হে বন্ধু বিদায়
বিক্রমের ঘটনার প্রায় তিন বছর কেটে গেছে। আমি এখন খড়গপুর কেশবচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার একজন সহকারী শিক্ষক। বিয়ে করিনি। মা অনেকবার বলে বলে ক্লান্ত হয়ে ছ’মাস হল চলে গেছেন। আমার এখন দিন কাটে স্কুলে ছাত্র পিটিয়ে আর বাড়িতে হুইস্কি পিটিয়ে।
হ্যাঁ, মদ ধরেছি। ধরতেই হতো, তবে আমি মাতাল নই। স্কুলের চাকরির বাইরে কিছু দুঃস্থ বাচ্চাকে নিখরচায় পড়াই। তাও হপ্তায় দু’দিন। বাদবাকি দিন এক পেগ হুইস্কি আর বই নিয়েই আমার দিন কাটে। দিনগত পাপক্ষয়। বিক্রমের কথা মনে পড়লে অবশ্য দু’তিন পেগ বেশি হয়ে যায়। শেষ খবর অনুযায়ী ও উইল করে সমস্ত টাকা আর সব সম্পত্তি বহুদিনের বিশ্বস্ত নগেনদাকে দিয়ে গেছে। এ খবর জানায় প্রদীপ্ত। সে মাঝে মধ্যে ফোন করত। এখন তাও বন্ধ। শেষ ফোন করেছিল ছ’মাস আগে, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে। বিক্রমের সঙ্গে কাটানো পাঁচ বছর আমায় আগের থেকে অনেক বেশি যুক্তিবাদী করে তুলেছে। যেমন, এই যে আমি না জানানো সত্ত্বেও প্রদীপ্ত আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিল; এর একটাই যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে-আমি এখনও পুলিশি নজরের আওতায় আছি। ওদের বোধহয় ধারণা, আমিও কোনোভাবে বিক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অবশ্য এখন আমায় নিয়ে কে কী ভাবল, কী বুঝল… আমি আর পরোয়া করি না। ব্যস! বিরক্ত না করলেই হল। তবে মাঝে মধ্যে বড় একা লাগে, বাড়িতে কথা বলার মতো কেউ নেই। এই একাকিত্ব কাটানোর জন্য প্রথম প্রথম বইয়ে ডুবে থাকলেও সেটা যথেষ্ট নয়। তাই অগত্যা মদ! বিক্রমের অধ্যায়কে আমি বহুদূরে ফেলে দিয়েছি। আমার কাছে ওর দেওয়া কোনো উপহার বা স্মৃতিচিহ্ন-কিচ্ছু নেই। এমনকী ফোন থেকে সব ছবিও মুছে দিয়েছি। তবু মন থেকে মুছতে পারলাম কই! স্মৃতি বড় বেয়াদব, বড় অবাধ্য। যত ভোলার চেষ্টা করি, তত যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। তবে বেয়াদব ছাত্রদের যখন সামলাতে পারি, স্মৃতিকেও এক দিন সামলে নেব। কিন্তু ভাগ্যের আকস্মিক অভিঘাত আগাম বোঝা যায় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হল…
দিনটা ছিল শনিবার। স্কুলের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। আড়াইটে নাগাদ স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ একটা অজানা নাম্বার থেকে ফোন এল। ফোন তুলে বললাম, ‘হ্যালো!’
ওপার থেকে অজানা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘নমস্কার, আপনি বোধিসত্ত্ব ঘোষ বলছেন?’
‘বলছি, আপনি কে কথা বলছেন?’
‘আমায় আপনি নামে চিনবেন না। আমার নাম মহাবীর সিং। একটা অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে আপনার সঙ্গে দরকার আছে।’
‘আপনি কি কোনো ছাত্রের গার্জেন কথা বলছেন?’
‘না, আমার দরকারটা একদম আলাদা।’
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘বলুন কী দরকার?’
‘ফোনে বলা যাবে না। কাল তো রবিবার, আমি সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আপনার বাড়িতে আসব।’
আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘কী ব্যাপার সেটা তো বলুন, চিনি না জানি না, হঠাৎ করে বাড়ি আসব মানেটা কী?’
‘মিস্টার ঘোষ, দরকারটা আমার থেকে আপনার ঢের বেশি। বাকিটা সামনাসামনি বলব। রাখছি।’
ভারি আশ্চর্য লোক তো! একবার মনে হল, নিশ্চয়ই কেউ মশকরা করছে। নয়তো এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে কারও তেমন দরকার নেই। ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম।
রবিবার আমি একটু বেলা করে উঠি। চা নিয়ে বারান্দায় এসে বসেছি, এমন সময় দেখলাম একটা গাঢ় ধূসর রঙের হুন্ডাই অ্যাক্সেন্ট আমার বাড়ির সামনে এসে ব্রেক কষল। ভেতর থেকে নামল প্রদীপ্ত। তবে পুলিশের পোশাকে নয়। ঘরে ঢুকেই আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তারপর বোধি, আছ কেমন? অনেকদিন বাদে।’
আমি হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ, প্রায় বছর দুয়েক।’
প্রদীপ্ত সামনে রাখা চেয়ারে বসল। আমি রান্নার মাসিকে আরেক কাপ চা আনতে বললাম। তারপর প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে বললাম, ‘তারপর হঠাৎ এত সকাল সকাল এদিকে কী ব্যাপার?’
প্রদীপ্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘মানে? তুমি তো কাকে দিয়ে একটা ফোন করে আমায় ডেকে পাঠালে! বললে, সাংঘাতিক দরকার, ফোনে বলা যাবে না। কী যেন নাম বলল লোকটা… ভুলে গেছি।’
ইলেকট্রিক শকের মতো লাগল আমার। কাল ফিরতি পথে আমার কাছেও একটা ফোন এসেছিল না? একটু ভাবতেই নামটা মনে পড়ে গেল-মহাবীর সিং। লোকটা বলেছিল, আজ সকাল সাড়ে দশটায় আসবে। এখন দশটা সতেরো। হাতে আছে তেরো মিনিট। প্রদীপ্তকে লোকটার নাম আর গতকাল আমার কাছে আসা ফোনের কথা বললাম। আর জিগ্যেস করলাম ও সশস্ত্র কিনা! উত্তরে ও টি-শার্টের ডান দিকের কিছুটা তুলতেই দেখলাম, কোমরে গোঁজা একটা কালো রঙের নাইন এমএম পিস্তল।
প্রদীপ্ত বলল, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম, কেউ ইয়ার্কি মারছে। কিন্তু লোকটার কথার মধ্যে কী যেন ছিল… এড়ানো গেল না। তাই চলেই এলাম। একবার ভেবেছিলাম তোমায় ফোন করব। তারপর ভাবলাম যাই, তোমার সঙ্গে দেখাও হবে।’
কথাবার্তার মধ্যেই হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। ঘড়িতে দেখলাম কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা। একটু পরে যিনি ঘরে ঢুকলেন, তাঁকে এর আগে কোথাও দেখিনি। বয়স ষাটের ওপরে, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, যার মধ্যে পাকা চুলের সংখ্যাই বেশি। পরনে একটা নীলচে হাফ-স্লিভ শার্ট আর প্লিট দেওয়া কালো প্যান্ট। কাঁধে বেশ বড় সাইজের একটা চামড়ার ব্যাগ ঝুলছে। ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই আমার আর প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে নমস্কার জানালেন। আমরাও প্রতিনমস্কার জানিয়ে ওনাকে বসতে বললাম।
‘আপনিই মহাবীর সিং? কালকে আমায় আর বোধিকে আপনিই ফোন করেছিলেন?’ প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল।
ভদ্রলোক সামান্য হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, ‘আমার মনে একটা সন্দেহ ছিল আপনাদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া যাবে কি না! যাক ভালোই হল। এবারে কাজের কথায় আসি, প্রায় তিরিশ বছরের বেশি পুরোনো এক কালো ইতিহাস আজ এতগুলো বছর ধরে যক্ষের মতো আগলে রেখেছি। এবার আমার কাজ শেষ। আপনাদের কাজ শুরু।’ লোকটার কথাগুলো হেঁয়ালির মতো শোনাল।
প্রদীপ্ত আর থাকতে না পেরে বলল, ‘আপনি দয়া করে একটু খোলসা করে বলুন।’
লোকটি আবার রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, ‘আমি এখানে কিছু বলতে আসিনি, দিতে এসেছি। আগে সেটা দিয়ে নিই, তারপর আপনারা যা বলার বলবেন।’ ভদ্রলোক নিজের ব্যাগ থেকে একটা হালকা সবুজ রঙের খাম বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘আজকের দিনটা আপনার খেয়াল আছে?’
আমি ওনার হাত থেকে খামটা নিয়ে বললাম, ‘আজ রবিবার আর আগস্ট মাসের উনিশ তারিখ।’
মহাবীর সিং বললেন, ‘আজ আপনার বন্ধুর জন্মদিন। এটা তার চিঠি। বিক্রম।’
আমার হৃৎস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। উনি বলে চললেন, ‘বিক্রম বলেছিল, ওর যদি মৃত্যু হয়, তাহলে কম করে তিন বছর পর সব ঠান্ডা হলে যেন আমি আপনাদের দুজনকে এক জায়গায় ডেকে এই চিঠি আর যা যা আছে, সব দিই। মনে হল, আজকের দিনটাই সবথেকে ভালো। নিন চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করুন। জোরে জোরে পড়বেন।’
আমি খানিকক্ষণ বোকা হয়ে তাকিয়ে রইলাম। প্রদীপ্ত ইশারা করতে আমি চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করলাম। বিরাট চিঠি।
প্রিয় বোধি আর প্রদীপ্ত,
এই চিঠিটা যদি তোমরা মহাবীরকাকুর কাছ থেকে পেয়ে থাকো, তাহলে আমি আর বেঁচে নেই। জানি যখন সব ধরা পড়বে, তোমরা আমায় ঘৃণা করবে। সে চাইলে করতেই পারো, তবে সবেরই একটা কারণ থাকে। সেটা জেনে তারপর না হয় ঘৃণা কোরো। যা মুখে বলিনি, সেটা আজ চিঠিতে জানাচ্ছি।
আজ তোমাদের একটা গল্প বলব। তবে গল্প হলেও এই কাহিনির প্রতিটা শব্দ সত্যি। আর তার প্রমাণ আজ প্রায় পনেরো বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে রিটায়ার্ড হেড কনস্টেবল মহাবীর সিং। এই কাহিনি তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব আর বিশ্বাসঘাতকতার। এরা হলেন তিন আই.পি.এস অফিসার আকাশ চক্রবর্তী, অনিকেত চ্যাটার্জি আর আমাদের সকলের প্রিয় শেখর সেন, এই গল্পের ‘নায়ক’। এই কাহিনি শুরু ১৯৮১ সালে, যে বছর শেখর সেন ফোর্স জয়েন করে। আর প্রথম পোস্টিং পড়ে রানিগঞ্জে। সব ঠিকঠাক চলছিল, আচমকা একটা ঘটনা সবকিছু ওলট-পালট করে দিল। সেই ঘটনায় আসার আগে একটু শেখর সেনের পূর্বতন ইতিবৃত্ত জেনে নেওয়া দরকার।
শেখর সেনরা বাগবাজারের বিখ্যাত সেন চৌধুরী পরিবার। এদের আদিনিবাস ছিল উত্তরবঙ্গে। কালের নিয়মে জমিদারি প্রথার অবসান হলেও জমিদারি মেজাজ আর ঠাঁট পুরো মাত্রায় বজায় রেখেছিল সেনরা। সঙ্গে ছিল বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ঔদ্ধত্য, জাত্যাভিমান আর রক্ষণশীলতা।
শেখর সেনরা দুই ভাই বোন ছিল। শেখর সেন বড় আর তার পাঁচ বছরের ছোট বোন অনু ওরফে অনন্যা সেন। অনন্যা, সেন পরিবারে জন্মালেও তাদের উন্নাসিক মানসিকতা তাকে কোনোদিন ছুঁতে পারেনি। সে ছিল জন্ম থেকেই স্বাধীনচেতা এবং উদারমনস্ক। শেখর সেন তার বোনকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসত।
সময়টা ১৯৮৩, পরিবারের অমতে অনন্যা আচমকা নিকোলাস জেমস রজার্সকে বিয়ে করে নিল। খবর সেন বাড়িতে পৌঁছল। গৃহকর্তা এ. কে. সেন বা অভয় কৃষ্ণ সেন অনন্যাকে ত্যাজ্য-কন্যা করলেন। এদিকে নিকোলাস তখন আইনের ছাত্র, পড়াশোনা শেষ হতে আরও দু’বছর বাকি। সুতরাং পাশ করে রোজগার শুরু হলে তবে তিনি তার স্ত্রী’কে সসম্মানে ঘরে তুলবেন। ততদিন অনন্যাকে আশ্রয় দিল তার প্রিয় বন্ধু তোর্সা দেব। শেখর সেন খবর পেয়ে ছুটে এল কলকাতায়। দেখা করল বোনের সঙ্গে। কিন্তু বাপের রোষদৃষ্টির সামনে সে সময় তারও কিছু করার ছিল না।
সময় ১৯৮৪। তোর্সা ও আরও কিছু বন্ধুদের সাহায্যে আশ্রয় বলে একটি এনজিও খোলে অনন্যা। উদ্দেশ্য- আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দেওয়া। এর মুখপাত্র হল তোর্সা। বেশ নামডাক হল।
সাল ১৯৮৬। কোনো কাজে এক দিন সংস্থার অফিস থেকে বেরোতে বেশ রাত হয়ে যায় অনন্যার। যাদবপুর এইটবি বাস স্ট্যান্ডের কাছে একদল নরকের কীট অপেক্ষা করছিল। তারা অনন্যাকে পেয়ে তাকে ছিঁড়ে খুবলে নিজেদের বিকৃত আশ মেটায়, তারপর একটা মোটা পাথরের চাঁই দিয়ে তার মাথা থেঁতলে দেয়। প্রায় ছ’ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তার দেহ বাস স্ট্যান্ডের এক কোণে পড়ে ছিল। যখন উদ্ধার হয়, তখন দেহে পিঁপড়ে ধরে গেছে।
সন্তানের এই মর্মান্তিক পরিণতি বাবা-মা মেনে নিতে পারলেন না। তিন মাসের মধ্যে দেহ রাখলেন অভয় কৃষ্ণ সেন আর তার এক বছরের মাথায় মীরা সেন। শেখর সেন ছুটে এল কলকাতায়, তৎকালীন সরকারকে অনুরোধ জানাল, বোনের কেসটা যেন তাকে দেওয়া হয়। কিন্তু বাধ সাধল প্রোটোকল। কেস গেল তারই অভিন্নহৃদয় বন্ধু অনিকেত চ্যাটার্জির কাছে।
অনিকেত সে সময় সদ্য কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছেন। সব শুনলেন এবং বন্ধু শেখরকে কথা দিলেন তিনি এই কেসের নিষ্পত্তি না করে ছাড়বেন না। অনিকেত ছিলেন ডিপার্টমেন্টের অন্যতম সেরা অফিসার। কোনো কেস হাতে এলে সমাধান নিশ্চিত ছিল। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শেখর সেন ফিরে গেল রানিগঞ্জ। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে গোটা শহর ওলট-পালট করে খুঁজেও অনন্যার অপরাধীদের ধরা গেল না। সরকার এক বছর পর অনিকেতকে কেস থেকে সরিয়ে দিল। যেহেতু খুনের কেস কখনও তামাদি হয় না, তাই এই কেসেরও একটা ফাইল বানিয়ে ফেলে রাখা হল। শেখর সেন সব জানল। ততদিনে সে প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ পশুতে পরিণত হয়েছে।
সময় ১৯৮৮। অনেক হাত-পা মেরে কলকাতায় বদলি হল শেখর সেন। ঠিক করল, প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু কার থেকে? অপরাধী কে? অনিকেতের সঙ্গে দেখা করল শেখর। অনিকেত নিঃসংকোচে বন্ধুকে সব জানালেন। এখানে বলে রাখা ভালো, এই তদন্ত করতে গিয়ে অনিকেতের ধারণা হয়-অপরাধীরা নির্ঘাত ওই আশ্রয়হীন পথবাসীদের কেউ। কারণ, পোস্টমর্টেমে অনন্যার দেহে ক্লোরোফর্ম পাওয়া গিয়েছিল। যদি কারও অনন্যাকে দেখে আচমকা বিকৃত কামের উদ্রেক হয়, তাহলে জোর-জবরদস্তি করবে বা মুখ চেপে ধরবে। ক্লোরোফর্ম ছিল মানে গোটা ঘটনাটা পূর্ব-পরিকল্পিত ছিল।
তৎকালীন সরকার নিজেদের স্বার্থে এই কেস ধামাচাপা দিয়েই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, অনন্যার স্বপ্নের ‘আশ্রয়’-কেও তারা বন্ধ করে দেয়। শেখর সেন ঠিক করল এমন কিছু করবে, যাতে সরকার আর পুলিশের ভিত কেঁপে ওঠে। সে সময় খবরের কাগজ খুললেই একটা ঘটনা খুব শোনা যেত। বম্বে অধুনা মুম্বাই শহরের ফুটপাতবাসীদের ঘুমের মধ্যে কেউ বা কারা পাথরের চাঁই মেরে হত্যা করছিল। ঠিক যেমন অনন্যাকে মারা হয়েছিল।
ঠিক করে ফেলল শেখর সেন, এর থেকে ভালো উপায় আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু একা এই দুরূহ কাজকে পরিণতি দেওয়া অসম্ভব। এই সময়ে পাশে পেল অনন্যার স্বামী নিকোলাস জেমস রজার্স আর প্রিয় বন্ধু তোর্সা দেব রঞ্জনকে। নিকোলাস তখন প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছে আর তোর্সাও ততদিনে সাংসদ। শুরু হল ছক কষা।
সময় ১৯৮৯ ৪ঠা জুন। সরকার ও পুলিশের নাকের কাছে হত্যালীলার উদ্বোধন করল শেখর সেন। মারা গেলেন আলেয়া বিবি নামের এক তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা মহিলা। ঘটনাটা ঘটে লালবাজার থেকে ইট ছোড়া দূরত্বে। সেই শুরু, তারপর একের পর এক ঘটে যেতে থাকে। সংবাদমাধ্যম এই অচেনা হত্যাকারীর নাম দেয় স্টোনম্যান।
কিন্তু অপরাধ হলে তো একজন অপরাধী থাকা দরকার। নয়তো আজ না হোক কাল ধরা পড়তেই হবে। তাই বেছে নেওয়া হল অনিকেত চ্যাটার্জিকে। শেখর সেনের অনিকেতের ওপর একটা চাপা ক্ষোভ ছিলই, কারণ অনিকেত তার কথা রাখতে ব্যর্থ হন। এই সময়ে এই কাণ্ডে প্রবেশ ঘটে হাশিম তেরাজির। শেখর নিজে হাশিমকে বার দুয়েক অ্যারেস্ট করেছিল। হাশিমের নামে তখন প্রায় ছ’টা খুনের মামলা চলছে।
শেখর সেন বলল, সবকটা মামলার ফাইল সে নিজে চেপে দেবে আর তাকে নির্দোষ প্রমাণ করবে স্বয়ং নিকোলাস। পরিবর্তে করতে হবে একটা কাজ। ততদিনে আট মাসে ন’জন পথবাসীকে নিজের শিকার বানিয়েছে স্টোনম্যান ওরফে শেখর সেন। ঠিক হল দশ, এগারো এবং বারো নম্বর খুনের জায়গায় থাকতে হবে হাশিমের লোকেদের। সময় আসলে তারা অনিকেতের বিরুদ্ধে সাক্ষি দেবে। পুলিশে কাজের সুবাদে শেখর সেন জানত, কোন কোন জায়গায় পুলিশি পাহারায় ফাঁক আছে। সুতরাং আবারও সকলের নজর এড়িয়ে আরও তিনটে খুন হয়ে গেল। সরকার আর পুলিশের অবস্থা তখন প্রায় যায় যায়। এটা ছিল প্ল্যানের প্রথমার্ধ, যেখানে নিজের কাজ খুব সুনিপুণভাবে করেছিল একজন আইনরক্ষক এবং একজন আইনজীবী। দ্বিতীয়ার্ধে প্রবেশ করল তোর্সা দেব রঞ্জন। সবকিছু আগে থেকে ঠিক করাই ছিল, ভুলের কোনো জায়গা নেই। তৎকালীন নগরপাল এবং গোয়েন্দা প্রধানকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রবুদ্ধ লাহিড়ীর সঙ্গে দেখা করতে যায় শেখর সেন। নিজের ওপর মহলকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল। প্রমাণ পাওয়া গেছে স্টোনম্যানের। তিনি আর কেউ নন, নিজেদের অফিসার অনিকেত চ্যাটার্জি।
স্টোনম্যান কাণ্ডে এমনিতেই সরকার ও পুলিশ ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল। তার ওপর যদি প্রমাণিত হয় খুনি আসলে পুলিশের লোক-তাহলে আর রক্ষে নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রবুদ্ধ লাহিড়ী, সাংসদ তোর্সা দেব রঞ্জন, নগরপাল অনিন্দ্য কুমার সাহা, গোয়েন্দা প্রধান চন্দন মুখার্জি ও শেখর সেন মিলে একটা গোপন বৈঠক করে ঠিক করল, কোনোভাবেই এই ঘটনাকে বাইরে আনা যাবে না।
সময় ১৯৯০ সালের শেষ দিক। লালবাজারে কাজের অছিলায় ডেকে পাঠানো হল অনিকেত চ্যাটার্জিকে। তারপর গ্রেপ্তার। তিন-তিনজন সাজানো সাক্ষী সাক্ষ্য দিল অনিকেতের বিরুদ্ধে। সাক্ষীরা তার পোশাকের বিবরণও নিখুঁতভাবে দিল। আর সন্দেহের কোনো জায়গা রইল না। শুরু হল ইন ক্যামেরা ট্রায়াল। বাইরের লোক জানতেও পারল না। অনিকেতের বাবা-মা অনেকদিন গত হয়েছিলেন। থাকার মধ্যে ছিলেন স্ত্রী সুমনা আর তাদের দেড় বছরের ছেলে। তাদের জানিয়ে দেওয়া হল অনিকেতকে একটা অত্যন্ত গোপন কেসে কয়েকদিন কলকাতার বাইরে পাঠানো হয়েছে। প্রায় ছ’মাস ধরে চলল কেস। কিন্তু মাত্র তিনজন সাক্ষীর বিচারে একজন রেসপন্সবল অফিসারকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তার ওপর অনিকেত নিজে আদালতে নিজের ওপর নারকো টেস্টের আবেদন জানিয়েছে এবং সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি। বেশ কিছু মনোবিদও অনিকেতের পক্ষে কথা বললেন। পরবর্তীকালে সাক্ষীদের দেওয়া সাক্ষ্যেও হালকা ফাটল দেখা দিতে শুরু করল। শেখর সেন প্রমাদ গুনল। আবার ডাকল হাশিমকে। এবার বলল, জেলের ভিতর অনিকেতকে মেরে দিতে। পাঁচ লাখ টাকা নিল হাশিম। সাংসদ তহবিল থেকে কারচুপি চালিয়ে সে টাকা দিল তোর্সা।
সময় ১৯৯২, জুলাই মাস। জেলের ভেতর কুপিয়ে খুন করা হল অনিকেত চ্যাটার্জিকে। শেখর সেনের ভাগ্যোদয় হল, যখন মৃত্যুর পর পুলিশ এবং সরকার এমনভাবে সমস্ত সাজানো প্রমাণ মিডিয়া আর আদালতের সামনে পেশ করল, যাতে মরণোত্তর অনিকেতকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দোষী বলে দাগিয়ে দেওয়া হল। এবং কেসটি বন্ধ করে দেওয়া হল।
খবর গেল পরিবারের কাছে। ভেঙে পড়লেন সুমনা। কিন্তু এটাই শেষ নয়, যেহেতু স্বামী ছিলেন একজন অভিযুক্ত আসামি; সেহেতু বন্ধ হয়ে গেল পেনশন। অর্থাভাব আর অপমান মেনে নিতে না পেরে এক দিন তিন বছরের সন্তানকে প্রতিবেশীর কাছে রেখে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিলেন সুমনা। সুমনার নিঃসন্তান ভাই পরে এসে তার ভাগ্নেকে নিয়ে যায়। এবং নিজের সন্তানের মতো মানুষ করে। আজ সেই যুবক নিজের পরিচয় পুরোপুরি না জেনেও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একজন নির্ভীক পুলিশ অফিসার হয়ে উঠেছেন। তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রদীপ্ত সান্যাল বা প্রদীপ্ত অনিকেত চ্যাটার্জি।
অনিকেতের মৃত্যু ও সুমনার আত্মহত্যা শেখরকে অনেকটা স্বস্তি দিল। কিন্তু কথায় বলে বিপদের বারো ভাই, কয়েকদিন বাদে শেখর সেনের রক্তচাপ বাড়িয়ে স্টোনম্যান কেস নিয়ে গোপনে তদন্ত শুরু করল আমার ছোটকা আকাশ চক্রবর্তী। শেখর ততদিনে সেই তিনজন সাক্ষীকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ছোটকার খোঁজ পেতে বেশিদিন লাগবে না। সে নিজে যেচে ছোটকার সঙ্গে জুটে গেল। উদ্দেশ্য-ছোটকাকে বেপথে চালনা করা।
এই সময়ে আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। ঘুমের মধ্যে শেখর সেন হয় নিজেকে বার বার ফাঁসিতে ঝুলতে দেখছে, নয় দেখছে রক্তাক্ত অনিকেতকে বা পুড়ে যাওয়া সুমনাকে। ঘুমের ওষুধ খেয়েও লাভ হচ্ছে না। ঠিক করল ডাক্তার দেখাবে। কথায় বলে, ডাক্তার আর উকিলের কাছে কিছু লুকোতে নেই। কিন্তু এই ভীষণ সত্যি সে কাকে নির্ভয়ে বলবে?
এ সময়ে খোঁজ পেল ডাঃ আকাশ মিত্রের, যিনি একটি অপকর্ম করে বসে আছেন তার গৃহপরিচারিকার শিশু কন্যার সঙ্গে। শেখর সেন গোটা ব্যাপারটা নিজের হাতে নিল। ডাঃ মিত্রের সঙ্গে চুক্তি হল তার এই গোপন কথাটা শেখরের কাছে আর শেখরের গোপন কথাটা তার কাছে সুরক্ষিত থাকবে।
কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে এই কেসের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল ছোটকা। শেখর সেন জানত, সব প্রমাণ সরিয়ে ফেলা আছে, অনেকদিন ধরে লোকটা খুঁজে কিছু না পেয়ে এখন চুপ হয়ে গেছে। কিন্তু যেটা জানত না, সেটা হল ছোটকা পরের দিকে শেখর সেনকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। কারণ যে ক’বার শেখর সেনকে জানিয়ে ছোটকা কোনো কাজে নেমেছে বা লিড ফলো করেছে-সে লিড অবধারিতভাবে ফেল করেছে। কিন্তু ছোটকা তো ছোটকা, একসময় ধীরে ধীরে সে এই অসম্ভব নিপুণভাবে সাজানো মামালার তল পেল। বুঝল, কী কী হয়েছে। কিন্তু হাতে তখনও যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এই সময়ে ছোটকাও একটা বিরাট ভুল করে বসল। সে সোজা গেল শেখর সেনকে কনফ্রন্ট করতে। শেখর ততদিনে বিয়ে করে বাবা হতে চলেছে। সন্ধেবেলা একটা চেনা বারে দুজনের দেখা হল। মদের ঝোঁকে শেখর সেন একসময় সব উগরে দিল। ভাগ্যক্রমে আশেপাশে কোনো সাক্ষী ছিল না।
নেশা কাটলে শেখর সেন বুঝল, সে কী সর্বনাশ করেছে। উপায় না পেয়ে আরও একবার গোপনে যোগাযোগ করল তোর্সার সঙ্গে। তাকে দিয়ে জোর দেওয়াল রাজ্য প্রশাসনকে। ছোটকা আচমকা বদলি হল রানিগঞ্জে। শেখরের প্রথম পোস্টিং ছিল এখানে। সে তার এক পুরোনো সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ করল। সাজিদ জামাল। এক সময়ে পুলিশ ইনফরমারের কাজ করত এই শেখরের সঙ্গেই। তাকে দিয়ে ডবল এজেন্টের কাজ করাল শেখর সেন। সাজিদের কাজ ছিল প্রথমে ছোটকার বিশ্বাসভাজন হওয়া। আর সুযোগ বুঝে ছোটকার শত্রুদের তার হদিশ জানানো। সাজিদ কোনো ভুল করেনি। আরও একবার শেখর সেন জিতল।
কিন্তু বদলির খবর পেতেই ছোটকা বুঝে গিয়েছিল এর আসল উদ্দেশ্য। প্রয়োজনীয় সমস্ত ফাইল তাই সরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং সঙ্গী মহাবীর সিংকে। ছোটকা যখন পুরুলিয়ায় এস. পি ছিল, এই মহাবীর সিং ছিলেন সেখানকার হেড কনস্টেবল। ছোটকা বলে গিয়েছিল, এটা যেন তার মৃত্যুর পর আমার কাছে পৌঁছে যায়। মহাবীরকাকু সেদিনও ভুল করেননি, আশা করছি আজও করেননি। মৃত্যুর পর ছোটকার ডায়েরি এবং বেশ কিছু ফাইল আমি হাতে পাই। তার মধ্যে রয়েছে অনন্যা সেন রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেসের ফাইল, পিঙ্কি মণ্ডল মলেস্টেশন কেসের ফাইল, এবং বেশ কিছু মার্ডার কেসের ফাইল-যার প্রত্যেকটার মূল অভিযুক্ত হাশিম তেরাজি।
এবার আমার শেষ ভিক্টিম দিলীপ লাহা মণ্ডল, এ হল ছোটকার হত্যাকারীদের একজন, যারা ওর ওপর গুলি চালিয়েছিল। যখন ঝাড়খণ্ড পুলিশ কালু ওরফে ভৈরব সিংয়ের গ্যাংকে এনকাউন্টারে মেরেছিল, এই লোকটা কোনোভাবে বেঁচে যায়। পরে আসানসোলে এসে লুকিয়ে থাকে আর সুযোগ বুঝে সাজিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে শেখর সেনের সঙ্গে। তাকে অনুরোধ করে নাম-ধাম বদলে তাকে নতুন পরিচয়ের ব্যবস্থা করে দিতে। তার বদলে কালুর লুকানো সব টাকার সন্ধান সে দেবে।
শেখরের অর্থলোভ ছিল না। কিন্তু কয়লা চুরির টাকা মানে প্রায় কোটি টাকার ওপর। অত টাকার লোভ সামলানো যায় না। শেখর সেন একটা ফেক এনকাউন্টারে শেষ করে দিল দিগেন লাখা মণ্ডির জীবন আর জন্ম নিল দিলীপ লাহা মণ্ডল। এই খানে শেখর সেনের গল্প শেষ। আমার শুরু।
যেদিন এই গোটা ঘটনাটা জানতে পারলাম। আমিও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠলাম। একবার ঠান্ডা মাথায় ভাব তো বোধি, মানলাম ওর বোনের এই নিষ্ঠুর মৃত্যু মোটেই অভিপ্রেত নয়; তাই বলে বারোজন আশ্রয়হীন মানুষকে এইভাবে খুন করবে? আজ অনন্যা বেঁচে থাকলে কী ভাবত? যে নিজে এইসব আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয় গড়ে তুলেছিল!
প্রথমে ভাবলাম, সুযোগ বুঝে শেখর সেনকে মেরে দেব। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। কারণ এক, লোকটা হাই সিকিওরড গভর্নমেন্ট রেসিডেন্সে থাকে, দুই, মৃত্যু ওর কাছে মুক্তি হবে। ও যে কত বড় অপরাধী সেটা প্রমাণ করা যাবে না। নিজের বোনের পর লোকটার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হল তার স্ত্রী, কন্যা, নিজের সুনাম, খ্যাতি ও সম্মান। ওর থেকে এই সবকিছু কেড়ে নেব ঠিক করলাম।
ছকে ফেললাম প্ল্যান, শেখর সেনের সমস্ত হাত একটা একটা করে কাটতে শুরু করলাম। এই কাজে যখন হাত দিই, তখন ভাবিনি যে শেষে আমায় মরতে হবে। একটা সময় বুঝলাম, আইনের পথে শেখর সেনকে সাজা দিতে হলে আমায় জীবনের মায়া ত্যাগ করতে হবে। কারণ কোর্ট একজন খুনির কথায় কান দেবে না। সেই কারণে প্রতিটা খুনের আগে ভিক্টিমের থেকে ভিডিও কনফেসন রেকর্ড করে নিই অ্যাজ অ্যান এক্সট্রা অর্ডিনারি কেস; আমার মনে হয় কোর্টে এই ভিডিওগুলো অ্যাডমিসিবল হবে।
এবারে বোধি আর প্রদীপ্ত, তোমাদের আমি একটা গুরু দায়িত্ব দিয়ে যেতে চাই। যে কাজ আমি শুরু করেছিলাম কিন্তু শেষ করতে পারিনি, সেই কাজ তোমাদের শেষ করতে হবে। স্টোনম্যান কেসের ফাইল আমি আশা করি প্রদীপ্ত খুঁজে বার করে ফেলবে। প্রতিটা ভিক্টিমের কনফেশন একটা পেন ড্রাইভে সেভ করা আছে। সেটা মহাবীরকাকু তোমাদের দিয়ে দেবে। এছাড়া দিলীপ লাহা মণ্ডলের ফেক এনকাউন্টারে যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল, তার আসল ডেথ সার্টিফিকেট আর নকল ডেথ সার্টিফিকেট দুটোই রয়েছে মহাবীরকাকুর কাছে। আর তোমাদের একটু কষ্ট করে যেতে হবে বর্ধমান ও গঙ্গারামপুর। গঙ্গারামপুরে আজ পঁচিশ বছর ধরে লুকিয়ে আছে হারান মণ্ডল, ছোটন মাঝি এবং তৌফিক আহমেদ। এই তিনজন প্রদীপ্তর বাবার বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যে সাক্ষি দিয়েছিল। আর বর্ধমানে আছে ডাঃ মিত্রের হাতে নিগৃহীত হওয়া পিঙ্কি মণ্ডল ও তার পরিবার। এবং সবচেয়ে জরুরি ডাঃ আকাশ মিত্রের কাছ থেকে পাওয়া শেখর সেনের মেডিকেল কেসের ফাইল। এটাও ওই পেন ড্রাইভেই আছে, যেখানে সে নিজের করা অপরাধ নিজের মুখেই স্বীকার করেছে। তোমরা সব সাক্ষী ও সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে দেখা করবে অ্যাডভোকেট দীপাঞ্জন ঘোষালের সঙ্গে। ইনি ছোটকার ছোটবেলার বন্ধু। এনাকে আমি তোমাদের কথা আগেই বলে রেখেছিলাম। আশা করি মনে রেখেছেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই কেস তোমরা মানুষের সামনে নিয়ে আসবে। সাধারণ মানুষের এই সত্যিটা জানা খুব দরকার।
এই ছিল এই কেসের সত্যি। কি? মাথা খারাপ লাগছে তাই তো? লাগারই কথা। কথায় বলে ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। আমার কথা যদি জানতে চাও, তাহলে বলব যা করেছি তা আমায় করতেই হতো। তাই ঠিক ভুলের কথা ভাবিনি। এছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না।
একটা বিখ্যাত উক্তি আছে-’বিফোর ইউ এমবার্ক অন আ জার্নি অফ রিভেঞ্জ, ডিগ টু গ্রেভস’। আমি আমার কবর খুঁড়েই এ পথে নেমেছি। যদি সত্যিটা জেনেও এদের ছেড়ে দিতাম, তাহলে পরেরদিন আমার জেল হতো। শেখর সেন সাবধান হতো। আর ভিক্টিমরা সবাই আদালতে দাঁড়িয়ে নিজেদের বাঁচাতে অম্লানবদনে মিথ্যাচার করত।
আমার নৃশংসতা নিয়ে বললে তোমাদের একটা ছোট্ট প্রশ্ন করব-পুরাণে কথিত আছে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে মারতে ভগবান বিষ্ণু নৃসিংহ অবতার নিয়েছিলেন। ভগবান ব্রহ্মার সব আশীর্বাদি শর্ত মেনে তাকে সঠিক রূপে, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়, সঠিকভাবে বুক চিরে বধ করলেন। আচ্ছা চাইলে নৃসিংহদেব তো হিরণ্যকশিপুর গলা ধরে শূন্যে তুলে মটকেও দিতে পারতেন, বুক চিরতে গেলেন কেন? গেলেন কারণ, এই ঔদ্ধত্য, নৃশংসতা আর অধর্মের প্রতিবিধানের জন্য একটা উদাহরণস্বরূপ ভয়ংকর শাস্তির প্রয়োজন ছিল-যা মানবজাতি মনে রাখবে। আমি ভগবান নই, কিন্তু যারা প্রতিশোধস্পৃহা মেটাতে ও অর্থলোভে এই জঘন্যতম অপরাধে সামিল হয়েছে। তাদের এটাই প্রাপ্য শাস্তি বলে আমি মনে করি। এই চিঠিটা সামলে রেখো তোমরা। আদালতে কাজে লাগবে। আমার দৃঢ় ধারণা, শেখর সেনের উকিলরা যথাসম্ভব চেষ্টা করবে আদালতে আমায় পাগল প্রতিপন্ন করতে। আমি জানি, তোমরা সেটা হতে দেবে না।
পরিশেষে বলব, শেক্সপিয়ার বলেছেন নামে কী যায় আসে? আমি বলি, নামেই সব যায় আসে। বিশেষ করে আদ্যাক্ষরে। কারণ এই কাজ নিয়তি আমায় আদ্যাক্ষরে আদেশ দিয়েছে। তাই বলছিলাম বোধি, মহাভারত পড়াটা বন্ধ করিস না। আর কী, তোমরা ভালো থেকো, আর পারলে আমায় ক্ষমা কোরো।
ইতি
তোমাদের বিক্রম
চিঠিটা পড়ে মনে হল, আমি নড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। তিন দশকের পুরোনো এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা আর আইনরক্ষকের উর্দিধারী এক নরঘাতকের কাহিনি বিক্রম প্রায় পনেরো বছর ধরে চেপে রেখে দিয়ে ছিল। একটা মুহূর্তের জন্য কাউকে বুঝতে দেয়নি।
আজ পরিষ্কার হল, আমার মতো অপদার্থ কী করে বিক্রমকে পরাস্ত করতে পারল। সবটাই আসলে ওর পরিকল্পনার অঙ্গ ছিল। আর আমি ছিলাম সেই পরিকল্পনার এক সামান্য অংশ। একসময় হাসি পেল এই ভেবে যে, ওকে আমি মহাভারতের গল্প শুনিয়েছিলাম। যেখানে ও নিজে অন্য একটা মহাভারত রচনা করছিল। আমি প্রদীপ্তর দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর চোখে জল কিন্তু মুখ কঠিন। এক সময়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখনও বসে থাকবে?’ তারপর মহাবীর সিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার কাছে ওই উকিলের নাম্বার দিয়ে গেছে?’
মহাবীরবাবু কোনো উত্তর না দিয়ে একটা কার্ড বের করে আমার হাতে দিলেন।
‘ফোন লাগাও বোধিসত্ত্ব। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে আমার বাবা-মা ন্যায়ের অপেক্ষা করে চলেছে। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে পারি না আমরা,’ বলল প্রদীপ্ত। তারপর আবেগধরা গলায় বলল, ‘যে মানুষ আমার বাবা-মা’কে ন্যায়বিচার দিতে চেয়েছে, সে আমার গুলিতেই…’ গলা বুজে এল প্রদীপ্তর। আমিও আর সময় নষ্ট না করে ফোনটা হাতে নিলাম। অপরাধবোধের পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে গেছে বিক্রম। যতক্ষণ না এই মামলা ন্যায়বিচার পাচ্ছে, ততক্ষণ আমিও যে শান্তি পাব না।
