দি পেল হর্স – ১

প্রথম অধ্যায় 

মার্ক ইস্টারব্রুকের কথা 

এসপ্রেসো যন্ত্রটা ক্রুদ্ধ সর্পিণীর মতন হিস হিস শব্দে গজরাচ্ছিলো আমার ঠিক কাঁধের পিছনে। এ শব্দ আমার কাছে অশুভ বলে মনে হচ্ছিল। আমার মনে হয় আমাদের সময়কার সব শব্দের মধ্যেই রয়েছে এই একই অশুভের অনুমান। আকাশের বুকে জেট প্লেনগুলো দ্রুতগতিতে ক্রুদ্ধ আর্তনাদের ভীতি প্রদর্শন, সুড়ঙ্গ পথে আগুয়ান টিউব ট্রেনের ধীরগতির ভয়প্রদর্শনকারী গুম গুম শব্দ, বাড়ি ঘরদোরের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া রাজপথে চলমান ভারি পরিবহণ ট্রাকগুলোর আওয়াজ…এমন কি এই যুগের রান্নাঘরের সাড়াশব্দ, যদিও সেই কাজগুলো মঙ্গলকর তবুও সেগুলো একধরনের সতর্কতা সূচকধ্বনি। কাপ ডিস ধোয়ার মেশিন রেফ্রিজারেটর সমূহ রান্নার প্রেসার কুকাররা ছিচকাঁদুনে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারস। 

‘সাবধান’–এই সব যন্ত্রগুলো মনে হয় সবই আওড়ায়। তোমাদের সেবা করার জন্য তোমাদের হাতেই বন্দী আমি। আমার ওপর তোমাদের নিয়ন্ত্রণ যদি একবার খসে পড়ে…। এই সংসার এবং জগৎ সত্যিই বিপজ্জনক। আমার চোখের সামনে ধোঁয়া ওঠা কাপটা চামচ দিয়ে নাড়লাম। বড় সুন্দর এবং সুখকর গন্ধ। আর কি দেওয়ার আছে আপনাকে। পাকা কলা এবং লবণ মাখানো শুয়োরের মাংসের স্যাণ্ডউইচ আছে আপনাকে দেব কি? এই খাদ্যটা একেবারে আমার কাছে বিপরীতধর্মী। শৈশবের স্মৃতিতে আমার পাকা কলার কথা মনে পড়ে যায়। এ ছাড়া মাঝে মাঝে মদ্যপানের সাথে চিনি মেশানো পাকা কলার টুকরো মুখে ফেলি। লবণ মাখানো শুয়োরের মাংসের কথা মনে পড়লে ডিমের কথা মনে পড়ে যায়। তবে চেলসায় যখন আছি সেখানকার লোকেরা যেরকম খাদ্য খাবে ঠিক সেইরকম খাদ্য আমাকে খেতে হবে। কাজেই খাসা পাকা কলা আর লবণ মাখানো শুয়োরের মাংসের স্যাণ্ডউইচ খেতে আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমি এখন চেলসার বাসিন্দা। আজ তিন মাস ধরে আমি আসবাব পত্র কিনে ফ্ল্যাট জোগাড় করেছি। সবদিক থেকে বিচার করতে গেলে আমি এখন একদম ভিনদেশী আহেলি আদমি। মুঘল আমলের শিল্পের উপর আমি একখানা বই লিখেছি। এই বই লেখার জন্য হ্যামস্টেড, ব্রুমসবেরি, স্ট্রেথাম বা চেলসাতে থাকা যায়। এই রকম সুবিধে, অসুবিধে সব জায়গাতেই আছে। আমার পোশাক পরিচ্ছদ ছাড়া, পারিপার্শ্বিক অবস্থা আমার ভাবনাচিন্তায় নেই। আর যেখানে আমি বসবাস করি সেই পাড়ার লোকেরা আমার সম্বন্ধে একদম উদাসীন। তাই আমি নিজের দেশেও আজ বন্দী হয়ে আছি। সব লেখকই মাঝে মাঝে আকস্মিক বিতৃষ্ণা মনে করেন। আমার মনও সেই সন্ধ্যেবেলায় বিতৃষ্ণায় ভরে উঠেছিল। মুঘল স্থাপত্যশিল্প, মুঘল সম্রাটগণ, মুঘল জীবনচর্চার পদ্ধতি এই আজব সমস্যাগুলো আমার মনের পটে ফুটে উঠেছিল। এগুলোতে আমার কিছু আসে যায় না। এদের সম্বন্ধে কেন আমি লিখছি? যে পৃষ্ঠাগুলো আমি লিখেছি সেগুলোর উপর আমি চোখ বুলাতে লাগলাম। মনে হলো সব লেখাই আমার বাজে। নিচুদরের লেখা আমার মনে কখনো কৌতূহলের স্থান নেয় না। হেনরি ফোর্ড বলেছিলেন ইতিহাস পলায়ন প্রবৃত্তি জাগায় এটা একেবারে সত্যি কথা। বিতৃষ্ণায় পাণ্ডুলিপিখানা সরিয়ে উঠে পড়লাম। ঘড়িতে তখন এগারোটা বাজে। ডিনার খেয়েছি কিনা সেটাও আমার একটা ভাবনা। না খেয়েছি তো এ্যাথেনাস হোটেলে। সে তো অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছে। উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখলাম কিছু শুকনো খাবার পড়ে আছে। সেই খাবার দেখেও ভক্তি আসে না। ওই খাবারের দিকে আর নজর দিলাম না। এ জন্যই কিংস রোডে বেরিয়ে পড়লাম। ঘুরতে ঘুরতে একটা কফির দোকানে এসে হাজির হলাম। দোকানের নামটা বেশ বড় হরফে লেখা বেশ জ্বলজ্বল করছে, লুইজি। তারপর লবণমিশ্রিত শুয়োরের মাংস ও পাকা কলার তৈরি স্যাণ্ডউইচ সামনে নিয়ে ভাবছি—আধুনিক কালের নানাধরনের ভয়ানক শব্দ আমাদের পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার উপরে প্রভাব ছড়াচ্ছে। ভাবছিলাম এদের সবগুলোর সাথে আমার শৈশবকালের দেখা ছায়া শরীরদের স্মৃতির কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে। ধোঁয়ার মেঘের মধ্যে বন্দী বাক্স থেকে ডেভী জোনস আসছে। দরজা জানলাগুলো দিয়ে অশুভ শক্তি বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, সৎপরী ডারমণ্ডকে আসতে বাধা দিচ্ছে, এ ছাড়া আরো রয়েছে কত নাম। তারা এর বদলে অপ্রতুল দর্শন যাদুদণ্ড দোলাচ্ছে। এবং সততারই পরিণামে হবে জয় সেই মন্ত্র মোটা গলায় আওড়াচ্ছে, এমনিভাবে অপরিহার্য মুহূর্তের গান আগে গাইছে—অথচ এর সঙ্গে ওর বিশেষ ছায়া শরীরের কাহিনীর কোনো যোগই নেই। সহসা মনে আসে, অশুভ সব সময় ছিলো, মনে হয় শুভর চেয়ে অশুভের আকর্ষণ অধিক। নিজেকে তাই অশুভ প্রকাশ করে, দেখায়, চমকে দেয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান জানায়। এটা হচ্ছে স্থায়িত্বকে অস্থায়িত্বের আক্রমণ। স্থায়িত্ব সবসময় জয়লাভ করবে। স্থায়িত্বই সৎপরী ডারমণ্ডের অতিপ্রচলিত কাহিনীকে বাঁচিয়ে রেখেছে—মোটা গলার স্বর, মন্ত্রপাঠ, অপ্রাসঙ্গিক কণ্ঠস্বর, পাহাড় থেকে নেমে আসা যাদুদণ্ড আসছে পুরানো পৃথিবী শহরের বুকে, যে শহরকে আমি ভালোবাসি-এই সব থাকা সত্ত্বেও বাঁচিয়ে রেখেছি। মনে হয় এই অস্ত্রগুলো খুবই দুর্বল কিন্তু তবু এই অস্ত্রগুলো অপরিহার্য থাকবে। শরীরের স্মৃতি সবসময় যেমন মিলিয়ে যাবে। সিঁড়িতে ওঠানামার যে ধাপ, সৎপরী ডারমণ্ডের আবির্ভাব, খৃষ্টধর্মের বিনয় প্ৰদৰ্শন এই সবগুলির আসার জন্য ঠেলাঠেলি নয়, আসছে সার বেঁধে, পাশাপাশি, বিরোধের সাথে। এখন আর গর্জনরত দানবকে চোখে পড়ছে না। বরং নজরে পড়লো একজন লোককে যার পরণে ছিলো লাল আঁটোসাঁটো পোশাক। এসপ্রেসোর হিস্ হিস্ আওয়াজ আমার কানে এল। এক পেয়ালা কফি দিতে বলে এক নজরে আমি চারিদিক দেখে নিলাম। আমার চারপাশে কি ঘটছে সেইদিকে আমি নজর দিই না। আমার এক বোন। বোন আমাকে দোষ দিয়ে বলে তুমি তোমার রচিত জগতে বুঁদ হয়ে থাক। বিবেকর চেতনায় আমার চারধারে কি ঘটছে তা দেখতে বসলাম। চেলসিয়ার কফিবারগুলোর ভিতর যে কি ঘটছে তা রোজই দৈনিক পত্রিকায় খবর হয়ে ওঠে। তাই আধুনিক জীবন সম্পর্কে জানার একটা সুযোগ আমার জীবনে এসেছে। এসপ্রেসোর ভিতরটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন তাই সবকিছু নজরে পড়ে না। খরিদ্দাররা প্রায়ই সবাই যুবক-যুবতী। আমার ধারণা এরা সবাই হচ্ছে প্রজন্মের তলানি। আজকাল মেয়েদের দেখলেই মনে হয় সব মেয়েরাই নোংরা। মেয়েগুলো একটু নজরকাড়া গরম পোশাক-আশাক পরে এসেছে। ক-সপ্তাহ আগে বন্ধুদের সাথে খাওয়ার সময় এ ধরনের যুবতী মেয়ে আমার নজরে পড়েছিল। আমার পাশের চেয়ারে যে মেয়েটি বসেছিল তার বয়স কুড়ি হবে। মেয়েটি হলুদ রংয়ের পুলোভার পরে ছিল গরম রেস্তোরাঁর মধ্যে। আর পরে ছিল কালো রংয়ের স্কার্ট, কালো উলের মোজা, খাবার সময় সারাক্ষণ ঘাম ঝরছিল। তার দেহ ঘামে ভেজা, মাথায় বিচ্ছিরি গন্ধ, আমার বন্ধুদের কথায় মেয়েটি নাকি খুবই মনকাড়া। আমার কাছে নয়। একটা মাত্র প্রতিক্রিয়া আমার মনে হচ্ছিল একটা গরম জলভরা বাথটবে ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাতে একখানা সাবান গুঁজে দিতে। আর তাতে নিজের দেহটা পরিষ্কার করার জন্য অনুরোধ করতে। আমার এই ইচ্ছেটাই প্রমাণ করে সময়ের থেকে আমি কতটা ফারাক হয়ে গেছি। বোধ হয় বহুদিন বিদেশে থাকার জন্যই আমার এই অবস্থা হয়েছে। ভারতীয় মহিলাদের কথা মনে হতেই আমার মন আনন্দে ভরে গেল। তাদের মাথা ভরা কালো চুল। পরনে ভেজালবিহীন উজ্জ্বল রংয়ের শাড়ি, তালদোলায়মান তাদের হাঁটার ভঙ্গিমা। আমার এই আনন্দদায়ক স্মৃতি রোমন্থনের সুর কেটে গেল এক আকস্মিক তীব্র কন্ঠের চিৎকারে। আমার পাশের টেবিলে দুটি যুবতীর মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছে। ওদের সঙ্গী যুবকেরা ওদের বিবাদ মেটাবার চেষ্টা করলেও সফল হলো না। তারা পরস্পরকে আক্রমণ করে তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করছিলো। একটি মেয়ে অপর মেয়েটির গালে সজোরে চড় মারলো। দ্বিতীয় চেয়ার থেকে প্রথমাকে ঠেলে ফেলে দিল। মৃগী রুগীদের মতো গালাগালি করছে, জেলেনীদের মতো ঝগড়া করছে। একটি মেয়ের মাথায় মেকী চুলের খোঁপা। অন্য মেয়েটির মাথায় লম্বা সোনালি চুল। কি নিয়ে যে ওদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছে তা ঠিক মতো বুঝতে পারলাম না। অন্য টেবিল থেকে সোল্লাসে চিৎকার আর বিড়ালের ডাক শোনা গেল। 

মার! লাউ ওকে ঠেসে ধর। 

কাউন্টারের ওধারে বসেছিল মালিক—ইতালিয়ানদের মতন দেখতে লিকলিকে চেহারা। মুখে একপাশে পোড়া দাগ। ওকে আমি লুইজি নামেই জানি। সে এবার মধ্যস্থতা করার জন্য ওদের কাছে এসে দাঁড়ালো আর গেঁয়োবুলিতে ধমক দিলো। —না এবার ছাড়। ছেড়ে দে। এক্ষুনি তোরা রাস্তার লোকজনকে ভেতরে টেনে আনবি দেখছি। পুলিশ ছুটে আসবে। বলছি, এবার থাম। 

কিন্তু সোনালি চুলওলা মেয়েটি লালচে মাথা মেয়েটির চুলের মুঠি ধরে সজোরে টানছে আর মেয়েটি চিৎকার করছে। তুই একটা মরদ চোর কুক্কুরী ছাড়া আর কিছু নোস। কুক্কুরী তুই। লুইজি আর মেয়েদুটোর সঙ্গীসাথীরা মেয়েদুটোকে জোর করে দুদিকে সরিয়ে দিলেন। সোনালি চুল মেয়েটির মাথায় বড় এক গোছা লালচে চুল ছিঁড়ে এল। সে খুশীতে উঠে এসে চুলের গোছা ধরে মাটিতে ফেলে দিল। রাস্তার দিকের দরজা দিয়ে পুলিশ ভেতরে ঢুকল। পরণে ছিল নীল রংয়ের উর্দি। 

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে আইনমাফিক ধমক দিলো। কি হচ্ছে এখানে। সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষরা একত্রিত হয়ে গেল। মাথায় উঠল বিবাদবিস্বাদ। এই একটু হাসিঠাট্টার ব্যাপার আর কি। ওদের মধ্যে এক ছোকরা আওড়ালো। এছাড়া আর কিছু না। বললো লুইজি। বন্ধুবান্ধবরা একটু ঠাট্টা ইয়ারকি করছে। কথাবলার সঙ্গে সঙ্গে লুইজি পা দিয়ে ছেঁড়া চুলের গোছাটা কাছের টেবিলের নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিল। প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়েদুটো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। তৈরি করে নিল মেকী শান্তির আবহাওয়া। 

পুলিশ ভদ্রলোক প্রত্যেকের দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। সোনালি চুল মেয়েটি বলল আমরা এক্ষুনি যাচ্ছি—চল দুপ। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আরো অনেকে বেরিয়ে চলে গেল। ওদের বিষণ্ণ ভাবে চলে যেতে দেখল আইনরক্ষক। তার চোখের দৃষ্টি বলছিল ঠিক আছে এবারটা মাপ করে দেওয়া হল। ওদের উপর নজর রাখা হবে। ধীরে ধীরে আইনরক্ষক চলে গেল। লালচে মাথা মেয়েটির সঙ্গী বিল মেটাল। তুমি ঠিক আছো তো, মেয়েটি মাথার খোঁপা ঠিক করছিল, তাকেই শুধালো। লাউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। একেবারে চুলের গোড়া থেকে ছিঁড়ে নিয়েছে। লাগেনি। মেয়েটি শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলো। তার দিকে তাকিয়ে হেসে আবার বললে’—গোলমালের জন্য দুঃখিত লুইজি। দলের সবাই চলে গেল। বার এখন একদম ফাঁকা, পকেটে হাত ঢোকালাম পয়সা বার করার জন্য। ওদের চলে যাওয়ার পর দরজাটা বন্ধ হতে দেখেছিল লুইজি। বললো বেশ খেলোয়াড় মেয়ে দেখছি, ঠিক আছে। একটা ঝাঁটা দিয়ে লালচে চুলের গোছাটা ঝেঁটিয়ে কাউন্টারের বাইরে ফেলল।— বেশ যন্ত্রণা হয়েছে, বললাম। আমার এমন হলে আমি তো মরে যেতাম যন্ত্রণায়। লুইজি স্বীকার করলো—কিন্তু টমি খেলোয়াড় মেয়ে। 

মেয়েটাকে তুমি ভালোই চেনো দেখছি? ওহো, মেয়েটা বেশিরভাগ দিন সন্ধ্যেবেলায় এখানে আসে। টাকারটন ওর নাম। থমসিনা টাকারটন এটাই ওর পুরো নাম। কিন্তু এখানে সবাই ওকে টমি টাকার নামে জানে। ধনীর দুলালী। ওর বুড়ো বাপটা মরবার সময় ওর জন্য বহু টাকাকড়ি রেখে গেছে। অথচ দেখো এখানে সে কি করে বেড়াচ্ছে? এসেছে চেলসিয়াতে, ওয়াল্ডওয়ার্থ ব্রিজের দিকে আধাআধি গিয়েই একখানা বস্তির ঘরে থাকছে। চারধারে হৈ হৈ করে নেচে বেড়াচ্ছে, একদল ছোকরাছুকরির সাথে, ওরা সব একরকম কাজই করছে। ওদের অর্ধেক ছোকরাছুকরির হাতে টাকা পয়সা আছে, ওদের দেখে আমার মনে বড় কষ্ট হয়। চাইলে ওরা যেকোনো জাগতিক সুখ ভোগ করতে পারত। ইচ্ছে হলে থাকতে পারত রিজ হোটেল। অথচ যে জীবন ওরা বেছে নিয়েছে তাতে কত বিপদের ঝুঁকি, অসম্মানের লাথি। হ্যাঁ, সত্যি ওদের জন্য আমার কষ্ট হয়। তোমার পছন্দ তো ওর চলবে না। হ্যাঁ সে জ্ঞান আমার কাছে। বললো লুইজি—ওদের দেখে এটাই আমার ভাবনা, চলে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে শুধোলাম, কিসের জন্য ওদের এই লড়াই। টমি অন্য মেয়েটার বয়ফ্রেণ্ডকে বাগিয়ে নিয়েছে। বিশ্বাস করো, ওই ছোকরা এমন কিছু নয় যে এমন লড়াই করা সাজে। অন্য মেয়েটা সেটাই ভাবে, বললাম। ওহো। লাউ মেয়েটা বড় ভাবপ্রবণ, জবাব দিল লুইজি। এমনভাবে যেন ওকে সে সহ্য করেছে। আমার ধারণায় এটা ভাবপ্রবণতা নয়, কিন্তু আমি তা বললাম না। 

****

বোধহয় সপ্তাহ খানেক পরের ঘটনা। টাইমস পত্রিকায় মৃত ব্যক্তিদের নামের তালিকায় আমার নজর কাড়লো। 

টাকারটন : মৃত্যু হয়েছে অ্যাম্বারলির কালোফিল্ড নার্সিংহোমে দোসরা অক্টোবর। থমসিনা এ্যান, বছর কুড়ি বয়স—সারের অ্যাম্বারালির ক্যারিঙটা পার্কের প্রয়াত টমাস টাকারটন মহাশয়ের একমাত্র কন্যা। প্রাইভেট সমাধির ব্যবস্থা। ফুলের প্রয়োজন নেই। হতভাগিনী টমি টাকার জন্য আর ফুলের প্রয়োজন নেই। আর চেলসিয়ার জীবনচর্চায় আর কেউ তাকে অসম্মানের লাথি মারবে না। টমি টাকারের দুরবস্থা দেখে আজ মনে এক ক্ষণস্থায়ী বেদনা অনুভব করলাম। আমার মনে হয় যে আমার ধারণা সঠিক, একটা বিনষ্ট জীবন একথা বলবার আমি কে? হয়ত সে জীবন আমার এই নির্জন নিঃশব্দ আমার পণ্ডিত জীবন, বইগুলোর মধ্যে নিহিত, বাইরের জগৎ থেকে একেবারে বন্দী জীবন। তাই আমারই তো বিনষ্ট জীবন I দ্বিতীয়বার জীবনটা যেন হাত ফেরতা একটা বস্তু। এবার সদ্ভাবে শুধাই, জীবন থেকে সরে আমি কি অবহেলিত, বড় আজব ধারণা। অবশ্য সত্যিকথা অবহেলা আমি চাই না। কিন্তু আমার রোল। আমার তা প্রাপ্য। চিন্তাটি আজ আর একেবারেই ঈপ্সিত নয়। টমি টাকারের ভাবনা মনটাকে সরিয়ে নিয়ে উঠে লোখার কাজে নিয়োগ করলাম, আমার পিসতুতো বোন রোডা ডেস্পার্ডের লেখা একখানা চিঠি এখন আমার প্রধান ভাবনার বিষয়। অনুগ্রহ করে সে লিখেছে একটু দেখাতে। ওর এই কথাটা আমার মনে বিতৃষ্ণা জাগালো—একে আজ সকাল থেকে কাজে মন বসছে না। এখন একেবারে কাজ না করার একটা ছুতো পেয়ে গেলাম। 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিংস রোডে একখানা ট্যাক্সি ধরলাম। মিসেস অ্যারিয়াডন অলিভার আমার বান্ধবী। ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলাম তার বাড়িতে। মিসেস অলিভার একজন নামকরা গোয়েন্দাকাহিনী লেখিকা। আর তার বাড়ির ঝি মিলি একটা সাক্ষাৎ ড্রাগন। বাইরের মানুষের হাত থেকে সে সব সময় তার কর্ত্রীকে পাহারা দেয়। 

স্রেফ ভুরু কুঁচকে একটা অকথিত প্রশ্নের ইঙ্গিত করলাম। সবেগে মাথা নাড়ালো মিলি। মিস্টার মার্ক বলল যে আজ সকাল থেকেই মেজাজ বিগড়েছে। আপনি হয়তো তার মেজাজ কিছুটা ঠান্ডা করতে পারবেন। সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠলাম। হালকা হাতে দরজায় টোকা দিলাম। এবং অভ্যর্থনার পরোয়া না করেই ঢুকে পড়লাম ঘরে। মিসেস অলিভারের লেখার ঘরখানা বেশ বড়। ওয়ালপেপারে মোড়া যাযাবর পাখি ডালে বসে বাসা বানাচ্ছে। মিসেস অলিভারের মাথা প্রায় বিগড়ে গিয়েছে। সারাঘর পায়চারি করছে আর আপন মনে বক্‌ করছে। আমার দিকে একবার অনাগ্রহ ভাবে তাকাল। তারপর আবার আগের মতন পায়চারি করতে লাগল। তার দুচোখের দৃষ্টি ঝাপসা। চার দেওয়ালে আবদ্ধ দৃষ্টি। মাঝে মাঝে খোলা জানলা দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে বাইরে। কখনও কখনও যন্ত্রণার দমক সহ্য করার জন্য সজোরে শ্বাস টানছে। কিন্তু কেন? যেন বিশ্বের দরবারে জানতে চাইলো মিসেস অলিভার — কেন বোকা লোকটা তক্ষুনি বললো না যে সে কাকাতুয়াটাকে দেখেছিল? কেন সে বলেনি? তার নজরে ওটা পড়েনি এমন তো হতে পারে না। কিন্তু যদি সে বলতো তবে তো সব কিছুই মিটে যেতো। একটা পথ নিশ্চয়ই আছে….নিশ্চয়ই আছে…। 

মিসেস অলিভার আর্তনাদ করলো, মাথায় বব করা পাকাচুলের মধ্যে আঙুল চালাতে লাগল। এবং একসময় পাগলির মতন চুলগুলো মুঠো করে ধরলো। তারপর সহসাই আমার দিকে সহজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, হ্যালো মার্ক। মাথা আমার বিগড়ে যাচ্ছে। এবং তারপর নিজের অভিযোগের বৃত্তান্ত বলতে শুরু করলো। 

এই ধরো মণিকার কথা। তাকে যত নিখুঁত ভাবে গড়তে চাইছি সে কিনা কদাকার হয়ে উঠছে। এত বোকা মেয়ে…আবার কখনো নিজের মনের খুশিতে বিভোর। মণিকা…মণিকা কি? মনে হচ্ছে নামটা ভুল হবে। ন্যান্সি? এই নামটা কি পছন্দসই। আচ্ছা এই জোয়ান নামটা প্রত্যেকেই নিজেকে সবসময় জোয়ান বলে মনে করে। অ্যানি নামটা খাসা। আচ্ছা সুসান নামটা কেমন? না, একটা কাহিনীতে সুসান নাম রেখেছি। লুসিয়া? লুসিয়া? আমার বিশ্বাস লুসিয়া নামটা খুবই পছন্দসই। মাথা ভরা লালচে চুল। গোলগলা জাম্পার কালচে আঁটোসাঁটো কি? পায়ে কালচে রংয়ের মোজা, মানসিক উল্লাসের সাময়িক রেশটুকু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল। মনে পড়ে গেল কাকাতুয়ার সমস্যার কথা। মিসেস অলিভার আবার ঘরময় পায়চারি শুরু করল। অন্যমনস্ক ভাবে টেবিল থেকে জিনিসপত্র নিয়ে অন্য জায়গায় রাখছে। চশমার খাপটা যত্ন করে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখল। আগে ওখানে চীনাবাঁটের হাতপাখা রেখেছে। তারপরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। 

বললো তুমি এসেছো আমি খুব খুশী হয়েছি। তুমি খুব খাসা তাই এমন কথা বললে। যে কেউ তো হতে পারত, কোনো বোকা মেয়েছেলে এসে আমাকে দিয়ে বাজারের দ্বারোদঘাটন করাতে চাইতো, কিংবা কোনো লোক এসে মিলির ইনস্যুরেন্সের কার্ড পরখ করতে চাইতো কিন্তু মিলি এই কার্ড বানাতে একেবারে অরাজী। কিংবা জলের কলের মিস্ত্রি কিন্তু সে এলে তো ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতো না। কেউ আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসতো আর এসেই নানা লজ্জাকর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে যেত। ওরা সবসময় এই একই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। লেখিকার জীবন অবলম্বন করার অনুপ্রেরণা আপনি কি থেকে প্রথম পেয়েছিলেন। কতগুলো বই লিখেছেন। কত অর্থ উপার্জন করেছেন। এমনি আরো অনেক সব। এ-সব প্রশ্নের জবাব আমার একটাও জানা নেই। আর তাই আমাকে এ-সব প্রশ্নের সামনে বোকা বোকা দেখায়। এমন নয় যে এ সবে আমার কিছু এসে যায়। তবে কাকাতুয়ার সমস্যাটা আমার মাথা একদম বিগড়ে দিয়েছে। একটা কিছু সমাধান খুঁজে পাচ্ছো না। সমবেদনার সুরে বললাম, বোধহয় আমার এখন চলে যাওয়াই ভালো। 

না যেও না। একদিক দিয়ে তুমি আমার চিত্তবিক্ষেপ ঘটিয়েছো। এমন সন্দেহজনক প্রশংসা তবুও তা মেনে নিলাম। 

ধূমপান করবে না কি। নামকাওয়াস্তে অতিথি সৎকারে ইচ্ছে প্রকাশ করার জন্য শুধালো মিসেস অলিভার। তারপর বললো—দেখো কোথাও হয়তো পড়ে আছে প্যাকেটটা। ওই টাইপ রাইটারের ডালাটা খুলে দেখো তো একবার। ধন্যবাদ আমার নিজের কাছে সিগারেট আছে। একটা সিগারেট নাও। ওহো তুমি তো আবার ধূমপান করো না। আমি মদ্যপানও করি না। বললো মিসেস অলিভার, তবে মনে হয় করা উচিৎ ছিল। ঠিক ওই আমেরিকান গোয়েন্দাদের মতন। ওদের ঘরে মদের বোতল মজুত করা থাকে। মনে হয় এতেই ওদের সব সমস্যা দূর হয়ে যায়। তুমি তো জানো। মার্ক আমি ভাবতেও পারছি না যে কেমন করে এই বাস্তব জীবনে খুন করে পালিয়ে যেতে পারে। আমার মনে হয় যে মুহূর্তে তুমি কাউকে খুন করলে সেই মুহূর্তে সব কিছু ভয়ানকভাবে সুস্পষ্ট হয়ে পড়লো। বাজে কথা। তুমি এমন অনেক খুন করেছ। অন্তত পঞ্চান্নটা বললো মিসেস অলিভার। খুনের ব্যাপারটা একেবারে সহজ আর সরল। এই খুন গোপন করাটাই যত গোলমেলে আর কঠিন কাজ। বলছি, তুমি ছাড়া কেন অন্য লোক হবে। তুমি রয়েছো মাইলখানেক দূরে। সমাপ্ত প্রায় কাহিনীতে নয়। বললাম। আহা এতে আমার মনের উপর কত চাপ পড়ছে। বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল মিসেস অলিভার। বলো তুমি কি চাও, ‘খ’ নামক লোকটা যখন খুন হলো তখন পাঁচ-ছ জন লোকের উপস্থিতি থাকা স্বাভাবিক নয় এবং তাদের প্রত্যেকেরই খ নামক লোকটাকে খুন করার উদ্দেশ্য ছিলো।—আর না হলে খ নামক লোকটা সকলের কাছে ঘোর অবাঞ্ছিত লোক এবং সে ক্ষেত্রে সে খুন হলে কি হলো না তা নিয়ে কেউ কিছু মনে করবে না এবং কে এ কাজ করেছে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। তোমার সমস্যা বুঝতে পেরেছি, বললাম, তবে পঞ্চান্ন বার যখন এ কাজ করতে তুমি সফল হয়েছো তখন আর এবারও এটা করার ব্যবস্থা করতে ঠিক পারবে। 

নিজের মনকে তাই বোঝাই, মিসেস অলিভার বলল, বার বার বলি, কিন্তু প্রতিবারই বিশ্বাস করতে পারি না। তাই যন্ত্রণায় ছট্‌ফট্ করি। আবার নিজের চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে ভীষণভাবে টানলো মিসেস অলিভার। 

কোরো না ও কাজ। চেঁচিয়ে বললাম—একেবারে গোড়াসুদ্ধ উপড়ে ফেলবে। 

বাজে কথা, জবাব দিলো মিসেস অলিভার—চুল শক্ত হয়। যদিও বছর চোদ্দ বয়সে ভয়ঙ্কর হাম হয়েছিলো, হাই টেম্পারেচার উঠেছিলো, তখন চুলগুলো গোড়া থেকে খসে পড়তো, মাথার সামনেটা একেবারে সব ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। দারুণ লজ্জাকর ব্যাপার। এবং আবার ঠিকমতন চুল গজাতে সময় নিয়েছিলো মাস ছয়েক। একটা মেয়ের কাছে এটা সাংঘাতিক ব্যাপার। মেয়েদের মনে এতে আঘাত লাগে। 

গতকাল নার্সিংহোমে মেরি দোলা ফনটেইনকে দেখতে গিয়ে এ কথাটাই ভাবছিলাম, আমার যেমন মাথা থেকে সব চুল উঠে গিয়েছিল তারও ঠিক তেমন ভাবে মাথা থেকে সব চুল উঠে যাচ্ছে। মেয়েটা বলল ভালো হয়ে উঠে সে মাথার সামনেটায় পরচুল পরবে। বয়স যখন ষাট হয়ে যাবে তখন আর মাথায় নতুন চুল গজাবে না এইটুকু আমার বিশ্বাস। 

কাল রাত্রিবেলা একটা মেয়ে অপর একটা মেয়ের মাথা থেকে একগোছা চুল ছিঁড়ে নিতে দেখেছি, বললাম আমি। জীবনে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এমন একজন মানুষের মতন আমার কণ্ঠস্বরে যে অহঙ্কারের সামান্য সুর ফুটে উঠেছে সে সম্বন্ধে আমার মন সচেতন ছিলো। 

কেন অস্বাভাবিক সব জায়গায় তুমি যাতায়াত শুরু করেছ? মিসেস অলিভার শুধালো।

চেলসিয়ার একটা কফিখানায় ঘটেছিলো ব্যাপারটা। 

ওহো, চেলসিয়ার কথা বলছো, বলল, মিসেস অলিভার — আমার বিশ্বাস, সেখানে সব কিছুই ঘটে। আছে বিটানক আর স্পুটানিক। আছে অভিজাত আর বিটপ্রজন্ম। ওদের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ভুল করে ফেলি এই ভয়ে ওদের সম্বন্ধে আমি কিছু লিখি না। আমার মনে হয় যা তুমি জান তার উপর লাঠির খোঁচা দেওয়াই বেশি নিরাপদ। যেমন শত্রুপক্ষের জাহাজ অন্বেষণরত জাহাজে এবং ছাত্রাবাসগুলোয় যে সব লোক রয়েছে এবং কি সব ঘটছে হাসপাতালগুলোতে আর গীর্জার পরামর্শদাতাদের মধ্যে এবং বিক্রি বাট্টার কাজকর্মে—সঙ্গীত সম্মেলন সমূহে এবং কারখানার মেয়েগুলোর মধ্যে, আর সমিতিগুলোতে এবং হররোজ নারী যুবক ছোকরা আর ছুকরী যারা বিজ্ঞানের স্বার্থে এবং দোকানগুলোর কর্মচারী হয়ে সারাবিশ্ব জুড়ে ঘুরছে ফিরছে।..। 

এক টানা কথা বলতে বলতে হাঁফিয়ে উঠে থামলো মিসেস অলিভার। মনে হচ্ছে এদের সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করা অনেকটা সুবিধাজনক— 

বললাম, একই কথা – 

তুমি যে কোনো দিন আমাকে চেলসিয়ার কফিখানায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারো—আমার অভিজ্ঞতাকে শুধু আর একটু বাড়াবার জন্যে। সতৃষ্ণভাবে বলল মিসেস অলিভার। 

যে দিনই বলবে নিয়ে যাব। আজ রাতে যাবে নাকি? 

না আজ রাতে নয়। লেখায় খুব ব্যস্ত কিংবা বলতে পারো লিখতে পারার জন্য খুব বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। লেখালেখির ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে ক্লান্তিকর অবস্থা যদিও বাস্তবে প্রতিটি বস্তুই ক্লান্তিকর—যে মুহূর্তে তোমার মাথায় একটা ভাব দেখা দিল যা মনে হচ্ছে আশ্চর্যজনক একটা ভাব হয়ে উঠবে শুধু এটি ছাড়া। এবং তক্ষুনি তা শুরু না করে একেবারেই অপেক্ষা করা যায় না। আচ্ছা, আমাকে বলো তো মার্ক, তুমি কি ভাব যে, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাউকে খুন করা সম্ভব? 

দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ বলতে তুমি কি বলতে চাইছো। একটা বোতাম টিপে ধরলো আর অমনি ছুটে চললো তেজষ্ক্রিয় মারণ রশ্মি। 

না—না—। কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী নয়। আমার মনে হয় সন্দেহান্বিত হয়ে, মিসেস অলিভার থামল। তারপর বলল। আসলে আমি বলতে চাইছি ব্লাক ম্যাজিক (মারণ যন্ত্র)-এর কথা। 

মোমের পুতুল তৈরি করে তার গায়ে পিন ফোটানো, ওহো, মোমের পুতুল এখন শেষ হয়ে গেছে। 

মিসেস অলিভার অবজ্ঞাভরে বলল – কিন্তু আজব ঘটনা তো এখনও আফ্রিকা অথবা ওয়েস্টইণ্ডিজে ঘটে। লোকজনের মুখে এমন কাহিনী তো প্রায়ই শোনা যায়। কি ভাবে ওখানকার লোকজনের দেহ যায় কুঁকড়ে এবং তাদের মৃত্যু ঘটে। ভুদু…বা…জুজু…। যা হোক আমি যা বলতে চাইছি তা তুমি বুঝতে পেরেছো। 

বললাম যে এসবই এখন সংকেতপূর্ণ শব্দ প্রয়োগের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রতারিত লোকটার কাছে সবসময় একটা ইঙ্গিতধর্মী শব্দ প্রয়োগ করা হয় যে, ওঝা তার মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করেছে। বাকিটুকু শেষ করে লোকটার অবচেতন মনে। 

মিসেস অলিভার নাক ঝেড়ে বলে উঠলো, দ্যাখো, কেউ যদি আমার কাছে এসে বলে যে তোমার আয়ু ফুরিয়েছে এবং তোমার মরণ হবে। তাহলে তাদের আশা ব্যাহত করে আমি বড় আনন্দ লাভ করবো। 

হেসে বললাম—তোমার শরীরে শতাব্দীপ্রাচীন নির্ভেজাল পাশ্চাত্যের অবিশ্বাসধর্মী রক্তের ধারা অবহমান। না, পূর্ববিন্যাস নয়। 

তাহলে তুমি বলছো যে, এমনটা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে এত বেশি কিছু আমার জানা নেই যাতে এর বিচার আমি করতে পারি। 

তুমি নিজে কি ভাবছো। তোমার লেখা উপন্যাসের মধ্যে মারণযন্ত্রে খুন ঘটাচ্ছ। 

না—বাস্তবিক তা নয়। পুরনো পদ্ধতিতে ভালোজাতের ইঁদুর মারার বিষ অথবা আর্সেনিক হলেই আমার চলে যাবে। বিশ্বস্ত হাতে ভোঁতা অস্ত্র। সম্ভব হলে আগ্নেয়াস্ত্র একেবারেই নয়। আগ্নেয়াস্ত্রগুলো এখন খোলা হয়ে গেছে। আচ্ছা, তুমি নিশ্চয় আমার বইয়ের আলোচনা করতে আমার কাছে আসোনি। 

খোলাখুলি বলতে হলে বলবো না। আসল ঘটনা হলো আমার পিসতুতো বোন রোডা ডেসপার্ডে গীর্জায় একটা মিলন উৎসব করছে এবং… 

আবার। কক্ষণো নয়। বললো মিসেস অলিভার। এর আগের বার কি হয়েছিলো তা কি তুমি জান। মনে মনে আমি একটা খুনের ঘটনা খুঁজছিলাম, এবং প্রথম যে ঘটনা ঘটল তা হচ্ছে জলজ্যান্ত একটা মৃতদেহ। সে দুঃস্বপ্ন আমার এখনও কাটেনি। 

এটা কিন্তু খুনের অন্বেষণ নয়। একটা তাঁবুতে বসে তোমাকে কেবল তোমার বইগুলোতে সই করে দিতে হবে। ব্যাস। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় শুরু হবে 

আচ্ছা – মিসেস অলিভারের কণ্ঠে সন্দেহের সুরও কাজ ঠিক করা যাবে। আমাকে উৎসবের উদ্ঘাটন করতে হবে না। অথবা বাজে বক্তৃতা দিতে হবে না তো, কিংবা মাথায় টুপি দিতে হবে না তো। 

তাকে নিশ্চিত করে জানালাম যে এ-সব কিছুই তাকে করতে হবে না। ব্যাপারটা শেষ হতে ঘণ্টাখানেক কিংবা ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগবে। খোশামোদি সুর আমার গলায়। 

ওটা মিটে গেলে একটা ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। 

না, মনে হয় বছরের এসময় আর ক্রিকেট ম্যাচ হবে না। বোধহয় ছেলেদের নাচ হবে। কিংবা হতে পারে আজব পোষাক পরার প্রতিযোগিতা…মিসেস অলিভারের বন্য চিৎকারে আমার কথা বাধা পড়লো। 

—ঠিক ওটাই। মিসেস অলিভার চেঁচিয়ে বললো—নিশ্চয়ই একটা ক্রিকেট বল। সে জানালা দিয়ে ওটা দেখেছিলো…শূন্যে লাফিয়ে উঠেছে…বলটাই তাকে অন্যমনস্ক করে ফেলেছিলো – এবং তাই সে কাকাতুয়ার নাম কখনও উল্লেখ করেনি। আহা, তুমি এসে কি ভালোই না করেছো মার্ক। তুমি অপূর্ব মানুষ। 

আমি তো একেবারেই বুঝতে পারছি না…। 

—বোধহয় তুমি পারছো না, কিন্তু আমি পারছি। বললো মিসেস অলিভার–দ্যাখো, এটা খুব জটিল ব্যাপার তবে এখন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি সময় নষ্ট করতে চাই না। তুমি বড় ভালো লোক, কিন্তু এখন তোমার চলে যাওয়াটাই আমার কাম্য। যাও এক্ষুনি। 

—নিশ্চয়। তাহলে উৎসবের ব্যাপারটা…। 

—আমি ভেবে দেখবো। এখন আমাকে বিরক্ত কোরো না। কোথায় যে আমার চশমা জোড়া এখন রাখলাম? সত্যি, যেভাবে জিনিসপত্র এমন উবে যায়…।