যেখানে দেখিবে ছাই – প্রমিত গুপ্ত

যেখানে দেখিবে ছাই

ক্যাফে মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। আমরা একটা কোনা দেখে বসে পড়লাম। বিক্রম প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রদীপ্ত আজকে বরং তোমার কনক্লুশন শুনব। আমি তো প্রত্যেকবার বলি।’

‘বেশ,’ প্রদীপ্ত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘দ্যাখো, নতুন পাওয়া সূত্র অনুযায়ী আজ থেকে প্রায় বছর তিরিশেক আগে এক ভদ্রমহিলাকে কেউ বা কারা ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছিল। কিন্তু এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে আজকে, এত বছর বাদে। কেন? এতদিন কী করছিল?’

‘…তার থেকেও বড় কথা হচ্ছে, নিকোলাস আর তোর্সাকে কেন মারা হল? এরা তো ভিক্টিমের নিজের লোক?’ বিক্রম যোগ করল।

এবারে আমি মুখ খুললাম, ‘আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে, আসলে এনারাই কেউ অনন্যাকে মেরে ফেলে বাইরে ভালো সাজতেন? কিংবা প্রথম দিকে এনারা সিরিয়াসলি লড়াই করছিলেন, পরে প্রোমোশন আর টাকা পেয়ে পিছিয়ে আসেন।’

‘এটা একটা ভালো পয়েন্ট কিন্তু।’ প্রদীপ্ত বলল। বিক্রমও মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। এতদিন বাদে কেন? আর ওই পুলিশ অফিসার কে, সেটাও জানা দরকার।’ কিছুক্ষণ ভেবে বিক্রম আবার প্রদীপ্তকে বলল, ‘আচ্ছা এটা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ কেস ছিল। তোমাদের ডেটা বেসে কিছু পাওয়া যাবে না?’

প্রদীপ্ত বলল, ‘এত আগের ঘটনা যদি ডেটাবেসে না-ও থাকে, তাহলে অন্তত পুরোনো ফাইলে পাওয়া যেতে পারে। ঘটনাটা যাদবপুর এইটবি বাস স্ট্যান্ডের কাছে ঘটেছিল যখন, যাদবপুর থানায় নিশ্চয়ই থাকবে। না থাকলে লালবাজার আর্কাইভে থাকবে। ওটা আমি দেখে নিচ্ছি।’

‘গ্রেট!’ বিক্রম বলল, ‘তবে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর এখনও পাচ্ছি না। যেমন, কী কারণে ডাঃ মিত্রের সঙ্গে সিক্রেট ডিল করা হয়েছিল? হাশিম তেরাজিকে মারা হল কেন? কে আসল অপরাধী? খুনির বয়স যদি ‘৮৬ সালে কুড়ি-বাইশ বছর হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও এখন তার বয়স হওয়া উচিত প্রায় পঞ্চাশ। একজন পঞ্চাশ বছরের লোকের অ্যাক্রোব্যাটিক স্কিল এত সাংঘাতিক ভালো হয় কী করে?’

এই সময় আমি বললাম, ‘আচ্ছা এটা কি ভালোভাবে চেক করা হয়েছে যে ওনার কোনো সন্তান ছিল কি না? হয়তো সে বড় হয়ে মায়ের বদলা নিচ্ছে?’

‘প্লটটা কোথা থেকে নিলি রে? অগ্নিপথ, বাজিগর না সোলজার?’ বিক্রম অম্লানবদনে আমায় চেটে দিল। আমি আর কিছু বললাম না।

বিক্রম বলল, ‘প্রদীপ্ত, তুমি চেক করো পুলিশ আর্কাইভ আর আমি ভাবছি একবার খবরের কাগজের অফিসে যাব। যদিও পুরো ‘৮৬ সালের সব খবরের কাগজ ঘাঁটা মানে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা। কিন্তু উপায় নেই। আশা করি এবার কিছু পাব, নয়তো আমায় গোয়েন্দাগিরি ছাড়তে হবে।’

রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে লাগলাম-কী হতে পারে। কয়েকদিন বা মাস নয়, প্রায় তিরিশ বছরের পুরোনো কেস হিস্ট্রি খুঁজে বের করা চারটিখানি কথা নয়। এই খুনগুলো কি কোনো পুলিশ অফিসার করছে নাকি অন্য কেউ?

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল…

যে পাথরটা দিয়ে হাশিম তেরাজিকে মারা হয়েছিল, ওটাকে কোথায় দেখেছি! কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব, তাহলে কি… একটা অজানা আতঙ্কে আমার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিক করে ঘুম এল না।

পরদিন আমি আর বিক্রম গেলাম দুটো সংবাদপত্রের অফিসে। সৌভাগ্যক্রমে, দু’জায়গাতেই আমাদের স্কুলের দুই বন্ধু চাকরি করে। প্রথম পত্রিকার অফিসে অনেক খুঁজে ওই বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারির সংস্করণে ভেতরের পাতায় একটা খবর পাওয়া গেল। এখানে জনৈকা নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ধর্ষণের সন্দেহ করা হয়েছে। তার সঙ্গে আবার খবরের শেষে এই প্রশ্নও করা হয়েছে যে-এত রাতে মহিলা ওই স্থানে কী করছিল? তবে সেরকম কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল না।

একটা সুবিধা হল, ঘটনার তারিখটা জানা গেল। দ্বিতীয় পত্রিকার অফিসে একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া গেল, তারিখ বলতেই পনেরো মিনিটের মধ্যে তিরিশ বছর আগের সংস্করণ আমাদের সামনে হাজির হল। এখানে একটি নয়, পর পর তিনদিনের কাগজে এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত করেছেন এক সাংবাদিক। তবে এখানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখলাম সাহিত্যিক হিসাবে তোর্সা দেবের নামও লেখা।

১৭ তারিখের সংস্করণে প্রথম ওনার স্বামী নিকোলাস রজার্সের নাম এসেছে, কিন্তু কোনোভাবেই মৃতার দাদার উল্লেখ কোথাও নেই। সারাটা দিন একরকম নষ্ট হল। ফিরতি পথে বিক্রমকে জিগ্যেস করলাম ‘কিছু বুঝলি?’ বিক্রম আমার দিকে না তাকিয়ে শুধু দু’পাশে মাথা নেড়ে ‘না’ বলে দিল। সারাদিনে প্রদীপ্তরও কোনো ফোন এল না।

বিক্রম সারা সন্ধে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে সোফায় বসে রইল। ও কি ভেঙে পড়ছে ভেতর থেকে? জানি না। সামনে গিয়ে একবার ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললাম, ‘এখনও লড়াই বাকি আছে বন্ধু, হাল ছেড়োনা। আমি তো রয়েছি পাশে নাকি!’ উত্তরে বিক্রম, শুকনো হেসে

একবার আমার হাতটা ধরল।

এর পরের প্রায় তিন দিন আমি বিক্রমকে আর এই তদন্তকে বিশেষ সময় দিতে পারলাম না। আমার কোচিং সেন্টারে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছে। কারণ পরের মাস থেকেই প্রায় সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে ক্লাস টেস্ট শুরু হয়ে যাবে। এ যাকে বলে পরীক্ষার প্রাক-পরীক্ষা প্রস্তুতি। সুতরাং প্রশ্ন তৈরি করা, পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা-এই সবে আমার সমস্ত মন প্রাণ নিয়োজিত করলাম। তবু এত কিছুর মধ্যেও মনের সেই কাঁটাটা রয়েই গেছে।

দু’দিন বাদে এক দিন কোচিং সেরে বাড়ি ফিরছি। হাতঘড়িতে সময় তখন রাত সওয়া ন’টা। হঠাৎ একটা জিনিস নজরে পড়ায় বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আরও একটা পাথর কম। আমি প্রমাদ গুনলাম। আমি যা আশঙ্কা করছি, সেটাই কি তাহলে… 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *