেমিরিসের মুখ থমথমে হয়ে উঠেছে–আমি সন্ধি করতে চাইছি? তোমাকে কে বলল?

–মেলিনা।

 এবার দুজনেই সরল সত্যটা উপলব্ধি করতে পারলেন।

-মেলিনা বলেছে, তোমার সাথে আমি সন্ধি করতে চাইছি।

–মেলিনা বলেছে, আমি আমার জাহাজ বিক্রি করব?

ডেমিরিস চিৎকার করে বললেন–ওই কুত্তীর বাচ্চা, আমার মনে হচ্ছে, এইভাবে সে আমাদের দুজনকে এক টেবিলে বসাতে চেয়েছে। আহা, সে একটা মস্ত বড় বোকা। লামব্রো, তুমি নিজের বোনকে চিনতে পারলে না। তোমার জন্য আমি গোটা সন্ধ্যেটা নষ্ট করলাম।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। দরজা দিয়ে ছিটকে বাইরে এলেন।

স্পাইরস লামব্রো তার দিকে তাকিয়েছিলেন। মেলিনা মিথ্যে কথা বলতে পারে না। মেলিনা হয়তো ভেবেছিল, স্বামী এবং আমাকে একটেবিলে বসাতে না পারলে উপায় নেই। কিন্তু এখন বড় দেরি হয়ে গেছে, বড় দেরি, মেলিনাকে বোধহয় বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হল না।

.

ডেমলিনা বলেছে তোমার সপ্রলব্ধি করতে, নিজের বোনকে টেবিলে বলেন–ওইজ বিক্রি

একটা বেজে তিরিশ মিনিট। মেলিনা তাঁর কাজের মেয়েটিকে ডাকল–আনড্রিয়া, তুমি আমার জন্য একটু চা আনবে?

এখুনি আনছি ম্যাডাম।

কাজের মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যখন সে ফিরে এল, দশ মিনিট কেটে গেছে, শুনতে পেল তার মালকিন টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন, উত্তেজিত কণ্ঠস্বর

না কোস্টা, আমি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাইছি। আমি জনসমক্ষে এটা প্রচার করব, যতটা সম্ভব।

আনড্রিয়া অবাক হয়েছে। ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে দিল। হতভম্ভের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর চলে যাবার জন্য ফিরে দাঁড়াতেই মেলিনা হাত নেড়ে তাকে থাকতে বললেন।

মেলিনা তখন মৃত ফোনে কথা বলছেন–তুমি আমাকে এভাবে ভয় দেখাবার চেষ্টা কোরো না। কোনো অবস্থাতেই আমি আমার মত পরিবর্তন করব না। না, তুমি কেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছ কোস্টা? তুমি আমার কী করবে? ঠিক আছে, আমি বীচ হাউসে তোমার সাথে দেখা করতে যাব। তুমি আমার ক্ষতি করার চেষ্টা কোরো না কিন্তু। হ্যাঁ, আমি একাই যাব। আধ ঘণ্টার মধ্যে। ঠিক আছে।

মেলিনা রিসিভারটা আস্তে নামিয়ে রাখলেন। মুখের ওপর উদ্বিগ্নতার ছাপ। আনড্রিয়ার দিকে তাকালেন।

–আমি আমার স্বামীর সাথে দেখা করতে বীচ হাউসে যাচ্ছি। যদি ছটার মধ্যে আমি না ফিরি, তাহলে তুমি অবশ্যই পুলিশের কাছে খবর দিও।

আনড্রিয়ার মুখ শুকিয়ে গেছে ড্রাইভার কি আপনাকে নিয়ে যাবে ম্যাডাম?

না, ডেমিরিস বলেছেন, আমি যেন একলা যাই।

–ঠিক আছে, ম্যাডাম।

.

আর একটা কাজ করতে হবে। ক্যাথেরিন আলেকজান্ডারের জীবন এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। তাকে সাবধান করতে হবে। ওই প্রতিনিধি দলের মধ্যে আততায়ী লুকিয়ে আছে। তারপর? ওই মেয়েটিকে আর দেখা যাবে না। তাকে এমন জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে, সেখান থেকে কেউ জীবন্ত ফিরে আসতে পারে না। মেলিনা লন্ডন অফিসে ফোন করল।

ক্যাথেরিন আলেকজান্ডার এখানে কাজ করেন?

–এই মুহূর্তে তিনি এখানে নেই। আপনাকে কীভাবে সাহায্য করব?

মেলিনা ইতস্তত করতে থাকেন। এই খবরটা দিতেই হবে। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করে দেওয়া যায় কি?নাকি মেলিনা আর একটু অপেক্ষা করবেন। কোস্টার কথা মনে পড়ল।উইম ভ্যানডিন নামে এক ভদ্রলোকের কথা কোস্টা বলেছিল। তাকে ফোনে পেলে ভালো হত।

–আমি কি মিঃ ভ্যানডিনের সাথে কথা বলতে পারি?

–আপনি একটু অপেক্ষা করুন।

একজন মানুষের গলা শোনা গেল–হ্যালো?

 মেলিনা উইমকে কী করে চিনবেন?

মেলিনা বললেন–ক্যাথেরিন আলেকজান্ডারের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে। আপনি দেখবেন যে, এই খবরটা যেন যথাসময়ে তার কানে পৌঁছে যায়।

ক্যাথেরিন আলেকজান্ডার?

-হ্যাঁ, বলবেন, তার জীবন এখন নিরাপদ নয়। কেউ বা কারা তাকে হত্যা করতে চাইছে। এথেন্স থেকে যে প্রতিনিধি দল লন্ডনে গেছেন, তাদের মধ্যে আততায়ী লুকিয়ে আছে। কথাটা দয়া করে বলবেন তো?

-এথেন্স?

–হ্যাঁ।

–এথেন্সের জনসংখ্যা…

মেলিনা কিছুই বুঝতে পারছেন না, লোকটার কি মাথা খারাপ? তিনি ফোনটা রেখে দিলেন। তিনি চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ, পরে কিছু ঘটে গেলে তিনি আর নিজেকে দোষারোপ করতে পারবেন না।

উইম ডেস্কে গিয়ে বসলেন। টেলিফোনের কথাগুলো তার মনকে আচ্ছন্ন করেছে। কেউ ক্যাথেরিনকে হত্যা করতে চাইছে। এ বছর ইংল্যান্ডে ১১৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাথেরিন হবে ১১৫ নম্বর বলি। এথেন্স থেকে কেউ একজন এসেছে। কেউ না কারা? জেরি হ্যালি, ইভেস রেনার্ড, ডিনো মাত্তুসি? তাঁদের কেউ একজন ক্যাথেরিনকে মেরে ফেলবেন। উইমের কম্পিউটার কাজ করতে শুরু করে। এই তিনটে লোকের সমস্ত তথ্য তার মগজে ঢুকে, গেছে। ধীরে ধীরে তিনি সবকিছু ভাবতে থাকেন।

ক্যাথেরিন ফিরে এল। উইম এই টেলিফোনের ব্যাপারে তাকে কিছুই জানালেন না।

 তিনি ভাবছিলেন, দেখাই যাক না। সত্যি সত্যি দুর্ঘটনাটা ঘটে কিনা।

.

ক্যাথেরিনকে তখন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। রোজ সন্ধ্যাবেলা কাবোর না কারোর সঙ্গে ঘুরতে হচ্ছে। থিয়েটার হল অথবা মিউজিক্যাল ক্লাবে। ভোর থেকেই আবার কাজ শুরু  হচ্ছে। উইমের সঙ্গে দেখা হয়েছে। উইম বোধহয় ক্যাথেরিনকে আর পছন্দ করছেন না।

কখন এই ঘটনাটা ঘটবে–উইম ভাবতে থাকেন। মাঝে মধ্যেই ভাবছেন, টেলিফোনের; খবরটা দেওয়া উচিত। কিন্তু না দিলেই বা কী ক্ষতি হবে?

.

২৫.

কুড়ি বছরের স্মৃতি, এক ঘণ্টার যাত্রা শহর থেকে বীচ হাউস পর্যন্ত। মেলিনা অনেক কিছু ভাবছিলেন। কোস্টা, তরুণ এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের। বলেছিল–তুমি আর আমি এখানেই স্বর্গ তৈরি করব। তোমার সৌন্দর্য, আমি বর্ণনা করতে পারব না। হায় ঈশ্বর।

সেই অসাধারণ প্রমোদ তরণী। সারাতে কাটানো ছুটির অবসর। দিনগুলো পরিপূর্ণ ছিল ভালোবাসার স্মারক চিহ্নতে। রাতগুলো? বন্য ভালোবাসায় ভরা। তারপর ওই গর্ভপাত? একটির পর একটি রক্ষিতার আবির্ভাব। নোয়েলে পেজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। জনসমক্ষে অপমান। আরও কত কী? প্রেম মরে গেল। ঘৃণা জেগে উঠল। তুমি কেন নিজেকে হত্যা করছ না? শেষ পর্যন্ত স্পাইরসকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াসে মত্ত হয়েছ।

স্মৃতির সমুদ্রে আলোড়ন, মেলিনা আর কোনো কিছু ভাবতে পারছেন না।

.

মেলিনা বীচ হাউসে পৌঁছে গেলেন। একেবারে ফাঁকা। আকাশে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। ঠান্ডা বাতাস বইছে সমুদ্রের দিক থেকে। শয়তানের পদচিহ্ন, মেলিনা ভাবলেন।

তিনি ওই সুন্দর বাড়িটার দিকে হেঁটে গেলেন। শেষবারের মতো দেখলেন তার দিকে।

 তারপর? ফার্নিচারগুলো এলোমেলো করে দিলেন। ল্যাম্পশেডগুলো ভেঙে দিলেন। নিজের পোশাকটা নিজেই ছিঁড়ে ফেললেন। মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ডিটেকটিভ এজেন্সির কার্ডটা বের করলেন। টেবিলে রাখলেন। কম্বলের তলায় ওই সোনার বোতামটা ঢুকিয়ে দিলেন। কোস্টা তাকে যে সোনার রিস্টওয়াচটা দিয়েছিল, সেটা ভেঙে চুরে টেবিলের ওপর ফেলে রাখলেন।

স্বামীর সাঁতারের পোশাকটা নিয়ে এলেন। সেগুলোকে সমুদ্র সৈকতে পৌঁছোতে হবে। সমুদ্রের জলে ভিজিয়ে দিলেন। বাড়িতে ফিরে এলেন। আরও একটা কাজ বাকি আছে। এবার? দীর্ঘ নিশ্বাস নিলেন তিনি। ওই কসাইয়ের ছুরিটা। সাবধানে খুললেন। টিসু পেপারে হাতলটা চেপে দিলেন। না, হাতের চিহ্ন যেন উঠে না যায়। মেলিনা সেটা এক হাতে ধরলেন। তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। মাথা ঠিক রাখতে । হবে। নিজেকেই আঘাত করতে হবে। ব্যাপারটা কষ্টদায়ক। হত্যা করার মতো। আহা, তারপর? ষড়যন্ত্রের বাকিটুকু…

উনি চোখ বন্ধ করলেন, ছুরিটা ঢুকিয়ে দিলেন।

অসম্ভব যন্ত্রণা, গল গলিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। মেলিনা সাঁতারের পোশাকটা পাশে রাখলেন, দেখলেন সেখানে রক্ত জমেছে। ক্লোসেটের কাছে পৌঁছে গেলেন। এদিক ওদিক ঘুরলেন। আচ্ছন্নের মতো অবস্থা। ব্যাপারটা ঠিক হয়েছে কি? কোনো কিছু পড়ে নেই তো? চারদিকে তাকালেন। এবার ভোলা দরজা দিয়ে সাগর সৈকতের দিকে ছুটে গেলেন। কার্পেটের ওপর রক্তের ফোঁটা ফোঁটা দাগ, ক্রিমসন রঙের আলপনা।

তিনি সমুদ্রের দিকে ছুটতে শুরু করলেন। রক্তের স্রোত আরও দ্রুত। তিনি ভাবলেন, কোস্টা কি জিতে যাবে এই খেলাতে? আমি কখনও তা হতে দেব না।

এত দূর? আর পারছি না। আরও আরও একটা পদক্ষেপ–আরও একটা পদক্ষেপ বাকি আছে।

এভাবেই উনি হাঁটছিলেন। লড়াই করছিলেন। আর বোধহয় পারছেন না। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। পড়ে গেলেন হুড়মুড়িয়ে। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। দেহের সমস্ত শক্তি কেন্দ্রীভূত করে আবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর? শেষ অব্দি সমুদ্রের ঠান্ডা জল তাকে কাঙ্ক্ষিত শান্তি দিল। সকল যন্ত্রণার উপশম।

প্রথমে লবণাক্ত জল তার ক্ষতে আঘাত করেছিল। উনি চিৎকার করেছিলেন। অসহ্য যন্ত্রণা। স্পাইরসের জন্য এ যন্ত্রণা আমাকে সহ্য করতেই হবে। প্রিয় দাদা আমার।

অনেক দূরে, মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। এখন একটু সাঁতার দিতে পারলে ভালো হত। রক্তের সমুদ্র। তখনই কী যেন ঘটে গেল! একটা অলৌকিক ঘটনা! আকাশ থেকে মেঘ নেমে এল। কে যেন সাদা মোলায়েম হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সর্বাঙ্গে। আঃ, এত আনন্দ, যন্ত্রণা চলে গেছে। মনে হল, তিনি বুঝি শান্তির সমুদ্রে স্নান করছেন।

আমি বাড়ি যাব, শেষ অব্দি আমি বাড়ি যাব। মেলিনা ভাবলেন, অনেক রক্ত সঞ্জাত সন্ধ্যার পর আমি একটি নির্বিঘ্ন রাত্রির সন্ধান পেয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *