কুম্ভীলকের মৃত্যুভয় – প্রমিত গুপ্ত

কুম্ভীলকের মৃত্যুভয়

সকালবেলা উঠে দেখি বিক্রম বেশ খোশমেজাজে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। আমায় দেখে বিলিতি কায়দায় সামনে ঝুঁকে গুড মর্নিং জানাল। বুঝলাম এবারে আমার সব প্রশ্নের উত্তর পাব। আমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ওর পাশে বসে পড়লাম।

বিক্রম আমার দিকে ঘুরে গিয়ে বলল, ‘ইয়েস স্যার, বলুন কী জানতে চান?’

আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা এই যে এক নতুন চরিত্রের উদয় হল, কী যেন নাম?’

‘প্রফেসর অমরেন্দ্রনাথ দত্ত।’

‘হ্যাঁ, এনাকে হঠাৎ আগ বাড়িয়ে তোর্সার এই গল্প ঝাড়ার ব্যাপারটা সামনে আনতে কে বলল? নিজের চরকায় তেল দিতে পারছিল না?’

‘মানে যেহেতু চুরিটা আমার বাড়িতে না হয়ে আমার পড়শির বাড়িতে হচ্ছে, তাই আমার সব দেখেও চুপ করে থাকা উচিত? তাই বলতে চাইছিস?’

‘আরে বাবা তা নয়, দ্যাখ তুই নির্ঘাত কাল অনেক রাত অবধি জেগে রিসার্চ করেছিস। আমিও করেছি। আমাদের ব্যোমকেশের সৃষ্টিকর্তা শরদিন্দুবাবুর একটা উপন্যাস আছে “ঝিন্দের বন্দি”। এটা কিন্তু বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক অ্যান্টনি হোপের লেখা “প্রিসোনারস অফ জেন্দা” থেকে নেওয়া, এছাড়াও হেমেন্দ্রকুমার রায়ের জয়ন্ত-মানিক জুটির একটা গল্প আছে “নেতাজির ছয় মূর্তি”-এটাও শার্লক হোমসের “সিক্স নেপোলিয়ন” থেকে ধার নেওয়া, এমনকী শরদিন্দুবাবুর “সীমন্ত হীরা” গল্পটাতেও এই গল্পের ছোঁয়া পাওয়া যায়। আর আমার নিজের খুব প্রিয় সাহিত্যিক শ্রী নারায়ণ সান্যাল, ওনার বিখ্যাত লেখা “বিশ্বাসঘাতক” তো রবার্ট ক্যাডওয়েল উইলিয়ামসের “দ্য অ্যাটম স্পাই দ্য স্টোরি অফ ক্লাউস ফুক্স” থেকে অনুপ্রাণিত।

তবে শুধু এটাই নয়। আরও আছে। ওনার কাঁটায় কাঁটায় সিরিজের বেশ কিছু লেখা, যেমন “সোনার কাঁটা” আগাথা ক্রিস্টির “মাউসট্র্যাপ” থেকে নেওয়া, “অ-আ-ক-খুনের কাঁটা” নেওয়া “দ্য এ.বি.সি মার্ডার” থেকে, এখানে গল্পের নামটাও প্রায় এক। এছাড়াও বেশ কিছু গল্প আছে, যেগুলো আর্ল স্ট্যানলি গার্ডনারের প্যারী ম্যাসন থেকে নেওয়া। ওনার গোয়েন্দা পিকে রাসুর চরিত্রটাও নাকি প্যারী ম্যাসন থেকেই অনুপ্রাণিত। এদের বইগুলো এখনও বাজারে রমরমিয়ে চলছে। তাহলে তোর্সাকেই শুধু দোষ দেওয়া কেন? এবার বল?’

‘বা-বা, তুই তো পুরো ফিল্ডিং সাজিয়ে নেমেছিস রে, ভেরি গুড। তাহলে একটা একটা করে বলি, প্রথমেই তোকে বুঝতে হবে প্লেজিয়ারিজম আর অ্যাডাপ্টেশনের মধ্যে পার্থক্য কী! ধর, তুই কোনো বিদেশি লেখার প্লট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজে একটা গল্প লিখলি-যেখানে চরিত্র, সেটিং, ভাষা, সময়কাল সব বদলে আলাদা করলি, এবং কোথাও স্পষ্ট বা সূক্ষ্মভাবে উৎসের উল্লেখ করলি-তাহলে সেটা অ্যাডাপ্টেশন। প্লেজিয়ারিজম হল, যখন কারও লেখা বা ভাবনা প্রায় হুবহু কপি করে নিজের নামে প্রকাশ করা হয়, কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে। এবার তোকে একটা প্রশ্ন করব, তুই কাভ্যা বিশ্বনাথানের নাম শুনেছিস?’

‘কাভ্যা বিশ্বনাথন, নামটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে… দাবা খেলে?’

‘সেটা বিশ্বনাথন আনন্দ। যার কথা বলছি, তিনি একজন বিখ্যাত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন গল্পচোর। ইনি ২০০৬ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছিলেন। কোনো এক অজানা কারণে সে সময় লিটিল ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি বলে একটা পাবলিকেশন কাভ্যার সঙ্গে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তি সই করে, সে সময় ভারতীয় মুদ্রায় সেটা প্রায় সওয়া দু’কোটি টাকা। আর এখন তো প্রায় তিন কোটির ওপর ধর। চারিদিকে দারুণ হইহই করে মুক্তি পেল কাভ্যার একমাত্র উপন্যাস “হাউ ওপাল মেহতা গট কিসড, গট ওয়াইল্ড, অ্যান্ড গট আ লাইফ।”

‘বইটা মুক্তি পাওয়ার উনিশ দিনের মধ্যেই হল বিস্ফোরণ। জানা গেল, এই একটা মাত্র উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি সলমন রুশদি, মেগ ক্যাবট, মেগান ম্যাক্বাফারটি এবং তনুজা দেশাই হিডিয়ার এই চারজন লেখকের বিভিন্ন লেখা থেকে বিভিন্ন অংশ একরকম ছেপে বসিয়ে দিয়েছেন। প্রথমে দ্য হার্ভার্ড ক্রিমসন এবং তারপর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট আর আমাদের দেশে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-প্রায় প্রত্যেকে অরিজিনাল লেখা থেকে প্যারাগ্রাফ তুলে তুলে প্রমাণ করেছিল যে, লেখাটা মোটেই মৌলিক নয়। ফলে মাত্র চারদিনের মাথায় বইটা মার্কেট থেকে তুলে নেওয়া হয়। আর দশদিনের মধ্যে কাভ্যার সঙ্গে সব কন্ট্রাক্ট ক্যান্সেল করে দেওয়া হয়। সুতরাং চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো…’

‘বুঝেছি।’ আমি ধরা গলায় বললাম।

‘এবারে আইনে আসি। ১৮৮৬ সালে সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন শহরে দশটা ইউরোপিয়ান দেশের মধ্যে একটা চুক্তি সই হয়। এর নাম বার্ন কনভেনশন। এই চুক্তি অনুযায়ী কোনো এক দেশের লেখক অন্য দেশে প্রকাশিত হওয়া নিজের লেখার ওপর স্বচ্ছন্দে নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন। ১৯২৮ সালে ভারত এর সদস্য তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং ভারতে প্রকাশ না পাওয়া কোনো বিদেশি ভাষার উপন্যাসকে তুমি যদি নিজের নামে চালাও, তাহলে তোমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে কোনো বাধা নেই।

‘এই কারণে তোর্সার লেখা প্রায় ১৬টি উপন্যাস বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। গল্প জুড়ে দেওয়া হয়, কোনো এক অজ্ঞাত আইনি জটিলতার কারণে বইগুলোর প্রিন্টিং অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ আছে।’

আমি খানিকক্ষণ ভেবে বললাম, ‘আচ্ছা রঞ্জনদের তো অত টাকা, পালটা কেস করতে পারল না?’ 

‘পাগল নাকি?’ বিক্রম কিছুটা গলা তুলে বলল, ‘কেস হলেই তো গোটা দুনিয়া জেনে যেত। আর কে যেচে ইন্টারন্যাশনাল খিস্তি খাবে? রঞ্জনদের রেপুটেশন বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, না কি?’

এতক্ষণে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল। আমি কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তাহলে এখন কী করবি?’

বিক্রম নিজের আঙুল মটকাতে মটকাতে বলল, ‘একজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে, প্রফেসর অমরেন্দ্রনাথ দত্ত। একটা হাঞ্চ, দেখি লাগে কি না। স্নান করে নে, তারপর বেরোব। আগে প্রদীপ্তকে একটা ফোন করতে হবে।’ বিক্রম কফিটা শেষ করেই বাথরুমে চলে গেল। আমিও দৌড়লাম।

প্রফেসর অমরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি প্রদীপ্ত অপেক্ষা করছে। ভদ্রলোক বাড়িতেই ছিলেন, ওনাকে জিগ্যেস করায় পরিষ্কার বললেন, ‘একজন শিক্ষক কোনোদিন নিজের ছাত্র-ছাত্রীর ক্ষতি চায় না। তোর্সা একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল। কিন্তু সৎ ছিল না। আমারই এক ছাত্র আমায় প্রথম এই ব্যাপারটা দেখায়। ভীষণ কষ্ট হয়েছিল জানেন। আমি তোর্সাকে ফোন করে বলেছিলাম। বাট শি ওয়াস অ্যাডামেন্ট, আমার মুখের ওপর ফোন কেটে দেয়। তারপর বাধ্য হয়ে স্টেপ নিই।’

বিক্রম জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা ডাঃ দত্ত, ষোলোটা আনকমন বই… বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার তাদের সবার নাম, পাবলিশারদের ডিটেইল এত কিছু আপনি কীভাবে জোগাড় করলেন?’

অমরেন্দ্রবাবু গলা খাঁকরে নিয়ে বললেন, ‘দেখুন ওর বেশ কিছু বই আমি নিজে পড়েছি, কিছু আমার ছাত্র-ছাত্রীরা জানায়…’

‘আর বাকিটা জানায় তিস্তা অলউইন দেব এভান্স, তাই তো?’ বিক্রম ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে নামটা বলল।

অমরেন্দ্রবাবুর মুখে কথা সরল না। তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বললেন, ‘আপনি জানলেন কী করে?’

‘আন্দাজ করেছিলাম, আপনি নিশ্চিত করলেন। এবারে শুরু থেকে বলুন।’

অমরেন্দ্রবাবু সামনে রাখা গ্লাস থেকে কিছুটা জল খেয়ে শুরু করলেন। ওনার থেকে জানা গেল, তিস্তার স্বামী অলউইন এভান্স ব্রিটিশ কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্টস বিভাগে কাজ করেন। তার সঙ্গে অমরেন্দ্রবাবুর কর্মসূত্রে আলাপ। আর অলউইনের সূত্রেই তিস্তার সঙ্গে আলাপ। অমরেন্দ্রবাবুর কথা অনুযায়ী দুই বোনই অসম্ভব মেধাবী। তোর্সাকে জিগ্যেস করায় সে এ বিষয়ে কিছুই বলতে চায়নি। পরে তিনি তিস্তার থেকে সব জানতে পারেন এবং এ-ও জানতে পারেন যে তোর্সা লেখা চুরি করেছে এবং এখনও তার চুরি অব্যাহত। এই তিস্তাই বেশিরভাগ লেখার সূত্র জোগাড় করে আর বইগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠান অমরেন্দ্রবাবু। 

বিক্রম মন দিয়ে সব শুনে বলল, ‘আপনি এবং তিস্তা আইন অনুযায়ী কোনো অন্যায় করেননি স্যার। তবে একটা কাজ করুন, অ্যাডলেরিয়ান সাইকোলজি আর ফেস্টিঙ্গারের সোশ্যাল কম্পারাইসন থিওরিটা একটু পড়ে নেবেন। কার্যকারণ বুঝতে আপনার সুবিধা হবে। আজ উঠি, নমস্কার।’ 

বিক্রমের ‘হাঞ্চ’ যে একেবারে জায়গায় গিয়ে লেগেছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য ও তিস্তার পুরো নামটা আন্দাজ করল কীভাবে! জিগ্যেস করায় বলল, ‘তিস্তার নাম্বারটা টু কলার অ্যাপে ফেলতেই পুরো নামটা দেখাল।’ 

এর পরের দুটো দিন নির্ঝঞ্ঝাটেই কাটল। এক দিন কাজের ফাঁকে প্রদীপ্ত এসে ঘুরে গেছে এবং জানিয়ে গেছে শেখর সেন কেসের প্রগ্রেস জানতে চাইছেন। বিক্রম তাঁকে ফোন করে এযাবৎ পাওয়া সব প্রগ্রেস জানানোয়, তিনি একটা হালকা ‘গুড’ বলে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু কথায় বলে, শান্ত পরিবেশ অনেক সময় ঝড়ের পূর্বাভাস হয়-আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হল। 

বাজটা পড়ল তিনদিনের মাথায়। সেদিন আমি কোচিং থেকে বাড়ি ফিরেছি রাত দশটায়। খাওয়া-দাওয়া করে সবে এগারোটা নাগাদ শুতে যাব, এমন সময় বিক্রমের ফোনটা বেজে উঠল। প্রদীপ্ত! বিক্রম স্পিকারে রাখতে কয়েকটা দ্রুত কথা শোনা গেল ‘বিক্রম, এক্ষুনি ডাঃ মিত্রের চেম্বারে চলে এসো। উনি খুন হয়েছেন।’ 

ফোনটা রেখে বিক্রম বলল, ‘চটপট রেডি হয়ে নে বোধি, বেরোতে হবে।’ কথাটা বলেই ও নিজের ঘরে চলে গেল চেঞ্জ করতে। 

আধ ঘণ্টার মধ্যে আমরা ডাঃ মিত্রের চেম্বারে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নামতেই দেখলাম, জায়গাটা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। এত রাতেও দেখলাম কৌতূহলী মানুষের অভাব নেই। একজন অপরিচিত পুলিশ কন্সটেবল এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন, ‘বিক্রমবাবু কে?’ 

উত্তরে বিক্রম ‘আমি’ বলায় সেই কন্সটেবল আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন। 

ভিতরে যেতেই প্রথমে চোখে পড়ল, পেশেন্টদের বসার জায়গায় আগেরদিন দেখা সেই রিসেপশনিস্ট একজন মহিলার পাশে বসে কাঁদছে। পাশের ভদ্রমহিলাকে এর আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হল না, মুখটা ফ্যাকাসে আর অস্বাভাবিক রকমের স্থির। ‘উনি মিসেস আকাশ মিত্র। এক ঘণ্টা হল এখানে এসেছেন।’ আচমকা একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর, পিছনে ফিরতেই দেখলাম প্রদীপ্ত। দুজনের হাতে গ্লাভস আর মাস্ক দিয়ে চোখের ইশারায় ভেতরে আসতে বলল। 

চেম্বারে ঢুকতেই যে নৃশংস, মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হলাম, তা ভাষায় ব্যক্ত করা আমার অসাধ্য। ডাঃ মিত্র নিজের চেয়ারে বসে আছেন, মাথাটা বাঁ দিকে হেলে রয়েছে, দু’চোখের ভেতর আমূল বিঁধে আছে দুটো কলম। আর মুখটা অস্বাভাবিক রকমের বড় হাঁ করা-যেখানে আগেরদিনের টেবিলে রাখা সেই টেডি বিয়ার। ফ্যাকাসে হলুদের ওপর রক্ত মিশে ওটা এখন গাঢ় কমলা রং ধারণ করেছে। 

আমি বেশিক্ষণ তাকাতে পারলাম না, বমি পেয়ে গেল। দুটো লোক দেখলাম, এদিক-ওদিক থেকে ছবি তুলে চলেছে। বিক্রম কিন্তু নির্বিকার, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রথমে বডি দেখল, তারপর সামনে রাখা কম্পিউটার, টেবিলের নিচটা, ওষুধের আলমারি, ফ্রিজ কিছুই বাদ দিল না। তারপর প্রদীপ্ত আর আমায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। 

বাইরে আসতেই প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল, ‘কী বুঝছ?’ 

বিক্রম খানিকক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘প্রদীপ্ত, তোমাদের টিম মনে হয় ওনার কম্পিউটার, ফোন এগুলো নিয়ে যাবে। ফাইন্ড আউট ওনার কম্পিউটারে তোর্সা দেব রঞ্জনের ফাইলটা আছে কি না? আর শেষ ছ’মাসে উনি কাদের কাদের সঙ্গে ফোনে খুব ফ্রিকোয়েন্টলি কথা বলেছেন!’ 

‘ওকে, আর কিছু?’ প্রদীপ্ত জিগ্যেস করল। 

‘হ্যাঁ, ওনার বডি কে প্রথম খুঁজে পায়?’ 

‘এখানকার এক সিকিউরিটি। নরমালি ওনার অফিস নাকি কখনোই আটটার পরে খোলা থাকে না। সাড়ে আটটার পরও ডাক্তারের গাড়ি পার্কিং লটে আছে দেখে সিকিউরিটির সন্দেহ হয়, সে ভেতরে এসে ডাকাডাকি করে উত্তর না পেয়ে চেম্বারের ভেতরে ঢুকে দ্যাখে এই অবস্থা। অবশ্য ওর কথা অনুযায়ী, ও কিছু টাচ করেনি। মোড়ের মাথায় দাঁড়ানো এক ট্রাফিক গার্ডকে ডেকে আনে। সেই লোকাল থানায় খবর দেয়।’ 

‘তখন ক’টা বেজেছিল?’ 

‘লোকাল থানায় খবর যায় ন’টা নাগাদ। বডি আবিষ্কার… ধরে নাও আরও পনেরো-কুড়ি মিনিট আগে।’ 

বিক্রম কী যেন ভাবল, তারপর পকেট থেকে ফোন বার করে কাকে একটা ফোন করল, ‘হ্যালো ডাঃ ব্যানার্জি?… আমি বিক্রম, বিক্রমজিৎ চক্রবর্তী, আপনার সঙ্গে কয়েকদিন আগে দেখা করতে গিয়েছিলাম। রিগার্ডিং তোর্সা দেব রঞ্জন… হ্যাঁ শুনুন আপনি এই মুহূর্তে কোথায় আছেন?… ফ্যান্টাস্টিক আপনি বাড়িতেই থাকুন। আগামী কয়েকদিন আপনাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। উই হ্যাভ রিসন টু বিলিভ দ্যাট ইওর লাইফ ইজ আন্ডার থ্রেট। আর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ডাঃ আকাশ মিত্র একটু আগে নিজের চেম্বারে খুন হয়েছেন।… ডাঃ ব্যানার্জি প্লিজ প্যানিক করবেন না। এই মুহূর্তে যেকোনো লোক, সে আপনার যতই কাছের হোক না কেন-কারও সঙ্গে বাইরে কোথাও দেখা করবেন না। কোনো অপরিচিত কাউকে নিজের বাড়িতে অ্যালাউ করবেন না।… থ্যাঙ্ক ইউ।’ 

কথা শেষ হতেই বিক্রম প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে বলল, ‘প্রদীপ্ত, এক্ষুনি ডাঃ ব্যানার্জির সিকিউরিটির ব্যবস্থা করো।’ 

‘রাইট, তবে তার আগে একবার শেখরস্যারের পারমিশন নিয়ে নিই।’ 

‘তাড়াতাড়ি করো, আমি ততক্ষণ সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলব।’ প্রদীপ্ত একজন অফিসারকে ডেকে বলে দিল আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা করতে। বিক্রম অফিসারকে বলে সেই সিকিউরিটি গার্ডকে ডাকল।

লোকটা সামনে এসে একটা স্যালুট ঠুকল।  

‘আপনার নাম?’ 

‘বিমল পাইক স্যার।’ 

‘এখানে কতদিন কাজ করছেন?’ 

‘চার বছরের ওপর স্যার।’ 

‘ডাক্তারবাবুর সঙ্গে শেষ কে দেখা করতে এসেছিল?’ 

‘অনেকেই তো আসে স্যার প্রতিদিন। অতটা খেয়াল করিনি।’ 

‘খেয়াল রাখাটাই তো আপনার কাজ। সেটাই রাখলেন না! অদ্ভুত।’ বিক্রমের গলায় স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। 

লোকটা একটু থতমত খেয়ে বলল, ‘না স্যার খেয়াল রাখি, আসলে যারা এই অফিসগুলোতে কাজ করতে আসে তাদের নাম লিখে রাখি না। কারণ তারা ওই বাঁ দিকের রাস্তা দিয়ে ওপরে যায়। ওখানকার লিফটও আলাদা। আর ওদের সবকিছু অফিসগুলোই লিখে রাখে, তাই আমরা আলাদা করে কিছু করি না।’ 

বিক্রম ‘হুম’ বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, ‘ডাক্তারবাবুর চেম্বার কতক্ষণ খোলা থাকে?’ 

‘আজ্ঞে চেম্বারের ম্যাডাম বেরিয়ে যায় সাতটা নাগাদ, তার কিছুক্ষণ পরেই ডাক্তারবাবুও বেরিয়ে যান। খুব দেরি হলে সাড়ে সাতটা… তার বেশি কখনও হয়নি।’ 

‘যিনি মেন গেট দিয়ে ঢুকে ভেতরে যাচ্ছেন, তাকে আপনি এটা তো নিশ্চয়ই জানতে চান-কোথায় যাবেন? নাকি সেটাও চান না?’ 

উত্তরে বিমল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বোঝাই যাচ্ছে, কাজে সাংঘাতিক রকম গাফিলতি করে। বিক্রম নিজের মাথার রগ টিপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে ‘ইউসলেস’ আর ‘অপদার্থ’-শব্দদুটো প্রয়োগ করল। ততক্ষণে প্রদীপ্ত এসে দাঁড়িয়েছে। সব শুনে টিপিকাল পুলিশি ঢঙে বলল, ‘চিন্তা নেই, উলটো করে ঝুলিয়ে বাটাম দেব। সব সত্যি বেরিয়ে আসবে।’ তারপর বিমলকে বলল, ‘সিসিটিভি ফুটেজ চাই।’ 

এবার দেখলাম, বিমল কেমন যেন একটা অদ্ভুত মুখ করে তাকিয়ে রইল। পাশের অফিসার, এক ধমক দিয়ে বললেন, ‘কী হল? কথা কানে যাচ্ছে না?’

বিমল পাইক এবারে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘স্যার বিল্ডিংয়ের ক্যামেরাগুলো চার দিন ধরে খারাপ। আমি সেক্রেটারি রঞ্জিতবাবুকে…’ লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রদীপ্ত ঠাটিয়ে একটা চড় কষাল বিমল পাইকের গালে। 

‘শুয়োরের বাচ্চা, চার দিন ধরে একটা সেমি-কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি খারাপ, তার ওপর কে ঢুকছে বেরোচ্ছে, দেখিসনি? মাগনায় মায়না নিতে আসিস? এই কে আছ, এইটাকে তুলে থানায় নিয়ে যাও। তারপর আমি দেখছি।’

বিমল পাইক হাঁউমাউ করে বলল, ‘স্যার বিশ্বাস করুন আমার কোনো দোষ নেই। আমি বিল্ডিংয়ের সেক্রেটারি রঞ্জিতবাবুকে দু’বার বলেছি, ক্যামেরা খারাপ হয়ে গেছে। উনি কিছু না করলে আমি কী করব?’ 

‘তুমি নজর রাখবে শালা, ওটাই তোমার কাজ।’ চেঁচিয়ে বলল প্রদীপ্ত। 

‘ডাক্তারবাবুর কাছে যে মেয়েটি কাজ করে, সে কখন বেরিয়েছে?’ এবার বিক্রম জিজ্ঞাসা করল। 

‘আজ্ঞে তখন সাতটা হবে।’ 

‘তারপর কেউ এসেছিল ডাক্তারবাবুর কাছে?’ 

‘মনে হয় না স্যার, সাতটার পর ব্যাঙ্কের স্যারেরা বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়। কেউ যদি তাদের সঙ্গে ঢুকে গিয়ে থাকে… স্যার আমার মনে হয় তাই হয়েছে।’ বিমল পাইক চোখ বড় বড় করে শেষ কথাটা বলল। 

‘এই দাস, একে নিয়ে গিয়ে এর স্টেটমেন্টটা লিখে নাও।’ পাশে দাঁড়ানো অফিসারের উদ্দেশে বলল প্রদীপ্ত। সেই অফিসার ছোট্ট একটা ‘ইয়েস স্যার’ বলে বিমল পাইককে নিয়ে একধারে চলে গেলেন। 

‘প্রদীপ্ত, তোমরা কেউ ওই রিসেপশনিস্ট মহিলার সঙ্গে কথা বলেছ?’ বিক্রম প্রদীপ্তর উদ্দেশে বলল। 

‘লোকাল থানা থেকে স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছে। তবে তুমি চাইলে একবার কথা বলা যেতেই পারে। বলবে?’ 

বিক্রম বলল, ‘চলো।’ 

ভেতরে যাওয়ার সময় আরেক ঝামেলা হল। ফরেন্সিক টিম তাদের কাজ কমপ্লিট করে পোস্টমর্টেমের জন্য বডি শিফট করতে যাবে-এই সময় হঠাৎ মিসেস মিত্র উঠে এসে ‘নিও না, নিও না ওকে ছেড়ে দাও। ওকে একটু শান্তি দাও।’ বলে সাংঘাতিক কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। সঙ্গে যোগ দিল সেই রিসেপশনিস্ট। এই বাঁধভাঙা রোদনোচ্ছ্বাসে তার কান্নার বেগও বেড়ে বহুগুণ হয়ে গেল। দুজন মহিলা কনস্টেবল বহু কষ্টে তাদের সামলালেন। আমি, বিক্রম আর প্রদীপ্ত চেম্বারের ভেতর থেকে এই দৃশ্য দেখছিলাম। কিছু পরে রিসেপশনিস্ট মেয়েটিকে পাওয়া গেল। চেম্বারের পেছনে একটা প্যানট্রি গোছের ঘরে এলাম মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার জন্য। বিক্রম শুরু করল, ‘আগেরদিন তাড়াহুড়োয় আপনার নামটা জানা হয়নি…’ 

মেয়েটি ধরা গলায় উত্তর দিল, ‘অপর্ণা, অপর্ণা রায়।’ 

‘বেশ, ডাক্তারবাবু বাড়ি যান ক’টা নাগাদ?’ 

‘এখান থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে বেরিয়ে পড়েন। বাড়ি পৌঁছতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগা উচিত নয়।’ 

‘ওনার বাড়ি কোথায়?’ 

‘গড়চা, ম্যাডক্স স্কোয়্যারের পুজোটা যেখানে হয়, তার কাছেই।’ 

‘আপনি আজ কখন বেরিয়েছিলেন?’ 

‘রোজ যে সময় বেরোই তখনই, সাতটা।’ 

বিক্রম একবার কী ভেবে নিয়ে আবার প্রশ্ন করল, ‘শেষ কে এসেছিল?’ 

‘নাম মনে নেই, তবে এন্ট্রি করা আছে। একজন মহিলা আর ওনার হাজবেন্ড। ওনারা চলে যান সাড়ে পাঁচটার কিছু পরে। তারপরে মিস্টার আগরওয়াল এলেন। উনি স্যারের পুরোনো পেশেন্ট। এখন সুস্থ, মাঝে মধ্যে এসে দেখা করেন। এই চেম্বারটার ব্যবস্থা উনিই করে দিয়েছিলেন। উনি চলে যান সাড়ে ছ’টা নাগাদ। তারপর স্যার বেরিয়ে এসে একটু চায়ের কথা বললেন। সামনের দোকান থেকে বললে দিয়ে যায়। স্যার বোধহয় সে সময় কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। এর পর চা আসে, আমিও এক কাপ খাই, সাতটা নাগাদ বেরিয়ে যাই।’ 

বিক্রম চোখ সরু করে জিগ্যেস করল, ‘বেরোনোর সময় কাউকে ঢুকতে দেখেছিলেন?’ 

অপর্ণা খানিকক্ষণ ভেবে বলল, ‘না, সেরকম কাউকে তো চোখে পড়েনি।’ 

‘আপনি শিওর? ভালো করে ভেবে দেখুন তো!’ বিক্রম একটু জোর দিল। 

মেয়েটি আবার খানিকক্ষণ ভেবে একই উত্তর দিল। 

বিক্রম মাথা নেড়ে বলল, ‘ওকে, ডাক্তারবাবুকে শেষ কয়েকদিনে কি কোনো কারণে বিচলিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হয়েছিল আপনার?’ 

‘দেখুন, স্যার খুব চাপা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। যদি কোনো কিছু হয়েও থাকে, সেটা বাইরের কাউকে বুঝতে দিতেন না।’ 

‘কীরকম?’ বিক্রম প্রশ্ন করল। 

‘এই চেম্বারে আসার পর পর একটা ঘটনা হয়েছিল। একজন পেশেন্ট স্যারকে একবার চড় মেরেছিল। স্যার গোটা ঘটনাটা নিজের ফ্যামিলির কাছে পর্যন্ত চেপে যান। সেবার লক্ষ্মীপুজোয় ওনার বাড়িতে যাই, সে সময় ম্যাম মানে ওনার স্ত্রী’কে কথায় কথায় ব্যাপারটা বলে ফেলি। উনি এই ঘটনা শুনে অবাক হলেও স্যারের চেপে যাওয়ায় অবাক হননি। মজা করে বলেছিলেন, স্যার নাকি চাইলে পেটের ভেতর ব্রহ্মাণ্ডও লুকিয়ে রাখতে পারেন।’ 

‘শেষ প্রশ্ন, উনি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন?’ 

‘খুব ভালো মানুষ ছিলেন। স্যালারি যেমন সময়মতো দিতেন, তেমনই পুজোর সময় বোনাস হিসেবে কিছু এক্সট্রা টাকাও পেতাম। ওনার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল-কখনও রাগ করতেন না, তা সে যাই হয়ে যাক না কেন! কারও সঙ্গে কোনো ঝগড়া ছিল না। সেই মানুষটার এই অবস্থা যে কে করল, বুঝতে পারছি না।’ শেষের কথাগুলো বলতে বলতে অপর্ণা কেঁদে ফেলল। 

‘মাপ করবেন আরেকটা প্রশ্ন করছি, পেশেন্টদের ডিটেইলস কোথায় থাকে? আই মিন, এই যা কথাবার্তা হয় নিশ্চয়ই উনি সব নোট করেন।’ 

অপর্ণা নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, ‘বছর তিনেক হল, স্যার একটা সোনির ডিক্টাফোন ব্যবহার করেন। তার আগে অবশ্য সব লিখে নিজের হাতে ফাইল করে রাখতেন। ওই ডিক্টাফোন কেনার পরেই সবকিছু ডিজিটালাইজড করে ফেলেন। প্রায় তিরিশ বছরের সব রেকর্ড। একটা লোকাল আইটির ছেলেকে ডেকে পাঠান। সব করতে ছ’মাসের ওপর সময় লেগেছিল। সমস্তটা ওনার কম্পিউটারেই আছে।’ 

‘গ্রেট, থ্যাঙ্ক ইউ মিস রয়। এবার আপনি আসতে পারেন।’ 

অপর্ণা রায় উঠে পড়লেন। সঙ্গে আমরাও। প্রচণ্ড চোখ টানছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত দেড়টা। বিক্রমের দিকে তাকাতে দেখি, সে-ও হাই তুলছে। চোখাচোখি হতে একটু হেসে বলল, ‘কী রে, ঘুম পাচ্ছে? আমারও। চল বাড়ি যাব।’ কথাটায় একটু স্বস্তি পেলাম। বাইরের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ বিক্রম প্রদীপ্তর দিকে ঘুরে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা প্রদীপ্ত, ডেডবডির পাশে কোনো গান চলছিল?’ 

‘ও ইয়েস, বলতেই ভুলে গেছি।’ 

‘কোন গান?’ 

‘ওই তো একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, খুব ফেমাস। মনে পড়ছে না, দাঁড়াও। আকাশ দিয়েই গান…’ 

‘আকাশ ভরা সূর্য তারা?’ আমি জিগ্যেস করলাম। 

‘না না, এটা নয়। হ্যাঁ মনে পড়েছে, এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।’ 

‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ বিক্রম শুকনো হেসে বলল, ‘এখন আসি, গুড নাইট।’ 

‘গুড নাইট বিক্রম। গুড নাইট বোধিসত্ত্ব। সাবধানে যেও।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *