তোমার খোলা হাওয়া – প্রমিত গুপ্ত

তোমার খোলা হাওয়া

আরও একবার লালবাজার, ডিসিডিডির অফিস। তফাত শুধু একটাই, আগেরবারের মতো আমরা ভেতরে নেই, বরং গত পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ওপর বাইরে বসে অপেক্ষা করে চলেছি। সেই তিরিক্ষি মেজাজের অফিসারটাই আমাদের বসিয়েছেন। ওনার থেকেই জানলাম, শেখর সেন অফিসে নেই। কখন ফিরবেন তাও কেউ জানে না। আমি একবার বিক্রমকে বললাম, ‘প্রদীপ্তকে একটা ফোন করলে হয় না! ইনি কখন ফিরবেন সেই ফাঁকে একটু ক্রাইম সিনটা দেখা হয়ে যেত।’

বিক্রম বলল, ‘শেখর সেন না বললে আমাদের আর কেউ ক্রাইম সিনে অ্যালাউ করবে না। সুতরাং যতই সময় লাগুক… অপেক্ষা করতে হবে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সে কী! কেন?’      

‘আমরা এখনও পর্যন্ত কোনো রেজাল্ট দিতে পারিনি। এক মাসের কম সময়ে চার-চারটে খুন। এখানে আসার আগে একবার প্রদীপ্তর সঙ্গে ফোনে কথা হল, বলল, যখনই হোক লালবাজারে যেন আসি।’ বিক্রম বলল, ‘বুঝলি বোধি, আততায়ী আমাদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সে হয় আমাদের পিছু পিছু, নয় সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। হয়তো আমাদের চোখের সামনেই আত্মগোপন করে রয়েছে। একে ধরার একটাই উপায়- ইতিহাসের সেই লুকানো পাতাগুলো উদ্ধার করতে হবে।’

এইসময় দেখলাম হঠাৎ আশেপাশের অফিসারেরা তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়াল। বুঝলাম, ডিসিডিডি আসছেন। আবার আমার পেটটা খালি খালি লাগতে শুরু করেছে। শেখর সেন অত্যন্ত গম্ভীর মুখে অফিসে প্রবেশ করলেন। একটাই স্বস্তি, সঙ্গে প্রদীপ্তও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ডাক পড়ল। ভেতরে গেলাম।

‘বোস রনি, তুমিও বোসো ভাই।’ ঘরে ঢুকতেই বললেন শেখর সেন, ‘রনি, আমি এতক্ষণ হোম মিনিস্টারের অফিসে বসে ছিলাম। অপজিশন লিডারেরা সকাল থেকে বিভিন্ন চ্যানেলে বসে পুলিশের বাপ-বাপান্ত করে চলেছে। হোয়্যার ইজ দ্য রেজাল্ট? এই তদন্তের অংশ হওয়ার জন্য তুই তো সেদিন অনেক বড় বড় কথা বলেছিলি। কী হল তার?’

‘শেখরকাকু, আমি জানি আমি এখনও রেজাল্ট দিতে পারিনি, কিন্তু দ্য কিলার ইজ এক্সট্রিমলি স্মার্ট। আর এটা এমন সিরিয়াল কিলিংয়ের কেস, যাতে কোনো পার্টিকুলার প্যাটার্ন মেইন্টেন করা হয়নি। একেক জায়গায় একেক রকমভাবে খুন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের বিভ্রান্ত করতে কতগুলো গান চালিয়ে রেখেছিল। আমায় আরেকটু সময় দাও প্লিজ।’ বিক্রমের গলায় অনুনয়ের সুর স্পষ্ট।

‘আরও সময়? এরপরে আরও সময় চাস তুই? চার-চারটে খুন… আর আমরা এখনও অন্ধকারে রয়েছি। তুই কি সত্যিই বুঝতে পারছিস পরিস্থিতি কতটা গুরুতর?’

‘পারছি কাকু, কিন্তু আমি এই মুহূর্তে একটা পুরোনো ঘটনা খুঁজে চলেছি। প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো সাধারণ ঘটনাই হবে, কিন্তু যত সময় যাচ্ছে বুঝতে পারছি-এটা একটা এমন ঘটনা, যার সঙ্গে পুলিশ ও সরকার একসঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘটনার সময়কাল চুরাশি থেকে দু’হাজার সালের মধ্যে। এ ব্যাপারে তুমি কোনো সাহায্য করতে পারো?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।

শেখর সেন একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘মানে? চুরাশি থেকে দু’হাজার… কোন ঘটনা না বুঝলে কী করে বলব? কত কেসই তো আছে।’

‘এমন কোনো কেস, যার সঙ্গে তোর্সা দেব রঞ্জন জড়িয়ে ছিলেন, যেটা চেপে যাওয়া হয়েছে?’ বিক্রম ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে কথাগুলো বলল।

‘তুই কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছিস রনি?’ শেখর সেন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কেস সলভ হচ্ছে না বলে এইসব কন্সপিরেসি থিওরি শোনাচ্ছিস?’

‘আমি কোনো কন্সপিরেসি থিওরি শোনাচ্ছি না কাকু। এই কেস কোনো না কোনো গোপন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। সেটা জানতে না পারলে শুধু আমি কেন, কেউ এই কেস সলভ করতে পারবে না।’ বিক্রম রীতিমতো দাপটের সঙ্গে কথাটা বলল। একটু স্বস্তি পেলাম, অনেকক্ষণ বাদে পুরোনো বিক্রমকে দেখছি।

শেখর সেন খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘তুই কী করে এই টাইমলাইন নিয়ে এত শিওর হচ্ছিস?’

বিক্রম সামনে রাখা জলের গ্লাসে সামান্য চুমুক দিয়ে, প্রথম থেকে এখন অবধি সব ঘটনা বলে গেল। কথা শেষে ভদ্রলোক শুধু একবার ‘হুম্’ বলে চুপ করে গেলেন, তারপর বললেন, ‘শোন রনি, সরকার, পুলিশ দুই-ই এই মুহূর্তে খুব চাপে আছে। এক ঘণ্টার মধ্যে সত্যসিন্ধু লাহিড়ী আসছেন। আমি ওনার থেকে ম্যাক্সিমাম সাত দিন সময় নিতে পারি। তার মধ্যে যদি সমাধান হয় তো ভালো, না হলে ‘ক্যে সেরা সেরা’। সুতরাং মুভ ফাস্টার। ডিসমিস।’

আমরা উঠে দাঁড়ালাম বেরোনোর জন্য। শেখর সেন আরেকবার বিক্রমকে ডাকলেন, ‘যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট কথা বলে নিই। আমি চাই তুই এই কেসটা ক্র্যাক কর, কিন্তু আগে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে দেখা। আর হ্যাঁ, আজকের পরে কখনও কোনো কাজ বের করার জন্য নিজের কাকার নাম ভাঙাস না। আজ আকাশ চক্রবর্তী থাকলে এতগুলো খুন হতো না। খুনি অনেক আগেই ধরা পড়ে যেত। এটা আমি নই, তোর কাকার ট্র্যাক রেকর্ড বলছে। আশা করি কথাটা মনে রাখবি, এবার যা।’

আমাদের সঙ্গে প্রদীপ্তও বাইরে এল। বিক্রম চিন্তিত মুখে একবার প্রদীপ্তকে জিগ্যেস করল, ‘সত্যসিন্ধু লাহিড়ী কে?’

‘ডিজিপি ওয়েস্ট বেঙ্গল,’ প্রদীপ্ত উত্তর দিল, ‘লোকটা প্রথম জীবনে আর্মিতে ছিলেন। যে রকম রূঢ়, সেরকম কড়া। উনি আসছেন যখন, তখন নিশ্চয়ই ড্রাস্টিক কিছু করবেন।’

কথাটা শুনে বিক্রমের চোখ-মুখ এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল। তার পরক্ষণেই ও চতুর্থ খুনের বিবরণ জানতে চাইল। তাতে প্রদীপ্ত যা বলল, তা মোটামুটি এই-খুন হয়েছে সূর্যতোরণ বিল্ডিংয়ের ছাদে। নিহত ব্যক্তি হাশিম তেরাজি প্রতিরাতে ছাদে বসে মদ্যপান করেন। কালও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রাথমিক পরীক্ষা অনুযায়ী খুন হয়েছে রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার ভেতর। খুনের আগে নিহতের ওপর শারীরিক অত্যাচার হয়। এই প্রথমবার খুনির অস্ত্র মৃতের পাশেই পড়েছিল। প্রায় পাঁচ থেকে ছ’কিলো ওজনের একটা প্রকাণ্ড পাথর। তবে সেখান থেকে কোনোরকম ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি। যেহেতু বহুদিনের পুরোনো বিল্ডিং, তাই না সিসিটিভি আছে না সিকিউরিটি। আর পাশে ভিক্টিমের ফোনে চলছিল তোমার খোলা হাওয়া।

‘বাড়ির লোক কী বলল?’ বিক্রম জিগ্যেস করল।

‘বাড়ির লোক বলতে ওনার স্ত্রী আর দুই মেয়ে। একজনের বিয়ে হয়ে গেছে, আরেকজনের নাকি এই বছরই বিয়ে। তবে কেউই বিশেষ কিছু বলতে পারল না। জানবার মধ্যে ওই… প্রতি রাতে বোতল নিয়ে ছাদে বসে, ব্যস। কোনো টেনশনে ছিল কি না, কারও সঙ্গে ঝামেলা ছিল কি না-কিছুই জানে না।’

‘বিল্ডিংটা তো জি প্লাস ফোর?’ বিক্রম জিগ্যেস করায় প্রদীপ্ত মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

‘একদম ওপর তলায় যারা থাকে, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে?’

‘চেষ্টা করেছিলাম লাভ নেই। খুনটা হয়েছে ছাদের পেছনের দিকে। সেখানের ফ্ল্যাটটা নাকি আজ প্রায় দশ বছর ধরে খালি পড়ে আছে। ফ্ল্যাটের মালিক বিদেশে থাকে।’

‘প্রিভিয়াস ভিক্টিমদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ?’

‘এখনও কিছু পাইনি,’ প্রদীপ্ত বলল, ‘এনার বাগুইআটি, রাজারহাট মিলিয়ে প্রায় তিনখানা বার আছে। তবে লোকটার খুব দুর্নাম আছে। বিল্ডিংয়ের কেউই বিশেষ পছন্দ করে বলে মনে হল না। অবশ্য কারণটা অস্বাভাবিক নয়। হাশিম তেরাজির নামে এককালে খিদিরপুর এলাকায় বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত। কম করে পনেরো থেকে ষোলোটা মার্ডার কেসে লোকটার নাম আছে। শেখরস্যার নিজে বার তিনেক অ্যারেস্ট করেছেন। কিন্তু প্রত্যেকবার প্রমাণের অভাবে জামিন পেয়ে গেছে। খুন, রাহাজানি, তোলাবাজি, দেহব্যবসার চক্র, অবৈধ জমি কেনা-বেচা-সব ধরনের গুরুতর অপরাধের সঙ্গে ইনি জড়িত ছিলেন। এমন লোকের তো আর শত্রুর অভাব নেই।’

‘একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকছে না। না হয় রাত্রি দশটায় সবাই নিজের ঘরে খিল দিয়েছিল তাই কেউ খুনিকে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেনি। কিন্তু একটা পাঁচ-ছ’কিলো ওজনের পাথর প্রায় ছ’ফুট উঁচু থেকে আছড়ে ফেলে কাউকে মারা হল, আর কেউ কোনো আওয়াজ পেল না? এটা কী করে সম্ভব?’ বিক্রম অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।

‘জিনিসটা আমারও মাথায় এসেছে, তবে ওই দিন ঠিক পাশেই একটা অবাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। ফলে বক্স বাজিয়ে গান চলছিল। আর তাছাড়া তেরাজি সবসময় যে একা একা মদ্যপান করতেন তা নয়, মাঝে মাঝে তার শাগরেদরাও আসত। তখন প্রচুর হই-হুল্লোড় চলত। ফলে শব্দ অনেকেই পেয়েছে, কিন্তু আমল দেয়নি।

‘আর একটা কথা, একটা দড়ির পোড়া অংশ পেয়েছি। দড়িতে প্রচুর পরিমাণে ঘি মাখিয়ে রাখা হয়েছিল। রাতে বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে তালা মেরে দেওয়া হয়, ফলে খুনি দড়ি দিয়ে নেমেছে। তারপর দড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। বাড়ির পেছন দিকে জলা জমি। ওখানে কেউ ছিল না। আগুনলাগা দড়িও কারও চোখে পড়েনি। ইট ওয়াজ এক্সট্রিমলি ওয়েল প্ল্যানড।’ প্রদীপ্ত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

‘কিন্তু খুব রিস্কিও ছিল।’ বলে বিক্রম মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। এইসময় একটা লোক এসে প্রদীপ্তর কানে কানে কিছু বলতেই প্রদীপ্ত আমাদের ইশারায় ওর পেছন পেছন আসতে বলল। ওর বসার জায়গায় আসতে আমাদের ক্রাইম সিনের ছবি দেখানো হল। এবারে আমি আর মুখ ফেরালাম না। এতগুলো ভয়ানক মৃত্যু দেখে দেখে চোখ আর মন দুই-ই সয়ে গেছে।

কিন্তু মৃত্যুর ভয়াবহতা কমেনি। একটা জায়গায় এসে আমার চোখ আটকে গেল। হত্যার অস্ত্রটা দেখলাম একটা বড় গোল সাইজের পাথর। একটা পাঁচ সাইজের ফুটবলের থেকে সামান্য বড়। কিন্তু পাথরটা খুব চেনা, কোথায় যেন দেখেছি, কিছুতেই মনে পড়ছে না। অবশ্য এমন নয় যে, এটা কোনো দুষ্প্রাপ্য কিছু! এমন পাথর এই কলকাতা শহরেই প্রচুর জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু এটাকেই কেন আমার এত চেনা লাগছে?

বিক্রমকে কিছু বললাম না। ও মন দিয়ে সব দেখল। শেষে প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা এই লোকটা… হাশিম তেরাজি। প্রোমোটার ছিলেন। রুলিং পার্টির লোক ছিলেন…’ বলেই চুপ করে গেল। পরক্ষণেই ও টেবিলে একটা চাপড় মেরে বলল, ‘তাই তো! এটা তো ভাবিনি। আচ্ছা প্রদীপ্ত, সূর্যতোরণ বিল্ডিংটা তো বোধহয় এনারই বানানো?’

প্রদীপ্ত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বিক্রম বলল, ‘আমাদের প্রাক্তন মন্ত্রী প্রণবেশ পাল মশাই এখানেই ফ্ল্যাট কিনলেন কেন? তার মানে হাশিম তেরাজি আজকে থেকে নয়, বহুদিন ধরেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নির্ঘাত উনি তোর্সাকেও চিনতেন। প্রদীপ্ত, ইমিডিয়েটলি আমাদের আরেকবার প্রণবেশ পালের বাড়িতে যেতে হবে। উনি সব জানেন।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *