সূর্যতোরণে সূর্যাস্ত
‘মাফ করবেন আপনাদের বোধহয় অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম না! আসলে বয়স হয়েছে তো, স্নান করতে একটু সময় লাগে। চা দিয়েছে আপনাদের?’ কথাগুলো আমাদের উদ্দেশে বললেন বিরাশি বছরের বৃদ্ধ প্রণবেশ পাল, যিনি এককালের দাপুটে নেতা ছিলেন। আমরা এই মুহূর্তে বাগুইআটি চিনার পার্কের কাছে সূর্যতোরণ অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলায় বসে আছি। হাতঘড়ি বলছে সময় দুপুর একটা দশ।
ওনার কথা শুনে বিক্রম অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাল যে, আমরা চা খেয়েই এসেছি। এখন আর খাব না। তাতে যেন ভদ্রলোক আরও ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘দেখুন দেখি! প্রথমবার এলেন একটু যে মিষ্টিমুখ করাব, তার জো নেই। আসলে আমার আর আমার স্ত্রীর- দুজনেরই হাই সুগার।’
প্রদীপ্তর মনে হয় অনেকক্ষণ ধরেই অধৈর্য লাগছিল। এবারে সে খানিকটা ব্যস্ত হয়েই বলল, ‘আমরা এখন কিছুই খাব না পালবাবু। যে দরকারে এসেছিলাম, সে বিষয়ে একটু কথা বলি।’
প্রণবেশবাবু বোধহয় প্রদীপ্তর মনের কথা বুঝেই সামান্য হেসে বললেন, ‘আচ্ছা বেশ, বলুন কী দরকারে এসেছেন?’
প্রদীপ্ত বিক্রমের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতে বিক্রম প্রশ্ন করা শুরু করল, ‘প্রণবেশবাবু আপনার তোর্সা দেব রঞ্জনকে মনে আছে?’
প্রণবেশবাবু থুতনির কাছে হাতটা নিয়ে গিয়ে কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘বুঝেছি, আপনারা তোর্সার খুনের তদন্ত করতে এসেছেন।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ বিক্রম উত্তর দিল।
‘তোর্সাকে আমার বিলক্ষণ মনে আছে। বলুন কী জানতে চান?’
‘তোর্সা রাজনীতিতে যোগ দেন কী করে আর কবে?’
‘যতদূর মনে পড়ে ‘৮৬ সালেই ও পার্টি জয়েন করে। আর প্রথম ইলেকশন লড়ে ‘৮৮ সালে। সাংঘাতিক একটা রিস্ক খেলা হয়েছিল সেইবার। ও যদি হারত, ওর কী হতো জানি না-তবে পার্টিতে প্রবুদ্ধদার জায়গা হালকা হয়ে যেত।’
‘একটু যদি খোলসা করে বলেন ভালো হয়।’
‘দেখুন ‘৮৩ সালে আমরা পর পর দ্বিতীয়বার গণমান্য পার্টির বর্ষীয়ান নেতা নীহার রঞ্জন সেনের কাছে অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে হারি। প্রায় দু’লাখ ভোটের মার্জিনে। তোর্সাকে তার পর পরই পার্টিতে আনেন প্রবুদ্ধদা।’
‘প্রবুদ্ধ মানে তৎকালীন হোম মিনিস্টার প্রবুদ্ধ লাহিড়ী?’ প্রদীপ্ত জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ। শুনেছি তোর্সার বাবার সঙ্গে প্রবুদ্ধদার কীভাবে যেন পরিচয় ছিল, সেই সূত্রেই প্রবুদ্ধদা ওকে পার্টিতে নিয়ে আসেন। তবে হ্যাঁ, ও ততদিনে লেখালেখির জগতে সামান্য পরিচয় পেয়েছে, আর কী একটা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই সংস্থার গড়িয়াহাটের কাছে অফিস ছিল। জমজমাট এলাকা। ব্যাপারটা ধীরে ধীরে মানুষের চোখে পড়ে। অনেকে এগিয়ে এসে সাহায্যও করে। বেশ নাম হয়। একে উঠতি সাহিত্যিকের মানব সেবা, তার ওপর কমবয়সি সুন্দরী মেয়ে, যাকে বলে মণিকাঞ্চন যোগ।
‘প্রবুদ্ধদা একবারে ওকে তুলে নিয়ে আসেন। অবশ্য সে সময়ের বেশ কিছু পার্টি মেম্বার এই নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু প্রবুদ্ধদার ওপর কথা বলার সাহস কারও ছিল না। আর ‘৮৮তে তোর্সা সবার সব আপত্তিকে ধূলিসাৎ করে নীহার সেনকে প্রায় ৭২০০০ ভোটে পরাজিত করে। তার পরে আর কখনও ওকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি, টিল ‘৯৮।’
‘এই এনজিওর ব্যাপারটা কী ছিল? মানে কী ধরনের কাজ করা হতো?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।
প্রণবেশবাবু সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘দেখুন, তোর্সা যে সময় পার্টি জয়েন করে আমি তখন দিল্লিতে। সংসদের গ্রীষ্মকালীন অধিবেশন চলছিল। ফিরে এসে সব জানতে পারি। তবে ওদের ওই এনজিওর ব্যাপারটা যতদূর শুনেছিলাম, ওরা পথবাসীদের জন্য বাসস্থান তৈরির চেষ্টা করছিল। হ্যাঁ একটা ব্যাপার, তোর্সা পার্টি জয়েন করার পর ওটা বেশিদিন চলেনি, বন্ধ হয়ে যায়। কারণ আমার জানা নেই।’
‘সংস্থার নামটা খেয়াল আছে আপনার?’ বিক্রম অস্থিরভাবে জিগ্যেস করল।
‘না ভাই, এত বছর আগের কথা, তার মধ্যে আমি সাত ঝামেলায় থাকা মানুষ; এইসব ছুটকো ব্যাপার তেমন আমল দিইনি।’ প্রণবেশবাবুর কণ্ঠে যেন সামান্য ক্লান্তির ছাপ।
‘আচ্ছা একটা ডিস্টার্বিং প্রশ্ন করছি। তোর্সা কি কোনো বেআইনি বা অপরাধমূলক কাজে কখনও জড়িয়ে পড়েছিলেন?’ বিক্রম প্রশ্ন করল।
‘মানে? কোন অপরাধ?’ প্রণবেশবাবু বেশ অবাক হলেন।
‘রাজনীতির জগৎটা তো খুব সুন্দর নয় পালবাবু। তাই বলছিলাম ওনার কি কোনো লুকানো ইতিহাস আছে?’ প্রদীপ্ত বলে উঠল।
প্রণবেশবাবু হেসে বললেন, ‘তোর্সা অত বড় রাজনীতিবিদও ছিল না। ও প্রবুদ্ধদাকে আড়ালে বাবা বলে ডাকত। শুনেছি ওর নিজের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। প্রবুদ্ধদাও নিঃসন্তান ছিলেন। ফলে অদ্ভুত একটা বাবা-মেয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বেসিক্যালি তোর্সা ছিল পার্টির সাজানো পুতুল। যাকে ভোটের সময় আইক্যান্ডি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ‘৯৭ সালে যখন প্রবুদ্ধদা মারা যান, তখন থেকেই ও ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এর পরে ‘৯৮-তে হার, ২০০২-এ হার… তারপর হঠাৎ পদত্যাগ।’
‘আপনি বাধা দেননি?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।
‘অনেকবার বলেছিলাম এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিতে। শোনেনি, বড্ড জেদ ছিল। ওর জন্য সঠিক লোকেশন ছিল যাদবপুর আর দক্ষিণ কলকাতা। কিন্তু হঠাৎ ওর ইচ্ছে হল মুর্শিদাবাদে দাঁড়াবে। আচ্ছা, মুর্শিদাবাদের ক’টা মানুষ তোকে চেনে যে তুই ওখানে দাঁড়াবি! শুনল না। দাঁড়াল আর হারল। প্রথমে নিজের সিট তারপর পার্টিতে নিজের জায়গা।’ প্রণবেশবাবু কথা শেষ করে একটু জল খেলেন। এ সময় লক্ষ্য করলাম একজন মহিলা কিছু পাত্র আর থালা গ্লাস এনে পেছনের খাওয়ার টেবিলের ওপর রাখল।
‘আপনার বোধহয় খাওয়ার সময় হয়ে এল, আমরা আর আপনাকে বিরক্ত করব না।’ বিক্রম বিনয়ের সুরে বলল, ‘একটা শেষ প্রশ্ন, অবশ্য এটাকে অনুরোধও বলতে পারেন। তোর্সা যে এনজিওর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার সম্বন্ধে আমরা সবকিছু জানতে চাই। এমন কেউ কি আছে, যার কাছে সব জানা যেতে পারে? একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, যদি কিছু মনে পড়ে আমাদের প্লিজ জানাবেন। আর একটা কথা, তোর্সা পার্টি ছাড়ার পরেও আপনি ওনাকে এত সাহায্য করেছিলেন কেন?’
‘নিজের জন্য কিছু করিনি, আমার তোর্সার প্রতি সেরকম দুর্বলতা কোনোদিন ছিলও না। যা করেছি, পার্টির স্বার্থে করেছি। এর বেশি কিছু জানতে চাইবেন না।’ ভদ্রলোকের শেষ কথাগুলোয় সামান্য কাঠিন্যের আভাস পাওয়া গেল।
আমরা আর সময় নষ্ট না করে ওনাকে যথাযথ ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। ফিরতি পথে বিক্রমকে বললাম, ‘এখান থেকেও তো সেরকম কিছু জানতে পারা গেল না। এরপর কী করবি কিছু ভাবলি?’
বিক্রম অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লোকটা পোড়-খাওয়া পলিটিশিয়ান। পশ্চিমবঙ্গের এককালের সাংসদ, পরে ভূমি সংস্কার দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। আর একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের মতোই ইনিও বেশ গুছিয়ে কয়েকটা মিথ্যে কথা বললেন।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোন মিথ্যে কথা?’
‘বোধি, যিনি তোর্সার ইতি বৃত্তান্ত সন তারিখ আর সংখ্যাসহ মনে রেখে দিয়েছেন, তার এটা মনে নেই, যে তোর্সা কোন এনজিওর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন! এমনকী তোর্সা কোনো গন্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছিলেন কি না সেটাও মনে নেই? না রে, হি ওয়াজ ডেলিবারেটলি লাইং। তবে এক দিকে ভালোই হয়েছে।’
‘কী?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘তেঁতুল বটের কোলে দক্ষিণে যাও চলে, ঈশান কোণে ঈশানী কহে দিলাম নিশানী।’ এই খাপছাড়া কথাগুলো বলেই বিক্রম চুপ হয়ে গেল। আমিও বুঝলাম না এখানে ‘গুপ্তধন’-এর সঙ্গে কী সম্পর্ক?
পরদিন সকাল ছ’টায় বিক্রমের ডাকে ঘুম ভাঙল আমার। তবে এবারে ও খুব ধাক্কাধাক্কি করেনি, বরং সামান্য ঠেলা মেরেছিল। আমি উঠে দেখলাম, বিক্রমের থমথমে মুখ। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, ‘চতুর্থ খুন হয়েছে। চিনার পার্ক সূর্যতোরণ অ্যাপার্টমেন্ট।’
‘প্রণবেশ পাল?’ আমি সভয়ে প্রশ্ন করলাম।
‘না নিহতের নাম হাশিম তেরাজি। ওই অঞ্চলের বেশ নাম করা প্রোমোটার। তার থেকেও বড় কথা হল, লোকটা রুলিং পার্টির লোক। প্রদীপ্ত বলল, হাওয়া গরম আছে একটু বেলার দিকে আসতে।’
‘কখন যাবি?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘জানি না, তবে সবার আগে লালবাজার যেতে হবে। শেখরকাকু ডেকেছে।’ বিক্রম হালকা স্বরে বলল। একে শেখর সেনের তলব, তার ওপর বিক্রমের এই ঘাবড়ে যাওয়া-আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
