খুঁজি খুঁজি নারি – প্রমিত গুপ্ত

খুঁজি খুঁজি নারি

পরেরদিন সকালে দেখলাম, বিক্রম গোমড়া মুখে সোফার ওপর বসে আছে। সামনে ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে ছ’টা খবরের কাগজ। আমায় দেখেই কাগজগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিল। তিনটে ইংরেজি আর তিনটে বাংলা কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে একই খবর— ‘অ্যানাদার ভিক্টিম অফ দ্য মেলোডি বুচার’, ‘টেগোরস টিউন টার্স ডেডলি’, ‘দ্য প্লেব্যাক কিলার স্ট্রাইকস এগেন’, ‘ফের সুরঘাতকের তাণ্ডব’, ‘আবার বাজল প্রাণান্তকর সুর…’। 

আমি কাগজগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিক্রমকে বললাম, ‘এতগুলো কাগজ নিয়ে এসেছিস কেন? এই হেডলাইনগুলো দেখার জন্য?’

বিক্রম একটা হালকা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বোধি, এই খবরগুলোর মানে পুলিশের ওপর এই মুহূর্তে মারাত্মক চাপ হয়ে রয়েছে। আমরা এখনও তোর্সার খুনির কাছেই পৌঁছতে পারলাম না। আর খুনি দ্বিতীয় শিকার করে তৃতীয় শিকারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আমরা কোথাও একটা মারাত্মক ভুল করছি। কী ভুল-সেটা খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া দরকার।’ 

‘কোন ভুলের কথা বলছিস?’ আমি সোফায় বসে প্রশ্ন করলাম। 

‘কয়েকটা ব্যাপার মনে হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো সেরকম জোরালো কিছু নয়।’ বিক্রম কফির কাপ হাতে নিয়ে বলল, ‘আসলে ব্যাপারটা প্রথম থেকেই…’ কথা শেষ হওয়ার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। প্রদীপ্ত! বিক্রম স্পিকার অন করল। 

‘হ্যালো প্রদীপ্ত, বলো।’ 

‘হ্যাঁ বিক্রম, বলছিলাম তুমি কি বাড়িতে আছ? তাহলে একটু আসব। খুব দরকার।’ 

‘হ্যাঁ, চলে এসো। বাড়িতেই আছি।’

বারোটা নাগাদ প্রদীপ্ত আমাদের বাড়িতে এল। এই প্রথমবার ওকে বিনা ইউনিফর্মে দেখলাম। পরনে জিন্স আর টি-শার্ট ছাড়াও পিঠে একটা ব্যাগ। এসেই ব্যাগটা একদিকে ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। 

‘জল খাবে?’ বিক্রম জিগ্যেস করল। ‘প্লিজ’ একটা ছোট্ট উত্তর এল। 

জল খেয়ে প্রদীপ্ত একটু থিতু হয়ে বসে বলল, ‘অনেক কথা আছে, কোথা থেকে যে শুরু করি…।’ 

‘কাবেরী বাসুর কল আর হোয়াটস্অ্যাপ ডিটেইলসটা দিয়েই শুরু করো।’ 

প্রদীপ্ত খানিকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। বিক্রম সামান্য হাসল। 

‘তুমি আগে থেকে জানতে অজয় রঞ্জন আর কাবেরীর মধ্যে অ্যাফেয়ার চলছে! তারপরেও পুলিশকে কিছু জানাওনি?’ মনে হল, প্রদীপ্ত এই লুকোচুরি ব্যাপারটা ভালোভাবে নেয়নি। 

‘জানিয়ে কোনো লাভ হতো না প্রদীপ্ত। অজয় রঞ্জন আর কাবেরী বাসুর প্রেম আমাদের খুনির সন্ধান দিতে পারত না।’ 

‘বিক্রম তুমি পুলিশের সঙ্গে কাজ করছ। তোমার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, প্রেমজনিত ঈর্ষা থেকে হওয়া হত্যার ফাইলগুলো যদি এখানে এনে রাখি, তাহলে তোমাদের রাস্তায় থাকতে হবে। কারণ ঘরে জায়গা হবে না।’ প্রদীপ্তর কণ্ঠে কাঠিন্যের আভাস পাওয়া গেল। 

বিক্রম ঠান্ডা মাথায় বলল, ‘আমি জানি প্রদীপ্ত, তবে গোটা ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বললে তোমার সুবিধা হবে।’ 

‘বেশ, বলো।’ প্রদীপ্ত পায়ের ওপর পা তুলে হেলান দিয়ে বসল। 

বিক্রম আমায় যা যা বলেছিল, প্রদীপ্তকেও মোটামুটি সেটাই ব্যাখ্যা করল। প্রদীপ্ত সব মন দিয়ে শুনে বলল, ‘ওয়েল তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু আমায় একটা জিনিস বোঝাও তো, এই নাম্বারটা থেকে বেশ কয়েকবার ফোন এসেছে। এখানে এই নাম্বারটা কী করছে?’ প্রদীপ্ত ব্যাগ থেকে একতাড়া কাগজ বের করে আমাদের সামনে রেখে জিগ্যেস করল। কাগজগুলো সার্ভিস প্রোভাইডারের দেওয়া কল লিস্ট। কয়েকটা জায়গায় ফ্লুরোসেন্ট রঙের হাইলাইট করা আছে। 

বিক্রম লিস্টটা মন দিয়ে দেখে বলল, ‘এই নাম্বারটা +৪৪ ৭৭১২ ৩৪৫৯৭৯ এটা তো তিস্তার নাম্বার। এখানে কী করে এল?’ 

প্রদীপ্ত বলল, ‘আমারও সেই একই প্রশ্ন!’ 

বিক্রম দু’হাতে খানিকক্ষণ নিজের মাথা ধরে বসে তারপরে হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওহ্ আমি একটা উজবুক। এই কথাটা আগে কেন মনে হয়নি?’ 

‘কী মনে হয়নি?’ আমি জিগ্যেস করলাম। 

‘বোধি, তোর্সা প্রায় ষোলোটা বিভিন্ন ভাষার বই থেকে গল্প চুরি করেছিলেন। খালি ওর বাংলায় লেখা বই পড়ে সেটা কোন বই থেকে ঝাড়া, সেটা ধরা অসম্ভব। এইখানেই আসেন কাবেরী, আমার ধারণা যমুনাদেবীর মাধ্যমে তিস্তার সঙ্গে আলাপ হয় কাবেরীর। দুজনেরই তোর্সার ওপর একই কারণে রাগ। সুতরাং এনিমি অফ মাই এনিমি ইজ মাই ফ্রেন্ড। তোর্সার কোন লেখা কোথা থেকে নেওয়া-সেটা কাবেরীর থেকে ভালো কেউ জানবে না। তারপরের কাজটা তো জলবৎ তরলং। লং স্টোরি শর্ট, তিস্তা এবং অমরেন্দ্রবাবুর সঙ্গে মিলে কাবেরী তোর্সাকে তার কৃতকর্মের সাজা দিয়েছেন। কিন্তু খুনটা কে করেছে?’ 

বিক্রম একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘এই মুহূর্তে সবথেকে জোরালো মোটিভ যাদের ছিল তারা এক, অজয় রঞ্জন, কিন্তু উনি নিজের স্ত্রী’কে ত্যাগ করতে চাইছিলেন। তার দুটো কারণ-এক, তোর্সা ওনার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল আর দুই, পরের দিকে উনি কাবেরীর প্রেমে পড়েন। 

‘এবার দ্বিতীয় ব্যক্তি কাবেরী বাসু, ওনার লেখা তোর্সা চুরি করেছিল, কিন্তু উনি তার প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছেন তোর্সাকে এক্সপোজ করে। তিন তিস্তা, তার কথা আলাদা করে কিছু বলার নেই। এবার প্রবলেম হল, এদের প্রত্যেকের মোটিভ যেমন আছে, অ্যালিবাইও আছে। খুন না হলে তোর্সার ডিভোর্স নিশ্চিত ছিল। আর কাবেরী ও তিস্তার খুনের প্রয়োজন নেই। তাহলে খুনটা করল কে? আচ্ছা প্রদীপ্ত, ডাঃ মিত্রের কম্পিউটার থেকে কী কী পাওয়া গেছে?’ 

প্রদীপ্ত সোজা হয়ে বসে বলল, ‘কয়েক লক্ষ ফাইল, কিছু ওনার কম্পিউটারে আর বাদবাকি দুটো হার্ড ডিস্কে আছে। একটু সময় লাগবে।’ 

‘তুমি শুধু দেখো তোর্সার ফাইলটা পাওয়া যায় কি না। ওটা পাওয়া খুব জরুরি। আর ভালো কথা মানসী ব্যানার্জির প্রোটেকশন ডিটেইল কে দেখছে?’ 

‘আমি নিজে দেখছি। তবে ভদ্রমহিলা পুরোপুরি কো-অপারেট করছেন না। বড্ড বেশি স্বাধীনচেতা।’ 

‘হুম্’ বিক্রম একটা স্বগতোক্তি করে বলল, ‘স্বাধীনচেতা মানুষ…’ শেষ কথাগুলো বলতে বলতে বিক্রম উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে শুরু করল। তারপর আপন মনেই বলল, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমরা কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি না। অথচ জিনিসটা আমাদের সামনেই রয়েছে। যে জিনিস চোখের সামনে লুকিয়ে থাকে, তাকে খুঁজতে হলে জ্ঞানচক্ষু দরকার… সাদা চোখে দেখা যাবে না।’ 

‘কী বলছ বলো তো? কীসের জ্ঞানচক্ষু?’ প্রদীপ্ত অধৈর্যভাবে বলল। 

‘প্রদীপ্ত, তুমি ডাঃ মিত্রের কেসে নতুন কোনো ইনফরমেশন পেলে? হেল্পফুল কিছু?’ বিক্রম সম্পূর্ণভাবে বিষয় বদলে প্রশ্ন করল। 

‘এখনও পর্যন্ত একটাই ইনফরমেশন পেয়েছি, কতটা কাজে লাগবে জানি না। ওই শুয়োরের বাচ্চা সিকিউরিটি গার্ডের পরে নাকি মনে পড়েছে, সোয়া সাতটা নাগাদ সে দ্যাখে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে আলো নেভানো ছিল। পরে আবার আলো জ্বলা অবস্থায় দেখে তার সন্দেহ হয়।’ 

‘ডাঃ মিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হয়েছে?’ 

‘হয়েছে। আমি নিজে পুলিশ রেকর্ড চেক করেছি।’ প্রদীপ্ত বলল, ‘বললে বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ২০১৩ সালের নভেম্বরে একটা সিগন্যাল ভাঙা ছাড়া ভদ্রলোকের আর কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই। হি’জ রেকর্ডস আর টু ক্লিন।’ 

কথাগুলো শুনে বিক্রম খানিকক্ষণ চুপ করে ভাবল। তারপর বলল, ‘ওনার পরিবারে কে কে আছে?’ 

‘ওনার স্ত্রী আর এক ছেলে। ছেলে থাকে কানাডায়, তাকে খবর দেওয়া হয়েছে। সে দিনদুয়েকের মধ্যেই দেশে আসছে।’ 

‘প্রদীপ্ত, ওনার স্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। বলা যাবে?’ 

‘যাবে।’ 

‘এক কাজ করো, তুমি দুপুরের খাওয়া এখানেই সেরে নাও। তারপর একসঙ্গে বেরোব।’ বলে বিক্রম আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বোধি, পাঁচ মিনিটে স্নান করে নে। বেরোতে হবে।’ 

ডাঃ মিত্রের বাড়িতে গিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করার পর ওনার স্ত্রীর দেখা মিলল। শোকস্তব্ধ এক নারী ধীর পায়ে আমাদের সামনে এসে বসলেন। আমরা ওনাকে নমস্কার ও সমবেদনা জানালাম। এই প্রথম প্রদীপ্ত বিক্রমের আগে কথা শুরু করল। ‘মিসেস মিত্র, আমরা সকলেই আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু ডাঃ মিত্রের মৃত্যু যত না আকস্মিক, তার থেকেও বেশি অস্বাভাবিক। সুতরাং আমাদের আপনাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু প্রশ্ন করতে হবে। আশা করব, আপনি সহযোগিতা করবেন।’ উনি অত্যন্ত ধীরে ধীরে ওপর-নীচে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। 

প্রদীপ্ত চোখের ইশারা করতেই বিক্রম শুরু করল, ‘ম্যাডাম, আপনার পুরো নামটা?’ 

‘অর্চনা মিত্র।’ 

‘আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?’ 

‘উনি থাকলে এই শীতে পঁচিশ হতো। বাবলু বলেছিল, আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে এবার ও আমাদের ইউরোপ ঘোরাতে নিয়ে যাবে। আর ইউরোপ ঘোরা!’ শেষ কথাটার সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। 

‘ডাঃ মিত্রকে শেষ কয়েকদিন বা তার বেশি সময় ধরে কি কোনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা ভীত মনে হয়েছে?’ 

‘না, সেরকম কিছু তো মনে হয়নি। আসলে কখনও সেভাবে কিছু খুলে বলতেন না। প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম এটাই উনি। যেরকম চাপা, সেরকম সংযমী, শান্ত আর স্থির স্বভাবের মানুষ।’ 

‘কখনও কোনো গন্ডগোলের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন?’ 

‘না কোনোদিনও না। গন্ডগোল, ঝগড়াঝাঁটি, অশান্তি এসবের মধ্যে পারতপক্ষে থাকতেন না। এমনকী আমার সঙ্গেও ঝগড়া করতেন না।’ অর্চনাদেবী সামান্য একটু অন্যমনস্ক থেকে হঠাৎ বললেন, ‘একটা কথা জানি না আপনাদের কাজে লাগবে কি না, ওনার একটা খুব ট্রমাটাইজড শৈশব ছিল। অবশ্য পুরোটাই আমার ধারণা, কারণ এর কোনো প্রমাণ নেই। বিয়ের প্রথম দিকে কোনো কথা কাটাকাটি চলাকালীন যদি আমি চেঁচিয়ে উঠতাম, দেখতাম উনি দু’হাত কানের ওপর চেপে ধরে একটা ভয়ার্ত শিশুর মতো গুটিয়ে যেতেন। 

‘আমার শ্বশুর মারা যান, তখন উনি সতেরো না আঠেরো, আর বিয়ের দু’বছর আগে আমার শাশুড়ি। আত্মীয় বলতে আমার এক দেওর-কিন্তু সে-ও দিল্লিতে থাকে। তাকে জিগ্যেস করেও ফল হয়নি। তাই আমি কোনোদিন জানতে পারিনি, ওনার এই সমস্যাটা কেন?’ 

‘আপনার দেওর কি ডাক্তারবাবুর নিজের ভাই?’ 

‘না নিজের জ্যাঠার ছেলে। ওকে খবর পাঠানো হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় কলকাতায় পৌঁছবে।’ 

‘আচ্ছা মিসেস মিত্র, ওনার কোনো বন্ধুবান্ধব কেউ কিছু বলেছিল?’ 

‘ওনার সেরকম কোনো বন্ধু নেই। বাবলু মানে আমাদের ছেলে অনেকবার বলেছিল, পাপা একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলো। কিছুতেই রাজি হননি। বলতেন, ওসব ভালো লাগে না।’ 

‘বুঝলাম, এবার ওনার কাজের ঘরটা একটু দেখতে চাই।’ 

মিসেস মিত্র ওনাদের কাজের মেয়েকে ডেকে আমাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমার শরীরটা ভালো নেই।’

বিক্রম সবিনয়ে বলল, ‘কোনো অসুবিধা নেই ম্যাডাম। আপনি বিশ্রাম করুন।’ 

ডাঃ মিত্রের কাজের ঘরটা একেবারেই বৈচিত্র্যহীন। একটা ছোট পড়ার টেবিল ও চেয়ার, একপাশে দেওয়ালের গায়ে লাগানো একটা বুকশেলফ। কিছু মনোরোগ বিষয়ক বই আছে তাতে। আর একদিকে দেওয়ালে স্বামী বিবেকানন্দ, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ও সারদা মায়ের ছবি। বিক্রম খুব মন দিয়ে ঘুরে ঘুরে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করল। তারপর বলল, ‘চল, আর কিছু দেখার নেই এখানে।’ 

আমরা ডাঃ মিত্রের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মিসেস মিত্র আরেকবার আমাদের সামনে এলেন। বিক্রম অত্যন্ত নরম স্বরে জিগ্যেস করল, ‘কিছু বলবেন?’ 

‘হ্যাঁ একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ল। অনেক বছর আগের ঘটনা, তাই সবটা পরিষ্কার মনে নেই। তখন আমি সাত মাসের প্রেগন্যান্ট। শিলিগুড়িতে মায়ের কাছে ছিলাম। সে সময় একটা মেয়ে এই বাড়িতে কাজ করত, নাম লক্ষ্মী। কী যেন একটা গন্ডগোল হয়েছিল সে সময়… মেয়েটা হঠাৎ কাজ ছেড়ে চলে যায়। আমি ওনাকে জিগ্যেস করায় উনি বলেছিলেন, আচমকা নাকি লক্ষ্মী একশো টাকা মাইনে বাড়াতে বলেছে, উনি মানা করায় কাজ ছেড়ে দেয়।’ 

‘আপনার ব্যাপারটা বিশ্বাস হয়নি?’ 

‘না, আসলে লক্ষ্মী এই বাড়িতে আমার বিয়ের আগে থেকে ছিল। টাকা-পয়সা নিয়ে কোনোদিন কোনো সমস্যা হয়নি। পুজোর সময় আমি নিজে ওকে আর ওর মেয়েকে জামা-কাপড় কিনে দিতাম। সুবিধা-অসুবিধায় কতবার ওর হাতে টাকা গুঁজে দিয়েছি। সে হঠাৎ এভাবে একশো টাকার জন্য কাজ ছেড়ে চলে যাবে-এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি।’ 

‘পরে খোঁজ করেননি?’ 

‘করেছিলাম, কিন্তু শুনলাম ওরা নাকি কোথায় চলে গেছে।’ 

‘দেখুন ম্যাডাম, আপনার কথা অনুযায়ী ডাঃ মিত্রের মতো নির্বিবাদী মানুষ কী কারণে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াবেন? অবশ্য জড়ানোর মতো মানুষ ছিলেন কি না-সেটা আপনি ভালো বলতে পারবেন।’ 

মিসেস মিত্র হাঁ হাঁ করে বললেন, ‘না না, বিশ্বাস করুন উনি সেরকম মানুষই ছিলেন না। এই যে শ্যামলী এ বাড়িতে আজ পাঁচ বছরের ওপর আছে। কোনোদিন ওর সঙ্গে কোনো ঝগড়া অশান্তি কিছু হয়নি।’ 

‘আচ্ছা ম্যাডাম, ডাক্তারবাবুর কি কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল? মানে সুগার বা প্রেশার? কোনো ওষুধ খেতেন?’ 

‘মাথাব্যথার একটা ওষুধ ছিল। মাঝে মাঝে মাথা ধরলে খেতেন। তবে সুগার প্রেশার কিছু ছিল না।’ 

বিক্রম মিসেস মিত্রের দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিল। তারপর বলল, ‘ধন্যবাদ, চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, ডাক্তারবাবুর আততায়ীকে ধরতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব। আর আপনাকে এ অবস্থায় বিরক্ত করার জন্য আমরা দুঃখিত। আসি, নমস্কার।’ 

বাইরে আসতেই প্রদীপ্ত বিক্রমকে চেপে ধরল। ‘কী বুঝলে কী দেখলে?’ প্রদীপ্ত অস্থিরভাবে জিগ্যেস করল।

বিক্রম একটু হেসে বলল, ‘কিছুই সেভাবে দেখতে পেলাম না। এমনকী মাথাব্যথার ওষুধের একটা স্ট্র্যাপও নেই। আর সেটাই সিগনিফিক্যান্ট। প্রদীপ্ত, ওনার জ্যাঠতুতো ভাই কলকাতায় ঢুকলে একবার ওনার সঙ্গে বসতে হবে। আমরা এখনও একটা হাঞ্চের ওপর চলছি। কোনো প্রমাণ নেই আমাদের হাতে।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *