২. অদ্ভুত বন্ধুত্বের সম্পর্ক

০৬.

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস এবং তার শালা স্পাইরস লামব্রো। তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

স্পাইরস লামব্রোকে প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী মানুষ বলা যেতে পারে। যথেষ্ট অর্থবান তিনি। ডেমিরিসের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন। পৃথিবীর সবথেকে বড়ো কারগো জাহাজের মালিক ডেমিরিস। স্পাইরসের হাতে আছে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাহাজ সম্ভার। ডেমিরিস সংবাদপত্র এবং বিমান সংস্থার একটি চেন চালিয়ে থাকেন। তারই পাশাপাশি তিনি একাধিক তৈলখনির মালিক, তৈরি করেছেন ইস্পাতের কারখানা, কিনে নিয়েছেন সোনার খনি। স্পাইরস লামব্রোও এব্যাপারে পিছিয়ে পড়েননি। তার হাতে অনেকগুলো ইনসিওরেন্স কোম্পানির দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়েছে। একাধিক ব্যাঙ্কের সঙ্গে তিনি যুক্ত, রিয়েল এস্টেট অর্থাৎ সম্পত্তির ব্যবসা করেন। এছাড়া তার একটি কেমিক্যাল প্ল্যান্ট আছে। সকলেই বলে থাকেন, তাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। তবে কেউ কেউ বলেন, ওপরে যতই বন্ধুত্বের আবরণ থাক না কেন, তারা একে অন্যের ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী।

জনমুখে শোনা গেছে ভাবতে অবাক লাগে, পৃথিবীর দুই ধনকুবের কী করে এমন ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করেন!

বাস্তবিক পক্ষে তারা একে অন্যকে মোটেই সহ্য করতে পারেন না। যখন স্পাইরস লামব্রো একশো ফুট লম্বা একটি প্রমোদ তরণী কেনেন, কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস সঙ্গে সঙ্গে একশো পঞ্চাশ ফুট লম্বা একটি প্রমোদ তরণী কেনার জন্য ছটফট করতে থাকেন। এরই পাশাপাশি তিনি দুটি স্পিডবোট কিনে নেন। তৈরি করেন পরিষ্কার জলের একটি সুইমিং পুল। এই ঘটনাতেই প্রমাণ হয়, তারা একে অন্যকে টেক্কা দেবার জন্য কতখানি উদ্গ্রীব।

স্পাইরস লামব্রোর জাহাজ সম্ভার বারোটি ট্যাঙ্কার, দু লক্ষ টন যুক্ত ক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে চলে। এই খবর কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের কানে পৌঁছোনো মাত্র তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি ট্যাঙ্কারের সংখ্যা বাড়িয়ে তেইশ-এ নিয়ে যান। ভারবহনের ক্ষমতা ছলক্ষ পঞ্চাশ হাজার টনে পৌঁছে যায়। স্পাইরস লামব্রো রেস হর্স কেনার সাথে সাথে ডেমিরিস আর একটা বড়ো আস্তাবল তৈরি করেন। দুই ধনবান মানুষের ঘোড়ার মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইতে কে জিতবে তা বুঝতে পারা যায় না। তবে দুজনেই যে ওই লড়াইয়ের ফলাফলের জন্য উগ্রীব চিত্তে অপেক্ষা করতে থাকেন, তাদের হাবভাব ও আচরণে সেই উৎকণ্ঠা ধরা পড়ে।

তাঁদের দুজনের মাঝে মধ্যেই দেখা হয়। দুজনেই অনেকগুলি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আছেন। একই মঞ্চ আলো করে দুজনে পাশাপাশি বসে থাকেন। বিভিন্ন করপোরেশনের বার্ষিক অধিবেশনে তাদের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আবার কখনও সখনও পারিবারিক উৎসব অনুষ্ঠানেও তাদের ডাক দেওয়া হয়।

স্বভাবের দিক থেকে তারা একে অন্যের বিপরীত। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে আমরা সংগ্রামশীল জীবনের নায়ক বলতে পারি। কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে তিনি বুদ্ধি আর পরিশ্রমকে পাথেয় করে আজ এখানে এসে পৌঁছোতে পেরেছেন। স্পাইরস লামব্রার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। জন্ম সূত্রেই তিনি ছিলেন অভিজাত সম্প্রদায়ের। সোনার চামচ মুখে দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন বলা যেতে পারে। পাতলা ছিপছিপে চেহারা

৯৩৩ তাঁর, পুরোনো রীতিনীতি বজায় রাখতে ভালোবাসেন। খুব একটা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরেন না। তার বংশমর্যাদার কথা ভেবে সব সময় গৌরবান্বিত থাকেন। বাভারিয়ার আটো শহর থেকেই এই বংশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই বংশের কেউ কেউ একদা গ্রিসের রাজা হিসেবে সুখ্যাত হয়েছিলেন। গ্রিসে যখন রাজনৈতিক উন্মাদনা শুরু হল, তখন সব কিছু কেমন পালটে গেল। তখন এই বংশের কিছু বুদ্ধিমান মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করেছিলেন। ধীরে ধীরে তারা জাহাজ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। জমি কেনাবেচার কাজও চলতে থাকে। স্পাইরস লামব্রোর পিতা ছিলেন এক বিখ্যাত ব্যবসাদার। পারিবারিক সূত্রে স্পাইরস সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন।

গত কয়েক বছর ধরে স্পাইরস লামব্রো এবং কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের মধ্যে এই মেকি বন্ধুত্বের সম্পর্কটা এগিয়ে চলেছে। কিন্তু একে অন্যকে শেষ করে দেবার জন্য বদ্ধপরিকর। শুধু সময় আর সুযোগের অপেক্ষা। ডেমিরিস মাঝে মধ্যেই বিপাকে পড়েন। বুদ্ধিমত্তার জোরে সেই বিপদের সীমারেখা থেকে আবার জীবনের প্রান্তে চলে আসেন। লামব্রো অবশ্য এ ব্যাপারে একটু সহানুভূতিসম্পন্ন। যেহেতু ডেমিরিস সম্পর্কে তাঁর শালা, তাই তিনি খুব একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারেন না। সবসময় প্রিয় বোন মেলিনার মুখখানি মনে পড়ে যায়।

স্পাইরস লামব্রো একজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। তিনি ভাগ্যকে বিশ্বাস করেন। ভগবানের ওপর তার আস্থা আছে, আগাধ এবং অটুট। মাঝে মধ্যেই তিনি বিভিন্ন জ্যোতিষীর কাছে পরামর্শ নেন। তবে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকেও অতুলনীয়। তিনি অতি সহজে বুঝতে পারেন প্রতারকদের। তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। একজন জ্যোতিষীর কথা তার বিশেষ মনে পড়ে। ওই ভদ্রমহিলা চোখ বন্ধ করে ভবিষ্যতের স্পষ্ট ছবি দেখতে পান। উনি বলেছিলেন, মেলিনার গর্ভপাত ঘটে যাবে। উনি আরও বলেছিলেন, এই বিবাহ শেষ । পর্যন্ত সুখের হবে না। ওই ভদ্রমহিলা এথেন্সে থাকেন, উনি হলেন মাদাম পিরিস।

.

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের জীবনযাত্রা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। গেরোন্ডা স্ট্রিটের অফিসে ঠিক ছটার সময় এসে হাজির হন। এই সময় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। ডেমিরিস বেশ কিছুক্ষণ তার এজেন্টদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। বিশ্বের সমস্ত শহরে তার এজেন্টরা। ছড়িয়ে আছেন।

ডেমিরিসের নিজস্ব অফিসটি চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জায় ভরা। দেখলে মনে হয়, এ বুঝি এক রাজপ্রাসাদ! তবে ছোটো এবং সংবদ্ধ। এই অফিসের জানালায় দাঁড়ালে এথেন্স শহরটা ভালোভাবে দেখা যায়। কালো গ্রানাইট দিয়ে মেঝেটা তৈরি হয়েছে। ইস্পাত এবং চামড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে ফার্নিচার। দেওয়ালে ঝুলছে অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন। লেজারসের পাশাপাশি ব্রাকেস এবং পিকাসোর বেশ কয়েকটা বিশ্ববিখ্যাত ছবি। ছবিগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে পারা যায়, মালিক শিল্পরসিক। আছে কাঁচ এবং ইস্পাত দিয়ে তৈরি একটি বিরাট ডেস্ক। আছে লেদার প্রোন চেয়ার। ডেস্কের ওপর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মুখোশ সাজানো আছে। ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি। লেখা আছে? আলেকজান্ডার–মানুষের পরিত্রাতা।

সেই বিশেষ সকালে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের নিজস্ব ফোনটা বেজে উঠল। তখন তিনি সবেমাত্র অফিসে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু এই ফোননম্বর তো জানে মাত্র দু-জন মানুষ। তাহলে কে?

ডেমিরিস রিসিভার তুলে বললেন–কালিমেহরা।

কালিমেহরা, কণ্ঠস্বর ভেসে এল, স্পাইরস লামব্রোর প্রাইভেট সেক্রেটারি নিকোস ভেরিটোজ-এর। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের মধ্যে সন্ত্রস্ত ভাব ফুটে উঠেছে।

-অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করছি বলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন মিঃ ডেমিরিস। আপনি বলেছিলেন, বিশেষ কোনো খবর এলে সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে যেন জানানো হয়।

-হ্যাঁ, কিন্তু, খবরটা কী?

লামব্রো একটা কোম্পানি কিনে নেবার চেষ্টা করছেন। কোম্পানিটির নাম হল অরোরা, ইন্টারন্যাশনাল। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে এটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। লামব্রোর একজন বন্ধু এই কোম্পানির ডাইরেক্টরস-এর অন্যতম। এই কোম্পানির সঙ্গে সরকারের ভালোলা সম্পর্ক আছে। নানা ধরনের বরাদ পেয়ে থাকে এই কোম্পানিটি। ব্যাপারটা কিন্তু খুবই গোপনীয়। কিছু দিনের মধ্যেই স্টক মার্কেটে কোম্পানির সুনাম আরও বেড়ে যাবে। শেয়ারের দামও বাড়তে থাকবে।

–আমি স্টক মার্কেটের ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী নই, ডেমিনিস সংক্ষেপে বললেন, পরবর্তীকালে কিন্তু এভাবে আমাকে আর বিরক্ত করবে না, ঠিক আছে।

–আমি দুঃখিত, মিঃ ডেমিরিস, আমি ভেবেছিলাম…

কী ভেবেছিলেন, সেটা জানার প্রয়োজন বোধ করলেন না মিঃ ডেমিরিস। তিনি রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন।

.

সকাল আটটা, ডেমিরিসের সহকারী জিনাস টায়োস প্রবেশ করলেন। ডেমিনিস তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন এবং বললেন নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে অরোরা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি আছে। আমাদের সমস্ত খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলল যে, এই কোম্পানিটাকে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অচেনা অজানা উৎসের কথা বলবে। তবে খবরটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই গল্পটা রোজ শোনাবে। যাতে বাজারে কোম্পানির সুনামটা পড়ে যায়। তারপর এই কোম্পানিটাকে কেনার চেষ্টা । করা হবে।

–ঠিক আছে স্যার। আর কিছু?

না, আমার হাতে সব ক্ষমতা আসবার পর বলতে হবে যে, এসব গুজবের অন্তরালে কোনো সত্যি লুকিয়ে নেই। দেখো, স্পাইরাস লামব্রো ইতিমধ্যে কতদূর এগিয়েছেন। এই কোম্পানির ব্যাপারে আরও খোঁজখবর নাও।

জিনাস টাকরোস শান্তভাবে বললেন–মিঃ ডেমিরিস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যাপারে অনুসন্ধান করাটা কিন্তু আইনত অপরাধ।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস হেসে বললেন আমি জানি।

.

এক মাইল দূরে সিনটাগমা স্কোয়ারে স্পাইরস লামব্রো তার অফিসে বসে কাজ করছিলেন। তার অফিসটা দেখলে মনে হয়, এখানে আভিজাত্যের সঙ্গে প্রাচীনত্বের সংমিশ্রণ ঘটে গেছে। যে ফার্নিচারগুলো অফিসে পাতা, সেগুলিকে অনায়াসে আমরা বিরলতম অ্যান্টিক বলতে পারি। তার মধ্যে ফরাসি এবং ইতালীয় সৌন্দর্যের ছাপ আছে। তিনদিকের দেওয়ালে সেসব ছবি টাঙানো রয়েছে সেগুলি ফরাসি ইমপ্রেসনিস্ট যুগের শিল্পীদের আঁকা। চতুর্থ দেওয়ালটি উৎসর্গ করা হয়েছে বেলজিয়ামজাত শিল্পীদের উদ্দেশে, ভ্যানরাই সেলবার্গ থেকে ডিম্মেড পর্যন্ত। অফিসের বাইরে দরজায় লেখা আছে–লামব্রো অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। কিন্তু নেহাতই কথার কথা। স্পাইরস লামব্রো তার বাবার কাছ থেকে বিশাল ব্যবসার উত্তরাধিকার সংগ্রহ করেছেন। অনেক বছর ধরে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন তার বাণিজ্যের সুবাস। এখানে তিনিই সর্বময় কর্তা।

স্পাইরস লামব্রোকে আমরা এক সুখী মানুষ বলতে পারি। তিনি ধনী এবং সফল। স্বাস্থ্যের দিক থেকে বিন্দুমাত্র চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন স্পাইরস সত্যিকারের সুখ ভোগ করতে পারবেন না। এই শালাবাবুটিকে তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। বলা যেতে পারে অত্যন্ত ঘৃণা করেন। ডেমিরিস তার চোখে এক জীবন্ত শয়তান। এমন একজন শয়তান, যার মধ্যে নৈতিকতার ছাপ নেই। ডেমিরিসের যে-কোনো আচরণকে লামব্রো সন্দেহের চোখে দেখেন। বিশেষ করে প্রিয় বোন মেলিনার প্রতি তার এই অভদ্র আচরণকে তিনি কোনোদিনই ক্ষমা করবেন না। বোধহয় তাদের দুজনের মধ্যে শত্রুতা এখন চরমসীমায় পৌঁছে গেছে।

এই বৈরিতার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে দশ বছর আগে। সেই গল্পটাও আমাদের শুনে নিতে হবে। একদিন লাঞ্চের আসরে স্পাইরস লামব্রো তাঁর প্রিয় বোন মেলিনার সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মেলিনা দাদাকে এত উত্তেজিত হতে আগে কখনও দেখেননি।

–মেলিনা, তুমি কি জানো একদিনে সারা পৃথিবীতে কত পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি খরচ করা হয়? এটা তৈরি হতে হাজার বছর সময় লেগেছে।

না, স্পাইরস, এ খবরটা আমার জানা ছিল না।

–তাহলেই বুঝতে পারছ, আগামী দিনে তরল সোনার চাহিদা কতখানি বৃদ্ধি পাবে। যার হাতে বড়ো বড়ো অয়েল ট্যাঙ্কার থাকবে, সেই হবে এই পৃথিবীর আসল রাজা।

–তুমি কি ট্যাঙ্কার তৈরি করতে চাইছ?

আমি বড়ো ট্যাঙ্কারের একটা ফ্লিট তৈরি করব। আমার কাছে এখন যে ফ্লিট আছে, আয়তনে এটা হবে তার দ্বিগুণ।

বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, উত্তেজনায় স্পাইরস অধীর হয়ে উঠেছেন। তিনি আরও বলতে থাকেন- আমি বেশ কয়েক মাস ধরে ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছি। তুমি সব কিছু সংক্ষেপে শুনে রাখো। পারস্য উপসাগর থেকে এক গ্যালন পেট্রোলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে নিয়ে আসতে খরচ হয় সাত সেন্ট। কিন্তু যদি একটা বড় ট্যাঙ্কার হাতে থাকে, তা হলে এই খরচটাকে আমরা কমিয়ে গ্যালন প্রতি তিন সেন্টে নিয়ে আসতে পারি। বুঝতে পারছ, আমি কী বলতে চাইছি?

স্পাইরস, কিন্তু এত বড়ো একটা ফ্লিট তৈরি করার জন্য টাকাপয়সা কোথা থেকে আসবে।

স্পাইস হেসেছিলেন- আগে আমার প্রকল্পের পুরোটা শোনন, তারপর কথা বলবে। এর জন্য আমাকে এক সেন্টও খরচ করতে হবে না।

কী বললে?

স্পাইরস ঝুঁকে পড়ে বলেছিলেন–আগামী মাসে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাব। সেখানকার বড়ো বড়ো তেল কোম্পানির মাতব্বরদের সঙ্গে বৈঠক করব। এই ট্যাঙ্কারের সাহায্যে আমি তাদের তেল অর্ধেক দামে পাঠাতে পারব, এমন একটা লোভনীয় প্রস্তাব ছুঁড়ে দেব।

কিন্তু তোমার হাতে তো এখন বড়ো ট্যাঙ্কার নেই।

স্পাইস হেসে বলেছিলেন না, কিন্তু আমি যদি ওইসব তেল কোম্পানির কাছ থেকে

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আনতে পারি, তাহলে ব্যাঙ্ক সহজেই আমার হাতে ঋণের টাকা তুলে দেবে। সেই টাকা দিয়ে আমি ট্যাঙ্কার তৈরি করব। উপযুক্ত সময়ে টাকা ফেরত দেব। কী বোন, আমার এই প্রকল্পের মধ্যে কোনো ফাঁক আছে কী?

–আহা, দাদা, সত্যি তুমি একজন প্রতিভাশালী ব্যক্তি! আমার চোখে তুমি সর্বোত্তম।

– মেলিনা এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে, ভাইয়ের এই প্রকল্পনার কথা সেদিনই স্বামী ডেমিরিসের কানে পৌঁছে দিলেন সন্ধ্যেবেলা এক ভোজের আসরে।

সবকিছু বোঝানো সম্পূর্ণ হল। মেলিনা বললেন–এটা একটা চমৎকার পরিকল্পনা, তাই না?

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস কিছুক্ষণ চুপ করেছিলেন। তারপর বললেন–তোমার ভাই একজন স্বপ্নবিলাসী। ব্যাপারটা বলা সহজ, কিন্তু কাজে করে দেখানো মোটেই সহজ নয়।

মেলিনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন–কেন কোস্টা?

কারণ, এই ব্যাপারটার মধ্যে অনেক ভজঘট জিনিস আছে। প্রথমত, আমার তো মনে হয় না, তরল সোনার জন্য এতখানি বাজার থাকবে। তাই ওই বড়ো বড়ো ট্যাঙ্কারগুলো খালি অবস্থাতেই যাতায়াত করবে। দ্বিতীয়ত, তেল কোম্পানিগুলো এমন কোনো বিষয়ে লগ্নি করতে চাইবে না, যার অস্তিত্ব এখনও পর্যন্ত নেই। তৃতীয়ত, ব্যাঙ্ক বোধহয় এই ব্যাপারটাতে অর্থ ঋণ দেবে না। সবটাই আকাশকুসুম কল্পনা।

স্বামীর মুখ থেকে ছুটে আসা এই শব্দগুলো মেলিনার উৎসাহ নিভিয়ে দিয়েছিল। মেলিনা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।

–তবে স্পাইরস এত উত্তেজনার সৃষ্টি করছে কেন? আমি কি ভাইয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলতে পারি?

ডেমিরিস মাথা নেড়ে বলেছিলেন–তুমি এ ব্যাপারে নাক গলিও না মেলিনা। তোমার ভাই তার নিজের স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকুক। আমাদের সংলাপের কথা যেন তার কানে যায়। ব্যাপারটা মনে রেখো, কেমন?

-ঠিক আছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেলিনা বলেছিলেন, কোস্টা, তুমি যা বললে আমি তাই মনে রাখব।

.

পরের দিন সকালে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পথে উড়ে গেলেন। বড়ো ট্যাঙ্কারের ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে। তিনি জানতেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ানের বাইরে যে তেলের খনিগুলি আছে, সেগুলির অবস্থা সঙ্গীন। সাতটি বড়ো বড়ো কোম্পানি এই তেলের খনিগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। এই কেম্পানিগুলি হল স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অফ নিউজার্সি, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, গালফ অয়েল, টেকসাস কোম্পানি, সোকোনি ভ্যাকুয়াম, রয়্যাল ডাচসেল এবং অ্যাংলো ইরানিয়ান। তিনি আরও জানেন, তিনি যদি একটি মাত্র কোম্পানির সাথে চুক্তি করতে পারেন, তাহলে বাকি কোম্পানিগুলিও তার সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হবে।

.

কনস্ট্যানটিন প্রথম গিয়েছিলেন নিউজার্সির স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির অফিসে। আওয়েন গারটিসের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই কথা বলা ছিল। ওই ভদ্রলোক এই বিরাট তেল কোম্পানির চতুর্থ ভাইসপ্রেসিডেন্ট।

–মিঃ ডেমিরিস, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?

–আমি আমার একটা প্রকল্পনার কথা আপনাকে বুঝিয়ে বলতে চাই। এই প্রকল্পনাটি ঠিকমতো এগিয়ে গেলে আপনার কোম্পানি অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হবে।

–আপনি তো টেলিফোনে একথা বলতে পারতেন। গারটিস তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়েছিলেন। আসলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার একটা মিটিং আছে। আপনি সংক্ষেপে বলতে পারবেন কী?

–আমি অত্যন্ত সংক্ষেপে বলছি৷ পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব প্রান্তে তেল আনতে প্রতি গ্যালনে সাত সেন্ট করে খরচ হয়, তাই তো?

ডেমিরিসের মুখের দিকে তাকিয়ে উনি বলেছিলেন- হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন।

–আমি যদি বলি, গ্যালন প্রতি তিন সেন্টে আমি সেই তেল আপনার হাতে পৌঁছে দেব, তাহলে কি আপনি আমার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন?

গারটিস যেন চেয়ার থেকে লাফিয়ে পড়লেন। তিনি হাসলেন। বললেন, এই অলৌকিক ঘটনাটা আপনি ঘটাবেন কী করে?

ডেমিরিস শান্তভাবে বলেছিলেন–এখন আমাদের হাতে যেসব ট্যাঙ্কার আছে আমি তার দ্বিগুণ আয়তনের ট্যাঙ্কার তৈরি করব। বুঝতে পারছেন, কত সহজে আমি দামটা কমিয়ে আনতে পারব। আর একটা ব্যাপার, যে মুহূর্তে তেল উৎখনন করা হবে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে ট্যাঙ্কারে ভরা হবে। মাঝে এতটুকু সময় নষ্ট করা হবে না।

গারটিস ডেমিরিসের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বেশ বোঝা গেল, তিনি চিন্তার সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

কিন্তু আপনি এতগুলো বড়ো বড়ো ট্যাঙ্কার তৈরি করবেন কী করে?

আমি সেগুলো বানাব।

না, এব্যাপারে আমরা কোনো অর্থ সাহায্য করতে পারব না।

ডেমিরিস বাধা দিয়ে বললেন–আপনার কোম্পানিকে এক পেনিও খরচ করতে হবে না। আমি শুধু আপনার কাছ থেকে একটা দীর্ঘমেয়াদি শর্তসম্পন্ন চুক্তিতে সম্মতি চাইছি। এখন আপনি যে দাম দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে অর্ধেক দামে একই পরিমাণ তেল পাবেন। ব্যাঙ্কের কাছ থেকে আমি অর্থনৈতিক সঙ্গতি পাব। এ ব্যাপারে কথা হয়ে গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ সেখানে বিরাজ করছিল নীরবতা। বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, গারটিস এই পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। শেষ অব্দি তিনি বললেন আমার মনে হচ্ছে, আপনি ওপরে গিয়ে আমাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলুন।

.

এভাবেই শুরু হয়েছিল গল্পটা। অন্যান্য তেল কোম্পানির মালিকের সাথে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের একই রকম কথা হয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে স্পাইরস লামব্রো নিজের অন্যান্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। যখন এই ষড়যন্ত্রের কথা তার কানে পৌঁছল, তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছিলেন। কতগুলি স্বাধীন কোম্পানির সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু ডেমিরিস ইতিমধ্যেই লাভের আসল অংশ তুলে নিয়ে গেছেন।

–ওই কুত্তাটা তোমার স্বামী! লামব্রো রাগে ফেটে পড়েছিলেন, আমি কথা দিচ্ছি মেলিনা একদিন আমি তাকে যথেষ্ট শাস্তি দেব, এই ষড়যন্ত্রের কোনো ক্ষমা হয় না।

মেলিনা এই ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তার কেবলই মনে হয়েছিল, তিনি বোধহয় ভাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার খেলা খেললেন।

তারপর, তারপর তিনি স্বামীর সাথে বাক যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। ডেমিরিস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন- মেলিনা, আমি তো ওদের সাথে কথা বলতে যাইনি। ওরাই এসেছে আমার কাছে। তুমি বলো, একজন ব্যবসায়ী হয়ে আমি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করব কী করে?

সেখানেই এই সংলাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

.

তখন থেকেই ডেমিরিস সম্পর্কে লামব্রোর ধারণা আরও খারাপ হয়ে যায়। তবে চরম কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে প্রতি বার তিনি প্রিয় বোন মেলিনার কথা ভাবতে থাকেন।

সেদিক দিয়ে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে এক শয়তান বলেই মনে করা যায়। এই মানুষটি নিজের ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকেন। স্পাইরস সম্পর্কে তিনি মোটেই আগ্রহী নন। তিনি মেলিনাকে মাঝে মধ্যে অপমান করেন। সময় এবং সুযোগ পেলে লামব্রো পরিবারের সকলকেই বিষতীরে বিদ্ধ করতে চান। নোয়েলে পেজ নামে ওই অভিনেত্রীর সাথে ডেমিরিসের ঘটনার কথা অনেকেই জেনেছেন। বিভিন্ন পত্রিকাতে এবিষয়ে মুখরোচক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। স্পাইরস ভাবতে থাকেন, একদিন নিশ্চয়ই…

.

লামব্রোর সহকারী নিকোস ভেরিটোজ, তিনি ধীরে ধীরে অফিসে প্রবেশ করলেন। গত পনেরো বছর ধরে এই ভদ্রলোক স্পাইরস লামব্রোর সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাকে আমরা যথেষ্ট উদ্যমী বলতে পারি। কিন্তু তার মধ্যে স্বপ্ন নেই। তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাকে ধূসর এবং মুখহীন বলে মনে হয়। দুই মহান ধনী ব্যক্তির মধ্যে যে লড়াই চলেছে, ভেরিটোজ সেই লড়াইয়ের সুযোগটা নিতে পারছেন না। তিনি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি ভেবেছেন, এই লড়াইতে শেষ পর্যন্ত ডেমিরিস জয়যুক্ত হবেন। তাই ডেমিরিসের কানে অত্যন্ত গোপন খবর সংগোপনে পৌঁছে দেন। ভাবেন, এর জন্য তাকে অর্থনৈতিকভাবে পুরস্কৃত করা হবে।

ভেরিটোজ লামব্রোর কাছে পৌঁছে গেলেন- আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। মি. অ্যান্থনি রিজোলি নামে এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

লামব্রো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন- ওকে এখানে পাঠিয়ে দিন।

অ্যান্থনি রিজোলির বয়স পঁয়তাল্লিশ, কালো চুল, পাতলা নাক, চোখের রং বাদামি। তাকে দেখে মনে হয় তিনি বুঝি এক প্রশিক্ষিত বক্সার। ভারি সুন্দর পোশাক তার পরনে। আজ তিনি হলুদ সিল্কের শার্ট পরেছেন। নরম চামড়ার জুতো। আস্তে আস্তে কথা বলেন। ভদ্র এবং সুস্নাত, মনে হচ্ছে কোনো একটা কারণে তার মনে অকারণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

–আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুবই ভালো লাগছে শ্ৰী লামব্রো।

বসুন মিঃ রিজোলি।

রিজোলি চেয়ারে বসে পড়লেন।

আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?

–হ্যাঁ, আমি মিঃ ভেরিটোজকে সব কথা বুঝিয়ে বলেছি। আমি আপনার একটা বড়ো কারগোশিপ ভাড়া নিতে চাইছি। মার্সেইলসে আমার একটা ফ্যাক্টরি আছে। সেখান থেকে কিছু ভারী মেশিনারি আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাব। যদি আপনার সঙ্গে আমার চুক্তিটা ঠিক হয়ে যায়, তা হলে ভবিষ্যতে অনেক ব্যবসা করা সম্ভব হবে।

স্পাইরস লামব্রা তার চেয়ারে বসে কী যেন ভাবলেন। উল্টোদিকের চেয়ারে বসে থাকা এই মানুষটির মুখের দিকে তাকালেন।

মিঃ রিজোলি, এটাই কি আপনার পরিকল্পনা? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

অ্যান্থনি রিজোলি বললেন–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমার মনে হচ্ছে এই ব্যাপারে আমি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না। কারণ আপনাকে দেবার মতো কোনো জাহাজ আমার হাতে নেই।

-কেন? আপনি একথা বলছেন কেন?

নিষিদ্ধ ড্রাগ, মিঃ রিজোলি, আপনি নিষিদ্ধ ড্রাগ কেনাবেচা করেন।

এই অভিযোগ শুনে রিজোলির চোখ ছোটো হয়ে গেল- আপনি আহাম্মক, আপনি নানাধরনের গুজবে বিশ্বাস করেন। আসল সত্যটা তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন না।

আসলে এটাই সত্যি। স্পাইরস লামব্রো প্রত্যেক মানুষের অন্তরালে কী আছে তা দেখতে পান। অ্যান্থলি রিজোলি হলেন ইউরোপের প্রধান ড্রাগস স্মাগলার। তিনি মাফিয়া দলের সদস্য। এই সংগঠনের অন্যতম কর্তা। রিজোলির সম্পর্কে অনেক কথা এখানে সেখানে লেখা হয়। তাই হয়তো লামব্রো পিছিয়ে আসছেন।

আমার মনে হয় এ ব্যাপারে আমি কোনো সাহায্য করতে পারব না। আপনি অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

অ্যান্থনি রিজোলি আর কথা বাড়ালেন না। তার চোখ শীতল হয়ে এসেছে। তিনি বললেন–ঠিক আছে। তিনি তার পকেট থেকে একটা বিজনেস কার্ড বের করলেন। সেটা ডেস্কের ওপর রাখলেন। যদি কোন সময় আপনার মনের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

তিনি অতি দ্রুত স্পাইরসের অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

স্পাইরস লামব্রো ওই কার্ডটা তুলে নিলেন। লেখা আছেঃ অ্যান্থনি রিজোলি, ইমপোর্ট এক্সপোর্ট। নীচে এথেন্সের হোটেলের ঠিকানা দেওয়া আছে। তলায় একটা টেলিফোন নম্বর দেওয়া আছে।

নিকোস ভেরিটোজ শান্ত মনে এই সংলাপ শুনছিলেন। যখন অ্যান্থনি রিজোলি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি বললেন–সত্যি কী?

-হ্যাঁ, মি. রিজোলি হেরোইনের ব্যবসা করেন। যদি আমরা আমাদের জাহাজ দিই, তাহলে সরকার আমাদের ব্যবসাটাই বন্ধ করে দেবে। আমি অত বোকা নই।

.

অ্যান্থনি রিজোলি লামব্রোর অফিস থেকে অতি দ্রুত বেরিয়ে এলেন।

এই বদমাইসটা আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। কিন্তু সে আমার গোপন ড্রাগ ব্যবসার খবর পেল কী করে? এই জাহাজগুলো অত্যন্ত বড়ো। এর মাধ্যমে আমরা অনেক টাকার ড্রাগ পাচার করতে পারতাম। অন্তত এক কোটি ডলারের তো হবেই। সমস্যা হচ্ছে, কোনো কোম্পানি আমাদের সঙ্গে চুক্তি করবে না। এথেন্সের সর্বত্র আমার বদনাম ছড়িয়ে গেছে। সিসিলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

অ্যান্থনি রিজোলি কখনও কোনো ব্যাপারে মন খারাপ করেন না। তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ। জীবনযুদ্ধে জয় লাভ করার জন্যই জন্ম হয়েছে তার। তিনি জানেন, এমন অনেক সমস্যার মোকাবিলা তাকে করতেই হবে।

নিউইয়র্ক শহরের হেলসকিচেনে তিনি বেড়ে উঠেছেন। ভৌগোলিক দিক থেকে এই জায়গাটা ম্যানহাট্টানের পশ্চিমদিকে। এইট এভিনিউ এবং হাডসন নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে। টোয়েন্টি থার্ড ও ফিফটি নাইথ স্টিটের মাঝে। মনোস্তাত্ত্বিক দিক থেকে হেলসকিচেন হল এমন একটি শহর, যার চারদিকে নিরাপত্তার বাঁধন আছে। কী নিরাপত্তা? এখানে সবসময় চুরি-ছিনতাই হয়ে থাকে। এখানে গফারস, পারলোর মব, গরিলাস এবং রোডেস গ্যাং এর দল আছে। তারা একে অন্যের সঙ্গে মারামারি করে। খুন জখমের কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে। একশো ডলার হাতে দিলে যে-কোনো মানুষের মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করা যায়। আহা, এটা হল এক জঘন্য নরক!

হেলসকিচেনে যারা বসবাস করে, তারা উকুন, বিছে-আর ইঁদুরের সাথে বসবাস করতে বাধ্য হয়। এখানে কোনো বাথটব নেই। তাই ছেলেমেয়েরা নিজস্ব উপায়ে সমস্যা সমাধান করে। তারা ল্যাংটো হয়ে চলে যায় হাডসন নদীর ডকের কাছে। সেই জলে স্নান করে। বাকি সব কিছুও সেখানেই সারা হয়। এই ডকের অবস্থা শোচনীয়। কী নেই সেখানে? কুকুর-বেড়ালের মৃতদেহ থেকে শুরু করে যত রাজ্যের নোংরা।

এই শহরের রাস্তাঘাটে নানা ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। ফায়ার ইঞ্জিন অ্যালার্ম বাজিয়ে এগিয়ে চলেছে। একদল মস্তান মারামারি করছে। বিয়ের শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। পথের পাশে বেসবলের আসর বসেছে। ঘোড়া ছুটে চলেছে। সিনেমার শু্যটিং হচ্ছে। এই অঞ্চলের একমাত্র খেলার মাঠটি আছে রাস্তার এক প্রান্তে। সেখানে মাঝে মধ্যে শিশুদের চিৎকার করতে দেখা যায়। গরমকালে অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। নদীর জল পচে যায়। দরিদ্রতার চিহ্নমাখা এই শহর। এখানেই অ্যান্থনি রিজোলির বেড়ে ওঠা।

অ্যান্থনি রিজোলির অনেক স্মৃতি আছে। তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি কিছু পয়সা চুরি করেছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র সাত বছর। বয়সে বড় ছেলেরা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করত। যে পথ দিয়ে তিনি স্কুলে যেতেন। সেই পথের দুপাশে, মস্তানদের বাসস্থান। স্কুলটাকেও আমরা সংক্ষেপে একটা যুদ্ধক্ষেত্র বলতে পারি। পনেরো বছর বয়সের মধ্যে রিজোলি অসীম শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন।

ফাইটার হিসেবে যথেষ্ট নাম হয় তার, মারামারি করতে তার ভীষণ ভালো লাগত। যে-কোনো ব্যাপারে তিনি মস্তানি দেখাতেন। তিনি আর তার বন্ধুরা স্টিলম্যানস জিমে গিয়ে বক্সিং প্র্যাকটিস করতেন।

তখন থেকেই ছোটোখাটো ঝামেলা ঝাটে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিখ্যাত বক্সাররা মাঝে মধ্যে এই পাড়াতে আসত। ফ্রাঙ্ক কসটেলোর সাথে তার যোগাযোগ হয়েছিল। জো অ্যাডোনিসকে তিনি চোখের সামনে থেকে দেখেছেন লাকি লুসিয়ানোকেও। বক্সিং তাঁর শরীরে উত্তেজনা এনে দিত। এক-একটা ঘুষির মধ্যে দিয়ে নিজের ঘৃণা এবং অপমান প্রকাশ করতে চাইতেন। প্রত্যেকটা লড়াইতে টনি রিজোলি শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হতেন। কিছুদিনের মধ্যেই রিজোলি মস্তান বাহিনীর নয়নের মণি হয়ে ওঠেন।

একদিন রিজোলি লকার রুমে গিয়ে পোশাক পাল্টাচ্ছিলেন। তখন দুই বিখ্যাত বক্সারের কথোপকথন তিনি শুনে ফেললেন। তাদের একজন ফ্রাঙ্ক কসটেলে অন্যজন লাকি লুসিয়ানো।

–এই ছেলেটা একটা সোনার খনি, লুসিয়ানো বলছিলেন, আমি গত সপ্তাহে, ওর ওপর পাঁচটা গ্রান্ড জিতেছি।

–তাহলে? লোউ ডোমিনিকের সাথে লড়াই-এ বাজি হবে নাকি?

–হ্যাঁ, কেন হবে না।

–তাহলে কী করতে হবে?

দশে এক, এইভাবে বাজিটা হবে।

 টনি রিজোলির শরীরে একটা শীতল শিহরণ, এই সংলাপের অন্তরালে কী লেখা আছে, তিনি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। রিজোলি সঙ্গে সঙ্গে তার দাদা জিনোর শরণাপন্ন হন। পুরো ব্যাপারটা জিনোকে বুঝিয়ে বললেন।

–হায় যিশু, ভাই বলেছিল, ওই দুটো বক্সার তোকে নিয়ে মরণ খেলা খেলতে চাইছে,, তাই তো? তোকে সামনে রেখে ওরা লক্ষ লক্ষ ডলার কামাবে বলে ভেবেছে।

–আমি তো পেশাদার বক্সার নই।

জিনো তার দিকে তাকিয়ে বলেছে তুই কখনও কোনো লড়াইতে হারিসনি, তাই। তো টনি?

-না।

এই ব্যাপারটাই বোধহয় ওদের মনে ধরেছে। ওরা তাই তোকে নিয়ে জুয়া খেলার আসর তৈরি করতে চাইছে।

ছোটো ভাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল- আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

জিনো তাকে জড়িয়ে ধরে বলে–এর মানে অনেক কিছুই। আমাদের দুজনের ভাগ্যের চাকা একেবারে ঘুরে যাবে। ছোটো ভাইটি আমার, আমার পাশে বসে পুরো ব্যাপারটা শো।

.

স্টিলম্যানের জিমে লোউ ডোমিনিকের সাথে লড়াইটা শুরু হল শুক্রবারের বিকেলবেলা। বড়ো বড়ো দাদারা সব সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। ফ্রাঙ্ক কসটেলো, জো অ্যাডোনিস, অ্যালবার্ট অ্যানাসটাসিয়া, লাকি লুসিয়ানো, মেয়ার ল্যানস্কি। তারা ছোটো বক্সারদের লড়াই দেখতে ভালোবাসেন। তারা মনে করেন যে, এইভাবে অনেক টাকা আয় করা যেতে পারে।

লোউ ডোমিনিকের বয়স সতেরো বছর। টনির থেকে এক বছরের বড়ো। ওজনে পাঁচ পাউন্ড বেশি। কিন্তু উনি রিজোলির মতো তীক্ষ্ণ মন ছিল না তার। বক্সিং-এর ছলাকলা সে ভালো জানত না। আর একটা জিনিসও তার মধ্যে ছিল না। হত্যা করার প্রবণতা, যা একজন বক্সারের জয়ের চাবিকাঠি।

পাঁচ রাউন্ডের লড়াই। প্রথম রাউন্ড সহজেই জিতে নিয়েছিল টনি। দ্বিতীয় রাউন্ডটাও সে জিতে গেল। এবং তৃতীয় রাউন্ডটা। মস্তানদের মধ্যে হৈ-হৈ শুরু হয়ে গেছে। কে কত টাকা লগ্নি করেছে তার গোপন হিসাব-নিকাশ। এবার সুদে-আসলে সব বুঝে নেবার পালা।

মনে হচ্ছে, এই ছেলেটা একদিন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হবে। লাকি লুসিয়ানো মন্তব্য করেছিলেন, এই ছেলেটার জন্য কত টাকা লগ্নি করা হয়েছে?

–দশ গ্রান্ড। ফ্রাঙ্ক কসটেলো বলেছিলেন। আমি এর জন্য একে পনেরো দিতে পারি। এই ছেলেটা এখনই যথেষ্ট খ্যাতিসম্পন্ন হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ একটা অভাবিত ঘটনা ঘটে গেল। পঞ্চম রাউন্ডের মাঝামাঝি, লোউ ডোমিনিক টনি রিজোলিকে ফেলে দিল। আপার কাটের মাধ্যমে। রেফারি গুনতে শুরু করে দিয়েছেন…খুবই ধীরে ধীরে, তিনি তাকিয়ে আছেন চারপাশের উন্মত্ত জনতার মুখের দিকে। সকলের ইচ্ছে, টনি উঠে দাঁড়াক।

ওঠ-ওঠ কুত্তার বাচ্চা, উঠে দাঁড়া। জো অ্যাডোনিস চিৎকার করে বলেছিলেন, উঠে দাঁড়া আর লড়াই শুরু কর।

গোনা শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে। শেষ অব্দি দশ পর্যন্ত গোনা শেষ হল। টনি রিজোলি তখনও শুয়ে আছেন, উঠতে পারছেন না।

কুত্তির বাচ্চা, একটা, একটা ঘুষি তোকে শেষ করে দিল।

মানুষগুলোর অবস্থা হয়েছে শোচনীয়। তারা ভাবতেই পারছে না এমন একটা অভাবিত ঘটনা কী করে ঘটল।

জিনো তার ভাই অ্যান্থনি রিজোলিকে ড্রেসিং রুমে নিয়ে গেল। অ্যান্থনির চোখ বন্ধ ছিল। অ্যান্থনি ভেবেছিলেন, তিনি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন।

শেষ অব্দি অ্যান্থনি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল।

তার ভাই বলল–বুঝতে পারছিস, এই অভিনয়ের দ্বারা আমরা কত টাকা আয় করলাম। এক হাজার ডলার!

–আমি বুঝতে পারছি না।

আমি টাকা ধার করেছিলাম, ডোমিনিকের ওপর লগ্নি করেছিলাম। হিসাবটা ছিল। ১৫-১। বুঝতেই পারছিস ডোমিনিক জিতে গেছে, আমরা কত টাকা পেয়েছি।

এরকম কথা বলছ কেন? টনি জিজ্ঞাসা করল, যদি ওরা জানতে পারে।

জিনো হেসে বলেছিল এই গোপন ব্যাপারটা কেউ জানতে পারবে না। শুধু তুই আর আমি ছাড়া।

.

পরের দিন টনি রিজোলি যখন স্কুলে যাচ্ছে, তখনই একটা লম্বা কালো লিমুজিন গাড়ির সঙ্গে তার দেখা হল। লাকি লুসিয়ানোকে গাড়িতে বসে থাকতে দেখা গেল। তিনি বললেন এসো, ভেতরে চলে এসো।

টনি রিজোলির হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়েছে। টনি বলল–মি. লুসিয়ানো, আমি স্কুলে যাচ্ছি। দেরি হয়ে যাবে।

–ভেতরে এসো। কর্তৃত্বের সুর বাজছে লাকির কণ্ঠস্বরে।

টনি রিজোলি লিমুজিনের মধ্যে বসে পড়ল। লাকি লুসিয়ানো ড্রাইভারকে বলল, ব্লকের দিকে এগিয়ে চল।

হায় ভগবান, এইভাবে আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?

লুসিয়ানো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলেছিল–ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলো তো?

রিজোলি আমতা আমতা করতে থাকে–স্যার, আপনি কী বলছেন?

আমাকে বোকা হাঁদা ভেবো না। এই নকল যুদ্ধে কত টাকা পেয়েছ?

–কিছুই না মিঃ লুসিয়ানো।

–আমি তোমাকে আর একবার জিজ্ঞাসা করছি, এই নকল যুদ্ধে কত টাকা পেয়েছ?

ভয় পেয়ে টনি বলে ওঠে–এক হাজার ডলার।

লাকি লুসিয়ানো হেসে ওঠে- এটা তো মুরগির খাবার। আমার মনে হচ্ছে..তোমার বয়স কত?

–ষোলো বছর?

–ষোলো বছরের বালক হয়ে তুমি যথেষ্ট বুদ্ধি মত্তার পরিচয় দিয়েছে। তুমি কি জানো, তোমার এই আচরণ আমাকে আর আমার বন্ধুকে পথের ভিখিরি করেছে।

–এর জন্য আমি দুঃখিত।

-এটা ভুলে যাও। তোমার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে।

–আপনাকে ধন্যবাদ।

–আমি এই ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। টনি, আমার বন্ধুদের কানে যদি এই খবর পৌঁছে যায়, তাহলে তোমাকে তারা টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তুমি আগামী সোমবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো। এরপর থেকে তুমি আর আমি একসঙ্গে কাজ করব, কেমন? কথা দিচ্ছ তো!

এক সপ্তাহ কেটে গেছে। টনি রিজোলি এখন লাকি লুসিয়ানোর হয়ে কাজ করছে। রিজোলি রানার হিসেবে কাজ শুরু করেছে। পরে এনফোর্সের চাকরি পেয়েছে। সব কিছুই ঘটে গেছে গত সাতদিনের মধ্যে। এই কদিনেই টনি লুসিয়ানোর ডানহাত হয়ে উঠেছে।

এরপর যতদিন না লাকি লুসিয়ানোকে গ্রেপ্তার করা হল, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হল, তাকে জেলখানায় পাঠানো হল, ততদিনে টনি রিজোলি লুসিয়ানোর বিরাট সংগঠনের অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছেন।

.

এরা নানা ধরনের অনৈতিক কাজকর্ম করে থাকে। জুয়াখেলা থেকে শুরু করে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া, মেয়েদের নিয়ে অনৈতিক ব্যবসা চালানো, আরও কত কী? নানা উৎস থেকে অর্থের স্রোত অবিরাম ধেয়ে আসছে। ড্রাগের ব্যবসাও চালু আছে। তবে সব ব্যাপারগুলো একসঙ্গে চলে না।

টনি রিজোলি ইতিমধ্যে যথেষ্ট বডোলোক হয়ে উঠেছেন। জীবনকে তিনি দেখেছেন তার কদর্য অবস্থায়। তিনি জানেন, কীভাবে সব কিছু সামলাতে হয়। এভাবেই ভাগ্যের চাকা এগিয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত তাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হল।

.

টনি রিজোলি এমন একজন মানুষ, যিনি চট করে কোনো ব্যাপারে জড়িয়ে পড়তে চান না। তিনি প্রত্যেকটা বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে ভালোবাসেন। শেষ পর্যন্ত হেরোইন ব্যবসাতে মনোনিবেশ করলেন।

হেরোইনকে অনায়াসে আমরা নারকোটিক্সের রাজা বলতে পারি। মারিয়ানা এবং কোকেনেরও এই ব্যাপারে যথেষ্ট সুনাম আছে। কিন্তু হেরোইন যে অবস্থার সৃষ্টি করে তা অন্য কেউ দিতে পারে না। হেরোইন আমাদের সমস্ত স্নায়ুপুঞ্জকে আচ্ছন্ন করে। কোনো ব্যথা নেই, কোনো সমস্যা নেই, কোনো যন্ত্রণা নেই। হেরোইনের সাহায্যে আমরা স্বপ্ন লোকের বাসিন্দা হয়ে যাই। আমরা যে-কোনো অপকর্ম সহজেই করতে পারি। হেরোইন। শেষ পর্যন্ত আমাদের ধর্মে পরিণত হয়। আমরা হেরোইনের দাস হয়ে যাই।

এভাবেই বোধহয় সারা পৃথিবীতে হেরোইন সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়ছে। রিজোলি তুরস্ক দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চললেন। তাঁর প্রিয় এজেন্ট পেটে লুক্কার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হল।

রিজোলি বললেন–আমি এই ব্যাপারটায় যোগ দিতে চাইছি। কিন্তু কোনো সমস্যা হলে আমি তা সামলাতে পারব না।

টনি, আপনার বুদ্ধিমত্তা আমাকে অবাক করেছে।

–আমি চাইছি, এখনই আপনি তুরস্কে চলে গিয়ে এ ব্যাপারটার সমাধান করুন। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন?

ওই ভদ্রলোক ইতস্তত করতে থাকলেন।

আমি কথা দিচ্ছি, কিন্তু ওরা কি রাজি হবে? টনি, ওদের মধ্যে নৈতিকতার ছাপ নেই। ওরা কুকুরের মতো। যদি বিশ্বাস ভেঙে যায়, ওরা আপনাকে হত্যা করবে।

–আমি সাবধানে থাকব।

–ঠিক আছে।

 দু সপ্তাহ কেটে গেছে। টনি রিজোলি চলেছেন তুরস্কের দিকে।

তিনি বিভিন্ন শহরে গেলেন। ইজমির থেকে আফইওন এবং এসকিসেইর। এইভাবেই তার কাজ শুরু হল।

একে একে বাধাগুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ব্যাপারটা খুব একটা সহজ নয়। তবে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি জানতেন যে করেই হোক তুরস্ক জয় তাকে করতেই হবে। শেষ অবধি অনেককে ফোন করলেন। নিজেই চলে এলেন তুরস্ক-সিরীয় সীমান্ত অঞ্চলের কিলিস শহরে। কে কারেলা অঞ্চলের ক্ষেতগুলো পরিদর্শন করার সুযোগ দেওয়া হল। এখানে আফিম-এর চাষ হচ্ছে। আফিম থেকেই তো হেরোইন তৈরি হবে।

টনি পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিতে চেয়েছিলেন। এটাই তার স্বভাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যখন যে কাজে হাত দেন, গোড়া থেকে সবকিছু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেন।

তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি বুঝতে পারছি না, কীভাবে এই সুন্দর সাদা ফুল থেকে হেরোইন তৈরি হয়।

সাদা কোট পরা এক বিজ্ঞানী ভদ্রলোক সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন মিঃ রিজোলি, ধাপে ধাপে অনেকগুলো পদ্ধতি পার হতে হয়। আফিম থেকেই তো হেরোইন পাওয়া যায়। তার মধ্যে মরফিন আর অ্যাসেটিক অ্যাসিড দিতে হয়। পপি গাছের যে প্রজাতি থেকে হেরোইন আসে, তার নাম হল পাপাভার সনিফেরাম। এই গাছের ফুল খেলে ঘুম ঘুম আচ্ছন্নতা এসে আমাদের গ্রাস করে। ওপিয়ম নামটা আমরা গ্রিক ভাষা থেকে পেয়েছি। আসল শব্দটা হল ওপাস, যার অর্থ জুস।

অনেক কিছু বোঝা হয়ে গেছে টনির। এবার ফেরার পালা।

.

সময় কেটে গেছে। ফসল উঠবে। টনিকে আমন্ত্রণ জানানো হল কারেলার প্রধান এস্টেটটি পরিদর্শনের জন্য। কারেলা পরিবারের সকলেই এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের হাতে থাকে বিশেষভাবে তৈরি করা ছুরি। যা দিয়ে তারা গাছ থেকে ফুল তুলে নেয়। কারেলা অমায়িক ভদ্রলোক, উনি বললেনএই পপিগুলোকে পঁচিশ ঘণ্টার মধ্যে তুলে ফেলতে হবে, তা নাহলে সবগুলো পচে যাবে।

দেখা গেল ওই পরিবারের নজন সদস্য উৎসাহের সঙ্গে গাছ কাটার কাজে হাত লাগিয়েছে। সকাল থেকে সন্ধে অবধি তারা প্রচণ্ড পরিশ্রম করছে। বাতাস একটা মনমাতানো গন্ধে ভরপুর হয়ে উঠেছে। ঝিম ঝিম আচ্ছন্নতা জেগেছে শরীরের মধ্যে।

রিজোলিকে বলতে শোনা গেল–আরও আরও সাবধানে…কারেলা উত্তর দিলেন হ্যাঁ, আমাদের আরও সাবধান হতেই হবে। যদি একবার আপনি এই ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে পড়েন, তা হলে আর কখনও উঠতে পারবেন না। আপনার স্নায়ুপুঞ্জ ঝিমঝিম করবে। চেতনা আর ফিরে আসবে না।

ফার্মহাউসের জানালা-দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফসল কাটার মরশুমে এখানে বুঝি মৃত্যুর হাহাকার।

.

পপিগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। রিজোলি পুরো পদ্ধতিটা অনুধাবন করার চেষ্টা করছেন। তিনি দেখলেন মরফিনের সাথে পপিগুলো মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে তৈরি করা এক বীক্ষণাগারে এই বিশ্লেষণের কাজগুলো চলেছে। ল্যাবরেটরিটি পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত।

ব্যাপারটা এতক্ষণে বোধগম্য হল তাঁর কাছে।

–আমরা কি প্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি? শিশুর মতো কৌতূহল এনে তিনি জানতে চেয়েছিলেন।

কারেলা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন না বন্ধু, এত সহজ নয়। বলতে পারেন বিরাট একটা অভিযানের সূচনা হল মাত্র। হেরোইন তৈরি করাটা খুবই সহজ, কিন্তু পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সেটিকে পাচার করাটাই হল সবথেকে শক্ত।

টনি রিজোলির মনের মধ্যে উত্তেজনার আগুন। তাহলে? এখনই তাকে আরও কুশলী হয়ে উঠতে হবে। ব্যবসাটা শুরু হয়েছে।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কীভাবে এই কঠিন কাজটি সমাধা করা হয়?

অনেকগুলো পন্থা আছে, ট্রাক, বাস, ট্রেন, গাড়ি, খচ্চরের পিঠ এবং উট।

–উট?

-হ্যাঁ। আমরা উটের থলির ভেতর হেরোইন রেখে দিই, আইনরক্ষকেরা মেটাল ডিটেক্টরের সাহায্যে সবকিছু পরীক্ষা করে। তারপর? রাবার ব্যাগের ভেতর সেগুলিকে চালান করে দেওয়া হয়। কাজ শেষ হয়ে গেলে আমরা উটগুলোকে মেরে ফেলি। সমস্যা কী জানেন, মাঝে মধ্যে উটের পেটের ভেতর ব্যাগগুলো বিস্ফোরিত হয়ে যায়। আর এই হেরোইনের প্রভাবে উটগুলো আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কেমন যেন এলোমেলো আচরণ করতে শুরু করে। আইনরক্ষকের চোখে তখন আমরা ধরা পড়ে যাই।

–কোন্ পথ দিয়ে এই ড্রাগ পাচার করা হয়।

কখনও কখনও হেরোইন পাচার করা হয় আলেপ্পো থেকে বেইরুট হয়ে ইস্তানবুল পর্যন্ত। তারপর সারসেই, আবার ইস্তানবুল থেকে সরাসরি গ্রিসে নিয়ে আসা হয়। সিসিলি হয়ে করসিকা আর মরোক্কোকে টাটা গুডবাই করে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে।

–আপনার বিচার বোধকে আমি শ্রদ্ধা করছি। রিজোলি বললেন, আমি আমার ছেলেদের বলব, দেখা যাক কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।

–ঠিক আছে।

–পরবর্তী সময়ে আমি কি এই অভিযানের সঙ্গী হব?

না, ব্যাপারটা খুবই বিপজ্জনক।

–আমি তো বিপদ নিয়ে খেলতেই ভালোবাসি।

.

পরের দিন সন্ধ্যেবেলা। টনি রিজোলির সাথে এক ভদ্রলোকের আলাপ করিয়ে দেওয়া হল। বোঝা যাচ্ছে, সেই ভদ্রলোক যে সাম্রাজ্যের অধীশ্বর, সেই সাম্রাজ্যের সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা। বিশাল দশাসই চেহারা তার, পাঁকানো গোঁফ আছে।

ইনি হলেন মুস্তাফা। ইনি আফইওন থেকে এসেছেন। তুরস্ক ভাষায় আফইওন শব্দের অর্থ কী জানেন তো? আফইওনের অর্থ হল আফিম। মুস্তাফা হলেন আমাদের অন্যতম দক্ষ স্মাগলার।

মুস্তাফা শান্তভাবে বলেছিলেন- হ্যাঁ, এই ব্যাপারটা শিখতে হয়। অনেকগুলো পন্থা : আছে, যেগুলো সত্যি বিপজ্জনক। সামান্য ভুল হলে মৃত্যু এসে আপনাকে গ্রাস করবে।

টনি রিজোলি বিকৃত স্বরে বলে ওঠেন–প্রতি পদক্ষেপে এত বিপদ?

মুস্তাফা বললেন–আপনি টাকার কথা বলছেন তো? আফিমকে আমরা টাকার গাছ বলতে পারি। আফিমের ব্যাপারে একটা রহস্য আছে। এই রহস্যটা বুঝতে হবে। ভগবান এই বিশেষ পদ্ধতি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। অল্প খেলে আমাদের শরীর তরতাজা হয়ে ওঠে। একে আমরা খেতে পারি, সরাসরি ত্বকের ওপর প্রয়োগ করতে পারি। সাধারণ অনেক রোগ এই ওষুধে সেরে যায়। যদি পেট খারাপ হয় তাহলেও এটা উপকারী। ঠান্ডা লেগেছে, জ্বর জ্বর ভাব, মাথার যন্ত্রণা–সবকিছুতেই। তবে আপনাকে সতর্ক হতে হবে। যদি বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলেন, তাহলে আপনার চেতনার অবলুপ্তি ঘটে যাবে। আপনার যৌনক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন। আর তুরস্ক দেশের একটা কহবত আছে কী জানেন তো? যে পুরুষরা যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে তাকে নরকের কীট মনে করা হয়।

–ঠিক আছে, আপনার কথা মনে রাখব।

.

আফইওন থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে মধ্যরাতে। একদল কৃষক, রাতের অন্ধকারে হেঁটে চলেছে। মুস্তাফার সঙ্গী হয়েছে তারা। খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আফিমের বাক্সগুলো। বাক্সগুলোর ৩৫০ কিলো থেকে ৭০০ পাউন্ডের কিছু বেশি। শক্ত সুঠাম কিছু খচ্চর সেগুলোকে বহন করে নিয়ে চলেছে। বাতাসের ভেতর একটা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সত্যি সত্যি বোধহয় মৃত্যুঞ্জয়ী অভিযানে সকলে সঙ্গী হয়েছে। বারোজন কৃষক এগিয়ে চলেছে। তারা এখন রক্ষীর ভূমিকাতে অবতীর্ণ। সকলের আগে এগিয়ে চলেছেন মুস্তাফা। প্রত্যেক কৃষকের হাতে একটি করে রাইফেল।

এখন আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। যেতে যেতে মুস্তাফা রিজোলিকে বলেছিলেন। ইন্টারপোল এবং আরও অনেকগুলি-সংস্থা আমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছে। আগে ব্যাপারটা খুবই সহজ ছিল। আমরা কোনো একস্টা গ্রাম বা শহর থেকে আফিম চালান করতাম। কিন্তু এখন এটা তত সহজ নেই। এখন কোথায় ধরা পড়ে যাব কে জানে!

আফইওন শহরটির অবস্থান তুরস্কের পশ্চিম দিকে। সুলতান মাউন্টেনের পাদদেশে, একটি উচ্চ মালভূমির ওপর। জায়গাটায় খুব একটা সহজে পৌঁছোনো যায় না। বড়ো বড়ো শহর থেকে অনেক দূরে তার অবস্থিতি। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই বোধহয় এই শহরটিকে চোরাচালানকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে।

-এই জায়গাটা আমাদের কাজের পক্ষে খুবই ভালো, আমরা কোথায় আছি তা সহজে বের করা যায় না।

হাসতে হাসতে মুস্তাফা মন্তব্য করেছিলেন। 

খচ্চরগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে পাহাড়ি উপত্যকার পথ ধরে। তিনদিন কেটে গেছে। পুরো বাহিনী তুরস্ক-সিরীয় সীমান্তে পৌঁছে গেছে। সেখানে কালো পোশাক পরা এক মহিলার সাথে দেখা হল। তিনি একটা ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘোড়াগুলোর পিঠে ময়দার ঝুড়ি রয়েছে। তাছাড়াও খুব সাবধানে কী যেন বাঁধা আছে। এমনভাবে বাঁধা যাতে কেউ বুঝতে পারবে না। লম্বা দড়ি আছে, দুশো ফুট লম্বা। দড়ির একটা দিক কায়দা করে মুস্তাফার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। পনেরোজন ভাড়া করা দৌড়বীর ছুটে এসেছে, তারা পাশাপাশি দৌড়চ্ছে। প্রত্যেকে মাঝে মাঝে মাটির দিকে ঝুঁকছে, এক হাতে দড়িতে টান দিচ্ছে। অন্য হাতে বস্তাভর্তি আফিম নামিয়ে নিচ্ছে। প্রত্যেকটি বস্তায় পঁয়ত্রিশ পাউন্ড করে আফিম আছে। ওই ভদ্রমহিলা এবং তার ঘোড়া ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই পথটা খুবই নির্জন। রাখালছেলেরা ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে। মেষ চরছে। শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। প্রতিমুহূর্তে হাত বদল হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার মাদক দ্রব্য। কেউ জানতেও পারছে না। চোখে চোখে কথা হচ্ছে। মহিলাকে দেখেই বুঝতে পারা যায়, এ ব্যাপারে তিনি খুবই দক্ষ। মহিলা কোনো কথা বলছেন না, আপাত ভাবলেশহীন মুখ। কিন্তু চোখের মণি সর্বদা ঘুরছে। সকলকেই সন্দেহ করছেন উনি।

এইভাবে পুরো বাহিনী গ্রিস পেরিয়ে গেল। এটাই হল সীমান্ত শহর, পুলিশের কঠিন প্রহরা। নানা ধরনের পেট্রোলের বন্দোবস্ত করা আছে। স্মাগলাররা এবার এমন একটা জায়গায় ঢুকে পড়বে, যেখানে আইনের অনুশাসন নেই, শেষ অবধি তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। সেখানে একদল সিরিয়ান স্মাগলার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা আফিমের থলেগুলো মাটিতে রেখে দেবে। ইঙ্গিত করবে। সেখানেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। রিজোলি সাবধানে সবকিছু নিরীক্ষণ করতে থাকেন। তিনি দেখলেন কীভাবে আফিমের থলেগুলো ওজন করা হচ্ছে। সেগুলো ভালো করে বেঁধে রাখা হল। বারোটি সিরীয় দেশের গাধা সেখানে হাজির হয়েছে। কাজ শেষ হয়ে গেল। রিজোলি ভাবলেন, এবার এই মালটা কী করে থাইল্যান্ডে যায় সেটাও দেখা দরকার।

.

রিজোলি ব্যাংককে পৌঁছে গেছেন। তিনি একটি থাই ফিশিং জাহাজ ভাড়া করেছেন। সেখানে পলিথিন শিটে মুড়ে রাখা হয়েছে ওই প্যাকেটগুলো। ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ফাঁকা কেরোসিন ড্রামের ভেতর। ফিশিং বোট এগিয়ে চলেছে হংকং-এর দিকে। মাঝে একটা সরু খালের মতো জায়গা আছে, লিমা আর ল্যাড্রোন দ্বীপের মধ্যে। হংকং-এর ফিশিং বোট সেখানে অপেক্ষা করবে। হুকের সাহায্যে এই বস্তাগুলো তুলে নেবে।

রিজোলি ভাবতে থাকেন পদ্ধতিটা খুব একটা খারাপ নয়, কিন্তু মান্ধাতার আমলের এই পদ্ধতিটাকে পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে বেশি টাকা আয় করা সম্ভব নয়।

এখানে অনেকগুলো কোড সংকেত ব্যবহার করা হয়। হেরোইনকে এইচ অথবা হর্স নামে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু টনি রিজোলির চোখে হেরোইন সোনা ছাড়া আর কিছু নয়। দশ কিলো কঁচা ওপিয়ম তৈরি করার জন্য চাষিরা পায় তিনশো পঞ্চাশ ডলার। কিন্তু যখন সেই ওপিয়ম থেকে হেরোইন তৈরি হয়ে নিউইয়র্কের পথেঘাটে বিক্রি হয় তখন তার দাম হয় দু লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ডলার!

রিজোলি আবার ভাবলেন, কারেলা ঠিক কথাই বলেছিলেন। এত সহজে ব্যাপারটার ভেতর প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

একেবারে শুরু থেকে শুরু করতে হবে। দশ বছর আগের পৃথিবী। তখন ব্যাপারটা খবুই সহজ ছিল। এখন ইন্টারপোল চারদিকে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। ড্রাগ স্মাগলিং এর জন্য কঠিন কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি বন্দরে পুলিশ বাহিনী সজাগ রয়েছে। কী মাল ওঠানো নামানো হচ্ছে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। তাই রিজোলি স্পাইরস লামব্রোর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ভদ্রলোকের অসীম ক্ষমতা। তার জাহাজ কেউ সন্দেহ করবে না। কিন্তু ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হল না। বেজন্মার বাচ্চাটা আমার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিল। দেখা যাক, অন্য কোনো পন্থায় আসা যায় কিনা। টনি রিজোলি ভাবতে থাকেন। যা কিছু করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।

.

ক্যাথেরিন, আমি কি তোমায় বিরক্তি করছি?

তখন মধ্যরাত। পরিশ্রান্ত ক্যাথেরিন ঘুমিয়ে পড়েছিল।

না কোস্টা, আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে আমার ভালোই লাগে।

 সব কিছু ঠিকঠাক চলছে তো?

–হ্যাঁ আপনাকে আবার ধন্যবাদ। কাজটা আমার ভালোই লাগছে।

আমি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লন্ডনে আসব। তোমাকে দেখার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে উঠেছি। আমি চাইছি কোম্পানির নিজস্ব ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে।

–ঠিক আছে।

শুভ রাত।

–ঠিক আছে, শুভ রাত।

.

ক্যাথেরিন বলতে চেয়েছিল–কোস্টা, আমি জানি না আমায় কী বলতে হবে। লকেটটা সত্যিই সুন্দর! এমন সুন্দর একটি লকেট… ।

–এটা একটা ভালোবাসার ছোট্ট স্মারক চিহ্ন ক্যাথেরিন। ইভলিন আমাকে বলেছে তুমি তাকে কত সাহায্য করছ। সেই সাহায্যের প্রতিদান ভাবতে পারো।

.

ব্যাপারটা খুবই সহজ, ডেমিরিস ভেবেছিলেন, ছোটো ছোটো উপহার আর সামান্য কিছু তোষামুদে কথাবার্তা।

পরবর্তীকালে আমি এবং আমার বউয়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে যাবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আমি খুব একা এই পর্ব।

এই ভাবেই বিয়ে সংক্রান্ত একটা বাজে কথাবার্তা হতে পারে। কোনো একসময় হয়তো ডেমিরিস ক্যাথেরিনকে আহ্বান জানাবেন তার প্রমোদ তরণীতে আসার জন্য। এইভাবেই তিনি একটির পর একটি যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছেন। প্রত্যেকটা খেলা তার কাছে নতুন উন্মাদনা নিয়ে আসে। ডেমিরিস ভাবতে থাকেন, কারণ প্রতিটি খেলার শেষটা একেবারে অন্যরকম। এবার কী হবে? এবার এই খেলাতে মেয়েটিকে মরতে হবে। হ্যাঁ, এর কোনো নড়চড় হবে না।

.

নেপোলিয়ান ছোটাসকে টেলিফোন করা হল। আইন বিশারদ ব্যাপারটা শুনে খুবই চিন্তা করতে থাকলেন।

–কোস্টা, সবকিছু ঠিকমতো চলছে তো?

 –হ্যাঁ, আমি আপনার একটা সাহায্য চাইছি।

কী সাহায্য?

রাফিনাতে নোয়েলে পেজের একটি ছোট্ট ভিলা আছে। আপনি সেই ভিলাটা আমার জন্য কিনে নিন। অন্য কারোর নামে।

–দেখি, আমি আমার অফিসের লইয়ারদের সঙ্গে কথা বলব।

না, আমি চাই এই ব্যাপারটা কেউ জানবে না। এটা আপনি নিজে করার চেষ্টা করুন।

এক মুহূর্তের নীববতা।

-ঠিক আছে আমি দেখছি।

-ধন্যবাদ।

ফোন রেখে নেপোলিয়ান ছোটাস সেখানেই বসে থাকলেন। একদৃষ্টে টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এই ছোট্ট ভিলাটি হল নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের সুখের নীড়। একসময় এখানে তারা ভালোবাসার স্বর্গ রচনা করতে চেয়েছিল। ডেমিরিস, এটা কিনতে চাইছেন কেন?

.

০৭.

এথেন্সের ডাউনডাউন। আরসাকিওন কোর্টহাউস। ধূসর পাথরের একটা মস্তবড়ড়া বাড়ি। ইউনিভারসিটি স্ট্রিট এবং স্ট্র্যাডারে তার অবস্থান। এই বাড়িটির মধ্যে ত্রিশটি বড়ো বড়ো কোর্টরুম আছে। একুশ, ত্রিশ এবং তেত্রিশ নম্বর ঘরকে শুধুমাত্র ফৌজদারি মামলার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে।

অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের ব্যাপারটা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে দারুণ উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চলছে তেত্রিশ নম্বর কক্ষে। এই কোর্টরুমটা চল্লিশ ফুট চওড়া, তিনশো ফুট লম্বা। তিনটে ব্লকে সিটগুলোকে ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ব্লকের মধ্যে ছফুটের দূরত্ব। প্রত্যেকটি রোতে নটি করে কাঠের বেঞ্চও সাজানো আছে। কোর্টরুমের সামনে আছে একটা উঁচু ডায়াস। ছ-ফুট উঁচু মেহগনির পার্টিশান দেওয়া। উঁচু রুমের সামনে আছে জাজ সেখানে বঙচু করা প্ল্যাটফর্ম যেন জুরি সেখানে

ডায়াসের সামনে সাক্ষ্য দেবার জায়গা। একটি উঁচু করা প্ল্যাটফর্ম। যেটা রিজিং লেকটার্ন এর সঙ্গে একেবাবে সংযুক্ত। তার পাশে জুরিদের বসার জায়গা। দশজন জুরি সেখানে বসতে পারেন। সামনের দিকে আইনজ্ঞদের চেয়ার।

হত্যাকাণ্ডের বিচার জমে উঠেছে নানা দিক থেকে। দুপক্ষেই ধারা-উপধারার ব্যাখা । চলেছে। নেপোলিয়ান ছোটাস একপক্ষের উকিল। তাকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা লইয়ার বলা হয়। তিনি শুধুমাত্র খুন সংক্রান্ত মামলা তদারক করেন। এ ব্যাপারে তার সাফল্য ঈর্ষণীয়। তার ফিস মেটানো খুব একটা সহজ নয়। বাতাসে কান পাতলে শোনা যায়, তিনি নাকি লক্ষ লক্ষ ডলারে নিজের পারিশ্রমিক নেন।

ছোটাস এক রোগাপাতলা চেহারার মানুষ। তার চোখের মধ্যে বিষণ্ণতার ধূসর ছায়া কাঁপে। মুখের ভেতর ক্ষুধার্ত নেকড়ের জিঘাংসা। পোশাক-পরিচ্ছদের দিকে বিন্দুমাত্র নজর নেই। চেহারা দেখলে মনে হবে না তিনি একজন উঁদে উকিল। কিন্তু এই আপাত তুচ্ছ আবরণের অন্তরালে আছে তার সদা অনুসন্ধিৎসু মন।

সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা সব সময় তার সঙ্গে কথা বলতে উৎসুক। তিনি কীভাবে সেই মেয়েটিকে সাহায্য করবেন, তা সকলে জানতে চাইছে। মনে হচ্ছে বোধহয় তিনি এই কেসটি জিততে পারবেন না। এখনই তাকে প্রথম পরাজয়ের তেতো স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

পিটার ডেমোনিডাস, প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নি। এর আগে ছোটাসের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি ছোটাসের আইন ক্ষমতা সম্পর্কে ভালো মতো অবহিত আছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাকে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে। তবে এইবার ডেমোনিসের মনে হচ্ছে, চিন্তা করার বিশেষ কিছু নেই। যদি এটা সাধারণ মার্ডার কেস হত, তাহলে হয়তো চিন্তা করতেন। কিন্তু অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম।

সংক্ষেপে বিষয়টা বলা যাক। অ্যানাসটাসিয়া সাভালাস ছিলেন এক অত্যন্ত রূপবতী তরুণী। তার সঙ্গে জর্জ সাভালাস নামে এক বিত্তবানের বিয়ে হয়েছিল। ভদ্রলোক বয়সে অ্যানাসটাসিয়ার থেকে ত্রিশ বছরের বড়ো। অ্যানাসটাসিয়ার সঙ্গে তাদের তরুণ ড্রাইভার জোসেফ পাপ্পাসের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাক্ষীরা বলেছে, স্বামী জর্জ অ্যানাসটাসিয়াকে ডিভোর্স করতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারে জর্জ তাঁকে ভয় দেখাতে থাকেন। এমনকি ইচ্ছাপত্র থেকে স্ত্রীর নাম বাদ দেবার ধমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। যে রাতে এ জঘন্য হত্যার ঘটনাটি ঘটে, সেই রাতে তরুণী তার চাকরদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিজের হাতে স্বামীর জন্য রাতের খাবার তৈরি করেছিলেন। জর্জ সাভালাসের সামান্য সর্দি হয়েছিল। নৈশভোজের সময় তিনি কাশছিলেন। অ্যানাসটাসিয়া তার হাতে কাশির ওষুধ তুলে দিয়েছিলেন, সেই ওষুধ খাবার পরেই সালাভাসের মৃত্যু হয়।

তার মানে? পরিষ্কার হত্যা। এর মধ্যে কোনো কিন্তুর অবকাশ নেই।

.

তেত্রিশ নম্বর ঘরে সকাল থেকে উৎসাহী মানুষের ভিড় জমেছে। অ্যানাসটাসিয়া সাভালাস বসে আছেন নির্দিষ্ট আসনে। সাধারণ কালো স্কার্ট পরেছেন তিনি, একই রঙের ব্লাউজ। তার গায়ে কোনো অলংকার নেই। সামান্য মেকআপ করেছেন, তবে তার মধ্যে একটা সহজ লাবণ্য আছে, এই বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যেও সেই লাবণ্যের দ্যুতিই চোখে পড়ছে।

প্রসিকিউটর পিটার ডেমোনিডাস জুরিদের উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন–ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহাশয়া, কোনো কোনো সময় একেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার তিনচার মাস ধরে চলতে থাকে। তবে এখানে সেই ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ব্যাপারটা খুবই সহজ এবং সাধারণ। যখন আপনারা এই হত্যা মামলার ঘটনা পরম্পরা শুনবেন, আপনারা সকলেই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, এখানে একটি মাত্র সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যেতে পারে, তা হল, জঘন্য হত্যাকাণ্ড। আইনের পরিভাষায় যাকে আমরা থার্ড ডিগ্রি মার্ডার বলে থাকি। রাষ্ট্র এ ব্যাপারে খুবই সচেতন। ওই ভদ্রমহিলা তার স্বামীকে ইচ্ছে করে খুন করেছেন। কেন? তার স্বামী বারবার বিবাহবিচ্ছেদের ভয় দেখাতেন, তার স্বামী বুঝতে পেরেছিলেন যে, ড্রাইভারের সাথে ওই ভদ্রমহিলার গোপন শারীরিক সম্পর্ক আছে। আমরা প্রমান করে দেব অভিযুক্তের কি মোটিভ ছিল, কীভাবে অভিযুক্ত সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। কীভাবে তিনি ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। আমার আর কিছু বলার নেই। সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

এই পর্যন্ত বলে তিনি তার নির্দিষ্ট আসনে ফিরে গেলেন।

 এবার প্রধান বিচারপতি ছোটাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন? আপনি আপনার সওয়াল-জবাব শুরু করতে পারেন।

নেপোলিয়ান ছোটাস ধীরে ধীরে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন–হ্যাঁ, মাননীয় মহাশয়… তিনি জুরিদের আসনের কাছে চলে গেলেন। বেশ বোঝা যাচ্ছে, তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। জুরিদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন শূন্য চোখে। কথা বললেন, মনে হল তিনি যেন ফিসফিস করে নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। অনেকটা স্বগত সম্ভাষণের মতো।

…আমি অনেকদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আমি জানি যে, কোনো মহিলা অথবা পুরুষ তাদের খল স্বভাবকে ঢেকে রাখতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশিত হয়ে থাকে। এক কবি বলেছেন যে, আমাদের চোখ হবে আত্মার জানালা। আমি সেই মতবাদে বিশ্বাস করি। মাননীয় ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলারা, আপনারা অনুগ্রহ করে অভিযুক্তের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকুন। তাকে দেখে কি মনে হচ্ছে তিনি কাউকে হত্যা করতে পারেন?

এই পর্যন্ত বলে নেপোলিয়ান ছোটাস একটু চুপ করলেন। আসলে তিনি তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে চাইলেন। সকলেই কি ওই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি তার আসনে ফিরে গেলেন।

পিটার ডেমোনিডাস এই কথা শুনে আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিলেন। হায় যিশু, আমি আমার জীবনে এমন কথা কখনও শুনিনি। এইভাবে কেউ কি কোনো আইনি সওয়াল জবাব শুরু করতে পারে? মনে হচ্ছে বুড়ো বয়সে লোকটার ভীমরতি ধরেছে। অথবা এই মামলায় পরাজয় নিশ্চিত জেনে উনি এমন বিভ্রান্ত আচরণ করছেন।

–অ্যাটর্নি কি তার প্রথম সাক্ষীকে ডেকে আনবেন?

হ্যাঁ, ইওর অনার, আমি রোসা লাইকোরগসকে ডাকছি।

মধ্যবয়সী এক পৃথুলা মহিলা এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ তিনি দর্শক আসনে বসেছিলেন। তিনি এবার কোর্টরুমের সামনে এলেন। শপথ নিলেন।

শ্ৰীমতী লাইকোরগসকে, আপনার পেশা কী?

–আমি হাউসকিপার,… কথা যেন বন্ধ হয়ে আসছে… আমি সাভালাসের হাউসকিপার ছিলাম।

মিঃ জর্জ সাভালাস?

ইয়েস স্যার।

–আপনি কি বলবেন কতদিন ধরে সেখানে আপনি চাকরি করছেন?

পঁচিশ বছর ধরে।

 তার মানে অনেকদিন ধরে। মিঃ সাভালাস কি আপনাকে পছন্দ করতেন?

–হ্যাঁ, তিনি ছিলেন সাধুর মতো ব্যক্তি।

–তার প্রথম বিয়ের সময় কি তিনি আপনাকে রেখেছিলেন?

–হ্যাঁ, তার প্রথমা স্ত্রীর যখন মৃত্যু হয় তখন আমিও কবরস্থানে গিয়েছিলাম।

–প্রথমা স্ত্রীর সাথে তার সম্পর্ক কেমন ছিল?

–তারা সুখী সম্পৃক্ত দাম্পত্য জীবন যাপন করেছিলেন, একে অন্যকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন।

পিটার ডেমোনিডাস নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। এই ব্যাপারে ছোটাস? কি কিছু বলতে চাইবেন। হয়তো কোনো প্রতিবাদ।

ছোটাস তার আসনে বসেছিলেন, মনে হয় তিনি যেন কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছেন। অথবা চিন্তার সমুদ্রে সাঁতার কাটছেন।

পিটার ডেমোনিডাস বলতে থাকেন মিঃ সাভালাসের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে আপনি কী জানেন? তার দ্বিতীয় স্ত্রী তো অ্যানাসটাসিয়া সাভালাস? তাই নয় কী?

–হ্যাঁ স্যার, আপনি ঠিক বলেছেন।

–এটাও কি একটা সুখী বিবাহিত জীবনের চিহ্ন?

পিটার আবার নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। কিন্তু সেদিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না কেন? বুড়ো ভামটা মনে মনে কোনো শয়তানি ষড়যন্ত্র আঁটছে নাকি।

সুখ? না স্যার, সবসময় তারা বেড়াল-কুকুরের মতো ঝগড়া করতেন।

–আপনি কি এমন কোনো ঝগড়ার সাক্ষী ছিলেন?

–হ্যাঁ, আমি কতবার বলব, বাড়ির সব জায়গা থেকে তাদের চিৎকার শোনা যেত। মস্তবড়ো বাড়ি। তাসত্ত্বেও আমরা নানা শব্দ শুনতে পেতাম।

–শুধু মুখে কথা হত নাকি একে অন্যকে শারীরিভাবে আঘাত করতেন। মিঃ সাভালাস কি তার স্ত্রীকে কখনও মেরেছিলেন?

না, তারা কেবল পারস্পরিক দোষারোপ করতেন। মাঝেমধ্যে ম্যাডাম আমার প্রভুকে মারতেন। মিঃ সাভালাস একবছরের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। সবসময় অজানা ভয়ে কম্পিত থাকতেন।

–আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন, শ্রীমতী সাভালাস তার স্বামীকে শারীরিকভাবে আঘাত করছেন?

–অনেকবার দেখেছি আমি।

সাক্ষী এবার অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের দিকে তাকালেন। তার কণ্ঠস্বরে আত্মতুষ্টি ফিরে এসেছে।

শ্ৰীমতী লাইকোরগস, যে রাতে মিঃ সাভালাসের মৃত্যু হয়, সেই রাতের ঘটনা সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন? বলুন তো, সেই রাতে ওই বাড়িতে কে কে ছিলেন?

আমাদের কেউ সেখানে ছিল না।

পিটার ডেমোনিডাসের কণ্ঠস্বরের ভেতর কাঠিন্য ফুটে উঠেছে।

–অত বড় বাড়িতে কেউ ছিল না? মিঃ সাভালাস কোনো রাঁধুনিকে রাখেননি? অথবা কোনো পরিচারিকা? নিদেনপক্ষে একজন বাটলার

-হ্যাঁ স্যার, আমরা সকলেই কাজ করতাম। কিন্তু সেই রাতে ম্যাডাম সকলকে ছুটি, দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন নিজের হাতে নৈশভোজ রান্না করবেন। এটা ছিল তাদের দ্বিতীয় মধুচন্দ্রিমা।

মনে হল, শেষ শব্দের মধ্যে কিঞ্চিৎ শ্লেষ মেশানো আছে।

তার মানে শ্রীমতী সাভালাস সকলের হাত থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন তাই তো?

চিফ জাস্টিস নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন, ছোটাস উঠে এসে প্রতিবাদ জানাবেন। কিন্তু অ্যাটর্নি সেখানেই বসে রইলেন, মনে হল তিনি যেন হতবাক হয়ে গেছেন।

প্রধান বিচারপতি ডেমোনিডাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–এইভাবে কথা বলা উচিত নয়।

–আমি ক্ষমা চাইছি ইওর অনার, আমি নতুন করে আবার প্রশ্নটা করতে চাইছি।

ডেমোনিডাস মিসেস লাইকোরগসের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন–সেই রাতে আপনাদের সকলকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল। শ্রীমতী সাভালাস বলেছিলেন সকলে যেন ওই বাড়ি থেকে চলে যান। তিনি তার স্বামীর সাথে একান্তে কিছুটা সময় কাটাবেন তাই তো?

হ্যাঁ স্যার, আমার প্রভু জ্বরে ভুগছিলেন। ভীষণ ঠান্ডা লেগেছিল তার।

শ্ৰীমতী সাভালাস কি মাঝে মধ্যে স্বামীর জন্য ডিনার রান্না করেন?

এই কথা শুনে শ্রীমতী লাইকোরগস হেসে উঠলেন–না না স্যার, কোনোদিন নয়। তিনি কখনও কোনো কাজ করেননি এই বাড়িতে।

নেপোলিয়ান ছোটাস তখনও তার চেয়ারে বসে আছেন। মনে হচ্ছে এই মামলার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নেহাতই এক দর্শক হয়ে এসেছেন।

–আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ শ্রীমতী লাইকোরগস, আপনারা বক্তব্য আমাদের কাজে লাগবে।

পিটার ডেমোনিডাস ছোটাসের দিকে তাকালেন। তিনি তখন জোর করে নিজের সন্তুষ্টি ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। শ্রীমতী লাইকোরগসের কথা জুরিদের প্রভাবিত করবে বলেই তার বিশ্বাস। কিন্তু এই বুড়ো লোকটা এবার কী বলবে?

জর্জ সাহেব প্রশ্ন করলেন–আপনার সাক্ষী?

নোপোলিয়ান ছোটাস নিস্তেজভাবে তাকালেন। বললেন–না, আমি কোনো প্রশ্ন করতে চাইছি না।

প্রধান বিচারপতি, অবাক হয়ে গেছেন। তিনি জানতে চাইলেন মিঃ ছোটাস, আপনি এই সাক্ষীর সাথে কথা বলবেন না? আপনি কি ক্রস এগজামিন করতে চাইছেন না?

নেপোলিয়ান ছোটাস তার পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন–না ইওর অনার, ভদ্রমহিলার কথায় কোনো ভুল আছে বলে আমারে মনে হচ্ছে না। তাকে দেখে আমি বুঝতে পারছি তিনি অত্যন্ত সৎ স্বভাবের মহিলা।

এই পর্যন্ত বলে ছোটাস আবার চেয়ারে বসে পড়লেন।

পিটার ডেমোনিডাস বিশ্বাস করতে পারছেন না তার ভাগ্য এখন কোন দিকে এগিয়ে চলেছে! হায় ঈশ্বর, লড়াই করতে হল না অথচ যুদ্ধতে আমরা জিতে গেলাম! বুড়ো লোকটা একেবারে শেষ হয়ে গেছেন। ডেমোনিডাস ইতিমধ্যে তার বিজয়ের দৃশ্য উপভোগ করতে থাকলেন।

প্রধান বিচারপতি প্রসিকিউটর অ্যাটর্নির দিকে তাকিয়ে বললেন আপনি আপনার পরবর্তী সাক্ষ্যকে ডেকে আনতে পারেন।

–আমরা জোসেফ পাপ্পাসকে এখানে ডাকছি।

লম্বা সুসভ্য ভদ্র চেহারার এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ তিনি দর্শকের আসনে বসেছিলেন। এবার তিনি উইটনেস বক্সের সামনে বসে দাঁড়ালেন। তাকে শপথ গ্রহণ করতে বলা হল।

পিটার ডেমোনিডাস বলতে শুরু করলেন–মিঃ পাপ্পাস, আপনি কী করেন তা জানাবেন। কী?

আমি একজন সোফেয়ার, মানে ড্রাইভার।

এই মুহূর্তে আপনি কোথায় চাকরি করছেন?

–কোথাও না।

–কিন্তু কিছুদিন আগে পর্যন্ত আপনি চাকরি করছিলেন, তাই তো? জর্জ সাভালাসের মৃত্যু পর্যন্ত আপনি তার সোফেয়ার ছিলেন। আমি কি মিথ্যে বলছি?

–না না, আপনি ঠিকই বলেছেন।

–কতদিন ধরে আপনি সাভালাস পরিবারের সঙ্গে যুক্ত?

–এক বছরের কিছু কম-বেশি হবে।

–এটা কি খুব সুন্দর চাকরি?

জোসেফ পাপ্পাস ছোটাসের দিকে তাকালেন। ছোটাস এগিয়ে এসে তাকে বাঁচাবেন এমন একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেখানে বিরাজ করছে থমথমে নীরবতা।

–আমি আবার প্রশ্ন করছি মিঃ পাপ্পাস, কাজটা করতে কি আপনার ভালো লাগতো?

–ঠিক আছে, আমি পেশাদার ড্রাইভার, সবসময় এসব চিন্তা করি না।

–আপনি কি ভালো বেতন পেতেন?

–হ্যাঁ।

–তাহলে আপনি কেন বলছেন এই চাকরিটা খুব একটা ভালো লাগতে না। আমার মনে হচ্ছে, আপনি কি বেশি কিছু টাকা পেতেন? যখন আপনি শ্রীমতী সাভালাসের সঙ্গে শয্যায় যেতেন। এর জন্য আপনাকে কি অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হত?

এই প্রশ্নটা সরাসরি। জোসেফ পাপ্পাস আবার ভাবলেন, নেপোলিয়ান ছোটাস তাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু সেখানে থেকে কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না।

–আমি…জোসেফ তোতলাতে থাকেন…স্যার, আপনি এসব কি বলছেন?

 পিটার ডেমোনিডাস এবার আরও তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে বললেন আমি কী বলছি? আপনি শপথ নিয়ে বলেছিলেন সত্যি কথা বলবেন। আপনি পরিষ্কার করে বলুন, শ্রীমতী সাভালাসের সাথে আপনার কোনো অবৈধ সম্পর্ক ছিল কী ছিল না?

পাপ্পাস কেমন যেন করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন আমাদের মধ্যে গোপন সম্পর্ক ছিল।

কী আশ্চর্য মিঃ পাপ্পাস, ব্যাপারটা ভাবতেই আমার কেমন লাগছে, আপনি ওই ভদ্রমহিলার স্বামীর কাছে কাজ করতেন। সেই ভদ্রলোক আপনার সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি, আর আপনি কিনা এমন একটা বিশ্বাসঘাতকের মতো কাজ করলেন?

হ্যাঁ স্যার।

প্রত্যেক মাসে আপনি মিঃ সাভালাসের কাছ থেকে হাত পেতে বেতন নিতেন। আর তার স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন?

না, এটা শুধু একটা শারীরিক সম্পর্ক ছিল না।

 পিটার ডোমেনিডাস এবার তার আসল কথার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। তিনি জানতে চাইলেন তার মানে? এটা শুধু শরীরের সম্পর্ক ছিল না? এই কথা বলে আপনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন? আমি আপনার কথার আসল অর্থ ঠিক মতো বুঝতে পারছি না।

আমি বলতে চাইছি…আমতা আমতা করেন পাপ্পাস, আমি আর অ্যানাসটাসিয়া বিয়ে করব বলে ঠিক করেছিলাম।

কোর্ট ঘরের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ধ্বনি শোনা গেল। জুরিরা অবাক চোখে অভিযুক্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

–এটা কি আপনার মাথা থেকে বেরিয়েছে, নাকি মিসেস সাভালাসের বুদ্ধি?

–আমরা দুজনেই ভীষণভাবে এটা চাইছিলাম।

–কে প্রথম এই প্রস্তাবটা তুলেছিলেন?

–আমার মনে হয় ও-ই বলেছিল।

পাপ্পাস অ্যানাসটাসিয়া সাভালসের দিকে তাকালেন। অ্যানাসটাসিয়াও ফিরতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তার চাউনির মধ্যে শূন্যতা ছাড়া আর কোনো চিহ্ন নেই।

মিঃ পাপ্পাস, সত্যি বলছি আপনার জবানবন্দি শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। আপনি কী করে ভাবলেন যে, এমন একটা ঘটনা সত্যি ঘটবে? মিসেস সাভালাস একজন বিবাহিতা মহিলা, তাই নয় কী? আপনি কি ভেবেছিলেন মিঃ সাভালাসের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? অথবা ভয়ংকর অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে দেবেন? সত্যি করে বলুন তো, আপনার মনের মধ্যে কোন্ ধারণার উদ্রেক হয়েছিল?

প্রশ্নগুলো পর পর ধেয়ে আসছে। তিনজন বিচারক নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। এমন আজেবাজে প্রশ্ন করার কোনো মানে হয় না। তারা সকলেই ভেবেছিলেন, ছোটাস এখনই উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করবেন। দেখা গেল, ওই ভদ্রলোক কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করছেন না। অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের দৃষ্টিতেও এক অসহায়তার ছাপ।

পিটার ডেমোনিডাস বুঝতে পারলেন, এবার তাকে আরও কঠিন হতে হবে।

তিনি বললেন মিঃ পাপ্পাস, আপনি কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি।

 জোসেফ পাপ্পাস অসহায়ের মতো বলতে থাকেন–আমি জানি না, ঠিক বলতে পারব না।

পিটার ডেমোনিডাসের কণ্ঠস্বরে এবার দারুণ কর্তৃত্ব ফুটে উঠেছে–তাহলে আমাকেই সত্যিটা বলতে দিন। মিসেস সালাভাস পরিকল্পনা করেছিলেন যে, তাঁর স্বামীকে তিনি নিজের হাতে খুন করবেন। তাহলেই পথ পরিষ্কার হবে। তিনি জানতেন যে, তাঁর স্বামী বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করবেন। উইল থেকে তাকে সরিয়ে দেবেন। তাহলে তিনি একেবারে কপর্দকশূন্য হয়ে যাবেন।

তিনি…

–আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। না, নেপোলিয়ান ছোটাসের মুখ থেকে নয়, প্রধান বিচারপতি বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করলেন- আপনি অযথা সময় নষ্ট করছেন। আপনি এমন কোনো কথা বলবেন না, যাতে মনে হতে পারে যে, সাক্ষীকে আপনি প্রভাবিত করছেন।

তিনি নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। ওই আইনজীবী এখনও কেন নিশ্চুপ, ব্যাপারটা ভদ্রলোককে অবাক করল। দেখা গেল ওই প্রবীণ মানুষটি বেঞ্চের দিকে শূন্য। চোখে তাকিয়ে আছেন। তার চোখ দুটি আধবোজা।

পিটার ডেমোনিডাস বলে ওঠেন- ইয়োর অনার, আমি অত্যন্ত দুঃখিত।

 তারপর তিনি ছোটাসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন- আপনার কিছু বলার আছে?

নেপোলিয়ান ছোটাস বললেনধন্যবাদ ডেমোনিডাস। না, আমার কিছু প্রশ্ন করার নেই।

তিনজন বিচারক পরস্পরের দিকে তাকালেন। ছোটাসের এই আচরণ তাদের একেবারে অবাক করে দিয়েছে। একজন বললেন–ছোটাস, আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, এইভাবে সুযোগ নষ্ট করলে এই মামলাতে আপনার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আপনি কেন সাক্ষীকে প্রশ্ন করছেন না?

নেপোলিয়ান ছোটাস বললেন–ইয়োর আনার…।

–আমার মনে হয়, আপনি প্রশ্ন করতে চাইছেন না, তাই কি?

নেপোলিয়ান ছোটাস বাতাসের বুকে একটি হাত আন্দোলিত করে বললেন, আমার কোনো প্রশ্ন করার নেই ইয়োর অনার। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিচারপতি মন্তব্য করলেন ঠিক আছে। আপনি পরবর্তী সাক্ষীকে ডাকতে পারেন মিঃ ডেমোনিডাস।

পরবর্তী সাক্ষী হলেন মিহালিস হারিটোনিডাস। বছর ষাট বয়স। পাকা চুল, ভারিক্কি চেহারা।

 তিনি এসে শপথ নিলেন। প্রশ্ন করা হল–আদালতের সামনে আপনি কি আপনার পেশার কথা বলবেন?

–হ্যাঁ, আমি একটা হোটেল চালাই।

–হোটেলের নামটি কী?

–আরগোস।

–হোটেলটা কোথায় অবস্থিত?

করফুতে।

মিঃ হারিটোনিডাস, এবার আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। দেখুন তো ভালো করে, এই কোর্টরুমে এমন কেউ কি আছেন, আপনার হোটেলে রাত কাটিয়েছেন যিনি?

হারিটোনিডাস চারদিকে তাকিয়ে বললেন–হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ওই ভদ্রলোক আর এই ভদ্রমহিলা।

তার মানে আপনি জোসেফ পাপ্পাস এবং অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসকে চিহ্নিত করছেন, তাই তো?

আইনজীবী সাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বললেন–ওঁরা কি আপনার হোটেলে একাধিকবার সময় কাটিয়েছেন।

–হ্যাঁ, তারা অন্তত বার ছয়েক আমার হোটেলে গিয়েছেন।

–তারা সমস্ত রাত সেখানে ছিলেন, তাই তো একই ঘরে?

–হ্যাঁ, স্যার, সাধারণত তারা সপ্তাহের শেষের দিকে হোটেলে আসতেন।

–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ হারিটোনিডাস।

এবার আইনজীবী নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনি কোনো প্রশ্ন করবেন কি?

না, আমার প্রশ্ন করার কিছু নেই।

প্রধান বিচারপতি অন্য দুজন বিচারকের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পারস্পরিক আলোচনা সেরে নিলেন। ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

এবার প্রধান বিচারপতি নেপোলিয়ান ছোটাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন আপনি এই সাক্ষীকেও ক্রশ এগজামিন করতে চাইছেন না, তাই তো মিঃ ছোটাস?

না, ইয়োরে অনার। তার সাক্ষ্য আমি বিশ্বাস করছি। হোটেলটা সত্যিই সুন্দর। সেখানে আমি কয়েকবার ছিলাম।

প্রধান বিচারপতি অবাক হয়ে নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন। তারপর তিনি সরকার পক্ষের আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, পরবর্তী সাক্ষীকে ডাকার অনুমতি দেওয়া হল।

–আমি ডাঃ ভ্যাসিলস ফ্রানজেসকোসকে ডাকছি।

দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তিনি ধীরে ধীরে উইটনেস বক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। শপথ নিলেন।

–ডাক্তার, আপনি কি বলবেন যে, কোন্ ধরনের ডাক্তারি বিদ্যা আপনি প্র্যাকটিস করে থাকেন?

আমি একজন জেনারেল প্র্যাকটিসনার।

–তার মানে আপনি পারিবারিক ডাক্তার তো?

হ্যাঁ, তাই বলতে পারেন।

কতদিন ধরে আপনি ডাক্তারি পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন? তিরিশ বছর ধরে।

–আপনার কাছে নিশ্চয়ই সরকারি অনুমতি পত্র আছে?

–নিশ্চয়ই আছে।

–ডাক্তার, জর্জ সাভালাস কি আপনার একজন পেশেন্ট ছিলেন?

–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন।

কত বছর ধরে তার সঙ্গে আপনার পরিচয়? দশ বছরের কিছু বেশি।

–আপনি কি তার কোন বিশেষ সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেছিলেন?

–যখন তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় তখন তাঁর হাই ব্লাডপ্রেশার ছিল।

–আপনি ব্লাডপ্রেশারের চিকিৎসা করতেন?

–তারপর কী হল?

–তিনি মাঝে মধ্যেই আমাকে ডাকতেন। তিনি ব্রঙ্কাইটিসে ভুগতেন। লিভারের যন্ত্রণা হত। তবে গুরুতর কিছু নয়।

–শেষবারের মতো কখন মিঃ সাভালাসের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?

গতবছর ডিসেম্বর মাসে।

–মৃত্যুর কিছুদিন আগে।

–হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।

উনি কি আপনার চেম্বারে এসেছিলেন?

–না, আমি ওঁনাকে দেখতে গিয়েছিলাম।

আপনি কি সব ক্ষেত্রেই বাড়িতে গিয়ে রোগীর সঙ্গে দেখা করেন? সাধারণত যাই না।

এক্ষেত্রে গেলেন কেন?

–বিশেষ কারণে।

কী কারণ?

–ডাক্তারবাবু ইতস্তত করতে থাকেন। তারপর বললেন–এই অবস্থায় উনি আমার চেম্বারে আসতে পারছিলেন না।

-কেন? ওঁনার কী অবস্থা হয়েছিল?

–ওঁনার সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। হাত-পা ভেঙে গেছে, উনি থরথর করে কঁপছিলেন।

–এটা কি কোনো অ্যাকসিডেন্ট?

ডাক্তার ইতস্তত করে বলতে থাকেন না, উনি বলেছিলেন যে, ওঁনার স্ত্রী ওঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন।

কোর্টরুমে আবার নীরবতা ভেঙে গেল। ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

প্রধান বিচারপতি রাগ করে বললেন–মিঃ ছোটাস, আপনি কোনো ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছেন না কেন? আপনি কি চাইছেন, বিচারটা একতরফা হোক?

নেপোলিয়ান ছোটাস বললেন–ওহ ধন্যবাদ! হ্যাঁ, আমি বাধা দেবার চেষ্টা করছি।

 কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই গেছে। জুরিরা চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন।

–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ডাক্তাবাবু। আমার আর কোনো প্রশ্ন করার নেই। পিটার ডেমোনিডাস ছোটাসের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন আপনি কোনো প্রশ্ন করবেন?

আমার প্রশ্ন করার কিছু নেই।

.

আরও অনেককে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হল। একজন পরিচারিকা এসে শ্ৰীমতী সাভালাসকে সনাক্ত করল। একজন বাটলার বলল, সে জর্জের কাছ থেকে শুনেছে, জর্জ নাকি স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চাইছে।

নেপোলিয়ান ছোটাস কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ জানালেন না।

এবার বোধহয় অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের পালা।

পিটার ডেমোনিডাসের মুখে বিজয়ের ছাপ পড়েছে। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন, কাগজের শিরোনামে তার ছবি বেরোবে। এত তাড়াতাড়ি বিচারপর্ব শেষ হবে, কেউ তা স্বপ্নেও ভাবেনি। হয়তো আজই বিচার শেষ হয়ে যাবে। তিনি ভাবলেন, আহা, মহান নেপোলিয়ান ছোটাসকে এখন পরাজয়ের গ্লানি বহন করতে হবে।

–আমি মিঃ নিকো মেনটাকিসকে এখানে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

 মেনটাকিস রোগা চেহারার মানুষ। বয়স বেশি নয়। কথা বলেন ধীরে ধীরে।

–মিঃ মেনটাকি, আপনি কী করেন জানাবেন কি?

আমি একটা নার্সারিতে কাজ করি।

ছোটোদের স্কুল?

 না, স্যার। এটা সেই নার্সারি নয়, আমরা ফুলগাছের পরিচর‍্যা করে থাকি।

–ও হোঃ, বুঝতে পারছি, আপনি উদ্ভিদবিদ্যার ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।

–হ্যাঁ, আমি একাজে অনেক দিন ধরে ব্যস্ত আছি।

আমার মনে হয় আপনি বোধহয় সুস্থ থাকার গাছগাছড়া বিক্রি করেন?

–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমরা নানা ধরনের গাছের পরিচযা করে থাকি।

তার মানে বাজারে আপনাদের বেশ সুনাম আছে।

–হ্যাঁ, স্যার। গর্বিত কণ্ঠস্বর, আমরা ভালো পরিষেবা দিয়ে থাকি।

–মিঃ মেনটাকিস বলুন তো, মিসেস সাভালাস কি আপনাদের একজন খদ্দের?

–হ্যাঁ, মিসেস সাভালাস গাছগাছড়া খুবই ভালোবাসতেন।

প্রধান বিচারপতি অধৈর্য হয়ে বললেন–মিঃ ডেমোনিডাস, এইভাবে আপনি কেন প্রশ্ন করছেন? যদি সত্যি কোনো প্রশ্ন না করার থাকে, তাহলে অযথা সময় নষ্ট করবেন না।

-আমাকে আর একটু বলার সুযোগ দিন ইয়োর অনার। আমার মনে হচ্ছে, এই মামলার ক্ষেত্রে এঁনার সাক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রধান বিচারপতি নেপোলিয়ান ছোটাসকে জিজ্ঞাসা করলেন- মিঃ ছোটাস, এই ধরনের প্রশ্নের বিরুদ্ধে আপনি কিছু বলবেন না?

ছোটাস বললেন–না, স্যার, আমার কিছু বলার নেই।

প্রধান বিচারপতির চোখেমুখে হতাশার ভাব সুস্পষ্ট। তিনি পিটার ডেমোনিডাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–ঠিক আছে, আপনি চালিয়ে যান।

–আচ্ছা মিঃ মেনটাকিস, মিসেস সাভালাস ডিসেম্বরের কোনো একদিন কি আপনার নার্সারিতে এসেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন যে তাঁর গাছ নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে?

-, উনি ওই অভিযোগ করেছিলেন।

–তিনি কি বলেছিলেন যে, বিষাক্ত পতঙ্গরা তাঁর গাছপালা নষ্ট করে ফেলছে?

–হ্যাঁ, স্যার।

–তিনি ওই পতঙ্গের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য কীটনাশক চাইতে এসেছিলেন কী?

–হ্যাঁ, স্যার।

–আপনি কি বলবেন, কী ধরনের কীটনাশক তাকে দেওয়া হয়েছিল?

আমি তাকে অ্যান্টিমনি বিক্রি করেছিলাম।

–এটার রাসায়নিক গুণাগুণ কী?

–এটা বিষাক্ত বস্তু। আর্সেনিকের মতো।

কোর্টঘরে আবার মৃদু ফিসফিসানি শব্দ শোনা গেল।

এবার প্রধান বিচারপতি টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন–কেউ কোনো রকম শব্দ করবেন না। আমি তাহলে বেলিফকে ডাকতে বাধ্য হব।

তিনি পিটার ডেমোনিডাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–ঠিক আছে, আপনি প্রশ্ন করে যান।

কতটা পরিমাণ অ্যান্টিমনি দেওয়া হয়েছিল?

–বেশ অনেকটা।

–এটা মারাত্মক বিষ তাই তো? আপনি একে আর্সেনিকের সঙ্গে তুলনা করছেন?

–হ্যাঁ, এটা মারাত্মক বিষ।

আপনি আপনার রেকর্ড বই দেখে বলতে পারবেন, কখন এই বিষটি বিক্রি করা হয়?

–হ্যাঁ, আমি বলতে পারব।

আপনি কি রেকর্ড বই সঙ্গে এনেছেন?

–হ্যাঁ, আমি এনেছি।

 মেনটাকিস পিটার ডেমোনিডাসের হাতে একটি লেজার তুলে দিলেন। সরকার পক্ষের অ্যাটর্নি ধীরে ধীরে বিচারকদের কাছে উঠে গেলেন।

তারপর মাথা ঝুঁকে বললেন–ইয়োর অনার, আমি দ্রষ্টব্য এ-র দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তারপর তিনি সাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনাকে আর বাড়তি কোনো প্রশ্ন করা হবে না। আর কোনো প্রশ্ন করার নেই আমার।

তিনি তাকালেন ছোটাসের দিকে। ছোটাস মাথা নেড়ে বললেন–আমিও কোনো প্রশ্ন করতে চাই না।

পিটার ডেমোনিডাস এবার সত্যি সত্যি খুশি হয়েছেন। তিনি বললেন–আমি দ্বিতীয় দ্রষ্টব্যটির দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তিনি পেছন দিকে তাকালেন। একজন বেলিফ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি বললেন, আপনি কি ওটাকে নিয়ে আসবেন?

বেলিফ তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে গেলেন। একটু বাদে ট্রে-তে বসানো কফ সিরাপ নিয়ে আসলেন। বেশ কিছুটা সিরাপ নেই বোঝা যাচ্ছে।দশর্কেরা তাকিয়ে আছে, বেলিফ এই বোতলটি আইনজীবীর হাতে তুলে দিলেন। পিটার ডেমোনিডাস সেটি জুরিদের সামনে রাখলেন।

–ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়রা, আপনারা খুনের অস্ত্রটির দিকে তাকিয়ে দেখুন। এই অস্ত্র দিয়েই জর্জ সাভালাসকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হল সেই কফসিরাপ যা মিসেস সাভালাস তার স্বামীর ওপর প্রয়োগ করেছিলেন। এই সিরাপের মধ্যে অ্যান্টিমনি বিষ মেশানো ছিল। তাই কফসিরাপ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জর্জ বমি করতে শুরু করেন। কুড়ি মিনিট বাদে তার জীবনাবসান হয়ে যায়।

নেপোলিয়ান ছোটাস এই প্রথম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ধীরে ধীরে বললেন আমি এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কারণ আমার মাননীয় আইনজীবী কিছুতেই বলতে পারবেন না যে, এই বোতল থেকেই কফসিরাপ জর্জের গলায় ঢালা হয়েছিল।

পিটার ডেমোনিডাস বললেন–আমার মাননীয় আইনজীবীর প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা রেখে আমি বলছি, মিসেস সাভালাস স্বীকার করেছেন যে, তিনি তার স্বামীকে কফসিরাপ দিয়েছিলেন। সেই রাতেই তার স্বামীর মৃত্যু হয়। সিরাপটি পুলিশ তালাচাবি দিয়ে রেখেছিল। কিছুক্ষণ আগে আমরা এই দ্রষ্টব্যটিকে কোর্টরুমে নিয়ে এসেছি। করোনার প্রমাণ করেছেন, জর্জ সাভালাসের মৃত্যু হয়েছে অ্যান্টিমনি বিষক্রিয়ার ফলে। কফসিরাপের মধ্যে অ্যান্টিমনির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তিনি উদ্ধত ভঙ্গিতে নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকালেন।

নেপোলিয়ান ছোটাস এবার তার পরাজয় স্বীকার করে নিলেন তাহলে মনে হচ্ছে আমারই ভুল হয়েছে।

পিটার ডেমোনিডাস বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলে উঠলেন–না, মিঃ ছোটাস, ব্যাপারটা সত্যি, আপনাকে তাই তা স্বীকার করতেই হবে।

নেপোলিয়ান ছোটাস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–ইয়োর অনার…তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন, প্রায় জুরি বক্সের কাছছাকাছি। দেখতে চেষ্টা করলেন, কে কে তার দিকে নজর দিচ্ছে। তিনি বোধহয় শব্দ হাতড়াচ্ছিলেন।

–আমি কেন কোনো সাক্ষীকে ক্রশ এগজামিন করিনি, কারণটা বুঝিয়ে বলা দরকার। আমার মনে হয়েছে আমার প্রিয় বন্ধু ডেমোনিডাস সেই শক্ত কাজটি আমার হয়ে করে দিয়েছেন। তাই অতিরিক্ত প্রশ্ন আমি আর করতে চাইনি।

পিটার ডেমোনিডাস হাসতে থাকলেন। বোকাটা বলছে কী! সে কি আমার হয়ে মামলা লড়বে নাকি!

নেপোলিয়ান ছোটাস কফসিরাপের বোতলের দিকে এক মুহূর্ত তাকালেন। তারপর জুরিদের দিকে তাকিয়ে বললেন–সমস্ত সাক্ষীকেই আমার অত্যন্ত সৎ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তাদের বক্তব্য থেকে কিছু প্রমাণ করা কি সম্ভব হল?

তিনি মাথা নাড়লেন পুরো গল্পটা আমি সংক্ষেপে বলে দিচ্ছি। এক সুন্দরী তরুণীর সাথে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের বিয়ে হয়েছিল। ওই ভদ্রলোক তরুণীকে যৌনতার দিক থেকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

এবার তিনি জোসেফ পাপ্পাসের দিকে তাকালেন তাই ওই তরুণী এক যুবকের প্রেমে পড়ে যান। তার এই অভিসারের খবর আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাদের প্রেমের ব্যাপারে কোনো কিছুই আর গোপন নেই। সারা পৃথিবীর লোকের কাছে এটি প্রকাশিত হয়েছে। যে কোনো সংবাদপত্রে মুখরোচক ওই কাহিনী বেরিয়েছে। আমি আর আপনি হয়তো তার এই অসংযত আচরণকে নিন্দা করব, কিন্তু অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসকে তো অস্থিরতা আচরণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি। একজন তরুণীর যে যৌনাকাঙ্ক্ষা থাকে, তিনি সেটা পূরণ করার জন্য প্রেমিকের সাহচর্য প্রার্থনা করেছিলেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। তাকে কোর্টে আসতে হয়েছে খুনের আসামি হিসেবে।

তিনি আবার বোতলের দিকে তাকালেন।

পিটার ডেমোনিডাস ভাবতে থাকেন, বুড়োটা আর কতক্ষণ বকবক করবে। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। বারোটা বাজলেই টিফিনের ছুটি ঘোষিত হবে। এর আগেই বোধহয় বুড়োটা তার বক্তব্য শেষ করবে। সে আর অপেক্ষা করতে চাইছে না। আমি আর এখন ওকে ভয় পাব না।

নেপোলিয়ান ছোটাস বলতে থাকেন–আসুন, আমরা প্রত্যেকটা দ্রষ্টব্যকে পরীক্ষা করি। মিসেস সাভালাস অভিযোগ করেছিলেন তার কিছু কিছু গাছ মরে যাচ্ছে। তিনি সেই গাছগুলোকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি মিঃ মেনটাকিসের কাছেগিয়েছিলেন। মেনটাকিস তাকে অ্যান্টিমনি প্রয়োগ করতে বলেন। তিনি মেনটাকিসের কথা মেনেছিলেন। একে কি আমরা খুন বলতে পারি? আমি অন্তত কখনোই তা বলব না। এবার আমরা হাউসকিপারের বক্তব্য শুনব। উনি বলেছেন যে, মিসেস সাভালাস সেদিন চাকরবাকরদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্বামীর সাথে হনিমুন ডিনারে অংশ নেবেন। নিজের হাতে সব রান্না করবেন। দেখুন, মেয়েরা কীভাবে স্বামীদের মন খুশিতে ভরিয়ে রাখতে পারে? ভালো ব্যবহার এবং ভালো রান্না। তাই নয় কী? এবার আমরা হাউসকিপারের কথাও বলব। ওই ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই মিঃ সাভালাসূকে মনে মনে ভালোবাসতেন। তা না হলে কেউ পঁচিশ বছর ধরে অনুগত হয়ে কাজ করতে পারেন নাকি? মনে রাখবেন, অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের আচরণ সম্পর্কে উনি বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন।

ছোটাস হঠাৎ কেশে উঠলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন–এবার আমরা আরও কিছু কথা শোনাব। যাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তিনি সত্যি সত্যি স্বামীকে ভালোবাসতেন। ভালো রান্না করে খাওয়াতে চেয়েছিলেন একে আমরা ভালোবাসার এক বহিঃপ্রকাশ বলতে পারি।

এবার ছোটাস আবার বোতলের দিকে তাকালেন।

তিনি স্বামীর যন্ত্রণার উপশম ঘটাতে চেয়েছিলেন।

বারোটা বাজতে আর মাত্র এক মিনিট বাকি আছে।

-লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, আপনারা ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকান। তার মুখ দেখে কি মনে হচ্ছে তিনি একজন হত্যাকারী? তার চোখ দেখে কি মনে হচ্ছে, তিনি একজন ঘাতিকা?

পিটার ডেমোনিডাস হতাশ হয়ে জুরিদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। জুরিরা ইতিমধ্যেই এই ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছেন–এটাই পিটারের স্থির বিশ্বাস।

এই ব্যাপারে আইন অত্যন্ত পরিষ্কার। ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়রা, আমাদের মহামান্য বিচারপতিরা তাদের বক্তব্য প্রয়োগ করবেন। আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন যে, অ্যানাসটাসিয়ার দোষ সম্পর্কে কোথাও এতটুকু অবকাশ নেই। তবু কেন আমি তার হয়ে এই মামলাটা লড়ছি, কিন্তু এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ….

নেপোলিয়ান ছোটাস কথা বলতে বলতে আবার কেশে উঠলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করলেন। মুখে চাপা দিলেন। যেখানে সিরাপের বোতলটা রাখা আছে সেদিকে এগিয়ে গেলেন।

…আমার মনে হচ্ছে, বিরুদ্ধে পক্ষের উকিল কিছুই প্রমাণ করতে পারেননি। তবে তার বক্তব্য থেকে আমি অনেকগুলি সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছি। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন

যে, মিসেস সাভালাস এই বোতলের কফসিরাপ স্বামীর ওপর প্রয়োগ করেছিলেন।

কথা বলতে বলতে প্রবল কাশির তোড়ে হকচকিয়ে গেলেন ছোটাস। অচেতন অবস্থা হল তাঁর। তিনি কোনোরকমে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। কফ মেডিসিনের বোতলটা খুললেন। তারপর খানিকটা সিরাপ ঢক করে গিলে ফেললেন। কোর্টঘরে উপস্থিত সকলে তখন অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, তারা যেন সম্মোহিত হয়ে গেছে। আইনজীবী কী করছেন? বিষাক্ত তরল জেনেও অনায়াসে তা পান করছেন?

কোর্টরুমের এখানে সেখানে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

 প্রধান বিচারপতি চিৎকার করে বললেন–মিঃ ছোটাস!

নেপোলিয়ান ছোটাস আর-এক ঢোক সিরাপ খেয়ে ফেললেন। বললেন–ইয়োর অনার, আপনার বেশ বুঝতে পারছেন, আমার মাননীয় আইনজীবী বন্ধু কীভাবে আপনাদের প্রতারণা করতে চেয়েছেন। জর্জ সাভালাস এই ভদ্রমহিলার হাতে নিহত হননি। ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার হল তো?

ঢং ঢং করে ঘড়িতে বারোটা বাজল। একজন বেলিফ ছুটে গেল প্রধান বিচারপতির কাছে।

প্রধান বিচারপতি হাতুড়ি ঠুকে বললেন–অর্ডার, অর্ডার! আমরা দু-ঘণ্টার জন্য বিচারসভা বন্ধ রাখব। জুরিরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবেন। এই বিচারে কী রায় দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হবে। দুটোর সময় আবার কোর্ট বসবে।

পিটার ডেমোনিডাসকে মনে হল, কেউ যেন তার মুখ রক্তহীন করে দিয়েছে। এটি কী করে সম্ভব? এটা কি ভোজবাজি নাকি? বোতল পালটে গেছে? কিন্তু তা কেমন করে হবে?.পুলিশের কড়া প্রহরা আছে। প্যাথোলজিস্টরা রিপোর্ট দিয়েছেন? ডেমোনিডাস তার সহকারীর সঙ্গে কথা বললেন। নেপোলিয়ান ছোটাসকে কাছে-পিঠে কোথাও দেখা গেল না।

দুটোর সময় কোর্ট আবার বসল। জুরিরা কোর্টরুমে এসে গেছেন। নেপোলিয়ান ছোটাসকে তখনও দেখা যাচ্ছে না।

পিটারা ভাবলেন, বুড়োটা বোধহয় মরেছে। বেশি বাহাদুরি দেখতে গিয়েছিল।

সঙ্গে সঙ্গে নেপোলিয়ান ছোটাসকে দেখা গেল। তাকে যথেষ্ট স্বাস্থােজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে। কোর্টরুমের দর্শকরা অবাক চোখে নেপোলিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছেন।

প্রধান বিচারপতি বললেন–লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, জুরিরা একটা স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন।

জুরিদের একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–ইয়োর অনার, আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, অভিযুক্তাকে কখনোই খুনের আসামি বলা যায় না। তাঁকে সমস্ত অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া হল।

দর্শকদের মধ্যে থেকে উচ্ছ্বাসধ্বনি ভেসে এল।

পিটার ডেমোনিডাসকে দেখে মনে হল, অদৃশ্য শয়তান তার শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। বেজন্মার বাচ্চাটা আরও একবার আমাকে হারিয়ে দিল! বিড়বিড় করতে থাকেন তিনি। তাকিয়ে থাকেন জ্বলন্ত দৃষ্টিতে নেপোলিয়ান ছোেটাসের মুখের দিকে।

.

.০৮.

আসল রহস্যের কী হল? গ্রিসে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হয়। নেপোলিয়ান ছোটাস কি সেই পদ্ধতি নিলেন?

তাই কি আমরা তাকে এক জীবন্ত শয়তান বলে থাকি? যখনই অবস্থাপন্ন ঘরের পুরুষ অথবা নারী ভুল করে খুন করে বসেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে নেপোলিয়ান ছোটাসের শরণাপন্ন হন। এ ব্যাপারে ছোটাস কিংবদন্তীর মহানায়ক হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি খুনের আসামিকে বাঁচিয়ে আসছেন। একটির পর একটি সাফল্যের পালক গোঁজা হচ্ছে তার মাথার মুকুটে। অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের ব্যাপারটি সমাধান করে তিনি তো জাতীয় নায়ক হয়ে উঠেছেন। পৃথিবীর সর্বত্র সংবাদপত্রে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে এই খবরটি ছাপা হয়েছে। এমন একজন মহিলাকে তিনি বাঁচিয়েছেন, যাঁর প্রাপ্য ছিল মৃত্যুদণ্ড। বিজয়টাকে সত্যি সত্যি দর্শনীয় বলা যেতে পারে। তবে এর জন্য তাঁকে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিজের জীবন সংশয় করেও লড়তে হয়েছে। তিনি বলেই বোধহয় এই লড়াইতে নামতে পেরেছেন। অন্য কেউ হলে আগেই হার স্বীকার করতে বাধ্য হতেন।

জুরিদের মুখগুলোর কথা মনে পড়লে ছোটাস মাঝে মধ্যে হেসে ওঠেন। আহা, কী কৌশলেই বিপক্ষের আইনজীবীকে বোকা বানানো হয়। সাফল্য যে কত মধুর, তা তিনি সেদিন বুঝতে পেরেছেন। সব ব্যাপারটা আগে থেকে সাজানো ছিল। ইচ্ছে করেই তিনি সাক্ষীদের কোনো প্রশ্ন করেননি। তিনি চেয়েছিলেন, একেবারে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় পর্যালোচনাটা বলবেন বারোটা বাজার আগে, ঠিক এক মিনিট। যদি বিচারপতিরা আরও কিছুক্ষণ বেশি বিচার চালানোর কথা ভাবতেন, তাহলে কী হত? তাহলে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে যেত।

তার জীবন সংশয় দেখা দিত। কোর্টে টিফিন ঘোষিত হবার পর আবার তিনি তরতাজা হয়ে ফিরে আসতে চাইছিলেন। কিন্তু রিপোর্টাররা তাকে ঘিরে ধরেছিল।

মিঃ ছোটাস, আপনি কী করে জানলেন যে, কফসিরাপের মধ্যে বিষ নেই?

–আপনি কি বলবেন…

–কেউ কি বোতল পালটে দিয়েছে?

অ্যানাসটাসিয়া সাভালাস…

অনুগ্রহ করে আমায় এখন ছেড়ে দেবেন। প্রকৃতির ডাক এসেছে। আমি ফিরে এসে আপনাদের সব কথার জবাব দেব।

ছোটাস তখন দৌড়োচ্ছিলেন। করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে বাথরুমের ওপর লেখা ছিল আউট অফ অর্ডার।

একজন সাংবাদিক বলেছিলেন- আপনি অন্য একটা টয়লেটে এখুনি চলে যান স্যার।

নেপোলিয়ান ছোটাস বলেছিলেন–না, আমি আর দাঁড়াতে পারছি না।

তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন।

তার দলবল সেখানে তৈরি ছিল। ডাক্তার অনুযোগ জানিয়ে বললেন–তাড়াতাড়ি করুন। অ্যান্টিমনি খুব দ্রুত কাজ করে। এখুনি পাকস্থলী পাম্প করতে হবে।

কাজ শুরু হয়ে গেল। নেপোলিয়ান ছোটাসের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বলেছিলেন–মেঝের ওপর শুয়ে পড়ুন। মনে হচ্ছে, ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে পারে।

নেপোলিয়ান আমতা আমতা করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন।

এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না ডাক্তার। আমি জানি, এই লড়াইতে আমিই জিতব।

.

অ্যানাসটাসিয়া সাভালাসের জীবন বাঁচানোর জন্য নেপোলিয়ান ছোটাস দশ লক্ষ ডলার পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। পুরো ডলারটা সুইস ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া হয়েছিল। কোলোনারাইতে একটি প্রাসাদোপম বাড়ি কিনেছিলেন। এটি হল এথেন্সের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক অভিজাত অঞ্চল। আহা, করফু দ্বীপে একটি সুন্দর ভিলা! প্যারিসে এভিনিউ ফকে আর একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি এখন যথেষ্ট বিত্তবান ব্যক্তি।

সব মিলিয়ে নেপোলিয়ান ছোটাস জীবনে সফল পুরুষ। তবে তার জীবনাকাশে একটি মাত্র কালো মেঘের আনাগোনা দেখা যায়।

তিনি হলেন ফ্রেডেরিক স্টাভরস। তিনি হলেন ট্রিটসিস অ্যান্ড ট্রিটসিস-এর নতুন সদস্য।

নেপোলিয়ান, ওই লোকটির ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।

–সেই ভদ্রলোক আমার অনেকগুলি কেস ছিনিয়ে নিয়েছেন। এই মানুষটিকে আমি, কী করে শায়েস্তা করব?

–আপনারা কি জানেন, এই লোকটি কত বড়ো শয়তান?

বুঝতে পারছি, এর ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।

নেপোলিয়ান ছোটাস বুঝতে পেরেছিল, তার ঘাড়ে কেউ গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। কিন্তু কী আর করা যাবে? একবার, শুধু একটি সুযোগ দরকার। তাহলেই বিপক্ষ উকিলকে তিনি–ধরাশায়ী করতে পারবেন।

.

এক দার্শদিক একদা বলেছিলেন- সব ব্যাপারে তোমাকে সতর্ক হতে হবে।

 ফ্রেডারিক স্টাভরস এই প্রবাদ বাক্যটি মেনে চলেন। তিনি ট্রিটসিস অ্যান্ড ট্রিটসিস এর একজন সাধারণ সদস্য। তাঁর মনে স্বপ্ন আছে। তিনি জানেন, পৃথিবীর ওপর শক্ত পায়ে হেঁটে যেতে হয়। অসম্ভবকে সম্ভব করতে হয়।

–ফ্রেডারিক, তার বউ বলেছিল, মনে হচ্ছে, তুমি কোনো ব্যাপারে খুবই চিন্তিত।

না, আমি ভালোই আছি।

ফ্রেডারিক এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ। জীবনে অনেক আশা আছে, সে আদর্শবাদী। বেশ কিছুদিন ধরৈ তিনি একটি অফিসে চাকরি করছেন, এথেন্সের মোনাসটিরাকি বিভাগে। তসহিষ্ণু খদ্দেরদের সঙ্গে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। কোনো টাকাপয়সা নেননি। নেপোলিয়ান ছোটাসের সঙ্গে যখন তার দেখা হল, তখনই জীবনটা একেবার পালটে গেল।

একবছর আগে তিনি ল্যারি ডগলাসের কেসটা লড়েছিলেন। নোয়েলে পেজকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ডগলাসের বউকে হত্যার অপরাধে। মেয়েটির নাম ক্যাথেরিন। নেপোলিয়ান ছোটাসকে কিনে নিয়েছিলেন কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস। ডেমিরিস চেয়েছিলেন, তাঁর রক্ষিতার হয়ে একজন পুঁদে উকিলকে দাঁড় করাতে।

স্টাভরস ছোটাসের হয়ে কাজ করেছিলেন। আহা, তখন থেকেই তিনি ছোেটাসের ভক্ত হয়ে উঠেছেন।

–ছোটাসকে তার কর্মরত অবস্থায় দেখা উচিত। স্টাভরস বউয়ের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, ভদ্রলোককে দেখে তুমি বুঝতে পারবে না, কী ধুরন্ধর আর চালাক! আমার খুব ইচ্ছে, আমি কোনোদিন তার ফার্মে যোগ দেব।

তখন মামলা ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। একটা অপ্রত্যাশিত বাঁক দেখা গেল। নেপোলিয়ান ছোটাসের প্রাইভেট চেম্বারে নোয়েলে পেজ, ল্যারি ডগলাস এবং ফ্রেডারিক স্টাভরসকে কথা বলতে দেখা গেল।

ছোটাস স্টাভরসকে বলেছিলেন–এই মাত্র বিচারকদের সাথে আমি আলোচনা করে এলাম। মনে হচ্ছে ব্যাপারটা মনের মতো ঘটতে পারে, অবশ্য যদি অভিযুক্তরা তাদের জবানবন্দি পরিবর্তন করে। সেক্ষেত্রে বিচারকরা বলেছেন, অপরাধীদের পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করবেন। তার মধ্যে চার বছর মুকুব করে দেওয়া হবে। মাস ছয়েকের মতো জেল খাটতে হবে।

তারপর তিনি ল্যারির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন–আপনি একজন আমেরিকান, মিঃ। ডগলাস, আপনাকে এই দেশ থেকে বিতাড়ন করা হবে। আপনি আর কোনোদিন গ্রিসে ফিরে আসতে পারবেন না।

নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাস সেইমতো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের জবানবন্দি বদলে দিয়েছিলেন। পনেরো মিনিট কেটে গেছে। প্রধান বিচারপতি বললেন–গ্রিক আদালত কখনও সেই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে না, যার বিরুদ্ধে খুনের মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই মনে হচ্ছে, নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতেই হবে। কারণ তাদের দোষ সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে। আজ থেকে নব্বই দিনের মধ্যে এই ঘটনাটা ঘটবে।

স্টাভরস ভেবেছিলেন, নেপোলিয়ান ছোটাস এবার বোধহয় চিৎকার করে উঠবেন। কিন্তু ছোটাসকে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস ভাড়া করেছিলেন অন্য কারণে। তিনি চেয়েছিলেন, তার রক্ষিতা নোয়েলে পেজের যেন মৃত্যুদণ্ড হয়। এভাবেই তিনি ওই বিশ্বাসঘাতিকার চরম শাস্তি চেয়েছিলেন।

স্টাভরস ভেবেছিলেন, তিনি নিজেই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করবেন। ছোটাস কী জঘন্য কাজ করেছেন তা বুঝিয়ে বলবেন। চেষ্টা করবেন, বিচারটাকে যদি পালটানো যায়।

নেপোলিয়ান ছোটাস স্টাভরসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বলেছিলেন–কাল যদি তুমি ফাঁকা থাকো তাহলে আমার কাছে এসো। আমার সাথে লাঞ্চের আসরে। আমি আমার পার্টনারদের সঙ্গে তোমায় কথা বলিয়ে দেব।

.

চার সপ্তাহ কেটে গেছে, ফ্রেডারিক স্টাভরস ওই ট্রিটসিস অ্যান্ড ট্রিটসিস-এর অন্যতম অংশীদারে পরিণত হয়েছেন। বিরাট অফিস পেয়েছেন। মোটামুটি ভালো বেতন। এইভাবে তিনি তাঁর আত্মাকে বিক্রি করলেন শয়তানের কাছে। শেষ অব্দি তিনি সেই সরল সত্যটা বুঝতে পেরেছিলেন, তা হল, অর্থই এই পৃথিবীর একমাত্র নিয়ন্ত্রক।

–তাও নিজেকে মাঝে মধ্যে অপরাধী বলে মনে হয় স্টাভরসের। মনে হয় আমি যেন এক জঘন্য হত্যাকারী।

ফ্রেডারিক স্টাভরস মাঝে মধ্যেই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন। শেষ অব্দি তিনি একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোলেন।

একদিন সকালে তিনি নেপোলিয়ান ছোটাসের অফিসে গেলেন। বললেন নেপোলিয়ান,…

হ্যাঁ, কী বলতে চাইছ বলো? তুমি কি ছোট্ট ছুটি চাইছ, ফ্রেডারিক? হ্যাঁ এটা তোমার পক্ষে ভালোই হবে।

স্টাভরস জানতেন যে, তিনি তার সমস্যার কথা বলতে এসেছেন। তিনি বললেন নেপোলিয়ান, আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি এখানে থাকতে পারছি না।

ছোটাস তার এই কথা শুনে অবাক হয়ে বলেছিলেন- তুমি কী বলছ? তুমি তো ভালোই কাজ করছ।

না, আমি থাকতে পারছি না।

–কেন? বিবেকের তাড়না?

ফ্রেডারিক বলেছিলেন- নোয়লে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের ব্যাপারটা মনে আছে? এর জন্য পনি কি কখনও বিবেকের দংশন অনুভব করেন না?

ছোটাসের চোখ দুটি সরু হয়ে এল।

– ফ্রেডারিক, কোনো কোনো সময় বিকৃত পন্থা অবলম্বন করে সুবিচার কিনতে হয়।

নেপোলিয়ান হেসেছিলেন।

আমাকে বিশ্বাস করো, কোনো কাজের জন্য আমি কখনও অনুতাপ প্রকাশ করি  না। যা ঘটবার তা তো ঘটবেই। আমরা হলাম নিমিত্ত মাত্র।

–আমরা ইচ্ছে করে ওই দুজনকে ফাঁসি দিয়েছি। আমরা ওদের সাথে দুষ্টু বুদ্ধির খেলা খেলেছি। আমি অত্যন্ত দুঃখিত, আমি আপনার সঙ্গে আর কাজ করতে পারছি না। আমি এ মাসের শেষে এই ফার্ম ছেড়ে চলে যাব।

তোমার পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করব না। ছোটাস বলেছিলেন, তুমি কেন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছ? আত্মঘাতী বরং কিছুদিন ছুটি নাও, স্ত্রীর সাথে কোথাও ঘুরে এসো। মন তরতাজা হলে আবার এখানে এসো।

না, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এখানে থাকলে আমি খুশি হতে পারব না। আমি দুঃখিত।

নেপোলিয়ান ছোটাস অনেকক্ষণ ধরে ফ্রেডারিকের দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন- এবার কী করবে কিছু ভেবেছ কী? তুমি কিন্তু একটা ভীষণ ভালো পেশাকে লাথি মেরে চলে যাচ্ছ। ভবিষ্যতে এর জন্য তোমাকে পস্তাতে হবে।

না, আমি আমার জীবনকে বাঁচাতে চাইছি।

–তুমি এ ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছ?

–হ্যাঁ, কোনোভাবেই আমার এই সিদ্ধান্ত পালটাবে না। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি… কোথাও গিয়ে এব্যাপারটা আলোচনা করব না।

ফ্রেডারিক অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ নেপোলিয়ান ছোটাস তাঁর ডেস্কে বসেছিলেন চিন্তামগ্ন হয়ে। শেষ অব্দি তিনি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিয়ে একটি নাম্বার ডায়াল করলেন।

মিঃ ডেমিরিসকে বলবেন যে, আজ বিকেলবেলা তার সঙ্গে আমার দেখা করতেই হবে। ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

.

চারটে বেজেছে। নেপোলিয়ান ছোটাসকে দেখা গেল কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের অফিসে বসে থাকতে।

ডেমিরিস জানতে চাইলেন- কী হয়েছে নেপোলিয়ান? সমস্যাটা কোথায়?

–এটাকে আমি সমস্যা বলব না। কিন্তু ব্যাপারটা আপনাকে জানিয়ে রাখা দরকার। ফ্রেডারিক স্টাভরস আজ সকালে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে আর এই সংস্থায় থাকতে চাইছে না।

–স্টাভরস? ল্যারি ডগলাসের আইনজ্ঞ। তাই তো?

হ্যাঁ, বিবেকের দংশনে দংশিত হচ্ছে বেচারি।

অনেকক্ষণের নীরবতা।

–ঠিক আছে, আমি দেখছি।

অবশ্য ও বলছে, ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও আলোচনা করবে না। ব্যাপারটার সেখানেই ইতি ঘটে গেছে।

–আপনি কি ওকে বিশ্বাস করছেন?

–আমি করছি, কোস্টা।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস হেসে বলেছিলেন, ঠিক আছে, তা হলে এই ব্যাপারে চিন্তার কোনো কারণ আছে কী?

নেপোলিয়ান ছোটাস বলেছিলেন–মনে হচ্ছে চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবুও আমি আসল অবস্থাটা আপনাকে বলে গেলাম।

–ঠিক আছে,। অত চিন্তার কোনো কারণ নেই। আসছে সপ্তাহে আপনি কোনোদিন ফাঁকা আছেন কী? অনেকদিন দুবন্ধু মিলে নৈশভোেজ সারা হয়নি।

–নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই।

–ঠিক আছে, আমি টেলিফোনে আপনাকে ডেকে নেব।

–অনেক ধন্যবাদ কোস্টা।

.

শুক্রবার, শেষ বিকেল, কাপনিকারিয়া চার্চ, ডাউনটাউন। নীরবতা বিরাজ করছে। শান্ত পরিবেশ। বেদির পাশে ফ্রেডারিক স্টাভরস হাঁটু মুড়ে বসে আছেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ফাদার। তিনি স্টাভরসের মাথার ওপর এক টুকরো কাপড় চাপা দিয়েছেন।

–আমি অনেক পাপ করেছি ফাদার। আমার পাপের কোনো শাস্তি আছে কী?

-মানুষ অনেক সময় অজান্তে পাপ করে, হে আমার পবিত্র পুত্র। তুমি কী ধরনের পাপ করেছ?

–আমি একজন খুনে।

–তুমি কাউকে হত্যা করেছ?

–হ্যাঁ, ফাদার, আমি জানি না। এই পাপের জন্য আমাকে কী শাস্তি ভোগ করতে হবে?

–ভগবান সব কিছু জানেন, তুমি ভগবানের সাথে কথা বলল।

–আমি যে কথা বলতে পারছি না! লোভ আমাকে পাপের পথে ডেকে এনেছে। এক বছর আগে এই মারাত্মক ঘটনাটা ঘটেছে। খুনের দায়ে অভিযুক্ত একটি মানুষের হয়ে আমি ওকালতি করেছিলাম। মামলাটা তরতর করে এগিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ান ছোটাস…

ফ্রেডারিক স্টারস চার্চ থেকে বেরিয়ে এলেন। আধঘণ্টা কেটে গেছে। তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষে পরিণত হয়েছেন। মনে হল, তার কাঁধ থেকে বিরাট বোঝাটা তিনি নামিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্বীকারোক্তির যে রীতি আছে, সেটি তিনি পালন করেছেন। তিনি পুরোহিতকে সব কথা বলেছেন। এই প্রথম সব কথা বাইরের কাউকে বললেন। আহা, এত আনন্দ? স্বীকারোক্তির এত আনন্দ!

আমি একটা নতুন জীবন শুরু করব। আমি এই শহরের অন্য কোথাও চলে যাব। দেখব, দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতে পারি কিনা। আপনাকে অনেক-অনেক ধন্যবাদ ফাদার। আপনি এভাবে স্বীকারোক্তির সুযোগ না দিলে সারাজীবন একটা অপরাধ বোধ আমাকে কুরে কুরে খেত।

অন্ধকার ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, চারপাশ নীরব নিথর হয়ে গেছে। ফ্রেডারিক স্টাভরস রাস্তার দিকে চলে গেলেন। সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে। তিনি রাস্তা পার হবার চেষ্টা করলেন। ঠিক যখন মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, একটা কালো লিমুজিন গাড়ি পাহাড়ের ওপর থেকে হেডলাইট জ্বেলে এগিয়ে এল। বিরাট দৈত্যের মতো সেই গাড়িটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আহা, নির্মম এক শয়তান! স্টারস অপলক তাকিয়েছিলেন, ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিলেন, পালাবার পথ নেই, তারপর? আর্তনাদ, আর্তচিৎকার। স্টাভরসের মনে হল তার শরীর হাজার হাজার টুকরো হয়ে গেছে। তারপর ঘন অন্ধকার।

.

নেপোলিয়ান ছোটাস সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠেন। তাঁর কেবলই মনে হয়, দিনটি শুরু হবার আগে চারপাশ কী সুন্দর নীরব নিস্তব্ধ হয়ে থাকে। তিনি একা একা সকালের প্রাতরাশ সারেন। খবরের কাগজগুলো মন দিয়ে পড়েন। সেই সকালে তিনি একটি বিষয় জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি দলের কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন। ছোটাসের মনে হল, এখুনি তাকে একটা শুভেচ্ছাসূচক তারবার্তা পাঠানো উচিত। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সেন্যরা ইয়াংসি নদীর উত্তর প্রান্তে পৌঁছে গেছে। হ্যারি ট্রুম্যান এবং অ্যালবেন বার্কলেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। নেপোলিয়ান ছোটাস দ্বিতীয় পাতায় এলেন। এবং একটি খবর পড়ে তার রক্ত হিম হয়ে গেল।

মিঃ ফ্রেডারিক স্টাভরস, বিশিষ্ট ট্রিটসিস অ্যান্ড ট্রিটসিস সংস্থার অন্যতম অংশীদার, গতরাতে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তিনি কাঁপানিকারিয়া চার্চ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রকাশ, একটি কালোরঙের লিমুজিন তাকে চাপা দেয়। এই লিমুজিন গাড়িটিতে কোনো নাম্বার প্লেট ছিল না। নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের অন্যতম আইনজীবী হিসেবে মিঃ স্টাভরস দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ল্যারি ডগলাসের অ্যাটর্নি ছিলেন।–

 নেপোলিয়ান ছোটাস আর পড়তে পারলেন না। তিনি তার চেয়ারে স্থির হয়ে বসে রইলেন। ব্রেকফাস্ট খেতে ভুলে গেলেন। অ্যাকসিডেন্ট? সত্যি কি এটা একটা দুর্ঘটনা? কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস বলেছিলেন, কোনো ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু? ডেমিরিসের মুখের ভাব দেখে তাঁর মনের কথা বোঝা যায় কি?

ছোটাস টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে ফোনে ডাকলেন।

–আজ সকালের কাগজ পড়েছেন কি?

ছোটাস জানতে চাইলেন।

না, এখনও পড়িনি। কেন?

–ফ্রেডারিক স্টাভরস আর বেঁচে নেই।

–কী বলছেন! আপনি এসব কী বলছেন?

–সত্যি, ছেলেটি পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

–হে ঈশ্বর, আমি অত্যন্ত দুঃখিত! ড্রাইভারটাকে ধরা সম্ভব হয়েছে কি?

না, না, এখনও ধরা পড়েনি।

পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। এখনকার দিনে কারও জীবন আর নিরাপদ, নয়। আচ্ছা, বৃহস্পতিবার ডিনারের আসর বসানো যেতে পারে কি?

–ঠিক আছে।

–তাহলে এই কথা রইল।

 ছোটাস আবার কাগজ পড়তে শুরু করলেন। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের এই বিস্ময়বোধটা কতখানি সত্যি? নাকি তিনি এক পাকা অভিনেতা! মনে হচ্ছে স্টাভরসের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভদ্রলোকের কোনো যোগ নেই। এমনটাই ছোটাস ভাবতে চাইলেন।

.

পরের দিন সকালবেলা। নেপোলিয়ান ছোটাস তার প্রাইভেট গ্যারেজ থেকে গাড়ি নিয়ে অফিস বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে গেলেন। গাড়িটা পার্ক করলেন। যখন তিনি এলিভেটরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি অল্পবয়সী ছেলে বেরিয়ে এল।

–আপনার কাছে ম্যাচেস আছে স্যার?

 ছোটাসের মনের মধ্যে বেজে উঠল বিপদ ঘণ্টাধ্বনি। এই ছেলেটি একেবারে অজানা, এই গ্যারেজে কী করছে?

–হ্যাঁ, আছে। কোনো কথা চিন্তা না করে ছোটাস তার ব্রিফকেস দিয়ে ছেলেটির মাথায় আঘাত করলেন।

ছেলেটি যন্ত্রণায় গর্জন করে উঠল–কুক্কুররি বাচ্চা!

সে তার পকেট থেকে একটা বন্দুক বের করল। বন্দুকে সাইলেনসার লাগানো আছে।

একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল–কী হচ্ছে এখানে? এই ছোকরা? ইউনিফর্ম পরা গার্ড বেরিয়ে এসেছে।

ছোকরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর খোলা দরজার দিকে পালিয়ে গেল।

প্রহরী ছোটাসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনি ঠিক আছেন মিঃ ছোটাস?

 নেপোলিয়ান ছোটাস বললেন–হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।

–ও কী করার চেষ্টা করছিল?

নেপোলিয়ান ছোটাস বললেন–আমি ওর মতিগতি বুঝতে পারিনি।

.

এটা কি একটা সমাপতন? ছোটাস নিজের কাছে জানতে চাইলেন। হতে পারে, ছেলেটি হয়তো পাতি ছিনতাইবাজ। কিন্তু সাইলেনসার লাগানো বন্দুক ব্যবহার করবে কেন? নাকি ও আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল? এর অন্তরালেও কি কনস্ট্যানটিনের কালো হাত আছে? কিছু বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

আমি বুঝতে পারছি না, ছোটাস ভাবলেন, ডেমিরিস সম্পর্কে আরও সতর্ক হতে হবে। ডেমিরিসের কানে এমন কোনো খবর তুলে দেওয়া উচিত হবে না, যা বিপদসূচক হতে পারে।

এমন সময় নেপোলিয়ান ছোটাসের সেক্রেটারির কণ্ঠস্বর শোনা গেল ইন্টারকমে।

–মিঃ ছোটাস, তিরিশ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আদালতে আসতে হবে।

আজ একটা সিরিয়াল মার্ডার কেসের গুরুত্বপূর্ণ ট্রায়াল আছে। কিন্তু ছোটাস তখনও ভয়ে কাঁপছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি একটা সিদ্ধান্ত নিলেন না, আজ কোর্টে গিয়ে সওয়াল জবাবে অংশ নিতে পারবেন না। তিনি তার সেক্রেটারিকে বললেন বিচারককে ডেকে বলল, আমি আজ খুবই অসুস্থ। আমার কোনো একজন পার্টনারকে পাঠিয়ে দাও। ফোন এলে আর আমাকে বিরক্ত করো না।

তিনি ডেস্কের ড্রয়ার থেকে টেপরেকর্ডার বের করলেন। কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। তারপর কথা বলতে শুরু করলেন।

.

সেদিন সন্ধেবেলা নেপোলিয়ান ছোটাসকে দেখা গেল স্টেট প্রসেকিউটিং অ্যাটর্নি পিটার ডেমোনিডাসের চেম্বারে। হাতে একটা ম্যানিলা এনভেলপ। রিসেপশনিস্ট তাকে দেখে চিনতে পেরেছে।

শুভ সন্ধ্যা, মিঃ ছোটাস! আমি কীভাবে আপনাকে সাহায্য করব?

–আমি মিঃ ডেমোনিডাসের সঙ্গে দেখা করতে চাইছি।

উনি একটা মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন। আপনি কি আগে থেকে বলে রেখেছিলেন?

–না, আপনি বলবেন, আমি এখানে আছি। ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

–এখনই বলছি।

 পনেরো মিনিট কেটে গেছে। নেপোলিয়ান ছোটাস প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নির অফিসের মধ্যে বসে আছেন।

-ঠিক আছে, ডেমেনিডাস বললেন, মহম্মদ পাহাড়ের কাছে এসেছে, ব্যাপার কী? আপনার জন্য আমি কী করতে পারি? আজ বিকেলবেলা কোনো ভালো লেনদেন হবে বলে মনে হয় না।

-না, পিটার। এটা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।

বসুন, বসুন নেপোলিয়ান।

দুজনে পাশাপাশি বসলেন।

ছোটাস বললেন আমি এই এনভেলপটা আপনার হাতে তুলে দিতে চাইছি। মুখটা বন্ধ করা আছে। যদি কোনো কারণে আমার মৃত্যু ঘটে, তা হলে এই এনভেলপটা খুলবেন। আপনি কথা দিন।

ছোটাসের এই আচরণে পিটার ডেমোনিডাস অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন–এমন কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে কি?

–হ্যাঁ, সম্ভাবনা আছে।

–কেন? আপনার কোনো ক্লায়েন্ট কি?

-তা জানি না, কাউকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এই পৃথিবীতে একমাত্র আপনার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস। আপনি কথা দিন, এই খামটা ঠিক সময়ে খুলবেন।

ডেমোনিডাস বললেন–আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, কোনো কারণে আপনি আতঙ্কিত।

–আমি খুব ভয় পেয়েছি।

–আমার এই অফিসে আপনি কিছুক্ষণ থাকবেন কি? আমি একটা পুলিশকে আপনার সঙ্গে দিচ্ছি।

ছোটাস এনভেলপটার দিকে তাকিয়ে বললেন–আমি এই এনভেলপটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছি।

-ঠিক আছে, এটা আপনি আমার জিম্মায় রেখে যান।

–ঠিক আছে। ছোটাস উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যাক, কেমন? পিটার বললেন–ঠিক আছে, এ নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না।

এক ঘণ্টা কেটে গেছে। হেলেনিক ট্রেড করপোরেশনের অফিসে ইউনিফর্ম পরা এক বার্তাবাহক এসে দাঁড়িয়েছে। সে একজন সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলছে।

–মিঃ ডেমিরিসের একটি প্যাকেট এসেছে।

আমি কি সেটা সই করে নেব?

–না, এটা ডেমিরিসের হাতেই তুলে দিতে হবে।

আমি দুঃখিত। এখন তাকে বিরক্ত করা যাবে না। কোথা থেকে এই প্যাকেটটা এসেছে?

নেপোলিয়ান ছোটাসের কাছ থেকে।

–এই ব্যাপারে আর কিছু বলার আছে কি?

–হ্যাঁ, ম্যাডাম।

–দেখছি মিঃ ডেমিরিস এটা গ্রহণ করেন কিনা?

 সেক্রেটারি ইন্টারকমের সুইচটা টিপে ধরলেন।

–আমাকে ক্ষমা করবেন মিঃ ডেমিরিস। একজন বার্তাবাহক একটি প্যাকেট নিয়ে এসেছেন। মিঃ ছোটাস আপনাকে এই প্যাকেটটা পাঠিয়েছেন।

ডেমিরিসের কণ্ঠস্বর শোনা গেল ইন্টারকমে আইরিন ওটা ভেতরে নিয়ে এসো।

উনি বলেছেন, এটা আপনার হাতে ব্যক্তিগতভাবে তুলে দেবেন। ক্ষণকালের নীরবতা ভেতরে নিয়ে এসো। আইরিন এবং ওই বার্তাবাহক ভেতরে ঢুকল।

–আপনি কি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস?

–হ্যাঁ।

–আপনি এটা সই করে দেবেন?

ডেমিরিস একটুকরো কাগজে সই করলেন। বার্তাবাহক ওই খামটা ডেমিরিসের হাতে তুলে দিলেন। বললেন–ধন্যবাদ।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস তার সেক্রেটারির দিকে তাকানে, বার্তাবাহক চলে গেল। সেক্রেটারিও চলে গেল। তিনি কিছুক্ষণ ওই এনভেলপের দিকে তাকিয়ে থাকলেন চিন্তিত মুখে। শেষে এনভেলপটি খুললেন। কী আছে ভেতরে? টেপ কী? অবাক লাগল। তিনি টেপপ্লেয়ারটাও দেখতে পেলেন। বোতামটা টিপলেন। টেপরেকর্ডার গমগমিয়ে শব্দ করতে শুরু করল।

নেপোলিয়ান ছোটাসের কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল–প্রিয় কোস্টা, এই ব্যাপারগুলো আপনার কাছে খুবই সহজ সরল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ফ্রেডারিক স্টাভরসের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটা আমি মন থেকে মুছতে পারছি না। এর মধ্যে একটা রহস্য আছে, সে বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত। আমি জানি না, এই ব্যাপারটা আপনার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত হবে কিনা। হায়, হতভাগ্য স্টাভরস, তাকে এইভাবে মরতে হল! ভবিষ্যতে আপনি কি আমাকেও হত্যা করতে চাইছেন? আমার জীবনটা আমার কাছে খুবই দামি। যেমন আপনার জীবনটা আপনার কাছে। আমি হয়তো আপনার পরবর্তী শিকার হব। তাই আমি সব কিছু খুঁটিনাটি লিখে রাখছি। নোয়েলে পেজ এবং ল্যারি ডগলাসের ব্যাপারে আমি যে কাজ করেছিলাম, এটা কি তারই শাস্তি? আমি একটি মুখবন্ধ এনভেলপের মধ্যে এই টেপটি ঢুকিয়ে রাখছি। এটিকে প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নির হাতে তুলে দেওয়া হবে। যদি কোনো কারণে আমার মৃত্যু হয়, অবিশ্বাস্যভাবে, দুর্ঘটনায়, তা হলে এই খামটি ভোলা হবে। হে বন্ধু, আমি এখনও বেঁচে থাকব। জানি না, ভবিষ্যতে কী লেখা আছে!

টেপ এখানেই শেষ হয়ে গেছে।

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস বসে থাকলেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে।

.

নেপোলিয়ান ছোটাস অফিস থেকে বিকেলবেলা বাড়িতে ফিরে এলেন। এখন আর তার ভয় করছে না। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস এক ভয়ংকর শয়তান। কিন্তু মানুষটি আসলে বোকা। তিনি কারোর কোনো ক্ষতি করতে পারেন না। অবশ্য কোনো কোনো সময় ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ছোটাস ভাবলেন, আমাকে আরও কৌশলী হতে হবে। নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন। আহা, বৃহস্পতিবারের ডিনার পার্টি,.. সেদিন থেকে নতুন কাজ শুরু করলে কেমন হয়?

.

কয়েকদিন কেটে গেল দারুণ ব্যস্ততার মধ্যে। নতুন একটা মার্ডার কেসের মামলা শুরু হয়েছে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর দুই রক্ষিতাকে হত্যা করেছে। ছোটাস রোজ সকালবেলা ওঠেন, মধ্যরাত অব্দি একনাগাড়ে কাজ করেন। ক্রস এগজামিনের প্রশ্নগুলি তৈরি করেন। তার মন কেবলই বলছে, এই ব্যাপারে তিনি আবার জয়যুক্ত হবেন।

বুধবার, রাত হয়েছে। তারপরেও অনেকক্ষণ ছোটাস অফিসে বসেছিলেন। তখন মধ্যরাত। তিনি গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে এলেন। রাত একটার সময় ভিলাতে এসে পৌঁছোলেন।

বাটলার বলল–মিঃ ছোটাস, আমি আপনার জন্য কিছু খাবার তৈরি করেছি। আপনি খাবেন কি?

না, অনেক ধন্যবাদ। আমি এখন শুতে যাব।

 নেপোলিয়ান ছোটাস বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। পরের দিন আবার অনেক সকালে উঠতে হবে। দুটোর সময় তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তিনি একটা স্বপ্ন দেখলেন।

তিনি কোর্টে দাঁড়িয়ে আছেন। এক সাক্ষীকে ক্রশ-এগজামিন করছেন। হঠাৎ ওই সাক্ষী তার জামাকাপড় ছিঁড়তে শুরু করল।

ছোটাস জিজ্ঞাসা করলেন–আপনি কেন এখন আচরণ করছেন?

–আমি নিজেকে শেষ করতে চাইছি।

ছোটাস জনাকীর্ণ কোর্টরুমের দিকে তাকালেন। দেখলেন, সকলেই নিজেদের উলঙ্গ করছে।

তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাননীয় মহাশয়, এই ব্যাপারে আমি আমার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

দেখলেন, বিচারকও তার পোশাক খুলে ফেলেছেন। তিনি বলছেন–এখানে বড্ড গরম।

 ছোটাসেরও মনে হল, সত্যিই তো বড্ড গরম এবং শব্দে পরিপূর্ণ।

নেপোলিয়ান ছোটাস চোখ খুললেন। ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে কী? ঘরের ভেতর এত ধোঁয়া কেন? বাইরে ওটা কী অগ্নিশিখা?

নেপোলিয়ান উঠে বসলেন। ঘুম ভেঙে গেছে তার।

বাড়িটায় আগুন লেগেছে। কিন্তু বিপদ ঘণ্টা বাজছে না কেন?

প্রচণ্ড তাপে দরজা গলে যাচ্ছে। ছোটাস জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর দমবন্ধ হয়ে আসছে। তিনি জানালা খোলার চেষ্টা করলেন। বোঝা গেল, সেটাকে শক্ত করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ধোঁয়া, আরও ধোঁয়া, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। পালাবার কোনো পথ নেই।

সিলিং-এ আগুন ধরে গেছে। একটা দেওয়াল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। আগুন ছুটে আসছে। এখনই তা ছোটাসকে গ্রাস করবে। ছোটাস চিৎকার করে উঠলেন। তার চুল এবং পাজামাতে আগুন ধরেছে। অন্ধের মতো তিনি ছুটোছুটি করতে শুরু করলেন। বন্ধ দরজায় পাগলের মতো আঘাত করলেন। জানালা খোলার চেষ্টা করলেন। কিছুই হল না। একটু বাদে তার জ্বলন্ত দেহটা ষোলো ফুট নীচের মাটিতে পড়ে গেল।

.

 পরের দিন সকালবেলা। স্টেট প্রসিকিউটার পিটার ডেমোনিডাসকে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের স্টাডি রুমে দেখা গেল।

ডেমিরিস বললেন–কালিমেহেরা পিটার, আপনি এসেছেন। আমি খুশি হয়েছি। বলুন। কী খাবেন?

–হ্যাঁ স্যার, তিনি ডেমিরিসের হাতে ওই বন্ধ এনভেলপটা তুলে দিলেন। নেপোলিয়ান । ছোটাস যেটা তাকে দিয়েছিলেন।

–আমার মনে হচ্ছে, এটাকে এখানেই রাখা দরকার।

–ঠিকই বলেছেন পিটার। আপনি কি ব্রেকফাস্ট খাবেন?

–হ্যাঁ, হলে ভালো হয়।

–কোস্টা, আমাকে কোস্টা বলে ডাকবেন। আপনার কাজের ওপর আমার নজর আছে। আমার মনে হয় ভবিষ্যতে আপনি আমার বন্ধু হবেন। আমার এই সংস্থাতে আপনাকে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দেব। আপনি আমার সঙ্গে কাজ করবেন কি?

পিটার ডেমোনিডাস হাত কচলাতে কচলাতে বললেন–হ্যাঁ, কোস্টা, আমি তাহলে খুবই খুশি হব।

তাহলে আসুন, ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

.

০৯.

লন্ডন

ক্যাথেরিনের সঙ্গে কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের নিয়মিত দেখা হয় ক্যাথেরিন বলেছিল, সপ্তাহে অন্তত একবার যেন তিনি দেখা করেন। ডেমিরিস কথা রাখেন। মাঝে মধ্যেই ভালো মন্দ উপহার পাঠান। ক্যাথেরিন কোনো কোনো সময় নিতে অস্বীকার করেন। কিন্তু কনস্ট্যানটিন বলেন- এগুলো হল ভালোবাসার স্মারক চিহ্ন।

ইভলিন জানিয়েছে, কীভাবে তুমি বাকসারের ব্যাপারটা সামলেছ। ইভলিনের কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি, তুমি অনেক খরচ বাঁচিয়ে দিয়েছ।

সত্যি কথা বলতে কি, নিজের কাজ নিয়ে ক্যাথেরিন এখন আনন্দে ডগমগ। অফিসের দিকে নানা উন্নতি হয়েছে। ফিরে এসেছে ক্যাথেরিনের পুরোনো সৌন্দর্যবোধ। প্রশাসনিক দক্ষতা। ক্যাথেরিন জানে, এইভাবে সে একদিন আরও উঁচুতে উঠতে পারবে।

ডেমিরিস বলেছিলেন- তোমার জন্য আমি গর্ব অনুভব করি।

এই কথায় ক্যাথেরিনের মুখে অহংকারের অভিব্যক্তি। আহা, ডেমিরিস সত্যি এক অসাধারণ পুরুষ! ওঁনাকে বিশ্বাস করা যায়।

.

এখন আমাকে আরও তৎপর হতে হবে, ডেমিরিস চিন্তা করলেন। স্টাভরস এবং ছোটাস পথ থেকে হারিয়ে গেছে। এখনও একজন আছে, সে হল ক্যাথেরিন।

ক্যাথেরিনের কাছ থেকে বিপদ আসতে পারে। এই ব্যাপারে আর বেশি দিন অপেক্ষা করা উচিত নয়। নেপোলিয়ান ছোটাস গোলমাল করার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে আর বাড়তে দেওয়া হয়নি। ডেমিরিস ভাবলেন, আহা, ক্যাথেরিন এত সুন্দরী, কিন্তু আর বেশি দিন নয়। অতএব এখন আমার গন্তব্য হওয়া উচিত রাফিনার ওই ভিলাটি।

ভিলাটি কিনে নেওয়া হয়েছে। ক্যাথেরিনকে নিয়ে সেখানে যেতে হবে। ভালোবাসার অভিনয় করতে হবে। ঠিক যেভাবে ল্যারি ডগলাস তার আদরিনী রক্ষিতা নোয়েলেকে ভালোবাসতো। তারপর…

.

মাঝে মধ্যে ক্যাথেরিন পুরোনো দিনের কথা মনে করে। লন্ডন টাইম-এ সে ফ্রেডারিক স্টাভরস এবং নেপোলিয়ান ছোটাসের মৃত্যুসংবাদ পড়েছে। এই নামগুলো তার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে আনছে কী? শুধু একটি তথ্য, ওরা ল্যারি ডগলাস এবং নোয়েলে পেজের কেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই রাতে ক্যাথেরিন আবার সেই ভয়ংকর স্বপ্নটা দেখল।

.

একদিন সকালবেলা, ক্যাথেরিন দেখল, খবরের কাগজে লেখা আছে

উইলিয়াম ফ্রেজার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি টুম্যানের সহকারী, লন্ডনে এসেছেন। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্যিক চুক্তিতে সই করবেন।

কাগজটা ক্যাথেরিন রেখে দিল। ভাবল, এখন কী করা উচিত? উইলিয়াম, ফ্রেজার, তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখন কী হবে?

ক্যাথেরিন অনেকক্ষণ ডেস্কে বসে রইল। সে নিজের দিকে তাকিয়ে হাসল। আবার খবরের কাগজের পাতার দিকে চোখ মেলে দিল। তার মানে? উইলিয়াম ফ্রেজার এখন লন্ডনে? এই পুরুষটিকে সে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল। আহা, সেই স্মৃতি সতত সুখের। পুরুষটি এখন লন্ডনে এসেছেন। আমি অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করব। ক্যাথেরিন ভাবল, খবরের কাগজের মতানুসারে তিনি এখন ক্লারিজে থাকবেন।

ক্যাথেরিন ওই হোটলের ফোন নাম্বার ডায়াল করল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। তার মনের ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন। একবার ভাবছে, অতীতকে জাগিয়ে তুলে কী লাভ? কিন্তু ফ্রেজারের সাথে অনেক দিন বাদে দেখা হবে, এই ব্যাপারটাই তাকে অস্থির করে তুলল। সে ফ্রেজারকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। আহা, ফ্রেজার যখন আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবেন তখন কী হবে? উনি কি একইভাবে আমাকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠবেন?

অপারেটর বলল–গুড মর্নিং, ক্লারিজ।

ক্যাথেরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–উইলিয়াম ফ্রেজারকে একবার দেবেন কি?

–আমি দুঃখিত, ম্যাডাম, আপনি তো বলেননি মিস্টার না মিসেস উইলিয়াম ফ্রেজার?

তিক্ত স্বপন,–এই কথা শুনে ক্যাথেরিনের মনে হল, কে বুঝি তার গালে সশব্দে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছে। হায়, কী বোকা আমি, এই সম্ভাবনার কথা কেন ভাবিনি!

–ম্যাডাম? 

না, ঠিক আছে।

 ক্যাথেরিন রিসিভারটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল।

অনেক দেরি হয়ে গেছে। কোস্টাই ঠিক বলেছে, অতীতকে অন্ধকারেই রাখা উচিত। তাকে আলোকিত সূর্যের সামনে আনলে মন আরও উদ্বিগ্ন এবং হতাশ হয়ে উঠবে।

.

নিঃসঙ্গতাকে আমরা কী বলতে পারি? নিঃসঙ্গতা আমাদের সব কিছু গ্রাস করে।

জীবনের আনন্দ এবং বেদনাকে সমানভাগে ভাগ করতে হয়। কিন্তু ক্যাথেরিন এমন একটা জগতের বাসিন্দা, যেখানে শুধুই অজানা আগন্তুকদের আনাগোনা। অন্য দম্পতিদের সুখী সম্পৃক্ত জীবনের দিকে সে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর তাকে ব্যথিত এবং মর্মাহত করে। কিন্তু সে কখনোই ব্যথার কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে না।

সে ভাবে, এই বিশ্বে আমিই একক মহিলা নই, আমি বেঁচে আছি, এটাই মস্ত বড় পাওনা আমার কাছে।

লন্ডনে বিনোদনের সহস্র উপকরণ সর্বদা থরে থরে সাজানো থাকে। লন্ডনের সিনেমা হলগুলিতে হলিউডি সিনেমার দাপাদাপি। ক্যাথেরিন মাঝে মধ্যে সেইসব সিনেমা দেখতে যায়। ইতিমধ্যে সে দি রেজরস এজ অ্যান্ড অ্যানা এবং দ্য কিং অফ সিরাম দেখে নিয়েছে। জেন্টলম্যানস এগ্রিমেন্ট ছবিটা তার মোটেই ভালো লাগেনি। ক্যারি গ্রান্টকে দ্য ব্যাচিলর অ্যান্ড দ্য ববি-সক্সার ছবিতে দারুণ দেখিয়েছে।

মাঝে মধ্যে ক্যাথেরিন অ্যালবার্ট হলে কনসার্ট শুনতে যায়। স্যাডলারস ওয়েলস-এ গিয়ে ব্যালে নাচ দেখে। স্ট্যাফোর্ড-আপোন অ্যাভোন-এ গিয়ে অ্যান্থনি হুইলিকে দেখে এসেছে। দ্য টেমিং অফ দ্য শ্রু-তে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। রিচার্ড থার্ডে স্যার লরেন্স অলিভারের অভিনয় তাকে পাগল করে দিয়েছে। কিন্তু সেখানে একা একা যেতে ভালল লাগে না।

আর তখনই তার জীবনের রঙ্গমঞ্চে কিক রেনল্ডস-এর প্রবেশ।

কির্ক লম্বা, আকর্ষণীয়। একদিন ক্যাথেরিনকে ডেকে সে বলল–আমি কির্ক রেনল্ডস। তুমি এত নিঃসঙ্গ কেন?

–আমি তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

 এ ভাবেই গল্পটা শুরু হয়েছিল।

.

কির্ক একজন আমেরিকান অ্যাটর্নি। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের হয়ে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ। বছর চল্লিশ বয়স। ওপর থেকে দেখলে মনে হয় খুবই গম্ভীর। বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখের অধিকারী। সব কাজ মন দিয়ে করতে ভালোবাসেন।

কির্ক রেনল্ডসের সাথে কথা হয়। ইভলিনের সাথেও আলোচনা হয়। ক্যাথেরিন জানতে চায়, কির্কের মধ্যে কী আছে বলো তো? তাকে না দেখলে মনটা কেমন হয়ে যায়।

ইভলিন বলেছিলেন- কির্ক সম্পর্কে আর বেশি আগ্রহী হয়ে উঠো না যেন। সব ব্যাপারে ভেবেচিন্তে পা ফেলবে।

ক্যাথেরিন প্রতিজ্ঞা করেছে, না, কিন্দ্রে প্রতি আমি আমার আসল মনোভাব কখনও প্রকাশ করব না।

.

একদিন কির্ক ক্যাথেরিনকে নিয়ে গেল লন্ডন শহরের এক প্রান্তে। তারা ওল্ড বেইলিতে গেল। বিচারসভায় গুরুত্বপূর্ণ ক্রিমিনালদের বিচার হয়েছে। তারা বিভিন্ন ল কোর্ট ঘুরে বেড়াল। ল কোর্টের প্রধান হলে তারা ব্যারিস্টারদের কালো গাউন পরে ছুটোছুটি করতে দেখল। নিউগেট প্রিজনেও তারা পা রেখেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি তৈরি হয়েছিল, রাস্তাটা আরও চওড়া করা হয়েছে।

ক্যাথেরিন বলেছিল–এইভাবে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে কেন?

–আরও বেশি লোক যাতে জেলখানাটা দেখতে পায়। একসময় এখানেই সর্বসমক্ষে ফাঁসির মঞ্চে মানুষকে ঝুলিয়ে দেওয়া হত।

ক্যাথেরিন শিউরে উঠেছে, ব্যাপারটা এত বীভৎস!

.

সন্ধ্যেবেলা। কিক ক্যাথেরিনকে নিয়ে গেছে ইস্ট ইন্ডিয়ার ডক রোডে। কিছুদিন আগে এখানে ক্রিমিনালদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হত।

জায়গাটা ফাঁকা এবং নিষিদ্ধ। ক্যাথেরিনের কাছে মনে হল এটা বুঝি এখনও ভয়ংকর! একদিন তারা প্রসপেক্ট অফ হুইটবি-তে গিয়ে ডিনার সারল। ইংল্যান্ডের অত্যন্ত পুরোনো শুড়িখানা। ব্যালকনিতে বসে থাকা যায়, তাকিয়ে থাকা যায় টেমসের দিকে।

লন্ডন পাবের অস্বাভাবিক নামগুলো ক্যাথেরিনকে আকর্ষণ করে। সে ভাবতে থাকে এই পাবের সাথেই লন্ডন শহরের সভ্যতা জড়িয়ে আছে।

কির্ক জিজ্ঞেস করেছিল–ছোটোবেলায় তুমি কি এসব জায়গাতে এসেছ?

ক্যাথেরিন জবাব দেয় না, আমি এসব জায়গার নামও শুনিনি।

সময় কেটে যাচ্ছে। আহা, ছোটোবেলার ছড়া মনে পড়ে যাচ্ছে। ক্যাথেরিন হেসে উঠেছে। কির্কের ব্যবহারের মধ্যে ছেলেমানুষি আছে। তারপর? কথা বলতে বলতে কির্ক হঠাৎ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। সে বলে- আমি সেন্ট মরটিজ-এ যাব। সেখানে স্কি খেলার ব্যবস্থা আছে। ক্যাথেরিন, তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?

কির্ক উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে।

-না, আমি জানি না জুটি পাব কিনা?

–বলল না আমার সঙ্গে যাবে কিনা?

–হ্যাঁ। ক্যাথেরিনের সমস্ত শরীর কাঁপছে। ল্যারিকে সে একদা ভালোবেসেছিল। এখন আবার নতুন কাউকে ভালোবাসা দান করবে কেমন করে?

.

শেষ পর্যন্ত ক্যাথেরিন ঠিক করল, সে কির্কের সাথে উইমের আলাপ করাবে।

উইমকে তার ফ্ল্যাট থেকে তুলে নেওয়া হল। আইভিতে ডিনারের আসর বসেছে। সমস্ত সন্ধ্যে ধরে উইম কির্কের দিকে তাকায়নি। মনে হয়েছে, সে বোধহয় অসহায় অবস্থার মধ্যে আছে। কির্কও এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেনি।

শেষ অব্দি উইমের পেছনে লাগা হল।

–উইম, এই শহরটা তোমার কেমন লাগে?

–ভালোই লাগে।

–তোমার প্রিয় শহর কোনটা?

এই পৃথিবীতে আমার কোনো প্রিয় শহর নেই।

–তুমি তোমার কাজ ভালোবাসো?

–হ্যাঁ, আমি কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চাই।

 কির্ক ক্যাথেরিনের দিকে তাকিয়েছে। কাঁধ ঝাঁকানি দিয়েছে।

 ক্যাথেরিন চোখের ইঙ্গিতে চুপ করতে বলেছে।

 কির্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। উইমের দিকে তাকিয়ে বলেছে- রবিবার আমি গল খেলব, তুমি আসবে কি?

উইম বলেছে–গলফ হল মাথার ওপর লোহা বসানো এক ধরনের খেলা।

তারপর বকবক করে অনেক কথাই বলে গেছে। কির্ক রেনল্ডস তার দিকে তাকিয়ে বলেছে- সত্যি তোমার মনের প্রশংসা না করে পারছি না।

ক্যাথেরিন বলেছে- ও কোনোদিন গলফ খেলার আসরে যায়নি। কিন্তু চোখ বন্ধ করে গলফ সম্পর্কে একশো কথা বলতে পারে।

উইমের বুদ্ধির দৌড় পরীক্ষা করার জন্য বলেছে তুমি কি দুই-এর ঘাড়ে উনষাটের আসল অঙ্ক কত বলতে পারবে?

এক মুহূর্তে উইম জবাব দিয়েছে ৫৭৬, ৪৬০, ৭৫২, ৩০৩, ৪২৩, ৪৮৮।

কির্ক বলেছে- হায় জেসাস, এটা কি সত্যি?

উইম বলেছে–হা তুমি একবার অঙ্কটা কষেই দেখোনা।

তারপর? প্রশ্নোত্তরের পালা এগিয়ে গেছে। সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে উইম এক জীবন্ত কিংবদন্তী।

কির্ক ক্যাথেরিনকে তার অফিসে ছেড়ে দিয়েছে। বলেছে- আশা করি, আমাকে তুমি ভুলবে না।

সেই রাতেই কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস ফোন করেছিলেন। ক্যাথেরিন ভেবেছিল, কির্ক সম্পর্কে সব কথা বলবে। শেষ মুহূর্তে সে তার মত পরিবর্তন করল। কেন, সে তা নিজেই জানে না!

.

১০.

 এথেন্স

ফাদার কনস্ট্যানটিনিউ অবাক হয়ে গেলেন। খবরের কাগজের পাতায় তিনি ফ্রেডারিক স্টাভরসের মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনী পড়েছেন। জীবনে অনেক স্বীকারোক্তির সাক্ষী তিনি। ফ্রেডারিক স্টাভরসের নাটকীয় স্বীকারোক্তির যে এমন চরম পরিণতি হতে পারে, তিনি তা ভাবতেও পারেননি!

কী নিয়ে এত চিন্তা করছেন স্যার?

পাশে যে ছেলেটি উলঙ্গ হয়ে শুয়েছিল, সে প্রশ্ন করল।

 ফাদার বললেন–না, নানা কারণে মনটা আমার ভালো নেই।

–আমি তো আপনাকে কখনও এমন চিন্তাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখিনি?

জর্জিয়াস একটা ব্যাপারে আমার মনটা খুবই খারাপ।

–কী ব্যাপার, বলবেন কি?

–একজন এসেছিলেন স্বীকারোক্তি দিতে। তারপরেই অটোমোবাইল অ্যাকসিডেন্টে উনি মারা গেছেন।

–এটা এত ভাববার কী আছে? আমাদের সকলকেই তো একদিন চলে যেতে হবে!

 কিন্তু, এই মানুষটির অতীত খুব একটা সুবিধার ছিল না।

তার মানে? মাথার গোলমাল ছিল?

–না, উনি এমন একটা গোপন খবর জানিয়েছেন, যার বিরাট ভা, উনি আর বহন করতে পারছিলেন না।

– কী ধরনের গোপন খবর?

পাদরি সাহেব এবার ওই যুবা মানুষটির গায়ে হাত রাখলেন বললেন–বুঝতেই তো পারছ, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি মোটেই আলোচনা করতে পারি না। সেটা ধর্মবিরোধী কাজ হবে।

আমাদের মধ্যে এমন কোনো গোপনীয়তা থাকা উচিত নয়।

–ঠিকই বলেছ তুমি, তবুও…

–তাহলে? ব্যাপারটা তো ওখানেই শেষ করে দেওয়া উচিত।

না,…পাদরি সাহেব আমতা আমতা করতে থাকেন।

জর্জিয়াস এবার জানতে উৎসুক আমি জানতে চাই সত্যি কী ঘটনা ঘটেছে?

জর্জিয়াস লেটো.এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। এথেন্সের বস্তি অঞ্চলে তার জন্ম হয়েছিল। বারো বছর বয়সে সে পুৰ। গণিকা হয়ে ওঠে। পথে ঘুরে ঘুরে কাজ করত। কয়েক ডলারের জন্য জঘন্য সংযোগে নিজেকে নিয়োগ করত। অনায়াসে চলে যেত ট্যুরিস্টদের ডাকে। হোটেল রুমে। লেটো দেখতে সুন্দর, ঈশ্বর প্রদত্ত শরীর, সহজাত আকর্ষণ আছে।

ষোলো বছর বয়সে, এক পুরুষবেশ্যা তাকে বলেছিল- আহা, তুমি এমনভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো, আমি তোমাকে আয়ের একটা নতুন দিগন্ত খুলে দেব।

লোকটা তার কথা রেখেছিল। সেই মুহূর্ত থেকে জর্জিয়াসের ভাগ্য পালটে গেল। সে শুধু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাহচর্য দিতে থাকল। এর জন্য তাকে যথেষ্ট অর্থ দেওয়া হল। শেষ অব্দি তার সঙ্গে নিকোস ভেরিটোজের দেখা হয়। উনি হলেন স্পাইরস লামব্রো নামে এক বিশিষ্ট বিজনেস টাইফুনের ব্যক্তিগত সহকারী। লেটোর লাইফ আরও পালটে গেল।

নিকোস ওই তরুণটিকে বলেছিল- আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি এইভাবে ঘুরে ঘুরে আর বেশ্যাবৃত্তি করতে পারবে না। তুমি এখন থেকে আমারই থাকবে।

নিকি, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।

ভেরিটোজ এই ছেলেটিকে নানা ধরনের উপহার দিতে শুরু করেন। দামি জামাকাপড় কিনে আনেন। তার জন্য একটা ছোটো অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করেন। খরচ করার মতো যথেষ্ট অর্থ তুলে দেন তার হাতে। কিন্তু ছেলেটি সত্যি সত্যি কথা রেখেছে কিনা, তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তিনি জানতে পারলেন, ছেলেটি অন্য জায়গায়তে গিয়ে খুচরো কাজ করছে। ব্যাপারটি তাকে বিব্রত করেছিল।

এই সমস্যা সমাধান করার জন্য একদিন নিকোস বললেন–স্পাইরস লামব্রোর কোম্পানিতে তোমাকে একটা চাকরি দেব।

–এইভাবে আপনি আমায় চোখে চোখে রাখবেন। কী তাই তো?

ব্যাপারটা এভাবে ভেবো না সুইটহার্ট। আমি তোমাকে আমার কাছে চাইছি।

জর্জিয়াস লেটো প্রথমে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল। শেষ পর্যন্ত পারেনি। কোম্পানিতে ঢুকে পড়ল সে। মেলরুমে ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করতে শুরু করল। আবার এই কাজেও দক্ষতা অর্জন করে ফেলল। অতিরিক্ত টাকার আশায় নামি-দামি ক্লায়েন্টদের চারপাশে ঘুর ঘুর করতে লাগল। এইভাবেই ফাদারের সঙ্গে তার পরিচয়।

.

বিকেল হব হব। জর্জিয়াস লেটো বিছানা ছেড়ে উঠল। তার মনের সমুদ্রে আলোড়ন চলছে। পাদরি সাহেব কোন্ ঘটনাটা তাকে বলতে চাইছে না? জর্জিয়াস বুঝতে পেরেছে, নিশ্চয়ই এই খবরটা পেলে কিছু টাকা আয় হতে পারে। নিকোস ভেরিটোজের কাছে সব কিছু খুলে বললেই হবে।

মনের ভেতর তার স্বপ্নের উড়ানপাখি। কিন্তু স্বীকারোক্তির অন্তরালে কী আছে?

.

পরের দিন সকালবেলা। লেটো হাঁটতে হাঁটতে স্পাইরস লামব্রোর রিসেপশন অফিসের দিকে এগিয়ে গেল।

ডেস্কের আড়ালে বসে থাকা সেক্রেটারি জানতে চাইলেন–কী ব্যাপার এত সকালে? কোনো ডাক এসেছে নাকি জর্জিয়াস?

জর্জিয়াস মাথা নেড়ে বলল–না ম্যাডাম, মিঃ লামব্রোর সঙ্গে একবার দেখা হবে কি?

মেয়েটি হাসলেন।

– সত্যি বলছ? কী ব্যাপারে দেখা করতে চাইছ? নতুন কোনো ব্যবসার প্রস্তাব নাকি?

মেয়েটি মাঝে মধ্যে জর্জিয়াসের পেছনে লাগতে ভালোবাসেন।

জর্জিয়াস বলল–সেরকম কিছু নয়। আমার মা মৃত্যুশয্যায়, আমাকে বাড়ি যেতে হবে।

–মিঃ লামব্রোকে আমি চাকরি দেবার জন্য ধন্যবাদ জানাব। এক মিনিটের বেশি সময় লাগবে না। অবশ্য যদি উনি খুব ব্যস্ত থাকেন, তাহলে…

জর্জিয়াস পেছন দিকে হাঁটা দিতে শুরু করল।

একটু দাঁড়াও। আমার মনে হয় তোমার আগমনে উনি মোটেই রাগ করবেন না।

 দশ মিনিট কেটে গেছে। জর্জিয়াস এখন স্পাইরস লামব্রোর অফিসে দাঁড়িয়ে আছে। অফিসের ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্র সে কখনও পায়নি। তার মনে লেগেছে অজানা উত্তেজনা।

-ঠিক আছে, তোমার মায়ের সংবাদ শুনে আমার খুবই খারাপ লাগছে। তোমার হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া দরকার, তাই তো?

–আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার, কিন্তু ঠিক এর জন্য আমি এখানে আসিনি।

লামব্রো ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছি না।

–মিঃ লামব্রো, আপনার জন্য কিছু খবর আছে আমার থলিতে। মনে হচ্ছে, খবরটা আপনাকে শোনানো উচিত।

লামব্রোর মুখের ভাব কী হল, জর্জিয়াস সেটা দেখার চেষ্টা করল।

কী খবর? আমি এখন খুবই ব্যস্ত। মনে হচ্ছে তুমি…

কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের ব্যাপারে।

শব্দগুলো জর্জিয়াস বলেই ফেলল।

–আমার একজন ভালো পাদরি বন্ধু আছেন। তিনি একজনের স্বীকারোক্তি শুনেছেন। এর ঠিক পরে পরেই ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছে গাড়ি দুর্ঘটনাতে। যিনি মারা গেছেন, তার স্বীকারোক্তিটা কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসকে কেন্দ্র করে। ডেমিরিস একটা মারাত্মক খারাপ কাজ করেছেন। এর জন্য তাকে জেলখানায় বন্দি করা উচিত। তবে যদি আপনি শুনতে না চান…

স্পাইরস লামব্রো এত অব্দি শুনে অবাক হয়ে গেলেন। ছেলেটা বলছে কী? তিনি বললেন–বসো…তোমার নাম কী?

–লেটো স্যার, জর্জিয়াস লেটো।

–ঠিক আছে, তুমি গল্পটা শুরু থেকে বলো।

.

বিয়েটা খুব একটা ভালো হয়নি কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস এবং মেলিনার মধ্যে। কোনোরকমে দিন কেটে গেছে। তবে কিছু দিন আগে অব্দি শারীরিক আঘাতের ঘটনা ঘটেনি।

একদিন সেটাও ঘটে গেল। শোনা গেল ডেমিরিস নাকি মেলিনার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সাথে শারীরিকভাবে সংযুক্ত।

তুমি যে-কোনো মেয়েকে বেশ্যা বানিয়ে দাও। তোমার স্পর্শ আমার খারাপ লাগে। আমি তোমাকে ঘেন্না করি। মেলিনা চিৎকার করে বলেছিলেন।

–চুপ, তোমার মুখখানা বন্ধ করবে কি?

না, তুমি আমাকে চুপ করাতে পারবে না। সারা পৃথিবীর কাছে আমি চিৎকার করে বলব, তোমার আসল চেহারাটা কেমন। আমার ভাই ঠিকই বলেছিল। তুমি একটা নররাক্ষস।

ডেমিরিস এই কথা শুনে এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি মেলিনার গালে সজোরে আঘাত করেছিলেন। আহত মেলিনা ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

পরবর্তী সপ্তাহে আরও একটা খারাপ ঘটনা ঘটে গেল। তুচ্ছ কারণে ঝগড়া বেধে গেল। সেদিন ডেমিরিস আবার আঘাত করলেন। মেলিনা ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন। অ্যাটিকসের দিকে যাত্রা করলেন এবোপ্লেনের সওয়ার হয়ে। এই ছোট্ট দ্বীপটি তার ভাইয়ের। তিনি ঠিক করেছেন, সেখানে এক সপ্তাহ থাকবেন একা একা এবং বিষণ্ণতার মধ্যে। স্বামীর সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হবেন ভেবে তিনি দুঃখিত হলেন। এমনও ভাবলেন, না, আবার স্বামীর কাছেই ফিরে যাই।

 এটা হল আমার ভুল সিদ্ধান্ত, মেলিনা ভেবেছিলেন, আমি বোধহয় কোস্টাকে মানিয়ে নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে সে আমাকে আঘাত করার জন্য এ কাজটা করেনি। হয়তো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। মুখ ফসকে খারাপ খারাপ কথা বেরিয়ে গেছে। কোস্টা যদি আমাকে দেখাশোনা না করে তাহলে কী হবে?

মেলিনা এইভাবেই মনকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করেছিলেন। তখনও পর্যন্ত তিনি বিয়েটাকে ভাঙতে চাননি। পরের রোববার মেলিনা বাড়িতে ফিরে এলেন।

তখন ডেমিরিস লাইব্রেরিতে ছিলেন।

মেলিনাকে দেখে তিনি বললেন–তাহলে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসাটাই স্থির করলে?

–এটা আমার বাড়ি কোস্টা, তুমি আমার স্বামী, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তবে একটা কথা পরিষ্কারভাবে শুনে নাও, যদি আবার কখনও আমাকে আঘাত করার চেষ্টা করো, তাহলে আমি কিন্তু তোমাকে খুন করে ফেলব।

ডেমিরিস তাকালেন তার স্ত্রীর চোখের দিকে। হ্যাঁ, চোখের ভাষাটা এই কদিনে একেবারে পালটে গেছে।

.

একটু অদ্ভুতভাবে হলেও, তাদের দাম্পত্যজীবন এই ঘটনার পর থেকে খানিকটা হলেও ভালো হল। শেষ পর্যন্ত কনস্ট্যানটিন ঠিক করলেন, না, এইভাবে আর কখনও উদ্ধত আচরণ করবেন না। তবে বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমের ঘটনাগুলো তখনও ঘটে চলেছে। মেলিনা সেগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছেন না। মেলিনা জানেন, কোন্ কোন মহিলার সাথে কনস্ট্যানটিনের শারীরিক সম্পর্ক আছে। তবে তখনকার মতো তিনি সব কিছু ভুলতে চেয়েছিলেন। তিনি এই ভেবে নিজের অশান্ত মনকে আশ্বস্ত করলেন যে, স্বামী আমাকে ছাড়া আর কোনো মেয়েকে ভালবাসে না।

.

শনিবার বিকেলবেলা, কনস্ট্যানটিন ডেমিরিস ডিনার জ্যাকেট পরেছেন। এখুনি বেরিয়ে যাবেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মেলিনা ছুটে এলেন।

–তুমি এখন কোথায় চলেছ?

-অ্যামার একটা এনগেজমেন্ট আছে।

–তুমি ভুলে গেছ, স্পাইরসের সাথে আজ আমরা ডিনার খেতে যাব।

–না আমি ভুলিনি, কিন্তু হঠাৎ একটা দরকারি কাজ এসে পড়েছে।

এই কথা শুনে মেলিনা খুবই অবাক হয়ে গেলেন। রাগত স্বরে বললেন আমি জানি, শয়তানের বাচ্চা, তুমি তোমার এক রক্ষিতার সাথে ফুর্তি লুটতে যাচ্ছ তো?

–আবার বলছি, ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখো। নিজের আচরণটা কেমন, তা কি একবার ভেবে দেখেছ মেলিনা?

ডেমিরিস আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে মন্তব্য করলেন।

-না, আমি তোমাকে স্পাইরসকে অপমান করতে দেব না। আমরা দুজনেই আজকে বাড়িতে থাকব।

কিন্তু স্বামীকে আটকাবেন কী করে? একটি মাত্র অস্ত্র তখনও মেলিনার হাতে ছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক ভেবেচিন্তে তিনি সেই অস্ত্রটা প্রয়োগ করলেন। যদিও সেটা কার্যকরী হবে কি না, তা তিনি জানতেন না।

মলিনা আবার বললেন–আজ রাতে আমাদের দুজনেরই বাড়িতে থাকা উচিত।

 ডেমিরিস উদাসীনভাবে জানতে চাইলেন কেন?

-তুমি জানো না আজকের রাতটা কেন স্মরণীয়?

না।

–এই রাতেই আমি তোমার পুত্রকে হত্যা করেছিলাম কোস্টা। বলতে পারো আজ সেই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ষপূর্তি উৎসব। এই রাতেই আমি গর্ভপাত করাতে বাধ্য হয়েছিলাম।

কথাগুলো বিষ তীর হয়ে আঘাত করেছে ডেমিরিসকে। মনে হল তিনি যেন বজ্রাহত। এর আগে কোনোদিন মেলিনা স্বামীকে এইভাবে ভেঙে পড়তে দেখেননি।

–আমিই ডাক্তারকে বলেছিলাম অপারেশনটা এমনভাবে করতে যাতে ভবিষ্যতে আর কখনও তোমার সন্তানের গর্ভ, আমাকে ধারণ করতে না হয়।

মেলিনা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা বললেন।

এবার ডেমিরিস তার আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন। বুনো শয়তানের মতো তিনি ছুটে এলেন। বারবার মেলিনাকে আঘাত করতে থাকলেন। দেহের সর্বত্র।

মেলিনা আর্তনাদ করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে হলের দিকে নেমে গেলেন। বুনো শুয়োরের মতো কনস্ট্যানটিন তাকে অনুসরণ করলেন। চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালে ঠুকে দিলেন।

চাপা গর্জন করে উঠলেন–এর জন্য তোমাকে আমি খুন করে ফেলব, শয়তানি হতভাগী! মেলিনা টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন, সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে।

অনেকক্ষণ তিনি পড়েছিলেন, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। হায় ঈশ্বর, মনে হচ্ছে আমার হাড়গোড় সব ভেঙে গেছে!

ডেমিরিস কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়ালেন, বললেন আমি একজন ঝি-কে বলছি ডাক্তার ডেকে আনতে। তোর জন্য আমি আমার সন্ধ্যেটা নষ্ট করব না।

.

নৈশভোজের আগে টেলিফোন আর্তনাদ করে উঠল।

মিঃ লামব্রো, আমি ডঃ মেটাক্সিস বলছি। আপনার বোন আপনাকে ফোন করতে বলেছেন। তিনি আমাদের প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমার মনে হচ্ছে, ওঁর বোধহয় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে…

স্পাইরস লামব্রো মেলিনার হাসপাতালের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। মেলিনার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মেলিনার একটা হাত ভেঙে গেছে। সমস্ত দেহে অসহ্য যন্ত্রণা। মুখ ভীষণভাবে ফুলে উঠেছে।

স্পাইরস লামব্রো বললেন কনস্ট্যানটিন! রাগে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠেছিল।

মেলিনার চোখে জল।

–ইচ্ছে করে ও কিন্তু আমাকে আঘাত করেনি। ফিসফিস করে মেলিনা বললেন।

–আমি শপথ নিচ্ছি, লোকটাকে পৃথিবী থেকে তাড়িয়ে ছাড়ব। এটাই আমার শেষ শপথ।

স্পাইরস লামব্রোকে এতটা রাগ করতে কেউ কখনও দেখেনি। কনস্ট্যানটিন ডেমিরিসের কার্যকলাপ সহ্যের বাইরে চলে গেছে। কীভাবে তাকে নিবৃত্ত করা যায়? অনেকগুলো পন্থা আছে। চোখ বন্ধ করে স্পাইরস ভাববার চেষ্টা করলেন। কারোর সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু কার কাছে যাওয়া যায়? একটাই নাম মনে পড়ল, মাদাম পিরিস। ভদ্রমহিলা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিণী। ওঁর কাছে গিয়ে একটা পরামর্শ নিতে হবে।

লামব্রো ভাবতে থাকেন, বন্ধুদের কাছে মুখ দেখাতে পারব না, শেষ পর্যন্ত আমি এক জ্যোতিষী মহিলার শরণাপন্ন হয়েছি। অবশ্য মাদাম পিরিস আমার জীবনে অনেকগুলো শুভ ঘটনার সাক্ষী। ওঁর কিছু আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। এখন আমি ওঁর কাছেই সাহায্য চাইব।

কাফের আলো-আঁধারির মধ্যে এক কোণে মাদাম বসে আছেন। কয়েক বছরে বয়েসটা তাঁর অনেক বেড়ে গেছে।

-মাদাম পিরিস, আমি আপনার সাহায্য চাইছি। মিঃ লামব্রো বললেন।

 মাদাম পিরিস জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।

–কীভাবে শুরু করা যায়? দেড় বছর আগে একটা খুনের মামলা শুরু হয়েছিল। ক্যাথেরিন ডগলাস নামে এক ভদ্রমহিলা…।

মাদাম পিরিসের মুখ চোখ পালটে গেছে। উনি জোর গলায় বললেন–না!

স্পাইরস লামব্রো তাকিয়ে থাকলেন ওঁর মুখের দিকে–ভদ্রমহিলাকে হত্যা করা হয়েছিল!…

মাদাম পিরিস উঠে দাঁড়ালেন–না, উনি এখনও বেঁচে আছেন।

স্পাইরস লামব্রো অবাক হয়ে গেছেন ওঁর তো মরে যাবার কথা। ওঁকে হত্যা করা হয়েছিল।

-না, উনি বেঁচে আছেন।

-মাদাম পিরিসের এই কথাগুলো শুনে স্পাইরস অবাক হয়ে গেছেন–এটা হতে পারে না!

উনি এখানে এসেছিলেন। কয়েকমাস আগে। কেউ বা কারা ওঁকে একটা কনভেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

শব্দগুলো অচেনা অজানা ঠেকছে স্পাইরসের কাছে। মনে হচ্ছে, তিনি যেন নিজেকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলছেন। –কেউ বা কারা ওঁকে কনভেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিল?– এটা ডেমিরিসির একটা প্রিয় খেলা, আওয়ানানি কনভেন্টে উনি মাঝে মাঝে কিছু অর্থ দান করে থাকেন। এই শহরেই ক্যাথেরিন ডগলাসকে হত্যা করা হয়েছে। অন্তত যতদূর খবর আছে তার কাছে। জর্জিয়াস লেটোর কাছ থেকে সেই খবরটা স্পাইরস পেয়েছিলেন। কিন্তু? ডেমিরিস দুজন মানুষকে পাঠিয়েছিলেন ক্যাথেরিনকে হত্যা করার জন্য। ব্যাপারটা সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

লামব্রো ভাবতেই পারছেন না, এবার কী করবেন! হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তার।

তখনই মনে পড়ে গেল আর একটি নাম–টনি রিজোলি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *