লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে – প্রমিত গুপ্ত

লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে

সে রাতে একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখলাম। দেখি, আমি একটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছি আর আমার পেছনে তোর্সা দেব রঞ্জন তেড়ে আসছেন। মহিলার সারা শরীর থেকে অনেকগুলো আঙুল বেরিয়ে আছে। সেইসব আঙুলে একটা করে পেন ধরা। এই অবস্থায় তিনি আমায় তাড়া করছেন আর পেছন থেকে চেঁচাচ্ছেন, ‘কোথায় পালাচ্ছিস? দাঁড়া। আমি তোর গায়ে স্টার্নোক্লিডোমাস্টয়েড বানান লিখব। দাঁড়া।’ কিছুদূর দৌড়ানোর পর দেখি বিক্রম আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমায় ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলছে, ‘আরে তাড়াতাড়ি দৌড়া। এরপর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আনতে যেতে হবে তো!’

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখি বিক্রম বলছে, ‘আরে ওঠ রে কুম্ভকর্ণ! বেরোতে হবে। প্রদীপ্ত ফোন করেছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে। রেডি হয়ে নে তাড়াতাড়ি।’

আমি উঠে পড়লাম। অবশ্য বিক্রমকে স্বপ্নের ব্যাপারটা জানাব না ঠিক করেছি। জানলেই লেগ পুল করবে।

বেরোনোর আগে বিক্রম নগেনদাকে বলে দিল অপেক্ষা না করতে। আজকে ফিরতে অনেক বেলা হবে। আমাকে জিজ্ঞাসা করায় আমিও জানালাম যে, সৌভাগ্যক্রমে আমারও আজকে কোচিংয়ে যাওয়া নেই। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, আমরা হয়তো আবার লালবাজার যাব। কিন্তু দেখলাম, বিক্রম আর. জি. কর মেডিকেল কলেজের ডেস্টিনেশন দিয়েছে। আমরা কি মর্গে যাচ্ছি তাহলে? আমার তো রীতিমতো গলা শুকিয়ে গেল। 

বিক্রমকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, ‘আরে না রে বাবা। আমরা যাব যেখানে অটোপ্সি হচ্ছে, সেখানে। সেটাকে মর্গ বলে না, মর্চুয়ারি বলে। তবে হ্যাঁ অটোপ্সি হচ্ছে যখন, লাশ তো থাকবেই। চিন্তা নেই আমাদের সামনে কেউ অটোপ্সি পারফর্ম করবে না।’

মর্গ আর মর্চুয়ারি যে একই জিনিস সেটা আমি জানি। যেটা জানি না সেটা হল, বিক্রম আমায় ঠিক কতটা ভিতু বা মূর্খ ভাবে। গোটা রাস্তায় বারবার একটা কবিতার কথা মনে পড়তে লাগল। জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’।

আর. জি. করের সামনে যখন পৌঁছলাম, ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা। ট্যাক্সি থেকে নেমে বিক্রম একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এহ্ হে, দেরি হয়ে গেল।’

আমরা হসপিটালের মেন গেট দিয়ে ঢুকলাম। সামনেই রাস্তা, সোজা মূল ভবনের দিকে গেছে। চারপাশে রোগীর আত্মীয়স্বজন, নার্স, হাসপাতালের কর্মী, অ্যাম্বুলেন্সের যাতায়াত-সব মিলিয়ে বেশ একটা কর্মব্যস্ত পরিবেশ।

মূল ভবনের সামনে এসে ডান দিকে তাকাতেই ফরেন্সিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি বিভাগের সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। সেখানে ডিরেকশন দেওয়াই ছিল। সেটা অনুসরণ করে আমরা ডান দিকে মোড় নিলাম, কয়েক মিনিট হাঁটতেই ফরেন্সিক বিভাগের একতলা ভবনটা চোখে পড়ল। দরজা খুলতেই সামনে রিসেপশন ডেস্ক।

সেখানে প্রদীপ্ত দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা এগিয়ে আসতেই বলল, ‘অটোপ্সি মোটামুটি কমপ্লিট, আশা করছি আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই বডি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। ডক্টর সেনগুপ্ত মিনিট পাঁচেক সময় চাইলেন। তারপর উনি আমাদের সঙ্গে বসে কথা বলবেন।’

‘তা বেশ তো, অসুবিধা নেই।’ নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিক্রম বলল।

অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন লোক এসে জানাল, ডাঃ বিধান কান্তি সেনগুপ্ত আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমরা তিনজন সেই লোকটাকে অনুসরণ করে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে এলাম। ডাঃ সেনগুপ্তর ঘরের বর্ণনা দিয়ে সময় নষ্ট করব না। কারণ বিশেষত্ব ঘরে নেই, আছে ওনার চেহারায়। ভদ্রলোককে দেখেই মনে হল, চোখের সামনে স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বসে আছেন। ইংরেজিতে যাকে বলে কটন ক্যান্ডি-ভদ্রলোকের মাথার চুল একেবারে সেইরকম। কোনোদিকে আঁচড়ানো নেই, শনের মতো সাদা চুল অবিন্যস্তভাবে মাথার দু’পাশে ছড়িয়ে আছে। আর মুখের ওপর একটা পুরু মোটা সাদা গোঁফ, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা।

ভদ্রলোক আমাদের হাতের ইশারায় বসতে বললেন। তারপর প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি এই কেসের ইনচার্জ?’

প্রদীপ্ত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

‘আর এনারা?’ প্রশ্নটা আমাদের দিকে তাকিয়ে করলেন তিনি।

‘ওনারা এই কেসে আমাদের সাহায্য করছেন।’

‘বেশ, বসুন। প্রথমেই বলি, খুনি প্রথমবার খুন করেছে, কিন্তু খুবই ব্রুটাল ও পরিকল্পিতভাবে। এই দুটো গুণ সাধারণত একসঙ্গে দেখা যায় না। প্রথমত, আমরা শরীরের কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাতের দাগ পেয়েছি। এগুলো তাৎক্ষণিক রাগে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ক্রোধে দেওয়া হয়েছে-যাকে বলে প্যাশনেট ক্রাইম।

‘দ্বিতীয়ত, খুনের পদ্ধতি বলছে খুনি পেশাদার নয়, কিন্তু খুবই নির্দয়। মৃতের দেহে কিছু আঘাত মৃত্যুর আগে, কিছু পরে-মানে, সে নিশ্চিত হতে চেয়েছে শিকার মরেছে কি না। এটা প্রথমবার খুন করা লোকেদের মধ্যেই দেখা যায়। ভিক্টিমের মৃত্যু হয়েছে ঘাড় মটকে দেওয়ার ফলে-এটা সাধারণত খুব দ্রুত ঘটে, বাহ্যিক ক্ষত কম থাকে। কিন্তু এখানে গভীর কালশিটের দাগ দেখা গেছে।

‘তৃতীয়ত, আমরা শুরুতে অনুমান করেছিলাম খুন হয়েছে ২:৩০ থেকে ৩:৩০-এর মধ্যে, কিন্তু আসল সময়টা ছিল ১২:৪৫ থেকে ১:৩০-এর মধ্যে। কারণ খুনি খুন করার আগে ভয় দেখিয়েছিল, যে কারণে রিগার মর্টিস তাড়াতাড়ি ধরেছে। প্রথমে ঘাড় মটকে মেরে তারপর ঠান্ডা মাথায় ভিক্টিমের আঙুলগুলো কেটেছে। নির্ঘাত সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করেছিল। কারণ খুব নিখুঁত কাট, টু ক্লিন ফর আ ফার্স্ট টাইমার।

‘সবচেয়ে ভয়ানক বিষয়, দেহের প্রায় ৮০% রক্ত বের করে নেওয়া হয়েছে, যাতে আশপাশে কোনো রক্তের দাগ না থাকে। এই রক্ত অ্যাক্সিলারি আর্টারি থেকে বের করা হয়েছে। সেখানে আমরা ছুঁচের দাগ পেয়েছি। সবকিছু এটাই বলছে, খুনি শুধু রাগে নয়, বিকৃত মানসিক তৃপ্তির জন্য খুনটা করেছে। এর মানে সে আবার খুন করতে পারে।’

প্রদীপ্ত চমকে উঠে জিগ্যেস করল, ‘আবার খুন করবে! সেটা আপনি কীভাবে বলছেন?’

ডাঃ সেনগুপ্ত হেসে বললেন, ‘ধরে নাও আমি নই, আমার চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে।’

বিক্রম এবার প্রশ্ন করল, ‘খুনি কি একজন? নাকি একাধিক?’

ডাঃ সেনগুপ্ত বললেন, ‘এই মুহূর্তে সেটা কনফার্ম বলা মুশকিল। এটা প্রাইমারি রিপোর্ট। ওকে জেন্টেলমেন, এবার আমায় উঠতে হবে, ক্লাস আছে।’

উনি প্রদীপ্তর হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়ে উঠে পড়লেন। সঙ্গে আমরাও উঠলাম। আগে থাকতেই ঠিক করে রেখেছিলাম, আদি হরিদাস মোদকে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করব। প্রদীপ্তকে বলতে সে-ও রাজি হয়ে গেল। হরিদাস মোদকে পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না। গিয়ে বসতেই কিছুক্ষণের মধ্যে কলাপাতায় গরম গরম কচুরি আর ছোলার ডাল চলে এল। খেতে খেতে প্রদীপ্ত বিক্রমকে বলল, ‘তোমায় এক ব্যাড নিউজ দেওয়ার আছে বিক্রম।’

বিক্রম খাওয়া থামিয়ে প্রদীপ্তর দিকে তাকাল। প্রদীপ্ত কচুরির টুকরোটা হাতে রেখেই বলল, ‘ফরেন্সিক টিম জানিয়েছে, রঞ্জনদের বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ থেকে কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। কেউ সিস্টেম হ্যাক করে পুরো ফুটেজ বাইপাস করে দিয়েছিল। ফরেন্সিক টিম ব্যাক ট্র্যাক করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর তোমার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেছি। সময় লাগবে। বাকি তুমি কী বুঝছ বলো?’ 

উত্তরে বিক্রম বলল, ‘আমি কাল অনেক রাত পর্যন্ত ভেবেছি এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এখন থেকে যা করার সবকিছু প্ল্যান করে করতে হবে। তুমি এক দিকে যাবে, আমরা আরেক দিকে যাব। দিনের শেষে নিজেদের ফাইন্ডিংস একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেব। তোর্সার ডক্টরদের ঠিকানা পেয়ে গেছি। ডাঃ আকাশ মিত্র, চেম্বারের নাম-মাইন্ড হিল নিউরোসাইকিয়াট্রিক ক্লিনিক। ঠিকানা-২৩/১ এজেসি বোস রোড, ৭০০০২০। আর ডাঃ মানসী ব্যানার্জির ঠিকানা ট্র্যাংকুইল মাইন্ডস থেরাপি সেন্টার, ১১৮ যোধপুর পার্ক, ৭০০০৬৮।’

কথাগুলো বলেই বিক্রম তড়াক করে উঠে হাত মুখ ধুয়ে চলে এল। তারপর বিল মিটিয়ে বলল, ‘আর দেরি করে লাভ নেই। প্রদীপ্ত, তুমি আমাদের সঙ্গে আকাশ মিত্রের চেম্বারে চলো। ওনাকে একবার তোমার শ্রীমুখ দেখিয়ে নেওয়া ভালো। যাতে পরে সুবিধা হয়।’

প্রদীপ্তও দেখলাম বিনা বাক্যব্যয়ে আমাদের নিয়ে জিপে চড়ে বসল। একটা আধুনিক ঢঙের পেল্লায় বিল্ডিংয়ের সামনে এসে জিপ থামল। এটা যাকে বলে, কমার্শিয়াল কাম রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং। নীচে একটা ওষুধের দোকান, একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, পাশাপাশি দুটো ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ আর একদিকে দোতলায় কয়েকটা ইনস্যুরেন্সের অফিস। অন্য দিকে বেশ বড় জায়গা জুড়ে ডাঃ আকাশ মিত্রের চেম্বার। ভেতরে সারি দিয়ে বসার জায়গা রয়েছে। ঠিক তার উলটো দিকেই রিসেপশন-সেখানে একটি কমবয়সি মেয়ে বসে আছে। আমাদের দেখেই মেয়েটা উঠে দাঁড়াল।

বিক্রম সোজা দাঁড়িয়ে বলল, ‘ডাঃ মিত্র।’

মেয়েটা আমাদের তিনজনকে দেখে নিয়ে বলল, ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে? একটু নামটা বলবেন।’

কথাটা শুনে প্রদীপ্ত এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল, ‘ডাক্তারবাবুকে বলুন, লালবাজার থেকে আসছি। দেখবেন চট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে যাবে।’

মেয়েটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে টেলিফোন তুলে ভেতরে জানান দিল। 

দু’মিনিটের মধ্যেই আমাদের ডাক এল। ভেতরে গেলাম। ঘরটা ছোট, কিন্তু সাজানো। দেওয়ালে সার্টিফিকেটের পাশে দুটো ফ্রেমে বাঁধানো ছবি-ছোট ছেলেমেয়েদের হাসিমুখ। টেবিলে ফাইলের মধ্যিখানে একটা ছোট টেডি বিয়ার, আর পাশে কয়েকটা ওষুধের শিশি। ডাঃ আকাশ মিত্রের চেহারা বিশেষত্বহীন হলেও বেশ সৌম্য। বয়স ষাটের ওপরে, ফর্সা রং, দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করে কামানো, চোখে একটা সোনালি ডাঁটি দেওয়া রিমলেস চশমা। আমাদের দেখে একগাল হেসে নমস্কার জানালেন। চেয়ারের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘বসুন বসুন, আপনারা যে এখানে আসবেন, সেটা আমি জানতাম। তবে বুঝতেই তো পারছেন, বাইরে অনেকে অপেক্ষা করছে।’

‘চিন্তা করবেন না ডাঃ মিত্র, আমরা আপনার বেশি সময় নেব না।’ বিক্রম বলল, ‘সোজা কাজের কথায় আসছি। তোর্সা দেব রঞ্জন আপনার কাছে কতবার এসেছিলেন?’

‘বার তিনেক মতন।’

‘একটু শুরু থেকে বলুন।’ বিক্রম বলল।

ডাঃ মিত্র চশমা ঠিক করে বললেন, ‘দেখুন, তোর্সার প্রধান সমস্যা ছিল ডিলিউসন। সাইকোলজিতে ডিলিউসনের অনেকগুলো ভাগ আছে, তার মধ্যে যে দুটো তোর্সার ওপর প্রযোজ্য হয়-সে দুটো হল, গ্র্যানডয়েস ডিলিউসন আর প্যারানয়েড ডিলিউসন। এর মধ্যে গ্র্যানডয়েস ডিলিউসনের রোগীদের ধারণা হয় যে, তারা একটা বা একাধিক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। আবার প্যারানয়েড ডিলিউসন হল সবসময় মনে হওয়া, কেউ বুঝি আমার ক্ষতি করতে চাইছে। মানসীর থেকে যতদুর শুনেছি, ওর ব্যাপারটা আস্তে আস্তে ম্যানিক স্টেজে চলে গিয়েছিল। এককথায় ভীষণ রকমের হুইমসিকাল।’

বিক্রম বলল, ‘কীসের থেকে ওনার এই সমস্যার শুরু?’

ডাঃ মিত্র হালকা হেসে বললেন, ‘দেখুন, মাত্র তিনবারে সবটা বোঝা যায় না। সম্ভবত, এই ডিলিউসনের শিকড় তোর্সার শৈশবে পোঁতা আছে। শুনেছি ওর এক দিদি আছে, যার সঙ্গে ওর দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ নেই। সম্ভবত সিব্লিং রাইভ্যালরি। বাবা-মা দিদিকে 

হয়তো বেশি প্রায়োরিটি দিয়েছে, ওকে কম। শিশুমনে এ ধরনের চিন্তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ওর ক্ষেত্রে হয়তো পরেও এই ধারণা রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের উপেক্ষা আর অনাদরের কারণে অনেক সময় মনে একধরনের অদ্ভুত ক্ষোভ জন্ম নেয়-এ অবস্থায় মানুষ নিজেকে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে পড়ে, নিজেকে “বিশেষ” ভাবতে শুরু করে, নিজের অস্তিত্বের পক্ষে জোরালো যুক্তি তৈরি করতে চায়-এটাই গ্র্যানডয়েস ডিলিউসন।

‘আর অন্যদিকে, দিদিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঈর্ষা, অপমান আর অভিমান ক্রমে রূপ নেয় সেলফ-ডাউট আর ক্ষোভে। ওর মনে হতে থাকে, সকলে যেন একজোট হয়ে ওর ক্ষতি চায়, ছোট করতে চায়-একসময় এটাই প্যারানয়েড ডিলিউসনের রূপ নেয়। এই মানসিক দোলাচলই ম্যানিক হাইপোথিসিস এনে দেয়-বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে।’

প্রদীপ্ত বলল, ‘এ বিষয়ে ওনার পরিবারের কী বক্তব্য?’

‘মিস্টার রঞ্জন স্ত্রীকে নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় থাকতেন, ভদ্রলোকের আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা অস্বীকার করি কীভাবে! আমি ওনাদের মানসীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলাম। ও কলকাতার সেরা সাইকোলজিস্টদের মধ্যে একজন। কিন্তু পেশেন্ট যদি কোনোভাবে কো-অপারেট না করে, সেক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না। মানসী আমায় ফোন করে জানিয়েছিল, ওর কোনো প্রচেষ্টাই কোনো ফল দেয়নি।’

‘আচ্ছা।’ প্রদীপ্ত এবার বলল, ‘ওনার ওই রাইটার্স ব্লক নিয়ে কী বলতেন? এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’

‘এটা একটা দরকারি প্রশ্ন করেছেন। দেখুন, আমি ভুলও হতে পারি, তবে আমার মনে হয় না ওর রাইটার্স ব্লক বলে কোনো সমস্যা ছিল বলে। এ ধরনের সমস্যায় মানুষ অসম্ভব মনোকষ্টে ভোগেন। ভীষণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকেন। কিন্তু তোর্সার সেই অর্থে কোনো কষ্ট ছিল না, ওর ছিল ভয়। কোনো কিছুকে বা কাউকে ভয়, ভীষণ ভয়।’

বিক্রম বলল, ‘কারও নাম বলতেন?’

ডাঃ মিত্র একটু থেমে, টেবিলের টেডি বিয়ারটা ঠিক করে বললেন, ‘আলাদা করে কখনও কিছু বলেনি। ও আমার কাছে যে তিনবার এসেছিল, একবারের জন্যও নিজের অতীতের দরজা খোলেনি। খুব সাবধানতা অবলম্বন করত এই ব্যাপারে। অবশ্য মানসীকে যদি কিছু বলে থাকে, সেটা আমি বলতে পারব না।’

বিক্রম বলল, ‘শেষবার কী বলেছিলেন?’

‘আলাদা কিছু নয়, যা বলেছিল-সবই আপনাদের বললাম।’ ডাঃ মিত্র বললেন, ‘তবে যে দারুণ ভয়টা কাজ করত আই থিংক ইট কুড বি আ গিল্ট।’

‘ঠিক আছে। আর একটা ছোট্ট সাহায্য লাগবে, আপনি একবার ডক্টর মানসী ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলে ওনাকে জানিয়ে দিন যে, আমরা ওনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’

‘নিশ্চয়ই, আমি এখনই ওকে জানিয়ে দিচ্ছি।’

‘আজ তাহলে অনুমতি দিন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আর আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত ডাঃ মিত্র।’

কথাগুলো বলেই বিক্রম উঠে পড়ল। ডাঃ মিত্র আমাদের তিনজনের সঙ্গেই করমর্দন করলেন। বাইরে আসতেই দেখলাম, বিক্রম নিজের ফোন খুলে কী যেন দেখছে, তারপর রিসেপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর আমাদের কাছে এসে বলল, ‘প্রদীপ্ত, তুমি ইমিডিয়েটলি ওই পাবলিশারদের সঙ্গে যোগাযোগ করো। আর এটা ধরো।’ বিক্রম প্রদীপ্তর হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ ধরিয়ে দিল। ‘এতে সমস্ত পাবলিশারদের ঠিকানা আছে। সৌজন্যে কাবেরী বাসু। এখন আমি আর বোধি যাব ডাঃ মানসী ব্যানার্জির চেম্বারে। তোর্সার আসল ইতিহাসটা এবারে খুঁজে বার করতে হবে।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *