পাপের প্রাসাদ – প্রমিত গুপ্ত

পাপের প্রাসাদ

আমি এটা জানতাম, সল্টলেক মানেই ধনী আর প্রভাবশালীদের চারণভূমি-তাও এই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কেমন যেন একটা নো-বডি নো-বডি মনে হচ্ছিল। এই তিনতলা বাড়িটা থুড়ি প্রাসাদটা আক্ষরিক অর্থেই একটা চোখে পড়ার মতো স্থাপত্য। উঁচু করে গাঁথা পাঁচিল, মূল গেটের ওপর ঝুলে থাকা ব্রোঞ্জের নেমপ্লেট, যার ওপর সোনালি হরফে লেখা-’গঙ্গোত্রী’। গেটের সামনে সিকিউরিটি বুথ। বাড়ির বাইরে বেশ কিছু কৌতূহলী জনতার ভিড়, যাদের সামলাচ্ছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন পুলিশ। সঙ্গে বেশ কিছু বুম ও ক্যামেরাধারী সাংবাদিকও আছে। গলির মুখে থাকতেই প্রায় পাঁচটা ওবি ভ্যান দেখেছিলাম। 

গাড়ি থেকে নামার আগে প্রদীপ্ত আমাদের বলল, ‘তোমাদের কাছে রুমাল থাকলে ওটা মুখের ওপর মাস্কের মতো বেঁধে নাও। প্রেস যেন তোমাদের খোঁজ না পায়। এটা খুব জরুরি।’

গাড়ি থেকে নামতেই সামনে উপস্থিত দুজন কনস্টেবল প্রদীপ্তকে স্যালুট জানাল। বিক্রম আর আমার এখানে আসার কথাটা বোধহয় আগেই জানিয়ে রাখা হয়েছিল। 

এই সময় বিক্রম একটা অদ্ভুত কাজ করল, বাড়ির ভেতরে না ঢুকে ও হঠাৎ বলল, ‘প্রদীপ্ত… ভেতরে ঢোকার আগে একবার বাইরেটা ভালো করে দেখা দরকার। এত সিকিউরিটি, সিসিটিভি থাকা সত্ত্বেও একজন ঢুকে খুন করে বেরিয়ে গেল, অথচ কারও চোখে পড়ল না। ব্যাপারটা কেমন যেন মানতে কষ্ট হচ্ছে।’ 

‘তা বেশ চলো।’ 

গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বুঝলাম, বাড়িটাকে প্রাসাদ ভেবে মোটেও ভুল করিনি। প্রথমেই চোখে পড়ল একটা পরিপাটি, সবুজে ঢাকা বাগান। দু’পাশে লাগানো কয়েকটা অশোক গাছ আর ছাঁটা ঘাসের মধ্যে কিছু নাম না-জানা ফুলগাছ, মাঝখানে শুঁড়ি পথ ধরে কয়েক পা এগোলেই মূল ভবন। বাড়ির পিছনের জায়গাটা বেশ সংকীর্ণ। একপাশে সরু পথ দিয়ে রান্নাঘরের দরজা পর্যন্ত যাওয়া যায়। ঠিক পাঁচিলের গা ঘেঁষে একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ, যা মূল বাড়ির বাইরে লাগানো হলেও তার কিছু উঁচু ডাল বাড়ির ছাদ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। বাড়ির তিনতলার কার্নিসের কাছে কয়েকটা শুকনো ডাল ঝুলছে। 

‘একটু দাঁড়া!’ বিক্রম নিচ থেকে অনেকক্ষণ গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর নিচু স্বরে বলল, ‘এই কৃষ্ণচূড়া গাছটা বাড়ির দিকে একটু বেশি রকম হেলে রয়েছে না!’ 

‘হয়তো বাড়ি তৈরির আগে থেকেই গাছটা ছিল।’ আমি বললাম। 

বিক্রম এবার প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে বলল, ‘আচ্ছা প্রদীপ্ত, একবার সিকিউরিটির সঙ্গে কথা বলা যাবে?’ 

‘সার্টেনলি, দাঁড়াও আমি ডাকছি।’ 

প্রদীপ্ত ডাকতেই দুজন সিকিউরিটি গার্ড এসে আমাদের সামনে তটস্থ হয়ে দাঁড়াল। দুজনেই সংস্থার দেওয়া কালচে নীল ইউনিফর্ম পরা, বুকে অ্যালার্ট অ্যান্ড অ্যাজাইল সিকিউরিটি সার্ভিসেস লেখা একটা ছোট্ট লোগো। প্রথমজনের গায়ের রং গাঢ় বাদামি, মুখের গড়ন চওড়া, চুল ছোট করে ছাঁটা, গালে হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মুখের রেখাগুলো দেখে মনে হল বয়স খুব বেশি না, তবে অভিজ্ঞ। দ্বিতীয়জন তুলনামূলকভাবে লম্বা ও চওড়া কাঁধের। গায়ের রংও একইরকম, তবে পরিষ্কার মুখ, চোখে-মুখে একধরনের অস্থিরতা। 

বিক্রম দুজনকে প্রশ্ন করা শুরু করল, ‘আপনাদের নাম?’ 

প্রথমজন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি বিকাশ যাদব, সাব।’ 

দ্বিতীয়জন একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘হামার নাম শম্ভু কুশওয়া মালিক।’ 

‘কতদিন ধরে কাজ করছেন এখানে?’ 

বিকাশ সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘হামি পাঁচ মাহিনা, সাব। আর উ এসেছে দু’মাহিনা আগে।’ শম্ভু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। 

‘গতকাল রাতে কে ডিউটিতে ছিল?’ 

‘হাম থে, সাব। পর সামনের গেটে।’ শম্ভু এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল। 

‘আর পেছনের দিকে কে ছিল?’ 

‘পিছে তো কোই নেহি থা সাব।’ 

‘সে কী! কেন?’ 

‘পিছে কোই গেট নেহি আছে সাব। আট ফিট উঁচা দিওয়ার, উসকে উপার দো ফিট উঁচা কন্টিলা তার। উখান দিয়ে কোই নেহি আ সাকতা।’ শম্ভু বলল। 

‘অর বড়ে সাব নে মানা ভি কিয়া থা।’ বিকাশ বলে উঠল। 

‘দারাসাল, বাত ইয়ে হ্যায় কি, পেহেলে পেহেলে রাত কো হার দেড় দো ঘণ্টে মে হাম একবার ঘুম যাতে থে আন্দার কি তরফ, ইয়াহাঁ ভি আতে থে। একবার কি হল হামি ইখান দিয়ে টেহেলছিলাম, আচানক ভিতর সে কোই অওরাত কি চিখনেকি আওয়াজ আয়া। হাম তো ডর গ্যায়ে। ফির পাতা চলা ইয়াহাঁ বুরবক অওরাত লক্সমি দিদি সোতি হ্যায়। উ নিন্দ মে হামরা সায়া দেখকে ডর গ্যায়ি থি। উসদিন বহুত বাওয়াল হুয়া থা। সব নিন্দ সে উঠকে আ গ্যায়ে থে। বড়ে সাব হামকো বহুত ডাঁটা, ফির বোলা আন্দার আকে পেহেরেদারি করনেকা জরুরত না হ্যায়। বাতাইয়ে ইসমে হামরা কওন সা কসুর থা? উস দিন সে আন্দার কি তরফ পেহেরেদারি বন্ধ।’ 

‘বুঝলাম, তা আপনারা কাল কোনো আওয়াজও শুনতে পাননি?’ 

‘নেহি সাব, কুছ সুনতে তো ব্যাঠকে থোরি রেহতে?’ 

‘দারুণ! একজন ঢুকল, এইরকম বীভৎসভাবে একটা খুন করল, আর আপনাদের দুজনের কেউ একজনও কিছু দেখলেনও না, শুনলেনও না। এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে?’ 

‘সাবজি আম্মা কসম, ঝুট বোলে তো সসুর হামরা জাবান টেরা হো যায়ে।’ 

‘চিন্তা নেই, প্রয়োজনে জাবান টেরা করেই সত্যিটা বের করব।’ 

‘একদমই তাই।’ বিক্রমের বলা শেষ কথাগুলোতে তাল মিলিয়ে সায় দিল প্রদীপ্ত। 

‘ঠিক আছে প্রদীপ্ত, এদের থেকে আপাতত আর কিছু জানার নেই।’ 

প্রদীপ্ত দুজনকে বলল, ‘এই তোমরা যাও।’ 

দুজনেই হালকা স্যালুট ঠুকে চলে গেল। 

প্রদীপ্ত বিক্রমকে উদ্দেশ করে জিগ্যেস করল, ‘এবার কোথায়?’ 

‘চলো ভেতরে যাই। আগে হাউস হেল্পদের সঙ্গে কথা বলব।’ 

‘চলো।’ 

আমরা মূল দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। ডান দিকে সরু করিডোর দিয়ে গেলে দুটো কমন বাথরুম, আর সোজা এগিয়ে গেলে রান্নাঘর। রান্নাঘরের ঠিক পাশেই তিনটে ছোট কামরা, যেখানে বাড়ির পরিচারিকারা থাকেন। সিঁড়ির ডান দিকে একটা ব্যাকডোর রয়েছে, যা বাড়ির পেছনের সরু চত্বরের দিকে খোলে। সেই দরজার পাশেই একটা ছোট স্টোর রুম। 

বিক্রম চারপাশটা ভালো করে দেখে নিচ্ছিল। প্রদীপ্ত একটু এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘কথাবার্তা এখানেই বলবে? নাকি ওপরে যাবে?’ 

‘না হাউস হেল্পদের সঙ্গে এখানেই কথা বলব। ক’জন লোক আছে?’ 

‘পরিবারের সদস্য এখন চারজন-তোর্সাদেবীর স্বামী অজয় রঞ্জন, মা যমুনা দেব, কন্যা ঝিলাম আর পুত্র সরযূ। এছাড়া আছেন কাবেরী বাসু, ওনার সেক্রেটারি।’ 

‘আর যারা কাজ করে?’ 

‘একজন পুরোনো চাকর, যমুনাদেবীর দেখাশোনার জন্য একজন সারা দিনের আয়া, একটা রান্নার লোক এই বাড়িতেই থাকে, একজন মালি সপ্তাহে দু’বার আসে, শনিবার আর রবিবার। আর চারজন সিকিউরিটি।’ 

‘চারজন?’ 

‘শিফটিং ডিউটি, দুজন যাদের সঙ্গে বাইরে কথা বললে তারা নাইট শিফট আর ডে শিফটের গার্ড এই এল বলে।’ 

বিক্রম একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ‘বেশ, এই বাড়ির যিনি সবচেয়ে পুরোনো চাকর, তাকে দিয়েই শুরু করি।’ 

প্রদীপ্ত ডাক পাঠাল। কিছুক্ষণ পর একজন প্রৌঢ় লোক ধীর ক্লান্ত পায়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বয়স বোধ করি সত্তর বা তার আশেপাশে হবে। রোগা একহারা চেহারা, চোখে একটা সাধারণ ফ্রেমের চশমা। পরনে একটা ঢিলা পায়জামা আর গায়ে আধ-ময়লা ফতুয়া। প্রৌঢ় দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে আমাদের নমস্কার করলেন। বিক্রম ইশারা করায় সামনে রাখা চেয়ারটায় এসে বসলেন। বিক্রম প্রশ্ন করা শুরু করল। 

‘আপনার নাম?’ 

‘আইজ্ঞে হরিনাথ দাস। সকলে আমায় হরিদা ডাকে।’ 

‘এই বাড়িতে কতদিন আছেন?’ 

হরিনাথ একটু ভেবে বললেন, ‘তা বাবু পেরায় পঞ্চাশ বছরের ওপর।’ 

‘বটে!’ 

‘আইজ্ঞে, বিয়ার সময়ে মা জননী আমারে নিজের লগে কইরা নিয়া আসেন, হেই থিকা এইহানেই আছি। বড়মা আর কর্তাবাবু দুইজনেই আমারে বড় ভালোবাসতেন।’ 

‘কর্তাবাবু আর বড়মা মানে…’ 

‘আইজ্ঞে আমাগো ছোটদাদাবাবুর বাপ-মা।’ 

‘আচ্ছা, তা পঞ্চাশ বছরের ওপর যখন আছেন, তখন এখানকার রোজনামচার একটা বিবরণ দিন তো!’ 

‘আইজ্ঞে রোজনাইমচা?’ হরিনাথ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন। 

এবার পাশ থেকে প্রদীপ্ত বলে উঠল, ‘রোজনামচা বলতে এই বাড়ির লোকেরা কে কখন খায়, ঘুমায়, কোথায় যায়, কখন যায়, কখন ফেরে-এইসব।’ 

‘ও বুঝছি।’ 

‘বেশ তাহলে বলুন।’ 

‘প্রথমে ছোটদাদাবাবুর কথা দিয়া কই, ছোটদাদাবাবু খুব কড়া মেজাজের মানুষ, তাঁর সবকিছু সময়ে চলে। এক্কেরে ঘড়ি ধইরা ভোর পাঁচটায় ওঠেন। তারপর এক গেলাস লেবু জল খান, খাইয়া ওই যে আমাগো বিডি পার্ক আছে, হেইহানে দৌড়াইতে যান, দুই ঘণ্টা পর ফিরেন। ফিরাই চান করতে চইলা যান, তার আগে ওনার প্যান্ট, শার্ট, বেল্ট, রুমাল, গেঞ্জি, আন্ডারপ্যান্ট সব গোছায় রেডি রাইখতে হয়। আটটার সময় টিফিন করেন- দুইটা টোস্ট, তার লগে দুইটা ডিম মামলেট, আর দুধ-চিনি ছাড়া কফি। আটটা পনেরো নাগাদ অমিত আইসে।’ 

‘অমিত কে?’ বিক্রম জিগ্যেস করল। 

‘আইজ্ঞে ওনার ডেরাইভার। ও আইসা গাড়ি বার কইরলে ঠিক সাড়ে আটটার সময়ে বাইর হইয়া যান।’ 

‘আর ফেরেন কখন?’ 

‘ফিরনের তো ঠিক-ঠিকানা নাই সবসময়। তবে মেলা সময় দ্যাখছি সাড়ে আটটা থিকা নয়টার মধ্যি আইসা পড়েন। মাঝে মধ্যি রাত এগারোটা বারোটাও হইয়া যায়।’ 

‘আর যেদিন অফিস যান না, সেদিন কী করেন?’ 

‘ওই দিন পোলা মাইয়ার লগে সময় কাটান, পড়ালেখা দ্যাখেন, মাঝে মধ্যি অগো লইয়া বেড়াইতে যান।’ 

‘আর বাকিরা?’ 

‘বাকি বলতে ছোট বউদিমণির মা আছেন, অগো তো শরীর ভালো নাই আজ অনেকদিন। নড়াচড়া কইরতে পারেন নাই। কয় বছর আগে অগো একখান এস্ট্রোক হইছিল। হেই থিকা বাঁ দিকটা এক্কেরে পইড়া গেছে। উনি ঘরেই শুইয়া থাকেন আর টিভি দ্যাখেন। দেখাশোনার জন্যি বেলা আছে।’ 

‘হুম, এবার আপনার ছোট বউদিমণির মানে তোর্সা দেব রঞ্জনের কথা বলুন। উনি কী করতেন? কোথায় যেতেন? কে কে ওনার সঙ্গে দেখা করতে আসত? আর সব চেয়ে জরুরি, উনি কেমন মানুষ ছিলেন?’ 

‘বউদিমণি বড় ভালো মানুষ ছিলেন বাবু, কিন্তু শরীরে মেলা রাগ ছিল। একবার রাগ হইলে বুদ্ধি-শুদ্ধি সব লোপ পাইত। সেবার কী হইছিল, আমাগো ঝিলামদিদি কী একখান বদমাইশি করছিল। ওরে ঠাকুর, সে কী মাইর মারল রে ওইটুকু মাইয়াডারে, রক্তারক্তি কাণ্ড। আমরা তো সবাই মিলাও ঠেকাইতে পারতাছিলাম না। শেষে কাবেরীদিদি ছোটদাদাবাবুরে ফোন কইরা ডাকলেন। উনি একটু পরে আইসা পড়লেন, তারপর সব ঠিক হইল। 

‘সেবার দাদাবাবু আর বউদিমণির মইধ্যে মেলা চেঁচামিচি হইছিল। ছোট বউদিমণিরে একবার এই কারণে ডাক্তারের লগেও নিয়ে যাওয়া হইছিল। ডাক্তার বাড়িতেও আইতেন। বউদিমণি কী সব ওষুধ খাইতেন, কিন্তু তাও মাত্র কয়দিন। তারপর ছাইড়া দিলেন। তবে আমাগো সবাইরে খুব ভালোবাইসতেন। এই যে রান্ধন করে- লক্ষ্মী, ওর পোলা মাইয়ার লেখাপড়ার সব খরচ বউদিমণি দ্যান। তারপর কাবেরীদিদির মায়ের অপারেশন হইছিল, হেই খরচও উনি দিলেন। তাঁর যে এমন কিছু হইব…’ 

হরিনাথ কথাটা শেষ করতে পারলেন না, অনেক কষ্টে কান্না চাপলেন, তারপর চশমা খুলে নিজের জামা দিয়ে চোখ মুছলেন। বিক্রম খানিকক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, উনি কি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন?’ 

‘আইজ্ঞে বাবু। বউদিমণি ওনার লেখাপড়ার ঘরে থাইকতেন, আমিও জাগতাম, মাঝে মধ্যি ওনারে কফি কইরা দিতে হতো।’ 

‘কাল রাতে আপনি কিছু অস্বাভাবিক দেখেছিলেন বা শুনেছিলেন?’ 

‘না বাবু, কিছু শুনি নাই।’ 

‘কেন? কাল রাতে জাগেননি?’ 

‘আইজ্ঞে না, জাগার হলে বউদিমণি আগে থাইকতে বলি রাইখতেন। কাল কিছু বলেন নাই।’ 

‘শেষবার কখন দেখা হয়েছিল ওনার সঙ্গে?’ 

‘কাল রাইতে খাওয়ার সময়।’ 

‘শেষ কয়েকদিনে ওনার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলেন?’ 

‘অ্যাঁ?’ হরিনাথ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন। 

‘মানে দেখে কি খুব টেনশনে বা ভয়ে ভয়ে আছেন বলে মনে হয়েছিল?’ 

‘না বাবু, সেরকম তো কিছু দেখি নাই।’ 

‘আচ্ছা, তোমার দাদাবাবু আর বউদিমণির মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?’ 

এই প্রশ্নে হরিনাথ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল।

প্রদীপ্ত ধমক দিল, ‘কী হল? উত্তর দাও।’

হরিনাথ কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললেন, ‘বাবু এই প্রশ্ন আমারে করবেন নাই। আপনাগো পায়ে পড়ি। আমি এ বাড়ির নুন খাইছি…’ বলতে বলতে একেবারে কেঁদে ফেললেন।

বিক্রম হরিনাথের দিকে সামান্য ঝুঁকে নরম সুরে বলল, ‘হরিদা, আপনি মিথ্যে বলেন না আমরা জানি। কিন্তু যদি সত্যি লুকান, সেটাও মিথ্যের থেকে কোনো অংশে কম অপরাধ হবে না। এই বয়সে কেন নিজের পাপ বাড়াবেন! তাই বলেই ফেলুন।’ 

হরিনাথ চোখ মুছে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলতে শুরু করলেন, ‘বাবু, বউদিমণির শুধু যে রাগ ছিল তাই নয়-এই শেষ কয় বছরে মেলা খিটখিটে হইয়া গেছিলেন। কথায় কথায় বাবুরে হেনস্থা কইরতেন। কোন পুরুষ মানুষ এমন ব্যভার সহ্য করবে বলেন দেখি। তাই একসময়ে ছোটদাদাবাবু কথা বলা বন্ধ কইরা দিছিলেন। খুব প্রয়োজন ছাড়া ওনাগো মধ্যে কথাবার্তা বিশেষ ছিল না।’ 

বিক্রম ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কতদিন ধরে?’ 

‘তা বাবু প্রায় বছর তিনেক হইল। একদিন কী নিয়ে যেন দুজনের মধ্যি খুব কথা কাটাকাটি হইছিল। সেই থিকা।’ 

‘আর ঝিলামকে মারার ঘটনাটা কবেকার?’ 

‘সেটাও অনেকদিনই হইল, তবে তখন বউদিমণি এখনকার মতো খিটখিটে হন নাই।’ 

বিক্রম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তোমার কিছু জানার আছে এনার থেকে?’ উত্তরে প্রদীপ্ত ঘাড় নেড়ে না বলল। বিক্রম হরিনাথের দিকে ফিরে বলল, ‘ঠিক আছে হরিদা, আপনি আসতে পারেন। প্রয়োজনে আবার ডাকব।’ 

‘নেক্সট কে?’ বিক্রম প্রদীপ্তকে জিগ্যেস করল। 

‘রান্নার মহিলাটিকে ডাকি? কী যেন নাম?’ 

‘লক্ষ্মী।’ আমি বললাম। 

কিছুক্ষণ পর এক লেডি কনস্টেবল একজন মহিলাকে এনে দাঁড় করালেন। দেখে মনে হল যেন একটা ভারসাম্যহীন পুতুলকে কেউ অনেক কষ্টে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ছোঁয়া লাগলেই পড়ে যাবে। আর হলও তাই। বিক্রম মহিলাকে সবেমাত্র জিগ্যেস করেছে, ‘আপনার পুরো নাম বলু…’ কথাটা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই মহিলা হঠাৎ করে বলে উঠলেন, ‘ও বাবু, আমি কিছু জানি না গো! আমি কিছু করিনি…’ বলেই জ্ঞান হারালেন। ভাগ্যক্রমে ওই লেডি কনস্টেবল পড়ার আগেই ওনাকে ধরে পাশের সোফায় শুইয়ে দিলেন। তারপর আমাদের বললেন, ‘এনার অবস্থা সকাল থেকেই এরকম। সকালে বডি দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।’ 

প্রদীপ্ত ধমকের সুরে বলল, ‘আর সেটা আপনি এখন জানাচ্ছেন?’ 

‘আসলে স্যার আপনারা এসেছেন বলে আমি ভাবলাম…’ 

‘কী ভাবলেন? একজন অসুস্থ মহিলা, হঠাৎ হার্ট ফেল করলে গোটা দোষ এসে পড়ত ডিপার্টমেন্টের ওপর। পাল্স চেক করুন তাড়াতাড়ি।’ 

বিক্রম এগিয়ে এসে বলল, ‘দাঁড়াও, আমি দেখছি।’ তারপর কিছুক্ষণ মহিলার নাড়ি ধরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে রইল। বলল, ‘ধীরে ধীরে নরমাল হচ্ছে। চিন্তার কিছু নেই।’ এর পর লেডি কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘ইনি কোন ঘরে থাকেন?’ 

লেডি কনস্টেবল আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে দেখালেন, ‘এই যে স্যার-এই ঘরটা।’

দরজা খোলাই ছিল, বিক্রম উঠে সেই ঘরে ঢুকে গেল। পেছন পেছন আমরাও গেলাম। 

একেবারে বৈশিষ্ট্যহীন একটা ঘর। আয়তন বোধ করি খুব বেশি হলে ৫ বাই ৮ ফিট। ঘরে ঢোকার দরজার ঠিক উলটো দিকের দেওয়ালে বেশ বড় সাইজের একটা জানালা, যার সামনে একজনের শোয়ার মতো একটা তক্তপোশ। বিক্রম পুরো ঘরটাকে ভালো করে দেখল। তারপর জানালার সামনে গিয়ে দু’দিকে দেখে নিয়ে উবু হয়ে বসে ওপরে কিছু দেখার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘চলুন।’ 

ঘরের বাইরে এসে প্রদীপ্ত বিক্রমকে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা বিক্রম, সিন্স উই আর ওয়ার্কিং টুগেদার, তুমি এখনও কী বুঝলে জানতে পারি?’ 

বিক্রম হেসে বলল, ‘এখনও সেরকম সিগনিফিক্যান্ট কিছু পাইনি। পেলে বলছি। বাই দ্য ওয়ে প্রদীপ্ত, এবার একটু ক্রাইম সিনটা দেখতে চাই, যদি অসুবিধা না থাকে।’ 

‘না না অসুবিধা কীসের? আমিও ভাবছিলাম তোমায় বলব। এই তো ফার্স্ট ফ্লোরে। এসো।’ 

আমরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে বেশ কিছু পারিবারিক ছবি ঝুলছে, যাতে তোর্সা দেব রঞ্জন ও তার পরিবারকে চিনতে অসুবিধা হয় না। বেশিরভাগ ছবি ছুটি কাটানোর। সিঁড়ির বাঁ দিকে যমুনা দেবের শোবার ঘর, দরজা বন্ধ। সামনে করিডোর ধরে এগোলেই ডান পাশে তোর্সা দেব রঞ্জনের স্টাডি। দরজা সিল করা, সামনে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। করিডোরের আরেক প্রান্তে, ডান দিকে অজয় রঞ্জনের অফিস ও স্টাডি-তুলনামূলক ছোট একটা ঘর। 

‘স্বামী-স্ত্রীর স্টাডি দেখছি পাশাপাশি!’ বিক্রম প্রদীপ্তর উদ্দেশে বলল। 

‘হ্যাঁ, তবে উনি মনে হয় না অনেক রাত অবধি এই ঘরে ছিলেন। আই মিন যার এত ভোরে ওঠা অভ্যাস।’ প্রদীপ্ত অজয় রঞ্জনের ঘরের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল। এই সময় হঠাৎ যমুনাদেবীর ঘরের ভেতর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। খানিক থতমত খেয়ে গেলেন আমাদের দেখে। বিক্রম ভদ্রমহিলার দিকে সামান্য এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু বলবেন?’ 

‘হ্যাঁ, মানে ওই…’ ভদ্রমহিলা তার কথা শেষ করার আগেই প্রদীপ্ত বলে উঠল, ‘জানি জানি, আমাদের ইনফর্ম করেছেন মিস্টার রঞ্জন। ওনাকে এখন আমরা বিরক্ত করব না।’ 

‘কী ব্যাপার?’ বিক্রম অবাক হয়ে জিগ্যেস করল। 

‘মেয়ের মৃত্যুর খবর মা খুব ভালোভাবে নেননি। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার এসে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে গেছেন। শেখরস্যারেরও অর্ডার আছে ওনাকে এই মুহূর্তে বিরক্ত করা যাবে না।’ 

বিক্রম মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘সে তো অবশ্যই। চিন্তা নেই আমরা ওনাকে কোনোভাবে বিরক্ত করতে আসিনি।’

উত্তরে ভদ্রমহিলা যেন অনেকটা মনের জোর এনে বললেন, ‘না মানে আপনারা যদি একটু যাতায়াত আর কথাবার্তা ধীরে করেন তাহলে সুবিধা হয়। মাসিমার ঘুম পাতলা আর কানও খুব পরিষ্কার।’ 

‘নিশ্চয়ই।’ প্রদীপ্ত আশ্বাস দিতেই ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকতে যাবেন, বিক্রম আচমকা ওনাকে ডাকল, ‘একটু শুনুন প্লিজ।’ 

‘হ্যাঁ বলুন।’ 

‘আপনি নিশ্চয়ই…?’ 

‘হ্যাঁ, আমি মাসিমার দেখাশোনা করি। নাম বেলারানি দাস। এই বাড়িতে আছি প্রায় বছর পাঁচেক হবে। এই বাড়িতে মালির কাজ করে জগন্নাথদা-উনি আমার বরকে চেনেন। উনিই এই কাজটার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগে আমি ঠিকে কাজ করতাম আর কাল রাতে আমি কানে তার দিয়ে মোবাইল দেখছিলাম, তাই কিছু শুনিনি।’ 

ভদ্রমহিলা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন। বিক্রম হেসে বলল, ‘আরিব্বাস, আপনি কি মুখস্থ করে রেখেছিলেন নাকি?’ 

ভদ্রমহিলা বললেন, ‘না, আসলে সবাই এই কথাগুলোই জিগ্যেস করছে তো তাই।’ 

‘একজন অসুস্থ মানুষের দায়িত্ব আপনার হাতে আর আপনি রাতে কানে ইয়ারফোন গুঁজে ফোন দেখছিলেন? বাইরের কথা বাদ দিলাম, ওনার যদি কোনো অসুবিধা হয়?’ প্রদীপ্ত জিজ্ঞাসা করল। 

‘মাসিমা রাতে যে ঘুমের ওষুধটা খান, সেটা খেলে সহজে ঘুম ভাঙে না। আর যদি ওঠার দরকার হয়, তাহলে আমি খাটের পাশেই শুই।’ ভদ্রমহিলার মুখে পুরো উত্তর তৈরি। আশ্চর্য সাহস। পুলিশের সামনে যেখানে আচ্ছা আচ্ছা লোক ঘাবড়ে যায়, সেখানে ইনি অদ্ভুত রকমের স্থির ও শান্ত। বিক্রম অনেকক্ষণ ধরে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন।’ 

আমরা এবারে তোর্সা দেব রঞ্জনের স্টাডি রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে পাহারারত কনস্টেবলকে বলতেই সে দরজা খুলে দিল। 

প্রদীপ্ত বলল, ‘ক্রাইম সিনে প্রবেশ করার আগে এই প্রোটেকশনটা নেওয়া খুব জরুরি।’ বলে আমাদের হাতে দু’জোড়া রবারের গ্লাভস দিয়ে দিল। এবার আমরা তোর্সা দেব রঞ্জনের স্টাডিতে ঢুকলাম। এখানে দরজার উলটো দিকে একটা বেশ বড় সাইজের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, তার ঠিক সামনেই একটা বড় এক্সিকিউটিভ টেবিল আর চেয়ার জানালার দিকে পিঠ করা। জানালার দু’দিকে ঘরের দুই কোনায় দুটো বেশ বড় বড় লম্বা ফ্লাওয়ার ভাস রয়েছে। 

তবে যেটা দেখে এককথায় মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়-সেটা ভদ্রমহিলার বইয়ের কালেকশন। গোটা ঘরের তিন দেওয়াল জুড়ে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত শুধু বই আর বই! ইংরেজি বাংলা আর বেশ কিছু বিদেশি ভাষা মিলিয়ে এই ঘরে অন্তত এক হাজারের বেশি বই আছে। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। বিক্রমের ডাকে হুঁশ ফিরল। 

‘কী দেখছিস?’ 

‘না, ওনার বইয়ের কালেকশনটা বেশ ঈর্ষণীয়।’ 

‘ইনডিড, তবে কালেকশন-টালেকশন এখন ছাড়, আসল কাজে মন দে।’ 

ঘরে ঢোকা থেকে অনেকক্ষণ ধরে একটা অদ্ভুত উৎকট গন্ধ নাকে আসছিল। বইয়ের থেকে মন ঘুরতেই সেটা অনেকটা বেড়ে গেল। ঘরের একটা বিশেষ অংশ জুড়ে চারদিকে পুলিশ টেপ দিয়ে ঘেরা আর তার মাঝখানে যেখানে দেহ পড়েছিল, সেখানে চক দিয়ে একটা আউটলাইন করা। বিক্রম মেঝের ওপর উপুড় হয়ে কী যেন দেখল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা কিছু কাগজ হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শুরু করল। সুযোগ বুঝে এবার আমি বিক্রমের কাছে গিয়ে বললাম, ‘ব্যাপারটা হচ্ছে…’ 

‘হুম্ বল।’ 

‘একটা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছিস? এটা কি ডেডবডির গন্ধ নাকি রে?’ 

আমার কথায় বিক্রম হেসে বলল, ‘বোধি, দেহ অনেকক্ষণ আগে ফরেন্সিক টিম নিয়ে চলে গেছে। আর তুই এখনও তার গন্ধ পাচ্ছিস?’ 

‘তাহলে এই অদ্ভুত গন্ধটা কীসের?’ 

বিক্রম কাগজগুলোর দিকে তাকিয়েই জিগ্যেস করল, ‘কোন গন্ধ?’ 

‘কী আশ্চর্য! তুই একটা আঁশটে গন্ধ পাচ্ছিস না?’ 

‘আরে ওটা তো…’ বিক্রম কথাটা শেষ করতে পারল না। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে বইয়ের র‍্যাকগুলোতে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করল। তারপর আবার এগিয়ে এসে টেবিল, তার পাশে রাখা ডিভানগুলোতে দেখল। এক দৌড়ে এগিয়ে গেল বড় ফুলদানি দুটোর দিকে। ফুলদানির মুখে চোখ রেখে কী যেন দেখল, তারপর প্রদীপ্তর উদ্দেশে বলল, ‘প্রদীপ্ত শিগগির দেখে যাও।’ 

প্রদীপ্ত আর আমি এগিয়ে গেলাম। প্রদীপ্ত ভেতরে উঁকি মেরে দেখল, তারপর পকেট থেকে ফোন বার করে কাকে যেন ফোন করে বলল, ‘আপনারা এখনই আরেকবার আসুন, উই ডিসকভার সামথিং…’ তারপর ফোনটা পকেটে রেখে সোৎসাহে বিক্রমকে বলল, ‘ব্রাভো বিক্রম ব্রাভো, এটা কী করে কেউ খেয়াল করেনি কে জানে?’ 

বিক্রম হেসে বলল, ‘ব্রাভো যদি সত্যি কাউকে বলতে হয়, তবে সেটা বোধিকে বলো, ও আমায় না বললে আমার মাথায় ব্যাপারটা ক্লিকই করত না।’ 

প্রদীপ্ত আমার দিকে ঘুরে হাতটা ধরে বেশ জোরে ঝাঁকিয়ে দিল। আমি বিক্রমকে বললাম, ‘ব্যাপারটা কী একটু বলবি?’

বিক্রম আমায় বলল, ‘এই ভাসটা দেখছিস? খুনি এখানে ভিক্টিমের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে ভেতরে ঢেলে রেখেছে। তুই এতক্ষণ তার গন্ধই পাচ্ছিলি।’ 

‘বলিস কী রে?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ফুলদানির ভেতরে রক্ত ঢেলে রেখেছে, কেন?’ 

বিক্রম ঠোঁট কামড়ে নিয়ে বলল, ‘সেটাই তো প্রশ্ন বন্ধু, কেন?’ তারপর প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে জিগ্যেস করল, ‘ফরেন্সিক টিমের এখানে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে?’ 

‘বেশিক্ষণ লাগবে না, এই ধরো এক ঘণ্টা।’ 

‘বেশ, এইখানে আমার আপাতত আর কিছু দেখার নেই। চলো, এবার তিন তলায় গিয়ে বাদবাকিদের সঙ্গে কথাবার্তাটা সেরে ফেলি।’ 

‘ঠিক আছে চলো।’ 

আমরা তিনজন তোর্সা দেব রঞ্জনের স্টাডি থেকে বেরিয়ে এলাম। ওপরে যাওয়ার সময় দেখলাম, যমুনাদেবীর ঘরটা একটু খোলা… ভেতরে চোখ রাখতেই নজরে পড়ল-বেলারানি দাস নিশ্চিন্তে কানে ইয়ারফোন গুঁজে মোবাইলে ভিডিও দেখছে। দৃশ্যটা দেখে আমার গা জ্বলে গেল। আমি বিক্রম আর প্রদীপ্ত দুজনের উদ্দেশেই বললাম, ‘ভদ্রমহিলা কী প্রচণ্ড উদাসীন, বাড়িতে এরকম একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে আর উনি বসে বসে ফোনে ভিডিও দেখে চলেছেন। কোনো রকম হেলদোল নেই। আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।’ 

আমার কথায় প্রদীপ্ত মুচকি হেসে বলল, ‘কেউ ফোনে ভিডিও দেখছে বলে তাকে তো আর দোষ দেওয়া যায় না, যায় কি?’

‘না তা যায় না, কিন্তু এই অস্বাভাবিক উদাসীনতা… এটা সন্দেহজনক নয়?’

‘বোধি তোকে একটা কথা বুঝতে হবে।’ এবার বিক্রম বলে উঠল, ‘আমরা কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একজন মানুষের থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করি, জরুরি নয় মানুষটা সবসময় সেভাবেই সাড়া দেবে। একেকজন মানুষ একেকরকম হয়। হয়তো ওনার মনে ভয় বা উদ্বেগ ব্যাপারটা কম কাজ করে। কিংবা সেটা কাটানোর জন্যই ফোনে ভিডিও দেখছে।’ 

আমি আর কথা বাড়ালাম না। তবে এই মুহূর্তে বিক্রম বা প্রদীপ্ত কারও সঙ্গেই আমি একমত হতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছে, ভদ্রমহিলা প্রয়োজনের তুলনায় যেন একটু বেশিই চালাক। ওপরে উঠতে উঠতে একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কানে আসছিল। পৌঁছতে দেখলাম, এখানেও প্রায় একই রকম ব্যবস্থা-খালি নীচে যেখানে রান্নাঘর ছিল, তার বদলে এখানে একটা ওপেন বসার জায়গা, দুটো বিশাল এল শেপ সোফা, একটা বিরাট সাইজের ওয়াল টিভি। সিঁড়ির বাঁ দিকে তিনটে ঘর। যেটা সব থেকে বড়, সেটা আশা করা যায় মিস্টার ও মিসেস রঞ্জনের শোয়ার ঘর। করিডোর থেকে সোজাসুজি আর যমুনাদেবীর ঘরের ঠিক মাথার ওপর আরেকটা ঘর। 

ওপরে ওঠার সময় যে কান্নার আওয়াজটা পাচ্ছিলাম, সেটাকে ধরেই আমরা তিনজন এগোতে লাগলাম। করিডোরের সোজাসুজি যে ঘরটা রয়েছে, আমরা সেখানে এসে ঢুকলাম। এটা যে বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ দুই সদস্যের ঘর, সেটা ঢুকলেই বোঝা যায়। একটা বছর তেরোর মেয়ে, আরেকটা বছর নয়ের ছেলে, ভারি ফুটফুটে-দুজনেই একজন ভদ্রমহিলার কোলে মাথা দিয়ে কাঁদছে। ইনি কে সেটা আন্দাজ করা শক্ত নয়। তোর্সা দেব রঞ্জনের সেক্রেটারি কাবেরী বাসু। 

ভদ্রমহিলা আমাদের দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। শাড়ির আঁচলটা অন্য কাঁধে জড়িয়ে নিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন। তারপর বাচ্চাদুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা একটু বোসো, আমি এক্ষুনি আসছি।’

কথাটা শুনে মেয়েটা রাজি হলেও, ছেলেটা ওনাকে ছাড়তে নারাজ। তাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে মানিয়ে বুঝিয়ে আসতে একটু সময় লেগে গেল। 

ভদ্রমহিলার চেহারায় বেশ একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে। নাক, চোখ-মুখ বেশ ধারালো, চোখে একটা হাফ রিমের চশমা, বয়স চল্লিশের আশেপাশে। আমরা তিনজনেই ওনার উদ্দেশে প্রতিনমস্কার জানালাম।

বিক্রম জিগ্যেস করল, ‘আপনি তো কাবেরী বাসু?’ 

‘হ্যাঁ।’ 

‘আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।’ 

‘পুলিশ তো আজ সকালেই আমার স্টেটমেন্ট নিয়ে গেল।’ 

বিক্রম এক ঝলক প্রদীপ্তর দিকে দেখে নিয়ে আবার কাবেরী বাসুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক। একটু বিশদে কথা বলতে চাই।’ 

‘এখানেই বলবেন? মানে ওরা…’ কথাটা বলতে গিয়ে শেষ না করে উনি ভেতরে বসে থাকা বাচ্চাদুটোর দিকে তাকালেন। 

‘নো নো সার্টেনলি নট। আপনি চাইলে আমরা ওই সামনের বসবার ঘরে বসে কথা বলতে পারি।’ 

‘ঠিক আছে এক মিনিট।’ এই বলে ভদ্রমহিলা আমাদের পিছনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হরিদা একটু শুনে যাও তো।’ 

আমরা তিনজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, কখন যেন হরিনাথ এসে দাঁড়িয়েছেন। আবার আগের মতো দুটো হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে আমাদের নমস্কার জানালেন। এগিয়ে এসে কাবেরী বাসুকে জিগ্যেস করলেন, ‘কিছু কইলেন?’ 

‘হ্যাঁ হরিদা। ওনারা আমার সঙ্গে কথা বলবেন। তুমি একটু ঝিলাম আর সরযূর কাছে বোসো।’ 

‘আইচ্ছা।’ 

এমন সময় পেছন থেকে একটা বাচ্চা ছেলের কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘তুমি কি বাড়ি চলে যাচ্ছ আন্টি?’ 

কাবেরী তাকে বললেন, ‘না বাবা, আমি এক্ষুনি আসছি।’ 

‘কোথায় যাচ্ছ?’ 

‘এই যে আঙ্কেলরা এসেছেন, ওঁদের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই… তারপরেই চলে আসছি। আপনারা আসুন।’ 

শেষ শব্দদুটো আমাদের উদ্দেশে ছিল। আমরা টিভির ঘরে এসে বসলাম। বসেই কাবেরী বাসু বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা কথা বলে নিতে চাই র‍্যাদার একটা অনুরোধ।’ 

‘হ্যাঁ বলুন।’ 

‘আসলে অনেক বেলা হয়ে গেছে তো, বাচ্চাদুটো এখনও কিছু খায়নি। আমি অবশ্য হরিদাকে বলে দিয়েছি ওদের জন্য একটু ভাতে ভাত করে দিতে। তাই বলছিলাম, আপনারা যদি একটু তাড়াতাড়ি করেন খুব ভালো হয়। ঝিলামকে নিয়ে চিন্তা নেই, কিন্তু সরযূ আমার কাছে ছাড়া কারও কাছে খাবে না।’ 

‘চিন্তা নেই আমরা আপনার খুব বেশি সময় নষ্ট করব না।’ বিক্রম বলল, ‘প্রথমেই যেটা জানতে চাই আপনি এখানে কত বছর কাজ করছেন?’ 

‘প্রায় দশ বছর।’ 

‘এর আগে কোথায় ছিলেন?’ 

‘কোথাও না, আমি টিউশন করতাম।’ 

‘আচ্ছা, কোন সাবজেক্ট?’ 

‘কোনো পার্টিকুলার সাবজেক্ট নেই। আমি ছোট বাচ্চাদের পড়াতাম। ইচ্ছে ছিল স্কুল টিচার হব। আমার মন্টেসরি টিচার্স ট্রেনিং করা। মর্নিং স্মাইল বলে একটা মন্টেসরি স্কুলে চাকরিও পেয়েছিলাম। কিন্তু ওই সময় হঠাৎ বাবার কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ল। বারবার ভেলোরে নিয়ে যাওয়া, সবে চাকরি পেয়েছিলাম… এত ছুটি মঞ্জুর হল না। বাধ্য হলাম চাকরিটা ছাড়তে। অবশ্য তার মাসখানেকের মধ্যেই আমাদের প্রায় সর্বস্বান্ত করে বাবা চলে গেলেন।’ 

‘আয়াম রিয়ালি সরি। তা এখানের চাকরিটা কী করে পেলেন?’ 

‘আমার হাজবেন্ড। ও অজয়স্যারের কোম্পানিতে কাজ করেছে প্রায় বারো বছর। তোর্সা ম্যাডাম একজন সেক্রেটারি চাইছিলেন, ও এটা জানতে পারায় আমায় অজয়স্যারের কাছে রেকমেন্ড করে। ইন্টারভিউতে ডাক পড়ে। আসি, চাকরিটা হয়ে যায়।’ 

‘আপনার হাজবেন্ড কী পজিশনে ছিলেন?’ 

‘সিনিয়র ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার।’ 

‘এখন কোথায় আছেন উনি?’ 

‘বছর দুয়েক হল ব্যাঙ্গালোরে আছে। একটা খুব ভালো অফার পেয়ে এখানে ছেড়ে দিয়েছিল।’ 

‘একটা ব্যাপার বুঝলাম না, তাহলে আপনার চাকরি করার প্রয়োজন পড়ল কেন?’ 

ভদ্রমহিলা এবারে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বেশ কঠিন স্বরে বললেন, ‘দেখুন, সেটা আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। যা আপনারা জানতে চাইছেন, তার সঙ্গে আজকের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।’ 

বিক্রম কিন্তু দমল না। ও ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, ‘কীসের সঙ্গে কীসের সম্পর্ক আছে, আর কীসের নেই-সেটা ঠিক করা আমাদের কাজ। আপনি দয়া করে প্রশ্নের উত্তর দিন, প্লিজ।’ 

কাবেরী বাসুর মুখে হতাশা, রাগ, অসহায়তা মিলিয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো অভিব্যক্তি খেলে গেল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ধরা গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘কী জানতে চান বলুন?’ 

‘আপনার চাকরির প্রয়োজনীয়তার কারণ।’ বিক্রম আগের মতোই ঠান্ডা গলায় জবাব দিল। 

‘বেশ তাহলে শুনুন, আমি মা হতে পারিনি। প্রথমে মিসক্যারেজ, তারপর… স্টিল বর্ন…’ 

কাবেরী বাসু দু’হাতের তেলোয় মুখ ঢাকলেন। একটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে টেনে বের করা হয়েছে। বলতে বাধা নেই আমার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। কাবেরী নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘আমরা সেটেল ডাউন করতে চাইছিলাম। জীবক মানে আমার হাজবেন্ডের একার স্যালারিতে সেটা সম্ভব ছিল না। ওর আমার সাপোর্টের দরকার ছিল। আর তাছাড়া নিজের মনটাও ডাইভার্ট থাকবে। সবদিক ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’ 

বিক্রম এবার খানিকটা নরমভাবে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না মিসেস বাসু, আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নাড়াঘাটা করার উদ্দেশ্য আমাদের নেই। তবে এই মুহূর্তে সবটা জানা আমাদের দায়িত্ব। যাই হোক, আপনাকে শেষ দুটো প্রশ্ন করতে চাই। এক, তোর্সা দেব রঞ্জন আর অজয় রঞ্জন বস এবং মানুষ হিসেবে কেমন? দুই, তোর্সা তো চলে গেলেন, এবারে আপনি কী করবেন?’ 

‘আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিচ্ছি। যা হয়েছে, তা যদি নাও হতো তাহলেও আমি এখানে আর খুব বেশি হলে ছ’মাস চাকরি করতাম। তার কারণ আমার হাজবেন্ড ব্যাঙ্গালোরে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। কথা ছিল ও একটু সেটেল করলেই আমাকে ডেকে নেবে।’ 

‘তোর্সা সেটা জানতেন?’ 

‘জানতেন। আমি বলেছিলাম।’ 

‘হুম, এবারে আপনার তোর্সা ম্যাডাম সম্বন্ধে বলুন।’ 

কাবেরী বাসু একটু সোজা হয়ে বসলেন, ‘ওনার কোন ব্যাপারে জানতে চাইছেন বলুন?’ 

‘ধরে নিন সবকিছু। বাট বিফোর দ্যাট আপনি কী কী কাজ করতেন সেটাও একটু বলুন।’ 

‘দেখুন প্রথম প্রথম আমার দায়িত্ব ছিল ম্যাডামের সমস্ত মিটিং আপডেট রাখা, কোনো লেখা কমপ্লিট হলে কপিরাইট করানো, পাবলিশারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, প্রুফ দেখা এইসব। আর পরের দিকে ওনার লেখাগুলো লেখা… মানে উনি ডিকটেট করতেন, আমি লিখতাম। অবশ্য লাস্ট পাঁচ বছর ধরে আমি ঝিলাম ও সরযূর গভর্নেস হিসেবেও কাজ করছি। তবে এই কাজটা আমি নিজে থেকে নিয়েছি, এর জন্য কোনো এক্সট্রা পেমেন্ট নিই না।’ 

‘তোর্সা ম্যাডাম কি কোনো সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন?’ 

প্রশ্নটা শুনে কাবেরী একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘ওনার অনেক সমস্যা ছিল। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি বলুন তো? তবে একটা কথা… উনি কিন্তু শেষ দিকে আর লিখতে পারছিলেন না।’ 

এবার প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল, ‘লিখতে পারছিলেন না মানে? রাইটার্স ব্লক?’ 

‘শুধু রাইটার্স ব্লক হলে একটা কথা ছিল। তবে নিজের এই অক্ষমতা লুকানোর জন্য প্লেজিয়ারিজমের সাহায্য নিয়েছিলেন। ওনার শেষ উপন্যাস “ময়না মাঝি” ২০১০ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিল। লেখাটা তপন দাশগুপ্ত নামক কোনো এক ব্যক্তির লেখা ছিল। তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কিছুটা হইচই করেন। ম্যাডাম টাকা খাইয়ে ওঁর মুখ বন্ধ করেন। তবে ঘটনাটা বইপাড়ায় চাউর হয়ে যায়। ফলে যারা এক সময়ে ওনাকে লেখা দেওয়ার জন্য তাগাদা দিতেন, তারাই ওনার ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন। এমনকী অফিসে গেলে দেখাও করতেন না অনেকে। 

‘একবার তো “প্রথম পৃষ্ঠা”-র অফিসে সিকিউরিটি গার্ড আমাদের ঢুকতে পর্যন্ত দেয়নি। তারপর যা হয়, ভীষণ খিটখিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছিলেন। অজয়স্যার অনেক চেষ্টা করেছিলেন সব ঠিক করার-কিন্তু লাভ হয়নি। একদিন কী নিয়ে যেন দুজনের মধ্যে মারাত্মক অশান্তি হয়। ম্যাডাম বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনো একটা হোটেলে ছিলেন প্রায় তিনদিন। তারপর বাড়ি ফিরে আসেন। সেই থেকে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ। কিন্তু বিশ্বাস করুন, উনি মানুষ হিসেবে খারাপ ছিলেন না। আমাদের সবাইকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু ওনার উচ্চাকাঙ্ক্ষাই ওনার কাল হল।’ 

প্রদীপ্ত আর আমি পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ও দিকে বিক্রমের মুখের কোনো ভোলবদল দেখা গেল না। ও একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে থাকল, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রঞ্জনের মধ্যে ঝামেলাটা ঠিক কী বিষয় নিয়ে হয়েছিল?’ 

কাবেরী বাসু মাথা নিচু করে বললেন, ‘সেটা আমি জানি না। যতদূর শুনেছি আমি বাড়ি চলে যাওয়ার পর এটা হয়েছিল। তাই…’ 

‘বুঝলাম, মিস্টার রঞ্জন কেমন মানুষ?’ 

‘দেবতুল্য মানুষ। আমি ও আমার হাজবেন্ড আজ যতটুকু যা করতে পেরেছি, তা শুধু ওনার জন্যই সম্ভব হয়েছে। জীবকের এই নতুন চাকরিটা পেতে উনি ভীষণ সাহায্য করেছিলেন। আচ্ছা বলুন তো, আজকাল কোন বস তার এমপ্লয়ির জন্য এতটা করে?’ 

‘মাই কোয়েশ্চেন এক্সট্র্যাক্টলি, বছর দেড়েক আগেই সম্ভবত, “ইকোনমিক টাইমস”-এ একটা খবর দেখেছিলাম। দিল্লি এনসিআর আর গুরগাঁও মিলিয়ে প্রায় সাতাশটা কমার্শিয়াল প্রোজেক্টের জন্য গ্রিন হেভেন রিয়েলটি গ্রুপ টেন্ডার ভরেছিল। যার প্রায় আঠেরোটা টেন্ডার পাশ হয়ে যায়। আপনার হাজবেন্ড দু’বছর আগে চাকরি ছেড়েছেন, তার মানে এই প্রোজেক্টগুলো হাতে নেওয়ার আগে মিস্টার রঞ্জন ওনার এতটা সুযোগ্য কর্মীকে দেশান্তরিত করে দিলেন? হিসেবটা ঠিক মিলছে না যে মিসেস বাসু?’ 

লক্ষ্য করলাম কাবেরী বাসু বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। আমতা আমতা করে বললেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমি এইসব…’ 

‘কিছুই জানতেন না তাই তো!’ বিক্রম একটা শুকনো হাসি হেসে বলল, ‘না জানারই কথা। এনিওয়ে আপনার আর সময় নষ্ট করব না। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর কো-অপারেশন মিসেস বাসু। মিস্টার রঞ্জন কি নিজের ঘরে আছেন?’ 

‘হ্যাঁ।’ 

‘থ্যাঙ্কস এগেইন। ওহো, আসল কথাটা বলতে ভুলেই গেছি। আমার একটা লিস্ট লাগবে। তোর্সা দেব রঞ্জন যেসব পাবলিশারদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের সবার নাম, পয়েন্ট অফ কন্ট্যাক্ট, অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার-সব চাই। আমরা মিস্টার রঞ্জনের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে যাব। বেরোনোর আগে ওটা চাই। একটু তাড়াতাড়ি করে দিলে ভালো হয়।’ 

কাবেরী বাসু তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘কিন্তু সেগুলো সব ওনার ল্যাপটপে আর ফোনে আছে, আর দুটোই পুলিশ নিয়ে গেছে।’ 

‘তাহলে আপনি আপনার ওই কালো ডায়েরিটা থেকে বের করে দিন, যেটা এখানে বসার আগে সরযূর বালিশের নীচে ঢুকিয়ে দিয়ে এলেন।’

একমুহূর্তে কাবেরী বাসুর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। 

বিক্রম একইরকম ভাবলেশহীনভাবে বলল, ‘লিস্টটা রেডি করে দেবেন। ভালো কথা, ফেসবুকে আপনার লেখার বেশ কদর আছে। কখনও বই বেরোলে বলবেন। পড়ব।’

কাবেরী বাসু এই শেষ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন। 

কথোপকথনটা শেষে গিয়ে যে এই জায়গায় দাঁড়াবে, সেটা বোধহয় প্রদীপ্তও আশা করেনি। আমি বিক্রমকে জিগ্যেস করতে যাচ্ছিলাম কী ভাবে, কিন্তু তার আগেই ও বলল, ‘এখন নয়। এই মুহূর্তে যার সঙ্গে কথা বলতে চলেছি, তিনি খুব সাধারণ মানুষ নন। বাড়ির বাকি লোকেদের থেকে সত্যিটা বের করা যতটা সহজ-এনার ক্ষেত্রে সেটা প্রায় হাজার গুণ কঠিন। প্রতিটা পদক্ষেপ খুব বুঝে শুনে ফেলতে হবে। একটা ভুল আমাদের গোয়েন্দাগিরির পুরো…’ বাকিটা ও আর বলল না, তাই আমিও লিখছি না। শুধু প্রদীপ্তকে দেখলাম মুখ টিপে হাসল। 

অজয় রঞ্জনের বেডরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে একটা ভারী কিন্তু কোমল স্বরে আওয়াজ এল ‘কাম ইন।’ ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম, ভদ্রলোক একটা সোফার কোনায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। পরনে একটা গাঢ় নীল ট্র্যাক স্যুট, বুকের চেন খানিকটা নামানো, পা-দুটো সামনে রাখা কাঠের টেবিলের ওপর লম্বা করে রাখা। চোখে একটা হাফ রিম ফ্রেমের চশমা, একটু নীচে নেমে এসেছে। বুকের কাছে একটা কুশন চেপে ধরে, ঘরের একপাশের দেওয়ালের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। 

আমি ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম-একটা ফ্রেমে বাঁধানো প্রমাণ সাইজের ছবি, তাতে এক যুবক এবং তার স্ত্রী হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। রঞ্জন দম্পতিকে চিনতে অসুবিধা হল না। ছবিটার বয়স নিঃসন্দেহে বারো-তেরো বছরের কম নয়, কারণ ছবির সেই চওড়া কপালের যুবকটার মাথাভর্তি ঘন কালো চুল, বেশিরভাগটাই এখন রুপোলি। 

ভদ্রলোক মনে হয় আমাদের এই মুহূর্তে আশা করেননি। আমাদের দেখে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালেন, অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জামা ঠিক করতে লাগলেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি আসলে ঠিক… মানে আমি একটু ওই…’ 

‘রিল্যাক্স, মিস্টার রঞ্জন।’ এবারে বিক্রম বলে উঠল, ‘আপনি বসুন, ব্যস্ত হবেন না।’ 

ভদ্রলোক আমাদের কথা শুনে বসলেন। তারপর আমার আর বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা কি পুলিশের…’

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিক্রম বলে উঠল, ‘পুলিশ বলতেও পারেন আবার নাও পারেন, আমরা পুলিশের সঙ্গে হলেও পেশায় পুলিশ নই। আমি একজন গোয়েন্দা। আমার নাম বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী আর ও হল আমার বন্ধু বোধিসত্ত্ব ঘোষ।’ 

ভদ্রলোকের বোধহয় বিক্রমের কথাগুলো বিশেষ পছন্দ হল না। তিনি বেশ রেগেমেগেই জিগ্যেস করলেন, ‘তার মানে? কে আপনাকে হায়ার করল? এসবের মানে কী?’ 

‘মিস্টার রঞ্জন, আমি একটু আগেই বলেছি আমি পুলিশের সঙ্গেই কাজ করছি।’ বিক্রম শান্তভাবে বলল, ‘আপনি দয়া করে উত্তেজিত হবেন না।’ 

‘ওহ রিয়েলি! কেউ আমার স্ত্রী’কে এসে এই রকম বীভৎসভাবে মেরে রেখে চলে গেছে। আর আপনি এসেছেন সেই চিতার আগুনে হাত সেঁকতে? ইয়ার্কি হচ্ছে? আর এই যে আপনি…’ শেষ কথাটা প্রদীপ্তকে উদ্দেশ্য করে বললেন অজয় রঞ্জন, ‘আপনি এই কেসের ইনচার্জ না?’ 

‘ইয়েস স্যার।’ প্রদীপ্ত হালকা স্বরে উত্তর দিল। 

‘তা আপনি যদি এই কেস হ্যান্ডেল নাই করতে পারেন, সেটা তো আপনার ওপরওয়ালাকে জানানো উচিত ছিল। সে সব না করে আমার ঘরে দুটো টিকটিকি ঢুকিয়ে দিয়েছেন তদন্ত তদন্ত খেলবেন বলে? লিসেন, আই উইল নট গোইং টু টলারেট দিস নুইসেন্স। পরিষ্কার জানিয়ে রেখে দিলাম।’ এই শেষ কথাগুলো উনি প্রায় চিৎকার করে বললেন। 

‘আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি মিস্টার রঞ্জন।’ প্রদীপ্ত এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল, ‘কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি আপনার লিমিট ক্রস করবেন।’ 

‘তাই নাকি? আমি লিমিট ক্রস করছি? কতগুলো ননসেন্স ডিটেকটিভ নভেল ছাড়া কোথাও কখনও শুনেছেন যে পুলিশকে হেল্প করতে একটা গোয়েন্দা এসে জুটেছে?’ 

‘আপনি রজনী পণ্ডিতের নাম শুনেছেন মিস্টার রঞ্জন?’ এবার বিক্রম মুখ খুলল। 

‘কে?’ 

‘রজনী পণ্ডিত। নাম শুনেছেন?’ 

মিস্টার রঞ্জন অস্থিরভাবে বললেন, ‘না শুনিনি। কে তিনি?’ 

‘ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ১৯৮৮ সালে মুম্বাইতে এক ভদ্রলোকের অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয়। পরিবারের সন্দেহ হয় তাদেরই এক আত্মীয়ের ওপর। তারা রজনীকে হায়ার করে। উনি প্রায় ছ’মাস পরিচারিকা সেজে সেই বাড়িতে ছিলেন এবং হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীর সব কথা একটা টেপ রেকর্ডারের মধ্যে রেকর্ড করে নিয়ে সেটা পুলিশের হাতে তুলে দেন। খুনিও ধরা পড়ে। 

‘তবে শুধু এটাই নয়। ১৯৯৯ জেসিকা লাল মার্ডার কেস, ২০০৮ আরুশি তালওয়ার মার্ডার কেস, ২০১২ শিনা বোরা মার্ডার কেস-এই সমস্ত কেসে প্রাইভেট ডিটেকটিভরা পুলিশকে শুধু সাহায্য করেছিল তাই নয়, কিছু এজেন্সি প্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুলিশের সঙ্গে কাজ করেছিল। খালি তাদের পাবলিসিটিটা ঠিক করে হয়নি। আর আপনার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, আমি কিন্তু লালবাজার থেকে অনুমতি নিয়েই এই কেসে হাত দিয়েছি। সুতরাং… ঠান্ডা হয়ে বসুন। এবার কিছু কাজের কথা বলব।’ 

মনে হল জোঁকের মুখে নুন পড়েছে। ভদ্রলোক খানিকক্ষণ আমাদের সবাইকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে নিজের জায়গায় বসে পড়লেন। 

‘কে প্রশ্ন করবে?’ ভদ্রলোক জানতে চাইলেন। 

‘আমি করব।’ বিক্রম বলল। 

‘বেশ, বলুন কী জানতে চান?’ 

‘আপনার স্ত্রী শেষ কয়েক মাস বা তার বেশি সময় ধরে কি কোনো কারণে বিচলিত বা কোনো ভয়ের মধ্যে ছিলেন?’ 

অজয় রঞ্জন বললেন, ‘নট দ্যাট আই নো অফ। নাথিং শি এভার টোল্ড মি।’ 

‘ওনার কোনো শত্রু ছিল?’ 

একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অজয়বাবু বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, “Uneasy lies the head that wears a crown”, কি? জানেন তো?’ 

‘জানি। কিন্তু উনি তো বহুবছর হল সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। আনলেস ইট ওয়াজ অল ফর অ্যান আই ওয়াশ।’ 

অজয়বাবু এবার সরাসরি বিক্রমের দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘তোর্সার রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ব্যাপারটা আপনার আই ওয়াশ মনে হয় মিস্টার চক্রবর্তী?’ 

‘আমার কী মনে হয় সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল সত্যিটা কী? আর সেটা এই মুহূর্তে আপনিই বলতে পারবেন।’ 

‘ওয়েল, ইট ওয়াজ নট অ্যান আই ওয়াশ, বাট প্যাসিভলি শি ওয়াজ এ পার্ট।’ 

বিক্রম বলল, ‘সেটা কি আপনার কারণেই?’ 

‘মানে?’ অজয়বাবুর গলায় কিছুটা বিরক্তির স্বর শোনা গেল। 

‘আপনাদের বিয়ে হয় বোধহয় ‘৯৫। রাইট?’ 

‘রং, ‘৯৪ ক্রিসমাস।’ 

‘আর তোর্সা ম্যাডাম রাজনীতি ছাড়েন ২০০২। ভারি আশ্চর্য সমাপতন।’ 

‘সরি, কী পতন?’ 

‘সমা… আই মিন কো-ইনসিডেন্স।’ 

‘কীসের কো-ইনসিডেন্স?’ 

‘২০০৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, আপনি প্রায় ৬টি গভর্নমেন্ট রেসিডেন্সিয়াল প্রোজেক্ট হাতে পান। অথচ তার আগে আপনার খুব সিগনিফিক্যান্ট কোনো কাজ তো ছিল না। এই নিয়ে সেই সময়ে সরকার আর তার এক্সিস্টিং কন্ট্রাক্টরদের মধ্যে রীতিমতো বাকবিতণ্ডা হয়। ঠিক বলছি তো?’ 

অজয় রঞ্জনের মুখ আবার অন্ধকার হয়ে গেল। তিনি কঠিন স্বরে বললেন, ‘আপনি কী ইমপ্লাই করছেন মিস্টার চক্রবর্তী?’ 

‘নাথিং মিস্টার রঞ্জন। যা ভাবছি, সেটা যদি সত্যিও হয় তাহলেও সেটা ক্রাইম নয়। আই মিন এইটুকু নেপোটিজম তো সব জায়গায় চলে। যাক গে। এবার বলুন তো, ঠিক কোন কারণে আপনার আর আপনার স্ত্রীর মধ্যে আজ তিন বছর ধরে কথা বন্ধ ছিল?’ 

আচমকা এই ব্রহ্মাস্ত্রের জন্য অজয়বাবু বোধহয় প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এই ব্যাপারটা জানার আগে আপনাদের আরও কতগুলো জিনিস জানা দরকার।’ 

বিক্রম এবারে সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে বলল, ‘বলুন শুনছি।’ 

অজয় রঞ্জন আবার খানিকক্ষণ চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলতে শুরু করলেন, ‘দেখুন, তোর্সা বহু বছর ধরে অনেক রকম মেন্টাল প্রবলেমের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ওর ছোটবেলা থেকে ক্লস্ট্রোফোবিয়া ছিল। তার সঙ্গে ছিল হাইপার অ্যাংজাইটি, পিপিডি-অ্যাজ টাইম গোজ বাই, সেটা বেড়েই চলেছিল। আর আমাদের যখন বিয়ের ঠিক হয়, তখন এই সমস্ত সমস্যা আমার শ্বশুরবাড়ির লোক স্রেফ চেপে যায়। যখন জানতে পারি ইট ওয়াজ টু লেট।’ 

‘লেট কেন? আপনি তো চাইলে মেন্টাল ডিসঅর্ডারের গ্রাউন্ডে সহজেই ডিভোর্স পেতে পারতেন। শ্বশুরবাড়ির এগেইনস্টে চিটিং কেসও ফাইল করতে পারতেন।’ 

‘সবই পারতাম মিস্টার চক্রবর্তী। কিন্তু পারিনি, কারণ আই ওয়াজ হেড ওভার হিলস ফর হার। ওর মধ্যে না একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে থাকত! একটা ছোট্ট মিষ্টি তোর্সা, যাকে বাইরের কঠিন তোর্সাটা আটকে রাখত। কিন্তু তাও সে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসত। আমি তাকেই ভালোবেসে ছিলাম। খুব ভালোবেসে ছিলাম। তবু তাকে কাছে পেয়েও পেলাম না। হারিয়ে গেল।’ 

অজয়বাবু একটু চুপ করলেন। ভদ্রলোকের চোখের কোণগুলো চকচক করে উঠল। আমি চোখ সরিয়ে নিয়ে দেখলাম প্রদীপ্তও মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু বিক্রম তার দৃষ্টি অজয় রঞ্জনের ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও সরাচ্ছে না। 

উনি চশমা খুলে চোখ মুছে আবার বলা শুরু করলেন, ‘আমি কখনও কোনো কিছুর জন্য কার্পণ্য করিনি জানেন, ওকে সেরা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম-ডক্টর আকাশ মিত্র। উনি একজন এক্সপার্ট সাইকোলজিস্টকে রেকমেন্ড করেছিলেন-ডক্টর মানসী ব্যানার্জি। উনি নিজে আমার বাড়িতে আসতেন তোর্সার কাউন্সেলিং করাতে। আমি গাড়ি পাঠাতাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। আর হবেই বা কী করে? না ঠিক করে কোনো ওষুধ খেত না কোনো কথা শুনত। 

‘প্রথম সমস্যা শুরু হয় যখন ও দ্বিতীয়বার ভোটে হারল-সেটা ২০০২ সাল। তারপর শুরু হল পার্টির ভেতরে ইন্টারনাল পলিটিক্স। বাধ্য হল রাজনীতি থেকে অবসর নিতে। অবশ্য তখনও ওর কিছু ওয়েল উইশার ছিল পার্টির ভেতরে। তারা আমাদের অনেকটা সাহায্য করে গ্রিন হেভেন… মানে আমার কোম্পানিকে তুলতে। অবশ্য কোনো কাজই ফ্রি-তে নয়। এ সময়ে আমরা বাচ্চা নেব ঠিক করি। ভেবেছিলাম বাচ্চা আসলে ও ঠিক হয়ে যাবে। 

‘ঝিলাম আমাদের জীবনে আসায় ওর মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন আসা শুরু হয়। আমরা খুব ভালো ছিলাম। তার চার বছর পর সরযূ। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন সইল না। হঠাৎ একদিন সন্ধেবেলা তোর্সার স্টাডি থেকে প্রচণ্ড আওয়াজ এল। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, সব বই-খাতা ছুড়ে ফেলে ঘরটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছে। আর একটা কোনায় বসে শিশুর মতো কাঁদছে। আমি বুকে জড়িয়ে ধরে জিগ্যেস করায় জানলাম, শি ওয়াজ গোইং 

রাইটার্স ব্লক। 

‘এর কিছুসময় পর থেকেই বাকি সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে আসতে শুরু করে। এই সময়ে ওর চিকিৎসা শুরু করেছিলাম। কিন্তু আর কখনও কোনো কিছু ঠিক হয়নি। বছর তিনেক আগে একদিন আমার কাছে এসে বলল, ওর টাকা লাগবে। জিগ্যেস করলাম, কত টাকা? বলল, তিন কোটি। আমি তো চমকে উঠলাম। বিশ্বাস করুন এত টাকা সে সময়ে আমার কাছে ছিল না। চার-চারটে অনগোয়িং প্রজেক্ট চলছে তখন। জিগ্যেস করলাম, এত টাকা কীসে লাগবে? ও বলল, ও নাকি নিজের একটা পাবলিশিং হাউস খুলতে চায় অ্যালং উইথ অ্যান ইন হাউস প্রিন্টিং প্রেস। আমি না করে দিতেই শুরু হল তুমুল অশান্তি। 

‘এক সময় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি আর নিতে পারছিলাম না মিস্টার চক্রবর্তী, শি পুশড মি টু দ্য এজ অফ মাই পেশেন্স। দ্যাট ওয়াজ দ্য মোমেন্ট, আই ডিসাইডেড টু কাট অল মাই টাইস উইথ হার। আই ওয়ান্টেড আ ডিভোর্স। কিন্তু ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে সেটা সম্ভব হয়নি। আর তাছাড়া আমার শাশুড়িকে আমি তোর্সার হাতে ছাড়তে পারব না। হাজার হোক শি ইজ আ মাদারলি ফিগার টু মি। কী জানেন, শেষ দিকে, আমাদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা ছিল না মিস্টার চক্রবর্তী।’ অনেকক্ষণ কথা বলে অজয়বাবু একটু চুপ করলেন। তারপর সোফার ওপর মাথা হেলিয়ে দিয়ে আপন মনে কয়েকটা লাইন আওড়ালেন। 

‘And I watered it in fears

Night and morning with my tears,

And I sunned it with smiles

And with soft deceitful wiles.

ব্লেকের পয়সন ট্রি। তোর্সা আর আমার খুব প্রিয় কবিতা। আমার ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা ডিসিটফুল ওয়াইলস ছিল না। কিন্তু কী লাভ? অল মাই এফর্টস আর ইন ভেইন।’ 

ঘরের মধ্যে তখন একটা আশ্চর্য নীরবতা, শুধু পাখা চলার একটা হালকা আওয়াজ আসছে। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বিক্রম মুখ খুলল, ‘একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছিল, মিস্টার রঞ্জন। শেষ তিন বছরে… উনি কি কখনও আপনাকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?’ 

‘মিস্টার চক্রবর্তী, আওয়ার রিলেশনশিপ হ্যাড বিকাম ফার মোর বিটার দ্যান ইউ কুড এভার ইম্যাজিন। আমাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খুব প্রয়োজন না হলে কোনো কথাবার্তা হতো না। উই স্পোক মোস্টলি থ্রু টেক্সট… অর ভায়া সামওয়ান এলস।’ 

‘আপনার কী মনে হয়? হ্যাস শি এভার ট্রায়েড টু রিকনসাইল?’ 

‘রিকনসাইল আর তোর্সা?’ মৃদু হাসলেন অজয় রঞ্জন। ‘আপনি হাসালেন, মিস্টার চক্রবর্তী। হার ইগো ওয়াজ আ থ্রোন-শি রিফিউজড টু স্টেপ ডাউন ফ্রম।’ 

‘সন্তানদের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক কেমন ছিল?’ 

‘ভালো না। শেষ দিকে ওর ব্যবহার ভীষণ রকম খারাপ হতে শুরু করেছিল। একবার সামান্য একটা দুষ্টুমির জন্য ঝিলামকে প্রায় জন্তুর মতো মেরেছিল জানেন? বাড়ির লোকেরা আটকাতে পারছিল না। আমায় একটা জরুরি মিটিং মাঝখানে থামিয়ে রেখে বাড়ি আসতে হয়েছিল। আর শুধু তাই নয়, রাগ হলেই অকথ্য ভাষায় যা নয় তাই বলে দিত। জানোয়ার, ইডিয়ট, স্কাউন্ড্রেল-কি না বলেছে!’ 

‘আচ্ছা, বডি প্রথম কে আবিষ্কার করে? আপনি?’ 

‘হ্যাঁ, আসলে বিছানায় ওকে দেখতে না পেয়ে একটু সন্দেহ হয়। ও ঠিক আমার মতো, আর্লি রাইজার নয়। খুঁজতে গিয়ে ওর স্টাডিতে পৌঁছই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। অনেকক্ষণ নক করি। কেউ ভেতর থেকে সাড়া না দেওয়ায় চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখি…’ মিস্টার রঞ্জন মুখে হাত দিয়ে অন্য দিকে তাকালেন। 

‘স্ট্রেঞ্জ, আপনাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ… অথচ একই ঘরে শুতেন! আপনি কোথায় শুতেন? এই সোফাতে?’ বিক্রম পাশে থাকা বড় সোফা কাম বেডটাকে দেখিয়ে জিগ্যেস করল। উত্তরে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন অজয় রঞ্জন। 

‘আপনার শ্যালিকার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে মিস্টার রঞ্জন? কী যেন নাম ওনার?’ 

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তোর্সা দেব রঞ্জনের আবার বোনও আছে। কিন্তু বিক্রম এত সব জানল কী করে? ও দেখলাম উঠে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। 

‘তিস্তা। তোর্সার থেকে বছর তিনেকের বড়। আমার শাশুড়ির কাছে শুনেছিলাম, ইউকে-তে থাকেন, ম্যারেড। কিছু ছোটবেলার ছবি ছাড়া আই নেভার ইভেন স হার ইন পার্সন। ইন ফ্যাক্ট আমাদের বিয়েতেও উনি আসেননি। মনে হয় কিছু গন্ডগোল ছিল। তবে তোর্সা কখনও কিছু বলেনি আর আমিও আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চাইনি। বাট হোয়াই?’ 

‘ওনাকেও তো একটা খবর দেওয়া উচিত। তাই জিগ্যেস করলাম। এনিওয়ে হোয়াট অ্যাবাউট ইওর ব্রাদার? আপনার দাদাকে খবর দেওয়া হয়েছে তো? উনি কখন আসবেন?’

আবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এবার দেখলাম, প্রদীপ্তও কুঁচকে তাকিয়ে আছে। 

‘দাদাকে আজ সকালেই ফোন করেছিলাম। সব বলেছি। আসলে দাদার ওসিআইটা করা হয়নি। ওরা চেষ্টা করছে দিন তিনেকের মধ্যে পৌঁছানোর।’ 

‘আপনার দাদার নামটা?’ 

‘রঙ্গিত। ডক্টর রঙ্গিত রঞ্জন। হি’জ আ…’ 

‘ফ্যাকাল্টি ইন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি।’ 

‘রাইট।’ 

বিক্রম এবার অজয়বাবুর দিকে এগিয়ে এল। খানিকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে তারপর নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার রঞ্জন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইউর ফুল কো-অপারেশন।’ 

আমরা তিনজনই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বিক্রম দেখলাম টিভির ঘরের দিকে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে আবার দেখা হল কাবেরী বাসুর সঙ্গে। বিক্রমের লিস্ট রেডি করে বসেছিলেন উনি। যেতেই দিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মিস্টার চক্রবর্তী, আমি একটা কথা জানতে চাই।’ 

‘বলুন।’ বিক্রম শান্ত কণ্ঠে বলল। 

‘আপনি কি আমায় সন্দেহ করছেন?’ 

‘এটা আমাদের পেশার একটা অলিখিত নিয়ম মিসেস বাসু। আমরা সবাইকে সন্দেহ করি আর কাউকে বিশ্বাস করি না।’ 

‘দেখুন, আমি কাউকে খুন করিনি। বিশ্বাস করুন, আমি তো এখানে ছিলামও না। আমি প্রতিদিন সন্ধে সাতটায় বাড়ি চলে যাই। কালকেও তাই গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন আমি খুন করিনি।’ 

‘মিসেস বাসু সেটা বরং সময় আর তদন্তের ওপর ছেড়ে দিন। যদি আপনি কিছু না-ই করে থাকেন, তাহলে তো আপনার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আরেকটা কথা, আড়ি পেতে লোকের কথা শোনা খুব খারাপ অভ্যাস। ওটা আর কখনও করবেন না। ঠিক আছে?’ 

‘আ-আমি? আমি কোথাও আড়ি পাতিনি।’ কাবেরী বাসুর মুখটা সাদা হয়ে গেল। 

‘আপনি মিস্টার রঞ্জনের ঘরে আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনছিলেন না?’ 

কাবেরী মাথা নামিয়ে নিলেন, ‘আপ-আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মিস্টার চক্রবর্তী।’ 

‘তাই? বেশ তাহলে আমায় বলুন তো আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি তো আপনাকে নিজের নাম বলিনি এখনও। ইন ফ্যাক্ট মিস্টার রঞ্জন ছাড়া এই বাড়িতে এখনও যে ক’জনের সঙ্গে কথা হয়েছে, কাউকেই আমি নিজের নাম বলিনি। আপনি কী করে জানলেন?’ 

এই একটা প্রশ্নে কাবেরী বাসু মুহূর্তের মধ্যে গুটিয়ে গেলেন। তারপর যেন নিজের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে কেটে কেটে বললেন, ‘আমি খুন করিনি।’ 

‘ওই যে বললাম, পুরোটাই তদন্ত সাপেক্ষ।’ বিক্রম সহজভাবে বলল। 

আবার আমরা মুখে রুমাল বেঁধে এই বাড়ি থেকে বেরোলাম। ঘড়িতে তখন সোয়া তিনটে। বেশ খিদে পেয়েছে। সময় যে কোথা দিয়ে বেরিয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। 

প্রদীপ্ত হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমায় তো জটায়ুর ভাষায় “কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই”। ভেতরে পুরো ম্যাজিক দেখালে। এবার বলো তো ওই দাদা আর বোনের ব্যাপারটা কী করে বুঝলে?’ 

বিক্রম হেসে বলল, ‘না না কোনো ম্যাজিক নয়। আমি একটু চোখ-কান খোলা রেখেছিলাম এই যা।’ 

‘না না ওসব বলে পার পাবে না। আমায় খুলে বলতে হবে।’ প্রদীপ্ত দেখলাম সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। 

বিক্রম বলল, ‘সব বলব প্রদীপ্ত। তবে তার আগে একটা খুব জরুরি কাজ আছে। তোমার হেল্প ছাড়া সম্ভব নয়।’ 

‘বলো না কী কাজ?’ 

বিক্রম একটু ভেবে বলল, ‘কাবেরী বাসু, ওনার শেষ পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক ট্রানজ্যাকশন ডিটেইলস। যে ক’টা অ্যাকাউন্ট আছে, যে যে ব্যাঙ্কে-সব। প্লাস ফোন কল রেকর্ডস শেষ পাঁচ বছরের। অ্যালং উইথ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটস। এগুলো সব আমার লাগবে।’ 

‘বেশ, আমি দেখছি। মনে হয় না পেতে খুব অসুবিধা হবে বলে। কিন্তু কারণ কী?’ 

‘হাতে পেলেই বুঝে যাবে।’ 

‘বেশ। তা এবার গন্তব্য কোথায়?’ 

‘সোজা বাড়ি যাব। অনেক বেলা হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া হয়নি এখনও।’ 

‘চলো আমি নামিয়ে দিচ্ছি।’ প্রদীপ্ত বলল। বিক্রম হাঁ হাঁ করে উঠল, ‘না না তুমি আবার কেন কষ্ট করতে যাবে? আমরা একটা উবার করে নিচ্ছি।’ 

‘কোনো দরকার নেই। চুপচাপ উঠে বসো। তোমাদের বাড়ি তো বিবেকানন্দ রোড?’ বিক্রম মাথা নাড়ল। ‘যাক ভালো হল। পথেই পড়বে।’ 

আমরাও আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। বাড়িতে যখন এসে পৌঁছলাম, তখন চারটে বেজে গেছে। ঢুকে দেখি নগেনদা তখনও না খেয়ে বিক্রম আর আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বিক্রম নগেনদার উদ্দেশে বলল, ‘এ কী নগেনদা, তুমি এখনও না খেয়ে বসে আছ? আমাদের দুজনের এরপরে মাঝে মধ্যেই এদিক-ওদিক যেতে হতে পারে। তুমি এভাবে আর না খেয়ে বসে থেকো না।’ 

উত্তরে নগেনদা বলল, ‘চান খাওয়া করবে তো নাকি সেটা বাইরে থেকে করে এসেছ?’ 

বিক্রম হালকা হেসে বলল, ‘না না, স্নান-খাওয়া দুটোই করব। তুমি ভাত বাড়ো, আমরা স্নান করে আসছি।’ 

আসার সময় বিক্রম গাড়িতে যেমন চুপচাপ ছিল, এখনও তাই রয়েছে। আজ নগেনদা অনেকদিন বাদে শুক্তো বানিয়েছে। বিক্রমের ভীষণ প্রিয়। অন্যদিন হলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিত, কিন্তু আজ দিনটাই আলাদা। ওকে দেখলাম, শুক্তো থেকে দই অবধি মুখ তুলল না। যন্ত্রের মতো খেয়ে উঠে গেল। আমি খেয়ে উঠে দেখি, ও বসবার ঘরের সোফার একপাশে চুপ করে বসে আছে। মুখ গম্ভীর। আমি আস্তে করে গিয়ে অন্য ধারে বসলাম। এই সময় ওকে কিছু বলা মানে নিজের শমন ডাকা। প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট পর আর থাকতে না পেরে আমি জিগ্যেস করলাম, ‘তুই কি খুব ব্যস্ত?’ 

বিক্রম আমার কথা শুনে ফিক করে একটু হাসল, তারপর বলল, ‘ভীষণ, পুরো পৃথিবীর দায়িত্ব আমার ওপর, দেখছিস না? বল কী বলবি?’ 

‘ওই বাড়িতে গিয়ে যা ভেলকির খেলা দেখালি…’ আমি বেশ গর্ব করে বললাম, ‘তা ওই দিদি আর দাদাটা তুই বুঝলি কী করে এবার বল তো?’ 

‘বোধি, গোয়েন্দারা কোনো ভেলকি দেখাতে পারে না। তাসে কাল্পনিক হোক বা বাস্তব। তোদের সমস্যা হল তোরা কিছু খেয়াল করিস না।’ 

‘কী খেয়াল করিনি?’ আমি নড়েচড়ে বসলাম। 

‘আমরা যখন তোর্সার স্টাডি থেকে বেরিয়ে ওনার মায়ের ঘরে উঁকি মারলাম, তখন কী দেখলাম?’ 

‘ওই তো সেই মহিলা, কী যেন নাম… বেলা। উনি ঘরে বসে ফোন দেখছিলেন।’ 

‘ভেরি গুড। আর কী দেখলি?’ 

‘আর কী দেখব? ফোনে কীসের ভিডিও চলছিল সেটা বুঝতে পারিনি।’ 

‘যমুনাদেবীর খাটের পাশে সাইড টেবিলটা খেয়াল করেছিলি?’ 

আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘না তো!’ 

‘ওখানে একটা ফটো ফ্রেমে দুটো বাচ্চা মেয়ের ছবি ছিল। যেখানে তোর্সাকে সহজেই চেনা যায়। অন্যজন তো নিশ্চয়ই ওনার মা হবেন না। সুতরাং…’ 

‘বুঝলাম। আর দাদার ব্যাপারটা?’ 

‘আরও সহজ। হরিদা অজয়বাবুকে কী বলে ডাকেন?’ 

‘হরিদা… হ্যাঁ, ছোটদাদাবাবু।’ 

‘এখনও বুঝলি না?’ 

‘না…’ 

‘ছোটদাদাবাবু কেউ কাউকে তখনই ডাকবে, যখন সেখানে একজন বড়দাদাবাবু থাকবে।’ 

‘অফকোর্স, ওনার বাবা।’ 

‘আজ্ঞে না। তিনি কর্তাবাবু।’ 

‘ও হো ইয়েস। তাই তো। ব্যাপারটা খেয়াল করিনি। কিন্তু উনি যে এমআইটির প্রফেসর-সেটা বুঝলি কী করে?’ 

‘সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে লাগানো ফটোগুলো।’ 

ছবিগুলো আমিও দেখেছিলাম, কিন্তু নজর করিনি। বিক্রম মাঝে মাঝে আমায় একটা কথা বলত ‘বুঝলি বোধি, একজন বিখ্যাত মানুষ একবার বলেছিলেন “You see, but you do not observe”। অবজার্ভ না করলে কিচ্ছু বোঝা যায় না।’ কথাটার মর্মার্থ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। 

আমি আবার জিগ্যেস করলাম, ‘আর এত কম সময়ের মধ্যে তুই অজয় রঞ্জনের কোম্পানি, আর কাবেরী বাসুর ফেসবুকে লেখালিখি নিয়ে এত ডিটেইলস জানলি কী করে?’ 

বিক্রম চোখ টিপে হেসে বলল, ‘সব রহস্য যদি এখনই ফাঁস করে দিই, তাহলে খেলাটাই তো মাটি হয়ে যাবে…’ 

আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাঝে মাঝে বিক্রম যে কী হেঁয়ালি করে, বুঝি না। আমি সামনে রাখা একটা পুরোনো পূজাবার্ষিকী ম্যাগাজিন উলটে পালটে দেখতে শুরু করলাম। এই সময়ে হঠাৎ ওর ফোন বেজে উঠল… স্ক্রিনে নাম দেখলাম-শেখরকাকু। ও ফোনটা রিসিভ করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আমি শুধু ‘হ্যাঁ শেখরকাকু,’ আর তার কয়েক সেকেন্ড পর দুটো ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলাম না। 

আমি একবার কৌতূহলবশত ওর ঘরে যাব ভাবলাম। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ভাবনা নিজেই নস্যাৎ করে দিলাম। বিক্রমের নিজের একটা আলাদা দুনিয়া আছে। সেখানে ও কারও অনধিকার প্রবেশ পছন্দ করে না। মনে আছে যেদিন এখানে প্রথমবার আসি, ও নিজের জেঠুর ঘরটা আমায় খুলে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘তুই এই ঘরে থাকবি বোধি। এটা জেঠুর ঘর। এমনি পড়ে আছে। আশা করি তোর কোনো অসুবিধা হবে না।’ অসুবিধার প্রশ্নই ওঠে না। বিক্রমদের বাড়িটা ওর ঠাকুরদার আমলে তৈরি। পুরোনো বাড়ি আমার এমনিই খুব পছন্দের, তার ওপর এরকম একটা বিরাট ঘর আর পালঙ্কের সাইজের একটা খাট। আর কী চাই? 

বিক্রম সেদিন আমাকে আস্তে করে একটা কথা বলেছিল, ‘যেমন ইচ্ছে থাকবি, খাবি, ঘুমাবি, পড়বি কোনো অসুবিধা নেই। শুধু একটা ব্যাপার, না বলে আমার ঘরে কখনও ঢুকিস না। এই অ্যালাওয়েন্স আমি আমার বাবা-মা’কেও দিইনি। আই হোপ দ্যাটস ফাইন।’

আমিও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম। অবশ্য ওর ঘরে যে আমি কখনও যাইনি, তা নয়। তবে যতবার গেছি, অনুমতি নিয়েই গেছি। বন্ধুত্ব আর ব্যক্তিগত স্পেস এই দুটো জিনিস বিক্রম খুব দারুণভাবে মেইনটেইন করে। 

এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম ভাঙল বিক্রমের ডাকে, ‘এই পাগলা! সোফায় বসে ঘুমাচ্ছিস কেন?’ 

আমি চোখ কচলে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কটা বাজে রে এখন?’ 

‘সাড়ে ছ’টা।’ 

আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম, ‘এ রাম, কী দেরি হয়ে গেল! সাতটা থেকে ক্লাস।’ 

‘আজও ছাত্র পেটাবি? ক’দিন আগে পরীক্ষা শেষ হল না?’ 

আমি হাই তুলে নিয়ে বললাম, ‘নতুন ব্যাচ ঢুকবে আজকে। দেরি হলে চাকরিটা যাবে।’ 

বিক্রম হেসে বলল, ‘একটু কফি খেয়ে যান স্যার। নয়তো নতুন ব্যাচের সামনে স্যার পড়াতে পড়াতে হাই তুললে ছাত্ররা কী ভাববে?’ 

কথাটা নেহাত মন্দ বলেনি। এই সময় যদি একটু কফি না খাই, পরে গিয়ে আমার মাথা ধরবে। কফি খেয়ে আমি পড়াতে চলে গেলাম। ফিরলাম প্রায় সাড়ে ন’টার পরে। ঘরে ঢুকে দেখি, কেউ কোথাও নেই। বিক্রম সাধারণত ঘরের সোফার ওপর আধশোয়া হয়ে পড়ে থাকে। ওকে দেখতে না পেয়ে একটা ফোন লাগালাম, রিংটোনটা ওর ঘর থেকেই আসছে। আমি কেটে দিলাম। বুঝলাম, এখন ও ব্যস্ত। আমি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে খাটের ওপর এসে বসতেই দেখলাম, বিক্রম কখন যেন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। 

‘আসব স্যার?’ 

‘আয় আয়। কেসের প্রগ্রেস কতদূর?’ 

‘এখনও সে তিমিরেই আছি।’ কথাটা বলতে বলতে ও এসে খাটের ওপর বসল। 

‘দ্যাখ, এখনও গোটা ঘটনার চব্বিশ ঘণ্টাও কাটেনি। একটু টাইম দে।’ আমি বললাম। 

‘হুম্। কাল সম্ভবত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া যাবে। ওটা খুব জরুরি। আর ফরেন্সিক টিম কী পেল সেটাও জানাটা খুব দরকার।’ 

‘তোর তালগোলটা পাকাচ্ছে কোথায়?’ 

‘যা যা দেখেছি, শুনেছি, বুঝেছি তার ওপর বেস করে একটা থিওরি তৈরি করেছি। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে সেটা খাপ খাচ্ছে না। কিংবা আমি খাপ খাওয়াতে পারছি না।’ 

‘তা থিওরিটা কি শোনা যাবে?’ 

‘যাবে। সেই জন্যই তোর কাছে এসে বসলাম। আচ্ছা ফর আ চেঞ্জ তুই ওখানে গিয়ে কী কী বুঝলি? অন্য পার্সপেক্টিভটা শুনি। কাজে লাগতে পারে।’ 

আমি কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললাম, ‘আমার মনে হচ্ছে যে বা যারা খুন করেছে, তাদের ওনার ওপর অনেকদিনের আক্রোশ ছিল। নয়তো কেউ এরকমভাবে কাউকে মারে না।’ 

‘ভেরি গুড। আর?’ 

‘ওনার সেক্রেটারি… বেশ সন্দেহজনক। মহিলা কিছু একটা চেপে যাচ্ছেন। আমার মনে হয় উনি আর ওনার হাজবেন্ড মিলে এই কাজটা করতে পারে।’ 

‘বটে! কিন্তু মোটিভ কী?’ 

‘কাবেরী বাসুর এই চাকরিটা নেওয়ার পেছনে হয়তো অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল। তুই অজয়বাবুর ঘরে যাওয়ার আগে বললি না ওর লেখাটা বেরোলে পড়বি? আমার মনে হয়, তোর্সা রঞ্জন রাইটার্স ব্লকে পড়ায় সেক্রেটারির লেখা নিজের নামে চালাচ্ছিলেন। আর সেই রাগে হাজবেন্ড-ওয়াইফ মিলে ওনাকে খুন করেছে। যেহেতু দুজনেই ওনাদের দয়ায় উপার্জন করতেন, তাই ডিরেক্ট কোনো লিগ্যাল অ্যাকশন নিতে ‘পারেননি। অগত্যা এই মার্ডার প্ল্যান।’

‘বুঝলাম।’

আমি মাথা চুলকে বললাম, ‘ভুলভাল বলে ফেললাম না রে?’

‘একদমই নয়। আই র‍্যাদার অ্যাপ্রিশিয়েট ইট। আমিও জিনিসটা এইভাবে ভাবিনি। দ্যাখ, এই জন্যই সেকেন্ড ওপিনিয়ন কত কাজে লাগে।’

কথাগুলো শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ আনন্দ হল। প্রথমে ফুলদানিতে রক্ত আবিষ্কার আর এখন অবশ্যম্ভাবী হত্যাকারী… উফফ, মনে হল নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিই। হাসিমুখে বিক্রমকে বললাম, ‘আচ্ছা, আমারটা তো হল। এবার তোর থিওরিটা শুনি।’

‘আমারটা আলটিমেটলি একটা বেসলেস থিওরি।’

‘আহা, বেসলেস না ওয়েল স্ট্রাকচার্ড সেটা আমি বুঝব। আগে তুই বল দেখি।’

‘আমার মনে হয়, কাবেরী বাসু আর অজয় রঞ্জন ইজ হ্যাভিং অ্যান অ্যাফেয়ার।’

‘অ্যাঁ? কী করে বুঝলি?’

বিক্রম আনমনে নিজের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতেই বলল, ‘একটা গন্ধ পেলাম। সেটাতেই বুঝলাম।’

‘কীসের গন্ধ?’

‘উইমেন পারফিউম। শ্যানেল নং ৫।’

‘একটু পরিষ্কার করে বলবি প্লিজ।’

‘আমার জেঠু জীবনের শেষ দিকে পারফিউমের ব্যবসা ধরেছিলেন। অবশ্য একা নয়, দীনেশ হরলালকা বলে এক অবাঙালি পার্টনার ছিলেন। ওঁদের কাজ ছিল কলকাতার সেই সময়কার বড় বড় দোকানগুলোতে দামি বিদেশি পারফিউমের সাপ্লাই দেওয়া। সেটা খুব সাকসেসফুলি করেছিলেন। কিন্তু ‘৯৫-এ জেঠুর মৃত্যুর দু’বছর আগে পুরো বিজনেসটা তিনি তার পার্টনারকে বিক্রি করে দেন। অবশ্য মাঝে মাঝে দীনেশবাবু এসে নতুন স্টকের একটা করে স্যাম্পল জেঠুকে দিয়ে যেতেন। ফ্রি-তে। 

‘একবার বাবা মা’কে বিবাহবার্ষিকীতে কী গিফট দেবে ভাবছে। জেঠু সব শুনে বাবাকে নিজের পার্সোনাল স্টক থেকে এই পারফিউমটা বের করে দিয়েছিলেন। আর বাবা উপহার দিয়েছিল মা’কে। ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। সেই প্রথম গন্ধটা পেয়েছিলাম। দ্য অ্যাগ্রেন্স অফ শ্যানেল নং ৫।’

‘খুব দামি ছিল?’

‘মায়ের কাছে যে শিশিটা ছিল, সেই সময়ে দাম ছিল প্রায় ৫০০০ টাকার কাছাকাছি। এই মুহূর্তে সেটা ১৭০০০ তো হবেই।’

‘তাতে অসুবিধা কোথায়? রঞ্জনরা যথেষ্ট ধনী। তারা যদি ১৭০০০ টাকার সেন্ট না মাখে, তাহলে কে মাখবে?’

‘সে মাখলে মাখতেই পারে। তবে মজার ব্যাপার হল, বেশ কিছু ভালো পারফিউম আছে অজয় রঞ্জনের বেডরুমে। বাট শ্যানেল নং ৫ নেই। তাও সেটার গন্ধ পেলাম দুটো জায়গায়। একটা কাবেরী বাসুর গায়ে, অন্যটা অজয় রঞ্জনের গায়ে।’

আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা এমনও তো হতে পারে ওই বাড়িতে ওই শ্যানেল না কি সেই পারফিউমটা ছিল। কাবেরীর পছন্দ হওয়ায় উনি চুরি করেছেন।’

‘যে বাড়ি থেকে পারফিউম চুরি করেছে, সেই বাড়িতে সেই পারফিউমটাই মেখে যাবে? তুই পারিসও বটে।’

আমি যুক্তি দিতে বললাম, ‘আচ্ছা, কাবেরী হয়তো গিফট পেয়েছেন। অজয়বাবুই দিয়েছেন। আই মিন ওনার মতো বড়লোকের কাছে ওই টাকাটা তো নস্যি।’

‘বেশ, তাহলে ওনার গায়ে গন্ধটা এল কী করে?’

‘মে বি ওনার কাছেও একই পারফিউম আছে। তুই দেখিসনি, হয়তো অন্য কোথাও রাখা আছে।’

‘বোধি, আমরা যখন ওনার ঘরে গেলাম, উনি কী পরে ছিলেন?’

‘এক মিনিট দাঁড়া বলছি… হ্যাঁ উনি একটা ট্র্যাক স্যুট পরেছিলেন… ডিপ ব্লু কালারের। উনি জগিং যাওয়ার জন্য বেরোচ্ছিলেন।’

‘বাহ, তুমি ক পেয়েছ। তাহলে বলো তো দেখি, একজন সৌখিন পুরুষ সকালে জগিংয়ে যাওয়ার আগে মেয়েদের পারফিউম কেন মাখবে?’

টিটকিরিটা হজম করে গেলাম। বিক্রম আরও বলল, ‘ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা দুজনেই একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ভালোবাসলে সেটা অপরাধ নয়।’

আমি ওকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘কী বলছিস? অ্যাডাল্টারি ইজ এ ক্রাইম।’

‘ট্রু।’ বিক্রম বলল, ‘বাট দেয়ারস এ ক্যাচ। অ্যাকর্ডিং টু সেকশন ৪৯৭ অফ আইপিসি। যদি আপনি বিবাহিত অবস্থায় অন্য কোনো নারীসঙ্গ গ্রহণ করেন এবং আপনার স্ত্রী সেটি টের পেয়ে আপনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে-সেক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে আপনার সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ জানতেই না পারে বা জেনেও মামলা দায়ের না করে, তাহলে? কোনো শাস্তি নেই। আর এই ধারায় মহিলাদের কোনো শাস্তি হয় না।’

‘কেন?’

‘তা জানি না। তবে আইন এটাই।’

আমি বালিশে হেলান দিয়ে বললাম, ‘বিক্রম, তুই বারবার কেন বলছিলি যে, এটা একটা বেসলেস থিওরি? তোর্সা দেব রঞ্জনকে ওনার স্বামী আর সেক্রেটারি মিলে খুন করেছেন। কারণ দুজনের মধ্যে অ্যাফেয়ার চলছিল। আর সেটা উনি টের পেয়ে গেছিলেন। উই সলভ দ্য কেস।’ আমি দারুণ উত্তেজিত হয়ে বললাম।

‘আর আমাদের কাছে আমাদের বক্তব্যের সমর্থনে কী কী প্রমাণ আছে?’

‘আরে প্রমাণের কী আছে? দুজনকে ধরে পুলিশ একটু কড়কালেই হড় হড় করে সব সত্যি বমি করে দেবে। আর তাছাড়া ওনাদের ফোনের কল লিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ লিস্ট এগুলো থেকেও প্রমাণ বেরিয়ে আসবে।’

‘এর থেকে খুন করেছেন প্রমাণিত হবে না। শুধু প্রেম করেছেন এটাই প্রমাণিত হবে।’ 

আমি অস্থির হয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, তুই কেন একটা সহজ জিনিসকে এত জটিল করছিস বল তো? পুলিশ যদি ওনাদের থেকে সব সত্যি বার করে ফেলে, তাহলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।’

‘আজ্ঞে না। ল্যাটা চুকে যায় না। পুলিশের কাছে দেওয়া স্টেটমেন্ট কোর্টে অ্যাডমিসিবল নয়। এবার আমার থিওরি বেসলেস কেন সেটা বলি। পয়েন্ট নম্বর এক, যেখানে একটা ডিভোর্স ফাইল করলেই ঝামেলা চুকে যায় সেখানে কেউ কাউকে খুন করবে কেন? আর মেন্টাল ইলনেসের গ্রাউন্ডে ডিভোর্স পাওয়াটা অনেক সহজ। পয়েন্ট নম্বর দুই, যদি পরকীয়াই আসল কারণ হয়-তাহলেও পাঁচ বছরের জেল থেকে বাঁচার জন্য কেউ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পথে কেন যাবে?

‘পয়েন্ট নম্বর তিন, তোর কথা যদি ধরেই নিই, ওনারা দুজনে মিলে মার্ডার করেছেন। সেক্ষেত্রে জিনিসটাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক মৃত্যু বা অ্যাক্সিডেন্ট দেখানোর চেষ্টা হতো। যেভাবে ওনাকে মারা হয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার এক্ষেত্রে খুনি হত্যা লুকানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। আর তাছাড়া এই রকম বীভৎসভাবে মারার জন্য অনেক আক্রোশ থাকা দরকার। সেটা কাবেরী বাসুর কিছুটা থাকলেও অজয় রঞ্জনের ছিল না।

‘এবার আইনটা ভালো করে বোঝ। সেকশন ৪৯৭ একটা কমপ্লেন বেসড ল। অর্থাৎ কেউ যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের না করে, সেক্ষেত্রে কোনো কেসই হবে না। আর ৪৯৭ ধারায় সবসময় জেল হয় না, শাস্তি কেসের মেরিটের ওপর নির্ভর করে। অনেক কেস এরকমও আছে, যেখানে শুধুমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেটার চান্স এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি।

‘কারণ এক, তোর্সার হিস্ট্রি অফ মেন্টাল ইস্যু। আর দুই কাবেরীর হাজবেন্ডের তার সন্তান প্রসবে অক্ষম স্ত্রীর ওপর থেকে মন উঠে গেছে। এক্ষেত্রে কোর্ট শুধু জরিমানার সাজাও দিতে পারত। কারণ সামওয়ান লাইক অজয় রঞ্জন উইল নট হায়ার এনি অর্ডিনারি লয়ার। হি উইল হায়ার দ্য বেস্ট ইন দ্য টাউন।’

পুরো ব্যাপারটা শুনে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। তবুও একটা কথা মনের মধ্যে খোঁচা মারছিল। বিক্রম যা বলছে, সেগুলো ও অনেক ঠান্ডা মাথায় ভেবে বার করেছে। কিন্তু কেউ যদি কাউকে রাগের মাথায় খুন করে, তাহলে কি তার মনে এতরকম চিন্তা ভাবনা আসবে?

বিক্রমকে জিগ্যেস করতে ও বলল, ‘বোধি আক্রোশ থেকে কাউকে খুন করা আর রাগের মাথায় কাউকে খুন করা এক জিনিস নয়। আক্রোশ তৈরি হয় অনেকদিনের চাপা ক্ষোভ থেকে। এবার সেই ধরনের ক্ষোভ থেকে একজন যেমন খুনও করতে পারে, তেমন অন্যভাবেও নিজের প্রতিশোধস্পৃহা মেটাতে পারে। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতিতেই প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য প্ল্যানও হতে পারে, আবার ন্যাচারালিও হতে পারে।’

বিক্রমের শেষ কথাগুলো আমার খুব দুর্বোধ্য ঠেকল। ও আমার অবস্থা দেখে বলল, ‘আচ্ছা বুঝিয়ে বলছি। মনে কর তুই একজন লেখক। আর তোর অনেকদিনের ইচ্ছে নিজের লেখা প্রকাশ করার। এই ইচ্ছে নিয়ে তুই তোর একজন প্রিয় লেখকের বাড়িতে সেক্রেটারির কাজ নিলি। ঠিক করলি, সঠিক সুযোগ বুঝে তোর নিজের লেখা ওনাকে দেখাবি যাতে ওনার একটা রেকমেন্ডেশন পাওয়া যায়। আর যখন এটা হল-রেকমেন্ডেশনের বদলে তুই দেখলি, তোর প্রিয় লেখক তোর লেখাই নিজের নামে ছাপিয়ে অকাদেমি পুরস্কার পাচ্ছেন।

‘কারণ ওনার অনেকদিন ধরে রাইটার্স ব্লক চলছে। অথচ ওই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা আর অধিকার শুধু তোরই আছে। তোর খুব রাগ হল। ভাবলি লোকটাকে মেরেই ফেলে দিবি। কিন্তু তার আগেই দেখলি ওনার স্ত্রী তোর প্রেমে পড়েছে আর ওনার বাচ্চারা ওনার থেকে বেশি তোকে ভালোবাসে। কারণ উনি ব্যক্তিগত জীবনে একজন অ্যাবিউসিভ মানুষ। তুই প্রেমও পেলি, সন্তানও পেলি, আবার ডিভোর্স অ্যালুমনি বাবদ অনেক টাকাও পেলি। আর ওনার প্রাক্তন স্ত্রী তোর হয়ে সবাইকে জানাল যে, উনি তোর লেখা চুরি করেছিলেন। তোর নামও হল আর বদলাও হল। এবার বল, এরপরেও কি তুই ওনাকে খুন করবি?’ 

এতক্ষণে ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হল। এবারে বিক্রম আমায় প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা বোধি, তোর্সা দেব রঞ্জনকে কীভাবে মারা হয়েছে?’

প্রশ্নটা করতেই আমার প্রদীপ্তর ল্যাপটপে দেখা ওই ছবিগুলোর কথা মনে পড়ল। কিছুটা হলেও ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলাম। মুখে বললাম, ‘অত্যন্ত বীভৎসভাবে মারা হয়েছে। আঙুল কেটে মুখে চোখে ঢুকিয়ে দিয়ে… উফফ্ হরিবল্।’

‘তুই আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না, আমি জিজ্ঞাসা করলাম কী ভাবে?’

‘বললাম তো কীভাবে। আঙুল কেটে চোখে ঢুকিয়ে, ও হ্যাঁ সব রক্ত টেনে বের করেও হতে পারে।’

‘আচ্ছা মনে কর, তোকে তোর মতো পাঁচজনের শক্তি রাখে এমন কেউ চেপে ধরে তোর আঙুলগুলো কাটার চেষ্টা করছে। তুই কী করবি?’

‘পালিয়ে যাব। পালাতে না পারলেও যেভাবে হোক বাধা দেব। চেঁচাব।’

‘কারেক্ট। কেউ তোর্সার আঙুলগুলো কেটে ওনাকে মারতে চাইছে। এই অবস্থায় উনি চিৎকার করলেন না কেন? কিংবা বাধা দিলেন না কেন?’

আমি কিছুটা ভেবে বললাম, ‘হয়তো খুন করার আগে অজ্ঞান করে দিয়েছিল। ক্লোরোফর্ম দিয়েছিল বা মাথায় বাড়ি মেরেছিল।’

‘এক্সেলেন্ট, যদি খুনই করবে তাহলে তো সেটা মাথায় বাড়ি মেরেও করা যেত। শুধু অজ্ঞান করার জন্য বাড়ি মারবে কেন? আর ক্লোরোফর্ম দেওয়া হয়নি, দিলে নাকে-মুখে ফ্যাকাসে বা পোড়া দাগ পড়ে যায়। ওনার মুখে সেরকম কোনো দাগ ছিল না, অ্যাটলিস্ট ছবিতে যতটুকু দেখলাম। যদি আমার ক্যালকুলেশন খুব ভুল না হয়, তাহলে খুনি ঘাড় মটকে মেরে তারপর যা করার করেছে।’

‘ঘাড় মটকে মেরেছে? তুই কী করে বুঝলি?’ চোখ গোল গোল করে জিগ্যেস করলাম আমি।

‘ছবিগুলো দেখে। দ্যাখ, যদি কেউ দ্রুত এবং সঠিকভাবে ঘাড় মোচড়ায়, তাহলে সাধারণত শরীরের ওপর কোনো দাগ বা কালশিটে পড়ে না। কিন্তু যদি কেউ ঘাড় ধরে জোরে টানে, অনেকসময় পেশি বা ত্বকের নীচে রক্তক্ষরণ হয়, তাহলে হালকা কালশিটে দাগ দেখা যেতে পারে। এছাড়া যদি আক্রমণকারী ঘাড়ের দু’পাশ থেকে শক্তভাবে চেপে ধরে, তাহলে আঙুলের চাপে গলার স্টার্নোক্লিডোমাস্টয়েড পেশির ওপরে কালশিটে দেখা যেতে পারে।’

‘কী বললি কোন পেশি?’

‘স্টার্নো… ছাড়, এই যে এই পেশিটা।’ বলে বিক্রম মাথাটা একপাশে ঘুরিয়ে নিজের গলার পাশে আঙুল দিয়ে দেখাল। ঘাড় ঘোরালে গলার পাশের যে লম্বা পেশিটা বেরিয়ে আসে, তারই নাম স্টার্নোক্লিডোমাস্টয়েড পেশি।

আমি হেসে বললাম, ‘তুই তো ঘরে বসে অটোপ্সি করে দিলি রে। তা এই সব এত ডিটেলস কোথা থেকে জানলি?’

বিক্রম একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ইন্টারনেট।’ তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘এখনও পুরো কেসটাই অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। অনেক কিছু এখনও জানা বাকি। যেমন তোর্সার সাইকিয়াট্রিস্টের থেকে জানা দরকার, ওনার অ্যাকচুয়াল প্রবলেমটা কী ছিল? ওনার মায়ের থেকে জানতে হবে, দুই বোনের সমস্যাটা এক্সাক্টলি কী? আর অজয় রঞ্জন ও কাবেরী বাসু সত্যি বলছে কি না? শেষ তিন-চার বছরে কাদের কাদের সঙ্গে উনি খুব ফ্রিকোয়েন্টলি যোগাযোগ করেছিলেন? এবং কেন? ওনার রাজনৈতিক ও সাহিত্য জগতের বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলা দরকার। অনেক কাজ বাকি রে ভাই।’ বলে আস্তে করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *